📄 আত্মকথন : ভেতরের আমি ও বাইরের আমি
প্রতি সপ্তাহের মতো আজও মাহাদ থেকে মাদানীনগরে বাসায় এসে পরিবারের সাথে মিলিত হলাম। স্নেহের সন্তানদের ও জীবনসঙ্গীনিকে পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদ পেয়ে মহান আল্লাহর শোকর আদায় করলাম। সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার।
বাসায় এসে লক্ষ্য করলাম, কিছু সমস্যার সমাধান বিষয়ে আমার 'ভেতরের আমি'কে 'বাইরের আমি'র সঙ্গে এবং 'বাইরের আমি'কে 'ভেতরের আমি'র সঙ্গে একান্তে নৈশালাপের সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি প্রবলভাবে তাড়িত। তবে স্ত্রী-সন্তানদের সাথে হাসি-আনন্দে কিছু সময় কাটানো ছিল পরিবেশের দাবি। এই স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ না করা অসঙ্গত মনে করলাম। তাই তাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটালাম। রাতের খাবারও একসঙ্গে খেলাম।
ঘুমের সময় হলে তাদেরকে বললাম, তোমরা শুয়ে পড়। তোমাদের অনুমতি হলে আমি কিছুক্ষণ পর আসছি। সকলে মুচকি হেসে সম্মতি প্রকাশ করল। আল্লাহ তাদেরকে মৃত্যুর সময়ও হাস্যোজ্জ্বল রাখুন। আমি ও আমার পাঠকদের প্রতিও সন্তুষ্ট হোন। আমিন! তাই এখন আশা করছি, 'ভেতরের আমি' ও 'বাইরের আমি' মুক্ত-স্বাধীনভাবে নিজেদের মাঝে অনুভূতি বিনিময় ও নৈশালাপ করার সুযোগ পাবে।
বাইরের আমি : আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছ বন্ধু?
ভেতরের আমি : ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। বন্ধু না হয়েও তুমি আমাকে 'বন্ধু' বলে সম্বোধন করেছ। তাই বুঝে নাও, আমি কেমন আছি!
বাইরের আমি : বলছ কি প্রিয়! আমি তোমার বন্ধু না? অথচ সর্বদা তোমার সঙ্গে আছি, এক মুহূর্তের জন্যও তোমার থেকে পৃথক হই না!
ভেতরের আমি : তোমার সাথে একান্তে কথা বলার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছি; আর তুমি কিনা নিজ পরিবার নিয়ে ব্যস্ত! এ অবস্থায় এ দাবি করার অধিকার কি তোমার আছে?
বাইরের আমি : মাফ করো বন্ধু! তুমি জান, পরিবারেরও চাওয়া-পাওয়া আছে। আমি তার কিছুটা আদায় করার চেষ্টা করেছি; যেন বাকি সময়টাতে তোমার প্রতি পূর্ণ মনযোগ দিতে পারি।
ভেতরের আমি : ঠিক আছে। তোমার ওজর ছিল। আর উদার মনের মানুষের কাছে ওজর গ্রহণযোগ্য।
বাইরের আমি : ধৈর্যধারণ করার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি কতো ভালো বন্ধু!
ভেতরের আমি : তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। মনযোগ দিয়ে শুনবে কি?
বাইরের আমি : অবশ্যই শুনব। সংকোচ না করে বলো।
অজ্ঞতার খোঁড়া ওজর
ভেতরের আমি : উদাহরণস্বরূপ বলি, অসংখ্য খ্রিস্টান আছে যারা খ্রিস্টধর্ম পালন করে, ইসলামের ধার ধারে না; এই বিশ্বাসে যে, খ্রিস্টধর্ম সত্য ধর্ম, আর ইসলাম বাতিল ধর্ম। এটা কি বাস্তব নয়?
বাইরের আমি : অবশ্যই।
ভেতরের আমি : কিন্তু বাস্তবতা কী?
বাইরের আমি : বাস্তবতা হলো, ইসলাম সত্য আর খ্রিস্টধর্ম মিথ্যা।
ভেতরের আমি : তাহলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করে নিজ নিজ ধর্ম অনুসরণ করার ব্যাপারে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে অজ্ঞতার ওজর রয়েছে। বিষয়টি এমন নয় কি?
বাইরের আমি : অবশ্যই।
ভেতরের আমি : আচ্ছা, আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন তাদের অজ্ঞতার এই ওজর কি গ্রহণ করবেন? ইসলাম গ্রহণ না করা সত্ত্বেও তাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবেন?
বাইরের আমি : কখনও না। কারণ, ‘জরুরিয়াতে দীনে’র ক্ষেত্রে অজ্ঞতার ওজর গ্রহণযোগ্য নয়।
ভেতরের আমি : যদি কাফেরদের না জানার ওজর অগ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে এমন সব বিষয়ে নামধারী মুসলমানদের অজ্ঞতার ওজর কেনো গ্রহণযোগ্য হবে?
বাইরের আমি : অনুগ্রহপূর্বক একটি উদাহরণ দাও তো!
মুসলমান (?) কর্তৃক কোরআনের আয়াত প্রত্যাখ্যান করার উদাহরণ
ভেতরের আমি :
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا .
কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর এই অবকাশ নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয় চূড়ান্ত করে দেওয়ার পরও নিজেদের বিষয়ে তাদের এখতিয়ার থাকবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানি করল, সে সুস্পষ্ট গোমরাহিতে পতিত হলো। [সুরা আহযাব : ৩৬]
বাইরের আমি : বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে এ আয়াত প্রত্যাখ্যান করে?
ভেতরের আমি : আয়াতের মর্মার্থ হলো, 'আল্লাহ ও রাসুল যখন কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর ব্যাপারে কোনো ফায়সালা করেন, তখন এভাবে তার বিরোধিতা করার সুযোগ নেই যে, তাদের ব্যাপারে যে ফায়সালা করা হয়েছে তারা তা ব্যতীত অন্যকিছু গ্রহণ করবে।' [আততাফসিরুল মুয়াসসার] ‘সাফওয়াতুত তাফাসির' কিতাবে আছে أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمُ অর্থাৎ তাদের জন্য কোনো মত বা এখতিয়ার থাকবে না। বরং জরুরি হলো, আত্মসমর্পণ করা ও মেনে নেওয়া। আল্লামা ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, আয়াতটি সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অতএব আল্লাহ ও রাসুল যখন কোনো বিধান প্রদান করেন, তখন কারো জন্য তার বিরোধিতা করার সুযোগ নেই। এবং তাদের কোনো এখতিয়ার, রায় বা মতামত প্রকাশেরও কোনো অবকাশ নেই।
আর এটা জ্ঞাত বিষয় যে, বাংলাদেশের জনগণ দেশের সংবিধান অনুসারে সকল ক্ষমতার উৎস। নিজেদের বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্তগ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ ও রাসুল যে ফায়সালা করেছেন, তা ব্যতীত অন্যকিছু পছন্দ করার এখতিয়ার তাদের রয়েছে। প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে নিজস্ব মতামত, পছন্দ ও সিদ্ধান্তের অধিকার।
সংবিধানের পক্ষ থেকে তাদের উক্ত অধিকার রয়েছে- বিষয়টি এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সকল জনগণ এ ক্ষমতা ও অধিকার নির্বাচনে ভোট দিয়ে এবং মিটিং- মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, হরতাল, অবরোধ, অনশন, ধর্মঘট, লংমার্চ, স্বারকলিপি প্রদান প্রভৃতি পদ্ধতিতে প্রয়োগও করে। ভোটের মাধ্যমে জনগণ নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে তাদেরকে সংসদে পাঠায়। আর প্রত্যেক বিষয়ে এই প্রতিনিধিদের নিজস্ব মতামত প্রদান করার অধিকার থাকে। তারা আল্লাহ- রাসুলের নিকট নিজেদেরকে সোপর্দ করে না এবং কোরআন- হাদিসের বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করে না। যেমন- পরস্পর সম্মতিক্রমে যিনা করা, মদ পান করা, সুদভিত্তিক লোন নেওয়া, লোন দেওয়া, ফিক্সড ডিপোজিট রাখা, সুদভিত্তিক ব্যাংকে চাকুরি করা ইত্যাদি এমন অনেক বিষয়কে বৈধ সাব্যস্ত করে, যা ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ।
তদ্রূপ ইসলামের দণ্ডবিধি তারা অবৈধ সাব্যস্ত করে, যেগুলো আল্লাহ ও রাসুল প্রবর্তন করেছেন। এগুলো কি বাস্তব নয়? এভাবে তারা আল্লাহ তাআলার উল্লিখিত বাণী প্রত্যাখ্যান করছে, যাতে তিনি বলেছেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا.
কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর এই অবকাশ নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয় চূড়ান্ত করে দেওয়ার পরও নিজেদের বিষয়ে তাদের এখতিয়ার থাকবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানি করল, সে সুস্পষ্ট গোমরাহিতে পতিত হলো। [সুরা আহযাব : ৩৬]
তারা কি মুসলমান আছে?
এখন বলো, এ সকল প্রতিনিধির হুকুম কী? এবং ঐ জনগণেরই বা কী হুকুম, যারা আল্লাহর আইনের বিপরীতে নিজেদের প্রতিনিধিদের প্রবর্তিত আইন পালন করে? অথচ আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا.
অতএব না, আপনার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের মধ্যে সংঘটিত বিবাদের ক্ষেত্রে আপনাকেই [আপনার সুন্নাহকেই] বিচারক বানাবে। তারপর আপনার ফয়সালা সম্বন্ধে নিজেদের মনে কোনো সংকীর্ণতা বোধ করবে না এবং [তা] সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিবে। [সুরা নিসা : ৬৫]
তারা কি এখনও মুসলমান আছে? তোমার কী মনে হয়?
