📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর > 📄 কিতাব ও রিজালের অনুসরণে বিষয়ক দেওবন্দি মানহাজের বিবরণ

📄 কিতাব ও রিজালের অনুসরণে বিষয়ক দেওবন্দি মানহাজের বিবরণ


আনাস : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
যুবায়ের: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আনাস : কয়েকদিন আগে আমাদের গ্রামের মাদরাসায় 'জঙ্গিবাদ দমন' শীর্ষক একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে একজন বক্তা বলেছেন, 'বাংলাদেশের অমুসলিমরা জিম্মি। তাই এ দেশের মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হলো, দারুল ইসলামের জিম্মিদের ন্যায় তাঁরা এখানকার অমুসলিমদের অধিকারসমূহ আদায় করবে, এবং তাদের জান, মাল ও ইজ্জতের হেফাজত করবে।' আমি জানতে চাই, কাউকে ভীতসন্ত্রস্ত করার বৈধতা ইসলামে আছে কি? আর এ দেশের অমুসলিমরা কি সত্যিই জিম্মি?
যুবায়ের : আমি তোমাকে পবিত্র কোরআনের সুরা আনফালের ৬০ নং আয়াতের কিছু অংশের অর্থ শোনাব। তা থেকে তুমি নিজেই প্রথম প্রশ্নের উত্তর জেনে নিয়ো। 'আর [হে মুসলমানগণ!] তোমরা কাফেরদের [মোকাবিলা করার] জন্য তোমাদের সাধ্যানুযায়ী [সমরশক্তি ও পালিত ঘোড়ার দল প্রস্তুত রাখ, যার দ্বারা তোমরা ভীতসন্ত্রস্ত রাখবে আল্লাহর দুশমন ও তোমাদের দুশমনদের, এবং তারা ছাড়াও অন্য কাফেরদের, যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ তাদের জানেন।'
আনাস : আচ্ছা, ইসলামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ আছে কি?
যুবায়ের : এ আয়াতে কাফেরদেরকে ভীতসন্ত্রস্ত রাখার যে নির্দেশ আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের দিয়েছেন, তাকে যদি 'সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ' আখ্যা দেওয়া হয়, তাহলে ইসলামে 'সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ' আছে কি-না, এ প্রশ্নের উত্তর তুমি নিজেই বের করো। পক্ষান্তরে 'সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ' বলে যদি অন্যায় ত্রাসসৃষ্টি ও অন্যায় যুদ্ধ বুঝানো হয়, তাহলে অবশ্যই ইসলামে 'সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ' নেই।
আনাস : আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, আমাদের দেশের অমুসলিমরা কি সত্যিই জিম্মি?
যুবায়ের : ইসলাম জিম্মিদেরকে অধিকার দিয়েছে। আমাদের জন্য যা রয়েছে, তারাও তা পাবে। এবং যা কিছু আমাদের উপর বর্তাবে, তাদের উপরও তা বর্তাবে। তবে মুসলমানদের সাথে তাদের সহাবস্থান তখনই বৈধ হবে, যখন তাদেরকে প্রতিহত করার ক্ষমতা مسلمانوں থাকবে। নতুবা তাদের সাথে মেলামেশার কারণে মুসলমানরা তাদের অনুরূপ হয়ে যাবে এবং নিজেদের ইসলামি ব্যক্তিত্ব হারিয়ে বসবে।
আনাস : আপনাকে আমি আমাদের দেশের অমুসলিমদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি, তারা জিম্মি কি-না? আশা করি, আপনি আমার এ প্রশ্নের উত্তর দিবেন।
যুবায়ের : চেয়েছিলাম কৌশলে এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাব। কিন্তু কাজ হলো না। প্রমাণিত হলো, তোমার মেধা আছে। তাহলে শুনো। আল্লাহ তোমার মেধায় বরকত দিন!
আনাস : আমিন! বলতে থাকুন। আল্লাহ আপনাকে জাযায়ে খায়ের দান করুন।
যুবায়ের : ظَارَةُ مُعَلَّمٍ وَنَظَرَاتُهُ কিতাবের লেখক 'বাংলাদেশ ও এর মতো দেশগুলোর কাফেররা জিম্মি কি-না' শিরোনামের অধীনে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য বিস্তর গবেষণা ও প্রচুর অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই। আচ্ছা, কোনো কাফের কোথায় জিম্মি হবে? সহজ উত্তর, অবশ্যই দারুল ইসলামে; দারুল হরবে নয়। তাই আমাদের প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে, বাংলাদেশ ও এর মতো যেসব দেশের অধিকাংশ নাগরিক মুসলমান, সেগুলো দারুল ইসলাম, না দারুল হরব?'
আনাস : ওরে বাবা! এতো কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হয়ে এলো। আচ্ছা, আমার আগের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পূর্বে অনুগ্রহপূর্বক দুটি প্রশ্নের উত্তর দিন। ১. মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও কি বাংলাদেশ দারুল ইসলাম না? ২. প্রত্যেক অমুসলিমই কি কাফের?
যুবায়ের: যুগের মুহাদ্দিস আল্লামা মুহাম্মদ ইউসুফ বিন্নুরি রাহিমাহুল্লাহ [১৩২৬-১৩৯৭ হি.] তাঁর 'বাসায়ের ও ইবার কিতাবে লিখেছেন, জমহুর আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত, কোনো ভূখণ্ড দারুল ইসলাম হওয়ার ভিত্তি, তার মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত নয়। বরং ভিত্তি হলো, সেখানে ইসলামের বিধিবিধান কার্যকর হওয়া। অতএব যে দেশের শাসকবর্গ জনগণকে ইসলামি আইনকানুনের বরকত থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ প্রদান করে না, উপরন্তু তাদের উপর কুফরি ও জাহিলি বিধিবিধান চাপিয়ে দেয়; জনগণের বিক্ষোভ সত্ত্বেও আল্লাহর বিধান উপেক্ষা করে মানবরচিত বিধান অনুসারে মামলা-মকদ্দমা মীমাংসা করতে তাদেরকে বাধ্য করে, আপনি সে দেশকে হাজারবার মুসলিম দেশ বলুন, কিন্তু তার জন্য 'ইসলামি রাষ্ট্র' ও 'দারুল ইসলাম' শব্দ ব্যবহার করতে আমার লজ্জা হয়।
আনাস : আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিলো, 'প্রত্যেক অমুসলিমই কি কাফের?' এ সম্বন্ধে কিছু বলুন।
যুবায়ের : কোরআন মাজিদের বিভাজন অনুসারে মানুষ দুভাগেই বিভক্ত, হয় মুমিন, না হয় কাফের। তাই যারা মুসলমান নয়, তাদের প্রত্যেকেই কাফের। 'অমুসলিম' শব্দটি কোরআন-হাদিসের পরিভাষা নয়। কোরআন-হাদিসের শব্দ হলো 'কাফের'। 'নায্যারা' কিতাবের লেখক লিখেছেন, অসম্ভব নয় যে, অমুসলিমদের জন্য 'কাফের' শব্দ মুসলমানদের ব্যবহার না করা প্রাচ্যবিদদের একটি চক্রান্ত, যেন মুসলমানরা তাদের সঙ্গে কাফেরসুলভ আচরণ না করে। উদাহরণস্বরূপ এ আয়াতের আদেশটি যেন অমুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ না করে- [অর্থ] 'হে ঈমানদারগণ! কাফেরদের মধ্যে যারা তোমাদের নিকটবর্তী, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। এবং তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা পায়। আর জেনে রাখো, আল্লাহ মুত্তাকিদের সঙ্গে আছেন।' [সুরা তাওবা : ১২৩]
আনাস : তাহলে তো 'অমুসলিম' শব্দের পরিবর্তে 'কাফের' শব্দের ব্যাপক প্রচলন ঘটানো অতীব জরুরি।
যুবায়ের : তোমার কথাটাই 'নাযযারা'র লেখক বলেছেন, 'এ জন্যই আমি মনে করি, কোরআন পাঠের সময় বর্তমান প্রজন্মের সামনে যখন “কাফের” শব্দ আসবে, তখন তারা মনে করবে, কাফের দ্বারা উদ্দেশ্য এমন কতিপয় লোক, যারা সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে অতিবাহিত হয়ে গেছে। শব্দটি এ যুগের অমুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাই তাদের সাথে নববি যুগের আরব কাফেরদের মতো আচরণ করা সঙ্গত হবে না।
তাই আমার দৃষ্টিতে প্রত্যেক যুগের প্রত্যেক শহরের অমুসলিমদের ব্যাপারে কোরআন-হাদিসে উল্লেখিত "কাফের” শব্দটিই প্রয়োগ করা জরুরি।'
আনাস : আপনি কি কোরআন-হাদিস আকাবির-আসলাফের তুলনায় বেশি বুঝেন?
যুবায়ের : তোমার এ কথার উদ্দেশ্য আমি বুঝতে পারিনি। কী হলো, হঠাৎ কথার ধরণ পাল্টে গেল যে! উদ্দেশ্য যদি স্পষ্ট করতে!
[আনাস তখন দেশের বড় বড় কয়েকটি দীনি প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত প্রসিদ্ধ কয়েকজন আলেমের নাম উল্লেখ করে বলল,]
আনাস : সমকালীন কোনো রাষ্ট্রকে তাঁরা 'দারুল হরব' মনে করেন না। তাঁদের দৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য বর্তমানে 'সমঝোতার ধর্ম' গ্রহণ করা আবশ্যক, এবং যুগের অমুসলিমদেরকে 'কাফের' শব্দে সম্বোধন করা অনুচিত। সর্বোপরি বর্তমান সময়ের অমুসলিমদেরকে তাঁরা জিম্মি মনে করেন। তাই মুসলমানদের জন্য যেসকল অধিকার রয়েছে, তা অমুসলিমরাও ভোগ করবে, যদিও মুসলমানদের উপর যেসব দায়িত্ব আছে, তা পালন করা তাদের জন্য জরুরি নয়।
এখন আপনিই বলুন, আমি কার কথা মানব? আকাবির- আসলাফের, না আপনি ও আপনার মতো যারা আছেন তাদের? ও! আরেকটি কথা, তাঁদের দৃষ্টিতে আপনাদের অধ্যয়ন অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত। এবং আপনাদের উদ্ভাবন ও উদ্ঘাটন অগভীর ও ভাসাভাসা।
যুবায়ের : বুঝলাম, তাঁরা আমাদেরকে ত্রুটিপূর্ণ অধ্যয়ন ও ভাসাভাসা চিন্তার অধিকারী আখ্যা দিয়েছেন। এক কাজ করো, তুমি পূর্ণ অধ্যয়ন ও গভীর চিন্তার অধিকারীদেরকে জানিয়ে দাও, এ বিষয়ে আমাদের বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযোগ করার অধিকার আছে। তবে এ অভিযোগ আমাদের দলিল-প্রমাণগুলোকে দলিলভিত্তিক খণ্ডন করে ভুল প্রমাণিত করার পরে হোক। তার আগে নয়। কারণ, দলিলহীন খণ্ডন লোকেরা গ্রহণ করে নিবে- এমন ভাবনা এখন অতীতের গল্প। দলিলবিহীন খণ্ডনের গ্রহণযোগ্যতার বাজার এখন মন্দা।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا وَرِزْقًا طَيِّبًا .. হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট চাই উপকারী ইলম, মাকবুল আমল ও উত্তম জীবিকা। [মুসনাদে আহমদ: ২৬৫২১]
তারপর বলো, তুমি তাঁদের যে অবস্থানের কথা তুলে ধরেছ, তা কি কোরআন-হাদিসে উল্লেখিত দ্ব্যর্থহীন কোনো বক্তব্য? অথবা কমপক্ষে এমন কোনো বিষয় কি, যার ব্যাপারে উম্মাহর সকল আকাবির-আসলাফ অভিন্ন মত পোষণ করেন?
আনাস : সত্যিই বিষয়টি এমন নয়। অর্থাৎ উল্লিখিত অবস্থানটি কোরআন-হাদিসের দ্ব্যর্থহীন কোনো বিষয় নয়। তদ্রূপ তা সকল আকাবির-আসলাফের সর্বসম্মত মতও নয়।
যুবায়ের : তাহলে কীভাবে তুমি কয়েকজন আলেমের বিরোধিতাকে সকল আলেমের বিরোধিতা বানিয়ে দিলে? তা কি ঠিক হয়েছে? এই অপবাদ আরোপ থেকে তোমার তাওবা করতে হবে। বাচনভঙ্গি পরিবর্তন না করলে আমি তোমাকে কিছুতেই ক্ষমা করবনা।
আনাস : ঠিক বলেছেন, কয়েকজন আলেমের বিরোধিতা করার অর্থ যে সবাই আপনাদের বিরোধিতা করে- বিষয়টি এমন নয়। বরং আপনারা যা বলেছেন, আকাবির- আসলাফের অনেকেই তা বলেছেন। তাই যুগের এমন কয়েকজন আলেমের বিরোধিতা করার কারণে আপনারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হননি, যাদের গুটিকয়েক মন্দ ও দরবারি, অধিকাংশ সহজ-সরল ও উদাসীন। ভুল বাচনভঙ্গির জন্য ক্ষমা করবেন।
যুবায়ের : এখন বলো, যেসকল রাষ্ট্রশক্তির ভয়ে মুসলমানরা ইসলামের সকল বিধান যথাযথ পালন করতে পারছে না, কিতাল ফি সাবিলিল্লাহর পরিবর্তে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, তাবলিগ জামাতে বের হয়ে এবং খানকায় সময় ব্যয় করে জিহাদের তৃষ্ণা নিবারণ করছে, সেসব রাষ্ট্র কেনো দারুল হরব নয়?!
আনাস : বলুন।
যুবায়ের : যেসকল রাষ্ট্রশক্তির ভয়ে মুসলমানরা খোলাফায়ে রাশেদিনের পদ্ধতিতে আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার করতে পারছে না, তার পরিবর্তে কুফরি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সৎকাজ করার ও অসৎকাজ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করে যাচ্ছে, দীনের প্রতিরক্ষাকারীদেরকে সাহায্য করতে ও আশ্রয় দিতে পারছে না, সেই রাষ্ট্রগুলো কেনো দারুল হরব হবে না?!
আনাস : হুম, বলুন।
যুবায়ের : যেসকল রাষ্ট্রশক্তির ভয়ে মুসলিম বাবারা সন্তানদেরকে কোরআন-হাদিস ও ফিকহের কিতাবাদিতে বর্ণিত জিহাদের শিক্ষা দিতে পারছে না, উস্তাদগণ মাদরাসায় ফিকহ ও ফতোয়ার কিতাবসমূহের অনেক অধ্যায় পড়ানো সত্ত্বেও ঐসকল কিতাবেই থাকা 'সিয়ার' অধ্যায় পড়াতে পারছেন না, সেসব রাষ্ট্র দারুল হরব নয় কেনো?!
আনাস : আচ্ছা!
যুবায়ের : এমনকি যেসব রাষ্ট্র বর্তমান সময়ে সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মায়ানমার প্রভৃতি দেশে মুসলমানদের রক্ত ঝরাচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামি সকল অগ্রযাত্রার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলছে, সেগুলো কেনো দারুল হরব হবে না?!
আনাস : তাইতো!
যুবায়ের : যেসকল রাষ্ট্র এখন আল্লাহর পথের পথিকদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিপূর্ণ শক্তি ব্যয় করে চলেছে; বদর, উহুদ, খন্দকের যোদ্ধাদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছে, রাসুলের সিয়ার ও মাগাযির শিক্ষা ধারণকারী মুসলমানদের দমন ও নিয়ন্ত্রণ করতে নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু ঢেলে দিচ্ছে, সেগুলো দারুল হরব না হওয়ার কারণ কী?
আনাস : একজন আলেম নাকি বলেছেন, দারুল ইসলাম ও দারুল হরব নসের পরিভাষা নয়। বর্তমান পৃথিবীতে দারুল ইসলাম যেমন নেই, তেমনি দারুল হারবও নেই। হ্যাঁ, সর্বোচ্চ ইসরাইলকে দারুল হরব বললেও বলা যায়। এ সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
যুবায়ের : কোথায় যেন দেখলাম, শায়খ আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি নামক একজন লেখক তাঁর 'দারুল ইসলাম ও দারুল হরব' নামে প্রকাশিত বইয়ে, কোরআন-হাদিস এবং সালাফের বাণী ও অবস্থানের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
আনাস : আপনার বক্তব্য শুনলাম। এখন বলুন, আপনি কোন দলের লোক? আর যেসকল আলেমের কথা আমি উল্লেখ করেছি, তাঁরা কোন দলের?
যুবায়ের : আমি দেওবন্দি। দেওবন্দিয়াত আমার আদর্শ। তাঁরা কাদের আদর্শ লালন করেন, আমি জানি না।
আনাস : দেওবন্দিয়াত?! এটা আবার কী? বুঝিয়ে বলুন তো।
যুবায়ের: দেওবন্দিয়াত হলো আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তাচেতনার নাম। এ জামিয়ার আকাবিরগণ কিতাবুল্লাহ [কোরআন] ও রিজালুল্লাহ [সালাফ]-র মাঝে সমন্বয় সাধন করে চলেন।
আনাস : বুঝলাম না।
যুবায়ের : দারুল উলুম দেওবন্দের আকাবিরগণ সালফে সালেহিনের ব্যাখ্যার আলোকে কোরআন-হাদিস বুঝেন, এবং কোরআন-হাদিসের আলোকে সালফে সালেহিনকে যাচাই-বাছাই করেন।
আনাস : সত্যিই আমি এখনও আপনার কথা বুঝিনি। দয়া করে আরও স্পষ্ট করুন।
যুবায়ের : আচ্ছা, ঠিক আছে। শোনো, দারুল উলুম দেওবন্দের কর্মপন্থা উল্লেখ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-
'দারুল উলুম দেওবন্দের আকাবিরদের এই জামাত কোরআন-সুন্নাহ হতে আলোগ্রহণ ব্যতীত পূর্বসূরি আলেমদের উপর পরিপূর্ণ নির্ভর করেননি। তেমনিভাবে তাঁরা পূর্বসূরি আলেমদের ইলমি ঐতিহ্য, রুচি ও নির্দেশনা থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে কোরআন-সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে নিজেদের মত-অভিমতের উপর একগুঁয়ে হননি। বরং দেওবন্দের আকাবিরদের বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে, কোরআন-সুন্নাহের আলোকে সালফে সালেহিনের অনুসরণ করা এবং সালফে সালেহিনের মত-অভিমত ও বংশপরম্পরায় তাঁদের থেকে প্রাপ্ত ইলমিরুচির আলো গ্রহণ করে কোরআন-সুন্নাহর উদ্দেশ্য বোঝা। কিতাব ও রিজালের এই সমন্বয়ের ফলে দেওবন্দের আলেমসমাজ চিন্তা ও কর্মে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হননি। অপর কয়েকজন আকাবিরও এ কর্মপন্থাটি বিভিন্নভাবে ব্যক্ত করেছেন।
আনাস : অনুগ্রহপূর্বক তাঁদের কয়েকজনের কিছু উক্তিও যদি শোনাতেন!
যুবায়ের : দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক শায়খুল হাদিস ও সদরুল মুদাররিসিন [প্রধান শিক্ষক] মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরি রাহিমাহুল্লাহ [১৩৬০-১৪৪১ হি.] বলেছেন, আকাবিরের আমল তখনই দলিলযোগ্য হবে, যখন তা কোরআন-সুন্নাহ ও কল্যাণের সাক্ষ্যপ্রাপ্ত তিন প্রজন্মের আমল দ্বারা সমর্থিত হবে। সর্বাবস্থায় আকাবিরের আমল গ্রহণ করে নেওয়াকে 'আকাবির অনুসরণ' নাম দেওয়া যাবে না। বরং তার নাম 'আকাবির পূজা'।
আনাস : হুম!!
যুবায়ের : হজরত রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আকাবির ও মাশায়েখগণের বাণী ও কর্ম শরিয়তের দলিল নয়। বরং দলিল হলো, শরিয়ত প্রবর্তকের কর্ম ও বাণী এবং মুজতাহিদ ইমামগণের রায়।
আনাস : আচ্ছা!!
যুবায়ের : হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রাহিমাহুল্লাহ 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা' কিতাবে দীন বিকৃতির ৭টি কারণ বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে একটি হলো, মাশায়েখদের পছন্দ। অর্থাৎ আগত প্রজন্ম প্রত্যেক এমন কাজকে দীন মনে করা, যাকে আকাবিরগণ পছন্দ করেছেন। এভাবেও দীন বিকৃত হয়।
আনাস : দেওবন্দের আকাবিরগণের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর আপনি নিজের জন্য কী করণীয় নির্ধারণ করেছেন?
যুবায়ের : কোরআন-হাদিসের অনুসরণ ও আকাবির-আসলাফের অনুকরণের ক্ষেত্রে একেই আমি মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছি। সালফে সালেহিন বিশেষকরে মুজতাহিদ ফকিহ ইমামগণের ব্যাখ্যার আলোকে কোরআন-হাদিস বুঝার চেষ্টা করি। এবং কারো কোনো অবস্থানের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দেহ হলে যাচাই করা পর্যন্ত তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকি; যদিও তিনি দেওবন্দের উচ্চপদস্থ কেউ হন। কারণ, আলেম-জাহেল নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলমানের প্রতি আল্লাহ তাআলার আদেশ হলো-
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمُ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا .
আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তর– প্রত্যেকটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। [সুরা বনি ইসরাঈল : ৩৬]
আনাস : কেউ যদি কোনো দেওবন্দি আলেমের কথা ও কাজকে যাচাই না করে প্রত্যেক ক্ষেত্রে তাঁর অনুসরণ করে, তাহলে তার সম্পর্কে কী বলবেন?
যুবায়ের : এই মাত্র তোমাকে মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরি রাহিমাহুল্লাহর বাণী শুনিয়েছি- সর্বাবস্থায় আকাবিরের আমল গ্রহণ করে নেওয়াকে ‘আকাবির অনুসরণ’ নাম দেওয়া যাবে না। বরং তার নাম ‘আকাবির পূজা’।
আনাস : আপনারা কি সকলকেই এ ধরনের যাচাইয়ের পাত্র মনে করেন?
যুবায়ের : শোনো, দেওবন্দের নীতিমালার অনুসারীগণ বড় বড় ইলমি মারকাজ এমনকি খোদ দেওবন্দকেও দলিলের আলোকে আহলে ইলম কর্তৃক যাচাই করাকে, দেওবন্দের আকাবিরগণের নীতির দাবি মনে করেন। অন্যথায় চিন্তা ও কর্মে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা করেন।
আনাস : বড়দেরকে এভাবে যাচাই করা গোমরাহি নয় তো?
যুবায়ের : জরাহ-তাদিলের কিতাবসমূহ থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই যে, আকাবির রাহিমাহুমুল্লাহের কথা ও কাজের দলিল তালাশ করা এবং সেই দলিলের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাই করা গোমরাহি নয়, উপরন্তু তা দীনের হেফাজতের বিশেষ মাধ্যম।
এ প্রসঙ্গে তোমাকে মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নাদাবি রাহিমাহুল্লাহর [১৩৩৩-১৪২০ হি.] কিছু কথা শোনাব। তিনি লিখেছেন, ‘কোন জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্য সবচে’ বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক বোধ ও চেতনা থেকে বঞ্চিত হওয়া। যে জাতি সর্বপ্রকার যোগ্যতা ও প্রতিভার অধিকারী, ধর্ম ও কর্ম উভয় ক্ষেত্রে প্রাগ্রসর। বদন আছে, বদান্যতা আছে, শক্তি আছে, সাহস আছে, কৌশল আছে, কুশলতা আছে, আবার আমল আছে, আখলাক আছে, রোযা-নামায সবই আছে, কিন্তু ভালো-মন্দ, পাপ-পূণ্য ও ভুল-নির্ভুল বোঝার, শত্রু-মিত্র চেনার এবং অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে পদক্ষেপ গ্রহণ করার যোগ্যতা নেই; নেতা ও ধর্মনেতাদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়ার এবং জাতির কাছে যারা অপরাধী তাদের পাকড়াও করার সৎ সাহস নেই; যে জাতি নেতা ও নায়কদের মিষ্টি মোলায়েম কথায় ভুলে যায়, বাগ্মিতা ও বাক-যাদুতে মুগ্ধ হয়ে যায়, বারবার প্রতারিত হয়, তারপরও নতুন প্রতারণার শিকার হয়, এমন জাতি তার ধর্মীয় ও জাগতিক সাফল্য, উচ্চতা ও যোগ্যতা সত্ত্বেও কিছুতেই আস্থাযোগ্য নয়। এমন জাতি যে কোন সময় যে কোন পেশাদার রাজনীতিক ও ভাগ্যান্বেষী নেতাদের খেলার পাত্র হতে পারে। জাতির সরলতা ও বোধহীনতার কারণে এসব নেতা ও শাসক স্বেচ্ছাচার করার সুযোগ পায় এবং নিশ্চিন্ত থাকে যে, তার কাছে হিসাবে চাওয়ার বা কৈফিয়ত নেয়ার কেউ নেই।
আনাস : আপনি অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছেন।
যুবায়ের: মাওলানা আবু তাহের মিছবাহ হাফিজাহুল্লাহ একস্থানে লিখেছেন, 'এখানে কলমে প্রবল স্রোত ও প্রবাহ ছিলো। আরো অনেক কিছু লেখা যেতো। কিন্তু কলম ও কলব উভয়কে সংযমে রেখেছি। আল্লাহর শোকর, শেষ পর্যন্ত লেখার ইচ্ছের উপর না লেখার শক্তি জয়ী হয়েছে। নইলে হয়ত আপনজনেরাও সমালোচনা শুরু করতো।'
তবে কোনো শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি বিশেষকরে দীনি আলেমের সঙ্গে বেয়াদবিমূলক আচরণ-উচ্চারণ থেকে আল্লাহর দরবারে পানাহ চাই।
একটি জরুরি কথা, একটু আগে তোমাকে হজরত আলি মিয়াঁ নাদাবি রাহিমাহুল্লাহর যে উক্তিটি শুনিয়েছি, তা ছিল তাঁর রচিত 'মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো?' বইয়ের 'বোধ ও চেতনার পরিচর্যা' শিরোনামের ভূমিকা। এক সুযোগে শিরোনামটির অধীনের পুরো লেখাটি পাঠ করে নিয়ো; আলোচ্য বিষয়ে অনেক উপকৃত হবে ইনশাআল্লাহ। লেখাটি বইটির প্রথম প্রকাশে ৪৯৯ নং পৃষ্ঠা থেকে আরম্ভ হয়ে ৫০৮ নং পৃষ্ঠায় সমাপ্ত হয়েছে। মন চাচ্ছিল, তোমাকে লেখাটির শেষ অনুচ্ছেদটিও শুনিয়ে দিই।
আনাস : অবশ্যই শোনান ভাইয়া! আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!
যুবায়ের : সর্বশেষ অনুচ্ছেদে তিনি লিখেছেন, 'ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার একই কথা এজন্য বলতে হচ্ছে যে, আলমে ইসলামের (ইসলামি বিশ্ব) জন্য এখন সবচে' বড় খেদমত হলো, এমন বোধ ও প্রজ্ঞা এবং চেতনা ও প্রেরণা জাগ্রত করা যাতে ব্যক্তি, সমাজ ও জাতি, ভালোমন্দ, ন্যায়-অন্যায়, কপটতা ও আন্তরিকতা, সংশোধন ও বিনাশ এবং হকের দাওয়াত ও বাতিলের শোরগোলের মধ্যে সহজেই পার্থক্য করতে পারে এবং গ্রহণ-বর্জনের সঠিক ও নির্দ্বিধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।
বন্ধু যেন অবহেলিত না হয়, শত্রু যেন সমাদৃত না হয়; অপরাধী যেন নিস্তার না পায়; সৎ ও নিষ্ঠাবান যেন উপেক্ষিত না হয়। নাগরিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জটিল থেকে জটিল বিষয়ে মানুষ যেন পূর্ণ প্রজ্ঞার সঙ্গে চিন্তা করার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পরিপূর্ণ যোগ্যতার অধিকারী হয়। এমন জাতি ও জনগোষ্ঠী যতক্ষণ আমরা না পাবো ততক্ষণ কোন কর্মোদ্দীপনা ও কর্মযোগ্যতা এবং জাগতিক ও ধর্মীয় জীবনের জৌলসপূর্ণ যাবতীয় প্রকাশ ও অভিপ্রকাশ, জাতির ভাগ্য ও সময়ের গতিধারা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশেষ কোন ভূমিকাই রাখতে পারে না।'
আনাস : আমার কোনো উস্তাদ যদি স্পষ্ট কোনো ভুল উক্তি বা অবস্থান গ্রহণ করেন, তখন আমার করণীয় কী?
যুবায়ের : তা ভুল কি-না প্রথমে তোমাকে সে বিষয়ে দলিল- প্রমাণের আলোকে পূর্ণ নিশ্চিত হতে হবে। তোমার ধারণা ভুলও হওয়ার সম্ভাবনা আছে। শেষ পর্যন্ত যদি উস্তাদের অবস্থানই ভুল সাব্যস্ত হয়, তাহলে এই আয়াতের উপর আমল করবে-
وَإِن جَهَدَاكَ عَلَى أَن تُشْرِكَ بِى مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبَهُمَا فِى الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَىَّ ثُمَّ إِلَىَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ.
আর তারা [পিতামাতা] যদি তোমার উপর বলপ্রয়োগ করে- আমার সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করার জন্য, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তাদের আনুগত্য করো না। তবে দুনিয়াতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে থাকবে। আর ঐ ব্যক্তির পথ অনুসরণ করবে, যে [পুরোপুরি] আমার অভিমুখী হয়েছে। অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল। তখন আমি তোমাদের জানিয়ে দেব, যা কিছু তোমরা করতে। [সুরা লোকমান : ১৫]
আনাস : যাই হোক, আপনি দেওবন্দের আকাবিরগণের যে কর্মপদ্ধতি উল্লেখ করলেন, এভাবে হক জানা তো বিদগ্ধ আলেমদের কাজ। সাধারণ লোকেরা কী করবে? শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাই করার যোগ্যতা তো সকলের নেই।
যুবায়ের : সাধারণ লোকদের উপযোগী একটি পরামর্শ হলো, তাঁরা 'নবী রাসুলগণের উত্তরসূরি' বইয়ের 'সাধারণ মুসলমানদের করণীয়' অধ্যায়টি পাঠ করে নিজেদের করণীয় জেনে নিবেন।
আনাস : আলহামদুলিল্লাহ, বুঝতে পেরেছি। এখন একজন মাদরাসার শিক্ষার্থী হিসেবে লেখাপড়া বিষয়ক আমাকে কিছু উপদেশ দিন।
যুবায়ের : নিজের প্রতি ও তোমার প্রতি আমার উপদেশ হলো, আমরা যেন প্রথমে ভালোভাবে আরবিভাষা শিখি। نَظَارَةُ المُوَطَّأُ فِي العَرَبِيَّةِ الوَظِيفِيَّةِ 3 مُعَلَّمٍ وَنَظَرَاتُهُ ভূমিকায় উচ্চতর আরবিভাষা শেখার প্রয়োজনীয় অনেক নির্দেশনা এসেছে। الْمُوَطَّأُ কিতাবটির প্রথম তিন ইউনিটের প্রত্যেক 'নসে'র পর, অনুকরণের মাধ্যমে ভাষার মান উন্নত করার পর্যাপ্ত নমুনা এসেছে।
প্রাথমিক স্তরগুলো অতিক্রম করার পর এ সকল নির্দেশনার আলোকে কিতাবদুটি এবং 'নায্যারা'র লেখকের مُخْتَارَاتٌ مِنْ أَدَبِ الْعَرَبِ প্রভৃতি কিতাব থেকে যেন ভালোভাবে আরবিভাষা শিখি। পাশাপাশি ফকিহ ইমামগণের ব্যাখ্যার আলোকে কোরআন-হাদিস শেখার প্রতি মনোযোগী হই। এবং কিতাব-সুন্নাহের আলোকে যে কোনো অবস্থানের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাই-বাছাই করার যোগ্যতা অর্জন করি।
তোমাকে আমি এ উপদেশও দিচ্ছি, কোনো বিষয়ে কোনো বড় ব্যক্তির দেওয়া সিদ্ধান্তকে কোরআন-হাদিসে উল্লেখিত দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্তের মতো অকাট্য মনে করবে না; তাঁর সিদ্ধান্ত ভুলও হতে পারে। গবেষণার বিষয়গুলোতে তুলনামূলক ছোট ব্যক্তির সিদ্ধান্তও সঠিক হতে পারে। উম্মাহর ইতিহাসে এর পর্যাপ্ত উদাহরণ আছে।
আনাস : আরো কিছু বলুন।
যুবায়ের: হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন-
إِنَّ الحَقَّ لَا يُعْرَفُ بِالرِّجَالِ، اِعْرِفِ الحَقَّ تَعْرِفُ أَهْلَهُ.
ব্যক্তিদের দ্বারা হক চেনা যায় না। হক চেনো, তাহলে হকওয়ালাদেরকে চিনবে।
আনাস : বুঝলাম, আমাদের প্রথমে হক চিনতে হবে। কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে গেল, ব্যক্তি দিয়ে হক চেনা যায় না, তখন কীভাবে আমরা হকের সন্ধান পাব?
যুবায়ের : এর উত্তর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসে আছে-
تَرَكْتُ فِيْكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوْا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ.
আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে গেলাম; যতক্ষণ তোমরা তা আঁকড়ে ধরে থাকবে, পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবির সুন্নাহ। [মুআত্তা মালেক : ১৮৭৪, তাহকিক, বাশশার আওয়াদ মারুফ।]
সুতরাং হক চেনা ও ভ্রষ্টতা থেকে মুক্তি লাভের পদ্ধতি হলো, আল্লাহর কিতাব ও নবির সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা। হাদিসটি এ বাস্তবতার সুস্পষ্ট প্রমাণ, কেউ যদি কিতাব ও সুন্নাহ আঁকড়ে না ধরে, অবশ্যই সে পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ হয়ে যাবে।
তবে কিতাব-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার কাজটি হতে হবে সালফে সালেহিনের ব্যাখ্যার আলোকে। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে রয়েছেন মুজতাহিদ ফকিহ ইমামগণ। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُوْنَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُوْنَهُمْ.
সর্বোত্তম মানুষ হলো আমার প্রজন্ম। এরপর তাদের পরবর্তীরা। তারপর তাদের পরবর্তীরা। [সহিহ বুখারি : ২৬৫২, সহিহ মুসলিম: ৬৬৩৫]
আনাস : আচ্ছা, কিতাব ও রিজালের মাঝে সমন্বয়সাধন বিষয়ে আপনাদের এতো গুরুত্ব দেওয়ার রহস্য কী?
যুবায়ের : দীনের সঠিক রূপ পাওয়া ছাড়া আর কোনো রহস্য নেই। ভেবে দেখো!
আনাস : গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্যের জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। আমিন! ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
যুবায়ের : এগুলো বলা আমার কর্তব্য ছিল। আল্লাহ তোমাকেও জাযায়ে খায়ের দান করুন। ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

