📄 কাফেরদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান
কাফেরদের সঙ্গে তথাকথিত শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে একটি ইসলামি সাময়িকীতে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। সাময়িকীটির প্রধান দায়িত্বশীলের সঙ্গে একজন আলেম এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তাদের কথোপকথন ছিল নিম্নরূপ-
= সুরা তাওবা-র ১২৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা আদেশ করেছেন- [অর্থ] 'হে ঈমানদারগণ! কাফেরদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের নিকটবর্তী, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, এবং তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা পায়। আর জেনে রাখো, আল্লাহ মুত্তাকিদের সঙ্গে আছেন'। এ জাতীয় আয়াত ও কাফেরদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্যে সমন্বয়সাধনের ধরণ কী হবে?
= = হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাজিআল্লাহু আনহু কি তাঁর ইহুদি প্রতিবেশির খোঁজখবর নেননি যে, তাঁর জন্য যে গোশত রান্না করা হয়েছে, তা থেকে ঐ ইহুদিকে দেওয়া হয়েছে কি-না। এটি কি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নয়?
= আমার ধারণায় ঐ ইহুদি জিম্মি কাফের ছিল; হরবি কাফের ছিল না। [বলাবাহুল্য, ফকিহগণের পরিভাষায় জিম্মির যে সংজ্ঞা, তা এ দেশের কাফেরদের ব্যাপারে প্রযোজ্য হয় না। এ বইয়ের আলেম الْمَوْسُوْعَةُ الفِقْهِيَّةُ الْكُوَيْتِيَّةُ কিতাবে (৭ : ১২৪) ঐ সকল শর্ত দেখে নিতে পারেন, যেগুলো মেনে নেওয়ার শর্তে তখনকার জিম্মিরা সাইয়িদুনা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট তাদেরকে নিরাপত্তাপ্রদানের আবেদন পেশ করেছিলো এবং হজরত ফারুকে আজম রাজিয়াল্লাহু আনহু তাদের দরখাস্ত গ্রহণ করেছিলেন। এই অধ্যয়ন দ্বারা বর্তমানের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিভিন্ন দেশের কাফেররা জিম্মি কি-না, তা বুঝা সহজ হবে ।]
= = লেখক সাধারণভাবে কাফেরদের সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। হরবি কাফেরদের সম্বন্ধে আলোচনা করেননি। [তিনি সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছেন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতি প্রবন্ধে যে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে, তা জিম্মি কাফেরদের ব্যাপারে। অতএব আপত্তির কিছু নেই ।]
= আমাদের অঞ্চলের বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে সাধারণ পাঠক প্রবন্ধের উৎসাহদান কাদের ব্যাপারে প্রয়োগ করবেন?
= = [রাগতস্বরে] আপনি বুঝতে চান না, বুঝাতে চান। আপনার অধ্যয়ন অসম্পূর্ণ এবং আপনার বুঝ ভাসাভাসা। গভীর চিন্তার সাথে পাঠ করুন, সকল আপত্তি দূর হয়ে যাবে।
= হয় আপনিই আমাকে বুঝিয়ে দিন। অথবা বিশেষ কোনো কিতাবের বিশেষ কোনো স্থান নির্দেশ করুন, আমি তা পড়ে জেনে নিব ইনশাআল্লাহ।
= = ইতিহাস পাঠ করুন।
[মানসম্মত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে যাতায়াত করে ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থাবলির বৈচিত্র্য, পরিমাণ ও বিস্তৃতি সম্পর্কে যাদের কিছুটা ধারণা আছে, তাঁরা বুঝবেন, এটি এমন এক বিষয় পাঠ করার নির্দেশ, অন্য সবকিছু থেকে অবসর হয়ে কয়েক বছর একটানা করলেও তা সমাপ্ত হওয়ার নয় ।]
উক্ত কথোপকথনকারী আলেমকে তার একজন সহকর্মী প্রশ্ন করলেন, উল্লিখিত দায়িত্বশীলের সাথে আলাপচারিতা সম্পন্ন হওয়ার পর এখন আপনার অনুভূতি কী? উত্তরে তিনি বলেছেন, আমার মনে হয়েছে, দলিল চাইলে তিনি ও তাঁর স্তরের লোকেরা বিরক্ত হন। [বন্ধনীর ভেতরের লেখাগুলো সংলাপের অন্তর্ভুক্ত নয় ।]