বাইরের আমি: আর কিছু বলবে?
ভেতরের আমি: তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছ না কেন? তারা কি এখনও মুসলমান আছে? তাদের ঈমান এখনও কি বহাল আছে? আমার কথাগুলো কি অবাস্তব?
না জানার অজুহাত
বাইরের আমি : জবাব দিতে পারছি না বলে দুঃখিত। আসলে তোমার বিশ্লেষণ যে বাস্তবতার পর্দা উন্মোচন করেছে, তা জানার পর আমার অন্তর কাঁপতে শুরু করেছে। দেখ ভাই! আমি দুর্বলচিত্তের মানুষ। তাই বাস্তবতা স্বীকার করা এবং তা নিয়ে কথা বলার সাহস আমার নেই। তবে তাদের অধিকাংশই আল্লাহ তাআলার দীন ও শরিয়ত সম্পর্কে জানে না- এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়।
ভেতরের আমি : তাহলে শেষ পর্যন্ত কি তুমি বলতে চাচ্ছ, সংবিধানের পক্ষ থেকে সাংসদদের যে স্বাধীনতা রয়েছে, তা গ্রহণ করার ব্যাপারে তাদের কাছে অজ্ঞতার ওজর আছে? অর্থাৎ নিজেদের বিষয়গুলোতে ইসলামের বিপরীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগ করার সাংবিধানিক অধিকার থাকাটা যে আল্লাহ তাআলার উল্লিখিত বাণীর বিরোধী, তা জনগণের সংসদীয় প্রতিনিধিরা বুঝতে পারেনি। অতএব তাদের অজ্ঞতার ওজর রয়েছে?
বাইরের আমি : আমি এটাই বলতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু তুমি আমার সামনে খ্রিস্টান, হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অজ্ঞতার ওজরের– যা আল্লাহ গ্রহণ করবেন না- উদাহরণ পেশ করেছ। তাই আমি এখন তা বলতে চাই না। তবে জনগণ আল্লাহর বিপরীতে সংসদ সদস্যদেরকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেনি, যদিও তারা আইন প্রণয়নের স্বাধীনতা এবং বৈধ-অবৈধ নির্ধারণের ক্ষমতা তাদের নিকট সোপর্দ করেছে।
মানুষ যখন প্রভু
ভেতরের আমি: আল্লাহ তাআলা সুরা তাওবার ৩১তম আয়াতে বলেছেন-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَيْهَا وَاحِدًا لَّا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ وَ عَمَّا يُشْرِكُونَ .
অর্থাৎ তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের আলেম, আবেদ ও মাসিহ ইবনে মারইয়ামকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তাদেরকে এ আদেশই করা হয়েছিল যে, তারা এক মাবুদের ইবাদত করবে- যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তিনি তাদের শিরক থেকে পবিত্র।
ইমাম মুহিউস সুন্নাহ আবু মুহাম্মদ আলহুসাইন ইবনে মাসউদ আল বাগাবি রাহিমাহুল্লাহ [মৃ. ৫১০ হি.] তাঁর প্রসিদ্ধ তাফসির 'মাআলিমুত তানযিল ফি তাফসিরিল কোরআন' যা 'তাফসিরে বাগাবি' নামে প্রসিদ্ধ, তাতে তিনি লিখেছেন- اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ অর্থাৎ তারা নিজেদের জ্ঞানীব্যক্তিবর্গ ও ধর্মীয়গ্রন্থের পাঠকদেরকে প্রভুরূপে গ্রহণ করেছে। যদি বলা হয়, তারা তাদের ইবাদত করেনি। তাহলে আমরা বলব, আয়াতের অর্থ হলো, তারা আল্লাহর অবাধ্যতার ব্যাপারে নিজেদের আলেম ও আবেদদের অনুসরণ করেছে এবং তারা যা বৈধ সাব্যস্ত করেছে, সেটা গ্রহণ করেছে এবং যা অবৈধ সাব্যস্ত করেছে, তা মেনে নিয়েছে। এভাবে তারা আবেদ ও আলেমদেরকে প্রভুর মতো গ্রহণ করেছে।
হজরত আদি ইবনে হাতিম রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, [ইসলাম গ্রহণের পূর্বে] একবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলাম, তখন আমার গলায় একটি স্বর্ণের ক্রুশ ছিল। তা দেখে তিনি আমাকে বললেন, হে আদি! তোমার গলা থেকে এই মূর্তিটাকে ছুঁড়ে ফেলো। আমি তা ছুঁড়ে ফেললাম। তারপর তাঁর নিকট গেলাম; তিনি তখন তিলাওয়াত করছিলেন-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ
তিনি তিলাওয়াত থেকে অবসর হলে আমি বললাম, আমরা তো তাদের ইবাদত করি না। তিনি বললেন, আল্লাহ যা বৈধ করেছেন তারা কি তা অবৈধ সাব্যস্ত করে না? ফলে তোমরাও তা অবৈধ বল। আর আল্লাহ যা অবৈধ বলেছেন তারা কি তা বৈধ সাব্যস্ত করে না? আর তোমরাও তা বৈধ বল। আমি বললাম, অবশ্যই। এ কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটাই তাদের ইবাদত করা। ['তাফসিরে বাগাবি'র বিবরণ সমাপ্ত হয়েছে।]
এবার বলো, যেসকল সাংসদ ও জনপ্রতিনিধি সংসদে কোরআন- সুন্নাহর বিপরীত আইন প্রণয়ন করে, তথা আল্লাহর বৈধ করা বস্তুকে অবৈধ সাব্যস্ত করে এবং অবৈধ সাব্যস্ত করা বস্তুকে বৈধ করে, তারা কেনো আল্লাহর বিপরীতে প্রভু হবে না? আর জনগণ কর্তৃক তাদের এ ধরনের আইনগুলো মেনে চলাকে কেনো 'ইবাদত' বলা হবে না? কেনো এরূপ পরিস্থিতিতে জনগণের কাজটা শিরক হবে না? তাছাড়া যে ভোটারদের ভোটের সাহায্যে সাংসদরা সংসদে গিয়ে আল্লাহ ও রাসুলের অবৈধকৃত বিষয়কে বৈধ সাব্যস্ত করছে এবং তাঁদের বৈধকৃত বিষয়কে অবৈধ ঘোষণা করছে, সে ভোটারদেরই বা কী হুকুম হবে?
হেফাজতে ইসলামের দাবিগুলো কেনো অসাংবিধানিক ছিল?
তারপর তুমি আমাকে প্রশ্ন করেছ 'আর কিছু বলবে কি?' হ্যাঁ, বলব। গণতন্ত্রের [অর্থাৎ 'জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস' এ বিষয়টির] পাশাপাশি আরেকটি বিষয় আছে। তা হলো, বাংলাদেশের জনগণের উল্লিখিত স্বাধীনতা নিঃশর্ত নয়; বরং তা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীন প্রতিষ্ঠার দাবি না করার শর্তের সাথে শর্তযুক্ত। এজন্যই শাপলা চত্বরে আল্লামা আহমদ শফি রাহিমাহুল্লাহর নেতৃত্বে ও 'হেফাজতে ইসলামে'র পতাকাতলে দেশের মুসলমানদের '১৩ দফা দাবি' ছিল সংবিধান বিরোধী। কারণ, তারা ইসলামের দণ্ডবিধি কায়েম করার দাবি জানিয়েছিল।
বাইরের আমি : বল কি! বিশাল সংখ্যক জনগণ হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে ১৩ দফার দাবিগুলো উত্থাপন করার অধিকার তাদের ছিল না? এমন বিশাল সংখ্যক জনগণ যদি কোরআন-সুন্নাহর দণ্ডবিধি কায়েম করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়, তাহলে কেনো তারা তা বাস্তবায়ন করা তো দূরের কথা, দাবি পর্যন্ত করতে পারবে না?
ভেতরের আমি : সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদে আছে : 'প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।'
বাইরের আমি : অনুগ্রহপূর্বক বিষয়টি ব্যাখ্যা করো।
ভেতরের আমি : চারটি মূলনীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিচালিত হয়। সেগুলো হলো- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র। সংবিধানের ভাষা হলো, 'জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এই নীতিসমূহ এবং তৎসহ এই নীতিসমূহে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।'
তাহলে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' দেশ পরিচালনার অন্যতম একটি মূলনীতি। আর ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে, ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করার নাম। এটা সুস্পষ্ট যে, কোরআন-সুন্নাহর দণ্ডবিধি কায়েম করার অধিকার সাব্যস্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এজন্যই বাংলাদেশের আদালতগুলোতে ইসলাম অনুযায়ী বিচার করার দাবি করা সংবিধান বিরোধী। এখন বিষয়টি বুঝে এসেছে?
বাইরের আমি : তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কীভাবে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, তিনি এদেশে কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন বাস্তবায়নের সুযোগ দিবেন না? এমন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে কি?
যে বিধানের আলোকে বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বিচারকার্য পরিচালিত হয়
ভেতরের আমি : বাংলাদেশ সরকারের সরকারি ওয়েবসাইট ও 'উইকিপিডিয়া'য় স্পষ্ট উল্লেখ আছে, যে আইনে বর্তমান বিচারপতিরা বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বিচার করছে, তার অধিকাংশই হচ্ছে হুবহু ঐ আইন, যার মাধ্যমে ব্রিটিশ বিচারপতিরা নিজেদের সময়ে এ দেশ শাসন করেছে। আর ইসলামি আইন অর্থাৎ যেসকল বিধান আল্লাহ তাআলা নাযিল করেছেন, সেগুলো ব্রিটিশদের সময় যেমন পরিত্যাজ্য ছিল, বর্তমানেও তেমনি প্রত্যাখ্যাত। পার্থক্য শুধু এই যে, দেশের বর্তমান সময়ের বিচারপতিরা বাংলাদেশী। আর সে যুগে বিচারকরা ছিল ব্রিটিশ।
তাই বাংলাদেশের আদালতগুলোতে এত অধিক পরিমাণ কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন থাকাবস্থায় এমন কথা প্রধানমন্ত্রী কীভাবে বললেন?! আমি মনে করি, তিনি এরকম কথা তখনই বলতে পারবেন যখন আমরা মেনে নেব, তিনি বাংলাদেশের আইনের ব্যাপারে অজ্ঞ। বলাবাহুল্য, এমনটা হওয়া অসম্ভব!
