📘 ইমামগণের মতবিরোধ কি ও কেন > 📄 প্রথম কারণ : হাদীস গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে মূলনীতি ও মাপকাঠির ভিন্নতা

📄 প্রথম কারণ : হাদীস গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে মূলনীতি ও মাপকাঠির ভিন্নতা


পূর্বের আলোচনা থেকে এই বিষয় তো স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সম্মানিত বর্ণনা কারীগণের পক্ষ থেকে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কিছু হস্তক্ষেপ হয়ে গেছে। কখনো বর্ণনা করার ক্ষেত্রে কখনো বুঝার ক্ষেত্রে। এ জন্য হাদীস ও ফেকাহের ইমামগণের জন্য প্রয়োজন দেখা দিলো যে, সে সকল বর্ণনা গুলোকে সামনে রেখে সেগুলোর মাঝে প্রাধান্য দিবেন ও নিজ বিশ্লেষণ অনুযায়ী সহীহ ও গ্রহনযোগ্য বর্ণনা সমূহকে প্রাধান্য দিবেন। গায়রে সহীহকে আমলের অনুপোযুক্ত সাব্যস্ত করবেন। এ কথা বাস্তব যে, মুজাহিদ ইমামগণের বাণী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে গৃহীত। অনেক সময় সরাসরি শব্দ থেকে নির্গত। আবার কখনো কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা থেকে মাসয়ালা নির্গত করার জন্য কিছু উসূল ও মূলনীতির প্রয়োজন আবশ্যক ছিলো। যদ্বারা বিভিন্ন হাদীসের মাঝে প্রাধান্য দেওয়া যায়। আর সে সকল উসূল ও মূলনীতির ক্ষেত্রে ফেকাহ ও হাদীসের ইমামগণের মাঝে মতানৈক্য হয়েছে। এই আলোচনা খুব লম্বা। উসূলে হাদীস ও উসূলে ফেকাহ হাদীসের কিতাব পড়ানোর পূর্বে এই উদ্দেশ্যেই পড়ানো হয়। উপরোক্ত আলোচনার সার সংক্ষেপ হলো আইম্মায়ে হাদীস উপরোক্ত কারণ গুলোর ভিত্তিতে হাদীসকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। (১) মুতাওয়াতির (২) মাশহুর (৩) খবরে ওয়াহেদ।

মুতাওয়াতির: ওই হাদীসকে বলে যার বর্ণনাকারী সকল যুগেই এত অধিক পরিমান ছিলো যে, তাঁরা সকলেই কোন মিথ্যা বা ভুলের উপর একমত হওয়া অসম্ভব। যেমনঃ মক্কা মদীনা ইত্যাদির অস্তিত্তের সংবাদ। এমনিভাবে নামাযের রাকাত, রোজার সংখ্যা ইত্যাদি ইত্যাদি।

দ্বিতীয় প্রকার মাশহুর: এটা প্রথম প্রকারের কাছাকাছি। আমরা এই দুই প্রকার সম্পর্কে আলোচনা করবো না। কেননা এগুলো সম্পর্কে ইমামগনের বেশী মতানৈক্য নেই। শুধু এটুকু মতানৈক্য আছে যে, মুতাওয়াতিরের জন্য কতজন বর্ননাকারী হওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া মাশহুর, মুতাওয়াতিরের হুকুমের অন্তর্ভক্ত, না-কি খবরে ওয়াহেদের, না-কি তৃতীয় একটি প্রকার? (এ বিষয় নিয়ে মতানৈক্য) আমরা এখানে শুধু খবরে ওয়াহেদের আলোচনা করবো অর্থাৎ যার বর্ণনাকারীদের সংখ্যা তাওয়াতিরের সংখ্যায় পৌঁছে না। প্রায় সকল রেওয়ায়েত এই প্রকারের-ই অন্তর্ভূক্ত। এই প্রকার সংক্ষেপে দুই প্রকারে বিভক্ত: (১) মাকবুল, (গ্রহণযোগ্য) (২) মারদূদ, (অগ্রহণযোগ্য)।

