📄 কিছু সন্দেহের উত্তরসহ প্রতিকার সারনির্যাস
এ বিষয়ে সর্বপ্রথম লক্ষণীয় হলো, ইসলামের গণ্ডি থেকে বহির্ভূত তথা কাফের হয়ে যাওয়ার জন্য ব্যক্তির ইচ্ছা ও নিয়ত থাকা আবশ্যক নয়। বড় শয়তান ইবলিস কাফের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা করেনি। কিন্তু তার কর্ম তাকে কাফের বানিয়ে দিয়েছে।(১) তার সম্পর্কেই কোরআন মাজিদের ইরশাদ হয়েছে-
وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ.
সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। [সুরা বাকারা : ৩৪]
প্রথম শতাব্দীতে জাকাত দিতে অস্বীকারকারী ও মিথ্যুক মুসাইলামার অনুসারীরাও ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার ইচ্ছা করেনি। অথচ সাহাবায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে তাদেরকে ইসলাম থেকে বহির্ভূত গণ্য করেছেন। কারণ, ব্যাখ্যাসাপেক্ষ অস্বীকারকে যদি কখনো অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান গণ্য না করা হয়, তাহলে দুনিয়ার বড় থেকে বড় কাফেরকেও ইসলামের গণ্ডি থেকে বহির্ভূত বলা যাবে না। বরং মূর্তিপূজক ও ইহুদি-খ্রিস্টানদেরকেও মুসলমান বলতে হবে।
কেননা ইবলিস শয়তান আল্লাহ তা'আলাকে কখনো অস্বীকার করেনি; না সে আল্লাহর সত্তাকে অস্বীকার করেছে, না তাঁর কোনো গুণকে অবিশ্বাস করেছে। বরং সে শুধু গায়রুল্লাহকে সিজদা করতে অস্বীকার করেছে। সে তো এ কথাও বলতে পারে, আমি সবচেয়ে বড় তাওহিদপন্থী। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তার এ অবাধ্যচরণকে অস্বীকারকরণের স্তরে রেখে তাকে সবচেয়ে বড় কুফর আখ্যা দিয়েছেন।
অনুরূপভাবে সাধারণ মূর্তিপূজকরা নিজেদের মূর্তিসমূহের পূজা করার কখনো এ ব্যাখ্যা করত যে, আমরা স্বয়ং মূর্তিগুলোকে আল্লাহ মনে করি না। বরং এগুলোকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করে তাঁর সন্তুষ্টি প্রাপ্তির আশায় তাদের পূজা করি। কিন্তু কোরআন মাজিদ তাদের এ ব্যাখ্যা অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়েছে। তাদের ভাষায় ইরশাদ হয়েছে,
مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى.
আমরা তো তাদের উপাসনা কেবল এ জন্য করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। [সুরা যুমার: ৩]
কখনো এই ব্যাখ্যা করে, এই মূর্তিগুলো সরাসরি আল্লাহ নয়; বরং আল্লাহর অধীনস্ত। তবে অত্যন্ত নিকটবর্তী হওয়ার কারণে তারাও জ্ঞান, শক্তি প্রভৃতি গুণের ক্ষেত্রে আল্লাহর অংশীদার। হাদিসে এসেছে, আরবের মুশরিকরা তাদের হজে তালবিয়া হিসেবে বলত, لَا شَرِيكَ لَكَ إِلَّا شَرِيْئًا هُوَ لَكَ ]আপনার কোনো অংশীদার নেই, এমন এক অংশীদার ব্যতীত যে আপনারই অধীন। অর্থাৎ মূর্তি প্রভৃতি ।]
