📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর > 📄 রহমানের বান্দাদের একটি গুণ

📄 রহমানের বান্দাদের একটি গুণ


এছাড়াও কতিপয় আলেমের সামনে কিছু দলিলভিত্তিক অস্পষ্টতা উত্থাপন করার পর আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে, তারা চান, এমনিতেই তাদের অবস্থান মেনে নিই। সেই অবস্থানের পক্ষে দলিল তলব না করি। দলিল তালাশ করলে তারা বিরক্তিবোধ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সর্বাবস্থায় যদি অন্ধ অনুকরণই করে যেতে হয়, তাহলে দরসে 'ফিকহে মুজাররাদ' পড়ানোর পর 'ফিকহে মুদাল্লাল' কেন পড়ানো হয়?! 'মুখতাসারুল কুদুরি'তে দলিলবিহীন মাসআলা পড়ার পর সেই মাসআলাগুলোই 'হিদায়া'তে দলিলসহ পড়ানো দ্বারা তো এটাই অনুমিত হয়, অন্ধ মুকাল্লিদ থাকা তালিবে ইলমের শান নয়। বরং তালিবে ইলম হবে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মুকাল্লিদ।
রহমানের বান্দা হতে হলে একজন মুসলমানের কেমন সচেতন ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া আবশ্যক, তা বুঝার জন্য শুধু একটি আয়াতে চিন্তা করুন। আল্লাহ তাআলা সুরা ফুরকানের ৭৩ নং আয়াতে রহমানের বান্দাদের একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন- وَالَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِنَايَاتِ رَبِّهِمْ لَمْ يَخِرُّوا عَلَيْهَا صُمًّا وَعُمْيَانًا. এবং যখন তাদেরকে উপদেশ দেওয়া হয় তাদের রবের আয়াতসমূহ দ্বারা, তখন তারা শ্রবণশক্তিহীন ও অন্ধরূপে তার উপর পতিত হয় না।
অর্থাৎ রহমানের বান্দারা কোরআনের আয়াতসমূহের উপর পতিত হয়। তবে মুনাফিকদের মতো শ্রবণশক্তিহীন ও অন্ধরূপে নয়। বরং তাঁরা এ অবস্থায় পতিত হয় যে, চোখ-কান খোলা রাখে এবং বোঝার ও হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করে।
এ আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে فِي ظِلَالِ القُرْآنِ কিতাবের নিম্নের উক্তিটি লক্ষণীয়- فَأَمَّا عِبَادُ الرَّحْمَنِ، فَهُمْ يُدْرِكُوْنَ إِدْرَاكًا وَاعِيًا بَصِيرًا مَا فِي عَقِيدَتِهِمْ مِنْ حَقٌّ، وَمَا فِي آيَاتِ اللهِ مِنْ صِدْقٍ، فَيُؤْمِنُوا إِيْمَانًا وَاعِيًا بَصِيرًا، لَا تَعَصُّبًا أَعْمَى وَلَا انْكِبَابًا عَلَى الوُجُوهِ! فَإِذَا تَحَمَّسُوا لِعَقِيدَتِهِمْ فَإِنَّمَا هِيَ حَمَاسَةُ العَارِفِ المُدْرِكِ البَصِيرِ.
রহমানের বান্দাগণ সচেতনভাবে ও দূরদর্শীতার সাথে উপলব্ধি করেন তাদের বিশ্বাসের যথার্থতা ও আল্লাহর আয়াতসমূহের সত্যতা। ফলে তাঁদের ঈমান হয় সচেতন ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। তাঁদের ঈমানে থাকে না অন্ধ পক্ষপাতিত্ব ও গোঁড়ামি। তাঁরা যখন নিজেদের বিশ্বাসের প্রতি উদ্যমী হন, তখন তা হয় অন্তর্দৃষ্টির সাথে উপলব্ধিকারী অভিজ্ঞ ব্যক্তির উদ্যম।
উদাহরণস্বরূপ সুরা বনি ইসরাঈলের ৩৬ নং আয়াতটিও এখানে লক্ষণীয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তর- প্রত্যেকটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।
এ আয়াত দ্ব্যর্থহীনভাবে সাব্যস্ত করে, জ্ঞানার্জন না করে কারো অন্ধঅনুসরণের -তিনি অনেক বড় হলেও- শরয়ি বৈধতা নেই। বরং হাফেজ ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহর [৬৯১-৭৫১ হি.] বিবরণ অনুযায়ী অন্ধ অনুসরণকারীদের জন্য অনুসৃত আলেমও একজন তাগুত। (১) আপন স্থানে ঐ আলেম তাগুত না-ও হতে পারেন।
তবে যেসকল আল্লামা নিজেদের অবস্থান সঠিক হওয়া বিষয়ে দলিল পেশ করার দায়বদ্ধতা কার্যত অস্বীকার করেন, এমনকি আলেমদের থেকেও অন্ধঅনুসরণ প্রত্যাশা করেন, ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ প্রদত্ত সংজ্ঞায় চিন্তা করে দেখুন, তারা তাগুতের সংজ্ঞার ভেতরে পড়েন কি-না।

