📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর > 📄 সতর্কীকরণ

📄 সতর্কীকরণ


এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়-

১. কুফরি ও ধর্মত্যাগ ঐ অবস্থায় সাব্যস্ত হয়, যখন কেউ কোনো অকাট্য বিধান গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এবং বিধানটি মান্য করা জরুরি হওয়ার আকিদা পোষণ না করে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি বিধানটি গ্রহণ করা আবশ্যক মনে করে, তবে উদাসীনতা বা দুষ্টামিবশত তার উপর আমল না করে, তাহলে তার অবস্থাকে কুফরি ও ধর্মত্যাগ বলা হবে না। পুরো জীবনে তার উপর একবারও আমল না করলেও তাকে মুসলমান বলা হবে।

প্রথমোক্ত ব্যক্তির অবস্থা ভিন্ন। সে কোনো অকাট্য বিধানকে আমলে পরিণত করা জরুরিই মনে করে না; যদিও কোনো কারণে পুরো জীবন তার উপর আমল করে যায়। এ ব্যক্তিকে মুরতাদ ও কাফের আখ্যা দেওয়া হবে। যেমন এক ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কঠোরভাবে আদায় করে, কিন্তু নামাজকে ফরজ ও আদায় করা জরুরি মনে করে না- এমন ব্যক্তি কাফের। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় ব্যক্তি যে নামাজকে ফরজ মনে করে, তবে কখনো পড়ে না, সে কাফের নয়, যদিও সে ফাসেক, পাপাচারী ও কঠিন গুনাহগার।

২. চিন্তাযোগ্য দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, প্রমাণিত হওয়ার দিক থেকে ইসলামের বিধানগুলো বিভিন্ন স্তরের। প্রত্যেক স্তরের হুকুম এক নয়। শুধু ঐসকল বিধান অস্বীকার করলে ব্যক্তি মুরতাদ ও কাফের হয়, যেগুলো শরিয়তে অকাট্যভাবে প্রমাণিত এবং যেগুলোর মর্মও অকাট্য।

'অকাট্যভাবে প্রমাণিত (১) হওয়ার অর্থ হলো, সেগুলো পবিত্র কোরআন বা এমন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, যার বর্ণনাকারী নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরকতময় যুগ থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক এলাকায় এতো অধিকসংখ্যক যে, মিথ্যার উপর তাদের সকলের একমত হওয়া অসম্ভব। পরিভাষায় একেই 'তাওয়াতুর' এবং এ জাতীয় হাদিসকে 'মুতাওয়াতির হাদিস' বলা হয়।

পক্ষান্তরে 'মর্ম অকাট্য (২) হওয়ার ব্যাখ্যা হলো, এ বিধান সম্পর্কে কোরআন মাজিদে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, অথবা যে মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা তা প্রমাণিত রয়েছে, তা তার উদ্দিষ্ট অর্থ পরিষ্কার ভাষায় প্রকাশ করে। তাতে কোনো প্রকার জটিলতা বা অস্পষ্টতা নেই। ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যার অবকাশও নেই।

তারপর এ প্রকারের অকাট্য বিধানগুলো যদি مسلمانوں বিশেষ ও সাধারণ প্রত্যেক স্তরে এমন প্রসিদ্ধ ও পরিচিত হয়, যা জানা কোনো বিশেষ গুরুত্বদান, শেখা ও শেখানোর উপর নির্ভরশীল থাকে না, বরং সাধারণভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে মুসলমানদের সেগুলো জানা হয়ে যায়, যেমন- নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি ফরজ হওয়া, এবং চুরি, মদ্যপান প্রভৃতি কাজগুলো হারাম হওয়া, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষনবি হওয়া)- এ ধরনের অকাট্য বিষয়গুলোকে 'জরুরিয়াতে দীন' বলা হয়। পক্ষান্তরে যেগুলো এ স্তরের প্রসিদ্ধ নয়, সেগুলোকে শুধু 'অকাট্য' বলা হয়, 'জরুরিয়াত' বলা হয় না।

'জরুরিয়াত' ও 'শুধু অকাট্য' -এ দুটোর বিধানের মধ্যে পার্থক্য হলো, 'জরুরিয়াতে'র অস্বীকার উম্মাহর ঐকমত্যে সর্বাবস্থায় কুফরি। না জানা ও অজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে ওজর নয়। তদ্রূপ তাতে কোনো প্রকার ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ নেই।

শুধু অকাট্য বিষয়- যেগুলো প্রসিদ্ধির ক্ষেত্রে জরুরিয়াতের স্তরে পৌঁছেনি, হানাফি ফকিহদের নিকট সেগুলো ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। যদি কোনো সাধারণ মানুষ না জানা ও অজ্ঞতার কারণে তা অস্বীকার করে বসে, তাহলে এখনই তার কুফরি ও ধর্মত্যাগের হুকুম দেওয়া হবে না। বরং প্রথমে তাকে জানানো হবে, এটি ইসলামের ঐসকল বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যা অকাট্যভাবে প্রমাণিত এবং তার মর্মও অকাট্য, তা অস্বীকার করা কুফরি। তারপরও যদি সে আপন প্রত্যাখ্যানে অনড়

টিকাঃ
১. صُرِّح به في شَرْحِ المَقَاصِدِ ..
১. قَطْعِيُّ الثُّبُوتِ ..
২. قَطْعِيُّ الدَّلَالَةِ .
১. দেশের উত্তরাঞ্চলে আমাদের এক সফরের ঘটনা। এলাকার এক যুবক নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দিল। তখন আমাদের এক সফরসঙ্গী তাকে মুসলমানদের নবির নাম জিজ্ঞাসা করল। যুবকটির অবস্থাদৃশ্যে মনে হলো, সে যেন 'নবি' প্রসঙ্গটির সঙ্গে পরিচিতই নয়। বেশ কয়েক মিনিট চিন্তা করে বলল, 'শেখ মুজিবুর রহমান'। তারপর উত্তরটা সঠিক হয়েছে কি-না জানার জন্য, উৎসুক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল । এ ঘটনাকে প্রমাণরূপে পেশ করে একজন বলল, নবির নাম জানা 'জরুরিয়াতে দীনে'র অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও দেখা গেল, উত্তরাধিকারসূত্রে অনেক মুসলমান তা জানে না। এমতাবস্থায় 'জরুরিয়াতে দীনে'র উক্ত সংজ্ঞা কী করে সঠিক হয়? তাকে বললাম, 'জরুরিয়াতে দীনের অস্বীকার উম্মাহর ঐকমত্যে সর্বাবস্থায় কুফরি। না জানা ও অজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে ওজর নয়।' এ মূলনীতি থাকা দ্বারা বুঝে আসে, একটি জিনিস জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও উদাসীনতার কারণে কিছু লোকের সে ব্যাপারে অজ্ঞ থাকা অসম্ভব নয়। এ জন্যই সংজ্ঞায় 'সাধারণভাবে' শব্দটি শর্ত হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। -অনুবাদক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00