📄 টিকাসমগ্র
৯ম পৃষ্ঠার ১ম টীকা 'আকিদা ও তাওহিদ বিভাগ' পরিচিতি
মাহাদের 'আকিদা ও তাওহিদ বিভাগ' দেওবন্দি মানহাজের উপর প্রতিষ্ঠিত। এর বিবরণ হলো, উলামায়ে দেওবন্দের আকিদার প্রকৃত মুখপত্র হিসেবে লিখিত কিতাব হলো দুটো- ১. হজরত খলিল আহমদ সাহারানপুরি রাহিমাহুল্লাহ [১২৬৯-১৩৪৬ হি.] প্রণীত المُهَنَّدُ عَلَى الْمُفَنَّدِ, ২. হজরত কারি মুহাম্মদ তাইয়েব রাহিমাহুল্লাহ [১৩১৫-১৪০৩ হি.] রচিত عقائد علماء دیوبند। পরবর্তীতে مسلک علماء دیوبند নামে তিনি তুলনামূলক বড় আরেকটি কিতাব রচনা করেছেন।
কিতাব দুটোসহ দেওবন্দি অন্যান্য আকাবিরের বিভিন্ন কিতাব ও রিসালায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আকিদা বিষয়ক আলোচনাগুলো, নিজস্ব বিন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে দারুল উলুম দেওবন্দের 'শায়খুল হিন্দ একাডেমি' থেকে প্রকাশিত دار العلوم دیوبند : مَدْرَسَةٌ فِكْرِيَّة ...توجيهية নামক কিতাবে। লেখক মাওলানা উবায়দুল্লাহ আসআদি কাসেমি হাফিজাহুল্লাহ। কিতাবটির মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮৩৯। আকিদা বিষয়ক পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৩৫। কিতাবের এ অংশটুকু মাহাদের 'আকিদা ও তাওহিদ বিভাগে'র সিলেবাসভুক্ত- কিছু অংশ দরসের, কিছু অংশ মুতালাআর।
তাছাড়া দেওবন্দি আলেমসমাজ হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রাহিমাহুল্লাহ [১১১৪-১১৭৬ হি.] প্রণীত العَقِيدَةُ الحسَنةُ কিতাবটিকে নিজেদের আকিদার সারসংক্ষেপ হিসেবে পেশ করেন। আল্লামা মুহাম্মদ উওয়াইস নাজরামি রাহিমাহুল্লাহ রচিত নামক শরাহসহ কিতাবটিও মাহাদের 'আকিদা ও তাওহিদ বিভাগে'র সিলেবাসভুক্ত।
সর্বোপরি... দারুল উলুম দেওবন্দ : মাদ্রাসায়ে ফিকরিয়া তাওজিহিয়া... ৪৪৫ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে-
)في العقائد والمسائل إلى كتب( واستنادهم (يعني علماء ديوبند أئمة أهل السنة من هذا الشأن من جميع الأزمان، منذ بداية عهد تدوين العلوم والفنون إلى هذه القُرُون، لا سيما كتاب «الفقه الأكبر» -مع شروحه المعروفة - المنسوب إلى إمامنا أبي حنيفة رحمه الله، وكتاب «العقيدة الطحاوية» للإمام أبي جعفر الطحاوي المعروف بين الأقاصي والأداني، وأخيرًا إلى كتب الإمام ولي الله الدهلবী ও كتب أخلافه وأبنائه وأحفاده। ويستفيدون ويستمدون بكتب النَّسَفِي والتَّفْتَازَانِي وابن الهمام, وبجانب آخر بكتب الإمام ابن تيمية شيخ الإسلام درسًا وتدريسا ومطالعة وتأليفا।
উলামায়ে দেওবন্দের উল্লিখিত মূলনীতির আলোকেই মাহাদ তার 'আকিদা ও তাওহিদ বিভাগ' পরিচালনা করার চেষ্টা করে। আল্লাহ সহজ করুন। আমিন! উল্লেখ্য, পাঠ্য বিষয় ও ভর্তি সংক্রান্ত আলোচনার জন্য ৯নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
৯ম পৃষ্ঠার ২য় টীকা মাহাদের সঙ্গে লেখকের সম্পর্ক
এ মাদরাসার সঙ্গে আমার সম্পর্ক এটুকুই যে, তা আমার একজন প্রিয় ছাত্র মাওলানা আবদুল আজিজ [গোপালগঞ্জ] আমার নামে প্রতিষ্ঠা করে এর শিক্ষাবিষয়ক তত্ত্বাবধান আমার উপর ন্যস্ত করেছেন। এর মুদিরও [পরিচালক] তিনিই। আল্লাহ তাআলা প্রতিষ্ঠানটির সকল প্রয়োজন সহজে পূরণ করুন এবং একে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য সাদাকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন। আমিন!
দশম পৃষ্ঠার টীকা 'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা ফিল ইসলাম' কিতাবের পরিচিতি
পবিত্র মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত 'উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে'র আকিদা শাখা থেকে মাস্টার্সডিগ্রি লাভের থিসিসরূপে গ্রন্থকার এটি রচনা করেছেন। ১৪০১ হিজরির শাবান মাসের ৪ তারিখে গ্রন্থটি পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গ্রন্থকারকে 'মুমতাজ' গ্রেডে মাস্টার্সডিগ্রি প্রদান করেছেন।
১২ নং পৃষ্ঠার টীকা প্রচলিত তাবলিগ জামাত সম্পর্কে একটি মূল্যায়ন
'ফাযায়েলে আমাল' কিতাবের ১০১৩ নং পৃষ্ঠার একটি উদ্ধৃতি এখানে উল্লেখযোগ্য। জিহাদ বিষয়ক ৪টি আয়াতের আলোচনা প্রসঙ্গে উক্ত পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে- 'দ্বিতীয় জিনিস যাহা আমাদের নিকট হইতে চাওয়া হইয়াছে, উহা হইল জেহাদ। জেহাদের আসল যদিও কাফেরদের সহিত যুদ্ধ ও মোকাবিলা করা, তথাপি জেহাদের মূল লক্ষ্য হইল আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করা ও তাঁহার হুকুম-আহকাম পূর্ণভাবে চালু করা। আর ইহাই আমাদের কাজের মূল উদ্দেশ্য।
উল্লেখ্য, আলোচ্য কিতাবের ৯৮১ থেকে ১০১৬ পর্যন্ত পৃষ্ঠাগুলো মূলত 'পস্তী কা ওয়াহেদ এলাজ' [অধঃপতনের একক চিকিৎসা) নামক পৃথক একটি পুস্তিকা। লেখক, মাওলানা ইহতিশামুল হাসান কান্ধলবি রাহিমাহুল্লাহ।
আমাদের উল্লিখিত নীতিটি বড়ই চিন্তনীয়। কারণ, আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করা ও তাঁর হুকুম-আহকাম পূর্ণভাবে চালু করার জন্য আল্লাহ তাআলা যে পদ্ধতি কোরআন মাজিদে নির্ধারণ করেছেন, তার পরিবর্তে অন্য একটি পদ্ধতি আমাদের অধঃপতনের একক চিকিৎসা [পস্তী কা ওয়াহেদ এলাজ কী করে হয়?
