📄 কাফের আখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সতর্কতা
উল্লিখিত আলোচনা দ্বারা জানা গেল, কিবলার দিকে মুখকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে 'আহলে কিবলা' বলা হয় না। 'আহলে কিবলা' শরিয়তের একটি পরিভাষা। তা দ্বারা শুধু ঐ সকল লোকদের বোঝানো হয়, যারা কিবলার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করে, এবং 'জরুরিয়াতে দীনে'র কিছুই অস্বীকার বা অপব্যাখ্যা করে না।
এ ভিত্তিতে এমন অসংখ্য লোককেও কাফের বলতে হবে, যারা নিজেদেরকে মুসলমান বলে, নামাজ-রোজা পালন করে, কোরআন মাজিদের তেলাওয়াত ও খেদমত করে, কিন্তু ইসলামের অকাট্য ও 'জরুরি' কোনো হুকুমকে অস্বীকার করে। [অথবা তার 'মানসুস ও ইজমায়ি’১) ব্যাখ্যার বিপরীত ব্যাখ্যা করে। -অনুবাদক ।]
কিন্তু এখানে একটি অসতর্কতার আশঙ্কা আছে। তা হলো, এমন হলে মুসলমানদের মধ্যে পরস্পরকে কাফের আখ্যা দেওয়ার দরজা খুলে যেতে পারে, যা তাদের জন্য ধ্বংস টেনে নিয়ে আসবে।
একটি দীর্ঘ সময় ধরে এটি শুধু আশঙ্কাই থাকেনি; বরং বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীনের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ কতিপয় নামধারী আলেম তুচ্ছ তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে, মুসলমানদেরকে কাফের আখ্যা দেওয়ার পেশা গ্রহণ করে নিয়েছে। তাদের মধ্যে একে অপরকে কাফের আখ্যা দেওয়ার ফতোয়া চলতে থাকে।
ফিকহের কিতাবসমূহে বিভিন্ন উক্তিকে 'কুফরি উক্তি' বলা হয়েছে। তারা এ সকল উক্তি দ্বারাও প্রতারিত হয়েছে। উক্তিগুলোর সারকথা এটুকুই- যে সকল কথা দ্বারা ইসলামের কোনো অকাট্য বিষয় অস্বীকার করা সাব্যস্ত হয়, সেগুলো কুফরি উক্তি।
তবে ফকিহগণ পরিষ্কার ভাষায় এটিও বলেছেন, এ উক্তিগুলোকে কুফরি উক্তি সাব্যস্ত করার অর্থ আদৌ এই নয় যে, যার মুখ থেকে এগুলো বের হবে, কোনো ধরনের চিন্তা-ভাবনা ও উদ্দেশ্য যাচাই-বাছাই করা ছাড়াই তাকে কাফের বলে দেওয়া হবে। বরং কাউকে কাফের তখন আখ্যা দেওয়া হবে, যখন প্রমাণিত হবে যে, উক্তিগুলোর ঐ অর্থ ও মর্মই তার উদ্দেশ্য, যাতে কুফরি আকিদা বা ইসলামের কোনো 'জরুরি' বিষয়ের অস্বীকৃতি রয়েছে।
কিন্তু প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অনবহিত লোকেরা ঐ শব্দগুলোকেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি বানিয়ে নিয়েছে, এবং তাকফিরবাজি(১) শুরু করে দিয়েছে। এর ফলে মুসলমানকে কাফের আখ্যা দেওয়ার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে। পুরো মুসলিম সমাজে তার মন্দ প্রভাব পড়ছে। তাতে কাফের আখ্যাদানকারী ব্যক্তির নিজের ঈমানও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
অপরদিকে কাফের আখ্যাদানের ফতোয়া একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ইসলামের যেসকল দাবিদার বাস্তবে কাফের, তাদের এ কথা বলার সুযোগ হয়ে গেছে যে, মানুষ তো একজন অপরজনকে তাকফির করেই। আমরাও সেই তাকফিরবাজির শিকার।
তাই ইসলামের দাবিদার কাউকে কাফের আখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত স্তরের সতর্কতা অবলম্বন করার বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল। সাধারণ সাধারণ কথার কারণে, বা সম্ভাব্য ও অস্পষ্ট কথার ভিত্তিতে, উদ্দেশ্য যাচাই না করে এমন ফতোয়া দেওয়ার মধ্যে, নিজের ঈমানের ঝুঁকি রয়েছে। এই অসতর্কতা সম্পর্কে ইমাম গাজ্জালি রাহিমাহুল্লাহর বিস্তারিত বক্তব্য আপনি পূর্বে অবগত হয়ে এসেছেন। (২) অধিক স্পষ্ট ও জোরদার করার জন্য নিম্নে আরো কিছু কথা লেখা হচ্ছে।
টিকাঃ
১. মানসুস ও ইজমায়ি : কোরআন-হাদিসে বর্ণিত ও উম্মাহর সর্বসম্মত।
১. তাকফির : কাফের আখ্যা দেওয়া।
২. এ বইয়ের ৫৭-৬৪ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।