এমন কিছু কথা এ বইয়ের ‘অনুবাদকের নিবেদন' শিরোনামের ভূমিকায়ও এসেছে। 'কালিমায়ে তাইয়েবা : বিশ্লেষণ ও ঈমান ভঙ্গের কারণ' বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের ৯১ নং পৃষ্ঠায় দেশ-বিদেশের কতিপয় বড় আলেম সম্পর্কে লেখা হয়েছে-
ইলমের শীর্ষ স্তরের কতকের একটি অবস্থা হলো, তাঁদের আচরণ-উচ্চারণ দ্বারা বিভিন্ন প্রমাণিত বাস্তবতা সম্পর্কে সত্যান্বেষীরা ধাঁধাঁয় পড়ে যায় ও সন্দিহান হয়ে উঠে। যেমন তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করা বিষয়ক বিভিন্ন মাসআলার ভুল-নির্ভুল বিভিন্ন দিক আবিষ্কার করে নির্ভুল কোনটি, তা জানার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো দলিল বা নির্দেশনা পেশ করার পরিবর্তে, তাঁরা অনির্দিষ্টভাবে উচ্চতর গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করার পরামর্শ দেন। অবস্থা যেন এমন, উচ্চতর ইলমি গ্রন্থসমূহ খুললেই সংশ্লিষ্ট আলোচনা সামনে এসে যাবে। আর সে আলোচনায় দৃষ্টি ফেললে তাদের প্রতিপক্ষের অবস্থানগুলো ভুলই সাব্যস্ত হবে। ওদিকে এ স্তরের ব্যাপক অধ্যয়ন করা অনেকের জন্য সম্ভব হয় না। ফলে তাঁদের ব্যক্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেকে সেসকল প্রমাণিত বিষয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন।
উল্লিখিত আলেমগণ দীনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ের জন্যও দলিল পেশ করার দায়বদ্ধতা কার্যত অস্বীকার করেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তাঁরা চান, মানুষ শুধু তাঁদের উপর নির্ভর করে তাঁদের কথাগুলো গ্রহণ করে নিক। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সূরা বনি ইসরাঈলের ৩৬ নং আয়াতে এমন কিছু মান্য করতে নিষেধ করেছেন।
📄 পশ্চিমা ‘মানবতবাদ’
পশ্চিমাদের 'বিশ্বজনীনতা' ও 'মানবতাবাদ' একই মতবাদের পৃথক দুটি নাম। তারা এ মতবাদ দ্বারা এমন এক চিন্তাধারাকে বুঝায়, যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হবে না; বরং সকল ধর্মের মানুষ সমমর্যাদার অধিকারী। কিন্তু মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর কাছে সকল মানুষ সমস্তরের নয়। আল্লাহর কাছে কাফেররা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও অধম। সুরা আরাফ ১৭৯ নং আয়াত দ্রষ্টব্য।
পশ্চিমাদের এ মতবাদ ইসলাম ধর্মের শত্রুতা ও মিত্রতার বিধান রহিত করে দিয়েছে; এবং মুসলমান ও কাফেরের মধ্যকার পার্থক্য অনেককে ভুলিয়ে দিয়েছে। তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কয়েকটি বিভ্রান্তিকর শব্দের উপর- স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব, সমতা ও ন্যায়বিচার। তারা এ মতবাদের মাধ্যমে দারুল ইসলাম ও দারুল হরবের বিভাজন উঠিয়ে দিয়ে নববি পদ্ধতিতে খেলাফাত প্রতিষ্ঠার চিন্তাকে পশ্চাদ্গামিতা আখ্যা দেয়। এ মতবাদ মুসলমানদেরকে ইহুদি-খ্রিস্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে প্ররোচিত করে। অথচ পবিত্র কোরআনের প্রথম সুরায় আল্লাহ তাআলা আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, খ্রিস্টানরা পথভ্রষ্ট এবং ইহুদিরা তাঁর ক্রোধের শিকার।
📄 দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদ ধর্ম