টিকাঃ
১. ২৮৪ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখিত একটি লেখার শিরোনাম হলো, 'পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব?'
২. আলেম পাঠকগণ المَوْسُوْعَةُ الفِقْهِيَّةُ الكُوَيْتِيَّةُ কিতাব (৭ : ১২৪) ঐ সকল শর্ত দেখে নিতে পারেন, যেগুলো মেনে নেওয়ার শর্তে তখনকার জিম্মিরা সাইয়িদুনা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট তাদেরকে নিরাপত্তাদানের আবেদন পেশ করেছিলো এবং হজরত ফারুকে আজম রাজিআল্লাহু আনহু তাদের দরখাস্ত গ্রহণ করেছিলেন। এই অধ্যয়ন দ্বারা বর্তমানের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিভিন্ন দেশের কাফেররা জিম্মি কি-না, তা বুঝা সহজ হবে। بصائر وعبر .
১. ২০৫-২০৭ নং পৃষ্ঠায় সংবিধানের কয়েকটি ধারা দ্রষ্টব্য।
২. সুরা তাগাবুন : ২ দ্রষ্টব্য।
১. এ লেখক নিজকে এবং তার প্রিয় পাঠকদেরকে যখনই সুযোগ হয় এ দুআটিসহ 'অনুবাদকের নিবেদনে'র শেষদিকে উল্লেখিত দুআগুলো করার বিশেষভাবে ওসিয়ত করছে।
১. এ ধরনের আরেকটি উদাহরণ হলো গণতন্ত্র। ১৮৪-১৮৫ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
২. ২৫৯-২৬৪ নং পৃষ্ঠায় 'তাকফিরু আহলিশ্ শাহাদাতাইনি' কিতাব সম্পর্কে একজন সৌদি আলেমের মন্তব্য পাঠ করুন।
১. যাদের মধ্যে বিশেষভাবে রয়েছেন উম্মাহর মুজতাহিদ ফকিহ ইমামগণ।
২. অনুষ্ঠানটি দারুল উলুম প্রতিষ্ঠার হিজরি ক্যালেন্ডার হিসেবে ১১৭ বছর এবং ঈসায়ি ক্যালেন্ডার অনুযায়ি ১১৪ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়। সময়কাল ছিল ৩-৫ জুমাদাল উলা ১৪০০ হিজরি মোতাবেক ২১-২৩ মার্চ ১৯৮০ ঈসায়ি। উল্লেখ্য, দারুল উলুম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৫ মহররম ১২৮৩ হিজরি মোতাবেক ১ মে ১৮৬৬ ঈসায়িতে।
১. এ অনুবাদের মূল আরবি ইবারত নিম্নরূপ- فَلَمْ تَجْعَلْ هَذِهِ الجَمَاعَةُ كُلَّ اعْتِمَادِهَا عَلَى السَّلَفِ وَالشَّخْصِيَّاتِ دُوْنَ الاسْتِنَارَةِ بالكتاب والسُّنَّةِ، وَلَمْ تَسْتَبِدَّ بِرَأْيِهَا فِي فَهم الكتاب والسُّنَّةِ مُسْتَغْنِيَةٌ عَنْ مَاثِرِ السَّلَفِ العِلْمِيَّةِ وَمَذَاقِهِمْ وَهَدْيِهِمْ، بَلْ صَارَ شِعَارُهَا اتَّبَاعَ السَّلَفِ الصَّالِحِ فِي ضَوْءِ الكتاب والسُّنَّةِ وفَهُمَ مُرَادَاتِ الكتاب والسُّنَّةِ مَعَ الاستنارة بآرَاءِ السَّلَفِ الصالح ومَذَاقِهم العِلْمِي المُتَوَارَثِ، فَلَمْ يَضِلُّوا عَمَلًا وَفِكْرًا. (انظر : العدد الخاص لمجلة «الداعي» الصادرة عن الدار بمناسبة الحفلة المئوية، ص ٨٠)
২. نَظَارَةُ مُعَلَّمٍ وَنَظَرَاتُهُ দ্রষ্টব্য। উল্লেখ্য, মুফতি সাহেব রাহিমাহুল্লাহর যারা সরাসরি ছাত্র এবং তাঁর মেজাজ সম্পর্কে অবগত, তাঁরা জানেন, তিনি এ ধরনের সংস্কারমূলক কথা হরহামেশাই বলতেন। তাই তাঁর এ ধরনের উক্তির জন্য কিতাবি উদ্ধৃতি পেশ করার বাস্তবে প্রয়োজন নেই। এ সংলাপ লেখকের সৌভাগ্য যে, তার রচিত نَظَارَةُ مُعَلَّمٍ وَنَظَرَاتُهُ কিতাবটির প্রথম খণ্ড হজরত মুফতি সাহেব বেশ সময় নিয়ে দেখেছেন। কিতাবটির শেষ দিকে حَدِيثُ النَّفْسِ [আত্মকথন] শিরোনামে একটি বিস্তারিত লেখা আছে। ৬ জুমাদাল উলা ১৪৪০ হিজরি [১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ঈসায়ি। মঙ্গলবার হজরত ফোনে লেখককে সাধারণভাবে কিতাবটির জন্য এবং বিশেষভাবে এ লেখাটির জন্য অনেক বাহবা দিয়েছেন। তাঁর কয়েকটি বাক্য হলো- 'বোল বোল ভি হ্যায়'। 'সাফ সাফ ভি হ্যায়।' 'আওর বহুত সহি লেখে হ্যায়।' 'উসে বহুত পসন্দ আয়া।' আলহামদুলিল্লাহ। উল্লিখিত বাণীটি কিতাবটির কভারের তৃতীয় পৃষ্ঠায় মুদ্রিত রয়েছে। এ হিসেবে 'নাযযারা' কিতাবটি এ লেখকের নিজস্ব রচিত হলেও বাণীটির জন্য তার হাওয়ালা দেওয়া হয়েছে।
১. 'ফাতাওয়ায়ে রশিদিয়া', পৃ. ১১৭ দ্রষ্টব্য।
২. 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা', ১ : ৪০২। মাকতাবায়ে হেজাজ দেওবন্দ, ১৪৩১ হি./২০১০ ঈ.।
১. সন্দেহের ধরণ বুঝার জন্য উদাহরণস্বরূপ আন্তঃধর্মীয় বৈঠকের নিম্নের লিংকদুটি দ্রষ্টব্য- https://www.youtube.com/watch?v=ia5rbafPV_w https://www.youtube.com/watch?v=tLCNMUxJCWM প্রথম লিংকের বিশেষভাবে ৯ মিনিট পরবর্তী অংশ দ্রষ্টব্য। লিংকদুটি দেওয়া হয়েছে নিম্নের আয়াতটির উপর আমল করার জন্য। يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ. হে ঈমানদারগণ! তোমরা হও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী, হও আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দানকারী, যদিও তা হয় তোমাদের নিজেদের বিপক্ষে। [সুরা নিসা : ১৩৫]
১. 'মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো?' প্রথম প্রকাশ, পৃ. ৪৯৯, অনুবাদ, মাওলানা আবু তাহের মিছবাহ।
১. অর্থাৎ মুসলিম বিশ্ব। ১৬০-১৬১ নং পৃষ্ঠায় মুহাদ্দিসুল আসর [যুগের মুহাদ্দিস] আল্লামা ইউসুফ বিন্নুরি রাহিমাহুল্লাহর উক্তি দ্রষ্টব্য।
১. মুসলিম জীবনের নাগরিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভৃতি বিষয়গুলোও ধর্মীয়। মুসলমানের কোনো কাজ তাঁর ধর্মের বাইরে নয়। লেখক এখানে 'ধর্মীয়' শব্দ দ্বারা সম্ভবত সালাত সিয়াম প্রভৃতি নিছক পারলৌকিক বিষয়গুলো বুঝিয়েছেন। লেখকের পরবর্তী 'জাগতিক ও ধর্মীয় জীবনের' শব্দের ব্যবহার দ্বারাও বিষয়টি প্রতীয়মান হয়।
২. যেমন- তারা যদি গণতন্ত্র গ্রহণ বা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন করার আদেশ করে, যে গণতন্ত্র আকাবির-আসলাফের ঐকমত্যে কুফর ও শিরক।
১. প্রশ্ন : 'কেনো জ্ঞান নেই'? উত্তর : শিরকের পক্ষে অস্তিত্বের জগতে কোনো জ্ঞান না থাকার কারণে জ্ঞান নেই। এমন নয় যে, শিরকের পক্ষে ও তাওহিদের বিপক্ষে বাস্তবে জ্ঞান ও যৌক্তিকতা আছে, কিন্তু এই ব্যক্তির উক্ত জ্ঞান ও যৌক্তিকতা অর্জন নেই।
১. প্রাথমিক স্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে তিন খণ্ডে সমাপ্ত এ লেখকের كيف نتعلم الإنشاء সিরিজ, এবং তাঁর অনুশীলনী সম্বলিত তিন খণ্ডের القراءة الراشدة ও পাঁচ খণ্ডের কাসাসুন নাবিয়্যিন। [ইউটিউবে albab institute লিখে সার্চ করলে كيف نتعلم الإنشاء সিরিজের প্রথম খণ্ডসহ লেখকের বিভিন্ন রচনা শোনা ও দেখা যাবে।] এই সবগুলোর আগে আয়ত্ত করতে হবে তিন খণ্ডের الطريق إلى العربية ও التمرين الكتابي على الطريق إلى العربية কিতাবদুটির তামরিনগুলো। তারও আগে পড়ার জন্য এ লেখকের المُفْرَدَاتُ العَرَبِيَّةُ (আরবি শব্দমালা) নামে একটি পুস্তিকা আছে।
১. উক্তিটির উদ্ধৃতি ১৬ নং পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য।

📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর > 📄 আকাবির-আলাফের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র

📄 আকাবির-আলাফের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র


পুত্র : আসসালামু আলাইকুম, আব্বু!
পিতা: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
পুত্র : আব্বু! আমার কিছু জানার ছিল ।
পিতা: বলো, কী জানতে চাও?
পুত্র : হাকিমুল উম্মত হজরত থানবি রাহিমাহুল্লাহর [১২৮০-১৩৬২ হি.] একটি বাণী শুনলাম। সে সম্পর্কেই জিজ্ঞাসা করতে চাচ্ছি।
পিতা: কী সেটা?
পুত্র : শুনলাম, ইমামে রাব্বানি হাকিমুল উম্মত হজরত মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'ইসলামে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলে কিছু নেই!' এ বর্ণনা কি সঠিক?
পিতা: তুমি ঠিক কথাই শুনেছ। হজরত তাঁর 'আশরাফুল জাওয়াব' কিতাবের ৩য় খণ্ডের ৩১৯ নং পৃষ্ঠায় তা বলেছেন। ৩২১ নং পৃষ্ঠায় তিনি আরো বলেছেন, 'কিছু মানুষের বোকামি এতো চরমে পৌঁছেছে যে, তারা ইসলামে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুপ্রবেশ ঘটাতে চেয়েছে। তাদের দাবি হলো, ইসলামে গণতন্ত্রেরই শিক্ষা রয়েছে। এর স্বপক্ষে তারা প্রমাণ পেশ করেছে আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী দিয়ে-
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ.
এবং [প্রয়োজনীয়] বিষয়ে আপনি তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। [সুরা আলে ইমরান: ১৫৯] কিন্তু তা সম্পূর্ণ ভুল। লোকেরা পরামর্শের ধারাকেই পাল্টে দিয়েছে। ইসলামে পরামর্শের যে অবস্থান রয়েছে, তারা তা বুঝেইনি।'
পুত্র : আমি আরো জানতে পেরেছি, শায়খুল ইসলাম হজরত মাওলানা সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানি রাহিমাহুল্লাহ [১২৯৬-১৩৭৭ হি.] পাকিস্তান সম্পর্কে বলেছেন, 'সেখানকার সরকার ইউরোপীয় পদ্ধতির গণতান্ত্রিক সরকার। তাতে জনসংখ্যা অনুপাতে মুসলিম-অমুসলিম সকলেই অংশীদার। তাকে ইসলামি সরকার বলা ভুল।'
পিতা: তুমি ঠিক শুনেছ। বাণীটি 'মাকতুবাতে শায়খুল ইসলাম' কিতাবের ২য় খণ্ডের ২৪২ নং পৃষ্ঠায় আছে। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইদরিস কান্ধলবি রাহিমাহুল্লাহর [১৩১৭-১৩৯৪ হি.] বক্তব্য শুনেছ কি?
পুত্র : না তো! বলুন আব্বু! বলুন! আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন!
পিতা: শোনো তাহলে। হজরত তাঁর 'আকাইদুল ইসলাম' কিতাবের ১ম খণ্ডের ১৯৫ নং পৃষ্ঠায় বলেছেন, 'যে সরকার আল্লাহর কর্তৃত্ব এবং শরিয়তের বিধিবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতা স্বীকার করে না, বরং বলে- সরকার জনসাধারণ ও শ্রমিকদের, এবং দেশের আইন তা-ই হবে যা জনসাধারণ ও শ্রমিকরা মিলে তৈরি করবে, তাহলে এ ধরনের সরকার নিঃসন্দেহে কাফের সরকার।'
প্রায় এমন কথাই বলেছেন আল্লামা শহিদ ইউসুফ লুধিয়ানবি রাহিমাহুল্লাহ [মৃ. ১৪২১ হি.]।
পুত্র : তিনি কী বলেছেন, আব্বু! বলুন না!
পিতা: 'আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল' কিতাবের ৮ম খণ্ডের ২০২ নং পৃষ্ঠায় হজরত লিখেছেন, 'অথচ পশ্চিমারা যে গণতন্ত্রের পূজারি, তা শুধু এতটুকুই নয় যে, ইসলামের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই, উপরন্তু তা ইসলামের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত। তাই ইসলামের সঙ্গে গণতন্ত্রের জোড়া লাগানো এবং গণতন্ত্রকে ইসলাম দ্বারা সম্মানিত করা সুস্পষ্ট ভুল।'
পুত্র : একজন আলেম বলেছেন, গণতন্ত্রের যতটুকু ইসলাম অনুমোদন করে, গণতন্ত্র থেকে ততটুকু নেওয়ার সুযোগ আছে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
পিতা: আচ্ছা বলো তো, গণতন্ত্রের যে দিকগুলো গ্রহণ করার জন্য তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলো ইসলামে আছে?! যদি থেকে থাকে, তাহলে ইসলাম থেকে না নিয়ে গণতন্ত্র থেকে নেব কেনো? আর যদি ইসলামে না থাকে, তাহলে সেগুলো গ্রহণযোগ্য হওয়ার দলিল কী?!
এবার শোনো, কোনো মতবাদ কুফরি হওয়ার জন্য ঐ মতবাদের সকল দিক কুফরি হওয়া আবশ্যক নয়। খ্রিস্টবাদ-ইহুদিবাদের সকল দিক কুফর, বিষয়টি এমন নয়। অন্যান্য কুফরি মতবাদেও এমন বিষয় আছে, যার সঙ্গে ইসলামের কোনো বিরোধ নেই। তাই বলে সেগুলো 'ইসলামি খ্রিস্টবাদ' ও 'ইসলামি ইহুদিবাদ' হয়ে যাবে না। ঠিক তেমনি গণতন্ত্রও কখনো 'ইসলামি গণতন্ত্র' হতে পারে না।
পুত্র : আব্বু! গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ভোট দেওয়া প্রসঙ্গে কয়েকজন আকাবিরের কথা আমাকে শোনান।
পিতা: 'খাযায়েনে মারেফত ও মহব্বত' কিতাবের ১৮৩ নং পৃষ্ঠায় আরিফ বিল্লাহ শায়খ হাকিম মুহাম্মদ আখতার রাহিমাহুল্লাহ [মৃ. ১৪৩৪ হি.] বলেছেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে নবুওয়াতের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন নির্বাচন ও ভোটের বিবেচনায় তাঁর সাথে কেউ ছিল না। তাঁর নিকট শুধু নিজের ভোট ছিল। তিনি কি তখন এই বলে নবুওয়াতের ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেহেতু আমার বিরুদ্ধে, অধিকাংশ যেহেতু আমার বিপরীতে, তাই নবুওয়াতের ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত থাকছি?'
এ প্রসঙ্গে জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের দারুল ইফতার সাবেক প্রধান মুফতি হামিদুল্লাহ জান রাহিমাহুল্লাহ [মৃ. ১৪৩৮ হি.]-এর একটি মূল্যবান বক্তব্য আছে।
পুত্র : তিনি কী বলেছেন?
পিতা: 'আদয়ান কি জঙ্গ' কিতাবের ৫৬ নং পৃষ্ঠায় আছে, মুফতি সাহেব রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'ভোটের ব্যবহার দ্বারা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যত মেনে নেওয়া হয়, এবং তার সকল অন্যায়ে ব্যক্তি অংশীদার হয়ে যায়। তাই প্রচলিত পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার অধীনে ভোটের ব্যবহার শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়।'
পুত্র : আব্বু! কেউ কেউ বলেন, গণতন্ত্র ও বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতিতে যতই ত্রুটি থাক, এ কারণে ভোটপ্রদানে বিরত থাকা উচিত হবে না। কারো মধ্যে যদি ইসলামবিরোধিতা ও রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধিতার লক্ষণ পাওয়া যায়, তাহলে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তার বিজয় ঠেকাতে হবে।
কোনো আসনে একজন লোককেও যদি সাক্ষ্য ও ভোট দেওয়ার উপযুক্ত মনে না হয়, তাহলে তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নীতি-নৈতিকতা, চিন্তা-চেতনা ও কাজ-কর্মে অন্য প্রার্থীর তুলনায় কম খারাপ, তাকেই ভোট দিতে হবে।
পিতা: তাদের উক্ত বক্তব্য সম্পর্কে একজন আলেম চমৎকার বলেছেন- গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের পক্ষে কথা বললে তা হবে ইসলামবিরোধী, আর এগুলোর বিপক্ষে কথা বললে তা হবে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রবিরোধী। এমতাবস্থায় তুমিই বলো, কোনো প্রার্থীর ক্ষেত্রে ইসলামবিরোধী না হওয়া ও রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী না হওয়ার গুণদুটি একসঙ্গে পাওয়ার পদ্ধতি কী?
তাছাড়া তারা যদি শুধু ইসলামের শিরোনাম ব্যবহারকারী প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কথা বলতেন, দলিলের আলোকে তা সমর্থনযোগ্য না হলেও তার একটা পর্যায় ছিল। কিন্তু ঢালাওভাবে যে ভোটপ্রদানকে আবশ্যক করা হলো, সে ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন আসলে তারা কী উত্তর দেবেন-
আমাদের এলাকায় দুজন প্রার্থী যারা নীতি-নৈতিকতায় উনিশ-বিশ। একজন কাদিয়ানি ধর্মে বিশ্বাসী, অপরজন দেওয়ানবাগির নির্ভেজাল মুরিদ। এক্ষেত্রে আমরা কাকে ভোট দেব?
অথবা আমাদের আসনে দুজন প্রার্থীর একজন মুসলমান থেকে সদ্য খ্রিস্টান হয়ে যাওয়া মুরতাদ, তবে তার নীতি-নৈতিকতা বর্তমান সমাজের দৃষ্টিতে ভালো। অপরজন নামে মুসলমান হলেও সমাজের মানুষ গালি দেওয়া ব্যতীত তার নাম মুখে নেয় না। এক্ষেত্রে আমরা কাকে ভোট দেব?
অথবা আমাদের আসনে দুজন প্রার্থী। একজনের নীতি-নৈতিকতা সমাজের দৃষ্টিতে খুব ভালো, কিন্তু তাকে ভোট দিলে যে দল ক্ষমতায় যাবে, সেটি ইসলামবিদ্বেষী। অপর প্রার্থীকে মানুষ 'হারামজাদা' ছাড়া কথা বলে না, তাকে ভোট দিলে যে দল ক্ষমতায় যাবে, তাকে অনেকটা ইসলামবান্ধব মনে করা হয়। এ ক্ষেত্রে আমরা কাকে ভোট দেব? এ জাতীয় অসংখ্য প্রশ্নের তারা কী উত্তর দেবেন?
পুত্র : তাহলে আমাদের যেসকল আকাবির গণতন্ত্রের রাজনীতি করেছেন, এবং প্রচলিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
পিতা: তোমার প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই দেব ইনশাআল্লাহ। তবে আগে বলো, গণতন্ত্র গ্রহণ করা ও প্রচলিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে এ সকল আকাবিরের সঙ্গে আমাদের ভিন্নমত পোষণ করার অর্থ কি, আমরা সকল আকাবিরের সঙ্গেই ভিন্নমত পোষণ করি?
পূত্র: বিষয়টি এমন নয়। কারণ, আপনাদের পক্ষেও অসংখ্য আকাবির রয়েছেন। অতএব আপনারা যদি গণতন্ত্রগ্রহণকারী ও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী আকাবিরদের খেলাপ করেন, তখনও আপনারা আকাবিরের অনুসরণকারী; আকাবিরবিরোধী কখনই নন।
পিতা: এই তো বুঝে গেছো! মাশাআল্লাহ। আল্লাহ তোমার বুঝে বরকত দান করুন! তোমাকে এ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাই আমার উদ্দেশ্য ছিল। কেননা কিছু মানুষ এ পরিমাণ বোকা, যখনই কাউকে কোনো বিষয়ে কতিপয় আকাবিরের সাথে দ্বিমত করতে দেখে, কোনোরূপ চিন্তাভাবনা ছাড়াই চটজলদি বলে ওঠে, ‘সে আকাবির বিরোধী'; যদিও তার গ্রহণকৃত মতটি অনেক আকাবিরেরই মত।
পুত্র : ঠিক বলেছেন, আব্বু! এরপরও আমার প্রশ্ন, প্রচলিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমাদের যেসকল আলেম দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাঁদের ব্যাপারে আপনার কী মত? ভুলে যাবেন না, তাঁরা কিন্তু ‘জমহুর' [অধিকাংশ]!!
পিতা: ‘জমহুর' বলে তুমি কী বুঝাতে চেয়েছ? তোমার উদ্দেশ্য কি এটা, সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে আমাদের এই আলেমগণই সেই ‘জামাআত', যাকে আঁকড়ে ধরার জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের আদেশ করেছেন?
যেমন সুনানে তিরমিযিতে বর্ণিত হয়েছে- [অর্থ] ‘জামাআত'কে আঁকড়ে ধরো। ভেদাভেদ থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, শয়তান একজনের সঙ্গে থাকে। সে দুজন থেকে অনেক দূরে থাকে। যে ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যভাগ চায়, সে যেন ‘জামাআত'কে আঁকড়ে ধরে।
'মুসনাদে আহমদে' বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি 'জামাআত' থেকে এক বিঘত দূরে সরল, সে আপন ঘাড় থেকে ইসলামের শৃঙ্খল খুলে ফেলল।
পুত্র : আব্বু! আমি আপনার থেকে কিছুই গোপন করব না। হ্যাঁ, আমি এটাই বুঝিয়েছি। আর এর উপর ভিত্তি করে আমার একটি বড় প্রশ্ন আছে। সেটা হলো- আপনি জানেন, বাংলাদেশের 'জমহুর' উলামায়ে কেরাম সরকার থেকে কওমি মাদরাসার সার্টিফিকেটের স্বীকৃতি গ্রহণ করেছেন। তদ্রূপ স্বীকৃতিপ্রদান উপলক্ষে এক সুবিশাল শোকরানা মাহফিলের আয়োজন করে সরকারের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন ।
অল্প কয়েকজন আলেম আছেন যারা স্বীকৃতি ও শোকরানা বিষয়ে 'জমহুর' আলেমগণের সাথে বিভিন্ন কারণে দ্বিমত পোষণ করেছেন। এমতাবস্থায় কি বলা যাবে, স্বীকৃতি গ্রহণকারী ও শুকরিয়া জ্ঞাপনকারীগণ হলেন 'জামাআত'; এবং তাঁদের সাথে দ্বিমত পোষণকারীরা 'জামাআত' পরিত্যাগ করে নিজেদের ঘাড় থেকে ইসলামের শৃঙ্খল খুলে ফেলেছেন?
পিতা: তুমি এটা কী শোনালে আব্বু! আমার কল্পনাও ছিল না যে, তোমার মতো ছেলে কখনো এমন প্রশ্ন করতে পারে!
এরপরও যেহেতু প্রশ্ন করেছ, তাই বলছি- নমুনা হিসেবে শোনো, সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজিয়াল্লাহু আনহু কী বলেছেন! তিনি বলেছেন, 'অধিকাংশ মানুষ জামাআত থেকে দূরে সরে গেছে। জামাআত হলো যা সত্যের অনুকূল হয়, আপনি একা হলেও।
অর্থাৎ হাদিসের 'জামাআত' শব্দ দ্বারা হকের জামাআত বা সত্যের অনুসারী উদ্দেশ্য। সত্যের অনুসারী একজন হলেও, সে-ই জামাআত।
তুমি বুঝেছ, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজিয়াল্লাহু আনহু এখানে কী বলেছেন? তিনি বলেছেন, অধিকাংশ মানুষ হকের জামাআত থেকে দূরে সরে গেছে; এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী- 'সে যেন জামাআতকে আঁকড়ে ধরে' এবং 'যে ব্যক্তি জামাআত থেকে দূরে সরল' দ্বারা ঐ ব্যক্তি উদ্দেশ্য, যিনি সত্যের অনুসারী, যদিও এমন লোক একজনই হন। এখানে 'জামাআত' দ্বারা কখনো 'জমহুর' তথা অধিকাংশ উদ্দেশ্য নয়।
তারপর দেখ, ইমাম নববি রাহিমাহুল্লাহর [৬৩১-৬৭৬ হি.] উস্তাদ ইমাম হাফেজ আবু শামা রাহিমাহুল্লাহ [৫৯৬-৬৬৫ হি.] কী বলেছেন- 'যেখানে জামাআত আঁকড়ে ধরার আদেশ এসেছে, সেখানে সত্য আঁকড়ে ধরা উদ্দেশ্য, যদিও সত্য আঁকড়ে ধরা ব্যক্তি সংখ্যায় কম হন এবং বিরোধী বেশি হয়।
ইমাম আবু ইসহাক শাতেবি রাহিমাহুল্লাহ [মৃ. ৭৯০ হি.] বলেছেন, 'জামাআত হলো ঐ জিনিস যার উপর ছিলেন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরام এবং তাঁদের পরিপূর্ণ অনুসারীগণ।'
এ হিসেবে 'জামাআতকে আঁকড়ে ধরা'র অর্থ হচ্ছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম এবং তাঁদের পরিপূর্ণ অনুসারীগণের আদর্শ আঁকড়ে ধরা। অধিকাংশ লোককে আঁকড়ে ধরা মোটেই উদ্দেশ্য নয়।
উদাহরণস্বরূপ তোমাকে প্রশ্ন করতে চাই; 'খালকে কোরআন' [কোরআন আল্লাহর সৃষ্টি, নাকি গুণ] বিষয়ে সত্যের উপর কে ছিলেন? ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ [১৬৪-২৪১ হি.], নাকি সে যুগের জমহুর আলেমগণ? স্বভাবতই তুমি বলবে, ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন সত্যের পতাকা ধারণকারী; এবং জমহুর আলেম ছিল বাতিলের পক্ষে।
পুত্র : তাহলে কি বলব, সংখ্যাধিক্যের কোনো ধর্তব্য নেই?
পিতা: ইমাম গাজ্জালি রাহিমাহুল্লাহ তাঁর 'আলমুসতাসফা' কিতাবের ২৮৯ নং পৃষ্ঠায় 'ইজমার মাসআলা অধ্যায়ে' বলেছেন- 'সত্যের অনুসারীদের ক্ষেত্রে কীভাবে সংখ্যাধিক্য ধর্তব্য হবে, অথচ বহু আয়াত ও হাদিসে সত্যের অনুসারীদের সংখ্যা-স্বল্পতার কথা বলা হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সেদিন তারা স্বল্পসংখ্যক হবে। অন্যত্র বলেছেন, দীন অপরিচিত হয়ে ফিরে আসবে যেভাবে শুরু হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, [অর্থ) তাদের অধিকাংশ বুঝে না। অন্যত্র ইরশাদ করেন, আমার বান্দাদের মধ্য থেকে অল্পসংখ্যকই কৃতজ্ঞ। আরো ইরশাদ করেন, কত ক্ষুদ্র দল আল্লাহর হুকুমে বড় দলের উপর বিজয়ী হয়েছে!'
পুত্র : এ ধরনের জটিল ও কঠিন বিষয়ের সহজ সমাধানের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনি কত মহানুভব! আল্লাহ আপনাকে সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন।
আচ্ছা, আব্বু! কওমি মাদরাসার শিক্ষার সরকারি স্বীকৃতি, শুকরিয়া মিছিল, শোকরানা মাহফিল, সরকারি খরচে শীর্ষ আলেমদের হজযাত্রায় গমনের কারণে গণমানুষের নিকট আমাদের কোনো সম্মান নষ্ট হয়েছে কি?
পিতা: এ সকল কারণে আমরা কী পরিমাণ তুচ্ছ হয়েছি, তা বুঝার জন্য প্রয়াত ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহর [১৯৪৫-২০২০ ঈ.) একটি উক্তি তোমাকে শোনাতে পারি- 'এবার হজেও কিন্তু আমি প্রত্যেকটা কাজ একটু হেকমতের সাথে করতে পারলে ভালো হয় না? আমি আমার যাদেরকে পছন্দ, তাকে নিছি। যারা চিৎকার করত, তাদেরকেও সাথে নিছি। কী জন্যি? যে নামাজের সময় যদি কুত্তা ঘেউ ঘেউ করে, নামাজ নষ্ট হয় না? তাহলে কুত্তাডারে যদি এক ভাগ বা এক কেজি মাংস খাওয়াই দিয়া কই- খা, তাহলে মাংস খাইতে থাকল, তা তো আর ডাকাডাকি করতে পারল না। মাঝখান দিয়া এতমিনানের সাথে আমার নামাজটা হইয়া গেল। আমি যাদেরকে নিতে চাইছি, যাদেরকে নিলে আমাদের সুবিধা হবে, আল্লাহ পাক তাদেরকে নিছে। যারা চিৎকার করে ঘেউ ঘেউ করবে, তাদেরও কিছু দিছি। শর্ত ছিল, যাহোক, অনেক লম্বা, সবাই মিলে কিন্তু আল্লাহর রহমতে কোনো গোলমাল-গোলোযোগ হয়নি।
এটি ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের অংশবিশেষ। তার বক্তব্য থেকে একজন আলেম অনেকগুলো বিষয় উদ্ভাবন করেছেন। কয়েকটি নিম্নরূপ-
১. যেসকল আলেমকে ধর্মনিরপেক্ষতার অধীনে হজ করার জন্য আহ্বান করা হয়নি, তাঁরাও বিভিন্ন কৌশলে ও বিভিন্ন মাধ্যমে হজের এ ধর্মনিরপেক্ষ কাফেলায় শরিক হওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। আর এভাবে দশ/বার জনের কাফেলা পঞ্চাশ/ষাট জনের কোটায় পৌঁছেছে।
২. ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি কোনো কোনো আলেমকে হজের সফরের জন্য আহ্বান করেছে, তাদের ঘেউ ঘেউ থামানোর জন্য।
৩. ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি যাদেরকে হজে নিয়েছে, কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে তাদের অনেকের জন্য হজটি ছিল কুকুরকে দেওয়া গোশতের টুকরা সদৃশ।
৪. ধর্মনিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে যেসকল আলেম কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করার মাধ্যমে তাদের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির গতিপথে ঝামেলা সৃষ্টি করে, একটি গোশতের টুকরা দিয়ে তাদের ঘেউ ঘেউ থামানোর জন্য সরকারি খরচে হজের আয়োজনটি করা হয়েছে।
৫. যাদেরকে হজে নিলে ধর্মনিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের সুবিধা হবে, কর্তৃপক্ষ তাদেরকেই নিয়েছে।
পুত্র : ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আচ্ছা আব্বু! ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কী বুঝায়?
পিতা: দেশের সংবিধানে 'আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' বাক্যটি ছিল। ৩০ জুন ২০১১ ঈসায়িতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাক্যটি বিলুপ্ত করে তার স্থলে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এর দ্বারা যেকেউ বুঝতে পারে, ধর্মনিরপেক্ষতা এমন একটি মতবাদ যা আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিশ্বাস, কর্ম ও উক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে। অন্যভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতা হলো, আইনবিভাগ, বিচারবিভাগ ও নির্বাহীবিভাগ পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ধর্মের পক্ষে না থাকা; এ সকল বিভাগ সংশ্লিষ্ট ইসলামের বিধানসমূহ প্রত্যাখ্যান করা এবং এই বিশ্বাস করা যে, দেশ পরিচালনায় ধর্মের কোনো প্রভাব থাকবে না।
পূত্র : আব্বু! আমি পুনরায় আগের প্রশ্নে ফিরে যাচ্ছি। প্রশ্নটি হলো, প্রচলিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় রত আমাদের আলেমদের সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?
পিতা: আমাদের আলেমদের ইখলাসের ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তবে সর্বাবস্থায় নিষ্পাপ নয় এমন কাউকে -তিনি আমাদের আকাবির হলেও- আমরা শরিয়তের সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণের উপর প্রাধান্য দেব না। জরাহ-তাদিলের কিতাবাদিতে আকাবিরগণ এটাই আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁরা আমাদেরকে কোরআন-হাদিসের আলোকে সালফে সালেহিনের অনুসরণ করা শিখিয়েছেন। তদ্রূপ সালফে সালেহিনের ইলমি রুচির আলোকে কোরআন-হাদিস বুঝার তালিম দিয়েছেন।
আচ্ছা, তুমি চাইলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামি আইনের বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়া বিষয়ে, পাকিস্তানের কয়েকজন আকাবিরের অভিজ্ঞাতানির্ভর বক্তব্য তোমাকে শোনাতে পারি।
পুত্র : বিশেষভাবে পাকিস্তানের আকাবিরদের বক্তব্য শোনাতে চাচ্ছেন কেনো?
পিতা: কারণ, পকিস্তানের জন্মই হয়েছিল ইসলামের শিরোনামে। তাই সেখানকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের আলোকে বলা তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা থেকে গ্রহণ করার মতো আমাদের শিক্ষণীয় অনেক উপাদান রয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ইসলাম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য। এর প্রমাণ হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা অংশের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদটি শোনো- 'আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।'
পুত্র : তাহলে পাকিস্তানে যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব না হয়, বাংলাদেশে তো কখনোই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। যাই হোক, সেখানকার কয়েকজন আকাবিরের অভিজ্ঞাতানির্ভর যে কথাগুলো আমাকে শোনাতে চেয়েছেন, অনুগ্রহপূর্বক বলুন।
