📄 হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর দৃষ্টিতে মুরতাদ হওয়া
এ পর্বে সর্বপ্রথম নবিগণের পর সর্বোত্তম ব্যক্তি প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাজিয়াল্লাহু আনহুর [মৃ. ১৩ হি.] কর্ম লক্ষ্য করুন-
১. শায়খ জালালুদ্দিন সুয়ুতি রাহিমাহুল্লাহ [৮৪৯-৯১১ হি.] 'তারিখুল খোলাফা' কিতাবে হজরত ওমর রাজিয়াল্লাহু আনহু [মৃ. ২৩ হি.] সম্পর্কে বর্ণনা করেন, যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করলেন এবং মদিনার আশপাশের কতিপয় আরব মুরতাদ হয়ে গেল, তখন সময়ের খলিফা সিদ্দিকে আকবার রাজিয়াল্লাহু আনহু শরিয়তের বিধান অনুসারে তাদেরকে হত্যা করার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। বিস্ময়ের কথা হলো, ফারুকে আজম রাজিয়াল্লাহু আনহুর মতো ইসলামি সিপাহসালার তখন পরিস্থিতির নাজুকতা ও সংবেদনশীলতার কারণে তাদেরকে হত্যা করার ব্যাপারে ইতস্তত করছিলেন। কিন্তু বিষয়টি ছিল আল্লাহর 'হদ'(১) সংশ্লিষ্ট। তাতে শিথিলতা প্রদর্শন করা সিদ্দিকে আকবারের দৃষ্টিতে সুযোগ ছিল না। তাই ফারুকে আজম রাজিয়াল্লাহু আনহুর উত্তরেও তিনি বললেন-
هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ، مَضَى النَّبِيُّ ﷺ وَانْقَطَعَ الْوَحْيُ، وَاللهِ لَأُجَاهِدُهُمْ مَا اسْتَمْسَكَ السَّيْفُ فِي يَدِي.
অসম্ভব! অসম্ভব! নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলে গেছেন, ওহির ধারা বন্ধ হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম, আমি অবশ্যই ঐ সময় পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে থাকব, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার হাতে তরবারি লেগে থাকবে।
আলোচনার পর হজরত ফারুকে আজম রাজিয়াল্লাহু আনহুর সামনেও সত্য স্পষ্ট হয়ে গেছে, এবং তাঁরা সম্মিলিত শক্তিতে মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন এবং প্রচুর সংখ্যক মুরতাদকে তরবারি দিয়ে হত্যা করেছেন।(২)
২. মুসাইলামাতুল কাজ্জাব [মৃ. ১২ হি.] নবুওয়াতের দাবি করেছিল। সাহাবায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে তাকে মুরতাদ আখ্যা দিয়েছেন। মদিনার আশপাশের মুরতাদদের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে অবসর হওয়ার পর সিদ্দিকে আকবার রাজিয়াল্লাহু আনহু তার প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। হজরত খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ রাজিয়াল্লাহু আনহুর [মৃ. ২১ হি.] নেতৃত্বে একটি বাহিনী সেদিকে প্রেরণ করেছেন। এ বাহিনী মুসাইলামাতুল কাজ্জাবকে মৃত্যুর ঘাটে নিপতিত করেছে।(৩)
এ ঘটনা দ্বারা এটাও প্রমাণিত হলো, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর নবুওয়াতের প্রত্যেক দাবিদার মুরতাদ, সে যে প্রকার নবুওয়াতেরই দাবি করুক, অথবা যে ব্যাখ্যাই করুক। কারণ, মুসাইলামাতুল কাজ্জাব যাকে সিদ্দিকে আকবার রাজিয়াল্লাহু আনহু হত্যা করিয়েছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত অস্বীকারকারী ছিল না। বরং নিজেদের আজানে أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللَّهِ [আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল]-এর ঘোষণা দিত। (১)
তারপর যে অপরাধে তাকে মুরতাদ ও হত্যা করা জরুরি আখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা শুধু এটুকু ছিল যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত স্বীকার করা সত্ত্বেও নিজের নবুওয়াতেরও দাবি করত, যেমনটা মির্জা সাহেবের হুবহু অবস্থা।