নির্বাচনী প্রহসন
বাইরের আমি : বুঝেছি, এদেশ যতদিন ধর্মনিরপেক্ষ থাকবে, ততদিন প্রধানমন্ত্রীর ওয়াদা পূর্ণ করা অসম্ভব। অবশ্য সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করা সম্ভব হলে, সম্ভব হতেও পারে! কিন্তু তা বহুত দূর কী বাত!! তাহলে কি তার উল্লিখিত প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী প্রহসন ছিল?
ভেতরের আমি : তুমি নিজেই এর উত্তর খুঁজে নাও!
[এরপর এখানে বেশ দূর পর্যন্ত যে কথাগুলো ছিল, সেগুলো ‘আকাবির-আসলাফের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র’ শিরোনামের অধীনে অতিবাহিত হয়েছে। তাই তা আর প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে না ।]
শায়খ ডক্টর আবদুল্লাহ আযযাম রাহিমাহুল্লাহর [১৩৬০-১৪১০ হি.] عُشّاقُ الحُوْرِ নামে একটি কিতাব আছে। ইসলামের দাবিদার প্রত্যেকের কিতাবটি অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। বাংলাভাষায় ‘কারা জান্নাতী কুমারীদের ভালোবাসে’ নামে তা প্রকাশিত হয়েছে।
বাইরের আমি : তোমার সাথে আলোচনা দীর্ঘতর করে তোমার ঘুম অনেক বিলম্বিত করে ফেলেছি। এখন আল্লাহর নাম নিয়ে ও তাঁকে স্মরণ করে ঘুমিয়ে পড়ো। তোমার মূল্যবান আলোচনার জন্য অনেক ধন্যবাদ। সত্যিই তোমার মত ভালো বন্ধু খুঁজে পাওয়া মুশকিল! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
ভেতরের আমি : না, না, ঠিক আছে। যে কোনো সময় তোমাকে সুস্বাগতম। ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় পাঠক! উপরের লাইনগুলোতে আমি আপনাদের জন্য আমার মনের গোপন কথাগুলো প্রকাশ করেছি এবং 'ভেতরের আমি'র সাথে 'বাইরের আমি'র নৈশালাপ সুস্পষ্টভাবে এবং কিছুটা বিস্তারিত ও ব্যাখ্যাসহ তুলে ধরেছি; যাতে যে ধ্বংস হবে, যেন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর ধ্বংস হয় এবং যে বেঁচে থাকবে, সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর যেন বেঁচে থাকে।
আল্লাহ তাআলা আমাকে, আপনাকে এবং ইসলামের দাবিদার প্রত্যেককে বুদ্ধিমান হওয়ার তাওফিক দান করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'বুদ্ধিমান হলো ঐ ব্যক্তি যে নিজের হিসাব নিল এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনের জন্য আমল করল। পক্ষান্তরে অক্ষম হলো ঐ ব্যক্তি, যে নিজকে তার কুপ্রবৃত্তির অনুসারী বানাল এবং আল্লাহর নিকট [দয়া ও ক্ষমার] আশা করল।' [সুনানে তিরমিজি : ২৪৫৯ ও মুসনাদে আহমদ : ১৭১৬৫]
টিকাঃ
১. ৬ই রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হি. [১৫ নভেম্বর ২০১৮ ঈ.] বৃহস্পতিবার।
১. ৪৮ নং পৃষ্ঠায় ‘জরুরিয়াতে দীনে’র ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
১. ইসলামের দণ্ডবিধি মোট তিন প্রকার: কিসাস, হদ ও তাজির। হদ সাত প্রকার : চুরির হদ, জিনার হদ, মদপানের হদ, অপবাদের হদ, ডাকাতির হদ, জাদুর হদ ও সমকামিতার হদ। বাংলাভাষায় 'ইসলামি শাসনব্যবস্থা' বিষয়ে, বরং পূর্ণাঙ্গ 'ইসলামি জীবনব্যবস্থা'র ধারণা নেওয়ার জন্য মুফতি তারেকুজ্জামান রচিত 'ইসলামি জীবনব্যবস্থা' গ্রন্থটি দ্রষ্টব্য।
১. তাকফির বিষয়ে সীমালঙ্ঘন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আলেম পাঠকগণ শায়খ আবু মুহাম্মদ আসেম মাকদিসি [হাফিজাহুল্লাহ] রচিত الرَّسَالَةُ الثَّلَاثِينِيَّةُ فِي التحذير مِنَ الغُلُو في التكفير
১. মৃত্যু: ২৯ মহররম ১৪৪২ হি. / ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ঈ. জুমাবার বাদ মাগরিব।
১. বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৮
২. ১৯১-১৯২ নং পৃষ্ঠায় ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
📄 ব্যাঙ কর্পোরেশনের একটি মূল্যায়ন
সাদ : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
যুবায়ের: ওয়া আলাইকুমুস সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সাদ : আমি জেনেছি, আমেরিকায় 'র্যান্ড কর্পোরেশন' নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। এটি আসলে কী ধরনের প্রতিষ্ঠান? এ বিষয়ে আমাকে কিছু বলুন, ভাইয়া!
যুবায়ের : এটি একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান বা থিংকট্যাঙ্ক। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মার্কিন সশস্ত্রবাহিনীকে বিভিন্ন তথ্য, গবেষণা ও বিশ্লেষণ সরবরাহ করার জন্য। প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকা ও অন্যান্য সরকার, যেমন ইসরাইলের সহযোগিতায় কাজ করে এবং তাদের সহায়তা করে।
সাদ : আমি শুনেছি, প্রতিষ্ঠানটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে। অনুগ্রহপূর্বক আমাকে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলুন।
যুবায়ের : র্যান্ড কর্পোরেশন অসংখ্য প্রাচ্যবিদদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে আমেরিকা ও অন্যান্য কাফের রাষ্ট্রের রণকৌশল ও স্ট্র্যাটেজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সমকালীন সময়ে আমেরিকা ও ইসলামের অন্যান্য শত্রুরা এই প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ফলাফল ও প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করছে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে।
সাদ : আমি 'উইকিপিডিয়া' থেকে জেনেছি, প্রাচ্যবিদ বলা হয় সেই পশ্চিমা পণ্ডিতকে, যিনি প্রাচ্য-সংশ্লিষ্ট জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রাচ্যের ভাষা ও সাহিত্যের বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখেন। তো প্রাচ্যবিদদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী?
যুবায়ের: এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সিরিয়ার বিশিষ্ট গবেষক আলেম ডক্টর মুস্তফা সিবাঈ রাহিমাহুল্লাহ [১৩৩৩-১৩৮৪ হি.] তাঁর فِي التَّشْرِيعِ الْإِسْلَامِيّ السُّنَّةُ وَمَكَانَتُهَا পুস্তিকায় প্রাচ্যবিদদের ইসলাম-গবেষণার নেপথ্যের যে লক্ষ্যগুলো তুলে ধরেছেন, তার অন্যতম হলো-
১. হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সত্যতা বিষয়ে সংশয় সৃষ্টি করা।
২. ইসলাম আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত দীন হওয়া বিষয়ে মানুষকে সন্দিহান করে তোলা।
৩. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের বিশুদ্ধতা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করা।
৪. ইসলামি ফিকহের স্বতন্ত্র গুরুত্বের বিষয়ে অবিশ্বাসের বীজ বপন করা।
৫. বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের সাথে আরবিভাষার তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
শায়খ মুস্তফা সিবাঈ রাহিমাহুল্লাহ তাঁর اَلْإِسْتِشْرَاقُ وَالْمُسْتَشْرِقُوْنَ পুস্তিকায় প্রাচ্যবিদদের সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। পুস্তিকাটি বাংলাদেশের একাধিক প্রকাশনী থেকেও মুদ্রিত হয়েছে।
সাদ : আল্লাহ তাআলা প্রাচ্যবিদ ও তাদের সহযোগীদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করুন এবং মুসলমানদের রক্ষা করুন। আমি অবশ্যই পুস্তিকাটি পাঠ করব এবং মুসলমানদের সামনে তাদের ষড়যন্ত্র ও দুষ্কৃতির মুখোশ উন্মোচন করব ইনশাআল্লাহ।
এখন আমরা আমাদের র্যান্ড কর্পোরেশন বিষয়ক আলোচনায় ফিরে আসি। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু বলুন।
যুবায়ের: প্রতিষ্ঠানটি ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পর মুসলমানদেরকে চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে।
সাদ : এই শ্রেণি-বিভাজন সম্পর্কে জানব। তবে আগে বলুন, আপনার কথার উৎস কী; যেন আপনার বক্তব্যের সত্যতার বিষয়ে আমি নিশ্চিত হতে পারি; আমার ভিতরে কোনো সংশয় না থাকে এবং নিশ্চিন্ত মনে আপনার কথা গ্রহণ করে নিতে পারি।
যুবায়ের : আমার কথার উৎস প্রতিষ্ঠানটিরই একটি প্রতিবেদন, যা 'সিভিল ডেমোক্রেটিক ইসলাম : পার্টনার্স, রিসোর্সেস, অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিস' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। তুমি নিজেই তা দেখে নিতে পার। আমি তোমাকে শুধু আমার উপর ভরসা করে গ্রহণ করার কথা বলব না। কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবির ভাষায় বলেছেন, 'বলে দিন, এই হলো আমার পথ, আমি আল্লাহর দিকে অন্তর্দৃষ্টির সাথে দাওয়াত দিই, আমি এবং আমার অনুসারীরা। আল্লাহ পবিত্র। আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। [সুরা ইউসুফ: ১০৮]
তবে আমি বলব, শত্রুর ব্যাপারে শত্রুর মূল্যায়ন প্রকৃত সত্য ও বাস্তবতা নির্ভর হয়ে থাকে। তাই আমাদের উচিত, শত্রুর মূল্যায়ন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং সেই আলোকে নিজেদের করণীয় নির্ধারণ করা। আমি মনে করি, আমাদের সম্পর্কে র্যান্ডের মূল্যায়ন, আমাদের কর্মপন্থা নির্ধারণে সহায়তা করবে। তদ্রূপ আমরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে চার শ্রেণির কোন শ্রেণির হয়ে দাঁড়াতে চাই- তা বুঝতেও সাহায্য করবে।
সাদ : আমি আপনার কথার উৎসের ব্যাপারে আস্বস্ত হয়েছি। এখন র্যান্ড কর্পোরেশন মুসলমানদের যে চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে, তা বলুন।
যুবায়ের : তারা প্রথম শ্রেণির নাম দিয়েছে ফান্ডামেন্টালিস্ট, অন্যভাষায় মৌলবাদী। র্যান্ড তা দ্বারা ঐ সকল মুসলমানকে বুঝিয়েছে, যারা গণতন্ত্র ও সমকালীন পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান করে; নববি পদ্ধতিতে ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর করার স্বপ্ন দেখে। এবং এ লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কোরআন মাজিদের সুরা বাকারার ২০৮ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদেরকে ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ করার আদেশ করেছেন। তো যারা আল্লাহর এ আদেশ পালন করে পুরোপুরিভাবে ইসলামে প্রবেশ করে; যারা ইসলামকে শাসনব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা ও অর্থায়নব্যবস্থাও মনে করে; এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে না, র্যান্ডের পরিভাষায় তারা হলো ফান্ডামেন্টালিস্ট বা মৌলবাদী।
র্যান্ড কর্পোরেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ফান্ডামেন্টালিস্ট তথা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশকারী মুসলমানরা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের প্রথম ও প্রধান শত্রু। পশ্চিমারা নিজেদের বিরোধী কোনো জীবনব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে মোটেও প্রস্তুত নয়। তাই পশ্চিমাদের প্রতি র্যান্ডের পরামর্শ হলো, যেকোনো উপায়ে এ শ্রেণির মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করুন; কারণ, তারাই পাশ্চাত্য সভ্যতা ও আন্তর্জাতিক পশ্চিমা শাসনব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
সাদ : দ্বিতীয় শ্রেণি কারা?