হাজারো নয়, লাখো নয়, বরং কোটি কোটি মুসলমান ফরজ জিহাদ করছে না, তা তাদের আমলের দুর্বলতা। [২০১-২০২ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য) তা দ্বারা মূল ঈমান ঝুঁকিতে পড়ার কথা নয়। কিন্তু একটি লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য আল্লাহ তাআলা যখন জিহাদের তরিকা প্রবর্তন করেছেন, তখন জিহাদের পরিবর্তে অন্য একটি তরিকাকে ঘোষণা দিয়ে বিধিবদ্ধ মূলনীতি বানিয়ে নেওয়া দ্বারা, আমাদের ঈমান ঝুঁকিতে পড়বে কি-না, তা ভেবে দেখা অতীব জরুরি। তাছাড়া যা আল্লাহর তরিকা নয়, তা নববি তরিকা কী করে হয়, তা-ও ভাবার বিষয়।
বিষয়টি এজন্যও খুবই চিন্তনীয়, নীতিটি নির্ধারিত হয়েছে আমরা যারা নবিওয়ালা মেহনতের দাবিদার, আমাদের একেবারে কেন্দ্রীয় জায়গা থেকে এবং যুক্ত রয়েছে আমাদের প্রধান মানহাজি কিতাবে।
লক্ষণীয়, জামাতের প্রচলিত তরিকা সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লেখা হয়েছে, 'আমরা আমাদের দুর্বল জ্ঞানবুদ্ধি অনুযায়ী মুসলমানদের কামিয়াবী ও উন্নতির লক্ষ্যে একটি কর্মপদ্ধতি ঠিক করিয়াছি, প্রকৃতপক্ষে যাহাকে ইসলামী জিন্দেগী অথবা আমাদের পূর্ববর্তী বুযুর্গদের জিন্দেগীর নমুনা বলা যাইতে পারে'।
তরিকাটি যখন 'আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করা ও তাঁহার হুকুম-আহকাম পূর্ণভাবে চালু করা'র উদ্দেশ্যে প্রবর্তিত আল্লাহর নির্ধারিত তরিকা নয়, তখন একে 'প্রকৃতপক্ষে ইসলামী জিন্দেগী অথবা আমাদের পূর্ববর্তী বুযুর্গদের জিন্দেগীর নমুনা' দাবি করার সুযোগ আছে কি?
বলাবাহুল্য, শুধু নিয়ত সহিহ হলেই কোনো কাজ সহিহ হয়ে যায় না। মূর্তিপূজার ক্ষেত্রে অনেক মুশরিকের নিয়ত আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে তাদের ভাষায় এভাবে ব্যক্ত করেছেন-
مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى.
আমরা তো তাদের উপাসনা কেবল এ জন্য করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। [সুরা যুমার : ৩)
প্রসঙ্গত, তাবলিগ জামাতের চারটি পরিভাষা তথা ১. কালিমার দাওয়াত, ২. নবিওয়ালা কাজ, ৩. আল্লাহর রাস্তার মেহনত, ৪. নবির তরিকা-এর পর্যালোচনা দেখুন পাকিস্তানের বরেণ্য লেখক শায়খ যুবাইর আহমদ সিদ্দিকি দামাত বারাকাতুহুম রচিত 'আদ-দীন আন-নাসিহাহ' নামক বইয়ে। বইটির বাংলা অনুবাদের শিরোনামও এটিই। প্রাপ্তিস্থান : ঢাকাস্থ বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ার।
কোনো হঠকারী মানুষকে কিছু বলে তো লাভ নেই। তাবলিগি সাথীদের যারা হঠকারী নন তাদেরকে বলব, ভুল বুঝবেন না। এ মেহনত তো আমরা দুনিয়ার জন্য করি না। বরং দীন হিসেবে করি।
দীনি বিষয়ে কারো অন্ধ অনুসরণের-তিনি অনেক বড় হলেও- শরয়ি বৈধতা নেই। আলেম-জাহেল নির্বিশেষে সকলের জন্য আল্লাহ তাআলার আদেশ লক্ষ্য করুন-
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمُ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তর- প্রত্যেকটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। [সুরা বনি ইসরাঈল: ৩৬]
এ আয়াত থেকে এটাও বুঝে আসে, জ্ঞানার্জন করে যে ব্যক্তি দীনের তাবলিগ করবে, অর্থাৎ আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করা ও তাঁর হুকুম-আহকাম পূর্ণভাবে চালু করার জন্য জিহাদের যে তরিকা কোরআন মাজিদে প্রবর্তিত হয়েছে এবং জিহাদের যে কর্মপদ্ধতি খোলাফায়ে রাশেদিন, তাবেঈন ও তাবেঈন প্রমুখ পূর্ববর্তী বুযুর্গদের জিন্দেগীর নমুনা, যে ব্যক্তি সেভাবে তাবলিগ করবে, এবং উল্লিখিত মূলনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে 'ফাযায়েলে আমল', 'মুন্তাখাব হাদীস' প্রভৃতি কিতাবের যে সমস্ত স্থানে তাবলিগ জামাতের আমলের জন্য জিহাদের আয়াত ও হাদিস ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থেকে তাবলিগ করবে, 'কালিমার দাওয়াত', 'নবিওয়ালা কাজ', 'আল্লাহর রাস্তার মেহনত' ও 'নবির তরিকা'- পরিভাষাগুলোর অপব্যবহার না করবে, এককথায় নববি পদ্ধতিতে তাবলিগ করবে, এমন তাবলিগে সমস্যা নেই। বরং সেটাই কাম্য ও প্রত্যাশিত।
অতএব হতাশার কিছু নেই। আল্লাহর নির্ধারিত পদ্ধতিতে কাজ করা আপাতত সম্ভব না হলে করণীয় হলো, তার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। কোনো বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলামি দাওয়াতের নববি পদ্ধতি
'হিদায়া' কিতাবের ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'ইনায়া' কিতাবের লেখক আল্লামা মুহাম্মদ বিন মাহমুদ রাহিমাহুল্লাহর [মৃ. ৭৮৬ হি.] একটি উদ্ধৃতি নিম্নে উল্লেখ করা হচ্ছে। উদ্ধৃতিটি দ্বারা দাওয়াতের অতি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ক্রম যেমন বুঝে আসবে, অনুরূপভাবে কোরআন মাজিদের এ বিষয়ের আয়াতসমূহের মধ্যকার বাহ্যিক বৈপরিত্বের সমাধানও জানা যাবে ইনশাআল্লাহ। 'হিদায়া'র 'কিতাবুস সিয়ার'-এর ব্যাখ্যায় 'ইনায়া'-র লেখক লিখেছেন-
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম দিকে মুশরিকদেরকে ক্ষমা করার ও এড়িয়ে চলার জন্য আদিষ্ট ছিলেন। ইরশাদ হয়েছে-
فَأَصْفَحِ الصَّفْحَ الْجَمِيلَ.
সুতরাং আপনি সুন্দরভাবে ক্ষমা করুন। [সুরা হিজর: ৮৫]
আরো ইরশাদ হয়েছে-
وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ.
এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন। [সুরা আনআম: ১০৬]
তারপর উপদেশদান ও সুন্দর পদ্ধতিতে বিতর্ক করে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়ার ব্যাপারে আদিষ্ট হয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ .
আপনি আপনার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করুন হেকমত ও সদুপদেশ দ্বারা। [সুরা নাহল: ১২৫]
এরপর কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধ করার অনুমতিপ্রাপ্ত হন- যদি আক্রমণ তাদের পক্ষ থেকে শুরু হয়। ইরশাদ হয়েছে-
أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ.
যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা হয়, তাদেরকে যুদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হলো। [সুরা হজ: ৩৯]
আরো ইরশাদ হয়েছে-
فَإِن قَتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ.
যদি তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরা তাদেরকে হত্যা করো। [সুরা বাকারা : ১৯১]
তারপর আল্লাহর শত্রুদের পক্ষ থেকে আক্রমণ না হলেও কিছু সময় তাদের উপর আক্রমণ করার জন্য রাসুল আদিষ্ট হয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-
فَإِذَا انْسَلَخَ الأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُّمُوهُم.
অতএব যখন নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হবে, তখন মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও, হত্যা করো। [সুরা তাওবা : ৫]
এরপর সকল সময় এবং সকল স্থানে আল্লাহর শত্রুদের উপর আক্রমণ করার জন্য রাসুল আদিষ্ট হয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ.
তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো, যতক্ষণ না ফেতনা [শিরক] দূরীভূত হয়। [সুরা বাকারা : ১৯৩]
আরো ইরশাদ হয়েছে–
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الآخِرِ
যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর ঈমান আনে না, তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো। [সুরা তাওবা : ২৯] ['ইনায়া' কিতাবের উদ্ধৃতি সমাপ্ত হয়েছে।]
একজন সিরাত ও হাদিস বিশেষজ্ঞ আলেম দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ অবতীর্ণ হওয়ার পর নববি যুগে ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে ইসলামের দিকে দাওয়াত দানকারী এমন কোনো কাফেলার অস্তিত্ব ছিল না, যাদের দাওয়াত গ্রহণ না করলে তারপর জিযিয়া প্রদানের আহ্বান ছিল না, এবং জিযিয়া প্রদান করতে অসম্মত হলে এরপর যুদ্ধের আহ্বান ছিল না! নিম্নের হাদিসটি লক্ষ্য করুন-
عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ بُرَيْدَةَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا بَعَثَ أَمِيرًا عَلَى سَرِيَّةٍ أَوْ جَيْشِ أَوْصَاهُ بِتَقْوَى اللهِ فِي خَاصَّةِ نَفْسِهِ وَبِمَنْ مَعَهُ مِنَ الْمُسْلِمِينَ خَيْرًا، وَقَالَ: «إِذَا لَقِيتَ عَدُوَّكَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ فَادْعُهُمْ إِلَى إِحْدَى ثَلاثِ خِصَالٍ أَوْ خِلَالٍ، فَأَيَّتُهَا أَجَابُوكَ إِلَيْهَا فَاقْبَلْ مِنْهُمْ، وَكُفَّ عَنْهُمُ : ادْعُهُمْ إِلَى الإِسْلامِ، فَإِنْ أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ وَكُفَّ عَنْهُمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى التَّحَوُّلِ مِنْ دَارِهِمْ إِلَى دَارِ الْمُهَاجِرِينَ، وَأَعْلِمْهُمْ أَنَّهُمْ إِنْ فَعَلُوْا ذَلِكَ أَنَّ لَهُمْ مَا لِلْمُهَاجِرِينَ، وَأَنَّ عَلَيْهِمْ مَا عَلَى الْمُهَاجِرِينَ؛ فَإِنْ أَبَوْا وَاخْتَارُوا دَارَهُمْ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّهُمْ يَكُونُونَ كَأَعْرَابِ الْمُسْلِمِينَ يُجْرَى عَلَيْهِمْ حُكْمُ اللهِ الَّذِي يَجْرِي عَلَى الْمُؤْمِنِينَ، وَلَا يَكُوْنُ لَهُمْ فِي الْفَيْءِ وَالْغَنِيمَةِ نَصِيبُ إِلَّا أَنْ يُجَاهِدُوا مَعَ الْمُسْلِمِينَ. فَإِنْ هُمْ أَبَوْا فَادْعُهُمْ إِلَى إِعْطَاءِ الْجِزْيَةِ، فَإِنْ أَجَابُوا فَاقْبَلْ مِنْهُمْ، وَكُفَّ عَنْهُمْ.
فَإِنْ أَبَوْا فَاسْتَعِنْ بِاللهِ تَعَالَى وَقَاتِلْهُمْ..
হজরত সুলাইমান বিন বুরাইদা রাহিমাহুল্লাহ তাঁর পিতা বুরাইদা বিন হাসিব আসলামি রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো ব্যক্তিকে কোনো যুদ্ধবাহিনীর আমির বানিয়ে পাঠাতেন, তখন তাঁকে তাঁর নিজের ব্যাপারে এবং তাঁর সঙ্গী مسلمانوں বিষয়ে কল্যাণমূলক আচরণে আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিতেন। এবং বলতেন-
যখন তুমি তোমার মুশরিক শত্রুদের মুখোমুখি হবে, তখন তাদেরকে তিনটি বিষয়ের কোনো একটি গ্রহণ করার প্রতি আহ্বান করবে। তারা যদি সাড়া দেয়, তাহলে তা তুমি গ্রহণ করো এবং তাদের থেকে বিরত থাকো।
১. তাদেরকে ইসলামের দিকে ডাকো। যদি তারা সাড়া দেয়, তাহলে তাদের সাড়া দেওয়াকে গ্রহণ করো এবং তাদের থেকে বিরত থাকো। এরপর তাদেরকে আপন এলাকা থেকে বের হয়ে মুহাজিরদের এলাকায় স্থানান্তর হওয়ার কথা বলো। আর তাদেরকে জানিয়ে দাও, যদি তারা এ আহ্বান গ্রহণ করে, তাহলে তারা সেসকল সুবিধা পাবে, যা মুহাজিররা পায়; এবং তাদের উপর সে সব দায়িত্ব বর্তাবে, যা মুহাজিরদের উপর বর্তায়।
যদি তারা এ প্রস্তাব গ্রহণ না করে এবং নিজেদের বাড়িঘরে থেকে যায়, তাহলে তাদেরকে জানিয়ে দাও, তাদের অবস্থা গ্রাম্য সাধারণ مسلمانوں মতো হবে। মুমিনদের ক্ষেত্রে আল্লাহর যেসব বিধান প্রয়োগ হয়, তা তাদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হবে। তবে 'ফাই' ও গনিমতের মধ্যে তাদের কোনো অংশ থাকবে না; অবশ্য যদি মুসলমানের সঙ্গে যুদ্ধে শরিক হয়।
২. আর যদি ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে তাদেরকে জিযিয়া দিতে আহ্বান করো। যদি তারা এ প্রস্তাব গ্রহণ করে, তাহলে তুমি তা গ্রহণ করো এবং তাদের থেকে বিরত থাকো।
৩. পক্ষান্তরে তারা যদি জিযিয়া দিতেও অস্বীকার করে, তাহলে আল্লাহর সাহায্য কামনা করো এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো।
২৩৮ নং পৃষ্ঠার টীকা জিহাদ আগে, না খেলাফত প্রতিষ্ঠা আগে?
