📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর 📄 কুফর ও কাফেরের প্রকারভেদ

📄 কুফর ও কাফেরের প্রকারভেদ


এ পুস্তিকার মূল আলোচ্য বিষয় এ অধ্যায়টিই, যেমনটি অবতরণিকায় বলা হয়েছে।
পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেছে, কুফর হলো রাসুলকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়ার নাম। মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়ার বিভিন্ন রূপ রয়েছে। এর ফলে কুফরও কয়েক প্রকারে বিভক্ত। ইমাম গাজ্জালি রাহিমাহুল্লাহ তাঁর 'ফায়সালুত তাফরিকাতি বাইনাল ইসলামি ওয়ায যানদাকাতি(১) ও 'আল-ইকতিসাদু ফিল-ইতিকাদি’(২) কিতাবদ্বয়ে, হজরত শাহ আবদুল আজিজ দেহলবি রাহিমাহুল্লাহ [১১৫৯-১২৩৯ হি.] তাঁর ফতোয়ায়, এবং ইমাম বাগাবি রাহিমাহুল্লাহ [৪৩৩-৫১৬ হি.] إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ - আয়াতোর তাফসিরে প্রকারগুলো সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করেছেন। অনুরূপভাবে আকিদা ও কালাম শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'শারহুল মাওয়াকিফ' ও (৩) 'শারহুল মাকাসিদে'ও (৪) প্রকারগুলো বিস্তারিতভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে।

টিকাঃ
১. فَيْصَلُ التَّفْرِقَةِ بَيْنَ الإِسْلَامِ وَالزَّنْدَقَةِ .
২. الاقتصاد في الاعتقاد .
৩. الْمَوَاقِفُ কিতাবটি মূলত মহান আশআরি আলেম আজদুদ্দিন ইজি (عَضْدُ الدِّيْنِ الإِنْبِيُّ) রাহিমাহুল্লাহ [৬৮০-৭৫৬ হি.]-এর রচনা। شَرْحُ الْمَوَاقِفِ হলো সাইয়েদ শরিফ জুরজানি রাহিমাহুল্লাহ [৭৪০-৮১৬ হি.] রচিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ। -অনুবাদক।
৪. شَرْحُ المَقَاصِدِ فِي عِلْمِ الكَلَامِ . সাদুদ্দিন মাসউদ তাফতাযানি রাহিমাহুল্লাহ [৭২২-৭৯১ হি.]। -অনুবাদক।

📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর 📄 সতর্কতার দ্বিতীয় দিক

📄 সতর্কতার দ্বিতীয় দিক


পূর্বের আলোচনায় পরিষ্কার হয়েছে, যেভাবে কোনো শাখাগত মতপার্থক্যের কারণে, অথবা কোনো একাধিক অর্থের সম্ভাবনাময় ও অস্পষ্ট উক্তির কারণে, অথবা কুফর হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মতপার্থক্যপূর্ণ কোনো আকিদা ও উক্তির কারণে কোনো মুসলমানকে কাফের আখ্যা দেওয়া ভারি অসতর্কতা ও নিজের ঈমানকে ঝুঁকিতে ফেলার নামান্তর, কেননা তখন ঈমানকে কুফর আখ্যা দেওয়া আবশ্যক হয়, তদ্রূপ কোনো নিশ্চিত কাফেরকে মুসলমান আখ্যা দেওয়াও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধ এবং নিজের ঈমানকে ঝুঁকিতে ফেলার নামান্তর। কেননা তখন কুফরকে ঈমান বলা আবশ্যক হয়ে যায়। বলাবাহুল্য, যদি ঈমানকে কুফর অথবা কুফরকে ঈমান বলা স্বজ্ঞানে ও ইচ্ছাপূর্বক হয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে কুফর। অন্যথায় কুফরের ঝুঁকি থেকে তো অবশ্যই মুক্ত নয়। (১)

তাছাড়া কোনো কাফেরকে মুসলমান বলে দেওয়া শুধু একটি শব্দের উদারতা নয়, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামি সমাজের উপর বিরাট অবিচার। কারণ, তাতে পুরো উম্মাহর উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিবাহ, বংশ, উত্তরাধিকার, কোরবানি, ইমামতি, সালাত এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার- সবগুলোর উপর প্রভাব পড়ে।

এ ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতা (২) একজন প্রকৃত মুসলমানকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করতে পারে। (৩) অনুরূপভাবে (৪) ইসলামের একজন শত্রুকে ইসলামি সমাজের আস্তিনের সাপ ও কপট বন্ধু বানাতে পারে। আর এ উভয় ঝুঁকি উম্মাহর জন্য অনেক ভয়ঙ্কর, এবং সেগুলোর ফলাফল ও পরিণতি সুদূরপ্রসারী।

উল্লিখিত বিবরণ অনুসারে কুফরির যে রূপকে (১) শরিয়তের পরিভাষায় যান্দাকা ও ইলহাদ বলা হয়, যার মধ্যে একজন ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসুলের অনুগত হওয়ার মৌখিক ও আন্তরিক স্বীকৃতিও প্রদান করে; সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত- ইসলামের প্রভৃতি প্রতীকের অনুসরণও করে, তবে সেগুলোর পাশাপাশি কিছু কুফরি আকিদাও পোষণ করে, অথবা 'জরুরিয়াতে দীনে'র অসার ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে ইসলামের বিধিবিধান বিকৃত করে, তার বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদসঙ্কুল। (২)