যুবায়ের : র্যান্ড দ্বিতীয় শ্রেণির নাম দিয়েছে ট্র্যাডিশনালিস্ট বা ঐতিহ্যবাদী মুসলমান। এ শব্দ দ্বারা তারা ইসলামের ঐতিহ্য ধারণকারী ঐসকল মুসলিম ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে বুঝিয়েছে; যাদের তৎপরতা মসজিদের ইমামতি, জুমার খুতবা প্রদান, শিক্ষাদান, ফতোয়া প্রদান ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এ ছাড়া তাঁদের তেমন কোনো কাজ করতে হবে। বস্তুত নববি পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত খেলাফতব্যবস্থা ব্যতীত পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জীবনব্যবস্থা কার্যকর করা কিছুতেই সম্ভব নয়। বিদ্যমান পতন থেকে মুসলিম উম্মাহর উত্তরণের পথ জানার জন্য হজরত আলি মিয়াঁ নাদাবি রাহিমাহুল্লাহ রচিত 'মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো?' গ্রন্থটি অবশ্যই যেন উম্মাহর ভবিষ্যত কাণ্ডারীদের অধ্যয়ন ও আত্মস্থ হয়ে যায়। আল্লাহ সহজ করুন! প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন, 'জিহাদ আগে, না খেলাফত প্রতিষ্ঠা আগে?' প্রশ্নটির উত্তর ২৭৫-২৭৬ নং পৃষ্ঠায় দেখুন। নেই। অন্য ভাষায়, যারা ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা মনে করেন না; বরং শুধু কিছু বিশ্বাস এবং কতিপয় ইবাদত ও রুসম-রেওয়াজের সমষ্টি মনে করেন।
র্যান্ডের পর্যবেক্ষণ বলছে, এরা পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্য মৌলিকভাবে হুমকি নয়। উপরন্তু র্যান্ডের প্রত্যাশা, এরা পশ্চিমাদের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
সাদ : এর অর্থ কি এই, র্যান্ড এ সকল মুসলিম ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত! র্যান্ড তাদেরকে ভয় করে না?!
যুবায়ের : না, র্যান্ড কর্পোরেশন এদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয়। তাই র্যান্ড একইসাথে এ ব্যাপারেও সতর্ক করেছে, ফান্ডামেন্টালিস্ট ও ট্র্যাডিশনালিস্টদের মধ্যে ঐক্য হতে দেওয়া যাবে না। কারণ, ট্র্যাডিশনালিস্টরা যদি ফান্ডামেন্টালিস্টদের সঙ্গে মিলিত হয়, তাহলে তাঁদের পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তখন তারা সাহাবায়ে কেরামের অনুকরণে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর করার চেষ্টা করবে। আর তা পশ্চিমাদের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে।
র্যান্ড ঐতিহ্যবাদী মুসলিম ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত না থাকার কারণ হলো, সাধারণ মানুষের মাঝে তাঁদের বিরাট প্রভাব রয়েছে। তাঁদের জন্য জনসাধারণের নিকট পৌঁছা খুবই সহজ। মানুষ তাঁদের বক্তব্য নিরবে মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে। একটি ছোট্ট মাহফিল বা ক্ষুদ্র সমাবেশের আয়োজন করা কত কঠিন! স্থান নির্ধারণ করা, পোস্টার মুদ্রণ, দেয়ালে সাঁটানো ইত্যাদি কতকিছু! কিন্তু জনসাধারণ গোসল করে গায়ে সুগন্ধি মেখে নিজেদের কাছে থাকা সর্বোত্তম পোশাকটি পরিধান করে, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ঐতিহ্যবাদী ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সামনে বসে তাঁদের বক্তব্য শ্রবণ করে।
সাদ : তাহলে মার্কিন সরকারের জন্য র্যান্ডের প্রস্তাব কী?
যুবায়ের : মার্কিন সরকার ও তার মিত্রদের প্রতি র্যান্ডের প্রস্তাব ও পরামর্শ হচ্ছে, পূর্ণাঙ্গ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন লালনকারী মুসলমানদের থেকে ঐতিহ্যবাদী আলেমদেরকে দূরে রাখতে হবে। ঐতিহ্যবাদী আলেমদেরকে বিভিন্ন ফিকহি ও মাযহাবগত বিতর্কে লিপ্ত রাখতে হবে এবং ক্রমাগত এজাতীয় বিতর্কের নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করতে হবে।
সাদ : তৃতীয় শ্রেণি কারা?
যুবায়ের : র্যান্ডের পরিভাষা অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণি হলো মডারেট মুসলমান। এরা হলো মুসলমান নামধারী ঐ সকল লোক, যারা চায়- মুসলিম বিশ্ব বৈশ্বিক আধুনিকতার অংশ হয়ে যাক এবং নবি ও সাহাবিগণের জীবনে প্রতিষ্ঠিত ইসলাম থেকে মুসলমানগণ সম্পর্কহীন হয়ে পড়ুক, যেন মুসলমান পরিচয় ধারণ করলেও দেশের জনগণ পশ্চিমা আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে।
সাদ : এ শ্রেণির 'মুসলমান'দের ব্যাপারে র্যান্ডের কোনো পরামর্শ আছে কি?
যুবায়ের: হ্যাঁ, অবশ্যই। এ ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসন ও তার মিত্রদের প্রতি র্যান্ডের পরামর্শ হচ্ছে, মডারেট মুসলিমদের সহযোগিতা করতে হবে এবং আর্থিকভাবে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এছাড়াও প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ-সুবিধা তাদেরকে প্রদান করতে হবে।
র্যান্ডের আরও সুপারিশ হচ্ছে, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের প্রশংসা ফলাও করে প্রচার করতে হবে। কেননা সাধারণ মুসলমানদের মাঝে তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাই মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের উপস্থিতিকে বড় করে দেখানো উচিত; যেন তারা সাধারণ মানুষের নিকট সহজে পৌঁছতে পারে।
কারণ, জনসাধারণের নিকট পৌঁছার জন্য তাদের কাছে অন্য কোনো মাধ্যম নেই। তাদেরকে ইমাম হিসেবে মসজিদে কে প্রবেশ করতে দিবে? তাদের পেছনে কে নামাজ পড়বে? কে তাদের খুতবা শোনবে? জুতা মারা শুরু হয়ে যাবে না! তাই মডারেটদের ব্যাপারে র্যান্ডের পরামর্শ হচ্ছে, তাদেরকে মিডিয়ায় নিয়ে আসা। এর উপরই বর্তমানে আমল চলছে।
সাদ : মুসলমানদেরকে মডারেট বানানোর লক্ষ্যে র্যান্ডের বিশেষ কোনো তৎপরতা আছে কি?