পিতা: প্রসিদ্ধ 'আহসানুল ফাতাওয়া' কিতাবের লেখক আল্লামা মুফতি রশিদ আহমদ লুধিয়ানবি রাহিমাহুল্লাহ [মৃ. ১৪২২ হি.] লিখেছেন, '... যখন তাদেরকে [গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম বানানোর উদ্দেশ্যে আন্দোলনকারী আকাবিরগণের অনুসারীদেরকে] বলা হয়, আপনারা তো ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার দাবিদার। কিন্তু আপনারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজেরা যে কর্মপন্থা [গণতন্ত্র] অবলম্বন করছেন, তা তো অনৈসলামিক ও নাজায়েজ।
তখন তারা প্রত্যুত্তরে বলে, যদিও এ পদ্ধতি নাজায়েজ, কিন্তু তা ব্যতীত ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ জন্য এখন জায়েজ-নাজায়েজের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করা আবশ্যক। ক্ষমতা অর্জিত হলে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করব।
এটি ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়। তাঁদের নিয়তের ব্যাপারে আমরা সন্দেহ করছি না; কিন্তু তাঁদের কর্মপদ্ধতি এমন, যার মাধ্যমে কখনোই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশা করা যায় না। কেননা অনৈসলামিক পদ্ধতিতে দীনহীনদের জন্য তো সফলতা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু দীনদারদের জন্য প্রথমত সফলতা অর্জন করাই সম্ভব নয়। আর যদি বাহ্যত সফল হয়েও যায়, তবু তার পরিণামে ইসলাম আসবে না। বরং ইসলামের নামে অন্য কিছু হবে।
পুত্র : আব্বু! আরো বলুন।
পিতা: পূর্বে জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের দারুল ইফতার প্রধান মুফতি হামিদুল্লাহ জান রাহিমাহুল্লাহর একটি মূল্যবান বক্তব্য শুনেছ। তিনিই বলেছেন,
৫০ বছরের চেয়েও বেশি সময় আমরা লোকদের কাছে ভোট চেয়েছি। লোকেরা আমাদের ভোট দিয়েছে। কখনো এমনও হয়েছে, আমাদের ৮৫ জন মেম্বার [সংসদ সদস্য] অর্জন হয়েছে, জাতীয় এসেম্বলিতে [সংসদে] যথেষ্ট আধিক্যতা অর্জন হয়েছে। কিন্তু আপনারা দেখেছেন, কোন্ ইসলামি বিধানটা এসেছে?
তাঁরা বলেন, আমরা প্রতিরক্ষা করছি। প্রতিরক্ষা কাকে বলে? [তথাকথিত] নারী অধিকার বিল পাশ হয়েছে। কেউ তা প্রতিহত করতে পেরেছে? জবাব দিন! [সংসদে কিছু] বলা তো উদ্দেশ্য নয়। প্রতিরক্ষার অর্থ তো হচ্ছে কাজটাকে রুখে দেওয়া। প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্য তো আগে বুঝে নিন। প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্য তো শুধু বলা নয়। প্রতিরক্ষার অর্থ তো হচ্ছে প্রতিহত করা। কে প্রতিহত করেছে সে বিলকে? পাস হয়েছে কি-না, বলুন?
আমি আরজ করব, আল্লাহর ওয়াস্তে আগে বাস্তবতা বুঝুন! হে মৌলবিরা! তাওবা করুন। আমি বলছি, আমি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশ নিয়েছি। ৭০ সালে আমি মাওলানা সদরুশ শহিদের প্রার্থী ছিলাম। পাসও করেছি। ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পাস করেছি। কিন্তু আমি পরিষ্কার ভাষায় বলছি, আমি এই গোনাহ থেকে তাওবা করে নিয়েছি। আল্লাহ আমাদের তাওবা কবুল করুন। আপনাদের কাছে দরখাস্ত করছি, আপনারাও তাওবা করুন এবং খেলাফত শাসনব্যবস্থার জন্য আন্দোলনের মূল ভিত্তি অনুসারে ময়দানে আসুন। ঘাবড়াচ্ছেন কেন? আসুন, ময়দানে আসুন। [খোলাফায়ে রাশেদিনের পদ্ধতিতে কাজ করে] দেখুন, ইসলামি শাসনব্যবস্থা আসে কি-না!
পুত্র : অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। আল্লাহ তাঁকে উত্তম বিনিময় দান করুন। আমিন!
পিতা: শায়খুল হাদিস মাওলানা সালিমুল্লাহ খান রাহিমাহুল্লাহকে [মৃ. ১৪৩৮ হি.] জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, নির্বাচন পদ্ধতিতে বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার অধীনে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবায়ন সম্ভব কি?
তিনি উত্তরে বলেছেন, 'না, এটি সম্ভব নয়। নির্বাচনের মাধ্যমেও ইসলাম আনা সম্ভব নয় এবং গণতন্ত্রের মাধ্যমেও ইসলাম আনা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রে মতের আধিক্যতা বিবেচনা করা হয়। আর আধিক্যতা হচ্ছে মূর্খদের, যারা দীনের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে অবগত নয়। তাদের কাছে কিছু আশা করা যায় না।'
শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রাহিমাহুল্লাহ [মৃ.১৪৩৩ হি.] কী বলেছেন, তা কি তুমি জান?
পুত্র : না তো, তিনি কী বলেছেন?!
পিতা: তিনি বলেছেন, প্রচলিত নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামি রাজনীতির উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন। মানবতার প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে ইসলামি খেলাফত ব্যবস্থা।
পুত্র: শায়খুল হাদিস রাহিমাহুল্লাহর বক্তব্যের কি কোনো বাস্তবতা আছে, না এটা তাঁর নিছক ব্যক্তিগত ধারণা?
পিতা: তিনি ও তাঁর মতো আকাবির-আসলাফের কথাগুলোর যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে। আমরা তুরস্ক, ইয়েমেন, তিউনিসিয়া ও মিশরে ইসলামি শিরোনাম ব্যবহারকারী গণতান্ত্রিক দলগুলোকে দেখেছি, নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতার মসনদে বসা সত্ত্বেও তাঁরা ১ মিনিটের জন্য গণতন্ত্রের ১টি মৌলিক ধারাও পরিবর্তন করতে পারেনি, ইসলামি বিধিবিধান বাস্তবায়ন করা তো দূরের কথা; বরং পরিবর্তনের কোনো ফিকির তাদের মনের ধারে-কাছে এসেছে বলেও কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এর বিপরীতে আফগানিস্তানে তালেবান মুজাহিদগণ জিহাদের মাধ্যমে বিজয় লাভ করার পরপরই পর্যায়ক্রমে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন শুরু করে দিয়েছিলেন।
পুত্র: গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলনকারীদের ব্যর্থতা ও মুজাহিদদের সফলতার রহস্য কী?
পিতা: বেটা! রহস্যটি একটি প্রবচনে লুকিয়ে আছে। কথায় আছে না- 'জোর যার মুল্লুক তার।' অর্থাৎ শক্তির বলে যে জয়ী হয়, তার মতাদর্শই প্রতিষ্ঠিত হয়।
পুত্র: ইসলামের শিরোনাম ব্যবহার করে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কি কোনো নেতিবাচক প্রভাব আছে?
পিতা: ইসলামের শিরোনামে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ফলে যেসকল ভয়াবহ বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম হলো, আমাদের মুহতারাম উস্তাদ হজরত মাওলানা মুফতি ফজলুল হক আমিনি রাহিমাহুল্লাহ [মৃ. ১৪৩৪ হি.]-র মতো আলেমদের থেকে গণতন্ত্র কুফরি হওয়া বিষয়ক স্পষ্ট উক্তি থাকা সত্ত্বেও, এখন মানুষকে বুঝানো কঠিন হয়ে পড়েছে যে, গণতন্ত্র সুস্পষ্ট কুফর। কারণ, জনগণ প্রত্যক্ষ করছে, আলেমগণও গণতন্ত্র গ্রহণ করে নিয়েছেন।
পুত্র: এ ছাড়া আর কোনো নেতিবাচক প্রভাব আছে কি?
পিতা: এর চেয়ে মারাত্মক আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের যেসকল আকাবির গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তাঁরা গণতন্ত্রকে কুফরই মনে করতেন। কুফরি জানা সত্ত্বেও এ পদ্ধতি গ্রহণের কারণ ছিল, তাঁদের ধারণায় বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্য কোনো পদ্ধতিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ ধারণা বাস্তবসম্মত কি-না তা ভিন্ন কথা। কিন্তু তাঁদের প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর অধিকাংশ সদস্য গণতন্ত্রকে কুফর মানতে এখন প্রস্তুত নয়। বিষয়টি এ পর্যন্ত গড়িয়েছে, কেউ কেউ সম্প্রতি সাইয়িদুনা ওমর রাজিয়াল্লাহু আনহুকে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠতা সাব্যস্ত করে বসেছে। সকল অভিযোগ আল্লাহরই কাছে।
পুত্র : জানতে চাচ্ছি, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য এ পদ্ধতির অন্য কোনো নেতিবাচক প্রভাব আছে কি?
পিতা: গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণের নেতিবাচক ফল এই হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের কথা তো বাদই, আলেম ও তালেবে ইলমদের অন্তর থেকেও জিহাদি চেতনা মূলোৎপাটিত হয়ে গেছে। আর কেনই বা হবে না, কেউ কেউ তো ঘোষণা দিয়েছে- 'বর্তমানে সশস্ত্র জিহাদ হলো আত্মহত্যা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণই জিহাদ।' এ জাতীয় ঘোষণাগুলো প্রজন্মকে রাসুলের সুস্পষ্ট বাণী ভুলিয়ে দিয়েছে যে,
رَأْسُ الأَمْرِ الإسلامُ وَعَمُودُهُ الصَّلَاةُ وَذُرْوَةُ سَنَامِهِ الجِهَادُ
প্রবেশ করার ও জাহান্নাম থেকে দূরে থাকার প্রধান শর্ত হলো ইসলাম, তার খুঁটি হলো নামাজ এবং ইসলামের কুঁজের চূড়া হলো জিহাদ।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের আবেগ ও চেতনা কীভাবে প্রকাশ করেছেন, দেখো-
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوَدِدْتُ أَنِّي أُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، ثُمَّ أُحْيَى، ثُمَّ أُقْتَلُ، ثُمَّ أُحْيَى، ثُمَّ أُقْتَلُ، ثُمَّ أُحْيَى، ثُمَّ أُقْتَلُ.
ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন, আমি চেয়েছি, আমাকে আল্লাহর পথে হত্যা করা হবে, তারপর জীবিত করা হবে। আবার হত্যা করা হবে, তারপর জীবিত করা হবে। আবার হত্যা করা হবে, তারপর জীবিত করা হবে। আবার হত্যা করা হবে।
কেনই বা জিহাদ এতো গুরুত্ব পাবে না, যখন আল্লাহ তাআলার আদেশ হলো-
فَلْيُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ وَمَن يُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبْ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا.
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا.
الَّذِينَ ءَامَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانُ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا.
অতএব তারা যেন আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে যারা পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন বিক্রয় করে। আর যেকেউ আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে, তারপর সে নিহত হোক বা বিজয়ী হোক, আমি অবশ্যই তাকে দান করব মহাপ্রতিদান।
তোমাদের কী হলো যে, তোমরা যুদ্ধ কর না আল্লাহর পথে এবং অসহায় নর-নারী ও শিশুদের জন্য? যারা বলে, 'হে আমাদের রব! আমাদেরকে এই জনপদ থেকে বের করে নিয়ে যান, যার অধিবাসীরা অত্যাচারী। আর আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য কোনো অভিভাবক নির্ধারণ করে দিন এবং নিযুক্ত করে দিন আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী।
যারা ঈমানদার, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, আর যারা কাফের, তারা তাগুতের পথে যুদ্ধ করে। নিশ্চয় শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল। [সুরা নিসা: ৭৪-৭৬]
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিসও শোনো-
مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَغْزُ، وَلَمْ يُحَدِّثْ نَفْسَهُ بِهِ؛ مَاتَ عَلَى شُعْبَةٍ مِنْ نِفَاقٍ.
যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যে, [কাফেরদের বিরুদ্ধে] অভিযান চালায়নি এবং অভিযান চালানোর ব্যাপারে মনের সাথে কথাও বলেনি, সে মুনাফেকির একটি শাখার উপর থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করল।
পুত্র : তাহলে আপনি নিজে জিহাদ করেন না কেনো? দারুল ইসলামে হিজরত করেন না কেনো? হিজরত ও জিহাদের কোনো তৎপরতাই তো আপনার মধ্যে লক্ষ্য করছি না!
পিতা: তা আমার অনেক বড় ত্রুটি ও কাপুরুষতা। শোনো, আমার মতো আলেম লকবধারী বিভিন্ন দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের এবং মুসলমান নামধারণকারী বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি লোকের জিহাদ না করা বা জিহাদের কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ না করা দ্বারা এটা সাব্যস্ত হবে না যে, এমন কোনো যুগ আছে- যখন জিহাদ ফরজ নয়। কারণ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- 'আল্লাহ আমাকে প্রেরণ করার সময় থেকে আমার উম্মতের শেষ দিকের ব্যক্তি দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করা পর্যন্ত, জিহাদ অব্যাহত থাকবে। কোনো অত্যাচারীর অত্যাচার এবং কোনো ন্যায়পরায়ণের ন্যায়পরায়ণতা তা অকার্যকর করতে পারবে না।'
যেসব ক্ষেত্রে আমি এবং আমার মতো আলেম ও মুসলমানরা অনুসরণযোগ্য নই, এটি সেগুলোর অন্যতম। আল্লাহ তাআলা আমাকে এবং দেশের আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের মুসলমান হওয়ার দাবিদার সদস্যদেরসহ সকলকে পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করার তাওফিক দান করুন। আমিন!
পুত্র : যাই হোক, তাহলে যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণকেই জিহাদ বলেন এবং বর্তমানে সশস্ত্র জিহাদকে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করেন, তাদের হুকুম কী?
পিতা : আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন- [অর্থ] তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাক, যে পর্যন্ত না ফিতনা [শিরক] নিঃশেষ হয়। এবং দীন [আনুগত্য] পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। [সুরা আনফাল : ৩৯] এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- আমি মানুষের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল। আর সালাত প্রতিষ্ঠা করে ও জাকাত প্রদান করে। তারা যদি এগুলো করে, তবে আমার পক্ষ থেকে নিজেদের জন্য জানমালের নিরাপত্তা লাভ করল। অবশ্য ইসলামের অধিকার নষ্ট করা হলে, তাহলে ভিন্ন কথা। আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহর উপর অর্পিত।
এ আয়াত ও হাদিস থেকে আমরা শিক্ষা পাই, যতদিন পৃথিবীর বুকে শিরক থাকবে এবং আনুগত্য পুরাপুরিভাবে এক আল্লাহর জন্য হবে না, যতদিন পর্যন্ত সকল মানুষ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ'র সাক্ষ্য দিবে না, সালাত কায়েম করবে না, জাকাত আদায় করবে না, ততদিন পর্যন্ত সশস্ত্র জিহাদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট বিধান।
অতএব এ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আল্লাহকে স্মরণ করো, আনুগত্যকে একমাত্র তাঁর জন্য নিবেদন করো। এবং নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজে নাও।
পুত্র : আব্বু! আমি আপনাকে কষ্ট দিয়ে ফেলছি না তো?
পিতা : কষ্ট!! তোমার প্রশ্নের আধিক্যে আমি বরং খুশি হয়েছি।
পুত্র : তাহলে কি আমি আরো প্রশ্ন করতে পারি?
পিতা: নির্দ্বিধায় করো।
পুত্র : আপনি শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রাহিমাহুল্লাহর উক্তি উল্লেখ করেছেন- প্রচলিত নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামি রাজনীতির উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন।
পিতা: হ্যাঁ, উল্লেখ করেছি। আবার বলছি, তিনি তা বলেছেন।
পুত্র : তাহলে কি তা সত্যিই অনেক কঠিন?
পিতা: শুধু অনেক কঠিন নয়। বরং নিশ্চিত অসম্ভব।
পুত্র : কেনো, আব্বু?!
পিতা: সচেতন এমন কে আছে, যে জানেনা- গণতন্ত্রে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। অর্থাৎ গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের শাসন; অথবা সংসদ সদস্যদের শাসন। কোনো অবস্থাতেই তা মহান আল্লাহর শাসন নয়। তুমি জান, গণতন্ত্রে আল্লাহর অকাট্য বিধানের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই, যদি না তা প্রথমে সাংবিধানিক ধারার ও দ্বিতীয়ত জনগণের ইচ্ছার অনুকূলে হয়। তারও আগে সংসদ সদস্যদের আগ্রহের অনুকূল হয়।
পুত্র : যদি সকল জনগণ সরকারের কাছে দাবি জানায়- আমরা দেশকে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দ্বারা শাসন করতে চাই, আইনপ্রণয়নের ক্ষেত্রে কারো কোনো অধিকার থাকবে না। আমাদের ইচ্ছা- মুরতাদ, ব্যভিচারী, মদ্যপ, চোর...এর উপর আল্লাহর বিধান কার্যকর করব। নারীদেরকে পর্দা পালনে ও সম্ভ্রম রক্ষায় বাধ্য করব। এবং সৌন্দর্য প্রদর্শন, উলঙ্গপনা, অশ্লীলতা, পাপাচার, ব্যভিচার, সমকামিতা প্রভৃতি নিষিদ্ধ করব। সকল জনগণ সরকারের নিকট এসব দাবি জানালে কি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়?
পিতা: যদি জনগণ এসব দাবি জানায়, তাহলে সরকার তাদের মুখের উপর বলে দিবে, 'এসব দাবি গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক।'
পুত্র : কী আশ্চর্য!! সরকার এমন উত্তর দেবে কেনো? গণতন্ত্র তো বাকস্বাধীনতার কথা বলে!
পিতা: আমার বোকা ছেলে! তারা এ উত্তরই দেবে। কারণ, গণতন্ত্রবাদীরা যখন বাকস্বাধীনতার বুলি আওড়ায়, তখন তারা আল্লাহর কালাম ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী প্রকাশ্যে বলার স্বাধীনতা উদ্দেশ্য নেয় না। বরং তাগুত, কাফের, মুলহিদ ও মুশরিকদের বাকস্বাধীনতা, বিশ্বাস ও ধর্মত্যাগের স্বাধীনতা এবং প্রত্যেক পবিত্র জিনিস নিয়ে কটূক্তি করার স্বাধীনতা উদ্দেশ্য নেয়।
পুত্র : গণতন্ত্রের বাকস্বাধীনতাকে নিঃশর্ত স্বাধীনতা মনে করে, আমাদের আলেম নেতৃবৃন্দ যদি সংসদে স্পষ্টভাবে আল্লাহর কালাম ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী প্রকাশ্যে বলার স্বাধীনতা উদ্দেশ্য নেন, তাহলে তাদের কোনো সমস্যা হবে কি?
পিতা: তাঁদের জন্য কখনোই তা সম্ভব নয়। তাঁদের কাজটা তখন সংবিধান বিরোধী বলে গণ্য হবে।
পুত্র : কেনো আব্বু, কেনো?!
পিতা: বাংলাদেশের সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদ আমি তোমার সামনে উদ্ধৃত করছি। ১২ নং অনুচ্ছেদ হলো, 'ধর্ম নিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য (ক) সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার, (ঘ) কোন বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন, বিলোপ করা হইবে।' ভেবে দেখ, ধর্মনিরপেক্ষতা যখন দেশ পরিচালনার একটি মূলনীতি এবং এ নীতি বাস্তবায়নের জন্য এসকল পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তখন রাষ্ট্র পরিচালনা সংশ্লিষ্ট ইসলাম ধর্মের বিধানসমূহ কার্যকর করা কখনো কি সম্ভব? যখন সম্ভব নয়, তখন গণতন্ত্রের বাকস্বাধীনতাকে নিঃশর্ত স্বাধীনতা মনে করার সুযোগ কীভাবে থাকে?
২ নং অনুচ্ছেদ হলো, 'প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।'
এ অনুচ্ছেদ থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, এ সংবিধান ইসলামকে একক সত্য ধর্ম মনে করে না। তদ্রূপ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্মকে বাতিল ও পরিত্যাজ্য বলে না। নাউযুবিল্লাহ। অথচ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ .
নিশ্চয় আল্লাহর নিকট ধর্ম হচ্ছে কেবল ইসলাম। [সূরা আলে ইমরান : ১৯]
আরো ইরশাদ করেছেন-
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ .
আর যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম অন্বেষণ করবে, তার পক্ষ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না। আর সে আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [সূরা আলে ইমরান : ৮৫]
বলার অপেক্ষা রাখে না, সংবিধানের আলোচ্য অনুচ্ছেদটি এ আয়াতদুটোর সুস্পষ্ট বিরোধী। অতএব আল্লাহর কালাম ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে যেসমস্ত বিষয় হারাম ও নিষিদ্ধ, কিন্তু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মে হারাম ও অবৈধ নয়, সংবিধান মেনে আলেম নেতৃবৃন্দ সেগুলো কীভাবে প্রতিহত করবেন? প্রতিহত করতে না পারাই হলো যুগ-যুগান্তরের বাস্তব অভিজ্ঞতা। এমতাবস্থায় গণতন্ত্রের বাকস্বাধীনতাকে নিঃশর্ত স্বাধীনতা মনে করার কোনো সুযোগ আছে কি-না, তুমিই বলো।
৪১ নং অনুচ্ছেদের 'ক' হলো, 'প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে।'
স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, সংবিধান এখানে দেশের মুসলমানদেরকে মুরতাদ হওয়ার অধিকার দিয়েছে, এবং প্রত্যেক নাগরিককে পছন্দমত যেকোনো ধর্ম গ্রহণ করা এবং যেকোনো ধর্মের প্রতি দাওয়াত দেওয়ার অধিকার প্রদান করেছে। নাউযুবিল্লাহ। এরপরও কি মনে হয়, গণতন্ত্রের বাকস্বাধীনতা নিঃশর্ত?
গণতন্ত্রের বাকস্বাধীনতা নিঃশর্ত না হওয়ার বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে ৭ নং অনুচ্ছেদের প্রথমাংশে। তাতে লেখা হয়েছে, 'প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।'
পুত্র : আমার তো ভয় হচ্ছে, কুফরি অনুচ্ছেদ সম্বলিত এমন সংবিধান সংরক্ষণের জন্য যে ব্যক্তি শপথ নেবে, সে মুরতাদ হয়ে যাবে।
পিতা: আল্লামা যাহেদ কাউসারি রাহিমাহুল্লাহসহ [১২৯৬-১৩৭১ হি.] উম্মাহর বিদগ্ধ আলেমগণ ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করার প্রবক্তাদের মুরতাদ বলে ফতোয়া দিয়েছেন।
