📄 মুমিনদেরকে পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশের আহ্বান
প্রসঙ্গতঃ একটি কথা হলো, আমরা ও আমাদের সরকার মুসলমান হলে, যিন্দিকদেরকে 'মুরতাদ ঘোষণা করা'র জন্য আন্দোলন তো দূরের কথা, আবেদনও করতে হবে কেন? শুধু কাদিয়ানিদেরকে নয়, বরং সকল যিন্দিককে মুরতাদ ঘোষণা করে তাদের জন্য নির্ধারিত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা, মুসলিম সরকারের নিজেরই দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা ঈমানদার হওয়ার দাবিদার সকলকে ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ করার তাওফিক দিন এবং আমেরিকান র্যান্ড কর্পোরেশনের বিভাজন অনুযায়ী 'ট্র্যাডিশনালিস্ট মুসলিম' হওয়া থেকে রক্ষা করুন! আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ .
হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে প্রবেশ করো পরিপূর্ণরূপে এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন। [সুরা বাকারা: ২০৮]
উল্লেখ্য, র্যান্ড কর্পোরেশনের পরিভাষায় পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশকারীর নাম হলো ফান্ডামেন্টালিস্ট মুসলিম বা মৌলবাদী মুসলিম। (১)
টিকাঃ
১. র্যান্ড কর্পোরেশন সকল মুসলমানকে চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে : ১. ফান্ডামেন্টালিস্ট বা মৌলবাদী। ২. ট্র্যাডিশনালিস্ট বা ঐতিহ্যবাদী। ৩. মডারেট বা মধ্যপন্থী। ৪. সেকুলারিস্ট বা ধর্মনিরপেক্ষ। 'পরিশিষ্ট' পর্বে 'র্যান্ড কর্পোরেশনের একটি মূল্যায়ন' শিরোনামের সংলাপটি দ্রষ্টব্য।
📄 যিনদিকদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া বিষয়ক কর্মশালার মূল্যায়ন
যাই হোক, এ পুস্তিকা পাঠ করলে আমরা জানতে পারব, হত্যা প্রত্যেক মুরতাদের শাস্তি। মুরতাদ হওয়ার পর যারা দারুল ইসলামের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, এ শাস্তি তাদেরও; যারা কোনো প্রকার বিদ্রোহের ইচ্ছাও করে না, এ শাস্তি তাদেরও। [১৪৮ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।] শাসক-শাসিত যারাই মুসলমান হওয়ার দাবিদার, সকলের উপর আবশ্যক হলো, ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ করা।
এক মাদরাসায় কাদিয়ানিদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার পদ্ধতি বিষয়ক একটি কর্মশালা হয়েছিল। তখন একজন আলেম বললেন, কাদিয়ানিদেরকে যদি মুরতাদ মনে করেন, তাহলে আমার মন্তব্য হলো, 'তাদের ব্যাপারে কিতাবে যা আছে তা আমরা করছি না, এবং যা করছি তা কিতাবে নেই।' তাঁর এ মূল্যায়ন শ্রবণ করে সেখানকার প্রধান শায়েখ তাঁকে কঠিনভাবে শাসিয়েছেন। তার ব্যবহৃত একটি বাক্য ছিল, 'আপনি বুঝতে চান না, বরং বুঝাতে চান।' এ পরিস্থিতিতে এ পুস্তিকাটি অনুবাদ করা আশা করি আমার সার্থক হয়েছে। শোকর, আলহামদুলিল্লাহ। প্রসঙ্গত এ বইয়ের ২৮০ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
