📄 সতর্কতার দ্বিতীয় দিক
পূর্বের আলোচনায় পরিষ্কার হয়েছে, যেভাবে কোনো শাখাগত মতপার্থক্যের কারণে, অথবা কোনো একাধিক অর্থের সম্ভাবনাময় ও অস্পষ্ট উক্তির কারণে, অথবা কুফর হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মতপার্থক্যপূর্ণ কোনো আকিদা ও উক্তির কারণে কোনো মুসলমানকে কাফের আখ্যা দেওয়া ভারি অসতর্কতা ও নিজের ঈমানকে ঝুঁকিতে ফেলার নামান্তর, কেননা তখন ঈমানকে কুফর আখ্যা দেওয়া আবশ্যক হয়, তদ্রূপ কোনো নিশ্চিত কাফেরকে মুসলমান আখ্যা দেওয়াও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধ এবং নিজের ঈমানকে ঝুঁকিতে ফেলার নামান্তর। কেননা তখন কুফরকে ঈমান বলা আবশ্যক হয়ে যায়। বলাবাহুল্য, যদি ঈমানকে কুফর অথবা কুফরকে ঈমান বলা স্বজ্ঞানে ও ইচ্ছাপূর্বক হয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে কুফর। অন্যথায় কুফরের ঝুঁকি থেকে তো অবশ্যই মুক্ত নয়। (১)
তাছাড়া কোনো কাফেরকে মুসলমান বলে দেওয়া শুধু একটি শব্দের উদারতা নয়, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামি সমাজের উপর বিরাট অবিচার। কারণ, তাতে পুরো উম্মাহর উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিবাহ, বংশ, উত্তরাধিকার, কোরবানি, ইমামতি, সালাত এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার- সবগুলোর উপর প্রভাব পড়ে।
এ ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতা (২) একজন প্রকৃত মুসলমানকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করতে পারে। (৩) অনুরূপভাবে (৪) ইসলামের একজন শত্রুকে ইসলামি সমাজের আস্তিনের সাপ ও কপট বন্ধু বানাতে পারে। আর এ উভয় ঝুঁকি উম্মাহর জন্য অনেক ভয়ঙ্কর, এবং সেগুলোর ফলাফল ও পরিণতি সুদূরপ্রসারী।
উল্লিখিত বিবরণ অনুসারে কুফরির যে রূপকে (১) শরিয়তের পরিভাষায় যান্দাকা ও ইলহাদ বলা হয়, যার মধ্যে একজন ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসুলের অনুগত হওয়ার মৌখিক ও আন্তরিক স্বীকৃতিও প্রদান করে; সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত- ইসলামের প্রভৃতি প্রতীকের অনুসরণও করে, তবে সেগুলোর পাশাপাশি কিছু কুফরি আকিদাও পোষণ করে, অথবা 'জরুরিয়াতে দীনে'র অসার ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে ইসলামের বিধিবিধান বিকৃত করে, তার বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদসঙ্কুল। (২)
টিকাঃ
১. অর্থাৎ যদি ঈমানকে কুফর এবং কুফরকে ঈমান আখ্যা দেওয়া স্বজ্ঞানে ও ইচ্ছাপূর্বক না হয়, তাহলেও তা কুফরির ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। -অনুবাদক।
২. কাফের আখ্যাদানকারী ব্যক্তির সামান্য অসতর্কতা। -অনুবাদক।
৩. পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে কাফের আখ্যা দিলে একজন প্রকৃত মুসলমান ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত গণ্য হওয়ার আশঙ্কা আছে। -অনুবাদক।
৪. অর্থাৎ পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে মুসলমান আখ্যা দিলে ...। -অনুবাদক।
