📄 অনুবাদকের নিবেদন
الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه وتابعيهم بإحسان إلى يوم الدين، وبعد
দেওবন্দি মানহাজে(১) প্রতিষ্ঠিত আমাদের মাহাদের(২) 'আকিদা ও তাওহিদ বিভাগে'র(৩) বর্তমান পাঠ্য বিষয় নিম্নরূপ- ঈমানের রোকন, তাওহিদের প্রকার, কুফর-শিরকের প্রকার, ঈমানভঙ্গের কারণ, তাকফিরের ভয়াবহতা, প্রয়োজনীয়তা, শর্ত, কারণ ও প্রতিবন্ধকতা, তাকফির বিষয়ে প্রচলিত জঘন্য ভুল, খারেজি ও তাকফিরিদের মুখোশ উম্মোচন, 'সাহায্যপ্রাপ্ত দলে'র বিবরণ, ইসলামে শত্রুতা-মিত্রতা, সমকালীন বিভিন্ন ভ্রান্ত আকিদার পর্যালোচনা, আশআরি-মাতুরিদি ও সালাফি ধারার আকিদা ও চিন্তাধারা বিষয়ক নীতিমালা, আশআরি- মাতুরিদি ধারার মতবিরোধপূর্ণ মাসআলা, উচ্চতর উলুমুল কোরআন ও উলুমুল হাদিসের প্রাথমিক বিষয়াদি, ফতোয়াদানের মূলনীতি ও শিষ্টাচার, মতোবিরোধের শিষ্টাচার, উচ্চতর ব্যবহারিক আরবিভাষা প্রভৃতি।(৪)
'ঈমানভঙ্গের কারণ' বিষয়ে বর্তমানে প্রথমে পড়ানো হয় 'কালিমায়ে তাইয়েবা : বিশ্লেষণ ও ঈমান ভঙ্গের কারণ' নামক বইটি, যা মূলত শায়খ মুহাম্মদ বিন সাঈদ কাহতানি রাহিমাহুল্লাহ [১৩৭৬-১৪৪০ হি.] রচিত ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা ফিল ইসলাম’ কিতাবের ভূমিকা, এবং দারুল উলুম দেওবন্দের মজলিসে শুরার আমরণ সদস্য হজরত মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানি রাহিমাহুল্লাহ [১৩২৩-১৪১৭ হি.] রচিত ‘কালিমা তাইয়েবা কি হাকিকত’ রিসালার সরল অনুবাদ।
এ বিষয়ে দ্বিতীয় পর্বে পড়ানো হয় দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক প্রধান মুফতি হজরত মাওলানা মুহাম্মদ শফি দেওবন্দি রাহিমাহুল্লাহ [১৩১৪-১৩৯৬ হি.] রচিত 'ঈমান-কুফরের পরিচয় ও তাকফিরের মূলনীতি' এবং 'ইসলামে মুরতাদের শাস্তি' শীর্ষক বক্ষ্যমাণ পুস্তিকাদুটি, যা মূলত তাঁর ‘মুরতাদ কি সাজা ইসলাম মে আওর ঈমান ও কুফর কুরআন কি রওশনি মে’ অনুবাদ। প্রথম রিসালাটি তাঁর 'জাওয়াহিরুল ফিকহ' রাসায়েল সমগ্রের প্রথম ভলিয়মে, এবং দ্বিতীয়টি পঞ্চম ভলিয়মে রয়েছে।
মুফতি সাহেব রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন [পৃ. ৫০-৫১]- কুফর হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার নাম। আর রাসুলকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। ফলে কুফরও কয়েক প্রকারে বিভক্ত। রাসুলকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার প্রকারগুলো নিম্নরূপ-
১. তাঁকে আল্লাহ তাআলার রাসুলই স্বীকার না করা। যেমন মূর্তিপূজারী ও ইহুদি-খ্রিস্টানদের অবস্থা।
২. রাসুল স্বীকার করা সত্ত্বেও তাঁর কিছু উক্তিকে স্পষ্ট ভাষায় ভুল বা মিথ্যা আখ্যা দেওয়া। অর্থাৎ তাঁর কিছু নির্দেশনা বিশ্বাস করা এবং কিছু নির্দেশনা অবিশ্বাস করা।
৩. অকাট্যভাবে প্রমাণিত তাঁর কোনো উক্তি বা কর্মকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করা যে, তা তাঁর কর্ম বা উক্তি নয়। এটিও তাঁকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়ার নামান্তর।
৪. তাঁর উক্তি বা কর্মকে স্বীকার করা। কিন্তু সেগুলোর এমন ব্যাখ্যা করা, যা কোরআন-হাদিসের অকাট্য বর্ণনার বিপরীত। এ ধরনের ব্যাখ্যাসাপেক্ষে স্বীকার করা, অস্বীকার করারই নামান্তর।
কুফর ও মিথ্যা সাব্যস্ত করার শেষোক্ত রূপটি ইসলামের দাবিদার এবং নামাজ-রোজা প্রভৃতি আমল সম্পাদনকারীদের থেকে প্রকাশ পাওয়ার কারণে, অধিকাংশ মুসলমান ভুলবশত তাদেরকে মুসলমান মনে করে। বিশেষত আলেমগণের এ সর্বসম্মত মূলনীতির কারণে যে, ব্যাখ্যাসাপেক্ষে অস্বীকার করা, অস্বীকার নয় এবং এমন ব্যক্তি কাফের নয়।
বলাবাহুল্য, যিন্দিক ও মুলহিদ লোকেরা কোরআন-হাদিস প্রত্যাখ্যান কোনো না কোনো ব্যাখ্যার আড়ালেই করে থাকে। তাই জরুরি ছিল প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা যে, ইলহাদ ও ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য আছে। ব্যাখ্যাযোগ্য ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা করা দ্বারা কেউ কাফের হয় না। কিন্তু যান্দাকা ও ইলহাদজনিত ব্যাখ্যা দ্বারা উম্মাহর সর্বসম্মত মতানুসারে ব্যক্তি কাফের হয়ে যায়।
তিনি আরও লিখেছেন [পৃ. ৮০]- সাহাবা, তাবেঈন ও ইমামগণের সুস্পষ্ট বক্তব্যগুলো দ্বারা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, কোরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যাকারীকে কাফের সাব্যস্ত না করার নীতিটি ব্যাপক নয়। বস্তুত 'জরুরিয়াতে দীনে'র যে ব্যাখ্যা করা হয়, তা ব্যাখ্যা নয়; বরং বিকৃতি ও ইলহাদ। তা উম্মাহর ঐকমত্যে কুফর। আল্লাহ ও রাসুলের উক্তিসমূহের অপব্যাখ্যা করলে ব্যক্তি যদি কখনোই কাফের না হয়,(২) তাহলে শয়তানও কাফের থাকে না। কারণ, সে-ও তার কর্মের ব্যাখ্যা পেশ করেছে। [মুফতি সাহেব রাহিমাহুল্লাহর উদ্ধৃতি সমাপ্ত হয়েছে।]
'ঈমান-কুফরের পরিচয় ও তাকফিরের মূলনীতি' এ পুস্তিকায় মূলত উল্লিখিত ৪র্থ প্রকার কুফরির আলোচনাই সবিস্তারে করা হয়েছে। পুস্তিকার সারনির্যাস তার সর্বশেষ শিরোনাম তথা 'কিছু সন্দেহের উত্তরসহ পুস্তিকার সারনির্যাস'-এর অধীনে এসেছে। পাঠক তা শেষে তো পাঠ করবেনই, আমার পরামর্শ হচ্ছে, শুরুতেই দু-একবার পড়ে নিন। তাহলে বইটি হৃদয়ঙ্গম করা সহজ হবে। তখন অনুমিত হবে- অনেকের নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, তাবলিগ, পাগড়ি প্রভৃতির আড়ালে জঘন্যতম কুফর তথা ইলহাদ ও যান্দাকা লুকিয়ে থাকা অস্বাভাবিক নয়।
স্মরণ রাখতে হবে, শুধু ইলম, আমল ও আখলাক সহিহ করা দ্বারা কেউ মুসলমান হয়ে যায় না। মুসলমান হওয়ার প্রথম ভিত্তি হলো ঈমান-আকিদা সহিহ করা। কোরআন-হাদিসের তালিম ও তাবলিগ(৩) করার শিরোনামে যারা বিকৃতি, অপব্যাখ্যা ও নকলবাজি করে, দীনের লেবাস ধারণকারী সেসকল মুলহিদ ও যিন্দিকদের থেকে ঈমান- আকিদা হেফাজত করার জন্য, আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রাহিমাহুল্লাহর গবেষণার আলোকে মুফতি মুহাম্মদ শফি রাহিমাহুল্লাহ রচিত এ পুস্তিকার আন্তরিক পাঠ, অনেক সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ। 'পুস্তিকার সারনির্যাস' শিরোনামের লেখাটি থেকে উদ্ধৃত নিম্নের অংশটি লক্ষ্য করুন-
'বর্তমানে দীনের মূলনীতিসমূহ সম্বন্ধে অনবহিত অসংখ্য মানুষ মুলহিদদের বাহ্যিক নামাজ, রোজা প্রভৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদেরকে কাফের আখ্যাদানকারী আলেমসমাজের উপর এ অপবাদ আরোপ করে যে, তারা মুসলমানদেরকে কাফের বানায়। কিন্তু উল্লিখিত বিবরণ দ্বারা পরিষ্কার হয়ে গেছে, আলেমগণ কাউকে কাফের বানান না। তবে যে ব্যক্তি আপন কুফরি আকিদা, আচরণ ও উচ্চারণের কারণে নিজেই কাফের হয়ে যায়, তাঁরা তার কাফের হওয়ার সংবাদ প্রদান করেন মাত্র।
মোটকথা, রাসুলকে প্রত্যাখ্যান করার আলোচ্য প্রকার -যার পারিভাষিক নাম যান্দাকা ও ইলহাদ- নিকৃষ্টতর কুফরি। ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এ কুফরি অন্য সকল কুফরির তুলনায় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। ইবলিসের মতো কাফের এ প্রকারের প্রত্যাখ্যান করার কারণেই কাফের সাব্যস্ত হয়েছে।
কিন্তু এই প্রত্যাখ্যান যেহেতু প্রত্যাখ্যানের রঙে প্রকাশ পায়নি, তাই মুসলমানরাও তা দ্বারা অনেক প্রতারিত হয়। বিশেষত যখন এমন ব্যক্তি ইসলামের বিশেষ প্রতীকসমূহ তথা নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, পাগড়ি প্রভৃতিতে অভ্যস্ত হয়।
তাই কোরআন-হাদিস ও উম্মাহর আকাবিরগণের সুস্পষ্ট উক্তিমালার আলোকে বিষয়টির মূল বাস্তবতা স্পষ্ট করা প্রয়োজন ছিল। শোকর আল্লাহর, এ পুস্তিকায় পরিপূর্ণরূপে তার ব্যাখ্যা এসেছে। পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, ইসলামের অকাট্য ও নিশ্চিত বিধানগুলো ব্যাখ্যা করে সেগুলোকে "মানসুস ও ইজমায়ি” (১) মর্ম থেকে সরিয়ে ভিন্ন কোনো মর্ম উদ্দেশ্য নেওয়া, প্রকৃতপক্ষে রাসুলকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়ার নামান্তর।' [উদ্ধৃত অংশ সমাপ্ত হয়েছে।]
'পুস্তিকার সারনির্যাস' শিরোনামের প্রথম অনুচ্ছেদে উল্লেখিত (২) মুফতি সাহেব রাহিমাহুল্লাহর এ উক্তিটিও এখানে প্রণিধানযোগ্য-
'ইসলামের গণ্ডি থেকে বহির্ভূত তথা কাফের হয়ে যাওয়ার জন্য ব্যক্তির ইচ্ছা ও নিয়ত থাকা আবশ্যক নয়। বড় শয়তান ইবলিস কাফের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা করেনি। কিন্তু তার কর্ম তাকে কাফের বানিয়ে দিয়েছে। (৩)
কেননা ইবলিস শয়তান আল্লাহ তাআলাকে কখনো অস্বীকার করেনি; না সে আল্লাহর সত্তাকে অস্বীকার করেছে, না তাঁর কোনো গুণকে। বরং সে শুধু গায়রুল্লাহকে সিজদা করতে অস্বীকার করেছে। সে তো এ কথাও বলতে পারে, আমি সবচেয়ে বড় তাওহিদপন্থী। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার এ অবাধ্যাচরণকে অস্বীকারকরণের স্তরে রেখে একে সবচেয়ে বড় কুফর আখ্যা দিয়েছেন।...।'
'ইসলামে মুরতাদের শাস্তি' এ পুস্তিকাও বর্তমান প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ কাদিয়ানিদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে গুরুত্বের কারণ ব্যাখ্যা করা যায়। কাদিয়ানিদেরকে কাফের 'ঘোষণা দেওয়া'র আন্দোলনকারী মাশায়েখ ও আকাবিরগণ দ্ব্যর্থহীনভাষায় বলেন, আমরা শুধু 'তারা কাফের, মুসলমান নয়,' সরকারের এ ঘোষণাটিই দাবি করছি। তারপর অন্যান্য অমুসলিমরা যেভাবে নিজেদের অমুসলিম পরিচয়ে দেশে বসবাস করছে, তারাও সেভাবে বসবাস করবে। তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।
পুস্তিকাটি পাঠ করলে জানা যাবে, এ দাবি কুফরি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সৎকাজ করা ও অসৎকাজ থেকে বিরত থাকার অনুরোধকারীদের বক্তব্য হলেও, কোরআন-হাদিস, খোলাফায়ে রাশেদিন, পরবর্তী খলিফা ও ফিকহের ইমামগণের অনুসারীদের বক্তব্য নয়। কারণ, মুফতি সাহেব রাহিমাহুল্লাহ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, কোরআন-হাদিসের দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্ত এবং খায়রুল কুরুনের ধারাবাহিক আমল ও সকল মাজহাবের সর্বসম্মত রায় হলো, মুরতাদের শাস্তি নির্ধারিত; আর তা মৃত্যুদণ্ড, অন্য কিছু নয়।
এ বইয়ের ১৩৫ নং পৃষ্ঠায় আসবে, মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড না হওয়ার দাবি বস্তুত মির্জায়িদের। হজরত মুফতি সাহেব লিখেছেন,
'যখন আফগান সরকার [আল্লাহ তার মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করুন] শরিয়তের অকাট্য সিদ্ধান্ত অনুসারে নেয়ামতুল্লাহ খান মির্জায়িকে হত্যা করে দিয়েছে, তখন মির্জায়ি ফেরকার উভয় দল তথা কাদিয়ানি ও লাহোরি, বিশেষকরে তাদের মুখপত্র “পয়গামে সুল্লহ” [শান্তির বার্তা] হুকুমটিকে মূল থেকেই অস্বীকার করার জন্য উদ্যত হয়েছে।'
কাদিয়ানিদেরকে শুধু 'কাফের ঘোষণা দেওয়া'র আন্দোলনকারী ওলামা-মাশায়েখের দাবি প্রসঙ্গে হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুর [মৃ. ৪০ হি.] নিম্নের উক্তিটি নতুন করে স্মরণ হলো। তিনি বলেন,
إِنَّ الحَقَّ لَا يُعْرَفُ بِالرِّجَالِ، اِعْرِفِ الحَقَّ تَعْرِفُ أَهْلَهُ.
ব্যক্তিদের দ্বারা হক চেনা যায় না। হক চেনো, তাহলে হকওয়ালাদেরকে চিনবে। (১)
হক চেনার পদ্ধতি হলো সালাফের ব্যাখ্যার আলোকে কিতাব ও সুন্নাহ অধ্যয়ন করা। সালাফের মধ্যে বিশেষভাবে রয়েছেন উম্মাহর মুজতাহিদ ফকিহ ইমামগণ। অতএব আমাদের ছোট-বড় সবাইকে দীন গ্রহণ করতে হবে মুজতাহিদ ফকিহ ইমামগণের ব্যাখ্যার আলোকে কোরআন-হাদিস অধ্যয়ন করে। খাঁটি বুযুর্গদের সোহবত গ্রহণ করব দীনের উপর চলার চেতনা ধারণ করার জন্য; কিন্তু আমল করার জন্য মাসআলা কিতাব থেকে গ্রহণ না করলে, বড় ধরনের ভুলে নিপতিত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা আছে। (২)
প্রসঙ্গতঃ একটি কথা হলো, আমরা ও আমাদের সরকার মুসলমান হলে, যিন্দিকদেরকে 'মুরতাদ ঘোষণা করা'র জন্য আন্দোলন তো দূরের কথা, আবেদনও করতে হবে কেন? শুধু কাদিয়ানিদেরকে নয়, বরং সকল যিন্দিককে মুরতাদ ঘোষণা করে তাদের জন্য নির্ধারিত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা, মুসলিম সরকারের নিজেরই দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা ঈমানদার হওয়ার দাবিদার সকলকে ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ করার তাওফিক দিন এবং আমেরিকান র্যান্ড কর্পোরেশনের বিভাজন অনুযায়ী 'ট্র্যাডিশনালিস্ট মুসলিম' হওয়া থেকে রক্ষা করুন! আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ .
হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে প্রবেশ করো পরিপূর্ণরূপে এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন। [সুরা বাকারা: ২০৮]
উল্লেখ্য, র্যান্ড কর্পোরেশনের পরিভাষায় পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশকারীর নাম হলো ফান্ডামেন্টালিস্ট মুসলিম বা মৌলবাদী মুসলিম। (১)
যাই হোক, এ পুস্তিকা পাঠ করলে আমরা জানতে পারব, হত্যা প্রত্যেক মুরতাদের শাস্তি। মুরতাদ হওয়ার পর যারা দারুল ইসলামের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, এ শাস্তি তাদেরও; যারা কোনো প্রকার বিদ্রোহের ইচ্ছাও করে না, এ শাস্তি তাদেরও। [১৪৮ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।] শাসক-শাসিত যারাই মুসলমান হওয়ার দাবিদার, সকলের উপর আবশ্যক হলো, ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ করা।
এক মাদরাসায় কাদিয়ানিদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার পদ্ধতি বিষয়ক একটি কর্মশালা হয়েছিল। তখন একজন আলেম বললেন, কাদিয়ানিদেরকে যদি মুরতাদ মনে করেন, তাহলে আমার মন্তব্য হলো, 'তাদের ব্যাপারে কিতাবে যা আছে তা আমরা করছি না, এবং যা করছি তা কিতাবে নেই।' তাঁর এ মূল্যায়ন শ্রবণ করে সেখানকার প্রধান শায়েখ তাঁকে কঠিনভাবে শাসিয়েছেন। তার ব্যবহৃত একটি বাক্য ছিল, 'আপনি বুঝতে চান না, বরং বুঝাতে চান।' এ পরিস্থিতিতে এ পুস্তিকাটি অনুবাদ করা আশা করি আমার সার্থক হয়েছে। শোকর, আলহামদুলিল্লাহ। প্রসঙ্গত এ বইয়ের ২৮০ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
এছাড়াও কতিপয় আলেমের সামনে কিছু দলিলভিত্তিক অস্পষ্টতা উত্থাপন করার পর আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে, তারা চান, এমনিতেই তাদের অবস্থান মেনে নিই। সেই অবস্থানের পক্ষে দলিল তলব না করি। দলিল তালাশ করলে তারা বিরক্তিবোধ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সর্বাবস্থায় যদি অন্ধ অনুকরণই করে যেতে হয়, তাহলে দরসে 'ফিকহে মুজাররাদ' পড়ানোর পর 'ফিকহে মুদাল্লাল' কেন পড়ানো হয়?! 'মুখতাসারুল কুদুরি'তে দলিলবিহীন মাসআলা পড়ার পর সেই মাসআলাগুলোই 'হিদায়া'তে দলিলসহ পড়ানো দ্বারা তো এটাই অনুমিত হয়, অন্ধ মুকাল্লিদ থাকা তালিবে ইলমের শান নয়। বরং তালিবে ইলম হবে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মুকাল্লিদ।
রহমানের বান্দা হতে হলে একজন মুসলমানের কেমন সচেতন ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া আবশ্যক, তা বুঝার জন্য শুধু একটি আয়াতে চিন্তা করুন। আল্লাহ তাআলা সুরা ফুরকানের ৭৩ নং আয়াতে রহমানের বান্দাদের একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন- وَالَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِنَايَاتِ رَبِّهِمْ لَمْ يَخِرُّوا عَلَيْهَا صُمًّا وَعُمْيَانًا. এবং যখন তাদেরকে উপদেশ দেওয়া হয় তাদের রবের আয়াতসমূহ দ্বারা, তখন তারা শ্রবণশক্তিহীন ও অন্ধরূপে তার উপর পতিত হয় না।
অর্থাৎ রহমানের বান্দারা কোরআনের আয়াতসমূহের উপর পতিত হয়। তবে মুনাফিকদের মতো শ্রবণশক্তিহীন ও অন্ধরূপে নয়। বরং তাঁরা এ অবস্থায় পতিত হয় যে, চোখ-কান খোলা রাখে এবং বোঝার ও হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করে।
এ আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে فِي ظِلَالِ القُرْآنِ কিতাবের নিম্নের উক্তিটি লক্ষণীয়- فَأَمَّا عِبَادُ الرَّحْمَنِ، فَهُمْ يُدْرِكُوْنَ إِدْرَاكًا وَاعِيًا بَصِيرًا مَا فِي عَقِيدَتِهِمْ مِنْ حَقٌّ، وَمَا فِي آيَاتِ اللهِ مِنْ صِدْقٍ، فَيُؤْمِنُوا إِيْمَانًا وَاعِيًا بَصِيرًا، لَا تَعَصُّبًا أَعْمَى وَلَا انْكِبَابًا عَلَى الوُجُوهِ! فَإِذَا تَحَمَّسُوا لِعَقِيدَتِهِمْ فَإِنَّمَا هِيَ حَمَاسَةُ العَارِفِ المُدْرِكِ البَصِيْرِ.
রহমানের বান্দাগণ সচেতনভাবে ও দূরদর্শীতার সাথে উপলব্ধি করেন তাদের বিশ্বাসের যথার্থতা ও আল্লাহর আয়াতসমূহের সত্যতা। ফলে তাঁদের ঈমান হয় সচেতন ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। তাঁদের ঈমানে থাকে না অন্ধ পক্ষপাতিত্ব ও গোঁড়ামি। তাঁরা যখন নিজেদের বিশ্বাসের প্রতি উদ্যমী হন, তখন তা হয় অন্তর্দৃষ্টির সাথে উপলব্ধিকারী অভিজ্ঞ ব্যক্তির উদ্যম।
উদাহরণস্বরূপ সুরা বনি ইসরাঈলের ৩৬ নং আয়াতটিও এখানে লক্ষণীয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তর- প্রত্যেকটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।
এ আয়াত দ্ব্যর্থহীনভাবে সাব্যস্ত করে, জ্ঞানার্জন না করে কারো অন্ধঅনুসরণের -তিনি অনেক বড় হলেও- শরয়ি বৈধতা নেই। বরং হাফেজ ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহর [৬৯১-৭৫১ হি.] বিবরণ অনুযায়ী অন্ধ অনুসরণকারীদের জন্য অনুসৃত আলেমও একজন তাগুত। (১) আপন স্থানে ঐ আলেম তাগুত না-ও হতে পারেন।
তবে যেসকল আল্লামা নিজেদের অবস্থান সঠিক হওয়া বিষয়ে দলিল পেশ করার দায়বদ্ধতা কার্যত অস্বীকার করেন, এমনকি আলেমদের থেকেও অন্ধঅনুসরণ প্রত্যাশা করেন, ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ প্রদত্ত সংজ্ঞায় চিন্তা করে দেখুন, তারা তাগুতের সংজ্ঞার ভেতরে পড়েন কি-না।
কারো কারো আচরণ-উচ্চারণ দ্বারা তো মনে হয়, তাঁরা কোরআন-হাদিসের পরিবর্তে নিজেদেরকে মিয়ারে হক বা সত্যের মানদণ্ড মনে করেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, দীনের এক বড় মারকাজের একজন তাহাজ্জুদগুজার মুফতি পির সাহেব একজন বরেণ্য আলেম সম্পর্কে অভিযোগের সুরে বললেন, 'তিনি "নবী রাসূলগণের উত্তরসূরি” নামের বইটি পড়ার পরামর্শ দেন।' [বইটির লেখক মাওলানা আবু আবদুর রহমান সাঈদ ইসলামাবাদি। বইটি ঢাকাস্থ বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারে পাওয়া যায়।]
একজন তাকে প্রশ্ন করলেন, বইটির সমস্যা কী? তার নিঃসঙ্কোচ উত্তর ছিলো, 'বইটিতে আদর্শ আলেমের এমন অনেক গুণ উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো আমাদের মধ্যে নেই।' উল্লেখ্য, বইটিতে প্রতিটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে এক বা একাধিক আয়াত কিংবা হাদিসের দলিলসহ।
অবাক হওয়ার বিষয় হলো, আলোচ্য মজলিসে উপস্থিত উক্ত মারকাজের আলেম ও মুখলিস হওয়ার দাবিদার কোনো দাঈর দৃষ্টিতে, তার এ উত্তরে কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়েনি। উপরন্তু মনে হয়েছে, আয়াত ও হাদিসগুলোর বিপরীত নিজেদের অবস্থানগুলোকেই তারা হক মনে করছেন। উল্লেখ্য, তাদের উপদেষ্টা ও পথপ্রদর্শক হলো আন্তঃধর্মীয় বৈঠকগুলোতে অংশগ্রহণকারী নবি পরিবারের একজন আলেম।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাজিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিসটি এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, আমরা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি অনেক ফেতনার বিবরণ দিলেন। এমনকি চটের ফেতনার বর্ণনা দিলেন। একজন বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! চটের ফেতনা কী? তিনি বললেন, 'তা এমন ফেতনা যার মধ্যে একজন অপরজন থেকে পলায়ন করবে এবং ব্যক্তির সম্পদ এমনভাবে অপহরণ করা হবে যে, তার নিকট কিছুই থাকবে না। তারপর স্বচ্ছলতার ফেতনা হবে। এ ফেতনার প্রকাশ আমার পরিবারের একজন ব্যক্তির পায়ের নিচ থেকে হবে। সে মনে করবে, সে আমার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অথচ সে আমার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। আমার বন্ধু তো হলো মুত্তাকিগণ।' [মুসনাদে আহমদ : ৬১৬৮; এবং সুনানে আবি দাউদ : ৪২৪৪]
سَوْفَ تَرَى إِذَا انْجَلَى الغُبَارُ * أَفَرَسُ تَحْتَكَ أَمْ حِمَارُ
এ বইয়ের ৫৬ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখিত হজরত মুফতি মুহাম্মদ শফি রাহিমাহুল্লাহর একটি লেখা দ্বারা স্পষ্ট হয়, অভিশপ্ত মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি [১২৫৫-১৩২৬ হি./১৮৩৫-১৯০৮ ঈ.] অনেক উঁচুস্তরের আলেমও ছিল। বরং তাঁর ১৫০ নং পৃষ্ঠার আলোচনা থেকে পরিষ্কার হয়, গোলাম আহমদ কাদিয়ানি তাসাউফের বড় মাপের একজন পিরও ছিল। উপরন্তু গুগলে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত তার ছবিসমূহ থেকে যে কারো সামনে স্পষ্ট যে, সে ছিল উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী, দাড়িবিশিষ্ট ও দীনি লেবাসধারী। আর কী প্রয়োজন? হাঁ, সর্বাগ্রে প্রয়োজন আকিদার সংশোধন।
অতএব কারো শুধু তাফসির, হাদিস, ফিকহ প্রভৃতি বিষয়ে বড় আলেম হওয়ার কারণে, বা তাসাউফের বড় পির সাহেব হওয়ার কারণে, বা চাশত, আওয়াবিন ও তাহাজ্জুদগুজার হওয়ার কারণে, আমরা যেন তার অন্ধ অনুসারী না হয়ে যাই। তাগুত প্রত্যাখ্যান ও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন সংশ্লিষ্ট ইলম অর্জনের পূর্বে তাফসির, হাদিস, ফিকহ প্রভৃতি বিষয়ের 'তাখাসসুস' অর্জনের জন্য কেউ যেন পেরেশান না হই। সাহাবি হজরত জুনদুব বিন আবদুল্লাহ রাজিয়াল্লাহু আনহু [মৃ. ৭০ হি.] বলেছেন,
تَعَلَّمْنَا الْإِيمَانَ قَبْلَ أَنْ نَتَعَلَّمَ الْقُرْآنَ، ثُمَّ تَعَلَّمْنَا الْقُرْآنَ، فَازْدَدْنَا بِهِ إِيمَانًا.
'আমরা কোরআন শেখার পূর্বে ঈমান শিখেছি। তারপর কোরআন শিখেছি, তখন তা দ্বারা আমাদের ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে। (১)
অতএব ওজু-নামাজ প্রভৃতি ভঙ্গের কারণ জানার পূর্বে ঈমান ভঙ্গের কারণ জানার জন্য যেন প্রত্যেকে পেরেশান হই। কারণ, ঈমান সবার আগে।
যিন্দিক ও মুলহিদদের ইলম, আমল, বংশ ও বেশভূষা দেখে প্রভাবিত ও প্রতারিত হওয়া থেকে মেহেরবান আল্লাহ মুসলমানদেরকে নিরাপদ রাখুন। এবং ঈমান-আকিদা সহিহ করার পাশাপাশি আল্লাহ আমাদেরকে ইলম, আমল ও বাহ্যিক বেশভূষাও ঠিক করার তাওফিক দিন। اللَّهُمَّ اجْعَلْ سَرِيرَتِي خَيْرًا مِنْ عَلَانِيَتِي وَاجْعَلْ عَلَانِيَتِي صَالِحَةً
হে আল্লাহ! তুমি আমার গোপন অবস্থাকে প্রকাশ্য অবস্থার তুলনায় উত্তম বানাও এবং আমার প্রকাশ্য অবস্থাকে ভালো বানাও! (২) আমিন!
মোটকথা, 'ঈমান-কুফরের পরিচয় ও তাকফিরের মূলনীতি' এবং 'ইসলামে মুরতাদের শাস্তি' অনুবাদদুটো প্রকাশ করা সময়ের দাবি ছিল। 'পরিশিষ্ট' পর্বে জরুরি আরো কিছু লেখাও যুক্ত করা হয়েছে। যুগের মুলহিদ ও পথভ্রষ্টকারীদের থেকে নিজেদের ঈমান হেফাজত করার জন্যই বইটি পাঠকবর্গের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পাঠ করা ও প্রচার-প্রসার করা আবশ্যক। আল্লাহ তাওফিক দিন। আমিন!
প্রসঙ্গত, মাহাদের 'আকিদা ও তাওহিদ বিভাগে'র একটি বিষয় হলো ওয়ালা-বারা বা শত্রুতা-মিত্রতা। কেউ কেউ নাকি এ বিষয়টির শরয়ি উৎস খুঁজে পান না। তাই নিম্নে দুটি হাদিস পেশ করা হচ্ছে।
১. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজিয়াল্লাহু আনহুমা [মৃ. ৬৮ হি.] থেকে বর্ণিত রয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের নামাজের পর যেসকল দুআ করতেন তার একটি হলো,
اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا هَادِينَ مُهْتَدِينَ ، غَيْرَ ضَالَّيْنَ وَلَا مُضِلَّيْنَ، سِلْمًا لأَوْلِيَائِكَ، وَحَرْبًا لِأَعْدَائِكَ، نُحِبُّ بِحُبِّكَ مَنْ أَحَبَّكَ، وَنُعَادِي بِعَدَاوَتِكَ مَنْ خَالَفَكَ.
হে আল্লাহ! আমাদেরকে সুপথপ্রাপ্ত ও পথপ্রদর্শক করুন; বিপথগামী ও বিভ্রান্তকারী নয়। আপনার বন্ধুদের মিত্র ও আপনার দুশমনদের শত্রু বানিয়ে দিন। আপনাকে ভালোবাসার কারণে আমরা তাকে ভালোবাসি যে আপনাকে ভালোবাসে; এবং আপনার সাথে শত্রুতা করার কারণে আমরা তার সাথে শত্রুতা পোষণ করি যে আপনার বিরোধিতা করে। [সুনানে তিরমিজি: ৩৪১৯]
২. হজরত ইবনে আব্বাস রাজিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন,
مَنْ أَحَبَّ فِي اللهِ، وَأَبْغَضَ فِي اللهِ، وَوَالَى فِي اللهِ، وَعَادَى فِي اللهِ، فَإِنَّمَا تُنَالُ وِلَايَةُ اللهِ بِذلِكَ، وَلَنْ يَجِدَ عَبْدُ طَعْمَ الْإِيمَانِ وَإِنْ كَثُرَتْ صَلَاتُهُ وَصَوْمُهُ حَتَّى يَكُوْنَ كَذلِكَ، وَقَدْ صَارَتْ مُؤَاخَاةُ الناسِ عَلَى أَمْرِ الدُّنْيَا، وَذلِكَ لَا يُجْدِي عَلَى أَهْلِهِ شَيْئًا.
যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ভালোবেসেছে, আল্লাহর জন্য বিদ্বেষ পোষণ করেছে, আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব করেছে এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতা করেছে, [সে সুপথপ্রাপ্ত হয়েছে।] কারণ, এর মাধ্যমে আল্লাহর বন্ধুত্ব অর্জিত হয়। আর কোনো বান্দা ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে না, যতক্ষণ না তার অবস্থা এমন হয়, যদিও তার সালাত-সিয়াম অনেক হয়। বর্তমানে মানুষের ভ্রাতৃত্ব হয়ে পড়েছে দুনিয়ার বিষয়াদির ভিত্তিতে। আর এমন ভ্রাতৃত্ব লোকদের কোনো উপকারে আসবে না। [হিলয়াতুল আউলিয়া, ১: ৩১২]
আলোচ্য 'ঈমান-কুফরের পরিচয় ও তাকফিরের মূলনীতি' শীর্ষক পুস্তিকাটি যুগের ইমাম আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রাহিমাহুল্লাহর [১২৯২-১৩৫২ হি.] গবেষণা, এবং নিজ সময়ের মহান মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ শফি রাহিমাহুল্লাহর উপস্থাপন। পুস্তিকাটির মান বোঝার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু লেখার আদৌ প্রয়োজন নেই। 'জরুরিয়াতে দীনে'র অপব্যাখ্যাকারী কাফের হওয়া বিষয়ক এ স্তরের একটি প্রামাণ্যগ্রন্থ থেকে আমার মতো কোনো লোকের উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি, ধীরস্থির অনুবাদ করে বাংলাভাষাভাষী পাঠকদের নাগালে আনা মেহেরবান আল্লাহর কতো বড় তাওফিক, এবং এ বান্দার প্রতি মালিকের কী পরিমাণ করুণা, তা বলাই বাহুল্য। তাই আমার নিবেদন- رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَى وَعَلَى وَلِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ.
হে আমার রব! আমাকে আপনার সেই নেয়ামতের শোকরগুজার হওয়ার তাওফিক দিন, যা আমাকে এবং আমার পিতামাতাকে দান করেছেন এবং আমি যেন এমন নেক কাজ করি, যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন। আর আমার কল্যাণের জন্য আমার সন্তান-সন্ততির মধ্যেও যোগ্যতা দান করুন। আমি আপনার নিকট তাওবা করলাম। নিশ্চয় আমি [আপনার] অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত। [সুরা আহকাফ: ১৫]
এই রচনার প্রেক্ষাপট
যেসকল লোক ঈমান ও ইসলাম প্রকাশ করে এবং নামাজ রোজা ইত্যাদি বিধান যথাযথ পালন করে, কিন্তু ইসলামের কোনো অকাট্য ও সুস্পষ্ট বিষয়ের 'মানসুস ও ইজমায়ি' ব্যাখ্যার বিপরীত ব্যাখ্যা করে, তারা মূলত কাফের।
কিন্তু তাদেরকে কাফের সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে দুটো জটিলতর প্রতিবন্ধকতা ছিল- ১. আলেমগণের সিদ্ধান্তমতে, কোরআন-হাদিসের কোনো মর্ম ব্যাখ্যাসাপেক্ষে প্রত্যাখ্যান করা দ্বারা কেউ কাফের হয় না। আর উল্লিখিত লোকগুলো কোরআন-হাদিস সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে না; বরং সেগুলোর ভিন্ন ব্যাখ্যা পেশ করে। ২. আহলে কিবলাকে কাফের আখ্যা দেওয়া উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিষিদ্ধ। আর তারা কিবলার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে। বরং কেউ কেউ তো নামাজের বড় বড় জামাতের ইমামতিও করে।
তাই প্রয়োজন ছিল সংশ্লিষ্ট এ ধরনের অস্পষ্টতাগুলো দূর করা। মূলত এ উদ্দেশ্যেই আল্লামা কাশ্মিরি রাহিমাহুল্লাহ إِكْفَارُ الْمُلْحِدِينَ রচনা করেছেন। এবং তাঁর বক্তব্য সর্বসাধারণের বোধগম্য করার জন্যই হজরত মুফতি মুহাম্মদ শফি রাহিমাহুল্লাহ এ পুস্তিকা লিখেছেন।
উলুমে নবুওয়াতের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে
তালিবানে ইলম শিরোনাম ধারণ করে আমরা যারা সময় অতিবাহিত করছি, আমাদের কেমন ব্যাপক ও গভীর অধ্যয়নের অধিকারী আলেম হতে হবে, এবং সর্বজন বোধগম্য করে সেই ইলমের কেমন উপস্থাপনকারী হতে হবে, আমার মনে হয়েছে, সেই ধারণা নেওয়ার জন্য এ রচনাকে বিশেষ মাইলফলক হিসেবে আমরা গ্রহণ করতে পারি। পদ্ধতি হলো, إِكْفَارُ الْمُلْحِدِينَ কিতাবটি অধ্যয়ন করা। তারপর উক্ত কিতাব থেকে এ পুস্তিকা কীভাবে নির্গত হলো, তা মিলিয়ে বুঝার চেষ্টা করা। অথবা প্রথমে এ পুস্তিকাই পাঠ করা। তারপর إِكْفَارُ الْمُلْحِدِينَ অধ্যয়ন করা। আল্লাহ সহজ করুন। আমিন!
আল্লাহ তাআলা আল্লামা কাশ্মিরি ও মুফতি মুহাম্মদ শফি রাহিমাহুমাল্লাহ, এবং আমাকে ও আব্বা-আম্মাসহ আমার সকল মুহসিনকে, উত্তম জাযা দান করুন। বইটিকে সকল পাঠক ও সংশ্লিষ্ট সকলের ঈমানের হেফাজত ও আখেরাতের নাজাতের ওসিলা বানান।
অভিন্ন উদ্দেশ্যে অনূদিত 'কালিমায়ে তাইয়েবা : বিশ্লেষণ ও ঈমান ভঙ্গের কারণ' বইটির ফায়দাও ব্যাপকতর করুন। দেওবন্দি মানহাজে প্রতিষ্ঠিত আমাদের মাহাদ ও তার 'আকিদা ও তাওহিদ বিভাগ'সহ এ বান্দা সংশ্লিষ্ট সবগুলো কাজ হেফাজত করুন ও সাদাকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন। আমার সন্তানদেরকেও সুস্থতা ও অবসরের সাথে মুসলিম উম্মাহর চোখের শীতলতা বানান। আমিন! তারা বর্তমানে পাঁচজন- সাইফুল্লাহ ফুআদ, শারাফাতুল্লাহ ফুআদ, হাবিবা ফুআদ, লাবিবা ফুআদ ও আবদুল্লাহ ফুআদ।
বইটির অনুবাদ সমাপ্ত হওয়ার পর পরিমার্জন পর্বে প্রিয় ছাত্র মাওলানা ইরফানউদ্দীন [নোয়াখালী] আমার সঙ্গে ছিল। আল্লাহ আমাকে, তাকে ও দীনের জন্য যারা আমাদের মহব্বত করেন- সকলকে দীনদারের বেশে আত্মপ্রকাশকারী যিন্দিক, মুলহিদ ও ঐ সকল লোকদের থেকে নিরাপদ রাখুন, যারা ইলম, আমল ও আখলাক চর্চায় মত্ত থাকে; কিন্তু ঈমানি মুজাকারা, বিশেষকরে তাগুত প্রত্যাখ্যান ও তাওহিদুল উলুহিয়্যাতের আলোচনা যুগের সাথে মিলিয়ে শুনতে (২) ও করতে উদ্যম পায় না। অথচ কোরআনের ঘোষণা হলো-
فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنُ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انفِصَامَ لَهَا.
অতএব যে কেউ তাগুতকে (১) প্রত্যাখ্যন করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, নিশ্চয় সে এমন মজবুত হাতল আঁকড়ে ধরবে, যা ভেঙ্গে যাওয়ার নয়। [সুরা বাকারা: ২৫৬]
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ، وَمِنْ قَلْبِ لَا يَخْشَعُ، وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعُ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا.
হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পানাহ চাই অনুপকারী ইলম থেকে, অবিনয়ী অন্তর থেকে, অতৃপ্ত মন থেকে এবং এমন দুআ থেকে যা কবুল হয় না। [সহিহ মুসলিম: ৭০৮১]
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا وَرِزْقًا طَيِّبًا.
হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট চাই উপকারী ইলম, মকবুল আমল ও উত্তম জীবিকা। [মুসনাদে আহমদ: ২৬৫২১]
عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ، وَنَجْنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ.
আল্লাহর উপরই আমরা নির্ভর করলাম। হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে জালেম সম্প্রদায়ের নির্যাতনের শিকার বানাবেন না, এবং আপনি নিজ মেহেরবানীতে আমাদেরকে কাফের সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন। [সুরা ইউনুস: ৮৫-৮৬]
اللهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ صِحَةً فِي إِيمَانٍ، وَإِيْمَانًا فِي حُسْنِ خُلُقٍ، وَنَجَاحًا يَتْبَعُهُ فَلَاحُ ، وَرَحْمَةً مِنْكَ وَعَافِيَةً، وَمَغْفِرَةً مِنْكَ وَرِضْوَانًا.
হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট চাই ঈমানের সাথে সুস্থতা, সুন্দর চরিত্রের সাথে ঈমানদারি, [দুনিয়াতে] সফলতা যার পর থাকবে [আখেরাতের] কল্যাণ, আপনার পক্ষ হতে করুণা ও নিরাপত্তা এবং আপনার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। [আল-মুসতাদরাক, ১৯১৯] আমিন!