৩. ১২ হিজরিতে বাহরাইনের কিছু লোক মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। সিদ্দিকে আকবার রাজিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে হত্যা করার জন্য হজরত আলা ইবনুল হাজরামি রাজিয়াল্লাহু আনহুকে [মৃ. ১৪ হি.] প্রেরণ করেছেন।(২)
৪. অনুরূপভাবে আম্লানে কিছু লোক মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। তাদেরকে হত্যা করার জন্য তিনি ইকরিমা ইবনে আবি জাহল রাজিয়াল্লাহু আনহুকে [মৃ. ১৩ হি.] আদেশ করেছেন। (৩)
৫. নাজিরের অধিবাসী কিছু লোক ইসলাম থেকে ফিরে গিয়েছিল। তখন সিদ্দিকে আকবার রাজিয়াল্লাহু আনহু তাদের হত্যা করার জন্য কতিপয় মুহাজির সাহাবিকে প্রেরণ করেছেন। (৪)
৬. অনুরূপভাবে যিয়াদ বিন লাবিদ আনসারি রাজিয়াল্লাহু আনহুকে [মৃ. ৪১ হি.] মুরতাদদের একটি দলকে হত্যা করার আদেশ করেছেন। (১)
এই সবগুলো ঘটনা ইসলামের সর্বপ্রথম খলিফা এবং নবিগণের পর সর্বোত্তম ব্যক্তি হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাজিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে হয়েছে, এবং সাহাবায়ে কেরামের হাতে সম্পন্ন হয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম শরিয়তের হুকুমের বিপরীত কিছু দেখাকে মৃত্যুর চেয়ে বেশি অপছন্দ করতেন। তাই আল্লাহর পানাহ! যদি সিদ্দিকে আকবার রাজিয়াল্লাহু আনহুও শরিয়তের বিপরীত কোনো হুকুম প্রদান করার ইচ্ছা করতেন, তাহলে কি সকল সাহাবি তাঁর আনুগত্য করতেন এবং অন্যায় রক্তে নিজেদের হাত রঞ্জিত করতেন? তাই এই ঘটনাগুলো, অনুরূপভাবে অন্যান্য খোলাফায়ে রাশেদিনের ঘটনাগুলো শুধু সিদ্দিকে আকবার প্রমুখের আমল নয়; বরং সকল সাহাবির সর্বসম্মত ফতোয়া যে, মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
টিকাঃ
১. হদ এমন নির্দিষ্ট শাস্তি, যা আল্লাহ তাআলার অধিকার হিসেবে সাব্যস্ত। বান্দার তা ক্ষমা করার সুযোগ নেই। ২২৫ নং পৃষ্ঠার টীকা দ্রষ্টব্য। - অনুবাদক।
২. তারিখুল খোলাফা, পৃ. ৫৬
৩. ফাতহুল বারি ও তারিখুল খোলাফা, পৃ. ৫৬
১. তারিখে তাবারি, খণ্ড ১
২. তারিখুল খোলাফা, পৃ. ৫৬
৩. তারিখুল খোলাফা, পৃ. ৫৬
৪. তারিখুল খোলাফা, পৃ. ৫৬
১. তারিখুল খোলাফা, পৃ. ৫৬
📄 হজরত ওমর রা.-এর দৃষ্টিতে মুরতাদ হওয়া
১. আপনি জেনে এসেছেন, উল্লিখিত সকল ঘটনায় ফারুকে আজম রাজিয়াল্লাহু আনহুও সিদ্দিকে আকবার রাজিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে ছিলেন এবং তাঁর পরামর্শে অংশীদার ছিলেন।
২. ফারুকে আজম রাজিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন মুরতাদ সম্পর্কে নিজের লোকদেরকে বলেছেন, তাদেরকে যেন তিন দিন পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হয় এবং প্রতিদিন একটি করে রুটি দেওয়া হয়। তিন দিনের উপদেশের পরও যদি ইরতিদাদ [ইসলাম ধর্মত্যাগ] থেকে তাওবা না করে, তখন যেন হত্যা করে দেওয়া হয়। (২)
টিকাঃ
২. কাজি ইয়াজ প্রণীত 'শিফা'।
📄 হজরত উসমান গনি রা.-এর দৃষ্টিতে মুরতাদ হওয়া
১. উল্লিখিত হাদিসগুলোতে অতিবাহিত হয়েছে, হজরত উসমান রাজিয়াল্লাহু আনহু 'মুরতাদ হত্যা'কে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ মনে করতেন এবং লোকদের দ্বারা তা সত্যায়ন করাতেন।
২. 'বাইহাকি'র সূত্রে 'কানজুল উম্মাল' কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, হজরত উসমান রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
مَنْ كَفَرَ بَعْدَ إِيْمَانِهِ طَائِعًا فَإِنَّهُ يُقْتَلُ.