📄 রহমানের বান্দাদের একটি গুণ
এছাড়াও কতিপয় আলেমের সামনে কিছু দলিলভিত্তিক অস্পষ্টতা উত্থাপন করার পর আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে, তারা চান, এমনিতেই তাদের অবস্থান মেনে নিই। সেই অবস্থানের পক্ষে দলিল তলব না করি। দলিল তালাশ করলে তারা বিরক্তিবোধ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সর্বাবস্থায় যদি অন্ধ অনুকরণই করে যেতে হয়, তাহলে দরসে 'ফিকহে মুজাররাদ' পড়ানোর পর 'ফিকহে মুদাল্লাল' কেন পড়ানো হয়?! 'মুখতাসারুল কুদুরি'তে দলিলবিহীন মাসআলা পড়ার পর সেই মাসআলাগুলোই 'হিদায়া'তে দলিলসহ পড়ানো দ্বারা তো এটাই অনুমিত হয়, অন্ধ মুকাল্লিদ থাকা তালিবে ইলমের শান নয়। বরং তালিবে ইলম হবে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মুকাল্লিদ।
রহমানের বান্দা হতে হলে একজন মুসলমানের কেমন সচেতন ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া আবশ্যক, তা বুঝার জন্য শুধু একটি আয়াতে চিন্তা করুন। আল্লাহ তাআলা সুরা ফুরকানের ৭৩ নং আয়াতে রহমানের বান্দাদের একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন- وَالَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِنَايَاتِ رَبِّهِمْ لَمْ يَخِرُّوا عَلَيْهَا صُمًّا وَعُمْيَانًا. এবং যখন তাদেরকে উপদেশ দেওয়া হয় তাদের রবের আয়াতসমূহ দ্বারা, তখন তারা শ্রবণশক্তিহীন ও অন্ধরূপে তার উপর পতিত হয় না।
অর্থাৎ রহমানের বান্দারা কোরআনের আয়াতসমূহের উপর পতিত হয়। তবে মুনাফিকদের মতো শ্রবণশক্তিহীন ও অন্ধরূপে নয়। বরং তাঁরা এ অবস্থায় পতিত হয় যে, চোখ-কান খোলা রাখে এবং বোঝার ও হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করে।
এ আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে فِي ظِلَالِ القُرْآنِ কিতাবের নিম্নের উক্তিটি লক্ষণীয়- فَأَمَّا عِبَادُ الرَّحْمَنِ، فَهُمْ يُدْرِكُوْنَ إِدْرَاكًا وَاعِيًا بَصِيرًا مَا فِي عَقِيدَتِهِمْ مِنْ حَقٌّ، وَمَا فِي آيَاتِ اللهِ مِنْ صِدْقٍ، فَيُؤْمِنُوا إِيْمَانًا وَاعِيًا بَصِيرًا، لَا تَعَصُّبًا أَعْمَى وَلَا انْكِبَابًا عَلَى الوُجُوهِ! فَإِذَا تَحَمَّسُوا لِعَقِيدَتِهِمْ فَإِنَّمَا هِيَ حَمَاسَةُ العَارِفِ المُدْرِكِ البَصِيرِ.