যুবায়ের : বলো কি! সে এক ভয়ংকর তৎপরতা। তাদের এ বিষয়ক ভয়াবহ এজেন্ডা ও ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের বিবরণ এসেছে 'বিল্ডিং মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্কস শিরোনামে ২০০৭ সালে প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানটির এক اِسْتِرَاتِيجِيَّاتُ غَرْبِيَّةٌ لِاحْتِوَاءِ الإسلام : قِرَاءَةُ فِي تَقْرِيرِ رَانْدْ ٢٠٠٧ নামে প্রতিবেদনটির আরবিভাষায় একটি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত রয়েছে। তাতে র্যান্ডের আলোচ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রায়োগিক নীতি ও কলাকৌশল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ তুলে ধরা হয়েছে।
সাদ : চতুর্থ শ্রেণি কারা?
যুবায়ের : চতুর্থ শ্রেণি হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা। এরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ইসলামের বিধানগুলো অস্বীকার করে। তাদের মতে রাষ্ট্র ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে পরিচালিত হওয়া আবশ্যক। তারা মনে করে, ইসলামধর্ম কিছু বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি ছাড়া কিছুই নয়। এ শ্রেণির লোকেরা পূর্ব থেকেই পশ্চিমাদের পকেটস্থ হয়ে আছে।
সাদ : র্যান্ড কর্পোরেশন তার অর্থায়নকারীদের কী পরামর্শ দেয়?
যুবায়ের : ইসলামের সাথে সভ্যতার যুদ্ধে বিজয়ী থাকার জন্য অর্থায়নকারী ও সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি র্যান্ডের পরামর্শ হচ্ছে, তারা যেন মডারেট ও ধর্মনিরপেক্ষদেরকে সকল ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে; আর ফান্ডামেন্টালিস্টদের কঠোরভাবে মোকাবেলা করে। পাশাপাশি ট্র্যাডিশনালিস্টদেরকে তাদের ফিকহি ও মাজহাবগত বিতর্কে লিপ্ত রাখে। র্যান্ড কর্পোরেশনের মতে মুসলমানদের উপর পশ্চিমাদের বিজয় লাভের এটিই একমাত্র পন্থা।
সাদ : র্যান্ড কর্পোরেশন কখনো তার ষড়যন্ত্রে সফল হবে না, ইনশাআল্লাহ।
যুবায়ের: হ্যাঁ, অবশ্যই। সফল হওয়া তাদের পক্ষে কীভাবে সম্ভব, যখন আল্লাহ তাআলা ইসলামের হেফাজতের দায়িত্ব নিজেই নিয়েছেন! ইরশাদ করেছেন, [অর্থ] 'নিশ্চয় আমিই অবতীর্ণ করেছি যিকর [কোরআন] এবং আমিই তার হেফাজতকারী ।' [সুরা হিজর : ৯]
তবে আমাদের দায়িত্ব হলো, সাধারণ মানুষের সামনে প্রতিষ্ঠানটির মুখোশ উন্মোচন করা এবং তাঁদেরকে কোরআন পাকের এই আয়াত শোনানো ও বুঝানো- [অর্থ] 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে প্রবেশ করো পরিপূর্ণরূপে এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।' [সুরা বাকারা : ২০৮]
সাদ : শুকরান, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
যুবায়ের : আফওয়ান, ওয়া আলাইকুমুস সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
টিকাঃ
১. Civil democratic Islam: partners, resources, and strategies [নাগরিক গণতান্ত্রিক ইসলাম : অংশীদার, সম্পদ ও কৌশল] الإسلامُ الَّذِي يُرِيدُهُ الغَرْبُ : دِرَاسَةٌ تَحْلِيْلِيَّةً نَقْدِيَّةٌ لِتَقْرِيرِ مُؤَسَّسَةِ رَائِدُ : إسلام حَضَارِيٌّ دِيمُقراطِيُّ شُرَكَاءُ وَمَوَارِدُ وَاسْتِرَاتِيْجِيَّاتُ ৩৩০ পৃষ্ঠায় একটি পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়েছে। পর্যালোচনাটি মূলত মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের الدَّعْوَةُ وَأَصُوْلُ الدَّيْنِ অনুষদ থেকে মাস্টার্সডিগ্রি লাভের থিসিসরূপে তৈরি হয়েছে। সৌদিআরবের مَرْكّز الفِكْرِ المُعَاصِرِ নামক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে তা প্রকাশিত হয়েছে।
১. পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করার জন্য সঠিক আকিদাসমূহের জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি ইসলামের শরিয়াব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, অর্থায়নব্যবস্থা- এককথায় পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জীবনব্যবস্থার জ্ঞানার্জন করতে হবে। সর্বোপরি নববি পদ্ধতিতে খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করতে হবে। বস্তুত নববি পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত খেলাফতব্যবস্থা ব্যতীত পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জীবনব্যবস্থা কার্যকর করা কিছুতেই সম্ভব নয়। বিদ্যমান পতন থেকে মুসলিম উম্মাহর উত্তরণের পথ জানার জন্য হজরত আলি মিয়াঁ নাদাবি রাহিমাহুল্লাহ রচিত 'মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো?' গ্রন্থটি অবশ্যই যেন উম্মাহর ভবিষ্যত কাণ্ডারীদের অধ্যয়ন ও আত্মস্থ হয়ে যায়। আল্লাহ সহজ করুন! প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন, 'জিহাদ আগে, না খেলাফত প্রতিষ্ঠা আগে?' প্রশ্নটির উত্তর ২৭৫-২৭৬ নং পৃষ্ঠায় দেখুন।
১. 'পশ্চিমাদের গণতন্ত্র' বলা হয়েছে, গণতন্ত্র পশ্চিমাদের আবিষ্কার হওয়ার কারণে। এটা কতিপয় মুসলিম নামধারী মানুষের তথাকথিত 'ইসলামি গণতন্ত্রে'র বিপরীতে বলা হয়নি। ইসলামে কোনো গণতন্ত্র নেই। 'আকাবির- আসলাফের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র' শীর্ষক সংলাপ দ্রষ্টব্য।
১. 'মিডিয়া: প্রতারক চিন্তানৈতিক অভিযান' সংলাপের ১৩তম প্রোটোকলের অন্তর্ভুক্ত আলোচনাটি পাঠ করলে মুসলমানদেরকে 'পশ্চিমা আধুনিকতা'র রঙে রঙিন করার কিছু ষড়যন্ত্র জানা যাবে। ২৪৮-২৪৯ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
১. Building Moderate Muslim networks
২. اِسْتِرَاتِيجِيَّاتُ غَرْبِيَّةٌ لِاحْتِوَاءِ الإسلام : قِرَاءَةُ فِي تَقْرِيرِ رَانْدْ ٢٠٠٧ নামে প্রতিবেদনটির আরবিভাষায় একটি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত রয়েছে।
১. আরবি পর্যালোচনাটি প্রকাশ করেছে মিশরের রাজধানী কায়রোর অবস্থিত المركز العربي للدراسات الإنسانية নামক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।
📄 মিডিয়া : প্রতারক চিন্তানেতির অভিযান
শারাফাতুল্লাহ : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
সাইফুল্লাহ : ওয়া আলাইকুমুস সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
শারাফাতুল্লাহ: ভাইয়া! মিডিয়া সম্পর্কে কিছু বলো।
সাইফুল্লাহ : মিডিয়ার আলোচনা অনেক বিস্তৃত। মিডিয়া বা গণমাধ্যম বলতে এখানে আমার উদ্দেশ্য পশ্চিমা মিডিয়া। বর্তমানে এই পশ্চিমা মিডিয়াই পুরোবিশ্বে প্রভাব বিস্তার করছে ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। মিডিয়া বলতে বুঝায় বইপত্র, রেডিও- টেলিভিশন, পত্রপত্রিকা, সিনেমা ও বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ ইত্যাদি।
শারাফাতুল্লাহ : দয়া করে, একটু খুলে বলো।
সাইফুল্লাহ : পশ্চিমা মিডিয়া বস্তুত এমন এক মাধ্যম, যাকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, মুসলমানদের অভিন্ন মিত্রতাকে একাধিক জাহিলি মিত্রতায় বিভক্ত করার জন্য ব্যবহার করে চলেছে। কেননা যখন ইসলামের প্রতি মুসলমানদের মিত্রতা বাকি থাকবে না, তখন তাদেরকে যেকোনো চিন্তা ও পরিস্থিতি গেলানো সহজ হবে; তাতে তাদের যতই বশ্যতা ও পরাজয় থাকুক।
শারাফাতুল্লাহ : সাম্রাজ্যবাদ মানে কি? একটু বলবে?
সাইফুল্লাহ : সাম্রাজ্যবাদ হলো কোনো দেশ বা দলের নিজেদের স্বার্থে কোনো জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করা, তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ ব্যবহার করা।
শারাফাতুল্লাহ: ভাইয়া! পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য কী?
সাইফুল্লাহ : শায়খ মুহাম্মদ আল-গাযালি রাহিমাহুল্লাহর [১৩৩৫- ১৪১৬ হি.) মতে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য হলো এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা নিজেদের মুসলিম পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করবে, এবং ইসলামের কোনো হুকুম পালন করা অবস্থায় কেউ তাদেরকে দেখুক, তা অপছন্দ করবে; বিশেষত উচ্চশিক্ষিত ও ঐ শ্রেণির সন্তানদেরকে এভাবে গড়ে তোলা তাদের লক্ষ্য, যারা ভবিষ্যতে দেশের শাসন ও কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে প্রস্তুত হচ্ছে।
শারাফাতুল্লাহ : সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কী কী উপায় গ্রহণ করে?
সাইফুল্লাহ : এ বিষয়ে 'ইসলামে শত্রুতা-মিত্রতা' গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে, সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যেসব উপায় গ্রহণ করে, সেসবের অন্যতম হলো- ১. শিক্ষাদীক্ষা, ২. মিডিয়া, ৩. প্রাচ্যবিদদের বইপত্র প্রচার-প্রসার করা, ৪. মুসলমানদের মাঝে দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদ এবং বিশ্বজনীনতা ও মানবতাবাদ ইত্যাদি অনৈসলামিক মতবাদগুলোর ব্যাপক প্রচারণা চালানো।
শারাফাতুল্লাহ : এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা কোথায় পাব?