জাতীয়তাবাদ ও দেশাত্মবোধ ধর্মটি বর্তমান বিশ্বে পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক ব্যাপকতা লাভ করেছে। ইসলামি আকিদার উপর প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি কাজ জাতীয়তাবাদ ধর্মে পশ্চাদপদতা ও সেকেলে হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধর্মটি مسلمانوںকে তথাকথিত আধুনিক ও প্রগতিশীল করার লক্ষ্যে, ইসলামের অপরিহার্য আকিদা 'ওয়ালা-বারা' [শত্রুতা-মিত্রতা] থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
সাম্প্রতিককালে জাতীয়তাবাদ আল্লাহর দীন ও শরিয়তের স্থান দখল করে, এক নতুন ধর্মের রূপ গ্রহণ করেছে। ফলে মুসলমান নামধারী জাতীয়তাবাদীরা সাহাবা রাজিয়াল্লাহু আনহুমের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে, যারা ছিলেন কাফেরদের ক্ষেত্রে সীমাহীন কঠোর, আর নিজেদের পরস্পরের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল।
অনুরূপভাবে তারা সাইয়িদুনা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর সঙ্গীদের আদর্শকে ভুলে গেছে, যারা নিজ এলাকার কাফেরদের বলেছিলেন- [অর্থ] আমরা তোমাদের থেকে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের উপাসনা কর, তাদের থেকে সম্পর্কহীন। আমরা তোমাদের মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য প্রকাশ্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে গেছে, যে পর্যন্ত না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আন।
বস্তুত ইসলাম জাতীয়তাবাদের মূলোৎপাটনের জন্য এসেছে। ইসলাম তার প্রথম আহ্বানেই আরবের কুরাইশ বংশের আবু বকর, হাবশার বেলাল ও রোমের সুহাইবকে এক পতাকাতলে নিয়ে এসেছে। তাইতো সাইয়িদুনা ওমর রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আমরা এমন জাতি যাদেরকে আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। যখন আমরা অন্য কিছুতে সম্মান তালাশ করব, আল্লাহ আমাদের লাঞ্ছিত করবেন।'
আল্লামা মুহাম্মদ বিন সাঈদ কাহতানি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, জাতীয়তাবাদের ব্যাপারে সারকথা হলো, এই বিশ্বাস আল্লাহর সঙ্গে শিরক। কেননা জাতীয়তাবাদ ব্যক্তির কর্ম, ত্যাগ ও সাধনাকে এককভাবে নিজের জন্য সাব্যস্ত করে; এবং নিজের অনুসারীদেরকে এমন সব ব্যক্তিদের ঘৃণা ও শত্রুতা করতে বলে, যারা এ মতবাদ পরিত্যাগ করেছে; আর বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা করতে বলে জাতীয়তাবাদী ও তাদের দোসরদের সঙ্গে।
এ হিসেবে জাতীয়তাবাদ তার অনুসারীদের নিকট আল্লাহর সমকক্ষ এমন এক উপাস্যে পরিণত হয়েছে যে, আল্লাহ ব্যতীত তারা তার উপাসনায় লিপ্ত।
'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র মধ্যে শত্রুতা ও প্রত্যাখ্যান এবং মিত্রতা ও সাব্যস্তকরণ রয়েছে। 'লা-ইলাহা' হলো তাগুত তথা গায়রুল্লাহর সাথে শত্রুতা ও প্রত্যাখ্যান, এবং 'ইল্লাল্লাহ' হলো আল্লাহর সাথে মিত্রতা ও সাব্যস্তকরণ। জাতীয়তাবাদ এ ক্ষেত্রে কালিমার স্থান দখল করে নিয়েছে; যারা আপন ভূখণ্ডের নয়, জাতীয়তাবাদ তাদের সঙ্গে শত্রুতা করে, পক্ষান্তরে যারা এ ভূখণ্ডের, জাতীয়তাবাদ তাদের সঙ্গে মিত্রতা করে।
টিকাঃ
১. 'ওয়ালা-বারা' তথা 'শত্রুতা-মিত্রতা' ইসলামের অপরিহার্য আকিদা হওয়ার বিষয়টি, প্রয়োজনীয় দলিল-প্রমাণসহ জানার জন্য 'কালিমায়ে তাইয়েবা : বিশ্লেষণ ও ঈমান ভঙ্গের কারণ' বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের ৮৩-৯৩ পৃষ্ঠা দেখুন।
২. সুরা ফাত্হ: ২৯ দ্রষ্টব্য।
৩. সুরা মুমতাহিনা : ৪
১. الوَلاءُ وَالبَرَاءُ فِي الإسلام পৃ. ৪২৫, ৬ষ্ঠ সংস্করণ। ১.
📄 পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব?