হযরত হাফেজ ইবনে হাজর রহ. বলেন প্রথম প্রকার অর্থাৎ মুতাওয়াতির ব্যতীত যতো প্রকার আছে সবগুলো দুই প্রকারে সীমাবদ্ধ মাকবুল, মারদূদ। মাকবুল যার উপর আমল করা ওয়াজিব। আর মারদূদ যা গ্রহণযোগ্য হওয়া অগ্রহণযোগ্য হওয়ার উপর প্রাধান্য পায় না (অর্থাৎ অগ্রহণযোগ্য)। সুতরাং যে হাদীসে বিভিন্ন পরস্পর বিরোধী বস্তু থাকে অর্থাৎ কয়েকটি কারণ সহীহ ও গ্রহনযোগ্য হওয়ার দাবী করে অন্যদিকে অন্য কতক কারণ সে হাদীসটা অগ্রহণযোগ্য হওয়ার দাবী করে, সে হাদীসও অগ্রহণযোগ্যের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হবে যতক্ষন পর্যন্ত উহার গ্রহণযোগ্য হওয়ার কারণ সমূহ প্রাধান্য না পাবে। এরপর হাফেজ রহ. বলেন মারদূদ তো ওয়াজিবুল আমল-ই নয়। পক্ষান্তরে মাকবুলও দুই প্রকারে বিভক্ত, ওয়াজিবুল আমল, ওয়াজিবুল আমল নয়। কেননা যদি তা মাকবুল হওয়া স্বত্ত্বেও অন্য কোন হাদীসের সাথে দ্বন্দ হয়ে যায় তাহলে দেখতে হবে যে, উভয় হাদীসের মাঝে সমন্বয় করা যায় কিনা? যদি সমন্বয় করা যায় তাহলে তো অনেক ভাল। যেমন নিম্নোক্ত দুই হাদীসের মাঝে উলামা কেরাম সমন্বয় সাধন করেছেন। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, অসুস্থতা সংক্রামন নয়।৯২ পক্ষান্ত রে অন্য হাদীসে ইরশাদ হচ্ছে কুষ্ঠরোগী থেকে এমনভাবে পালায়ন কর যেমন পলায়ন কর নেকড়ে বাঘ থেকে।৯৩ উক্ত দুই হাদীসে বাহ্যত বৈপরিত্ব রয়েছে অথচ উভয়টি সহীহ ও গ্রহনযোগ্য বর্ণনা। উলামা কেরাম বিভিন্নভাবে সমন্বয় করেছেন। তাঁদের সে সকল বাণী বর্ণনা করা উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হলো যদি সমন্বয় সম্ভব হয় তাহলে তা অগ্রগণ্য ও প্রধান্য পাবে। আর যদি বৈপরিত্ব পূর্ণ হাদীসগুলোর মাঝে সম্বন্বয় সম্ভব না হয় তাহলে ইতিহাস দেখতে হবে যে কোনটি আগে ও কোনটি পরে। যদি প্রমাণিত হয় তাহলে পরের হাদীস অনুযায়ী আমল করতে হবে। আর যদি এটাও সম্ভব না হয় তাহলে দেখতে হবে যে, প্রাধান্য দেওয়ার অন্যান্য কারণ থেকে এমন কোন কারণ আছে কি-না যদ্বারা কোন একটিকে প্রাধান্য দেওয়া যায়। যদি এটাও না পাওয়া যায় তাহলে উক্ত দুইটি বর্ণনা সহীহ ও মাকবুল হওয়া স্বত্ত্বেও এই বৈপরিত্বের কারণে মারদূদের (অগ্রহণযোগ্য) প্রকার ভূক্ত হয়ে যাবে।

এ ক্ষেত্রে উলামাগণের মাঝে দীর্ঘ দুইটি আলোচনা রয়েছে। প্রথমতঃ প্রত্যাখ্যানের কারণ সমূহ অর্থাৎ কোন কোন কারণে হাদীস যঈফ ও অগ্রহণযোগ্য প্রমাণিত হবে। দ্বিতীয়তঃ প্রাধান্যের কারণ সমূহ অর্থাৎ ভিন্ন দুইটি বর্ণনার মাঝে দুইটি সহীহ হওয়া সত্ত্বেও কোন্ পদ্ধতিতে প্রাধান্য দেওয়া যায়। উক্ত দুইটি মৌলিক আলোচ্য বিষয়ে যে পরিমান শাখাগত মতানৈক্য উলামাগণের মাঝে হয়েছে তা যুক্তিযুক্ত। বিগত কায়দায় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, দুই হাদীসে যখন ভিন্ন ভিন্ন দুইটি বিষয় প্রমাণিত হয় তখন এটা জরুরী নয় যে, প্রত্যেক আলেমের কাছে তা বিপরিত হবে।