সাইফুল্লাহ : আমার আগের কথা থেকে স্পষ্ট, 'ইসলামে শত্রুতা-মিত্রতা' গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে এ বিষয়ে কিছুটা ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ এসেছে। তুমি ওখানে দেখে নিতে পার।
শারাফাতুল্লাহ : ভাইয়া! মিডিয়ার কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে কিছু বলো।
সাইফুল্লাহ : সমাজের সকল স্তরে মিডিয়ার বিরাট ও গভীর প্রভাব রয়েছে। ইসলামের শত্রুরা এর গুরুত্ব ও প্রভাব সম্বন্ধে পূর্ব থেকেই অবগত থাকার কারণে তার উপর নিজেদের আধিপত্যবিস্তার সুদৃঢ় করেছে; এবং এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংস ও ইসলাম থেকে বের করার নীলনকশা এঁকেছে।
শারাফাতুল্লাহ : মিডিয়ার প্রভাব সম্পর্কে আরো কিছু জানতে চাই।
সাইফুল্লাহ : পশ্চিমা মিডিয়া মুসলিম দেশগুলোতে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তীব্র যুদ্ধ ও ব্যাপক প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে; যা এখনো অব্যাহত আছে। পশ্চিমা মিডিয়া কাফেরদের সঙ্গে মুসলমানদের মিত্রতার বিষয়টি সুন্দর ও প্রিয় করে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মুসলমানদের মাঝে অশ্লীলতা প্রসারের প্রতিও সচেষ্ট আছে।
শারাফাতুল্লাহ : মিডিয়া যেসব মিশন বাস্তবায়নে মনোযোগী হয়েছে, সে সম্পর্কে কিছু বলবে!
সাইফুল্লাহ : পশ্চিমা মিডিয়া বিশেষত যেসব মিশনে মনোযোগী হয়েছে, তা হলো- অশ্লীলতা-উলঙ্গপনা ছড়ানো, পাপ-অন্যায়ের প্রতি প্ররোচিত করা, ঈমান-আকিদার ভিত নড়বড় করা ও আখলাক-চরিত্র ধ্বংসের লক্ষ্যে পৃথিবীতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করা। যখন মৌলিক ভিত্তিদুটো তথা ঈমান ও আখলাক ধ্বংস হয়ে যাবে, তখন কীভাবে একটি জাতির আপন ঈমান-আখলাকের উপর সুদৃঢ় থাকার আশা করা যায়?!
শারাফাতুল্লাহ : মিডিয়া সম্পর্কে তোমার সর্বশেষ মূল্যায়ন কী?
সাইফুল্লাহ : পশ্চিমা মিডিয়া সম্পর্কে আমার যা বলার আছে, তা সংক্ষেপে এই- তা অন্যায় কাজকে ন্যায় হিসেবে প্রচার করে এবং মানুষকে তাতে লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। আবার ভালোকে মন্দরূপে প্রকাশ করে এবং মানুষকে তা থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করে।
শারাফাতুল্লাহ : তোমার এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ আছে?
সাইফুল্লাহ : তোমার কি 'জায়নবাদী দার্শনিকদের প্রোটোকলস' সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে?
শারাফাতুল্লাহ : না, ভাইয়া! এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। যদি কিছু বলতে!
সাইফুল্লাহ : 'প্রোটোকলস' শব্দের অর্থ 'মূলনীতিসমূহ'। আর 'জায়ন' অর্থ দুর্গ। 'জায়ন' মূলত ঐ দুই টিলার একটি টিলার নাম, যেই টিলাদুটির উপর প্রাচীন 'জেরুজালেম' নগরী অবস্থিত। 'জায়নবাদী দার্শনিকদের প্রোটোকলস' দ্বারা ইহুদিদের প্রস্তুতকৃত একটি গোপন নথি উদ্দেশ্য, যাতে সারাবিশ্বে তাদের অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ নথিতে ২৪টি মূলনীতি রয়েছে।
শারাফাতুল্লাহ : আচ্ছা! আলোচ্য গোপন নথিটি কখন কোথায় প্রকাশ পেয়েছে?
সাইফুল্লাহ : শোনো, উইকিপিডিয়ায় 'জায়নবাদী দার্শনিকদের প্রোটোকলস' শীর্ষক প্রবন্ধে এসেছে, 'জায়নবাদী দার্শনিকদের প্রোটোকলস' যাকে অন্যভাষায় বলে 'বিশ্ব অভিযানের জন্য ইহুদি প্রোগ্রাম', সর্বপ্রথম ১৯০১ সালে প্রকাশিত হয়। রাশিয়ার ২য় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে প্রকাশিত 'যানামিয়া' পত্রিকা প্রথমে তা প্রকাশ করেছে।
শারাফাতুল্লাহ : এর অর্থ কি এই, ইহুদিদের এসকল প্রোটোকল ১৯০১ সালের পূর্বেই তৈরি করা হয়েছে?
সাইফুল্লাহ : বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
শারাফাতুল্লাহ : আগের প্রশ্নে ফিরে আসি। তুমি বলেছ, মিডিয়া অন্যায় কাজকে ভালো হিসেবে প্রমোট করে, আর ন্যায়কে অন্যায়রূপে পেশ করে। এ দাবির পক্ষে তোমার কাছে কোনো প্রমাণ আছে?
সাইফুল্লাহ : আমার এতোক্ষণের আলোচনা ছিল ভূমিকাস্বরূপ। এখন তোমার এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়।
শারাফাতুল্লাহ : দয়া করে, বলো। আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন!
সাইফুল্লাহ : যে ব্যক্তি 'জায়নবাদী দার্শনিকদের প্রোটোকলস' ভালো করে পাঠ করবে, সে মিডিয়া সম্পর্কে অক্ষরে অক্ষরে আমার মন্তব্যের প্রমাণ পেয়ে যাবে।
শারাফাতুল্লাহ : এ বিষয়ে 'জায়নবাদী দার্শনিকদের প্রোটোকলস'-এ কী এসেছে?
সাইফুল্লাহ : নথিটির ১৩তম প্রোটোকলে এসেছে- 'অইহুদি কোনো জাতি যেন আমাদের কোনো নতুন কর্মপন্থার মুখোশ নিজ উদ্যোগে উন্মোচন করতে না পারে, সে জন্য আমরা তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের বিনোদন ও খেলায় ব্যস্ত রেখে ভুলিয়ে রাখব।' 'বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের প্রতি মানুষকে আহ্বান করে অচিরেই আমরা পত্রপত্রিকায় শিল্প, খেলাধুলা ইত্যাদি বিভিন্ন পরিকল্পনার বিজ্ঞাপন দেওয়া আরম্ভ করব।'
'এই নতুন প্রমোদ-বিনোদন অইহুদি জনসাধারণের মেধাকে নিশ্চিতরূপে সেসব বিষয় থেকে ভুলিয়ে রাখবে, যেসব বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের মতানৈক্য রয়েছে। আর জনসাধারণ যখন ধীরেধীরে স্বাধীন চিন্তাশক্তির ক্ষমতা হারিয়ে বসবে, তখন আমাদের সঙ্গে সকলেই অভিন্ন সুরে শ্লোগান দিবে- আমরা ঐ অনন্য সমাজের অংশ হব, যারা নব চিন্তার জগতে প্রাগ্রসর।
বুঝতে পেরেছো, শারাফাতুল্লাহ! উঠতি বয়সি কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীদের জন্য মিডিয়ায় সম্প্রচারিত আকর্ষণীয় এসব প্রমোদ-বিনোদন, খেলাধুলা ও টুর্নামেন্ট প্রভৃতির লক্ষ্য কী?!
শারাফাতুল্লাহ : আল্লাহ! কী ভয়াবহ বাস্তবতা শুনালে!! এ তো শুধু কিছু প্রমোদ-বিনোদন, খেলাধুলা বা টুর্নামেন্ট নয়; বরং আল্লাহর ক্রোধভাজন ইহুদিদের ঐসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশবিশেষ, যেগুলো তারা অনেক আগেই অর্থাৎ কমপক্ষে সোয়া শতাব্দি পূর্বে প্রচলিত মিডিয়ার উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের যুগেই করে ফেলেছে!
আচ্ছা, এখন বলো, ইহুদিরা কীভাবে তাদের এই পরিকল্পনা মুসলমানদের মাঝে বাস্তবায়ন করছে?
সাইফুল্লাহ : তারা মুসলিম সমাজে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এ সমাজেরই এমন কিছু মানুষকে নির্বাচন করছে, তাদের প্রতি যাদের বন্ধুত্ব ও মিত্রতার ব্যাপারে তাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
শারাফাতুল্লাহ : তুমি কি মনে কর, ইহুদিরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সফল হয়েছে?
সাইফুল্লাহ : আমি তোমার এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেব না। তবে আমি একটু আগে তাদের নথির ১৩তম প্রোটোকলের কিছু কথা শুনিয়েছিলাম। তারই আরেকটি অংশ বলছি। শোনো। তারা লিখেছে- 'বিবেকশূন্য নিরক্ষর মাথাগুলো সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যেতে আমরা পরিপূর্ণ সফল হয়েছি। এখন এই নিরক্ষরদের মাঝে এমন কোনো বিবেক নেই, যা বুঝতে সক্ষম হবে যে, সর্বাবস্থায় “প্রগতি” শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি এবং ধোঁকা ও প্রতারণা।'
শারাফাতুল্লাহ : শয়তানের বন্ধু ও দলের উপর আল্লাহর অভিশাপ!! আল্লাহ আমাদেরকে তাদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করুন। ইহুদিদের চেয়ে ধূর্ত আর কোনো জাতি আমি দেখিনি! আচ্ছা, আমার একটি প্রশ্ন আছে; এই হঠকারী শত্রুদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য আমাদের সমাজেরই কিছু মানুষ কেনো এত উঠেপড়ে লেগেছে?