'জিহাদ আগে, না খেলাফত প্রতিষ্ঠা আগে?' প্রশ্নটির উত্তর প্রসঙ্গে একজন আলেমের নিম্নোক্ত বক্তব্যটি এখানে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। ‘মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা' থেকে প্রকাশিত একটি পারচায় জিহাদ ও খেলাফত উভয়টির জন্য অভিন্ন শর্তের কথা বলা হয়েছিল। সে সূত্র ধরে উক্ত আলেম লিখেছেন-
জিহাদকে কেনো খেলাফতের সাথে সংযুক্ত করা হচ্ছে বা কেনো এ দুটোর শর্ত বা সামর্থ্যকে এক করা হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। জিহাদ শুরু করার শক্তি থাকলে আগে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করে পরে জিহাদ করতে হবে, একথা আশ্চর্যজনক মনে হচ্ছে। জিহাদ করার সামর্থ্য থাকা মানেই কি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করার সামর্থ্য থাকা? যার জিহাদ করার সামর্থ্য আছে, তাকে আগে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে হবে বা জিহাদ শুরু করার শর্ত পূরণ হওয়ার অর্থই হলো খেলাফত প্রতিষ্ঠার সকল শর্ত বিদ্যমান থাকা, এটা কি শরিয়তের বক্তব্য? শরিয়ত কি এটা জরুরি সাব্যস্ত করে?
বর্তমানে অধিকাংশ জিহাদই হচ্ছে প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ। প্রতিরক্ষামূলক জিহাদের ব্যাপারে ফুকাহায়ে কেরাম এতদূর পর্যন্ত বলে ফেলেছেন যে, এর জন্য কোনো শর্ত নেই। বর্তমানের অধিকাংশ জিহাদই হচ্ছে খেলাফত পুনরুদ্ধারের জন্য জিহাদ। এমতাবস্থায় 'খেলাফত প্রতিষ্ঠার সামর্থ্য নেই অথচ জিহাদ করার সামর্থ্য আছে' বলে বিস্ময় প্রকাশ করার কী অর্থ হতে পারে?
শত্রুপক্ষ যখন একটি ইসলামি খেলাফতকে নিশ্চি করে দেবে, তখন মুসলমানদের তাৎক্ষণিক ফরজ দায়িত্ব হচ্ছে, জিহাদের মাধ্যমে সে ইসলামি খেলাফতকে উদ্ধার করা। এখানে স্বভাবসম্মত পদ্ধতিটি কী? জিহাদের জন্য খেলাফত প্রতিষ্ঠা করবে, না খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ করবে?
আমরা যা বুঝি তা হলো, দীন কায়েমের প্রচেষ্টা শুরু হবে দাওয়াত ও জিহাদ দিয়ে। ধাপে ধাপে এর মাধ্যমে দীনের শত্রুদের আক্রমণ ও হস্তক্ষেপের ক্ষমতা দূরীভূত হওয়ার পর আসবে খলিফা নির্ধারণ করে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করার বিষয়।
হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি [১২৩৩-১৩১৭ হি.] ও মুহাম্মদ কাসেম নানুতবি [১২৪৮-১২৯৭ হি.] রাহিমাহুমাল্লাহ খেলাফত প্রতিষ্ঠা না করে জিহাদ করতে গেলেন কেন? সাইয়েদ আহমদ বেরেলভি ও শাহ ইসমাঈল শহিদ রাহিমাহুমাল্লাহ খেলাফত প্রতিষ্ঠা না করে জিহাদ করতে গেলেন কেন? উমাইয়া খলিফাদের বিরুদ্ধে হোসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহুসহ আরো যারা জিহাদ করেছিলেন, তাঁরা খেলাফত প্রতিষ্ঠা না করে জিহাদ করতে গেলেন কেন? ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ এসব জিহাদে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়েছিলেন কেন? ...
খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে গেলেই কি খেলাফত বিরোধী শক্তিগুলো বাধা দেবে না? তারা যখন বাধা দেবে, তখন তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য জিহাদ ছাড়া আর কী ব্যবস্থা আছে? খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে গেলেই তো এর আগে জিহাদ লাগবে। একটি বিলুপ্ত খেলাফত পুনরুদ্ধার করতে গেলে আগে জিহাদ হবে, নাকি আগে বিলুপ্ত খেলাফত পুনরুদ্ধার হবে?
আলোচ্য আলেমের বক্তব্য সমাপ্ত হয়েছে। শুরুতে উল্লেখিত খণ্ডনকৃত অবস্থান 'মারকাযুদ দাওয়াহ'-র হলেও, ব্যক্তিগতভাবে মারকাযের আমিনুত তালিম মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ-এর অবস্থান সম্ভবত ভিন্ন। কারণ তিনি তাঁর প্রবন্ধসমগ্রে লিখেছেন- [তাঁর আলোচ্য লেখাটি ২১০ নং পৃষ্ঠায় পাঠ করুন।]
২০ নং পৃষ্ঠার টীকা তাগুতের সংজ্ঞা
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহর ভাষায়- তাগুত হলো প্রত্যেক ঐ উপাস্য, অনুসৃত ও মান্যবর সত্তা, যার মাধ্যমে মানুষ নিজের নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে। অতএব প্রত্যেক জাতির তাগুত হলো ঐ ব্যক্তি, যার নিকট লোকেরা কোরআন ও সুন্নাহর পরিবর্তে বিচারের জন্য গমন করে। অথবা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার উপাসনা করে। অথবা আল্লাহর সঠিক নির্দেশনা গ্রহণ না করে যার অনুসরণ করে। অথবা প্রত্যেক এমন ক্ষেত্রে মান্য করে, যা সম্বন্ধে তারা জানে না যে, এটা আল্লাহর আনুগত্য।
প্রসঙ্গত তাগুতের আরেকটি সংজ্ঞা নিম্নরূপ- آسان ترجمه قرآن কিতাবে সুরা নিসা-র আলোচ্য ৬০ নং আয়াতের তাফসিরে বলা হয়েছে-
'তাগুতের আভিধানিক অর্থ ঘোর অবাধ্য। কিন্তু শব্দটি শয়তানের জন্যও ব্যবহৃত হয়। প্রত্যেক বাতিলপন্থির জন্যও ব্যবহৃত হয়। এখানে শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য এমন শাসক, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধানাবলি থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে বিচার করে; অথবা তাঁদের বিপরীত আইন দ্বারা বিচার করে। আয়াতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি মুখে নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করে, কিন্তু আল্লাহ ও রাসুলের বিধানাবলির উপর অন্য কোনো বিধানকে প্রাধান্য দেয়, তার মুসলমান থাকার সুযোগ নেই।'
২০১ নং পৃষ্ঠায় আরেকটি সংজ্ঞা দেখুন। 'কালিমায়ে তাইয়েবা : বিশ্লেষণ ও ঈমান ভঙ্গের কারণ' বইয়ের 'তাগুতদের কূটকৌশল' লেখাটিও এখানে প্রাসঙ্গিক।
৬১ নং পৃষ্ঠার টীকা শিয়াদের ব্যাপারে বিন বায রহ.-এর ফতোয়া