১. 'উল্লিখিত বিবরণ অনুসারে' থেকে 'ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদসঙ্কুল' পর্যন্ত অনুচ্ছেদটি মূল উর্দু কিতাবে 'এ ক্ষেত্রে' থেকে শুরু হওয়া অনুচ্ছেদের পূর্বে ছিল। অবশ্য মূল উর্দুতে শুরুতে 'তাই' শব্দসহ উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ 'তাই উল্লিখিত বিবরণ অনুসারে'। কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে, 'এ ক্ষেত্রে' থেকে শুরু হওয়া অনুচ্ছেদের বক্তব্যটি 'তাছাড়া কোনো কাফেরকে...' অনুচ্ছেদের সাথে যুক্ত। তাই স্থান পরিবর্তনের কাজটি করা হয়েছে। সচেতন পাঠকের নিকট যদি মূল কিতাবের বিন্যাসটিই অধিক উপযোগী মনে হয়, তিনি সেভাবেই বুঝে নিবেন। -অনুবাদক।
২. কারণ, সে যদি তাওবা করে ঈমান নবায়ন না করে, তাহলে চির জাহান্নামি হবে। -অনুবাদক।
📄 আলোচনার সারমর্ম
আলোচনার সারমর্ম : ইরতিদাদের একটি প্রকার হলো, ধর্ম পরিবর্তন করা। দ্বিতীয় প্রকার হলো, দীনের জরুরিয়াত ও অকাট্য কোনো বিষয়কে অস্বীকার করা; অথবা জরুরিয়াতে দীনের এমন ব্যাখ্যা করা, যা দ্বারা তার পরিচিত মর্মের বিপরীত মর্ম সৃষ্টি হয় এবং জ্ঞাত উদ্দেশ্য পরিবর্তন হয়ে যায়।
টিকাঃ
১. ৪৭ নং পৃষ্ঠার টীকায় অতিবাহিত হয়েছে, المُسَامَرَةُ নামক ব্যাখ্যাগ্রন্থটির লেখক মূলত শায়খ কামালুদ্দিন ইবনু আবি শারিফ আলকুদসি আশশাফেয়ি রাহিমাহুল্লাহ [৮২২-৯০৬ হি.]। শায়খ কামালুদ্দিন ইবনুল হুমام আলহানাফি রাহিমাহুল্লাহ নন। -অনুবাদক।
📄 তাকফিরের মূলনীতি
তাই ইসলামের দাবিদারকে কাফের আখ্যা দেওয়া প্রসঙ্গে শরিয়তের মূলনীতি হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত কারো বক্তব্য ব্যাখ্যা করে সঠিক রাখার সুযোগ থাকে, এবং বক্তার বক্তব্যে ঐ ব্যাখ্যার বিপরীত কিছু পরিস্কারভাবে না থাকে, অথবা ঐ বিশ্বাস কুফরি হওয়ার ব্যাপারে মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে সামান্যতম মতানৈক্য থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে কাফের বলা যাবে না। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি দীনের কোনো 'জরুরি' বিষয় অস্বীকার করে, অথবা এমন ব্যাখ্যা করে যা তার সর্বসম্মত মর্মের বিপরীত মর্ম সৃষ্টি করে, তাহলে তাকে কাফের আখ্যা দেওয়ার ব্যাপারে কালক্ষেপণ করার সুযোগ নেই।
وَاللَّهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَعْلَمُ
টিকাঃ
১. বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করে সঠিক সাব্যস্ত করার সুযোগ থাকতে পারে। ভাস্কর্য তৈরি ও স্থাপন প্রভৃতি হলো কর্ম। কর্মের মধ্যে সে সুযোগ নেই। ১০৬-১০৮ নং পৃষ্ঠায় হজরত আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রাহিমাহুল্লাহর উদ্ধৃতি দ্রষ্টব্য। উল্লেখ্য, 'প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণের অবৈধতা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধান। এতে পূজার শর্ত নেই। এই অবৈধতার কারণ হল, আল্লাহর সৃষ্টিগুণের সঙ্গে সাদৃশ্য গ্রহণ, যা বিভিন্ন হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।' মাসিক আলকাউসার, ডিসেম্বর ২০০৮ দ্রষ্টব্য। প্রাণীর ভাস্কর্য তৈরি অবৈধ হওয়ার বিষয়টি 'তাওয়াতুর' দ্বারা প্রমাণিত। অতএব তার 'মানসুস ও ইজমায়ি' ব্যাখ্যার বিপরীত ব্যাখ্যা করা যান্দাকা ও ইলহাদ। এক শ্রেণির লোক তা বৈধ হওয়ার পক্ষে যেসব যুক্তি পেশ করে, সেগুলোর অসারতা জানার জন্য 'আলকাউসারে'র উল্লিখিত সংখ্যার 'আমিও বলি, কোথায় যাব, কার কাছে যাব!' লেখাটি অবশ্যই পাঠ করুন। -অনুবাদক।
📄 কাফের বানানো নয়, বরং কাফের আখ্যা দেওয়া
বর্তমানে দীনের মূলনীতিসমূহ সম্বন্ধে অনবহিত অসংখ্য মানুষ যিন্দিকদের বাহ্যিক নামাজ, রোজা প্রভৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদেরকে কাফের আখ্যাদানকারী আলেমসমাজের উপর এ অপবাদ আরোপ করে যে, তারা মুসলমানদেরকে কাফের বানায়। কিন্তু উল্লিখিত বিবরণ দ্বারা পরিস্কার হয়ে গেছে, আলেমগণ কাউকে কাফের বানান না। তবে যে ব্যক্তি আপন কুফরি আকিদা, আচরণ ও উচ্চারণের কারণে নিজেই কাফের হয়ে যায়, তাঁরা তার কাফের হওয়ার সংবাদ প্রদান করেন মাত্র।
মোটকথা, রাসুলকে মিথ্যুক প্রতিপন্ন করার আলোচ্য প্রকার যার পারিভাষিক নাম যান্দাকা ও ইলহাদ, নিকৃষ্টতর কুফরি; ইসলাম ও مسلمانوں জন্য এ কুফরি অন্য সকল কুফরির তুলনায় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। ইবলিসের মতো কাফের এ প্রকারের প্রত্যাখ্যান করার কারণেই কাফের সাব্যস্ত হয়েছে।
কিন্তু এই প্রত্যাখ্যান যেহেতু প্রত্যাখ্যানের রঙে প্রকাশ পায়নি, তাই মুসলমানরাও তা দ্বারা অনেক প্রতারিত হয়। বিশেষত যখন এমন ব্যক্তি ইসলামের বিশেষ প্রতীকসমূহ তথা নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, পাগড়ি প্রভৃতিতে অভ্যস্ত হয়।
তাই কোরআন-হাদিস ও উম্মাহর আকাবিরগণের সুস্পষ্ট উক্তিমালার আলোকে বিষয়টির মূল বাস্তবতা স্পষ্ট করা প্রয়োজন ছিল। শোকর আল্লাহর, এ পুস্তিকায় পরিপূর্ণরূপে তার ব্যাখ্যা এসেছে। পরিস্কার হয়ে গেছে যে, ইসলামের অকাট্য ও নিশ্চিত বিধানগুলো ব্যাখ্যা করে সেগুলোকে 'মানসুস ও ইজমায়ি'(১) মর্ম থেকে সরিয়ে ভিন্ন কোনো মর্ম উদ্দেশ্য নেওয়া, প্রকৃতপক্ষে রাসুলকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়ার নামান্তর।
এ আলোচনার অধীনে এটিও জানা হয়ে গেল- হাদিসে 'আহলে কিবলা'কে কাফের আখ্যা দেওয়ার যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তার অর্থ এ নয় যে, যে ব্যক্তি কিবলার দিকে মুখ করবে সে মুসলমান। বরং 'আহলে কিবলা' ইসলামি শরিয়তের একটি পারিভাষিক শব্দ। তা শুধু ঐসকল লোকদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যারা ইসলামের সাধারণ নিদর্শনাদি তথা নামাজ প্রভৃতি মুসলমানদের মতো সম্পাদন করে, এবং তাদের থেকে এমন কোনো আচরণ ও উচ্চারণ প্রকাশ পায় না, যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার নামান্তর।
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ للهِ رَبِّ العَالَمِينَ.
حَرَّرَهُ العَبْدُ الضَّعِيفُ
মুহাম্মদ শফি আফাল্লাহু আনহু রবিউস সানি ১৩৭৩ হি. জানুয়ারি ১৯৫৪ ঈ.
টিকাঃ
১. মানসুস ও ইজমায়ি : কোরআন-হাদিসে বর্ণিত ও উম্মাহর সর্বসম্মত।