হজরত মুফতি মুহাম্মদ শফি রাহিমাহুল্লাহ ও তাঁর মতো আলেমগণ নিঃসন্দেহে 'দারুল ইসলাম' প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন লালন করেই পাকিস্তান গঠন করেছেন। তাঁদের কারো নেক নিয়তের ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করার ফলে কার্যত কী হয়েছে? পাকিস্তান দারুল ইসলাম হয়েছে, না দারুল হরবই রয়ে গেছে? প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করার জন্য নিম্নে কিছু বাস্তবতা তুলে ধরা হবে ইনশাআল্লাহ ।
তার আগে প্রসিদ্ধ 'আহসানুল ফাতাওয়া' কিতাবের লেখক আল্লামা মুফতি রশিদ আহমদ লুধিয়ানবি রাহিমাহুল্লাহর কিছু অভিজ্ঞতা ও অভিব্যক্তি উল্লেখ করছি। তিনি লিখেছেন, '... যখন তাদেরকে [গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম বানানোর উদ্দেশ্যে আন্দোলনকারী আকাবিরগণের অনুসারীদেরকে] বলা হয়, আপনারা তো ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার দাবিদার। কিন্তু আপনারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজেরা যে কর্মপন্থা [গণতন্ত্র] অবলম্বন করছেন, তা তো অনৈসলামিক ও নাজায়েজ।
তখন তারা প্রত্যুত্তরে বলে, 'যদিও এ পদ্ধতি নাজায়েজ, কিন্তু তা ব্যতীত ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ জন্য এখন জায়েজ- নাজায়েজের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করা আবশ্যক। ক্ষমতা অর্জিত হলে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করব।'
এটি ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়। তাঁদের নিয়তের ব্যাপারে আমরা সন্দেহ করছি না; কিন্তু তাঁদের কর্মপদ্ধতি এমন, যার মাধ্যমে কখনোই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশা করা যায় না। কেননা অনৈসলামিক পদ্ধতিতে দীনহীনদের জন্য তো সফলতা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু দীনদারদের জন্য প্রথমত সফলতা অর্জন করাই সম্ভব নয়। আর যদি বাহ্যত সফল হয়েও যায়, তবু তার পরিণামে ইসলাম আসবে না। বরং ইসলামের নামে অন্য কিছু হবে।
এ বইয়ের ১৯৪-১৯৬ নং পৃষ্ঠায় জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের দারুল ইফতার প্রধান মুফতি হামিদুল্লাহ জান ও জামিয়া ফারুকিয়ার শায়খুল হাদিস মাওলানা সালিমুল্লাহ খান রাহিমাহুমাল্লাহর দুটি বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, তা এখন পুনরায় দেখে নিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে।
পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব? এ বিষয়ে প্রকৃত অবস্থা অনুভব করার জন্য উদাহরণস্বরূপ কিছু বাস্তবতা তুলে ধরার যে ওয়াদা শুরুতে করা হয়েছে, এখন তা আরম্ভ হচ্ছে-
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ রচিত 'সুদ পর তারিখি ফায়সালা' কিতাবের শুরুতে লিখিত মুফতি মুহাম্মদ রাফি উসমানি হাফিজাহুল্লাহর ভূমিকা থেকে আমরা জানতে পেরেছি, সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার মতো একটি রায়ও পাকিস্তানে আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। এ বিষয়ে জনৈক লেখকের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ নিম্নে উল্লেখ করা হচ্ছে-
১. যে দেশটি শুধু ইসলামের জন্য ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে দেশে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি মাসআলা নিয়েও কথা বলার সুযোগ, দেশটি অস্তিত্ব লাভের ৩২ বছর পর ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হয়নি।
২. ৩২ বছর পর একটি বিশেষ মাসআলা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে। ইসলামি শরিয়ার সকল মাসআলা নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়নি। কতিপয় আলেমের ভাষায় এটি أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ -এর স্তর।