শায়খ আবদুল আজিজ বিন বায রাহিমাহুল্লাহর [১৩৩০-১৪২০ হি.] অফিসিয়াল সাইটে রয়েছে, তিনি বলেছেন, শিয়ারা অনেক প্রকারে বিভক্ত। কারো কারো মতানুযায়ী তারা ২২ টি ফেরকায় বিভক্ত। কিন্তু তাদের মধ্যে যারা বাতেনি, যেমন- জাফরি এবং ইসনা আশারিয়া আকিদা ধারণকারী খোমিনির অনুসারী ইমামিয়্যা, তাদের কাফের হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, তারা রাফেজি। বিশেষত তাদের ঐসকল নেতৃবৃন্দ ও ইমামগণ, যারা আল্লাহর সঙ্গে শিরক করার ও নবি পরিবারের উপাসনা করার আহ্বান করে।
তারা হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তাঁর ইবাদত করে। হজরত হাসান [৩-৪৯ হি.] ও হোসাইন [৪-৬১ হি.] রাজিয়াল্লাহু আনহুমার ব্যাপারেও তারা বাড়াবাড়ি করে। তারা মনে করে, এঁরা নিষ্পাপ ও গায়ব জানেন। তাদের দাবি, হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুই আল্লাহ। নুসাইরিয়া ও ইসমাঈলিয়্যাদের অবস্থা তাদের অনুরূপ। তারা সবচেয়ে বড় কাফের; তাদের নেতৃবৃন্দ, ইমাম ও গুরুজন সকলে কাফের।
তাদের মধ্যে কিছু মূর্খ শিয়া আছে, যারা নবি পরিবারের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করে না, আল্লাহর পরিবর্তে তাঁদের ইবাদত করে না, এবং এ বিশ্বাসও করে না যে, তাঁরা গায়ব জানেন। তবে হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুকে প্রাধান্য দেয়। তারা বলে, হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু হজরত আবু বকর ও ওমর রাজিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে শ্রেষ্ঠ। এটা ভুল, অজ্ঞতা ও অবাধ্যতা। তবে এর কারণে তারা কাফের হবে না। বরং গুনাহগার ও বিদআতি হবে।
তারা কাফের হবে না, তবে যখন অথবা যখন বলবে, তাঁরা নবিগণের তুলনায় শ্রেষ্ঠ এবং হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য নবিগণের ঊর্ধ্বে, যেমনটা খোমেনি তার 'ইসলামি সরকার নামক গ্রন্থে লিখেছে- 'আমাদের ইমামগণ এমন মর্যাদায় উপনীত হয়েছেন, যেখানে কোনো নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা ও প্রেরিত নবি উপনীত হয়নি।' আমরা আল্লাহর নিকট চাই ক্ষমা ও সুস্থতা।
ইরানের বর্তমানের শাসকবর্গ সবচেয়ে বড় গোমরাহ এবং সবচেয়ে বড় কাফের, যদিও তারা ইসলামের পোশাকে আত্মপ্রকাশ করছে। আল্লাহর পানাহ! কারণ, তারা শিরক ও গায়রুল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করে। রাফেজি হওয়ার আহ্বান জানায়। সাহাবিগণকে গালমন্দ ও অভিসম্পাত করার আহ্বান করে। হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু ও নবি পরিবারের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে। তাঁদের নিষ্পাপ হওয়ার, গায়ব জানার ও আল্লাহর পরিবর্তে ইবাদতের উপযুক্ত হওয়ার বিশ্বাস পোষণ করে। তাঁদের সাহায্য কামনা করে, তাঁদের জন্য মানত করে প্রভৃতি। আমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও সুস্থতা চাই। [শায়খ বিন বায রাহিমাহুল্লাহর ফতোয়া সমাপ্ত হয়েছে।]
১১৪ নং পৃষ্ঠার টীকা কাফেরদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান
কাফেরদের সঙ্গে তথাকথিত শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে একটি ইসলামি সাময়িকীতে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। সাময়িকীটির প্রধান দায়িত্বশীলের সঙ্গে একজন আলেম এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তাদের কথোপকথন ছিল নিম্নরূপ-
= সুরা তাওবা-র ১২৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা আদেশ করেছেন- [অর্থ] 'হে ঈমানদারগণ! কাফেরদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের নিকটবর্তী, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, এবং তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা পায়। আর জেনে রাখো, আল্লাহ মুত্তাকিদের সঙ্গে আছেন'। এ জাতীয় আয়াত ও কাফেরদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্যে সমন্বয়সাধনের ধরণ কী হবে?
= = হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাজিআল্লাহু আনহু কি তাঁর ইহুদি প্রতিবেশির খোঁজখবর নেননি যে, তাঁর জন্য যে গোশত রান্না করা হয়েছে, তা থেকে ঐ ইহুদিকে দেওয়া হয়েছে কি-না। এটি কি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নয়?
= আমার ধারণায় ঐ ইহুদি জিম্মি কাফের ছিল; হরবি কাফের ছিল না। [বলাবাহুল্য, ফকিহগণের পরিভাষায় জিম্মির যে সংজ্ঞা, তা এ দেশের কাফেরদের ব্যাপারে প্রযোজ্য হয় না। এ বইয়ের আলেম الْمَوْسُوْعَةُ الفِقْهِيَّةُ الْكُوَيْتِيَّةُ কিতাবে (৭ : ১২৪) ঐ সকল শর্ত দেখে নিতে পারেন, যেগুলো মেনে নেওয়ার শর্তে তখনকার জিম্মিরা সাইয়িদুনা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট তাদেরকে নিরাপত্তাপ্রদানের আবেদন পেশ করেছিলো এবং হজরত ফারুকে আজম রাজিয়াল্লাহু আনহু তাদের দরখাস্ত গ্রহণ করেছিলেন। এই অধ্যয়ন দ্বারা বর্তমানের Muslim সংখ্যাগরিষ্ঠ বিভিন্ন দেশের কাফেররা জিম্মি কি-না, তা বুঝা সহজ হবে ।]
= = লেখক সাধারণভাবে কাফেরদের সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। হরবি কাফেরদের সম্বন্ধে আলোচনা করেননি। [তিনি সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছেন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতি প্রবন্ধে যে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে, তা জিম্মি কাফেরদের ব্যাপারে। অতএব আপত্তির কিছু নেই ।]
= আমাদের অঞ্চলের বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে সাধারণ পাঠক প্রবন্ধের উৎসাহদান কাদের ব্যাপারে প্রয়োগ করবেন?