'কালিমায়ে তাইয়েবা : বিশ্লেষণ ও ঈমান ভঙ্গের কারণ' বইটি যাদের এখনও পাঠ করা হয়নি, তারা নিকটতম সময়ের মধ্যে সংগ্রহ করে অবশ্যই পাঠ করুন এবং ঈমানি চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ও সওয়াব প্রাপ্তির আশায় বইদুটো খুব প্রচার করুন। উল্লেখ্য, বইদুটোতে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের জন্ম-মৃত্যুর তারিখগুলো বাংলা অনুবাদের সংযোজন। একজনের জন্ম-মৃত্যুর তারিখ শুধু একবার লেখা হয়েছে।
পরিশেষে, আমি একজন মানুষ। ভুল থেকে উর্ধ্বে নই। কোনো ভুল প্রকাশ হলে তা থেকে ফিরে আসা সৌভাগ্য মনে করি। তাই কল্যাণকামনায় ভুল চিহ্নিতকারীদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা। তাঁদের সহযোগিতায় পরবর্তী সংস্করণ অধিক ভুলমুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা রাখি।
وَصَلَّى الله على سيدنا محمد، وعلى آله وصحبه وتابعيهم بإحسان إلى يوم الدين.
বিনীত সফিউল্লাহ ফুআদ [আফাল্লাহু আনহু] মুসাফির টাওয়ার, উত্তর মাদানীনগর, সিদ্দিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ১৭-৪-১৪৪২ হি. মোতাবেক ৩-১২-২০২০ ঈ. বৃহস্পতিবার
টিকাঃ
১. মাহাদের 'আকিদা ও তাওহিদ বিভাগ'টি দেওবন্দি মানহাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বর্ণনা ২৬৫-২৬৬ নং পৃষ্ঠায়, এবং 'কিতাব ও রিজালের অনুসরণ বিষয়ক দেওবন্দি মানহাজের বিবরণ' ১৫৮-১৭৮ পৃষ্ঠার সংলাপে দেখুন।
২. 'মাহাদুশ শায়খ ফুআদ লিদ্দিরাসাতিল ইসলামিয়া ঢাকা'। ২৬৭ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
৩. قسم العقيدة والتوحيد على مَذْهَبِ أهلِ السُّنَّة والجماعة,
৪. এ বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীকে কমপক্ষে 'জাইয়িদ জিদ্দান' স্তরে দাওরায়ে হাদিস উত্তীর্ণ হতে হয়, এবং বার্ষিক পরীক্ষার নম্বরপত্রের ফটোকপি সাথে রাখতে হয়। তাছাড়া যেকোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সর্ব প্রকারের সংশ্লিষ্টতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে হয়। বর্তমানে পরীক্ষা হয় নিম্নের কিতাবগুলো থেকে- ১. ‘কিতাবুল ঈমান - সহীহ আল বুখারী’ ফাতহুল বারী। ২. ‘কিতাবুল ঈমান - সহীহ মুসলিম’ ফাতহুল মুলহিম। ৩. আল-আকীদাতুত তাহাবিয়া। মূল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর, যারা 'ব্যবহারিক আরবি' ভালো জানে এবং প্রমিত বাংলায় সাবলীলভাবে লিখতে পারে, তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
১. ২৬৭ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
২. এ স্থানের উর্দু বাক্যের শাব্দিক অর্থ হলো, 'যদি কুফরি প্রতিহত করার জন্য ব্যাখ্যাকে সর্বাবস্থায় যথেষ্ট মনে করা হয়'।
৩. ২৬৭-২৭৪ নং পৃষ্ঠায় আমাদের প্রচলিত তাবলিগ জামাত সম্পর্কে একটি মূল্যায়ন এবং 'ইসলামি দাওয়াতের নববি পদ্ধতি'র বিবরণ এসেছে। যে তাবলিগ ও দাওয়াত নববি পদ্ধতিতে হবে না, তাতে যত ইখলাস ও লিল্লাহিয়াতই থাকুক, তাকে নবিওয়ালা মেহনত বলার সুযোগ নেই। কারণ, শুধু লিল্লাহিয়াত ও ইখলাস দ্বারা কোনো জিনিস দীন হয় না। সুরা যুমার-এর ৩য় আয়াত দ্রষ্টব্য। শরিয়তের নির্ধারিত পদ্ধতিতে কাজ করা আপাতত সম্ভব না হলে করণীয় হলো, তার জন্য চেষ্টা করা। কোনো বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করা গ্রহণযোগ্য নয়।
১. মানসুস ও ইজমায়ি: কোরআন-হাদিসে বর্ণিত ও উম্মাহর সর্বসম্মত।
২. উল্লিখিত: ১. উপরে বা পূর্বে লিখিত। ২. পূর্বে উক্ত। উল্লেখিত: উক্ত।
৩. অর্থাৎ তার কর্মের কারণে সে কাফের হয়ে গেছে। এ বইয়ের ৯২ নং পৃষ্ঠার আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয়, ঈমানভঙ্গের কারণ পাওয়া গেলেই ব্যক্তি কাফের হয়ে যায়, যদিও সে কিবলামুখী হয়ে নামাজ পড়ে এবং নিজেকে মুসলমান মনে করে। কেননা উম্মাহ 'কিবলামুখী মুসল্লি'দের নাম নয়। উম্মাহ হলো ঈমানদারদের নাম। কোনো ব্যক্তির কাফের হওয়ার জন্য তার নিজের জানা জরুরি নয় যে, সে এখন কাফের, মুসলমান নয়।
১. হাকিমুল উম্মাত হজরত মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রাহিমাহুল্লাহ [১২৮০-১৩৬২ হি.] বলেছেন- غرض اسلام میں جمہوری سلطنت کوئی چیز نہیں (اشرف )جواب ۳ : ۳۱۹ مکتبہ عمر فاروق کراچیটা (মোট কথা, ইসলামে গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্য বলতে কিছু নেই।) শাইখুল ইসলাম হজরত মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানি রাহিমাহুল্লাহ وہاں (پاکستان) کی حکومت ایک یورپین طرز کی جمہوری - 1 . ۰۹۹-۵۹۵۶ حکومت ہے ، جس میں حسب آبادی مسلم اور غیر مسلم سب حصہ دار ہیں ، اسکو اسلامی حکوت کہنا غلط ہے ۔ (مکتوبات شیخ الاسلام ٢ : ٢٤٢) [পাকিস্তান] সরকার ইউরোপিয়ান পদ্ধতির গণতান্ত্রিক সরকার। জনসংখ্যা হিসেবে মুসলমান ও অমুসলমান সবাই তাতে অংশীদার। তাকে ইসলামি সরকার বলা ভুল।) ২৮৪ নং পৃষ্ঠায় 'পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব' শিরোনামে একটি লেখা আছে।
২. উক্তিটি আল্লামা কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ [মৃ. ৬৭১ হি.] উল্লেখ করেছেন সুরা বাকারার ৪২ নং আয়াতের তাফসিরে। এবং আল্লামা যামাখশারি [৪৬৭-৫৩৮ হি.] ও আবু হাইয়ান আন্দালুসি [৬৫৪-৭৪৫ হি.] রাহিমাহুমাল্লাহ উল্লেখ করেছেন সুরা কাফ-এর ১৫ নং আয়াতের তাফসিরে।
১. نَظَارَةُ مُعَلَّمٍ وَنَظَرَاتُهُ নামে প্রকাশিত এ লেখকের আরবি রোজনামচাসমগ্রের ১৯ মহররম ১৪৪০ হি. [৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ঈ.] রোববারের রোজনামচার অংশবিশেষ নিম্নরূপ- ولا بأس أن أسجل أنني - والحمد لله - أعلنتُ في المعهد في عدة مناسبات أن هناك واجبات دينية كثيرة لا أقوم بها ، ولاسيما فيما يتعلق بذِرْوَةِ ( ذُرْوَةِ) سَنَام الإسلام : الجهاد والقتال في سبيل الله، وذلك ضَعْفٌ مني، فلا يعتقدني وأمثالي أحد نموذجا للعالم الديني. وقد بَيَّنتُ مَوْقِفي هذا لما علمت أن عددا لا يستهان به من التلاميذ والمعلمين أعربوا عن تَطَلُّعَاتِهم أن يكونوا مثلي. নথিভুক্ত করতে কোনো সমস্যা নেই, আলহামদুলিল্লাহ আমি মাহাদে বেশ কিছু উপলক্ষ্যে ঘোষণা দিয়েছি, অনেক দীনি করণীয় আছে যা আমার করা হয় না, বিশেষকরে ইসলামের উচ্চতর কুঁজ তথা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও কিতালসংশ্লিষ্ট। তা আমার দুর্বলতা। তাই কেউ যেন আমাকে ও আমার মতো লোকদেরকে দীনি আলেমের নমুনা মনে না করে। আমি আমার এ অবস্থান স্পষ্ট করেছি যখন জানতে পেরেছি, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আমার মতো হওয়ার জন্য আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে। [দুআ করি, আল্লাহ আমাকেসহ প্রত্যেক ঈমানদারকে পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করার তাওফিক দিন! ২২৫ ও ২৩৭ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।]