সাইফুল্লাহ : বিষয়টা খুবই দুঃখজনক ভাই আমার! ইহুদিদের এই চিন্তানৈতিক অভিযানে বিদ্বেষ, দুষ্ট অভিজ্ঞতা ও কূট পরিকল্পনার পাশাপাশি সময়ানুবর্তিতা ও উপযোগী বিষয়ের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি আকর্ষক বিভিন্ন গুণও আছে; পার্থিব অনেক সুযোগ-সুবিধা তো আছেই। তাই আমাদের সমাজের অনেক নামধারী মুসলমান এসকল গুণে মুগ্ধ হয়ে ও সুবিধার প্রলোভনে পড়ে তাদের পরিচালিত মিডিয়ায় কাজ করে।
এরা ইহুদি কুলাঙ্গারদের চক্রান্তগুলো বুঝতে না পারার কারণ হলো, মুসলমান নাম ধারণ করলেও ইসলামি জীবনব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস তাদের মধ্যে অনুপস্থিত, এবং দীনি আত্মমর্যাদাবোধ থেকে তারা বহু দূরে। আর আল্লাহ তাআলা কোনো জাতি থেকে তাঁর নেয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত উঠিয়ে নেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থা বদলে ফেলে।
শারাফাতুল্লাহ : ভাইয়া! যদি কিছু উপদেশ দিতে! যখন মিডিয়ায় প্রমোদ-বিনোদন, খেলাধুলা ও বিভিন্ন টুর্নামেন্ট সম্পর্কিত কোনো বিজ্ঞাপন আমার চোখে পড়বে, তখন আমার করণীয় কী হবে?
সাইফুল্লাহ : হ্যাঁ, আমার উপদেশ হলো, তুমি মিডিয়ার উদ্ভাবন ও প্রচলন করার লক্ষ্য সম্পর্কিত মিডিয়া আবিষ্কারক ও প্রবর্তক ইহুদিদের বক্তব্য স্মরণ রাখবে। আল্লাহর কাছে পানাহ চাইবে এবং গুনাহের উপকরণ থেকে দূরে থাকবে। গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য খাঁটি মনে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার পর, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির তুলনায়ও ফলদায়ক বিষয় হলো, গুনাহের আসবাব ও উপকরণ থেকে দূরে থাকা। আল্লাহ তাওফিকদাতা। তিনিই সুপথ দেখান।
তোমার জন্য আমার উপদেশ এ-ও যে, তুমি মসজিদের মিম্বর এবং মাহফিল-সমাবেশ ইত্যাদির মঞ্চ থেকে যুবকদের জাগিয়ে তুলবে, ইহুদিদের পরিকল্পনা সম্বন্ধে তাদেরকে সতর্ক করবে, এবং এই কুলাঙ্গারদের বিছানো ফাঁদে না পড়তে আহ্বান করবে। আল্লাহ আমাকে, তোমাকে ও সকল মুসলমানকে শয়তান ও তার বন্ধুদের সকল ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করুন; এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে শয়তান ও তার বন্ধুমহলের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করুন। আমিন!
শারাফাতুল্লাহ : দাওয়াতের কাজে মিডিয়াকে ব্যবহার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব কি?
সাইফুল্লাহ : হুম, প্রিয় ভাই আমার! দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা অবশ্যই সম্ভব এবং তার ভূমিকা অপরিসীম। তবে তা হতে হবে কোনো অন্তরালোকসম্পন্ন মুসলিহ-মুযাক্কি আলেমের তত্ত্বাবধানে। তাফাক্কুহ ফিদ্দীন [দীনের বুঝ ও সমঝ] অর্জন অব্যাহত রেখে এমন কারো তত্ত্বাবধানে এসব মাধ্যমেও লিখে ও বলে আল্লাহর শত্রুদের ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে উম্মাহকে সতর্ক করো, স্বচ্ছ আকিদা ও আখলাকের দিকে ফিরিয়ে আনো, এবং আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জয় লাভের স্থায়ী পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করো। আল্লাহ আমাকে, তোমাকে এবং উম্মাহর সকল কাণ্ডারীকে তাওফিক দান করুন!
শারাফাতুল্লাহ: ভাইয়া! 'প্রযুক্তি' কী জিনিস?
সাইফুল্লাহ : প্রযুক্তি হলো কিছু প্রায়োগিক কৌশল, যা মানুষ তার পরিবেশের উন্নয়নকার্যে ব্যবহার করে। প্রযুক্তি হলো জ্ঞান ও যন্ত্রের ব্যবহার কৌশল, যা মানুষ নিজেদের জীবন সহজ করার প্রয়োজনে ব্যবহার করে। এ বিষয়ে الْمُوَطَّأُ فِي العَرَبِيَّةِ الوَظيفِيَّةِ কিতাবে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে। তোমার সঙ্গে কোনো সুযোগে এ সম্বন্ধে কথা বলব ইনশাআল্লাহ।
শারাফাতুল্লাহ : কিভাবে মিডিয়া সম্পর্কে এমন দুর্লভ তথ্যভাণ্ডার আমার কাছে পেশ করা তোমার জন্য সহজ হলো? তুমি তো ভারি বিচক্ষণ!!
সাইফুল্লাহ : মিডিয়া সম্পর্কে তোমার প্রশ্নের উত্তরে আমি যা বলেছি, তার বড় একটা অংশ শায়খ মুহাম্মদ বিন সাঈদ কাহতানি রাহিমাহুল্লাহ রচিত ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা ফিল ইসলাম' [ইসলামে শত্রুতা-মিত্রতা] কিতাবের তৃতীয় অধ্যায়ে এসেছে। কিতাবটি ‘মাহাদুশ শায়খ ফুয়াদ লিদ্দিরাসাতিল ইসলামিয়া ঢাকা’য় ১৪৪০-৪১ শিক্ষাবর্ষে আমি দরসে পড়েছি। তাই আমার পক্ষে তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া সহজ হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমার এ বিষয়ের উস্তাদজিকে উত্তম বিনিময় দান করুন। আমিন!
শারাফাতুল্লাহ : আল্লাহ আমাকে তোমার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করার ও কিতাবটি থেকে অধিক উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন। এবার নির্জনে তাকওয়া অবলম্বন বিষয়ে আমাকে কিছু উপদেশ দাও।
সাইফুল্লাহ : 'কালিমায়ে তাইয়েবা : বিশ্লেষণ ও ঈমান ভঙ্গের কারণ' বইয়ে 'নির্জনে তাকওয়া অবলম্বনে কিছু পদক্ষেপ' শিরোনামের অধীনে এই উপদেশগুলো দেওয়া হয়েছে-
■ আনন্দ-ফুর্তির অবসানকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করা।
■ আল্লাহ তাআলার হাজির-নাজির হওয়ার কথা স্মরণ রাখা। অর্থাৎ তাঁর সর্বত্র বিরাজমান থাকা ও সবকিছু দেখার অনুভূতি জাগ্রত রাখা।
■ সৎসঙ্গ গ্রহণ করা।
■ নিজের আমলের মুহাসাবা বা আত্মসমালোচনা করা।
■ প্রতিদিন আখলাক ও তাকওয়া বিষয়ে অন্ততপক্ষে ১ টি উপদেশ শোনা বা কিতাবে পড়া।
■ গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রতিদিন চোখের অশ্রু প্রবাহিত করা।
■ গুনাহের আশঙ্কার মুহূর্তগুলোতে একাকি না থাকা।
■ বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার না করা।
اللَّهُمَّ اجْعَلْ سَرِيرَتِي خَيْرًا مِنْ عَلَانِيَتِي وَاجْعَلْ عَلَانِيَتِي صَالِحَةً.
হে আল্লাহ! তুমি আমার গোপন অবস্থাকে প্রকাশ্য অবস্থার তুলনায় উত্তম বানাও এবং আমার প্রকাশ্য অবস্থাকে ভালো বানাও! [সুনানে তিরমিযি : ৩৬৬৭]
শারাফাতুল্লাহ : অনেক অনেক শুকরিয়া ভাইয়া! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
সাইফুল্লাহ : ঠিক আছে। ওয়া আলাইকুমুস সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
টিকাঃ
১. كِفَاحُ دِین পৃ. ১৪৭, তৃতীয় সংস্করণ। দারুল কুতুবিল হাদিসা, মিশর।
২. টীকাটি ২৮২-২৮৪ নং পৃষ্ঠায় পাঠ করুন।
৩. টীকাটি ২৮২ নং পৃষ্ঠায় পাঠ করুন।
১. প্রকাশ থাকে যে, তাদের আলোচ্য উক্তিটি বর্তমানের নয়; কমপক্ষে ১২০ বছর পূর্বের। কারণ, আমরা এখন ২০২০ ঈসায়িতে আছি। আর প্রোটোকলগুলো প্রকাশিত হয়েছে ১৯০১ ইসায়িতে।
১. بُرُوتُوكُوْلَاتُ حُكَمَاءِ صِهْيَوْنِ পৃ. ১৬৮, চতুর্থ সংস্করণ। আরবি অনুবাদক : মুহাম্মদ খলিফা তিউনিসি। আরো দেখুন মায়দানি রচিত مَكَائِدُ يَهُودِيَّةٌ ৩৪৬।
১. নিরক্ষর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য সকল অইহুদি।
১. 'আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জয় লাভ করার স্থায়ী পদ্ধতি' শিরোনামে দারুল উলুম দেওবন্দের মহান উস্তাদ মাওলানা নূর আলম খলিল আমিনি হাফিজাহুল্লাহর একটি প্রবন্ধ আছে। المُوَطَّأُ فِي العَرَبِيَّةِ الوَظِيفِيَّةِ কিতাবের প্রথম সংস্করণের ৩৬৩-৩৭৭ নং পৃষ্ঠায় প্রবন্ধটির সংলাপরূপ দ্রষ্টব্য।
📄 ইসলাম শান্তি, সমতা ও স্বাধীনতার ধর্ম, না সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার ধর্ম?