পুত্র : সংবিধানের উল্লিখিত অনুচ্ছেদগুলো থেকে তাহলে এটাই বুঝা যাচ্ছে, গণতন্ত্রের বাকস্বাধীনতা নিঃশর্ত নয়!
পিতা: এই তো, বুঝতে পেরেছ। মাশাআল্লাহ।
পুত্র : আমাদের আলেম নেতৃবৃন্দ যদি ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যহীন সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলো না মানেন, তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে?
পিতা: তাঁদের কাজটি রাষ্ট্রদ্রোহীতা বলে গণ্য হবে। এর কারণে তাঁদের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হওয়াসহ তাঁরা সর্বোচ্চ শাস্তির সম্মুখীন হবেন।
পুত্র : আল্লাহর উপরই আমরা ভরসা করলাম। হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে জালেম সম্প্রদায়ের জুলুমের শিকার বানাবেন না। এবং আপনি নিজ মেহেরবানীতে কাফের সম্প্রদায় থেকে আমাদের মুক্তি দিন। আচ্ছা, সংবিধানে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়?
পিতা: সংবিধানের ১৪২ নং অনুচ্ছেদে আছে, 'সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গৃহীত না হইলে অনুরূপ কোন বিলে সম্মতিদানের জন্য তাহা রাষ্ট্রপতির নিকট উপস্থাপিত হইবে না।'
অর্থাৎ সংবিধানে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে পরিবর্তনের দাবিদার সাংসদদের সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশ হওয়া আবশ্যক।
পূত্র : আমি আশাবাদী, অসম্ভব নয়, একদিন আলেম সাংসদদের সংখ্যা মোট সংসদ সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ হবে। তখন কি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক অনুচ্ছেদগুলো রহিত করা তাঁদের জন্য সম্ভব হবে না?
পিতা: পূর্বে আলোচিত অনুচ্ছেদগুলো সংবিধানের 'প্রস্তাবনা' এবং প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে রয়েছে। আর ৭ম অনুচ্ছেদের 'খ'তে স্পষ্টভাবে রয়েছে-
'সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।'
পুত্র : আপনার পুরো কথার অর্থ কি তাহলে এই দাঁড়াচ্ছে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামের দণ্ডবিধি প্রভৃতি বিধান কার্যকর সম্ভব নয়?
পিতা : আমি তোমাকে নিজের কোনো কথা শুনাইনি; সব সংবিধানের কথাই শুনিয়েছি। তাই কোনো কিছু আমার দিকে সম্বন্ধযুক্ত করবে না!
পুত্র : যাই হোক, তাহলে কি মূলকথা এই দাঁড়াচ্ছে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা অসম্ভব?
পিতা: কখনই নয়!
পুত্র : তাহলে কীভাবে সম্ভব?
পিতা: দেখ, ইসলাম এমন কোনো বিধানের আদেশ করেনি, যা পালনের পদ্ধতি স্পষ্ট করেনি। আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পাই, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে সালাতের আদেশ করার পর তিনি তাঁদেরকে বলেছেন, 'তোমরা সেভাবে সালাত আদায় করো, যেভাবে আমাকে আদায় করতে দেখ।'
পুত্র : আপনার উদ্দেশ্যটা যদি বুঝিয়ে বলতেন!
পিতা: আমি বলতে চাচ্ছি, প্রত্যেক যুগে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি হলো, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিত এবং চার খলিফা ও সাহাবিগণের অনুকরণ করা। এ প্রসঙ্গে তুমি মুবাল্লিগে ইসলাম শায়খ মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলবি রাহিমাহুল্লাহ [১৩৩৫-১৩৮৪ হি.] রচিত 'হায়াতুস সাহাবা' কিতাবের ৯ম অধ্যায়টি পাঠ করতে পার।
পুত্র: আচ্ছা, শুনেছি, জিহাদ করতে হলে নাকি ইসলামি সরকার থাকা জরুরি? এটা কি সঠিক?
পিতা: তোমার কথা শুনে 'মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা'-এর শিক্ষাসচিব মহোদয়ের একটি বক্তব্য স্মরণ হলো। তিনি লিখেছেন- 'প্রত্যেক মুসলিম দেশের সরকার এবং প্রত্যেক মুসলিম রাষ্ট্রসংঘকে জিহাদের এ সবক পুনরায় ইয়াদ করা অপরিহার্য, যদি তারা নিজেদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আগ্রহী হন এবং দুনিয়া থেকে জুলুম-অত্যাচার দূর করে ন্যায় ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার আশা রাখেন।
জাতির অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বদের দায়িত্ব শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বা সংঘসমূহকে জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যায় না। কেননা যদি তাঁদের আহ্বানে সাড়া না দেওয়া হয় এবং জিহাদের সুন্নত পুনরায় জীবিত না করা হয়, তবে তাঁদের আরো কিছু দায়িত্ব বাকি থেকে যায়। কী দায়িত্ব বাকি থাকে? এর উত্তর পাওয়া যাবে হযরত মাওলানা সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.), শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহ.) এবং সালাফ ও খালাফের এ প্রকৃতির জানবাজ মুজাহিদগণের জীবনীতে।
পুত্র : আপনাকে অনেক বিরক্ত করলাম, আব্বু!
পিতা : কোনো সমস্যা নেই। আরো কিছু বলবে?
পুত্র : জি, একটি কথা বাকি আছে। কিন্তু এখন বলার সাহস হচ্ছে না। এমনিতেই আপনার অনেক সময় নিয়ে ফেলেছি।
পিতা : কোনো সমস্যা নেই। বলে ফেলো। তোমার প্রশ্নগুলো শুনে আমি খুশি হয়েছি। তা থেকে বুঝা যায়, তুমি অন্ধ অনুসারী নও; বরং সমঝদার অনুসারী হতে চাও।
পুত্র : সত্যিই অনুপ্রাণিত হলাম। আপনি অনেক মহানুভব! অনুগ্রহ করে এবার তাহলে ইসলামের শুরাব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের মাঝে পার্থক্যের দিকগুলো স্পষ্ট করুন।
পিতা : চমৎকার প্রশ্ন করেছ। ইসলামের পরামর্শ ও গণতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্যের দিক অনেক। কয়েকটি শোনো-
১. 'ইসলামের পরামর্শ' হয় ঐ সকল বিষয়ে, যেগুলোর ব্যাপারে কোরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট কোনো বিধান নেই। কোরআন- হাদিসে বিধান থাকাবস্থায় পরামর্শের কোনো সুযোগ নেই। যে ব্যক্তি সুযোগ আছে মনে করে, সে মুমিন না মুরতাদ, এ সিদ্ধান্ত আমি দেব না; সে নিজেই উত্তর জেনে নিক সামনের আয়াতদুটি থেকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا.
কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর এই অবকাশ নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয় চূড়ান্ত করে দেওয়ার পরও নিজেদের বিষয়ে তাদের এখতিয়ার থাকবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানি করল, সে সুস্পষ্ট গোমরাহিতে পতিত হলো। [সুরা আহযাব: ৩৬]
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا .
অতএব না, আপনার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের মধ্যে সংঘটিত বিবাদের ক্ষেত্রে আপনাকেই [আপনার সুন্নাহকেই] বিচারক বানাবে। তারপর আপনার ফায়সালা সম্বন্ধে নিজেদের মনে কোনো সংকীর্ণতা বোধ করবে না এবং [তা] সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিবে। [সুরা নিসা : ৬৫]
পক্ষান্তরে গণতন্ত্রে শরিয়তের উক্তিসমূহ ও আল্লাহর বিধানাবলির কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। উপরন্তু কোরআন-হাদিসের যেসকল বিধান সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেগুলো বর্জনীয় বলে গণ্য হয়। সংবিধানের ৭ নং অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় অংশে কী আছে, শোনো– 'জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।'
২. গণতন্ত্রের প্রভু ও মানদণ্ড হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এটাই সকল ক্ষমতার উৎস। বিপরীতে ইসলামের শুরাব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কোনো প্রভাব নেই। বরং আল্লাহ তাআলা কোরআনে স্পষ্টভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপরীত ফায়সালা করেছেন। ইরশাদ করেন- وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ.
আপনি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মান্য করেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। তারা কেবল ধারণার অনুসরণ করে এবং তারা কেবল আন্দাজে বলে। [সুরা আনআম : ১১৬]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-
وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ .
অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনার নয়, যদিও আপনি মনেপ্রাণে [তা] চান। [সুরা ইউসুফ : ১০৩]
আরো ইরশাদ করেন-
وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ بِلِقَابِ رَبِّهِمْ لَكَافِرُونَ .
নিশ্চয় অধিকাংশ মানুষ তাদের রবের সাথে সাক্ষাত হওয়াকে অস্বীকার করে। [সুরা রোম : ৮]
অন্যত্র ইরশাদ করেছেন-
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُم بِاللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشْرِكُونَ.
আর তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে, কিন্তু এভাবে যে, [তাঁর সঙ্গে শিরকও করে। [সুরা ইউসুফ : ১০৬]
৩. গণতন্ত্রে জনগণ সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের শাসন। সংখ্যাগরিষ্ঠরাই হালাল-হারাম নির্ধারণ করে। অতএব গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠরাই প্রভু ও উপাস্য। পক্ষান্তরে ইসলামের শুরাব্যবস্থায় জনগণ কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠরা আল্লাহ ও রাসুলের, তারপর দারুল ইসলামের প্রধানের আদেশ-নিষেধ শ্রবণ ও মান্য করার ব্যাপারে আদিষ্ট। সংখ্যাগরিষ্ঠদের ইচ্ছা ও মতামত মেনে নেওয়ার জন্য ইসলামি রাষ্ট্রপ্রধানকে বাধ্য করা হয় না। বলাবাহুল্য, রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য ঐ সকল বিষয়েই প্রযোজ্য, যেখানে স্রষ্টার অবাধ্যতা নেই।
পুত্র : সত্যিই আমাদের আকাবির ও তাঁদের অনুসারীগণ বুঝেশুনে মানুষকে আল্লাহর প্রতি আহ্বান করতেন।
পিতা: এখন এই মুগ্ধতা প্রকাশের কারণ কী?
পুত্র : কারণ, আমি এখন হাকিমুল উম্মত হজরত থানবি রাহিমাহুল্লাহর কথার রহস্য বুঝতে পেরেছি। তিনি ঠিকই বলেছেন, 'লোকেরা পরামর্শের ধারাকেই পাল্টে দিয়েছে। ইসলামে পরামর্শের যে অবস্থান রয়েছে, তারা তা বুঝেইনি।'
পিতা: চমৎকার, বেটা! চমৎকার! আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর ও রাসুলের সকল আদেশ মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আল্লাহর একটি বিশেষ আদেশ হলো,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা হও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী, হও আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দানকারী, যদিও তা হয় তোমাদের নিজেদের বিপক্ষে। [সুরা নিসা: ১৩৫]
পুত্র : আচ্ছা, আব্বু! আমি আর একটি মাত্র প্রশ্ন করব যদি অনুমতি হয়। আজকের বৈঠকে আর কোনো প্রশ্ন করব না। প্রশ্ন হলো, কাদিয়ানিরা যদি মুরতাদ হয়, তাহলে গণতন্ত্রবাদীদের অবস্থা কী হবে?
পিতা: কী বললে, একটু ব্যাখ্যা করে বলো।
পুত্র : কাদি‍য়ানিরা ইসলামের বিপরীতে কোনো স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ণ করেনি এবং ইসলামের কোনো আকিদা সরাসরি অস্বীকার করেনি। তারা এ বিশ্বাসও করে, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাতামুন নাবিয়্যিন বা শেষনবি। অবশ্য 'খতমে নবুওয়াত'-এর এমন ব্যাখ্যা করে যা গ্রহণযোগ্য নয়। এসব সত্ত্বেও তারা যদি মুরতাদ হয় -নিঃসন্দেহে তারা মুরতাদ- তাহলে গণতন্ত্রবাদীদের অবস্থা কী হবে, যারা আল্লাহ ও রাসুলের পরিবর্তে জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস নির্ধারণ করেছে এবং সংবিধান থেকে 'আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' বিলুপ্ত করে তার স্থলে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' প্রতিস্থাপন করেছে?
অর্থাৎ কাদিয়ানিরা যদি আল্লাহ ও রাসুলকে সকল ক্ষমতার উৎস স্বীকার করা সত্ত্বেও ইসলামের মাত্র একটি আকিদার অপব্যাখ্যা করার কারণে মুরতাদ হয়ে থাকে –নিঃসন্দেহে তারা মুরতাদ- তাহলে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের কী হুকুম হবে, যারা ঘোষণা দিয়ে কোরআন-সুন্নাহর পরিবর্তে ধর্ম-বর্ণ-কর্ম নির্বিশেষে সকল জনগণকে আইনপ্রণয়ণের উৎস বানিয়েছে; উপরন্তু 'আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' তথা ঈমানকেই আইন করে বিলুপ্ত করে দিয়েছে?
পিতা: প্রত্যেক বিবেকবান মানুষ নিজেই উত্তর বের করে নিক। আমি কিছু বলা থেকে বিরত থাকলাম। এইমাত্র তোমাকে যে আয়াতটি শুনিয়েছি, আমি শুধু সে আয়াতটি আবার শোনাব। তারপর একটি দুআ করব।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ.
হে ঈমানদারগণ! তোমরা হও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী, হও আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দানকারী, যদিও তা হয় তোমাদের নিজেদের বিপক্ষে। [সুরা নিসা: ১৩৫]
আল্লাহ তাআলা আমাকেসহ এবং দেশের আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের যেসকল সদস্য ঈমানদার হওয়ার দাবিদার তাদেরকেসহ, সকল ঈমানদারকে আখেরাতের পরিণতির কথা স্মরণ করে পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করার তাওফিক দান করুন। আমিন!
একটি কথা, এতক্ষণ তুমি প্রশ্ন করেছ, আমি উত্তর দিতে চেষ্টা করেছি। এখন আমি নিজের পক্ষ থেকে কিছু কথা তোমাকে শোনাতে চাই। শুনবে কি?
পুত্র : বলেন কি আব্বু! অবশ্যই বলুন। আপনার মুখনিঃসৃত প্রতিটি বাণীর প্রতি রয়েছে আমার তীব্র আগ্রহ।
পিতা: তোমাকে একটি প্রশ্ন করি, দেশের সাধারণ মুসলমানদের ব্যাপক অবস্থা কি এই নয় যে, আখেরাতের ব্যাপারে উদাসীনতার কারণে দুনিয়াবি বিষয়গুলোতে দুনিয়াদারদের অনুসরণ করলেও, ঈমানকে তারা প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, কুফর ও শিরককে আন্তরিকভাবে ঘৃণা করে; এবং কোনো মডারেট ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে তারা শিরক ও কুফর করতে প্রস্তুত না?
পুত্র : আব্বু! 'মডারেট' কাকে বলে? তাদের পরিচয় জানলে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার জন্য সহজ হবে।
পিতা: বাবা! 'মডারেট' বলা হয় ঐ সকল লোকদেরকে, যারা চায়- মুসলিম বিশ্ব বৈশ্বিক আধুনিকতার অংশ হয়ে যাক, এবং নবি ও সাহাবিগণের জীবনে প্রতিষ্ঠিত ইসলাম থেকে মুসলমানগণ সম্পর্কহীন হয়ে যাক, যেন মুসলমান পরিচয় ধারণ করলেও দেশের জনগণ পশ্চিমা আধুনিকতার সঙ্গে তালমিলিয়ে চলে।
পুত্র : নাউযুবিল্লাহ! এমন লোকদের থেকে আল্লাহর পানাহ! যাই হোক, আপনার প্রশ্নের উত্তর তো স্পষ্টই- এটাই সাধারণ মুসলমানদের ব্যাপক অবস্থা যে, আখেরাতের ব্যাপারে উদাসীনতার কারণে দুনিয়াবি বিষয়গুলোতে দুনিয়াদারদের অনুসরণ করলেও ঈমানকে তারা আন্তরিকভাবে ভালোবাসে, কুফর ও শিরককে প্রচণ্ড ঘৃণা করে; এবং কোনো মডারেট ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের বলার কারণে শিরক ও কুফর করে না।
পিতা: এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন, তাহলে দেশ-বিদেশের গণতন্ত্রের ধারক-বাহকরা মডারেট ও ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া সত্ত্বেও, ইসলাম প্রেমিক সাধারণ মুসলমানগণ কেনো তাদের থেকে গণতন্ত্র নামক কুফর নির্দ্বিধায় গ্রহণ করছে? অথচ তুমি বুঝতে পেরেছ, গণতন্ত্র কোনো সাধারণ কুফর নয়, বরং কুফরের ডিপো।
কেনো কুফরের 'ডিপো' বলা হলো তা-ও আশা করি সংবিধানের ৭ নং অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় অংশের যে বিবরণ কিছুক্ষণ আগে শুনেছ, তা থেকে তোমার নিশ্চয় বুঝে এসেছে। কোরআন-হাদিসের কী পরিমাণ আইন 'জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা'র সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, তার কি কোনো হিসাব আছে?!
পুত্র : বড় জটিল প্রশ্ন আব্বু। এ প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার মাথায় আসছে না। তবে এতটুকু আমার মনে হচ্ছে, সাধারণ মুসলমানদের অনেকের আমল-আখলাক যত নিম্নমানেরই হোক, কোনো মডারেট ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি থেকে কুফর- শিরক গ্রহণ করার লোক নয় তারা। অনুগ্রহপূর্বক আপনিই বিষয়টি খোলাসা করুন। আল্লাহ আপনাকে জাযায়ে খায়ের দান করুন!
পিতা: বাবা! প্রশ্নটি শুধু তোমার কাছেই জটিল মনে হয়েছে, তা নয়। এটি আমার কাছেও জটিল ছিল। আমার কাছেও এর কোনো উত্তর ছিল না।
পুত্র : মনে হচ্ছে, আপনি পরে উত্তর পেয়েছেন। তো কোথায় পেলেন ও কী পেলেন?
পিতা: বাবা! ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পর আমেরিকার একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান -যার নাম 'র‍্যান্ড কর্পোরেশন'- তারা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে তারা মুসলমানদেরকে চার ভাগে বিভক্ত করেছে। দ্বিতীয় ভাগের আলোচনায় আমি প্রশ্নটির উত্তর পেয়েছি। আর কিছু বলার আমার সাহস হচ্ছে না। এটা আমার নিজের কোনো গবেষণা নয়। অতএব আমার নিকট এ বিষয়ে আর কিছু জানতে চেয়ো না। আমি তো গণতন্ত্র সম্পর্কে মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ প্রমুখের লেখা ও মাসিক আলকাউসার প্রভৃতি থেকেই জানতে পেরেছি।
পূত্র : ঠিক আছে, আব্বু! ঠিক আছে। আমি আপনাকে আর কষ্ট দেব না। আল্লাহ আপনাকে দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতে নিরাপদ রাখুন! 'র‍্যান্ড কর্পোরেশনে'র ঐ প্রতিবেদনে আমি নিজেই উত্তর খুঁজে নেব ইনশাআল্লাহ। তবে একটা প্রশ্ন আমার মনে উদয় হয়েছে। এর উত্তর দেওয়া আশা করি আপনার জন্য ভারী হবে না।
পিতা: 'আমরা আল্লাহরই উপর নির্ভর করলাম। হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে জালেম সম্প্রদায়ের পরীক্ষার বস্তু বানাবেন না এবং নিজ মেহেরবানীতে আমাদেরকে কাফের সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন। আমিন! আচ্ছা, তোমার প্রশ্নটি বলো দেখি।
পুত্র : আব্বু! আমাদের দেশের মডারেট ও ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা আর যাই হোক, মুসলমানদের সন্তানই তো। তারা তো ইসলাম ধর্ম ত্যাগের ঘোষণা দেয়নি। তো ইসলামের পরিচয় ধারণ করা সত্ত্বেও আল্লাহর এই বান্দারা কেনো এমন জঘন্যতম কুফরগুলো করল, যা থেকে তাওবা না করলে সেগুলো তাদের নিজেদের জন্য এবং গ্রহণকারী সকলের জন্য আখেরাতের অনন্ত-অসীম কালের নিশ্চিত ধ্বংস টেনে আনবে?
পিতা: চমৎকার প্রশ্ন! শোনো তাহলে, তারা কোরআন-হাদিস-ফিকহ তথা দীনি উৎসসমূহ থেকে জীবনব্যবস্থা গ্রহণ না করে, পশ্চিমা শিক্ষাকারিকুলাম থেকে জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এটাই তাদের বিচ্যুতির প্রকৃত কারণ। বাংলাদেশের সংবিধানের ব্যাখ্যামূলক যে পুস্তিকাটি আরিফ খান লিখেছেন, তার উপর সামান্য দৃষ্টি বুলালেই বিষয়টি তোমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
অনৈসলামিক উৎস থেকে মুসলমানদের জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করা বিষয়ে একটি হাদিস শোনো। 'মুসনাদে আহমদ' কিতাবে আছে, হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাজিয়াল্লাহু আনহু একবার আহলে কিতাবদের [ইহুদি-খ্রিস্টান] একজন থেকে একটি কিতাব নিয়ে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এলেন। তারপর তা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে পাঠ করলেন। তিনি রাগান্বিত হয়ে ইরশাদ করলেন, 'খাত্তাবের বেটা! তোমরা কি দিশেহারা? যার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, অবশ্যই আমি তোমাদের নিকট শুভ্র ও স্বচ্ছ দীন নিয়ে এসেছি। তোমরা তাদেরকে [ইহুদি-খ্রিস্টান প্রমুখ] কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করো না। কারণ, হতে পারে তারা সত্য বলবে, আর তোমরা তা মিথ্যা সাব্যস্ত করবে। অথবা মিথ্যা বলবে, আর তোমরা তা সত্য সাব্যস্ত করবে। যার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, যদি মুসা জীবিত থাকতেন, আমার অনুসরণ ছাড়া তাঁর কোনো উপায় থাকত না।’
পুত্র : আব্বু! অমুসলিমদের থেকে শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞানার্জন করার বিষয়টি একটু পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
পিতা: শায়খ মুহাম্মদ বিন সাঈদ কাহতানি রাহিমাহুল্লাহ [১৩৭৬-১৪৪০ হি.] রচিত 'আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা ফিল ইসলাম [ইসলামে শত্রুতা-মিত্রতা] কিতাবের দ্বিতীয় অধ্যায়ে কাফেরদের থেকে কী কী উপকার গ্রহণ করা জায়েজ আছে এবং কী কী জায়েজ নেই, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। সুযোগ হলে তা বলা যেত। কিন্তু আজকের বৈঠক এমনিতই অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। তাই আলোচনা এখানেই সমাপ্ত করতে চাচ্ছি।
পুত্র : আল্লাহ আপনাকে জাযায়ে খায়ের দান করুন। আপনি আমার মনকে প্রশান্ত করে দিয়েছেন।
পিতা: আল্লাহ তোমাকেও উত্তম বিনিময় দান করুন। তোমার প্রশ্নগুলো সময়োপযোগী ও যথাযথ হয়েছে।
পুত্র : শুকরান, আসসালামু আলাইকুম ।
পিতা : ঠিক আছে, ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

