📄 কোরআন মাজিদে মুরতাদ হওয়ার বিধান
এ বিষয়টি যেহেতু আমার পূর্বে একাধিক গুণীজন বিস্তারিত লিখেছেন, তাই সংক্ষিপ্তাকারে শুধু একটি আয়াত উল্লেখ করার উপর ক্ষান্ত হচ্ছি।
إِنَّمَا جَزَاؤُا الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيم.
যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং ফাসাদ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে দেশে দৌঁড়-ঝাপ করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি কেবল এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে, অথবা শূলে চড়ানো হবে, অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে, অথবা দেশ থেকে তাদেরকে নির্বাসিত করা হবে। (১) এটা দুনিয়াতে তাদের লাঞ্ছনা, আর আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। [সুরা মায়িদা : ৩৩]
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে যেসকল লোেক মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, এ আয়াতটি তাদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। হাদিস ও তাফসিরের অধিকাংশ কিতাবে সংশ্লিষ্ট ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। সহিহ বুখারি, ফাতহুল বারি প্রভৃতি হাদিস ও তাফসিরের সকল নির্ভরযোগ্য কিতাবে রয়েছে, এ আয়াতে বর্ণিত বিধান কার্যকর করতে গিয়েই নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে হত্যা করেছেন। এ আয়াতের মাধ্যমে দলিল দেওয়ার জন্যই ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ মুরতাদের বিধিবিধানের পরিচ্ছেদগুলোর শুরুতে আয়াতটি উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া তিনি সুরা মায়িদার তাফসির প্রসঙ্গে তাবেঈ সাঈদ বিন জুবাইর রাহিমাহুল্লাহ [৪৬-৯৫ হি.] থেকে বর্ণনা করেছেন, 'আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করা' দ্বারা কাফের হওয়া উদ্দেশ্য। মুহাদ্দিস ইবনে বাত্তাল রাহিমাহুল্লাহর [মৃ. ৪৪৯ হি.] উদ্ধৃতিতে ফাতহুল বারি কিতাবে এ মতটিকেই সমর্থন করা হয়েছে।
মোটকথা, উল্লিখিত আয়াতে মুরতাদের জন্য হত্যার শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। হত্যা দ্বারা উদ্দেশ্য যেকোনো পদ্ধতিতে প্রাণ হরণ করা। তা তরবারির আঘাতেও হতে পারে। প্রস্তর নিক্ষেপেও হতে পারে। অন্য কোনো পদ্ধতিতেও হতে পারে। ইমাম রাগিব আসফাহানি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৫০২ হি.] 'মুফরাদাতুল কোরআন' ও সাঈদ বিন আবদুল্লাহ শারতুনি [১২৬৪-১৩৩১ হি.] 'আকরাবুল মাওয়ারিদ' কিতাবে এমনটিই লিখেছেন।
টিকাঃ
১. আগত ব্যাখ্যা, হাদিসের বিবরণ ও চার খলিফাসহ উম্মাহর সকল খলিফার সর্বসম্মত আমলের ভিত্তিতে আমার মনে হচ্ছে, 'অথবা দেশ থেকে তাদেরকে নির্বাসিত করা হবে' অংশটি মুরতাদের ব্যাপারে নয়, বরং ডাকাতি, লুটতরাজ, দুরভিসন্ধি, বিভ্রান্তিকর প্রোপাগাণ্ডা প্রভৃতি অপকর্মে জড়িত লোকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। -অনুবাদক।
📄 হাদিস শরিফে মুরতাদ হওয়ার বিধান
পূর্বে বলা হয়েছে, মুরতাদ হত্যা বিষয়ে বহু সংখ্যক হাদিস বর্ণিত রয়েছে। একবারের সাধারণ দৃষ্টি দেওয়ায় আমারই দৃষ্টিগোচর হয়েছে প্রায় ৩০টি হাদিস। কিন্তু পত্রিকার কলামে এতগুলো হাদিস উদ্ধৃত করা উপযোগী মনে হচ্ছে না। তাই শুধু ঐ ১১টি হাদিস উল্লেখ করে ক্ষান্ত হব, যেগুলো সিহাহসিত্তা তথা হাদিসের পাঠ্য কিতাবগুলোতে রয়েছে। আমি মনে করি, পত্রিকা জগতের জন্য এ পরিমাণও অনেক বেশি।
مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ .. যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করে ফেল। (১)
২. হজরত আবু মুসা আশআরি রাজিয়াল্লাহু আনহু [মৃ. ৪৪ হি.) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে ইয়েমেনের গভর্নর ছিলেন। একদা হজরত মুয়াজ রাজিআল্লাহ আনহু [মৃ. ১৮ হি.] ইয়েমেন পৌছে দেখলেন, তাঁর নিকট একজন মুরতাদকে বন্দি করে আনা হয়েছে। তখন মুয়াজ রাজিআল্লাহু আনহু বললেন,
لَا أَجْلِسُ حَتَّى يُقْتَلَ، قَضَاءُ اللهِ وَرَسُولِهِ، ثَلَاثَ مَرَّاتٍ. আমি ততক্ষণ পর্যন্ত বসব না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে হত্যা না করা হবে। এটিই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিচার। কথাটি তিনি তিন বার বলেছেন। (২)
৩. হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু [মৃ. ৪০ হি.] বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনই এক দল লোক সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন,
أَيْنَمَا لَقِيتُمُوهُمْ فَاقْتُلُوهُمْ، فَإِنَّ فِي قَتْلِهِمْ أَجْرًا لِمَنْ قَتَلَهُمْ يَوْمَ القيامة.
তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা করে ফেল। কারণ, তাদেরকে হত্যা করার মধ্যে হত্যাকারীর জন্য কিয়ামতের দিন ছওয়াব রয়েছে। (১)
৪. এ অর্থেরই আরেকটি হাদিস ইমাম আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ [২০২- ২৭৫ হি.] হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাজিয়াল্লাহু আনহু [মৃ. ৭৪ হি.] থেকে বর্ণনা করেছেন।
৫. যখন উরাইনা গোত্রের কিছু লোক মুরতাদ হয়ে গেল, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাদেরকে হত্যা করেছেন। সহিহ বুখারিসহ হাদিসের অধিকাংশ কিতাবে সংশ্লিষ্ট দীর্ঘ ঘটনা বর্ণিত রয়েছে।
৬. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজিয়াল্লাহু আনহু [মৃ. ৩২ হি.] বলেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মুসলমানকে হত্যা করা কখনো বৈধ নয়। তবে তিন ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে-
النَّفْسُ بِالنَّفْسِ ، وَالثَّيِّبُ الزَّانِي، وَالمَارِقُ لِدِينِهِ التَّارِكُ لِلْجَمَاعَةِ.
প্রাণের পরিবর্তে প্রাণ নেওয়া হবে, বিবাহ করার পর ব্যভিচারকারী, নিজের ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের দল ত্যাগকারী। (২)
৭. হজরত উসমান রাজিয়াল্লাহু আনহু [মৃ. ৩৫ হি.] যখন ঘরের ভেতর অবরুদ্ধ ছিলেন, তখন একদিন দেয়ালে আরোহণ করে লোকদের সম্বোধন করে বললেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তোমরা কি জান? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোনো মুসলমানকে হত্যা করা ঐ সময় পর্যন্ত বৈধ নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তার থেকে তিন কাজের কোনো একটি প্রকাশ না পাবে-
زِنّى بَعْدَ إِحْصَانٍ، وَكُفْرُ بَعْدَ إِسْلَامٍ، وَقَتْلُ نَفْسٍ بِغَيْرِ حَقٌّ.
বিবাহ করার পর ব্যভিচার করা, ইসলাম গ্রহণ করার পর কাফের হওয়া এবং কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা। (১)
৮. হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাজিয়াল্লাহু আনহা [মৃ. ৫৮ হি.] থেকেও একই বিষয়ে কয়েকটি হাদিস বর্ণিত রয়েছে। সহিহ মুসলিম, মুসতাদরাকে হাকিম প্রমুখ কিতাব দ্রষ্টব্য।
مَنْ غَيَّرَ دِينَهُ فَاضْرِبُوا عُنُقَهُ .
যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম পরিবর্তন করে, তার ঘাড় মটকে দাও। (২)
إِذَا أَبَقَ العَبْدُ إِلَى الشِّرْكِ فَقَدْ حَلَّ دَمُهُ ...
ব্যক্তি যখন ইসলাম ছেড়ে শিরকের দিকে ছুটে যায়, তখন তার রক্ত বৈধ হয়ে যায়। (৩)
مَنْ جَحَدَ آيَةً مِنَ القُرْآنِ فَقَدْ حَلَّ ضَرْبُ عُنُقِهِ ۵۵۰
যে ব্যক্তি কোরআনের কোনো আয়াত অস্বীকার করে, তার ঘাড় মটকে দেওয়া বৈধ হয়ে যায়। (৪)
এগুলো ঐ সকল হাদিস, যা পাঠ্য কিতাবগুলোতেই রয়েছে। অধিকাংশ হাদিস সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে আছে। এতোসব নববি অধ্যাদেশ বিদ্যমান থাকাবস্থায় 'পয়গামে সুল্লহ'-এর সম্পাদকের এই উক্তি- 'নববি সুন্নাহে মুরতাদ হত্যার কোনো নমুনা পাওয়া যায় না', তার কী পরিমাণ ইলমের বহরের প্রমাণ পেশ করে!