১. র্যান্ড কর্পোরেশন সকল মুসলমানকে চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে : ১. ফান্ডামেন্টালিস্ট বা মৌলবাদী। ২. ট্র্যাডিশনালিস্ট বা ঐতিহ্যবাদী। ৩. মডারেট বা মধ্যপন্থী। ৪. সেকুলারিস্ট বা ধর্মনিরপেক্ষ। 'পরিশিষ্ট' পর্বে 'র্যান্ড কর্পোরেশনের একটি মূল্যায়ন' শিরোনামের সংলাপটি দ্রষ্টব্য।
১. হাফেজ ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহর বিবরণ ২৭৭ নং পৃষ্ঠায় দেখুন।
১. 'ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে'র সহযোগী অধ্যাপক শায়খ আবদুল আজিজ রাজিহি হাফিজাহুল্লাহকে আন্তঃধর্মীয় বৈঠকে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির হুকুম জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন- যে ব্যক্তি বিভিন্ন ধর্মের একটিকে অপরটির কাছাকাছি করার আহ্বান জানায়, সে তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করেনি। সে মুসলমানদেরকে ইহুদিধর্ম বা খ্রিস্টানধর্মের নিকটবর্তী হওয়ার বা তাদের মতো হওয়ার অথবা তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার আহ্বান জানায় বা তারা হকের উপর আছে- একথা বলে। এ লোক তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করেনি। এটি ধর্মত্যাগ। এ ব্যক্তি ঈমানভঙ্গকারী একটি কাজ করেছে। 'সাহাব' ওয়েবসাইট দ্রষ্টব্য।
১. সুনানে ইবনে মাজা: ৬১
২. সুনানে তিরমিজি: ৩৬৬৭
২. সে এবং ইরফানউদ্দীন এ বইয়ের চূড়ান্ত প্রুফ দেখেছে। চলতি ১৪৪১-৪২ হি. শিক্ষাবর্ষে সে দারুল উলুম মাদানীনগর মাদরাসায় [ঢাকা] ফজিলত ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী। আল্লাহ আমাকে, তাদেরকে এবং যারা 'আমিন' বলবে সকলকে, কিতাব-সুন্নাহের পারিভাষিক আলেম হওয়ার ও তার দাবি অনুযায়ী চলার তাওফিক দিন। আমিন! প্রকৃত আলেমের পরিচয়, বৈশিষ্ট, মর্যাদা ও দায়িত্ব জানার জন্য 'নবী-রাসূলগণের উত্তরসূরি' বইটি দ্রষ্টব্য।
১. আল্লাহ তাআলাকে শুধু 'রব' মানা দ্বারা কেউ মুসলমান হয় না; বরং তাঁকে একমাত্র 'ইলাহ' মানা দ্বারাই ব্যক্তি মুসলমান হয়। ইসলাম শুধু রুবুবিয়্যাতের তাওহিদের নাম নয়; বরং তা উলুহিয়্যাতের তাওহিদও বটে। রুবুবিয়্যাতের তাওহিদ হলো, নিজ কার্যাবলির [যেমন- সৃষ্টি, রিজিকদান, জীবনদান, মৃত্যুদানের] ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলাকে এক-অদ্বিতীয় বিশ্বাস করা। উলুহিয়্যাতের তাওহিদ হলো, একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে ইবাদতের উপযুক্ত জ্ঞান করা। পূর্বের এক টীকায় অতিবাহিত হয়েছে- কারো মধ্যে ঈমানভঙ্গের কারণ পাওয়া গেলেই সে কাফের হয়ে যায়। কাফের হওয়ার জন্য তার নিজের জানা জরুরি নয় যে, সে এখন কাফের, মুসলমান নয়। তাই গায়রুল্লাহর কোন্ কোন্ আনুগত্য 'ইবাদত', যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সাব্যস্ত করলে ব্যক্তির ঈমান ভেঙ্গে যায়, সে আলোচনা শোনার ও করার উদ্যম থাকা অতীব জরুরি। প্রসঙ্গত, 'কালিমায়ে তাইয়েবা : বিশ্লেষণ ও ঈমান ভঙ্গের কারণ' বইয়ে স্বতন্ত্র শিরোনামের অধীনে ঈমান ভঙ্গের কারণ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
২. ২০১ ও ২৭৭ নং পৃষ্ঠার তাগুতের সংজ্ঞা দ্রষ্টব্য।
📄 লেখকের অবতরণিকা
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ الْحَمْدُ للهِ وَكَفَى، وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِينَ اصْطَفَى خُصُوصًا عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ المُصْطَفَى وَمَنْ بِهَدْيِهِ اهْتَدَى.
ঈমান, ইসলাম, কুফর- শব্দগুলো সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে পরিচিত। প্রত্যেক ফেরকার মূর্খ লোকেরাও এগুলো জানে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এগুলোর এমন সংজ্ঞা দেওয়া দুষ্কর, যা দ্বারা তার কোনো একটি শাখা যেমন বাদ পড়বে না, তদ্রূপ বহির্ভূত কিছুও তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে না।
এটি শুধু কুফর ও ঈমানের অবস্থা নয়। টুপি, জামা, পাজামা, জুতা, বাড়ি, টেবিল, চেয়ার, বদনা, গ্লাস প্রভৃতি শব্দগুলো সর্বজন পরিচিত এবং সকলের মুখে মুখে ব্যবহৃত। এগুলোর মর্ম বুঝতে শিশুদেরও কষ্ট হয় না। কিন্তু যদি কোনো একটি শব্দের এমন সংজ্ঞা দেওয়ার প্রশ্ন আসে, যার মধ্যে তার প্রতিটি শাখা অন্তর্ভুক্ত থাকবে, কোনো একটি শাখা বাদ পড়বে না, তাহলে বড় বড় পণ্ডিতদেরও মাথা ঘোরা শুরু হয়ে যাবে, এবং পূর্ণ চিন্তা-ফিকির করে যে সংজ্ঞা তৈরি করবে, তাতেও এ আশঙ্কা থাকবে যে, হয়ত তার কোনো একটি শাখা ছুটে গেছে, বা বহির্ভূত কোনো শাখা তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।
উম্মাহর পূর্বসূরি তাফসির বিশারদ, ফিকহ বিশারদ ও আকিদাশাস্ত্রবিদ আলেমগণ ঈমান ও ইসলামের পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা, কুফরের সংজ্ঞা ও তার প্রকারভেদ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন এবং স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই শেষ যুগে ইসলামি জ্ঞানের বাতিঘর, আলেমকুলের ভরসা, উস্তাদগণের উস্তাদ, আমার মুরুব্বি ও উস্তাদ, দারুল উলুম দেওবন্দের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, হজরত আল্লামা মাওলানা মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি কুদ্দিসা সিররুহু, এ বিষয়ে إِكْفَارُ الْمُلْحِدِينَ নামে অত্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ও বিশদ একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন।
রচনার প্রেক্ষাপট: একটি বিশেষ প্রকারের কুফরের নাম হলো যান্দাকা বা ইলহাদ। এটিই বর্তমান সময়ের মুনাফিকির কুফর। এই ইলহাদ ও যান্দাকাকে ইসলাম ও ঈমান থেকে পৃথক করা এবং মুসলমান ও যিন্দিকের মধ্যে পার্থক্য করা সর্বকালেই গভীর চিন্তার দাবিদার বিষয় থেকেছে। কোরআন-হাদিসের জ্ঞানবিজ্ঞানের ব্যাপক অজ্ঞতার কারণে বিষয়টি বর্তমান সময়ে আরো বেশি জটিল হয়ে পড়েছে। ওদিকে মুলহিদ ও যিন্দিকদের দৌরাত্ম্য এ পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যে, তারা ইসলামের পোশাক ধারণ করে নিকৃষ্টতর কুফর প্রচার করে যাচ্ছে, এবং মুসলমানদের আস্তিনের সাপ হয়ে তাদেরকে দংশন করে যাচ্ছে।