টিকাঃ
১. 'বাংলাদেশের সংবিধান ২০১৮ সালের সপ্তদশ সংশোধনীসহ' বইয়ে [পৃ. ৭৫] এসেছে- Democracy বা গণতন্ত্র শব্দটি গ্রিক শব্দ Demos (জনগণ) ও Kratos (ক্ষমতা) থেকে উদ্ভূত। গণতন্ত্রের প্রবক্তাদের মতে, জনগণের ইচ্ছানুযায়ী দেশশাসনের নামই হলো গণতন্ত্র। তত্ত্বগতভাবে, গণতন্ত্রে জনগণের মতামত ও সংগঠনের অবাধ অধিকারকে স্বীকার করা হয়।
১. হজরত মাদানি রাহিমাহুল্লাহর এ মন্তব্যের বিপরীতে পাকিস্তানকে যারা দারুল হরব মানতে প্রস্তুত নন; উপরন্তু দেশটির সংবিধানের মূল ভিত্তিপ্রস্তর 'গণতন্ত্রে'র পরিবর্তে যারা 'আল্লাহর হাকিমিয়্যাত' মনে করতে চান, তাদের মধ্য থেকে যারা একগুঁয়ে নন, তাঁরা যেন নিজেরা যাচাই-বাছাই করে বাস্তবতা বুঝার জন্য 'আল্লাহর হাকিমিয়‍্যাত ও পাকিস্তান-সংবিধান' গ্রন্থটি অবশ্যই অধ্যয়ন করেন। তারপর পর্যালোচনাগুলো যথাযথ মনে হলে নিজকে পরিবর্তন করেন। পক্ষান্তরে ভুল মনে হলে তা খণ্ডন করেন। তাছাড়া এ বইয়ের ২৮৪ নং পৃষ্ঠায় 'পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব?' শিরোনামের লেখাটি অবশ্যই দেখুন। জ্ঞানার্জন না করে কারো অন্ধ অনুসরণের-তিনি অনেক বড় হলেও- শরয়ি বৈধতা নেই। আল্লাহ তাআলা সুরা বনি ইসরাঈলের ৩৬ নং আয়াতে ইরশাদ করেছেন- وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَتِبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا . আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তর- প্রত্যেকটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।
১. মাসিক আল কাউসার, ডিসেম্বর ২০০৮, পৃ. ৮-এর ছায়া অবলম্বনে।
১. ১৬২-১৬৪ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
২. সুনানে তিরমিজি: ২১৬৫। دَارُ إِحْيَاءِ الثَّرَاثِ العَرَبِيَّ সংস্করণ, বৈরুত।
১. মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ২১৫৬১। مُؤَسَّسَةُ الرَّسَالَةِ-এর দ্বিতীয় সংস্করণ, বৈরুত।
২. ৮ মহররম ১৪৪০ হিজরি [১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ঈসায়ি] বুধবার দিবাগত রাত ১০ টা ৫ মিনিটে সংসদ অধিবেশনে সরকার এ স্বীকৃতি ঘোষণা করেছে।
৩. ২৪ সফর ১৪৪০ হিজরি [৪ নভেম্বর ২০১৮ ঈসায়ি) রোববার ঢাকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে শোকরানা মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রয়োজনে নিম্নের লিংকে দেখুন- https://www.youtube.com/watch?v=A_XtS_ilpGI
৪. একটি বিশেষ কারণ হলো, সরকার ৩০ জুন ২০১১ ঈসায়িতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধান থেকে 'আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' বিলুপ্ত করে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' প্রতিস্থাপন করেছে।
১. ইমাম আবু শামা রাহিমাহুল্লাহ রচিত البَاعِثُ عَلَى إِنْكَارِ البِدَعِ والحَوَادِثِ . ২২। দারুল হুদা কায়রো, মিশর। মুদ্রণ : ১৩৯৮ হিজরি/১৯৭৮ ঈসায়ি। উক্তিটির আরবি পাঠ নিম্নরূপ- إِنَّ جُمْهُورَ النَّاسِ فَارَقُوْا الجَمَاعَةَ، وَإِنَّ الجَمَاعَةَ مَا وَافَقَ الحَقَّ وَإِنْ كُنْتَ وَحْدَكَ
২. অর্থাৎ হাদিসের الجَمَاعَةِ শব্দটির ‘আলিফ লাম’ عِوَضُ عَنِ الْمُضَافِ إِلَيْهِ - আর মুযাফুন ইলাইহি হচ্ছে الحَقُّ [সত্য]। অতএব, হাদিসে الجَمَاعَةِ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো الحَقُّ তথা হকের জামাআত বা সত্যের অনুসারী।
১. البَاعِثُ عَلَى إِنْكَارِ البِدَعِ والحَوَادِثِ .
২. الاعتصام ১ : ৩৭। দারু ইবনিল জাওযি, সৌদিআরব। প্রথম সংস্করণ ১৪২৯ হি./২০০৮ ঈ.।
৩. المُسْتَصْفَى فِي عِلْمِ الأُصُولِ .
১. المُسْتَصْفَى فِي عِلْمِ الْأُصُولِ পৃ. ২৮৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়া, বৈরুত।
২. তিনি আওয়ামী লীগের চতুর্থ মন্ত্রিসভার ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। মেয়াদ কাল ৭ জানুয়ারি ২০১৯ থেকে ১৩ জুন ২০২০ ঈসায়ি।
১. https://www.youtube.com/watch?v=uqpiwbB93cs লিংকের ১ ঘন্টা ২৮ মিনিট ১৭ সেকেন্ড পরবর্তী বক্তব্য দ্রষ্টব্য। লিংকটির ১ ঘণ্টা ১ মিনিট ২৭ সেকেন্ড থেকে ১ ঘণ্টা ৪ মিনিট ২২ সেকেন্ড পর্যন্ত পুরো বক্তব্যটি এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তাতে বরং বড় করুণ দুরাবস্থা ফুটে উঠেছে।
২. এ তথ্যটি নেওয়া হয়েছে লিংকটির ১ ঘণ্টা ১ মিনিট ২৭ সেকেন্ড থেকে ১ ঘণ্টা ৪ মিনিট ২২ সেকেন্ড পর্যন্ত পুরো বক্তব্য থেকে। প্রিয় আত্মমর্যাবোধসম্পন্ন মুসলিম ভাই! সুযোগ হলে বক্তব্যের এ অংশটি অবশ্যই শুনুন। লিখে আপনার সামনে পেশ করতে আমার রুচিতে বাধে। এ অংশটি শ্রবণ করে একজন আলেমের নাকি আল্লাহ তাআলার নিম্নের বাণীটি স্মরণ হয়েছে- فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَرِثُوا الْكِتَابَ يَأْخُذُونَ عَرَضَ هَذَا الْأَدْنَى وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا وَإِن يَأْتِهِمْ عَرَضُ مِثْلُهُ يَأْخُذُوهُ أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِم مِيثَقُ الْكِتَابِ أَن لَّا يَقُولُوا عَلَى الله إلَّا الْحَقَّ وَدَرَسُوا مَا فِيهِ وَالدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ . অনন্তর, তাদের পরে এমন অযোগ্য স্থলাভিষিক্তরা এসেছে, যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে- তারা এই তুচ্ছ জীবনের সামগ্রী গ্রহণ করে এবং বলে, 'নিশ্চয় আমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে।' আর যদি তাদের সামনে পুনরায় অনুরূপ সামগ্রী আসে, তবে তা-ও গ্রহণ করবে। তাদের থেকে কি কিতাবে এ অঙ্গীকার নেওয়া হয়নি যে, আল্লাহ সম্বন্ধে তারা সত্য ছাড়া [অন্য কিছু বলবে না? আর তারা তাতে [কিতাবে] যা কিছু রয়েছে, তা পড়েছে। বস্তুত আখেরাতের ঘরই অধিক উত্তম- তাদের জন্য, যারা [আল্লাহকে] ভয় করে। তোমরা কি বুঝ না? [সুরা আরাফ : ১৬৯]
১. সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার এ অর্থ উদ্দেশ্য হওয়ার ব্যাপারে কারো সন্দেহ হলে, তিনি যেন ২০৫-২০৭ নং পৃষ্ঠায় সংবিধানের কয়েকটি ধারা দেখে নেন।
২. কিতাব ও রিজালের অনুসরণ বিষয়ক দেওবন্দি আকাবির-আসলাফের কর্মপদ্ধতি জানার জন্য ১৬৭-১৬৯ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
১. গণতন্ত্র সম্পর্কে মুফতি আমিনি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'আমাদের আকিদা হলো, নবীজী ও খোলাফায়ে রাশেদিনের পদ্ধতির রাষ্ট্রব্যবস্থাই একমাত্র খিলাফতভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। খিলাফত ছাড়া সব রাষ্ট্রব্যবস্থাই হয়ত কুফরি অথবা পথভ্রষ্ট। বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী প্রধান রাষ্ট্রব্যবস্থা হচ্ছে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। উভয়টাই কুফরি রাষ্ট্রব্যবস্থা।' (মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ, জীবন ও সংগ্রাম, পৃ. ২১, নবপ্রকাশ)
১. অর্থাৎ সুউচ্চ বিধানসমূহের সর্বোচ্চ স্তর।
২. সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং ২৬১৬
৩. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৭৯৭। دَارُ طَوْقِ النَّجَاةِ বৈরুত। প্রথম সংস্করণ ১৪২২ হিজরি।
১. মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ লিখেছেন, 'তাগুতে'র অর্থ আল্লাহর ঐ বিদ্রোহী বান্দা, যে আল্লাহর মোকাবেলায় নিজেকে বিধানদাতা মনে করে এবং মানুষের উপর তা কার্যকর করতে চায়। প্রকৃতপক্ষে কোনো তাগুত- ব্যক্তি বা দলের বানানো আইনকানুন হচ্ছে সত্য দীন ইসলামের বিপরীতে বিভিন্ন 'ধর্ম', যা থেকে সম্পর্কছেদ করা ছাড়া ঈমান সাব্যস্ত হয় না। আল্লাহর বিরুদ্ধে কিংবা আল্লাহর সাথে তাগুতের উপাসনা বা আনুগত্য করা কিংবা তা বৈধ মনে করা, তদ্রূপ আল্লাহর দীনের মোকাবেলায় বা তার সাথে তাগুতের আইনকানুন গ্রহণ করা বা গ্রহণ করাকে বৈধ মনে করা, সরাসরি কুফর ও শিরক। তাগুত ও তার বিধি-বিধান থেকে সম্পর্কছেদ ছাড়া ঈমানের দাবি নিফাক ও মুনাফেকি। ['ঈমান সবার আগে' পৃ. ৬৭ দ্রষ্টব্য। পঞ্চম মুদ্রণ ২০১৮ খ্রি.]
২. সহিহ মুসলিম: ৫০৪০, দারুল জিল, বৈরুত।
৩. মূল সুগুণ চারটে- প্রজ্ঞা, সংযম, সাহস ও ন্যায়। পক্ষান্তরে মূল কুগুণ তিনটি- অহংকার, লোভ ও হিংসা। আসুন, আমরা এই চার গুণে গুণী হই এবং এই তিন মন্দ গুণের ব্যাপারে সতর্ক হই।
১. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৫৩২, দারুল ফিক্স, বৈরুত। ৮৪ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৫। দারু তাওকিন নাজাত ।
১. 'রাষ্ট্রীয় পর্যায়' বলতে আইনবিভাগ, বিচারবিভাগ ও নির্বাহীবিভাগকে বুঝানো হয়। বলাবাহুল্য, এ সকল বিভাগে ইসলাম প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো, বিভাগগুলো কোরআন-হাদিস অনুসারে পরিচালিত হওয়া।
১. এ কারণেই রাষ্ট্রে 'ইসলাম ধর্মত্যাগে'র 'হদ'সহ আল্লাহর সকল 'হদ' অবৈধ। [১৪৩ ও ২২৫ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।] সকলের জন্য সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার আইন আল্লাহর আইনের সম্পূর্ণ বিপরীত। উদাহরণস্বরূপ সূরা মায়েদার ১০০, সূরা আনফালের ৩৭, সূরা সাজদার ১৮, সূরা হাশরের ২০, সূরা কালামের ৩৫-৩৬ আয়াতগুলো দ্রষ্টব্য।
১. ১৯৪-১৯৫ নং পৃষ্ঠায় মুফতি হামিদুল্লাহ জান রাহিমাহুল্লাহর বক্তব্যটি পুনরায় দেখে নিন।
১. مَقَالَاتُ الكَوْثَرِيّ ، পৃ. ২৬৭। আরো দেখুন تَكْمِلَةُ فَتْحِ المُلْهِمِ ইমারাতের ভূমিকা।
১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬০০৮। দারু তাওকিন নাজাত।
১. 'নির্বাচিত প্রবন্ধ-২', পৃ. ৪০৩-৪০৪। জুমাদাল আখেরা, ১৪৩৭ হি./এপ্রিল ২০১৬ ঈ.
১. عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ وَنَجْنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ.
১. 'মিডিয়া: প্রতারক চিন্তানৈতিক অভিযান' সংলাপের ১৩তম প্রোটোকলের অন্তর্ভুক্ত আলোচনাটি পাঠ করলে মুসলমানদেরকে 'পশ্চিমা আধুনিকতা'র রঙে রঙিন করার কিছু ষড়যন্ত্র জানা যাবে। ২৪৮-২৪৯ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
২. ২১২ নং পৃষ্ঠায় প্রয়োজনে পুনরায় দেখে নাও।
১. ২৩৮-২৪০ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
১. মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ১৫১৫৬। বৈরুতের مُؤَسَّسَةُ الرِّسَالَةِ সংস্করণ।
২. বিশেষ সতর্কীকরণ : সংলাপটিসহ এ জাতীয় লেখাগুলোর মাদরাসা-শিক্ষার্থী পাঠক-পাঠিকাদের বলছি, সঠিক চেতনা ধারণ করার পাশাপাশি নিজের ইলমি যোগ্যতা বিনির্মাণের প্রতিও সবসময় মনোযোগী থাকবে। অন্যথায় তোমাদের শয়তানের ক্রীড়নকে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা আছে। 'কিতাব ও রিজালের অনুসরণ বিষয়ক দেওবন্দি মানহাজের বিবরণ' সংলাপটির শেষাংশে যে নির্দেশিকা পেয়েছ, তার আলোকে ইলমি যোগ্যতা তৈরির প্রতি পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ রাখবে। 'লেখাপড়ার আদর্শ পদ্ধতি' বইটির আলোকে পড়াশোনা করবে। 'শিক্ষার্থীদের সফলতার রাজপথ' বইটি আশা করি তোমাদের পড়া হয়েছে। ফলে ইতিবাচক মানসিকতা ও ক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করে নিজেদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য স্থির করেছ এবং গুনাহের উপকরণ হতে দূরে থেকে জীবন গড়ার মেহনত করে যাচ্ছ। আল্লাহ আমাদের সকলকে কবুল করুন। আমিন!

📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর > 📄 আত্মকথন : ভেতরের আমি ও বাইরের আমি

📄 আত্মকথন : ভেতরের আমি ও বাইরের আমি


প্রতি সপ্তাহের মতো আজও মাহাদ থেকে মাদানীনগরে বাসায় এসে পরিবারের সাথে মিলিত হলাম। স্নেহের সন্তানদের ও জীবনসঙ্গীনিকে পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদ পেয়ে মহান আল্লাহর শোকর আদায় করলাম। সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার।
বাসায় এসে লক্ষ্য করলাম, কিছু সমস্যার সমাধান বিষয়ে আমার 'ভেতরের আমি'কে 'বাইরের আমি'র সঙ্গে এবং 'বাইরের আমি'কে 'ভেতরের আমি'র সঙ্গে একান্তে নৈশালাপের সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি প্রবলভাবে তাড়িত। তবে স্ত্রী-সন্তানদের সাথে হাসি-আনন্দে কিছু সময় কাটানো ছিল পরিবেশের দাবি। এই স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ না করা অসঙ্গত মনে করলাম। তাই তাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটালাম। রাতের খাবারও একসঙ্গে খেলাম।
ঘুমের সময় হলে তাদেরকে বললাম, তোমরা শুয়ে পড়। তোমাদের অনুমতি হলে আমি কিছুক্ষণ পর আসছি। সকলে মুচকি হেসে সম্মতি প্রকাশ করল। আল্লাহ তাদেরকে মৃত্যুর সময়ও হাস্যোজ্জ্বল রাখুন। আমি ও আমার পাঠকদের প্রতিও সন্তুষ্ট হোন। আমিন! তাই এখন আশা করছি, 'ভেতরের আমি' ও 'বাইরের আমি' মুক্ত-স্বাধীনভাবে নিজেদের মাঝে অনুভূতি বিনিময় ও নৈশালাপ করার সুযোগ পাবে।
বাইরের আমি : আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছ বন্ধু?
ভেতরের আমি : ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। বন্ধু না হয়েও তুমি আমাকে 'বন্ধু' বলে সম্বোধন করেছ। তাই বুঝে নাও, আমি কেমন আছি!
বাইরের আমি : বলছ কি প্রিয়! আমি তোমার বন্ধু না? অথচ সর্বদা তোমার সঙ্গে আছি, এক মুহূর্তের জন্যও তোমার থেকে পৃথক হই না!
ভেতরের আমি : তোমার সাথে একান্তে কথা বলার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছি; আর তুমি কিনা নিজ পরিবার নিয়ে ব্যস্ত! এ অবস্থায় এ দাবি করার অধিকার কি তোমার আছে?
বাইরের আমি : মাফ করো বন্ধু! তুমি জান, পরিবারেরও চাওয়া-পাওয়া আছে। আমি তার কিছুটা আদায় করার চেষ্টা করেছি; যেন বাকি সময়টাতে তোমার প্রতি পূর্ণ মনযোগ দিতে পারি।
ভেতরের আমি : ঠিক আছে। তোমার ওজর ছিল। আর উদার মনের মানুষের কাছে ওজর গ্রহণযোগ্য।
বাইরের আমি : ধৈর্যধারণ করার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি কতো ভালো বন্ধু!
ভেতরের আমি : তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। মনযোগ দিয়ে শুনবে কি?
বাইরের আমি : অবশ্যই শুনব। সংকোচ না করে বলো।
অজ্ঞতার খোঁড়া ওজর
ভেতরের আমি : উদাহরণস্বরূপ বলি, অসংখ্য খ্রিস্টান আছে যারা খ্রিস্টধর্ম পালন করে, ইসলামের ধার ধারে না; এই বিশ্বাসে যে, খ্রিস্টধর্ম সত্য ধর্ম, আর ইসলাম বাতিল ধর্ম। এটা কি বাস্তব নয়?
বাইরের আমি : অবশ্যই।
ভেতরের আমি : কিন্তু বাস্তবতা কী?
বাইরের আমি : বাস্তবতা হলো, ইসলাম সত্য আর খ্রিস্টধর্ম মিথ্যা।
ভেতরের আমি : তাহলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করে নিজ নিজ ধর্ম অনুসরণ করার ব্যাপারে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে অজ্ঞতার ওজর রয়েছে। বিষয়টি এমন নয় কি?
বাইরের আমি : অবশ্যই।
ভেতরের আমি : আচ্ছা, আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন তাদের অজ্ঞতার এই ওজর কি গ্রহণ করবেন? ইসলাম গ্রহণ না করা সত্ত্বেও তাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবেন?
বাইরের আমি : কখনও না। কারণ, ‘জরুরিয়াতে দীনে’র ক্ষেত্রে অজ্ঞতার ওজর গ্রহণযোগ্য নয়।
ভেতরের আমি : যদি কাফেরদের না জানার ওজর অগ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে এমন সব বিষয়ে নামধারী মুসলমানদের অজ্ঞতার ওজর কেনো গ্রহণযোগ্য হবে?
বাইরের আমি : অনুগ্রহপূর্বক একটি উদাহরণ দাও তো!
মুসলমান (?) কর্তৃক কোরআনের আয়াত প্রত্যাখ্যান করার উদাহরণ
ভেতরের আমি :
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا .
কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর এই অবকাশ নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয় চূড়ান্ত করে দেওয়ার পরও নিজেদের বিষয়ে তাদের এখতিয়ার থাকবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানি করল, সে সুস্পষ্ট গোমরাহিতে পতিত হলো। [সুরা আহযাব : ৩৬]
বাইরের আমি : বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে এ আয়াত প্রত্যাখ্যান করে?
ভেতরের আমি : আয়াতের মর্মার্থ হলো, 'আল্লাহ ও রাসুল যখন কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর ব্যাপারে কোনো ফায়সালা করেন, তখন এভাবে তার বিরোধিতা করার সুযোগ নেই যে, তাদের ব্যাপারে যে ফায়সালা করা হয়েছে তারা তা ব্যতীত অন্যকিছু গ্রহণ করবে।' [আততাফসিরুল মুয়াসসার] ‘সাফওয়াতুত তাফাসির' কিতাবে আছে أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمُ অর্থাৎ তাদের জন্য কোনো মত বা এখতিয়ার থাকবে না। বরং জরুরি হলো, আত্মসমর্পণ করা ও মেনে নেওয়া। আল্লামা ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, আয়াতটি সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অতএব আল্লাহ ও রাসুল যখন কোনো বিধান প্রদান করেন, তখন কারো জন্য তার বিরোধিতা করার সুযোগ নেই। এবং তাদের কোনো এখতিয়ার, রায় বা মতামত প্রকাশেরও কোনো অবকাশ নেই।
আর এটা জ্ঞাত বিষয় যে, বাংলাদেশের জনগণ দেশের সংবিধান অনুসারে সকল ক্ষমতার উৎস। নিজেদের বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্তগ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ ও রাসুল যে ফায়সালা করেছেন, তা ব্যতীত অন্যকিছু পছন্দ করার এখতিয়ার তাদের রয়েছে। প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে নিজস্ব মতামত, পছন্দ ও সিদ্ধান্তের অধিকার।
সংবিধানের পক্ষ থেকে তাদের উক্ত অধিকার রয়েছে- বিষয়টি এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সকল জনগণ এ ক্ষমতা ও অধিকার নির্বাচনে ভোট দিয়ে এবং মিটিং- মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, হরতাল, অবরোধ, অনশন, ধর্মঘট, লংমার্চ, স্বারকলিপি প্রদান প্রভৃতি পদ্ধতিতে প্রয়োগও করে। ভোটের মাধ্যমে জনগণ নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে তাদেরকে সংসদে পাঠায়। আর প্রত্যেক বিষয়ে এই প্রতিনিধিদের নিজস্ব মতামত প্রদান করার অধিকার থাকে। তারা আল্লাহ- রাসুলের নিকট নিজেদেরকে সোপর্দ করে না এবং কোরআন- হাদিসের বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করে না। যেমন- পরস্পর সম্মতিক্রমে যিনা করা, মদ পান করা, সুদভিত্তিক লোন নেওয়া, লোন দেওয়া, ফিক্সড ডিপোজিট রাখা, সুদভিত্তিক ব্যাংকে চাকুরি করা ইত্যাদি এমন অনেক বিষয়কে বৈধ সাব্যস্ত করে, যা ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ।
তদ্রূপ ইসলামের দণ্ডবিধি তারা অবৈধ সাব্যস্ত করে, যেগুলো আল্লাহ ও রাসুল প্রবর্তন করেছেন। এগুলো কি বাস্তব নয়? এভাবে তারা আল্লাহ তাআলার উল্লিখিত বাণী প্রত্যাখ্যান করছে, যাতে তিনি বলেছেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا.
কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর এই অবকাশ নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয় চূড়ান্ত করে দেওয়ার পরও নিজেদের বিষয়ে তাদের এখতিয়ার থাকবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানি করল, সে সুস্পষ্ট গোমরাহিতে পতিত হলো। [সুরা আহযাব : ৩৬]
তারা কি মুসলমান আছে?
এখন বলো, এ সকল প্রতিনিধির হুকুম কী? এবং ঐ জনগণেরই বা কী হুকুম, যারা আল্লাহর আইনের বিপরীতে নিজেদের প্রতিনিধিদের প্রবর্তিত আইন পালন করে? অথচ আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا.
অতএব না, আপনার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের মধ্যে সংঘটিত বিবাদের ক্ষেত্রে আপনাকেই [আপনার সুন্নাহকেই] বিচারক বানাবে। তারপর আপনার ফয়সালা সম্বন্ধে নিজেদের মনে কোনো সংকীর্ণতা বোধ করবে না এবং [তা] সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিবে। [সুরা নিসা : ৬৫]
তারা কি এখনও মুসলমান আছে? তোমার কী মনে হয়?
বাইরের আমি: আর কিছু বলবে?
ভেতরের আমি: তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছ না কেন? তারা কি এখনও মুসলমান আছে? তাদের ঈমান এখনও কি বহাল আছে? আমার কথাগুলো কি অবাস্তব?
না জানার অজুহাত
বাইরের আমি : জবাব দিতে পারছি না বলে দুঃখিত। আসলে তোমার বিশ্লেষণ যে বাস্তবতার পর্দা উন্মোচন করেছে, তা জানার পর আমার অন্তর কাঁপতে শুরু করেছে। দেখ ভাই! আমি দুর্বলচিত্তের মানুষ। তাই বাস্তবতা স্বীকার করা এবং তা নিয়ে কথা বলার সাহস আমার নেই। তবে তাদের অধিকাংশই আল্লাহ তাআলার দীন ও শরিয়ত সম্পর্কে জানে না- এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়।
ভেতরের আমি : তাহলে শেষ পর্যন্ত কি তুমি বলতে চাচ্ছ, সংবিধানের পক্ষ থেকে সাংসদদের যে স্বাধীনতা রয়েছে, তা গ্রহণ করার ব্যাপারে তাদের কাছে অজ্ঞতার ওজর আছে? অর্থাৎ নিজেদের বিষয়গুলোতে ইসলামের বিপরীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগ করার সাংবিধানিক অধিকার থাকাটা যে আল্লাহ তাআলার উল্লিখিত বাণীর বিরোধী, তা জনগণের সংসদীয় প্রতিনিধিরা বুঝতে পারেনি। অতএব তাদের অজ্ঞতার ওজর রয়েছে?
বাইরের আমি : আমি এটাই বলতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু তুমি আমার সামনে খ্রিস্টান, হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অজ্ঞতার ওজরের– যা আল্লাহ গ্রহণ করবেন না- উদাহরণ পেশ করেছ। তাই আমি এখন তা বলতে চাই না। তবে জনগণ আল্লাহর বিপরীতে সংসদ সদস্যদেরকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেনি, যদিও তারা আইন প্রণয়নের স্বাধীনতা এবং বৈধ-অবৈধ নির্ধারণের ক্ষমতা তাদের নিকট সোপর্দ করেছে।
মানুষ যখন প্রভু
ভেতরের আমি: আল্লাহ তাআলা সুরা তাওবার ৩১তম আয়াতে বলেছেন-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَيْهَا وَاحِدًا لَّا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ وَ عَمَّا يُشْرِكُونَ .
অর্থাৎ তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের আলেম, আবেদ ও মাসিহ ইবনে মারইয়ামকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তাদেরকে এ আদেশই করা হয়েছিল যে, তারা এক মাবুদের ইবাদত করবে- যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তিনি তাদের শিরক থেকে পবিত্র।
ইমাম মুহিউস সুন্নাহ আবু মুহাম্মদ আলহুসাইন ইবনে মাসউদ আল বাগাবি রাহিমাহুল্লাহ [মৃ. ৫১০ হি.] তাঁর প্রসিদ্ধ তাফসির 'মাআলিমুত তানযিল ফি তাফসিরিল কোরআন' যা 'তাফসিরে বাগাবি' নামে প্রসিদ্ধ, তাতে তিনি লিখেছেন- اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ অর্থাৎ তারা নিজেদের জ্ঞানীব্যক্তিবর্গ ও ধর্মীয়গ্রন্থের পাঠকদেরকে প্রভুরূপে গ্রহণ করেছে। যদি বলা হয়, তারা তাদের ইবাদত করেনি। তাহলে আমরা বলব, আয়াতের অর্থ হলো, তারা আল্লাহর অবাধ্যতার ব্যাপারে নিজেদের আলেম ও আবেদদের অনুসরণ করেছে এবং তারা যা বৈধ সাব্যস্ত করেছে, সেটা গ্রহণ করেছে এবং যা অবৈধ সাব্যস্ত করেছে, তা মেনে নিয়েছে। এভাবে তারা আবেদ ও আলেমদেরকে প্রভুর মতো গ্রহণ করেছে।
হজরত আদি ইবনে হাতিম রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, [ইসলাম গ্রহণের পূর্বে] একবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলাম, তখন আমার গলায় একটি স্বর্ণের ক্রুশ ছিল। তা দেখে তিনি আমাকে বললেন, হে আদি! তোমার গলা থেকে এই মূর্তিটাকে ছুঁড়ে ফেলো। আমি তা ছুঁড়ে ফেললাম। তারপর তাঁর নিকট গেলাম; তিনি তখন তিলাওয়াত করছিলেন-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ
তিনি তিলাওয়াত থেকে অবসর হলে আমি বললাম, আমরা তো তাদের ইবাদত করি না। তিনি বললেন, আল্লাহ যা বৈধ করেছেন তারা কি তা অবৈধ সাব্যস্ত করে না? ফলে তোমরাও তা অবৈধ বল। আর আল্লাহ যা অবৈধ বলেছেন তারা কি তা বৈধ সাব্যস্ত করে না? আর তোমরাও তা বৈধ বল। আমি বললাম, অবশ্যই। এ কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটাই তাদের ইবাদত করা। ['তাফসিরে বাগাবি'র বিবরণ সমাপ্ত হয়েছে।]
এবার বলো, যেসকল সাংসদ ও জনপ্রতিনিধি সংসদে কোরআন- সুন্নাহর বিপরীত আইন প্রণয়ন করে, তথা আল্লাহর বৈধ করা বস্তুকে অবৈধ সাব্যস্ত করে এবং অবৈধ সাব্যস্ত করা বস্তুকে বৈধ করে, তারা কেনো আল্লাহর বিপরীতে প্রভু হবে না? আর জনগণ কর্তৃক তাদের এ ধরনের আইনগুলো মেনে চলাকে কেনো 'ইবাদত' বলা হবে না? কেনো এরূপ পরিস্থিতিতে জনগণের কাজটা শিরক হবে না? তাছাড়া যে ভোটারদের ভোটের সাহায্যে সাংসদরা সংসদে গিয়ে আল্লাহ ও রাসুলের অবৈধকৃত বিষয়কে বৈধ সাব্যস্ত করছে এবং তাঁদের বৈধকৃত বিষয়কে অবৈধ ঘোষণা করছে, সে ভোটারদেরই বা কী হুকুম হবে?
হেফাজতে ইসলামের দাবিগুলো কেনো অসাংবিধানিক ছিল?
তারপর তুমি আমাকে প্রশ্ন করেছ 'আর কিছু বলবে কি?' হ্যাঁ, বলব। গণতন্ত্রের [অর্থাৎ 'জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস' এ বিষয়টির] পাশাপাশি আরেকটি বিষয় আছে। তা হলো, বাংলাদেশের জনগণের উল্লিখিত স্বাধীনতা নিঃশর্ত নয়; বরং তা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীন প্রতিষ্ঠার দাবি না করার শর্তের সাথে শর্তযুক্ত। এজন্যই শাপলা চত্বরে আল্লামা আহমদ শফি রাহিমাহুল্লাহর নেতৃত্বে ও 'হেফাজতে ইসলামে'র পতাকাতলে দেশের মুসলমানদের '১৩ দফা দাবি' ছিল সংবিধান বিরোধী। কারণ, তারা ইসলামের দণ্ডবিধি কায়েম করার দাবি জানিয়েছিল।
বাইরের আমি : বল কি! বিশাল সংখ্যক জনগণ হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে ১৩ দফার দাবিগুলো উত্থাপন করার অধিকার তাদের ছিল না? এমন বিশাল সংখ্যক জনগণ যদি কোরআন-সুন্নাহর দণ্ডবিধি কায়েম করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়, তাহলে কেনো তারা তা বাস্তবায়ন করা তো দূরের কথা, দাবি পর্যন্ত করতে পারবে না?
ভেতরের আমি : সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদে আছে : 'প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।'
বাইরের আমি : অনুগ্রহপূর্বক বিষয়টি ব্যাখ্যা করো।
ভেতরের আমি : চারটি মূলনীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিচালিত হয়। সেগুলো হলো- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র। সংবিধানের ভাষা হলো, 'জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এই নীতিসমূহ এবং তৎসহ এই নীতিসমূহে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।'
তাহলে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' দেশ পরিচালনার অন্যতম একটি মূলনীতি। আর ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে, ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করার নাম। এটা সুস্পষ্ট যে, কোরআন-সুন্নাহর দণ্ডবিধি কায়েম করার অধিকার সাব্যস্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এজন্যই বাংলাদেশের আদালতগুলোতে ইসলাম অনুযায়ী বিচার করার দাবি করা সংবিধান বিরোধী। এখন বিষয়টি বুঝে এসেছে?
বাইরের আমি : তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কীভাবে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, তিনি এদেশে কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন বাস্তবায়নের সুযোগ দিবেন না? এমন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে কি?
যে বিধানের আলোকে বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বিচারকার্য পরিচালিত হয়
ভেতরের আমি : বাংলাদেশ সরকারের সরকারি ওয়েবসাইট ও 'উইকিপিডিয়া'য় স্পষ্ট উল্লেখ আছে, যে আইনে বর্তমান বিচারপতিরা বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বিচার করছে, তার অধিকাংশই হচ্ছে হুবহু ঐ আইন, যার মাধ্যমে ব্রিটিশ বিচারপতিরা নিজেদের সময়ে এ দেশ শাসন করেছে। আর ইসলামি আইন অর্থাৎ যেসকল বিধান আল্লাহ তাআলা নাযিল করেছেন, সেগুলো ব্রিটিশদের সময় যেমন পরিত্যাজ্য ছিল, বর্তমানেও তেমনি প্রত্যাখ্যাত। পার্থক্য শুধু এই যে, দেশের বর্তমান সময়ের বিচারপতিরা বাংলাদেশী। আর সে যুগে বিচারকরা ছিল ব্রিটিশ।
তাই বাংলাদেশের আদালতগুলোতে এত অধিক পরিমাণ কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন থাকাবস্থায় এমন কথা প্রধানমন্ত্রী কীভাবে বললেন?! আমি মনে করি, তিনি এরকম কথা তখনই বলতে পারবেন যখন আমরা মেনে নেব, তিনি বাংলাদেশের আইনের ব্যাপারে অজ্ঞ। বলাবাহুল্য, এমনটা হওয়া অসম্ভব!
নির্বাচনী প্রহসন
বাইরের আমি : বুঝেছি, এদেশ যতদিন ধর্মনিরপেক্ষ থাকবে, ততদিন প্রধানমন্ত্রীর ওয়াদা পূর্ণ করা অসম্ভব। অবশ্য সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করা সম্ভব হলে, সম্ভব হতেও পারে! কিন্তু তা বহুত দূর কী বাত!! তাহলে কি তার উল্লিখিত প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী প্রহসন ছিল?
ভেতরের আমি : তুমি নিজেই এর উত্তর খুঁজে নাও!
[এরপর এখানে বেশ দূর পর্যন্ত যে কথাগুলো ছিল, সেগুলো ‘আকাবির-আসলাফের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র’ শিরোনামের অধীনে অতিবাহিত হয়েছে। তাই তা আর প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে না ।]
শায়খ ডক্টর আবদুল্লাহ আযযাম রাহিমাহুল্লাহর [১৩৬০-১৪১০ হি.] عُشّاقُ الحُوْرِ নামে একটি কিতাব আছে। ইসলামের দাবিদার প্রত্যেকের কিতাবটি অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। বাংলাভাষায় ‘কারা জান্নাতী কুমারীদের ভালোবাসে’ নামে তা প্রকাশিত হয়েছে।
বাইরের আমি : তোমার সাথে আলোচনা দীর্ঘতর করে তোমার ঘুম অনেক বিলম্বিত করে ফেলেছি। এখন আল্লাহর নাম নিয়ে ও তাঁকে স্মরণ করে ঘুমিয়ে পড়ো। তোমার মূল্যবান আলোচনার জন্য অনেক ধন্যবাদ। সত্যিই তোমার মত ভালো বন্ধু খুঁজে পাওয়া মুশকিল! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
ভেতরের আমি : না, না, ঠিক আছে। যে কোনো সময় তোমাকে সুস্বাগতম। ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় পাঠক! উপরের লাইনগুলোতে আমি আপনাদের জন্য আমার মনের গোপন কথাগুলো প্রকাশ করেছি এবং 'ভেতরের আমি'র সাথে 'বাইরের আমি'র নৈশালাপ সুস্পষ্টভাবে এবং কিছুটা বিস্তারিত ও ব্যাখ্যাসহ তুলে ধরেছি; যাতে যে ধ্বংস হবে, যেন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর ধ্বংস হয় এবং যে বেঁচে থাকবে, সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর যেন বেঁচে থাকে।
আল্লাহ তাআলা আমাকে, আপনাকে এবং ইসলামের দাবিদার প্রত্যেককে বুদ্ধিমান হওয়ার তাওফিক দান করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'বুদ্ধিমান হলো ঐ ব্যক্তি যে নিজের হিসাব নিল এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনের জন্য আমল করল। পক্ষান্তরে অক্ষম হলো ঐ ব্যক্তি, যে নিজকে তার কুপ্রবৃত্তির অনুসারী বানাল এবং আল্লাহর নিকট [দয়া ও ক্ষমার] আশা করল।' [সুনানে তিরমিজি : ২৪৫৯ ও মুসনাদে আহমদ : ১৭১৬৫]