মোটকথা, মূর্তিপূজক ও মুশরিকরাও لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ ]আল্লাহ ব্যতীত ইবাদত লাভের উপযুক্ত কেউ নেই] কালিমার সুস্পষ্ট বিরোধিতা করত না। বরং ব্যাখ্যার পথ গ্রহণ করত। কিন্তু কোরআন মাজিদ এমন অসার ব্যাখ্যাগুলোকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা ও অস্বীকার করার সমার্থক ধরে তাদের সকলকে কাফের আখ্যা দিয়েছে। কারণ, لَا شَرِيكَ لَكَ [আপনার কোনো অংশীদার নেই] বিষয়ক কোরআন মাজিদ ও হাদিস শরিফের উক্তিগুলো এতটাই দ্ব্যর্থহীন যে, তা থেকে কোনো একটি জিনিসও ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই। এবং কোনো ধরনের বিশেষত্ব ও ব্যতিক্রম ব্যতীত আপন বাহ্যিক অর্থে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ব্যাপক হওয়া মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত আকিদা।
অদ্রূপ যে ব্যক্তি خَاتَمَ النَّبِيِّينَ ]শেষ নবি/নবিগণের ধারা সমাপ্তকারী] আয়াত অথবা لَا نَبِيَّ بَعْدِي ]আমার পর কোনো নবি নেই[ হাদিসে মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত আকিদার বিপরীত কোনো বিশেষত্ব ও ব্যতিক্রমের পথ বের করে বলবে, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাতামুন্নাবিয়্যিন তো আছেনই, এবং তাঁর পর কেউ নবি হতে পারে না। অবশ্য তাকে ব্যতীত, যে 'ছায়া বুরুজি' হিসেবে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুবহু সত্তা বা তাঁর ছায়া হবে। এ ব্যাখ্যা প্রকৃতপক্ষে আরবের মুশরিকদের ঐ বিশ্বাসের অনুকরণ ছাড়া কিছুই নয়, যা তারা إِلَّا شَرِيْكًا هُوَ لَكَ [এমন এক অংশীদার ব্যতীত, যে আপনারই অধীন] বলে ব্যক্ত করত।
যদি النَّبِيِّينَ و خَاتَمَ لا نَبِيَّ بَعْدِي -এর অসার ব্যাখ্যাকারীদেরকে ইসলামের গণ্ডিবহির্ভূত মনে না করা হয়, তাহলে মূর্তিপূজারি ও মুশরিকদেরকে, বরং তাদের গুরু ও শিক্ষক ইবলিসকেও ইসলামের গণ্ডিবহির্ভূত বা কাফের বলা যাবে না।
এ ধরনের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা করে উম্মাহর সর্বসম্মত আকিদাসমূহ ও কোরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট উক্তিগুলো প্রত্যাখ্যানকারীদেরকে মুসলিম উম্মাহ থেকে পৃথক করাকে যেসকল লোক এজন্য মন্দ মনে করে যে, তাতে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়; তাদের সংখ্যা হ্রাস পায় এবং তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়; তাদের চিন্তা করা উচিত, যদি বিভেদ ও মতানৈক্য থেকে বাঁচার অর্থ এটাই হয় যে, কেউ যা-ই করুক ও যা-ই বলুক, তাকে ইসলামের গণ্ডিবহির্ভূত মনে করা যাবে না, তাহলে ঐ সব মাটিভর্তি মুলহিদ ও যিন্দিকদের দ্বারা উম্মাহর কী লাভ হবে?
এমন বাজে ব্যাখ্যাসমূহ দ্বারা তো সমগ্র বিশ্বের কাফেরদেরকে মুসলিম উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত করা যায়। যদি এমনই সহনশীল আচরণ করতে হয়, তাহলে তা পেট ভরেই করুন, যেন পৃথিবীর সকল জাতি ও সাম্রাজ্যসমূহ নিজের হয়ে যায়, এবং ঈমান-কুফরের এ যুদ্ধই সমাপ্ত হয়ে যায়।
এটি এমন চমৎকার কল্পনা ও সহনশীলতা, যা গ্রহণ করলে কোরআন মাজিদ থেকে হাত গুটিয়ে নিতে হবে। কারণ, কোরআন ঘোষণা করেছে,
فَمِنكُمْ كَافِرُ وَمِنكُم مُّؤْمِنٌ .
তারপর তোমাদের মধ্যে কেউ কাফের, কেউ ঈমানদার। [সুরা তাগাবুন : ২]
কোরআন 'আল্লাহর দল' ও 'শয়তানের দল' নামে পার্থক্যরেখা টেনেছে। কোরআন পাকের প্রায় অর্ধাংশই কুফর ও কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও বিরোধিতায় পূর্ণ।
টিকাঃ
১. তার কর্মের কারণে সে কাফের হয়ে গেছে। -অনুবাদক।