= = [রাগতস্বরে] আপনি বুঝতে চান না, বুঝাতে চান। আপনার অধ্যয়ন অসম্পূর্ণ এবং আপনার বুঝ ভাসাভাসা। গভীর চিন্তার সাথে পাঠ করুন, সকল আপত্তি দূর হয়ে যাবে।
= হয় আপনিই আমাকে বুঝিয়ে দিন। অথবা বিশেষ কোনো কিতাবের বিশেষ কোনো স্থান নির্দেশ করুন, আমি তা পড়ে জেনে নিব ইনশাআল্লাহ।
= = ইতিহাস পাঠ করুন।
[মানসম্মত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে যাতায়াত করে ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থাবলির বৈচিত্র্য, পরিমাণ ও বিস্তৃতি সম্পর্কে যাদের কিছুটা ধারণা আছে, তাঁরা বুঝবেন, এটি এমন এক বিষয় পাঠ করার নির্দেশ, অন্য সবকিছু থেকে অবসর হয়ে কয়েক বছর একটানা করলেও তা সমাপ্ত হওয়ার নয় ।]
উক্ত কথোপকথনকারী আলেমকে তার একজন সহকর্মী প্রশ্ন করলেন, উল্লিখিত দায়িত্বশীলের সাথে আলাপচারিতা সম্পন্ন হওয়ার পর এখন আপনার অনুভূতি কী? উত্তরে তিনি বলেছেন, আমার মনে হয়েছে, দলিল চাইলে তিনি ও তাঁর স্তরের লোকেরা বিরক্ত হন। [বন্ধনীর ভেতরের লেখাগুলো সংলাপের অন্তর্ভুক্ত নয় ।]
এমন কিছু কথা এ বইয়ের ‘অনুবাদকের নিবেদন' শিরোনামের ভূমিকায়ও এসেছে। 'কালিমায়ে তাইয়েবা : বিশ্লেষণ ও ঈমান ভঙ্গের কারণ' বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের ৯১ নং পৃষ্ঠায় দেশ-বিদেশের কতিপয় বড় আলেম সম্পর্কে লেখা হয়েছে-
ইলমের শীর্ষ স্তরের কতকের একটি অবস্থা হলো, তাঁদের আচরণ-উচ্চারণ দ্বারা বিভিন্ন প্রমাণিত বাস্তবতা সম্পর্কে সত্যান্বেষীরা ধাঁধাঁয় পড়ে যায় ও সন্দিহান হয়ে উঠে। যেমন তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করা বিষয়ক বিভিন্ন মাসআলার ভুল-নির্ভুল বিভিন্ন দিক আবিষ্কার করে নির্ভুল কোনটি, তা জানার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো দলিল বা নির্দেশনা পেশ করার পরিবর্তে, তাঁরা অনির্দিষ্টভাবে উচ্চতর গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করার পরামর্শ দেন। অবস্থা যেন এমন, উচ্চতর ইলমি গ্রন্থসমূহ খুললেই সংশ্লিষ্ট আলোচনা সামনে এসে যাবে। আর সে আলোচনায় দৃষ্টি ফেললে তাদের প্রতিপক্ষের অবস্থানগুলো ভুলই সাব্যস্ত হবে। ওদিকে এ স্তরের ব্যাপক অধ্যয়ন করা অনেকের জন্য সম্ভব হয় না। ফলে তাঁদের ব্যক্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেকে সেসকল প্রমাণিত বিষয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন।
উল্লিখিত আলেমগণ দীনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ের জন্যও দলিল পেশ করার দায়বদ্ধতা কার্যত অস্বীকার করেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তাঁরা চান, মানুষ শুধু তাঁদের উপর নির্ভর করে তাঁদের কথাগুলো গ্রহণ করে নিক। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সূরা বনি ইসরাঈলের ৩৬ নং আয়াতে এমন কিছু মান্য করতে নিষেধ করেছেন।
২৪৫ নং পৃষ্ঠার ৩য় টীকা পশ্চিমা 'মানবতাবাদ'
পশ্চিমাদের 'বিশ্বজনীনতা' ও 'মানবতাবাদ' একই মতবাদের পৃথক দুটি নাম। তারা এ মতবাদ দ্বারা এমন এক চিন্তাধারাকে বুঝায়, যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হবে না; বরং সকল ধর্মের মানুষ সমমর্যাদার অধিকারী। কিন্তু মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর কাছে সকল মানুষ সমস্তরের নয়। আল্লাহর কাছে কাফেররা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও অধম। সুরা আরাফ ১৭৯ নং আয়াত দ্রষ্টব্য।
পশ্চিমাদের এ মতবাদ ইসলাম ধর্মের শত্রুতা ও মিত্রতার বিধান রহিত করে দিয়েছে; এবং মুসলমান ও কাফেরের মধ্যকার পার্থক্য অনেককে ভুলিয়ে দিয়েছে। তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কয়েকটি বিভ্রান্তিকর শব্দের উপর- স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব, সমতা ও ন্যায়বিচার। তারা এ মতবাদের মাধ্যমে দারুল ইসলাম ও দারুল হরবের বিভাজন উঠিয়ে দিয়ে নববি পদ্ধতিতে খেলাফাত প্রতিষ্ঠার চিন্তাকে পশ্চাদ্গামিতা আখ্যা দেয়। এ মতবাদ মুসলমানদেরকে ইহুদি-খ্রিস্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে প্ররোচিত করে। অথচ পবিত্র কোরআনের প্রথম সুরায় আল্লাহ তাআলা আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, খ্রিস্টানরা পথভ্রষ্ট এবং ইহুদিরা তাঁর ক্রোধের শিকার।
২৪৫ নং পৃষ্ঠার ২য় টীকা দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদ ধর্ম
জাতীয়তাবাদ ও দেশাত্মবোধ ধর্মটি বর্তমান বিশ্বে পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক ব্যাপকতা লাভ করেছে। ইসলামি আকিদার উপর প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি কাজ জাতীয়তাবাদ ধর্মে পশ্চাদপদতা ও সেকেলে হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধর্মটি মুসলমানদেরকে তথাকথিত আধুনিক ও প্রগতিশীল করার লক্ষ্যে, ইসলামের অপরিহার্য আকিদা 'ওয়ালা-বারা' [শত্রুতা-মিত্রতা] থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
সাম্প্রতিককালে জাতীয়তাবাদ আল্লাহর দীন ও শরিয়তের স্থান দখল করে, এক নতুন ধর্মের রূপ গ্রহণ করেছে। ফলে মুসলমান নামধারী জাতীয়তাবাদীরা সাহাবা রাজিয়াল্লাহু আনহুমের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে, যারা ছিলেন কাফেরদের ক্ষেত্রে সীমাহীন কঠোর, আর নিজেদের পরস্পরের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল।
অনুরূপভাবে তারা সাইয়িদুনা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর সঙ্গীদের আদর্শকে ভুলে গেছে, যারা নিজ এলাকার কাফেরদের বলেছিলেন- [অর্থ] আমরা তোমাদের থেকে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের উপাসনা কর, তাদের থেকে সম্পর্কহীন। আমরা তোমাদের মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য প্রকাশ্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে গেছে, যে পর্যন্ত না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আন।
বস্তুত ইসলাম জাতীয়তাবাদের মূলোৎপাটনের জন্য এসেছে। ইসলাম তার প্রথম আহ্বানেই আরবের কুরাইশ বংশের আবু বকর, হাবশার বেলাল ও রোমের সুহাইবকে এক পতাকাতলে নিয়ে এসেছে। তাইতো সাইয়িদুনা ওমর রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আমরা এমন জাতি যাদেরকে আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। যখন আমরা অন্য কিছুতে সম্মান তালাশ করব, আল্লাহ আমাদের লাঞ্ছিত করবেন।'
আল্লামা মুহাম্মদ বিন সাঈদ কাহতানি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, জাতীয়তাবাদের ব্যাপারে সারকথা হলো, এই বিশ্বাস আল্লাহর সঙ্গে শিরক। কেননা জাতীয়তাবাদ ব্যক্তির কর্ম, ত্যাগ ও সাধনাকে এককভাবে নিজের জন্য সাব্যস্ত করে; এবং নিজের অনুসারীদেরকে এমন সব ব্যক্তিদের ঘৃণা ও শত্রুতা করতে বলে, যারা এ মতবাদ পরিত্যাগ করেছে; আর বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা করতে বলে জাতীয়তাবাদী ও তাদের দোসরদের সঙ্গে।
এ হিসেবে জাতীয়তাবাদ তার অনুসারীদের নিকট আল্লাহর সমকক্ষ এমন এক উপাস্যে পরিণত হয়েছে যে, আল্লাহ ব্যতীত তারা তার উপাসনায় লিপ্ত।
'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র মধ্যে শত্রুতা ও প্রত্যাখ্যান এবং মিত্রতা ও সাব্যস্তকরণ রয়েছে। 'লা-ইলাহা' হলো তাগুত তথা গায়রুল্লাহর সাথে শত্রুতা ও প্রত্যাখ্যান, এবং 'ইল্লাল্লাহ' হলো আল্লাহর সাথে মিত্রতা ও সাব্যস্তকরণ। জাতীয়তাবাদ এ ক্ষেত্রে কালিমার স্থান দখল করে নিয়েছে; যারা আপন ভূখণ্ডের নয়, জাতীয়তাবাদ তাদের সঙ্গে শত্রুতা করে, পক্ষান্তরে যারা এ ভূখণ্ডের, জাতীয়তাবাদ তাদের সঙ্গে মিত্রতা করে।
২৯০ নং পৃষ্ঠার টীকা
পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব?