টিকাঃ
১. ৬ই রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হি. [১৫ নভেম্বর ২০১৮ ঈ.] বৃহস্পতিবার।
১. ৪৮ নং পৃষ্ঠায় ‘জরুরিয়াতে দীনে’র ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
১. ইসলামের দণ্ডবিধি মোট তিন প্রকার: কিসাস, হদ ও তাজির। হদ সাত প্রকার : চুরির হদ, জিনার হদ, মদপানের হদ, অপবাদের হদ, ডাকাতির হদ, জাদুর হদ ও সমকামিতার হদ। বাংলাভাষায় 'ইসলামি শাসনব্যবস্থা' বিষয়ে, বরং পূর্ণাঙ্গ 'ইসলামি জীবনব্যবস্থা'র ধারণা নেওয়ার জন্য মুফতি তারেকুজ্জামান রচিত 'ইসলামি জীবনব্যবস্থা' গ্রন্থটি দ্রষ্টব্য।
১. তাকফির বিষয়ে সীমালঙ্ঘন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আলেম পাঠকগণ শায়খ আবু মুহাম্মদ আসেম মাকদিসি [হাফিজাহুল্লাহ] রচিত الرَّسَالَةُ الثَّلَاثِينِيَّةُ فِي التحذير مِنَ الغُلُو في التكفير
১. মৃত্যু: ২৯ মহররম ১৪৪২ হি. / ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ঈ. জুমাবার বাদ মাগরিব।
১. বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৮
২. ১৯১-১৯২ নং পৃষ্ঠায় ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।

📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর > 📄 ব্যাঙ কর্পোরেশনের একটি মূল্যায়ন

📄 ব্যাঙ কর্পোরেশনের একটি মূল্যায়ন


সাদ : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
যুবায়ের: ওয়া আলাইকুমুস সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সাদ : আমি জেনেছি, আমেরিকায় 'র‍্যান্ড কর্পোরেশন' নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। এটি আসলে কী ধরনের প্রতিষ্ঠান? এ বিষয়ে আমাকে কিছু বলুন, ভাইয়া!
যুবায়ের : এটি একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান বা থিংকট্যাঙ্ক। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মার্কিন সশস্ত্রবাহিনীকে বিভিন্ন তথ্য, গবেষণা ও বিশ্লেষণ সরবরাহ করার জন্য। প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকা ও অন্যান্য সরকার, যেমন ইসরাইলের সহযোগিতায় কাজ করে এবং তাদের সহায়তা করে।
সাদ : আমি শুনেছি, প্রতিষ্ঠানটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে। অনুগ্রহপূর্বক আমাকে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলুন।
যুবায়ের : র‍্যান্ড কর্পোরেশন অসংখ্য প্রাচ্যবিদদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে আমেরিকা ও অন্যান্য কাফের রাষ্ট্রের রণকৌশল ও স্ট্র্যাটেজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সমকালীন সময়ে আমেরিকা ও ইসলামের অন্যান্য শত্রুরা এই প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ফলাফল ও প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করছে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে।
সাদ : আমি 'উইকিপিডিয়া' থেকে জেনেছি, প্রাচ্যবিদ বলা হয় সেই পশ্চিমা পণ্ডিতকে, যিনি প্রাচ্য-সংশ্লিষ্ট জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রাচ্যের ভাষা ও সাহিত্যের বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখেন। তো প্রাচ্যবিদদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী?
যুবায়ের: এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সিরিয়ার বিশিষ্ট গবেষক আলেম ডক্টর মুস্তফা সিবাঈ রাহিমাহুল্লাহ [১৩৩৩-১৩৮৪ হি.] তাঁর فِي التَّشْرِيعِ الْإِسْلَامِيّ السُّنَّةُ وَمَكَانَتُهَا পুস্তিকায় প্রাচ্যবিদদের ইসলাম-গবেষণার নেপথ্যের যে লক্ষ্যগুলো তুলে ধরেছেন, তার অন্যতম হলো-
১. হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সত্যতা বিষয়ে সংশয় সৃষ্টি করা।
২. ইসলাম আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত দীন হওয়া বিষয়ে মানুষকে সন্দিহান করে তোলা।
৩. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের বিশুদ্ধতা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করা।
৪. ইসলামি ফিকহের স্বতন্ত্র গুরুত্বের বিষয়ে অবিশ্বাসের বীজ বপন করা।
৫. বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের সাথে আরবিভাষার তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
শায়খ মুস্তফা সিবাঈ রাহিমাহুল্লাহ তাঁর اَلْإِسْتِشْرَاقُ وَالْمُسْتَشْرِقُوْنَ পুস্তিকায় প্রাচ্যবিদদের সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। পুস্তিকাটি বাংলাদেশের একাধিক প্রকাশনী থেকেও মুদ্রিত হয়েছে।
সাদ : আল্লাহ তাআলা প্রাচ্যবিদ ও তাদের সহযোগীদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করুন এবং মুসলমানদের রক্ষা করুন। আমি অবশ্যই পুস্তিকাটি পাঠ করব এবং মুসলমানদের সামনে তাদের ষড়যন্ত্র ও দুষ্কৃতির মুখোশ উন্মোচন করব ইনশাআল্লাহ।
এখন আমরা আমাদের র‍্যান্ড কর্পোরেশন বিষয়ক আলোচনায় ফিরে আসি। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু বলুন।
যুবায়ের: প্রতিষ্ঠানটি ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পর মুসলমানদেরকে চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে।
সাদ : এই শ্রেণি-বিভাজন সম্পর্কে জানব। তবে আগে বলুন, আপনার কথার উৎস কী; যেন আপনার বক্তব্যের সত্যতার বিষয়ে আমি নিশ্চিত হতে পারি; আমার ভিতরে কোনো সংশয় না থাকে এবং নিশ্চিন্ত মনে আপনার কথা গ্রহণ করে নিতে পারি।
যুবায়ের : আমার কথার উৎস প্রতিষ্ঠানটিরই একটি প্রতিবেদন, যা 'সিভিল ডেমোক্রেটিক ইসলাম : পার্টনার্স, রিসোর্সেস, অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিস' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। তুমি নিজেই তা দেখে নিতে পার। আমি তোমাকে শুধু আমার উপর ভরসা করে গ্রহণ করার কথা বলব না। কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবির ভাষায় বলেছেন, 'বলে দিন, এই হলো আমার পথ, আমি আল্লাহর দিকে অন্তর্দৃষ্টির সাথে দাওয়াত দিই, আমি এবং আমার অনুসারীরা। আল্লাহ পবিত্র। আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। [সুরা ইউসুফ: ১০৮]
তবে আমি বলব, শত্রুর ব্যাপারে শত্রুর মূল্যায়ন প্রকৃত সত্য ও বাস্তবতা নির্ভর হয়ে থাকে। তাই আমাদের উচিত, শত্রুর মূল্যায়ন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং সেই আলোকে নিজেদের করণীয় নির্ধারণ করা। আমি মনে করি, আমাদের সম্পর্কে র‍্যান্ডের মূল্যায়ন, আমাদের কর্মপন্থা নির্ধারণে সহায়তা করবে। তদ্রূপ আমরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে চার শ্রেণির কোন শ্রেণির হয়ে দাঁড়াতে চাই- তা বুঝতেও সাহায্য করবে।
সাদ : আমি আপনার কথার উৎসের ব্যাপারে আস্বস্ত হয়েছি। এখন র‍্যান্ড কর্পোরেশন মুসলমানদের যে চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে, তা বলুন।
যুবায়ের : তারা প্রথম শ্রেণির নাম দিয়েছে ফান্ডামেন্টালিস্ট, অন্যভাষায় মৌলবাদী। র‍্যান্ড তা দ্বারা ঐ সকল মুসলমানকে বুঝিয়েছে, যারা গণতন্ত্র ও সমকালীন পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান করে; নববি পদ্ধতিতে ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর করার স্বপ্ন দেখে। এবং এ লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কোরআন মাজিদের সুরা বাকারার ২০৮ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদেরকে ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ করার আদেশ করেছেন। তো যারা আল্লাহর এ আদেশ পালন করে পুরোপুরিভাবে ইসলামে প্রবেশ করে; যারা ইসলামকে শাসনব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা ও অর্থায়নব্যবস্থাও মনে করে; এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে না, র‍্যান্ডের পরিভাষায় তারা হলো ফান্ডামেন্টালিস্ট বা মৌলবাদী।
র‍্যান্ড কর্পোরেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ফান্ডামেন্টালিস্ট তথা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশকারী মুসলমানরা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের প্রথম ও প্রধান শত্রু। পশ্চিমারা নিজেদের বিরোধী কোনো জীবনব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে মোটেও প্রস্তুত নয়। তাই পশ্চিমাদের প্রতি র‍্যান্ডের পরামর্শ হলো, যেকোনো উপায়ে এ শ্রেণির মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করুন; কারণ, তারাই পাশ্চাত্য সভ্যতা ও আন্তর্জাতিক পশ্চিমা শাসনব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
সাদ : দ্বিতীয় শ্রেণি কারা?
যুবায়ের : র‍্যান্ড দ্বিতীয় শ্রেণির নাম দিয়েছে ট্র্যাডিশনালিস্ট বা ঐতিহ্যবাদী মুসলমান। এ শব্দ দ্বারা তারা ইসলামের ঐতিহ্য ধারণকারী ঐসকল মুসলিম ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে বুঝিয়েছে; যাদের তৎপরতা মসজিদের ইমামতি, জুমার খুতবা প্রদান, শিক্ষাদান, ফতোয়া প্রদান ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এ ছাড়া তাঁদের তেমন কোনো কাজ করতে হবে। বস্তুত নববি পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত খেলাফতব্যবস্থা ব্যতীত পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জীবনব্যবস্থা কার্যকর করা কিছুতেই সম্ভব নয়। বিদ্যমান পতন থেকে মুসলিম উম্মাহর উত্তরণের পথ জানার জন্য হজরত আলি মিয়াঁ নাদাবি রাহিমাহুল্লাহ রচিত 'মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো?' গ্রন্থটি অবশ্যই যেন উম্মাহর ভবিষ্যত কাণ্ডারীদের অধ্যয়ন ও আত্মস্থ হয়ে যায়। আল্লাহ সহজ করুন! প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন, 'জিহাদ আগে, না খেলাফত প্রতিষ্ঠা আগে?' প্রশ্নটির উত্তর ২৭৫-২৭৬ নং পৃষ্ঠায় দেখুন। নেই। অন্য ভাষায়, যারা ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা মনে করেন না; বরং শুধু কিছু বিশ্বাস এবং কতিপয় ইবাদত ও রুসম-রেওয়াজের সমষ্টি মনে করেন।
র‍্যান্ডের পর্যবেক্ষণ বলছে, এরা পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্য মৌলিকভাবে হুমকি নয়। উপরন্তু র‍্যান্ডের প্রত্যাশা, এরা পশ্চিমাদের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
সাদ : এর অর্থ কি এই, র‍্যান্ড এ সকল মুসলিম ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত! র‍্যান্ড তাদেরকে ভয় করে না?!
যুবায়ের : না, র‍্যান্ড কর্পোরেশন এদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয়। তাই র‍্যান্ড একইসাথে এ ব্যাপারেও সতর্ক করেছে, ফান্ডামেন্টালিস্ট ও ট্র্যাডিশনালিস্টদের মধ্যে ঐক্য হতে দেওয়া যাবে না। কারণ, ট্র্যাডিশনালিস্টরা যদি ফান্ডামেন্টালিস্টদের সঙ্গে মিলিত হয়, তাহলে তাঁদের পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তখন তারা সাহাবায়ে কেরামের অনুকরণে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর করার চেষ্টা করবে। আর তা পশ্চিমাদের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে।
র‍্যান্ড ঐতিহ্যবাদী মুসলিম ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত না থাকার কারণ হলো, সাধারণ মানুষের মাঝে তাঁদের বিরাট প্রভাব রয়েছে। তাঁদের জন্য জনসাধারণের নিকট পৌঁছা খুবই সহজ। মানুষ তাঁদের বক্তব্য নিরবে মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে। একটি ছোট্ট মাহফিল বা ক্ষুদ্র সমাবেশের আয়োজন করা কত কঠিন! স্থান নির্ধারণ করা, পোস্টার মুদ্রণ, দেয়ালে সাঁটানো ইত্যাদি কতকিছু! কিন্তু জনসাধারণ গোসল করে গায়ে সুগন্ধি মেখে নিজেদের কাছে থাকা সর্বোত্তম পোশাকটি পরিধান করে, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ঐতিহ্যবাদী ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সামনে বসে তাঁদের বক্তব্য শ্রবণ করে।
সাদ : তাহলে মার্কিন সরকারের জন্য র‍্যান্ডের প্রস্তাব কী?
যুবায়ের : মার্কিন সরকার ও তার মিত্রদের প্রতি র‍্যান্ডের প্রস্তাব ও পরামর্শ হচ্ছে, পূর্ণাঙ্গ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন লালনকারী মুসলমানদের থেকে ঐতিহ্যবাদী আলেমদেরকে দূরে রাখতে হবে। ঐতিহ্যবাদী আলেমদেরকে বিভিন্ন ফিকহি ও মাযহাবগত বিতর্কে লিপ্ত রাখতে হবে এবং ক্রমাগত এজাতীয় বিতর্কের নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করতে হবে।
সাদ : তৃতীয় শ্রেণি কারা?
যুবায়ের : র‍্যান্ডের পরিভাষা অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণি হলো মডারেট মুসলমান। এরা হলো মুসলমান নামধারী ঐ সকল লোক, যারা চায়- মুসলিম বিশ্ব বৈশ্বিক আধুনিকতার অংশ হয়ে যাক এবং নবি ও সাহাবিগণের জীবনে প্রতিষ্ঠিত ইসলাম থেকে মুসলমানগণ সম্পর্কহীন হয়ে পড়ুক, যেন মুসলমান পরিচয় ধারণ করলেও দেশের জনগণ পশ্চিমা আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে।
সাদ : এ শ্রেণির 'মুসলমান'দের ব্যাপারে র‍্যান্ডের কোনো পরামর্শ আছে কি?
যুবায়ের: হ্যাঁ, অবশ্যই। এ ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসন ও তার মিত্রদের প্রতি র‍্যান্ডের পরামর্শ হচ্ছে, মডারেট মুসলিমদের সহযোগিতা করতে হবে এবং আর্থিকভাবে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এছাড়াও প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ-সুবিধা তাদেরকে প্রদান করতে হবে।
র‍্যান্ডের আরও সুপারিশ হচ্ছে, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের প্রশংসা ফলাও করে প্রচার করতে হবে। কেননা সাধারণ মুসলমানদের মাঝে তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাই মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের উপস্থিতিকে বড় করে দেখানো উচিত; যেন তারা সাধারণ মানুষের নিকট সহজে পৌঁছতে পারে।
কারণ, জনসাধারণের নিকট পৌঁছার জন্য তাদের কাছে অন্য কোনো মাধ্যম নেই। তাদেরকে ইমাম হিসেবে মসজিদে কে প্রবেশ করতে দিবে? তাদের পেছনে কে নামাজ পড়বে? কে তাদের খুতবা শোনবে? জুতা মারা শুরু হয়ে যাবে না! তাই মডারেটদের ব্যাপারে র‍্যান্ডের পরামর্শ হচ্ছে, তাদেরকে মিডিয়ায় নিয়ে আসা। এর উপরই বর্তমানে আমল চলছে।
সাদ : মুসলমানদেরকে মডারেট বানানোর লক্ষ্যে র‍্যান্ডের বিশেষ কোনো তৎপরতা আছে কি?
যুবায়ের : বলো কি! সে এক ভয়ংকর তৎপরতা। তাদের এ বিষয়ক ভয়াবহ এজেন্ডা ও ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের বিবরণ এসেছে 'বিল্ডিং মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্কস শিরোনামে ২০০৭ সালে প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানটির এক اِسْتِرَاتِيجِيَّاتُ غَرْبِيَّةٌ لِاحْتِوَاءِ الإسلام : قِرَاءَةُ فِي تَقْرِيرِ رَانْدْ ٢٠٠٧ নামে প্রতিবেদনটির আরবিভাষায় একটি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত রয়েছে। তাতে র‍্যান্ডের আলোচ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রায়োগিক নীতি ও কলাকৌশল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ তুলে ধরা হয়েছে।
সাদ : চতুর্থ শ্রেণি কারা?
যুবায়ের : চতুর্থ শ্রেণি হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা। এরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ইসলামের বিধানগুলো অস্বীকার করে। তাদের মতে রাষ্ট্র ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে পরিচালিত হওয়া আবশ্যক। তারা মনে করে, ইসলামধর্ম কিছু বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি ছাড়া কিছুই নয়। এ শ্রেণির লোকেরা পূর্ব থেকেই পশ্চিমাদের পকেটস্থ হয়ে আছে।
সাদ : র‍্যান্ড কর্পোরেশন তার অর্থায়নকারীদের কী পরামর্শ দেয়?
যুবায়ের : ইসলামের সাথে সভ্যতার যুদ্ধে বিজয়ী থাকার জন্য অর্থায়নকারী ও সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি র‍্যান্ডের পরামর্শ হচ্ছে, তারা যেন মডারেট ও ধর্মনিরপেক্ষদেরকে সকল ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে; আর ফান্ডামেন্টালিস্টদের কঠোরভাবে মোকাবেলা করে। পাশাপাশি ট্র্যাডিশনালিস্টদেরকে তাদের ফিকহি ও মাজহাবগত বিতর্কে লিপ্ত রাখে। র‍্যান্ড কর্পোরেশনের মতে মুসলমানদের উপর পশ্চিমাদের বিজয় লাভের এটিই একমাত্র পন্থা।
সাদ : র‍্যান্ড কর্পোরেশন কখনো তার ষড়যন্ত্রে সফল হবে না, ইনশাআল্লাহ।
যুবায়ের: হ্যাঁ, অবশ্যই। সফল হওয়া তাদের পক্ষে কীভাবে সম্ভব, যখন আল্লাহ তাআলা ইসলামের হেফাজতের দায়িত্ব নিজেই নিয়েছেন! ইরশাদ করেছেন, [অর্থ] 'নিশ্চয় আমিই অবতীর্ণ করেছি যিকর [কোরআন] এবং আমিই তার হেফাজতকারী ।' [সুরা হিজর : ৯]
তবে আমাদের দায়িত্ব হলো, সাধারণ মানুষের সামনে প্রতিষ্ঠানটির মুখোশ উন্মোচন করা এবং তাঁদেরকে কোরআন পাকের এই আয়াত শোনানো ও বুঝানো- [অর্থ] 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে প্রবেশ করো পরিপূর্ণরূপে এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।' [সুরা বাকারা : ২০৮]
সাদ : শুকরান, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
যুবায়ের : আফওয়ান, ওয়া আলাইকুমুস সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

টিকাঃ
১. Civil democratic Islam: partners, resources, and strategies [নাগরিক গণতান্ত্রিক ইসলাম : অংশীদার, সম্পদ ও কৌশল] الإسلامُ الَّذِي يُرِيدُهُ الغَرْبُ : دِرَاسَةٌ تَحْلِيْلِيَّةً نَقْدِيَّةٌ لِتَقْرِيرِ مُؤَسَّسَةِ رَائِدُ : إسلام حَضَارِيٌّ دِيمُقراطِيُّ شُرَكَاءُ وَمَوَارِدُ وَاسْتِرَاتِيْجِيَّاتُ ৩৩০ পৃষ্ঠায় একটি পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়েছে। পর্যালোচনাটি মূলত মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের الدَّعْوَةُ وَأَصُوْلُ الدَّيْنِ অনুষদ থেকে মাস্টার্সডিগ্রি লাভের থিসিসরূপে তৈরি হয়েছে। সৌদিআরবের مَرْكّز الفِكْرِ المُعَاصِرِ নামক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে তা প্রকাশিত হয়েছে।
১. পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করার জন্য সঠিক আকিদাসমূহের জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি ইসলামের শরিয়াব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, অর্থায়নব্যবস্থা- এককথায় পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জীবনব্যবস্থার জ্ঞানার্জন করতে হবে। সর্বোপরি নববি পদ্ধতিতে খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করতে হবে। বস্তুত নববি পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত খেলাফতব্যবস্থা ব্যতীত পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জীবনব্যবস্থা কার্যকর করা কিছুতেই সম্ভব নয়। বিদ্যমান পতন থেকে মুসলিম উম্মাহর উত্তরণের পথ জানার জন্য হজরত আলি মিয়াঁ নাদাবি রাহিমাহুল্লাহ রচিত 'মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো?' গ্রন্থটি অবশ্যই যেন উম্মাহর ভবিষ্যত কাণ্ডারীদের অধ্যয়ন ও আত্মস্থ হয়ে যায়। আল্লাহ সহজ করুন! প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন, 'জিহাদ আগে, না খেলাফত প্রতিষ্ঠা আগে?' প্রশ্নটির উত্তর ২৭৫-২৭৬ নং পৃষ্ঠায় দেখুন।
১. 'পশ্চিমাদের গণতন্ত্র' বলা হয়েছে, গণতন্ত্র পশ্চিমাদের আবিষ্কার হওয়ার কারণে। এটা কতিপয় মুসলিম নামধারী মানুষের তথাকথিত 'ইসলামি গণতন্ত্রে'র বিপরীতে বলা হয়নি। ইসলামে কোনো গণতন্ত্র নেই। 'আকাবির- আসলাফের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র' শীর্ষক সংলাপ দ্রষ্টব্য।
১. 'মিডিয়া: প্রতারক চিন্তানৈতিক অভিযান' সংলাপের ১৩তম প্রোটোকলের অন্তর্ভুক্ত আলোচনাটি পাঠ করলে মুসলমানদেরকে 'পশ্চিমা আধুনিকতা'র রঙে রঙিন করার কিছু ষড়যন্ত্র জানা যাবে। ২৪৮-২৪৯ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
১. Building Moderate Muslim networks
২. اِسْتِرَاتِيجِيَّاتُ غَرْبِيَّةٌ لِاحْتِوَاءِ الإسلام : قِرَاءَةُ فِي تَقْرِيرِ رَانْدْ ٢٠٠٧ নামে প্রতিবেদনটির আরবিভাষায় একটি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত রয়েছে।
১. আরবি পর্যালোচনাটি প্রকাশ করেছে মিশরের রাজধানী কায়রোর অবস্থিত المركز العربي للدراسات الإنسانية নামক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00