দাঈ ইলাল্লাহ ডক্টর ইয়াদ কুনাইবি
আমরা মুসলিম ভাইদেরকে অনেক বলতে শুনি, 'ইসলাম শান্তির ধর্ম।' বিশেষকরে এ কথাটা ইউরোপের মুসলিমগণ বলেন, যখন তারা অন্য ধর্মাবলম্বীদের সামনে ইসলামের প্রতিরক্ষার চেষ্টা করেন। তারা বলেন, 'ইসলাম শান্তির ধর্ম।' অমুসলিমরা জবাবে বলে, 'তোমরা কীভাবে ইসলামকে শান্তির ধর্ম বল, অথচ তোমাদের কোরআনে এমন অনেক আয়াত আছে যেখান বলা হয়েছে- তোমরা কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করো!?'
তখন এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে, মুসলমানরা যেন অন্যদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে এবং নিজেদের দীনের কিছু জিনিস লুকানোর চেষ্টা করছে। অন্যদের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে তারাও প্রত্যুত্তরে বলে, ‘তোমাদের ধর্মগ্রন্থেও তো হত্যা ও যুদ্ধের কথা আছে।'
আমার ভাইয়েরা! আমাদের দীনে সঙ্কোচ করার মতো কোনো বিষয় নেই। আমাদের স্পষ্টভাষী হওয়া উচিত। দীনের বাস্তবতা প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে; তা নিয়ে আমাদের মধ্যে গর্ববোধ থাকতে হবে। তবেই আমরা সঙ্কোচ ও ইতস্ততা ছাড়া পুরো পৃথিবীর সামনে ইসলাম নিয়ে গর্ব করতে পারব।
আপনি যখন বলবেন, ইসলাম অমুক মূল্যবোধের ধর্ম, তখন সেই মূল্যবোধ ইসলামের সকল শিক্ষায় উপস্থিত থাকা জরুরি। একটি আয়াত বা একটি হাদিসও তার বিরোধী থাকতে পারবে না।
তাই আমরা যদি এক বাক্যে ইসলামের পরিচয় দিতে চাই, তাহলে কখনই তাকে 'শান্তির ধর্ম' অভিহিত করা ঠিক হবে না। কেননা ইসলাম কিছু ক্ষেত্রে কার্যত যুদ্ধের নির্দেশ দেয়। বরং আমরা মানুষের মধ্যে প্রচার করতে পারি যে, 'ইসলাম সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার ধর্ম।'
এই মূল্যবোধদুটি [সত্য ও ন্যায়পরায়ণতা] ইসলামের সকল শিক্ষায় এবং প্রত্যেক আয়াত, হাদিস ও বিধানে বিদ্যমান। আপনি একটি আয়াতও পাবেন না, যা সত্যের বিপরীতে বাতিলের পক্ষে কথা বলে। অনুরূপভাবে একটি আয়াত, হাদিস ও বিধানও পাওয়া অসম্ভব, যা ন্যায়পরায়ণতার আদেশ না করে জুলুমের আদেশ দেয়। অসম্ভব! সত্য ও ন্যায়পরায়ণতা এমন দুটি মূল্যবোধ, যা ইসলামের সকল বিধানে বিদ্যমান আছে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
اللهُ الَّذِي أَنزَلَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ وَالْمِيزَانَ.
আল্লাহই সেই সত্তা, যিনি অবতীর্ণ করেছেন সত্যসহ কিতাব ও তুলাদণ্ড। [সুরা শুরা : ১৭]
তুলাদণ্ড দ্বারা ন্যায়পরায়ণতা বুঝানো হয়েছে।
আরো ইরশাদ করেছেন-
وَبِالْحَقِّ أَنزَلْنَاهُ وَبِالْحَقِّ نَزَلَ.
আমি সত্যসহই তা [কোরআন] অবতীর্ণ করেছি এবং সত্যসহই তা অবতীর্ণ হয়েছে। [সুরা বনি ইসরাঈল : ১০৫]
আরো ইরশাদ করেছেন-
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ .
নিশ্চয় আমি আমার রাসুলদের নিদর্শনাদি দিয়ে প্রেরণ করেছি এবং তাদের সঙ্গে নাযিল করেছি কিতাব ও তুলাদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়নীতির উপর কায়েম থাকে। [সুরা হাদিদ : ২৫]
এ বিষয়ে আরো অনেক আয়াত রয়েছে।
পক্ষান্তরে কাফেরদের সাথে সন্ধি ও সমঝোতা করা কিছু ক্ষেত্রে জুলুম ও অন্যায়। তাদের সাথে জিহাদ চালিয়ে যাওয়াই সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার দাবী।
স্বাধীনতার বিষয়টিও এমন। ঢালাওভাবে বলা ঠিক হবে না যে, 'ইসলাম স্বাধীনতার ধর্ম।' কারণ, তখন প্রশ্ন আসবে, ইসলাম যদি স্বাধীনতার ধর্ম হয়, তাহলে কেনো তোমরা সমকামিতার স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিচ্ছ না? বরং আমরা বলব, ‘অনেক স্বাধীনতা এমন আছে যেগুলো বাতিল ও অন্যায়। ইসলাম সেগুলো সমর্থন করে না।'
ঢালাওভাবে এটি বলাও ঠিক হবে না যে, 'ইসলাম সমতার ধর্ম।' কারণ, তখন প্রশ্ন আসবে, ইসলাম যদি সমতার ধর্ম হয়, তাহলে কেনো সামাজিক সকল বিষয়ে এবং কর্তব্য ও অধিকার প্রভৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকার নেই? বরং আমরা বলব, 'কিছু সমঅধিকার আছে যা জুলুম ও অন্যায়।'
আচ্ছা, সকল বিষয়ে আমরা সত্য ও ন্যায়পরায়ণতা কীভাবে চিনতে পারব? আমরা তা চিনতে পারব আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য ও তাঁর দাসত্বের মাধ্যমে। প্রবৃত্তির দাসত্ব করা যাবে না। গণতন্ত্র ও অধিকাংশের মতামতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতাসীন, ধনকুবের ও মিডিয়ার মালিকদেরও দাসত্ব করা যাবে না।
এভাবে যখন আমরা ইসলামকে তার আসল আকৃতিতে চিনতে শিখব এবং মানুষের সামনে তার প্রকৃতরূপ উপস্থাপন করব, তখন কেউ কোরআনের কোনো আয়াত কিংবা ইসলামের কোনো বিধান নিয়ে আমাদের মুখোমুখি হলে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ব না।
এটি পাশ্চাত্যে অবস্থানরত অমুসলিমদের সাথে চলাফেরাকারী আমাদের সকল মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপদেশ। তারা যেন এ সমস্ত বিষয়ে স্পষ্টভাষী থাকেন। অমুসলিমদের সাথে আলোচনার সময় তাদের শিরোনাম যেন হয়, 'ইসলাম সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার ধর্ম।' আল্লাহ তাআলা সত্য ও ন্যায়ের প্রতি মানুষের অন্তরে ও স্বভাবে আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি ইসলাম যথাযথ গ্রহণ করবে, তাকে স্বাগতম। আর যে তা প্রত্যাখ্যান করবে, তা হবে তার বিকৃত স্বভাব ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণের কারণে। আল্লাহ তাআলা নবিকে বলেছেন-
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ.
আপনি যাকে চাইবেন তাকেই সৎপথে আনতে পারবেন না, কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনেন। আর তিনিই ভালো জানেন, কারা সৎপথে আসবে। [সুরা কাসাস : ৫৬]
ইসলামকে কোনো যুগের প্রচলিত কোনো শ্লোগানের অনুগত করা কখনই ঠিক হবে না। আপনি দেখবেন, এ শ্লোগানদানকারীরা নিজেদের শ্লোগানগুলোরই কঠিন বিরোধিতা করে। তাদের কয়েকটি শ্লোগান হলো- 'শান্তি', 'সমতা' ও 'স্বাধীনতা'। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ সকল শ্লোগান দেয়। কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজেরা সেগুলো লঙ্ঘন করে।
অবশেষে বলতে চাই, আপনি ওহির মাধ্যমে সংরক্ষিত ধর্ম তথা ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে কখনই দেখবেন না যে, তা সত্যিকার শান্তি, সমতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।
কবি আহমদ শাওকি সুন্দর বলেছেন-
রাসুল কত সম্মানজনক যুদ্ধে লড়েছিলেন!
তাতে সত্য প্রতিষ্ঠিত হতো নতুবা উচ্চকিত।
তাতে আল্লাহর সৈনিকেরা ছিলেন কঠোর।
কিন্তু তাঁরা পৃথিবীকে উপহার দিয়েছিলেন কোমলতা।
তাঁরা অজ্ঞতার উপর এমন আঘাত হেনেছিলেন,
যা মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতাকে করে দিয়েছিল নিশ্চিহ্ন।
তাঁরা যুদ্ধ করতেন শান্তির পক্ষ হয়ে।
রক্ত ঝরত, কিন্তু তা দমিয়ে রাখত রক্তের প্লাবন।
আল্লাহ অধিক অবগত। ওয়াসসালাম।
টিকাঃ
১. তাই জিহাদ একটি দায়েমি [বিরামহীন] ফরজ। ৮৪ ও ২০২ নং পৃষ্ঠার টীকায় হাদিস দ্রষ্টব্য। -অনুবাদক।
১. বক্তব্যের লিংক : https://youtu.be/SKPsjA_R68Y