হজরত মুফতি মুহাম্মদ শফি রাহিমাহুল্লাহ ও তাঁর মতো আলেমগণ নিঃসন্দেহে 'দারুল ইসলাম' প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন লালন করেই পাকিস্তান গঠন করেছেন। তাঁদের কারো নেক নিয়তের ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করার ফলে কার্যত কী হয়েছে? পাকিস্তান দারুল ইসলাম হয়েছে, না দারুল হরবই রয়ে গেছে? প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করার জন্য নিম্নে কিছু বাস্তবতা তুলে ধরা হবে ইনশাআল্লাহ ।
তার আগে প্রসিদ্ধ 'আহসানুল ফাতাওয়া' কিতাবের লেখক আল্লামা মুফতি রশিদ আহমদ লুধিয়ানবি রাহিমাহুল্লাহর কিছু অভিজ্ঞতা ও অভিব্যক্তি উল্লেখ করছি। তিনি লিখেছেন, '... যখন তাদেরকে [গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম বানানোর উদ্দেশ্যে আন্দোলনকারী আকাবিরগণের অনুসারীদেরকে] বলা হয়, আপনারা তো ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার দাবিদার। কিন্তু আপনারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজেরা যে কর্মপন্থা [গণতন্ত্র] অবলম্বন করছেন, তা তো অনৈসলামিক ও নাজায়েজ।
তখন তারা প্রত্যুত্তরে বলে, 'যদিও এ পদ্ধতি নাজায়েজ, কিন্তু তা ব্যতীত ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ জন্য এখন জায়েজ- নাজায়েজের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করা আবশ্যক। ক্ষমতা অর্জিত হলে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করব।'
এটি ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়। তাঁদের নিয়তের ব্যাপারে আমরা সন্দেহ করছি না; কিন্তু তাঁদের কর্মপদ্ধতি এমন, যার মাধ্যমে কখনোই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশা করা যায় না। কেননা অনৈসলামিক পদ্ধতিতে দীনহীনদের জন্য তো সফলতা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু দীনদারদের জন্য প্রথমত সফলতা অর্জন করাই সম্ভব নয়। আর যদি বাহ্যত সফল হয়েও যায়, তবু তার পরিণামে ইসলাম আসবে না। বরং ইসলামের নামে অন্য কিছু হবে।
এ বইয়ের ১৯৪-১৯৬ নং পৃষ্ঠায় জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের দারুল ইফতার প্রধান মুফতি হামিদুল্লাহ জান ও জামিয়া ফারুকিয়ার শায়খুল হাদিস মাওলানা সালিমুল্লাহ খান রাহিমাহুমাল্লাহর দুটি বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, তা এখন পুনরায় দেখে নিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে।
পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব? এ বিষয়ে প্রকৃত অবস্থা অনুভব করার জন্য উদাহরণস্বরূপ কিছু বাস্তবতা তুলে ধরার যে ওয়াদা শুরুতে করা হয়েছে, এখন তা আরম্ভ হচ্ছে-
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ রচিত 'সুদ পর তারিখি ফায়সালা' কিতাবের শুরুতে লিখিত মুফতি মুহাম্মদ রাফি উসমানি হাফিজাহুল্লাহর ভূমিকা থেকে আমরা জানতে পেরেছি, সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার মতো একটি রায়ও পাকিস্তানে আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। এ বিষয়ে জনৈক লেখকের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ নিম্নে উল্লেখ করা হচ্ছে-
১. যে দেশটি শুধু ইসলামের জন্য ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে দেশে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি মাসআলা নিয়েও কথা বলার সুযোগ, দেশটি অস্তিত্ব লাভের ৩২ বছর পর ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হয়নি।
২. ৩২ বছর পর একটি বিশেষ মাসআলা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে। ইসলামি শরিয়ার সকল মাসআলা নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়নি। কতিপয় আলেমের ভাষায় এটি أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ -এর স্তর।
৩. সুদের যে মাসআলা নিয়ে ৩২ বছর পর আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে, তা এমন এক মাসআলা যা দেশের সকল মুসলমানের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। তা প্রতিদিনের প্রতি লোকমার হালাল-হারামের সাথে সম্পৃক্ত মাসআলা।
৪. তারও ১২ বছর পর অর্থাৎ দেশটি প্রতিষ্ঠার ৪৪ বছর পর আদালতের একটি বেঞ্চ সুদ হারাম হওয়ার রায় দিয়েছে। ৪৪ বছর পর্যন্ত দেশটির পরিবেশ এমন রায় দেওয়ার উপযোগী ছিল না।
৫. দেশটির সরকার কর্তৃক অনুমোদিত বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সুদ হারাম হওয়ার বিরুদ্ধে আপিল করেছে। ইসলাম প্রেমিকগণ আল্লাহর দ্ব্যর্থহীন হুকুমের বিরুদ্ধে আপিলকারীদেরকে কোনো ধরনের শিক্ষা দিতে সক্ষম হয়নি।
৬. আপিলের শুনানি শুরু হয়েছে তারও ৮ বছর পর। দেশটির বয়স তখন ৫২ বছর। উল্লেখ্য, আপিল শুনানির বৈঠকের গণ্যমান্য মেহমান হচ্ছে ঐসকল ব্যাংকার, যারা যুগের পর যুগ সুদের মহাজনি করেছে, সুদের ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিরাট 'অবদান' রেখেছে।
৭. ৫৩ বছর পর ১৯৯৯ সনের শেষ মাথায় সুদ হারাম হওয়া প্রমাণিত করার জন্য আলেমসমাজ হাজার হাজার পৃষ্ঠা খরচ করেও সুদ হারাম হওয়ার রায় কার্যকর করতে পারেননি।