টিকাঃ
১. অর্থাৎ যদি ঈমানকে কুফর এবং কুফরকে ঈমান আখ্যা দেওয়া স্বজ্ঞানে ও ইচ্ছাপূর্বক না হয়, তাহলেও তা কুফরির ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। -অনুবাদক।
২. কাফের আখ্যাদানকারী ব্যক্তির সামান্য অসতর্কতা। -অনুবাদক।
৩. পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে কাফের আখ্যা দিলে একজন প্রকৃত মুসলমান ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত গণ্য হওয়ার আশঙ্কা আছে। -অনুবাদক।
৪. অর্থাৎ পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে মুসলমান আখ্যা দিলে ...। -অনুবাদক।
১. 'উল্লিখিত বিবরণ অনুসারে' থেকে 'ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদসঙ্কুল' পর্যন্ত অনুচ্ছেদটি মূল উর্দু কিতাবে 'এ ক্ষেত্রে' থেকে শুরু হওয়া অনুচ্ছেদের পূর্বে ছিল। অবশ্য মূল উর্দুতে শুরুতে 'তাই' শব্দসহ উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ 'তাই উল্লিখিত বিবরণ অনুসারে'। কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে, 'এ ক্ষেত্রে' থেকে শুরু হওয়া অনুচ্ছেদের বক্তব্যটি 'তাছাড়া কোনো কাফেরকে...' অনুচ্ছেদের সাথে যুক্ত। তাই স্থান পরিবর্তনের কাজটি করা হয়েছে। সচেতন পাঠকের নিকট যদি মূল কিতাবের বিন্যাসটিই অধিক উপযোগী মনে হয়, তিনি সেভাবেই বুঝে নিবেন। -অনুবাদক।
২. কারণ, সে যদি তাওবা করে ঈমান নবায়ন না করে, তাহলে চির জাহান্নামি হবে। -অনুবাদক।

📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর 📄 আলোচনার সারমর্ম

📄 আলোচনার সারমর্ম


আলোচনার সারমর্ম : ইরতিদাদের একটি প্রকার হলো, ধর্ম পরিবর্তন করা। দ্বিতীয় প্রকার হলো, দীনের জরুরিয়াত ও অকাট্য কোনো বিষয়কে অস্বীকার করা; অথবা জরুরিয়াতে দীনের এমন ব্যাখ্যা করা, যা দ্বারা তার পরিচিত মর্মের বিপরীত মর্ম সৃষ্টি হয় এবং জ্ঞাত উদ্দেশ্য পরিবর্তন হয়ে যায়।

টিকাঃ
১. ৪৭ নং পৃষ্ঠার টীকায় অতিবাহিত হয়েছে, المُسَامَرَةُ নামক ব্যাখ্যাগ্রন্থটির লেখক মূলত শায়খ কামালুদ্দিন ইবনু আবি শারিফ আলকুদসি আশশাফেয়ি রাহিমাহুল্লাহ [৮২২-৯০৬ হি.]। শায়খ কামালুদ্দিন ইবনুল হুমام আলহানাফি রাহিমাহুল্লাহ নন। -অনুবাদক।

📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর 📄 তাকফিরের মূলনীতি

📄 তাকফিরের মূলনীতি


তাই ইসলামের দাবিদারকে কাফের আখ্যা দেওয়া প্রসঙ্গে শরিয়তের মূলনীতি হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত কারো বক্তব্য ব্যাখ্যা করে সঠিক রাখার সুযোগ থাকে, এবং বক্তার বক্তব্যে ঐ ব্যাখ্যার বিপরীত কিছু পরিস্কারভাবে না থাকে, অথবা ঐ বিশ্বাস কুফরি হওয়ার ব্যাপারে মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে সামান্যতম মতানৈক্য থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে কাফের বলা যাবে না। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি দীনের কোনো 'জরুরি' বিষয় অস্বীকার করে, অথবা এমন ব্যাখ্যা করে যা তার সর্বসম্মত মর্মের বিপরীত মর্ম সৃষ্টি করে, তাহলে তাকে কাফের আখ্যা দেওয়ার ব্যাপারে কালক্ষেপণ করার সুযোগ নেই।

وَاللَّهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَعْلَمُ

টিকাঃ
১. বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করে সঠিক সাব্যস্ত করার সুযোগ থাকতে পারে। ভাস্কর্য তৈরি ও স্থাপন প্রভৃতি হলো কর্ম। কর্মের মধ্যে সে সুযোগ নেই। ১০৬-১০৮ নং পৃষ্ঠায় হজরত আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রাহিমাহুল্লাহর উদ্ধৃতি দ্রষ্টব্য। উল্লেখ্য, 'প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণের অবৈধতা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধান। এতে পূজার শর্ত নেই। এই অবৈধতার কারণ হল, আল্লাহর সৃষ্টিগুণের সঙ্গে সাদৃশ্য গ্রহণ, যা বিভিন্ন হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।' মাসিক আলকাউসার, ডিসেম্বর ২০০৮ দ্রষ্টব্য। প্রাণীর ভাস্কর্য তৈরি অবৈধ হওয়ার বিষয়টি 'তাওয়াতুর' দ্বারা প্রমাণিত। অতএব তার 'মানসুস ও ইজমায়ি' ব্যাখ্যার বিপরীত ব্যাখ্যা করা যান্দাকা ও ইলহাদ। এক শ্রেণির লোক তা বৈধ হওয়ার পক্ষে যেসব যুক্তি পেশ করে, সেগুলোর অসারতা জানার জন্য 'আলকাউসারে'র উল্লিখিত সংখ্যার 'আমিও বলি, কোথায় যাব, কার কাছে যাব!' লেখাটি অবশ্যই পাঠ করুন। -অনুবাদক।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية