📄 দ্বিতীয় কারণ : বিপরিতমুখী বর্ণনার মাঝে প্রাধান্য দেওয়ার মূলনীতিসমূহে মতানৈক্য
ইমামগণের মাঝে দ্বিতীয় মতানৈক্য হয়েছে বিপরীতমুখী বর্ণনার মাঝে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ সমূহে। যদিও এর আলোচনা সংক্ষিপ্ত আকারে পূর্বে চলে এসেছে। তারপরও বাস্তবে যেহেতু এটাই ইমামগণের মাঝে মতানৈক্যের অন্যতম বড় একটি কারণ সেহেতু এ বিষয়ে পৃথকভাবে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করাও প্রয়োজন মনে করছি। ইমামগণের মাঝে একাধিক বর্ণনাকে সহীহ মেনে নিয়ে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ সমূহের মাঝে ও মতানৈক্য হয়েছে অর্থাৎ ভিন্ন দুই বিষয়ের মাঝে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ কি হতে পারে। এর বর্ণনাও অনেক দীর্ঘ। আর চার ইমামের কিতাব অধ্যয়ন করার দ্বারা এর বিস্তারিত হাকীকত স্পষ্ট হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি,
সুফিয়ান ইবনে উয়ায়নাহ রহ. বলেন, এক বার এক বাজারে আবু হানীফা ও আওযায়ী রহ. এর কথা হল, ইমাম আওযায়ী রহ. ইমাম আবু হানীফা এর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা রুকুতে যাওয়া ও রুকু থেকে উঠার সময় কেন হাত উঠান না? ইমাম আবু হানীফা রহ. উত্তরে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত এর প্রমাণ সহীহভাবে প্রমাণিত না। আওযায়ী রহ, তিনি যুহরী, তিনি সালেম থেকে, তিনি ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায শুরু করার সময়, রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে উঠার সময় হাত উঠাতেন। ইমাম আওযায়ী রহ. এর উত্তরে ইমাম আবু হানীফা রহ. একটি হাদীস শুনিয়ে দিলেন যে, হাম্মাদ তিনি, ইবরাহীম থেকে, তিনি আলকুমা ও আসওয়াদ থেকে তাঁরা উভয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নামায আদায় করতেন তখন শুধু তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত উঠাতেন।' এর উত্তরে আওযায়ী রহ. বললেন, আমি যে সনদে হাদীসটি বর্ণনা করলাম অর্থাৎ যুহরী, তিনি সালেম থেকে তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে এ সনদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত তিনটি মাধ্যম মাত্র। আর আপনি সনদ বর্ণনা করলেন, অর্থাৎ হাম্মাদ থেকে, তিনি ইবরাহীম থেকে, তিনি আলকুমা ও আসওয়াদ থেকে, তাঁরা দুইজন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে, এ সনদে মাধ্যম চার জন। তখন ইমাম আবু হানীফা রহ. বললেন, হাম্মাদ মুহরী থেকে বেশী ফকীহ ছিলেন। আর ইবরাহীম সালেম থেকে বেশী ফকীহ ছিলেন। আলকুমাহও ইবনে উমর রা. থেকে নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে কম গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। তবে ইবনে উমার রা. সাহাবী হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন আলকুমারও অন্যান্য অনেক ফযীলত রয়েছে। আর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের রা. কথা তো বাদই দিলাম। এরপর আওযায়ী রহ. চুপ হয়ে গেলেন। ১০৬