৮. সর্বশেষ অবস্থা : পুরো পাকিস্তানে সুদের কারবার সেভাবেই চলছে যেভাবে ছিল। বৃটিশ ভারতে যেভাবে ছিল সেভাবেই আছে। বর্তমান ভারতে যেভাবে আছে সেভাবে আছে। আমেরিকা ও বৃটেনে যেভাবে আছে সেভাবেই আছে। বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশে যেভাবে আছে, সেভাবেই আছে। সারাবিশ্বে তাগুতের আইনে অর্থনীতি যেভাবে চলছে, সেভাবেই পাকিস্তানে চলছে। ব্যবধান হচ্ছে, সারাবিশ্বের মুসলমানরা যে পরিমাণ ধোঁকা খেয়ে চলেছে, সে তুলনায় পাকিস্তানের মুসলমানরা একটু বেশি খেয়ে চলেছে। অবশ্য যারা খাচ্ছে, তাদের ব্যাপারে বলা হচ্ছে। আল্লাহর এমন বহু বান্দাও আছে, যারা এসব ধোঁকা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে চলছে।
তাই ১৫ নং পৃষ্ঠায় বর্ণিত হজরত মাদানি রাহিমাহুল্লাহর উক্তিটিও এখানে স্মরণযোগ্য- 'সেখানকার [পাকিস্তানের] সরকার ইউরোপীয় পদ্ধতির গণতান্ত্রিক সরকার। তাতে জনসংখ্যা অনুপাতে মুসলিম- অমুসলিম সকলেই অংশীদার। তাকে ইসলামি সরকার বলা ভুল।
হজরত লুধিয়ানবি রাহিমাহুল্লাহর এ উক্তিটি পুনরায় উল্লেখ করে লেখাটি শেষ করছি- 'অনৈসলামিক পদ্ধতিতে দীনহীনদের জন্য তো সফলতা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু দীনদারদের জন্য প্রথমত সফলতা অর্জন করাই সম্ভব নয়। আর যদি বাহ্যত সফল হয়েও যায়, তবু তার পরিণামে ইসলাম আসবে না। বরং ইসলামের নামে অন্য কিছু হবে।'
এই হলো 'পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব'-এর আলোচনা, যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিতই হয়েছে ইসলামের জন্য। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলাম বাংলাদেশের জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও প্রাণোৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেনি; বরং জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- চেতনাগুলো তাদেরকে মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও প্রাণোৎসর্গ করতে উৎসাহিত করেছে। প্রমাণস্বরূপ বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা অংশের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদটি দ্রষ্টব্য-
'আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।'
টিকাঃ
১. পৃ. ৮৯০-৮৯৮ দ্রষ্টব্য। دار العلوم دیوبند : مَدْرَسَةٌ فِكْرِيَّة توجيهية ...।
১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬২।
১. ফাযায়েলে আমল, পৃ. ১০১৩। 'দারুল কিতাব' সংস্করণ। বাংলাবাজার, ঢাকা।
১. তিনি হজরতজি মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস রাহিমাহুল্লাহর [১৩০৩-১৩৬৫ হি.] চাচাতো ভাই, ভগ্নিপতি ও তাঁর বিশিষ্ট আস্থাভাজন ছিলেন। তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে নিজামুদ্দিনে তাবলিগ জামাত পরিচালনার বিভিন্ন দায়িত্বে ও হজরতজি মুহাম্মদ ইলিয়াস রাহিমাহুল্লাহর সাহচর্যে। জামাতের 'ছয় নম্বর' নামক পুস্তিকার লেখকও তিনি। তিনি হজরতজি মাওলানা এনামুল হাসান রাহিমাহুল্লাহর পিতা।
২. অন্য একটি তরিকা দ্বারা 'পস্তী কা ওয়াহেদ এলাজ' পুস্তিকায় যে তরিকাকে مسلمانوں অধঃপতনের একক চিকিৎসা বলা হয়েছে, তা উদ্দেশ্য।
৩. 'পস্তী কা ওয়াহেদ এলাজ' নামক পুস্তিকাটি জামাতের প্রধান কেন্দ্র তথা দিল্লির নিজামুদ্দিন থেকে প্রকাশিত তাবলিগি মানহাজের পরিচিতি ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
১. ফাযায়েলে আমল, পৃ. ১০০৬
১. দারুল ইসলামে বসবাস করার জন্য আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিস্টানদের 'দারুল ইসলাম কর্তৃপক্ষ'কে প্রতিবছর যে অর্থ দিতে হয়, তাকে জিযিয়া বলে।
১. সুনানু আবি দাউদ, কিতাবুল জিহাদ, বাবুন ফি দুআইল মুশরিকিন দ্রষ্টব্য। হাদিস নং ২৬১৪।
১. ২৭১-২৭৪ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
১. إِعْلَامُ الْمُوَقِّعِينَ দ্রষ্টব্য। খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৯২। দারু ইবনিল জাওযি সংস্করণ।
২. آسان ترجمه قرآن সুরা নিসা : ৬০
১. المَوْقِعُ الرَّسْمِيُّ لِسَمَاحَةِ الشيخ الإمام ابن باز رحمه الله .১
১. الحكومة الإسلامية .১
১. 'ওয়ালা-বারা' তথা 'শত্রুতা-মিত্রতা' ইসলামের অপরিহার্য আকিদা হওয়ার বিষয়টি, প্রয়োজনীয় দলিল-প্রমাণসহ জানার জন্য 'কালিমায়ে তাইয়েবা : বিশ্লেষণ ও ঈমান ভঙ্গের কারণ' বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের ৮৩-৯৩ পৃষ্ঠা দেখুন।
২. সুরা ফাত্হ: ২৯ দ্রষ্টব্য।
৩. সুরা মুমতাহিনা : ৪
১. الوَلاءُ وَالبَرَاءُ فِي الإسلام পৃ. ৪২৫, ৬ষ্ঠ সংস্করণ। ১.
১. বরং আকাবির-আসলাফের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তমতে কুফর।
২. এর অর্থ তো এটাই হচ্ছে, আল্লাহ এমন একটি আদেশ করেছেন, যা পালন করার জন্য আল্লাহ ও রাসুল কোনো জায়েজ পদ্ধতি প্রবর্তন করেননি। কিন্তু এই বাচনভঙ্গিতে আল্লাহ ও রাসুলের উপর অপবাদ আরোপের দুর্গন্ধ আছে কি-না, শুঁকে দেখা প্রয়োজন।
৩. نا أَحْسَنُ الفَتَاوَى، كتاب الجهاد ..
১. মাকতুবাতে শায়খুল ইসলাম, ২: ২৪২
২. احسن الفتاوى، كتاب الجهاد : ٨٠