অনেক ভালো মুসলমানও এ ফিতনার শিকার হচ্ছে যে, তারা ইসলামের প্রত্যেক দাবিদারকে মুসলমান গণ্য করা উচিত মনে করছে, তার আকিদা ও আমল যেমনই হোক। বর্তমানে একে 'রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা' বলে ব্যক্ত করা হয়। এর আবশ্যক পরিণতি হচ্ছে, ইসলাম কোনো বাস্তবতা বা আকিদার নাম নয়। বরং এক অর্থহীন শব্দমাত্র। যেন যে কেউ নিজস্ব আকিদা, চিন্তাধারা ও কর্মে অবিচল থাকাবস্থায় মুসলমান হতে পারে। ইসলাম যেন তার উপর কিছুই আবশ্যক করে না।
এ ফিতনার ভয়ঙ্কর পরিণতিগুলো ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কী পরিমাণ ধ্বংসাত্মক, তা ব্যাখ্যাযোগ্য ছিল। তাই কুফরের এ প্রকারটি -যা ইসলামের পোশাক ধারণ ও ইসলামের দাবির সাথে আত্মপ্রকাশ করেছে- পরিপূর্ণ স্পষ্ট করা সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে পড়েছিল।
বিশেষত এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় এমন ছিল যে, সাধারণদের অতিক্রম করে কতক বিশিষ্ট আলেমও সংশয়ের শিকার হতে পারতেন।
১. ফিকহশাস্ত্রবিদ আলেমগণের সুস্পষ্ট বিবৃতি ব্যাপকভাবে রয়েছে যে, কেউ ব্যাখ্যাসাপেক্ষে কোনো কুফরি আকিদা পোষণ করলে তাকে কাফের বলা হবে না। ওদিকে ইসলামের দাবিদার যে কেউ কোনো কুফরি আকিদা ও উক্তি গ্রহণ করে, তা কোনো না কোনো ব্যাখ্যার আড়ালেই করে। এর ফল এটাই হয় যে, ইসলামের দাবিদার কোনো ব্যক্তিকে কাফের আখ্যা দেওয়া জায়েজ থাকে না। অথচ কোরআন-হাদিসের বর্ণনা এর বিপরীত সাক্ষ্য প্রদান করে। তাই ফিকহ ও আকিদাশাস্ত্রবিদগণের উল্লিখিত মূলনীতিটি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন করা আবশ্যক ছিল।
২. একটি নির্ভরযোগ্য ও সুস্পষ্ট হাদিসের ভিত্তিতে আলেম ও ফকিহগণের সর্বজনমান্য উক্তি হলো, কোনো আহলে কিবলাকে কাফের বলা যাবে না। বাহ্যত এর ফল এ-ই দাঁড়ায় যে, ইসলামের দাবিদার যে ব্যক্তি কাবাঘরকে নিজের কিবলারূপে গ্রহণ করে, আল্লাহ ও রাসুল সম্পর্কে সে যতই গলদ আকিদা পোষণ করুক, এবং আল্লাহ ও রাসুলকে যত অবমাননাই করুক, তাকে কাফের আখ্যা দেওয়া যাবে না।
এ সংশয় দুটো ইলমের প্রলেপমিশ্রিত হওয়ার কারণে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরা আরো বেশি প্রয়োজন ছিল। তাই হজরাতুল উস্তাদ হজরত শাহ ছাহেব কুদ্দিসা সিররুহু এ বিষয়ে কলম ধরেছেন, এবং এমন দৃষ্টান্তহীন গ্রন্থ রচনা করেছেন যে, পূর্বের কোনো গ্রন্থে এতটা সমৃদ্ধি দৃষ্টিগোচর হয়নি।
📄 রচনার পটভূমি
কিন্তু এখানে দুটি দিক আছে। প্রথমত গ্রন্থটি রচিত হয়েছে আরবিভাষায়। দ্বিতীয়ত তা হজরত শাহ ছাহেব কুদ্দিসা সিররুহুর সেই জ্ঞানগত উচ্চতার প্রতিচ্ছবি, যার নাগাল পাওয়ার জন্যও প্রয়োজন স্বতন্ত্র এক বড় ইলমের। ফল এই দাঁড়িয়েছে যে, সাধারণ লোক তো বটেই, ইলমের ক্রমঃঅবনতির ফলে অধিকাংশ আলেমও তা হতে উপকৃত হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছে। তাই গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই অনেক গুণীজনের দাবি ছিল, এর বিষয়গুলোকে সহজ বিন্যাসে বিন্যস্ত করে সাবলীল উর্দুভাষায় লেখা হোক। অনেক বন্ধু অধমকেও এ প্রয়োজনের দিকে আকৃষ্ট করেছে। নিজের মধ্যেও এ অনুভূতি শুরু থেকে ছিল।
কিন্তু ভাগ্যের ফয়সালা, কাজটি অদ্যাবধি আটকে আছে। এখন পাকিস্তানে কাদিয়ানি ফেতনা যখন নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে, (১) এবং কুফর ও ইসলামের মধ্যে অস্পষ্টতা সৃষ্টিকারী পুরাতন শিকারি নতুন জাল নিয়ে মাঠে নেমেছে, তখন মুসলমানদের জন্য তা নতুনভাবে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে, এবং অনুভূতির প্রয়োজনীয়তা দ্বিগুণ হয়ে পড়েছে। তাই আল্লাহর নামে এ রচনার কাজ শুরু করলাম।
এ পুস্তিকায় শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদের আলোচনার সকল উপাত্ত ও গবেষণা পূর্ণরূপে আনা হয়েছে। তবে বিন্যাস ও বর্ণনা সব এ অধমের। শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদের বর্ণনাধারা ছিল একটি বিশেষ ফেতনা ও বিশেষ কিছু প্রশ্নের উত্তরে। তাই ইসলাম, ঈমান বা কুফর ও তার প্রকারভেদের পূর্ণ বিবরণ তাঁর রচনায় ছিল না। অধম তা সংযোজন করেছে এবং কোনো ফেরকার আকিদা ও চিন্তাধারাকে আলোচনার উপলক্ষ্য স্থির না করে, সাধারণ ও সামগ্রিক বিচারে ইসলাম ও কুফরের বিষয়টি পরিষ্কার করার প্রয়াস পেয়েছে। এখন আল্লাহর তাওফিকে এ পুস্তিকায় কুফর ও ইসলামের সকল প্রয়োজনীয় আলোচনা সন্নিবেশিত হয়ে গেছে, এবং সংশ্লিষ্ট সংশয়সমূহ দূরীভূত হওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছে। বস্তুত আল্লাহই তাওফিকদাতা এবং তিনিই তাওফিকদানের উপযুক্ত।
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا، إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.
বান্দা মুহাম্মদ শফি আফাল্লাহু আনহু মুকিম, করাচি, লাহোর নিবাস জুমাদাল উলা ১৩৭৩ হিজরি জানুয়ারি ১৯৫৪ ঈসায়ি
টিকাঃ
১. পাঞ্জাবের অনুসন্ধানী আদালতে মুসলমান ও কাফের এবং ইসলাম ও কুফরের পরিচয় বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে।
📄 কুফর ও কাফেরের প্রকারভেদ
এ পুস্তিকার মূল আলোচ্য বিষয় এ অধ্যায়টিই, যেমনটি অবতরণিকায় বলা হয়েছে।
পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেছে, কুফর হলো রাসুলকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়ার নাম। মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়ার বিভিন্ন রূপ রয়েছে। এর ফলে কুফরও কয়েক প্রকারে বিভক্ত। ইমাম গাজ্জালি রাহিমাহুল্লাহ তাঁর 'ফায়সালুত তাফরিকাতি বাইনাল ইসলামি ওয়ায যানদাকাতি(১) ও 'আল-ইকতিসাদু ফিল-ইতিকাদি’(২) কিতাবদ্বয়ে, হজরত শাহ আবদুল আজিজ দেহলবি রাহিমাহুল্লাহ [১১৫৯-১২৩৯ হি.] তাঁর ফতোয়ায়, এবং ইমাম বাগাবি রাহিমাহুল্লাহ [৪৩৩-৫১৬ হি.] إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ - আয়াতোর তাফসিরে প্রকারগুলো সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করেছেন। অনুরূপভাবে আকিদা ও কালাম শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'শারহুল মাওয়াকিফ' ও (৩) 'শারহুল মাকাসিদে'ও (৪) প্রকারগুলো বিস্তারিতভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে।
টিকাঃ
১. فَيْصَلُ التَّفْرِقَةِ بَيْنَ الإِسْلَامِ وَالزَّنْدَقَةِ .
২. الاقتصاد في الاعتقاد .
৩. الْمَوَاقِفُ কিতাবটি মূলত মহান আশআরি আলেম আজদুদ্দিন ইজি (عَضْدُ الدِّيْنِ الإِنْبِيُّ) রাহিমাহুল্লাহ [৬৮০-৭৫৬ হি.]-এর রচনা। شَرْحُ الْمَوَاقِفِ হলো সাইয়েদ শরিফ জুরজানি রাহিমাহুল্লাহ [৭৪০-৮১৬ হি.] রচিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ। -অনুবাদক।
৪. شَرْحُ المَقَاصِدِ فِي عِلْمِ الكَلَامِ . সাদুদ্দিন মাসউদ তাফতাযানি রাহিমাহুল্লাহ [৭২২-৭৯১ হি.]। -অনুবাদক।