যে ব্যক্তি ঈমান আনয়নের পর স্বেচ্ছায় কাফের হয়ে যাবে, তাকে হত্যা করা হবে। (১)? হাদিসের স্তর
৩. সুলাইমান বিন মুসা রাহিমাহুল্লাহ [মৃ. ১১৯ হি.] হজরত উসমান রাজিয়াল্লাহু আনহুর স্থায়ী কর্মপদ্ধতি এটিই বর্ণনা করেছেন যে, তিনি মুরতাদকে তিনবার তাওবা করার জন্য বলতেন। এরপর যদি ইসলাম কবুল না করত, হত্যা করে দিতেন। (২)
৪. হাদিসের ইমাম আবদুর রাজ্জাক রাহিমাহুল্লাহ [মৃ. ২১১ হি.] উল্লেখ করেছেন, একবার এক মুরতাদকে হজরত যিনুরাইন রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট উপস্থিত করা হয়েছে। তিনি তাকে তিনবার তাওবা করার আহ্বান করেছেন। সে গ্রহণ করেনি। তখন তাকে হত্যা করে দিয়েছেন। (৩)
৫. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজিয়াল্লাহু আনহু একদা একদল ইরাকি মুরতাদকে গ্রেফতার করে তাদের শাস্তি বিষয়ে পরামর্শ চেয়ে হজরত উসমান রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকটে চিঠি লিখেছেন। উত্তরে তিনি লিখেছেন,
اِعْرِضْ عَلَيْهِمْ دِينَ الحَقِّ، فَإِنْ قَبِلُوا فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ، وَإِنْ لَّمْ يَقْبَلُوا فَاقْتُلْهُمْ.
তাদের সামনে সত্য ধর্ম পেশ করুন। যদি গ্রহণ করে নেয়, তাহলে তাদেরকে ছেড়ে দিন। অন্যথায় হত্যা করুন। (১)
টিকাঃ
১. কানজুল উম্মাল, ১ : ৭৯
২. কানজুল উম্মাল, ১ : ৭৯
৩. কানজুল উম্মাল, ১ : ৭৯
১. কানজুল উম্মাল।
📄 হজরত আলি রা.-এর দৃষ্টিতে মুরতাদ হওয়া
১. ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেছেন, হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন মুরতাদকে হত্যা করেছেন। (২)
২. হজরত আবুত তুফাইল রাজিয়াল্লাহু আনহু [৩-১০২ হি.] বলেন, হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু নাজিয়া গোত্রের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য বাহিনী প্রেরণ করেছেন। তাতে আমিও শরিক ছিলাম। আমরা দেখলাম, তাদের মধ্যে তিনটি দল ছিল- কিছু লোক প্রথমে খ্রিস্টান ছিল। তারপর মুসলমান হয়ে ইসলামের উপর অবিচল রয়েছে। কিছু লোক খ্রিস্টান ছিল এবং ঐ ধর্মের উপরই আছে। কিছু লোক ছিল এমন, যারা প্রথমে খ্রিস্টান ধর্ম বর্জন করে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। তারপর খ্রিস্টান ধর্মের দিকে ফিরে গেছে। আমাদের দলপতি এই তৃতীয় দলকে বললেন, নিজেদের চিন্তা থেকে তাওবা করে পুনরায় মুসলমান হয়ে যাও। তারা তা প্রত্যাখ্যান করল। তখন দলপতি আমাদেরকে আদেশ করলেন, আমরা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। পুরুষদেরকে হত্যা করলাম এবং শিশুদেরকে গ্রেফতার করলাম।
৩. আবদুল মালিক বিন উমায়ের রাহিমাহুল্লাহ [৩৩-১৩৬ হি.] বর্ণনা করেন, আমি হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট উপস্থিত ছিলাম, যখন মাসতুর বিন কাবিসাকে গ্রেফতার করে আনা হলো। সে ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু পায়ের তলা বা গোড়ালি দিয়ে লাথি মেরে তাকে হত্যা করার আদেশ করলেন। হাওলা
এই হলো ঐসকল খোলাফায়ে রাশেদিনের আমল, যাদের অনুসরণ করার জন্য মুসলিম উম্মাহকে আদেশ করা হয়েছে। তাঁদের সম্পর্কে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ.
তোমাদের জন্য আমার সুন্নাহ এবং হেদায়েত ও সুপথপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহ অনুসরণ করা জরুরি। (১)
টিকাঃ
২. সহিহ বুখারি।
১. সুনানে আবি দাউদ, হাদিস নং ৪৬০৯