টিকাঃ
১. হাফেজ ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহর বিবরণ ২৭৭ নং পৃষ্ঠায় দেখুন।

📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর > 📄 নিজেদেরকে সতর্ক মানবও মনে করার উদাহরণ

📄 নিজেদেরকে সতর্ক মানবও মনে করার উদাহরণ


কারো কারো আচরণ-উচ্চারণ দ্বারা তো মনে হয়, তাঁরা কোরআন-হাদিসের পরিবর্তে নিজেদেরকে মিয়ারে হক বা সত্যের মানদণ্ড মনে করেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, দীনের এক বড় মারকাজের একজন তাহাজ্জুদগুজার মুফতি পির সাহেব একজন বরেণ্য আলেম সম্পর্কে অভিযোগের সুরে বললেন, 'তিনি "নবী রাসূলগণের উত্তরসূরি” নামের বইটি পড়ার পরামর্শ দেন।' [বইটির লেখক মাওলানা আবু আবদুর রহমান সাঈদ ইসলামাবাদি। বইটি ঢাকাস্থ বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারে পাওয়া যায়।]
একজন তাকে প্রশ্ন করলেন, বইটির সমস্যা কী? তার নিঃসঙ্কোচ উত্তর ছিলো, 'বইটিতে আদর্শ আলেমের এমন অনেক গুণ উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো আমাদের মধ্যে নেই।' উল্লেখ্য, বইটিতে প্রতিটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে এক বা একাধিক আয়াত কিংবা হাদিসের দলিলসহ।
অবাক হওয়ার বিষয় হলো, আলোচ্য মজলিসে উপস্থিত উক্ত মারকাজের আলেম ও মুখলিস হওয়ার দাবিদার কোনো দাঈর দৃষ্টিতে, তার এ উত্তরে কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়েনি। উপরন্তু মনে হয়েছে, আয়াত ও হাদিসগুলোর বিপরীত নিজেদের অবস্থানগুলোকেই তারা হক মনে করছেন। উল্লেখ্য, তাদের উপদেষ্টা ও পথপ্রদর্শক হলো আন্তঃধর্মীয় বৈঠকগুলোতে অংশগ্রহণকারী নবি পরিবারের একজন আলেম। (১)

টিকাঃ
১. 'ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে'র সহযোগী অধ্যাপক শায়খ আবদুল আজিজ রাজিহি হাফিজাহুল্লাহকে আন্তঃধর্মীয় বৈঠকে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির হুকুম জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন- যে ব্যক্তি বিভিন্ন ধর্মের একটিকে অপরটির কাছাকাছি করার আহ্বান জানায়, সে তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করেনি। সে মুসলমানদেরকে ইহুদিধর্ম বা খ্রিস্টানধর্মের নিকটবর্তী হওয়ার বা তাদের মতো হওয়ার অথবা তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার আহ্বান জানায় বা তারা হকের উপর আছে- একথা বলে। এ লোক তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করেনি। এটি ধর্মত্যাগ। এ ব্যক্তি ঈমানভঙ্গকারী একটি কাজ করেছে। 'সাহাব' ওয়েবসাইট দ্রষ্টব্য।

📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর > 📄 নবির সঙ্গে সম্পর্কহীন নবি পরিবারের সদস্য