৩. সুদের যে মাসআলা নিয়ে ৩২ বছর পর আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে, তা এমন এক মাসআলা যা দেশের সকল মুসলমানের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। তা প্রতিদিনের প্রতি লোকমার হালাল-হারামের সাথে সম্পৃক্ত মাসআলা।
৪. তারও ১২ বছর পর অর্থাৎ দেশটি প্রতিষ্ঠার ৪৪ বছর পর আদালতের একটি বেঞ্চ সুদ হারাম হওয়ার রায় দিয়েছে। ৪৪ বছর পর্যন্ত দেশটির পরিবেশ এমন রায় দেওয়ার উপযোগী ছিল না।
৫. দেশটির সরকার কর্তৃক অনুমোদিত বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সুদ হারাম হওয়ার বিরুদ্ধে আপিল করেছে। ইসলাম প্রেমিকগণ আল্লাহর দ্ব্যর্থহীন হুকুমের বিরুদ্ধে আপিলকারীদেরকে কোনো ধরনের শিক্ষা দিতে সক্ষম হয়নি।
৬. আপিলের শুনানি শুরু হয়েছে তারও ৮ বছর পর। দেশটির বয়স তখন ৫২ বছর। উল্লেখ্য, আপিল শুনানির বৈঠকের গণ্যমান্য মেহমান হচ্ছে ঐসকল ব্যাংকার, যারা যুগের পর যুগ সুদের মহাজনি করেছে, সুদের ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিরাট 'অবদান' রেখেছে।
৭. ৫৩ বছর পর ১৯৯৯ সনের শেষ মাথায় সুদ হারাম হওয়া প্রমাণিত করার জন্য আলেমসমাজ হাজার হাজার পৃষ্ঠা খরচ করেও সুদ হারাম হওয়ার রায় কার্যকর করতে পারেননি।
৮. সর্বশেষ অবস্থা : পুরো পাকিস্তানে সুদের কারবার সেভাবেই চলছে যেভাবে ছিল। বৃটিশ ভারতে যেভাবে ছিল সেভাবেই আছে। বর্তমান ভারতে যেভাবে আছে সেভাবে আছে। আমেরিকা ও বৃটেনে যেভাবে আছে সেভাবেই আছে। বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশে যেভাবে আছে, সেভাবেই আছে। সারাবিশ্বে তাগুতের আইনে অর্থনীতি যেভাবে চলছে, সেভাবেই পাকিস্তানে চলছে। ব্যবধান হচ্ছে, সারাবিশ্বের মুসলমানরা যে পরিমাণ ধোঁকা খেয়ে চলেছে, সে তুলনায় পাকিস্তানের মুসলমানরা একটু বেশি খেয়ে চলেছে। অবশ্য যারা খাচ্ছে, তাদের ব্যাপারে বলা হচ্ছে। আল্লাহর এমন বহু বান্দাও আছে, যারা এসব ধোঁকা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে চলছে।
তাই ১৫ নং পৃষ্ঠায় বর্ণিত হজরত মাদানি রাহিমাহুল্লাহর উক্তিটিও এখানে স্মরণযোগ্য- 'সেখানকার [পাকিস্তানের] সরকার ইউরোপীয় পদ্ধতির গণতান্ত্রিক সরকার। তাতে জনসংখ্যা অনুপাতে মুসলিম- অমুসলিম সকলেই অংশীদার। তাকে ইসলামি সরকার বলা ভুল।
হজরত লুধিয়ানবি রাহিমাহুল্লাহর এ উক্তিটি পুনরায় উল্লেখ করে লেখাটি শেষ করছি- 'অনৈসলামিক পদ্ধতিতে দীনহীনদের জন্য তো সফলতা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু দীনদারদের জন্য প্রথমত সফলতা অর্জন করাই সম্ভব নয়। আর যদি বাহ্যত সফল হয়েও যায়, তবু তার পরিণামে ইসলাম আসবে না। বরং ইসলামের নামে অন্য কিছু হবে।'
এই হলো 'পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব'-এর আলোচনা, যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিতই হয়েছে ইসলামের জন্য। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলাম বাংলাদেশের জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও প্রাণোৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেনি; বরং জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- চেতনাগুলো তাদেরকে মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও প্রাণোৎসর্গ করতে উৎসাহিত করেছে। প্রমাণস্বরূপ বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা অংশের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদটি দ্রষ্টব্য-
'আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।'
টিকাঃ
১. বরং আকাবির-আসলাফের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তমতে কুফর।
২. এর অর্থ তো এটাই হচ্ছে, আল্লাহ এমন একটি আদেশ করেছেন, যা পালন করার জন্য আল্লাহ ও রাসুল কোনো জায়েজ পদ্ধতি প্রবর্তন করেননি। কিন্তু এই বাচনভঙ্গিতে আল্লাহ ও রাসুলের উপর অপবাদ আরোপের দুর্গন্ধ আছে কি-না, শুঁকে দেখা প্রয়োজন।
৩. نا أَحْسَنُ الفَتَاوَى، كتاب الجهاد ..
১. মাকতুবাতে শায়খুল ইসলাম, ২: ২৪২
২. احسن الفتاوى، كتاب الجهاد : ٨٠