ইবনে আরাবী রহ. তিরমিযীর শরাহে লেখেন, যদি কখনো ইবনে উমার ও ইবনে মাসউদ (রা.) এর মাঝে কোন বিষয়ে দ্বন্দ হয় তাহলে ইবনে মাসউদ রা. কে প্রাধান্য দিতে হবে।
উক্ত বিতর্ক উল্লেখ করার দ্বারা আমার উদ্দেশ্য হলো উক্ত ইমাম দ্বয়ের প্রাধান্য দেওয়ার কারণ সমূহ বর্ণনা করা। কেননা আওযায়ী রহ. ও অন্যান্য শাফেয়ীদের মতে কম মাধ্যম বিশিষ্ট সনদ প্রাধান্য পাওয়ার ও যোগ্য অগ্রগণ্য। আর ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মতে বর্ণনাকারী ফকীহ হওয়ার দ্বারা প্রাধান্য পায়। আর হানাফীদের মতে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ সমূহ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটাও যে, যখন একাধিক বর্ণনার মাঝে দ্বন্দ হয় তখন ফকীহ বর্ণনাকারীর বর্ণনাকে তাঁরা প্রাধান্য দেয়। বিষয়টি যুক্তিযুক্তও। কেননা মানুষ যত বুঝমান হবে কথা তত পরিপূর্ণ ভাবে বর্ণনা করতে পারবে। এমনিভাবে ইমাম মালেক রহ. এর মতে মদিনাবাসীরা যদি কোন বর্ণনা অনুযায়ী আমল করে তাহলে তা প্রাধান্য পাওয়ার কারণ হবে। অর্থাৎ যদি কখনো দুই বর্ণনার মাঝে দ্বন্দ হয় তাহলে যেই বর্ণনা অনুযায়ী মদীনাবাসীরা আমল করে আসছে সেই বর্ণনাকে তাঁরা প্রাধান্য দেয়। 'মুওয়াত্তা ইমাম মালেক' যা দেখলে স্পষ্ট হয়ে যায়। ইবনে আরাবী মালেকী রহ. তিরমিযীর ব্যাখ্যা গ্রন্থে লেখেন যে, ইমাম মালেক রহ. এর নীতি হলো যখন কোন হাদীস মদীনাবাসীদের মাঝে প্রসিদ্ধ হয়ে যায় তখন তা যাচাই এর উর্ধ্বে উঠে যায়।
যে সকল কারণে একাধিক হাদীসের মাঝে কোন একটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, সেগুলো অনেক বেশী। হাযেমী রহ. 'কিতাবুল নাসেখ ওয়াল মানসুখ' এ এমন ৫০টি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলো দ্বারা দ্বন্দপূর্ণ দুই হাদীসের মাঝে কোন একটিকে অন্যটির উপর প্রাধান্য দেওয়া যায়।
আর ইরাকী রহ. 'কিতাবুন নুকাত' এ ১০০ টির চেয়েও বেশী কারণ উল্লেখ করেছেন। এগুলো সবগুলোর ব্যাপারে ঐক্যমত নেই। হাদীস অনুযায়ী আমল কারীদের জন্য এটা আবশ্যক যে, সে সবগুলোর তাহকীক করার পর এটা দেখা যে, কোন হাদীসে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ বেশী পাওয়া যায়। যাতে করে সে অন্যান্য দ্বন্দপূর্ণ হাদীসের উপর এটাকে প্রাধান্য দিতে পারে। এ জন্য হানাফীগণ ঐ সকল হাদীসকেও প্রাধান্য দেন যেগুলোর সনদ শক্তিশালী বা উঁচু স্তরের। আর এগুলোর কারণে প্রাধান্য পাবে না কেন? কেননা এর চেয়েও প্রাধান্য দেওয়ার শক্তিশালী কারণ পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ হানাফীদের মতে প্রাধান্য দেওয়ার শক্তিশালী অন্যতম কারণ হলো কোন হাদীসের বিষয়বস্তু কুরআনের শব্দের অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া। আর এটা খুবই স্পষ্ট বিষয়। কেননা হাদীসের শব্দ সমূহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শব্দ হওয়া নিশ্চিত নয়।
রাবীদের কর্তৃক অর্থ ঠিক রেখে ভিন্ন শব্দে বর্ণনা করার আলোচনা পূর্বে চলে গেছে। পক্ষান্তরে কুরআনের শব্দ সমূহ হুবহু বর্ণিত হওয়া নিশ্চিত। এজন্য বিভিন্ন হাদীসের বিষয় বস্তুর মাঝে যে বিষয় বস্তু কুরআনের শব্দের বেশী নিকটবর্তী বুঝা যাবে উহা প্রাধান্যশীল হওয়া নিশ্চিত ও স্পষ্ট কথা। এ কারণে হানাফীগণ রাফে'ইয়াদাইন (নামাজে হাত উঠানো) সম্পর্কে বর্ণনাসমূহের মাঝে ঐ সকল বর্ণনাকে প্রাধান্য দেন যেগুলো রাফে'ইয়াদাইন (নামাজে হাত উঠানো) বুঝায় না। কেননা কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, وَقُوْمُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ
এই আয়াতের শব্দের অর্থ হলো চুপ স্থীর হয়ে নামাজ পড়া। এই ভিত্তিতে এমন যত বর্ণনা রয়েছে যেগুলোর কোন একটিতে স্থীরতার কাছাকাছি পাওয়া যাবে সেই বর্ণনাটি হানাফীদের মতে প্রাধান্য পাবে। বিভিন্ন ঘটনা দ্বারাও এটার সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন প্রথম দিকে নামাজে অনেক আমল যেমন কথা বলা, আলাপ করা, ইত্যাদি সর্বসম্মতিক্রমে জায়েয ছিল।
পরবর্তীতে ধীরে ধীরে স্থীরতার দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। এজন্য যে কোন দ্বন্দপূর্ণ দুই বর্ণনা থেকে যে বর্ণনাটি স্থীরতার কাছাকাছি হবে সেই বর্ণনাটিই হানাফীদের মতে প্রাধান্য পাবে। আর এজন্যই হানাফীদের মতে ইমামের পিছনে ক্বেরাত পড়া সম্পর্কে দ্বন্দপূর্ণ বর্ণনার ঐ সকল বর্ণনাকে প্রাধান্যযোগ্য যেগুলো ক্বেরাত পাঠ না করা সম্পর্কে বুঝায়। কেননা وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا
অর্থাৎ আর যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তাতে কান লাগিয়ে রাখ এবং নিশ্চুপ থাক।১০৭ এই আয়াতের অধিক নিকটতম। এজন্য হানাফীদের মতে ফজর ও আছরের নামাজ বিলম্ব করে আদায় করা উত্তম। PM কেননা قَبْلَ طُلُوعِ الْشَمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا অর্থাৎ সূর্য উদয়ের পূর্বে ও সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে। এই আয়াতের অধিক নিকটতম। এজন্য যে, সূর্য উদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে কেবল ঐ সময়কেই বলা হবে যখন তা নিকটবর্তী হবে। কেননা সূর্যাস্তের তিন-চার ঘন্টা পূর্বে পৌছার ক্ষেত্রে কেউই বলে না যে, আমি সূর্য উদয়ের পূর্বে পৌছে যাব। এজন্যই হানাফীদের মতে বেতর নামাজে দো'আয়ে কুনূতে اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ দু'আকে প্রাধান্য দেয়। কেননা কুরআন শরীফে দুই সূরা পাঠ করার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের হাজারো উদাহরণ আছে দীর্ঘ হওয়ার আশংকায় সেগুলো উল্লেখ করছি না। কিন্তু হাদীস অনুযায়ী আমল করার জন্য বর্ণনার দুর্বলতার কারণ সমূহ এবং প্রাধান্য দেওয়ার কারণ সমূহ জানা একান্তই জরুরী। এটা ছাড়া বর্ণনা অনুযায়ী আমল সম্ভব নয়। আমি আমার ছাত্র জীবনে ইমামগণের উসূল জমা করা এবং প্রাধান্য দেওয়ার একাধিক কারণ একত্রিত করা শুরু করেছিলাম। কিন্তু সময়ের অভাবে পরিপূর্ণ করতে পারি নাই। والله الموفق
টিকাঃ
১০৬. ই'লাউস সুনান, কিতাবুল সালাত ৩/৭৫ (পাকিস্তান হতে প্রকাশীত)।
১০৭. সূরা আরাফ আয়াত নং-২০৪