📄 নবির সঙ্গে সম্পর্কহীন নবি পরিবারের সদস্য


হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাজিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিসটি এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, আমরা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি অনেক ফেতনার বিবরণ দিলেন। এমনকি চটের ফেতনার বর্ণনা দিলেন। একজন বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! চটের ফেতনা কী? তিনি বললেন, 'তা এমন ফেতনা যার মধ্যে একজন অপরজন থেকে পলায়ন করবে এবং ব্যক্তির সম্পদ এমনভাবে অপহরণ করা হবে যে, তার নিকট কিছুই থাকবে না। তারপর স্বচ্ছলতার ফেতনা হবে। এ ফেতনার প্রকাশ আমার পরিবারের একজন ব্যক্তির পায়ের নিচ থেকে হবে। সে মনে করবে, সে আমার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অথচ সে আমার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। আমার বন্ধু তো হলো মুত্তাকিগণ।' [মুসনাদে আহমদ : ৬১৬৮; এবং সুনানে আবি দাউদ : ৪২৪৪]
سَوْفَ تَرَى إِذَا انْجَلَى الغُبَارُ * أَفَرَسُ تَحْتَكَ أَمْ حِمَارُ
এ বইয়ের ৫৬ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখিত হজরত মুফতি মুহাম্মদ শফি রাহিমাহুল্লাহর একটি লেখা দ্বারা স্পষ্ট হয়, অভিশপ্ত মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি [১২৫৫-১৩২৬ হি./১৮৩৫-১৯০৮ ঈ.] অনেক উঁচুস্তরের আলেমও ছিল। বরং তাঁর ১৫০ নং পৃষ্ঠার আলোচনা থেকে পরিষ্কার হয়, গোলাম আহমদ কাদিয়ানি তাসাউফের বড় মাপের একজন পিরও ছিল। উপরন্তু গুগলে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত তার ছবিসমূহ থেকে যে কারো সামনে স্পষ্ট যে, সে ছিল উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী, দাড়িবিশিষ্ট ও দীনি লেবাসধারী। আর কী প্রয়োজন? হাঁ, সর্বাগ্রে প্রয়োজন আকিদার সংশোধন।

📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর > 📄 কোরআন আগে, না ঈমান আগে?

📄 কোরআন আগে, না ঈমান আগে?


অতএব কারো শুধু তাফসির, হাদিস, ফিকহ প্রভৃতি বিষয়ে বড় আলেম হওয়ার কারণে, বা তাসাউফের বড় পির সাহেব হওয়ার কারণে, বা চাশত, আওয়াবিন ও তাহাজ্জুদগুজার হওয়ার কারণে, আমরা যেন তার অন্ধ অনুসারী না হয়ে যাই। তাগুত প্রত্যাখ্যান ও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন সংশ্লিষ্ট ইলম অর্জনের পূর্বে তাফসির, হাদিস, ফিকহ প্রভৃতি বিষয়ের 'তাখাসসুস' অর্জনের জন্য কেউ যেন পেরেশান না হই। সাহাবি হজরত জুনদুব বিন আবদুল্লাহ রাজিয়াল্লাহু আনহু [মৃ. ৭০ হি.] বলেছেন,
تَعَلَّمْنَا الْإِيمَانَ قَبْلَ أَنْ نَتَعَلَّمَ الْقُرْآنَ، ثُمَّ تَعَلَّمْنَا الْقُرْآنَ، فَازْدَدْنَا بِهِ إِيمَانًا.
'আমরা কোরআন শেখার পূর্বে ঈমান শিখেছি। তারপর কোরআন শিখেছি, তখন তা দ্বারা আমাদের ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে। (১) অতএব ওজু-নামাজ প্রভৃতি ভঙ্গের কারণ জানার পূর্বে ঈমান ভঙ্গের কারণ জানার জন্য যেন প্রত্যেকে পেরেশান হই। কারণ, ঈমান সবার আগে।
যিন্দিক ও মুলহিদদের ইলম, আমল, বংশ ও বেশভূষা দেখে প্রভাবিত ও প্রতারিত হওয়া থেকে মেহেরবান আল্লাহ মুসলমানদেরকে নিরাপদ রাখুন। এবং ঈমান-আকিদা সহিহ করার পাশাপাশি আল্লাহ আমাদেরকে ইলম, আমল ও বাহ্যিক বেশভূষাও ঠিক করার তাওফিক দিন।
اللَّهُمَّ اجْعَلْ سَرِيرَتِي خَيْرًا مِنْ عَلَانِيَتِي وَاجْعَلْ عَلَانِيَتِي صَالِحَةً
হে আল্লাহ! তুমি আমার গোপন অবস্থাকে প্রকাশ্য অবস্থার তুলনায় উত্তম বানাও এবং আমার প্রকাশ্য অবস্থাকে ভালো বানাও! (২) আমিন!

টিকাঃ
১. সুনানে ইবনে মাজা: ৬১
২. সুনানে তিরমিজি: ৩৬৬৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00