এর উত্তরে আমরা এ ছাড়া আর কী বলতে পারি যে, আমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধর্ম ও তাঁর হাদিসসমূহে প্রবেশ করাই তাদের মৌলিক ভুল এবং যৌক্তিক বিষয়গুলোতে অর্থহীন অনুপ্রবেশ। তাদের উচিত হলো, নিজেদের মাহদি, মাসিহ নবি, মিকাঈল, ঈসা, মুসা, ইবরাহিম, আদম, পুরুষ, মহিলা, গর্ভবতী, ঋতুবতী- এককথায় নিজেদের বহুরূপী পথ প্রদর্শকের বক্তব্য ও তার চিন্তা-চেতনার মধ্যেই যেন নিমগ্ন থাকে। ইসলামি বিধিবিধান ঐ সকল লোকদের নিকট যেন সোপর্দ করে দেয়, যারা তার উপযুক্ত।
টিকাঃ
১. হজরত ইবনে আব্বাস রাজিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বুখারি, আবু দাউদ ও দারা কুতনি।
২. বুখারি, মুসলিম, নাসাঈ, আবু দাউদ ও আহমদ।
১. সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।
২. সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।
১. নাসাঈ, তিরমিযি, ইবনে মাজা।
২. হজরত জায়েদ বিন আরকাম রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বুখারি ও মুসলিম।
৩. হজরত জারির রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে আবু দাউদ।
৪. হজরত ইবনে আব্বাস রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে ইবনে মাজা।
📄 মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়ার জন্য ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা শর্ত?
উল্লিখিত আলোচনায় এ প্রশ্নের পর্যাপ্ত উত্তর এসে গেছে। কারণ, প্রথমত মুরতাদের শাস্তির ব্যাপারে যেসকল হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোতে বিদ্রোহ ও বিরোধিতার কোনো শর্ত নেই। বরং মুরতাদের মৃত্যুদণ্ডের সাধারণ ঘোষণা রয়েছে। তারপর ইসলাম ধর্মত্যাগের শাস্তিস্বরূপ যেসকল লোককে খোলাফায়ে রাশেদিন হত্যা করেছেন, তাদের মধ্যে দু-ধরনের লোকই ছিল। এমন লোকও ছিল, যারা মুরতাদ হওয়ার পর বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। এমনও ছিল, যাদের থেকে কোনো প্রকার সন্ত্রাস ও বিদ্রোহের ইচ্ছা প্রকাশ পায়নি।
যেসকল লোক মুরতাদের মৃত্যুদণ্ডকে এই বলে উড়িয়ে দিতে চায়, ইসলামে শুধু ঐসকল মুরতাদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে যারা দারুল ইসলামের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে; তারা কী বলে, তারা যেন চোখ খুলে হাদিস ও পূর্বসূরিদের আমলে দৃষ্টিপাত করে জেনে নেয়!
📄 মুরতাদকে হত্যা করার জন্য অগ্রাহ্যার্থ করা যাবে?
উল্লিখিত হাদিস ও পূর্বসূরিদের ঘটনাবলিতে এ প্রশ্নেরও উত্তর রয়েছে। কারণ, সেগুলো দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেছে, মুরতাদের মূল শাস্তি হলো হত্যা। আর আমরা ইমাম রাগিব আসফাহানি ও অন্যান্য ভাষাবিদদের থেকে বর্ণনা করে এসেছি, হত্যা অর্থ জীবন হরণ করা, চাই তা তরবারি দ্বারা, প্রস্তরাঘাতে, বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে হোক।
অতএব যখন মুরতাদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি প্রমাণিত হয়ে গেল, তখন যুগের ইমামের জন্য সময়ের উপযোগিতা লক্ষ্য রেখে যে পদ্ধতিতে ইচ্ছা, হত্যা করার এখতিয়ার রয়েছে। হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি এক মুরতাদকে অধিক অহংকারী মনে করে পায়ের তলা বা গোড়ালি দিয়ে লাথি মেরে হত্যা করার আদেশ করেছেন।