রহমানের বান্দাগণ সচেতনভাবে ও দূরদর্শীতার সাথে উপলব্ধি করেন তাদের বিশ্বাসের যথার্থতা ও আল্লাহর আয়াতসমূহের সত্যতা। ফলে তাঁদের ঈমান হয় সচেতন ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। তাঁদের ঈমানে থাকে না অন্ধ পক্ষপাতিত্ব ও গোঁড়ামি। তাঁরা যখন নিজেদের বিশ্বাসের প্রতি উদ্যমী হন, তখন তা হয় অন্তর্দৃষ্টির সাথে উপলব্ধিকারী অভিজ্ঞ ব্যক্তির উদ্যম।
উদাহরণস্বরূপ সুরা বনি ইসরাঈলের ৩৬ নং আয়াতটিও এখানে লক্ষণীয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তর- প্রত্যেকটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।
এ আয়াত দ্ব্যর্থহীনভাবে সাব্যস্ত করে, জ্ঞানার্জন না করে কারো অন্ধঅনুসরণের -তিনি অনেক বড় হলেও- শরয়ি বৈধতা নেই। বরং হাফেজ ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহর [৬৯১-৭৫১ হি.] বিবরণ অনুযায়ী অন্ধ অনুসরণকারীদের জন্য অনুসৃত আলেমও একজন তাগুত। (১) আপন স্থানে ঐ আলেম তাগুত না-ও হতে পারেন।
তবে যেসকল আল্লামা নিজেদের অবস্থান সঠিক হওয়া বিষয়ে দলিল পেশ করার দায়বদ্ধতা কার্যত অস্বীকার করেন, এমনকি আলেমদের থেকেও অন্ধঅনুসরণ প্রত্যাশা করেন, ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ প্রদত্ত সংজ্ঞায় চিন্তা করে দেখুন, তারা তাগুতের সংজ্ঞার ভেতরে পড়েন কি-না।
টিকাঃ
১. হাফেজ ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহর বিবরণ ২৭৭ নং পৃষ্ঠায় দেখুন।
📄 নিজেদেরকে সতর্ক মানবও মনে করার উদাহরণ
কারো কারো আচরণ-উচ্চারণ দ্বারা তো মনে হয়, তাঁরা কোরআন-হাদিসের পরিবর্তে নিজেদেরকে মিয়ারে হক বা সত্যের মানদণ্ড মনে করেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, দীনের এক বড় মারকাজের একজন তাহাজ্জুদগুজার মুফতি পির সাহেব একজন বরেণ্য আলেম সম্পর্কে অভিযোগের সুরে বললেন, 'তিনি "নবী রাসূলগণের উত্তরসূরি” নামের বইটি পড়ার পরামর্শ দেন।' [বইটির লেখক মাওলানা আবু আবদুর রহমান সাঈদ ইসলামাবাদি। বইটি ঢাকাস্থ বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারে পাওয়া যায়।]
একজন তাকে প্রশ্ন করলেন, বইটির সমস্যা কী? তার নিঃসঙ্কোচ উত্তর ছিলো, 'বইটিতে আদর্শ আলেমের এমন অনেক গুণ উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো আমাদের মধ্যে নেই।' উল্লেখ্য, বইটিতে প্রতিটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে এক বা একাধিক আয়াত কিংবা হাদিসের দলিলসহ।
অবাক হওয়ার বিষয় হলো, আলোচ্য মজলিসে উপস্থিত উক্ত মারকাজের আলেম ও মুখলিস হওয়ার দাবিদার কোনো দাঈর দৃষ্টিতে, তার এ উত্তরে কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়েনি। উপরন্তু মনে হয়েছে, আয়াত ও হাদিসগুলোর বিপরীত নিজেদের অবস্থানগুলোকেই তারা হক মনে করছেন। উল্লেখ্য, তাদের উপদেষ্টা ও পথপ্রদর্শক হলো আন্তঃধর্মীয় বৈঠকগুলোতে অংশগ্রহণকারী নবি পরিবারের একজন আলেম। (১)
টিকাঃ
১. 'ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে'র সহযোগী অধ্যাপক শায়খ আবদুল আজিজ রাজিহি হাফিজাহুল্লাহকে আন্তঃধর্মীয় বৈঠকে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির হুকুম জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন- যে ব্যক্তি বিভিন্ন ধর্মের একটিকে অপরটির কাছাকাছি করার আহ্বান জানায়, সে তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করেনি। সে মুসলমানদেরকে ইহুদিধর্ম বা খ্রিস্টানধর্মের নিকটবর্তী হওয়ার বা তাদের মতো হওয়ার অথবা তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার আহ্বান জানায় বা তারা হকের উপর আছে- একথা বলে। এ লোক তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করেনি। এটি ধর্মত্যাগ। এ ব্যক্তি ঈমানভঙ্গকারী একটি কাজ করেছে। 'সাহাব' ওয়েবসাইট দ্রষ্টব্য।