বরং এর উদ্দেশ্য কোন মুজতাহিদের কাছে এমন যা অন্য হাদীসের বিপরিত নয়। এর পর যদি বিপরিত মেনে নেওয়াও হয় তাহলে এটা জরুরী নয় যে, প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে সেগুলোর মাঝে সমন্বয়ের কোন পদ্ধতি থাকবে না। আর এটা খুবই সম্ভাবনা যে, কারো কাছে সমন্বয়ের কোন পদ্ধতি থাকবে আর কারো কাছে থাকবে না। এরপর যদি একথা মেনে নেয়া হয় যে, সমন্বয়ের কোন পন্থাই নেই তাহলে এর বিশ্লেষণের জন্য একাধিক মত হওয়া স্পষ্ট কথা। কেননা কোন হাদীস পূর্বের ও কোন হাদীস পরের এ বিষয়েও মতানৈক্য হওয়া জরুরী। কেননা ইহা খুব সম্ভব যে, কারো, কাছে এমন কিছু করীনা বা আলামত আছে যদ্বারা সে কোন একটিকে পরের ও রহিতকারী মনে করে আর অন্য টিকে রহিত। কিন্তু অন্যের কাছে সেই করীনা বা আলামত উক্ত বিষয়ের দলীল নাও হতে পারে। যদি একথাও মেনে নেওয়া হয় যে, পূর্বের-পরের বিষয়টি প্রমাণিত নয়, তাহলে এ অবস্থায়ও মতানৈক্য জরুরী। কেননা কারো নিকট বর্ণনা সমূহের মাঝে কোন একটিকে প্রাধান্য দেওয়ার এমন কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো অন্যের নিকট নেই। সংক্ষিপ্ত আকারে আমরা কোথাও এ বিষয়ে আলোচনা করবো। আর মতানৈক্যের এ সকল দিক মুজতাহিদদের নিকট মতানৈক্যের কারণ। এ সকল বিষয় সৃষ্টিগত ও স্পষ্ট বিষয়। যেমন একজন বর্ণনাকারী কোন কথা বর্ণনা করলেন, যায়েদের নিকট তা গ্রহণযোগ্য পক্ষান্তরে আমরের নিটক তা মিথ্যাবাদী হতে পারে। যায়েদের নিকট সে বুঝমান, আমরের নিকট সে বেওকুফ। যায়েদের নিকট তার বর্ণনা সত্য পক্ষান্তরে আমরের নিকট তার বর্ণনা মিথ্যা ও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার উপযুক্ত নয়। এ ধরনের আরো অনেক কারণ রয়েছে।

মোট কথা উপরোক্ত কারণ সমূহ নিয়ে হাদীস ও ফেকাহের ইমামগণের মাঝে অনেক শাখাগত বিষয়ে মতানৈক্য হয়েছে। যেগুলোকে আমরা সংক্ষেপে বর্ণনা করে দেখাতে চেয়েছি যে, ইমামগণের মাঝে মতানৈক্য হয়েছে উক্ত কারণ সমূহের কোন এক কারণে। আর সেগুলোর সমাধান দুই অবস্থায় সম্ভব যথাঃ (১) পরবর্তীতে আগত ব্যক্তি স্বয়ং নিজে এ পরিমাণ যোগ্যতা রাখবে যে, উক্ত কারণসমূহের আলোকে একটি বর্ণনাকে প্রাধান্য দিবে ও সে অনুপাতে আমল করবে। ইনশাআল্লাহ সে সঠিক পথ অবলম্বনকারী ও সওয়াব প্রাপ্ত হবে। এদেরকেই আমরা মুজতাহিদ বলে থাকি। (২) এ পরিমাণ যোগ্যতা তার নাই যে সে বিপরিতমুখি বর্ণনা সমূহের মাঝে প্রাধান্য দিতে পারে। এ ধরনের ব্যক্তির জন্য উচিত কোন বিজ্ঞ ইমামের অনুসরণ করা। কেননা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, রাস্তা যখন অস্পষ্ট হবে তখন যদি সে দক্ষ হয় তাহলে নিজে আগে বাড়বে। দক্ষ না হলে অন্য কারোর অনুসরণ করবে। তবে এ কথা যাচাই করার পর যে, যার অনুসরণ করবে সে নিজে দক্ষ কি-না এবং তার গন্তব্য কোথায়। আর অবস্থা এই যে, প্রশস্ত রাস্তায় যদি যে কেউ এক জনের পিছনে চলতে থাকে তাহলে বিপথগামী ও পথহারা হওয়া ছাড়া আর কি হবে? এ কারণেই উলামা কেরামের "আকলীদে শখসী" (নির্দিষ্ট কোন ইমামের অনুসরণ করা) কে জরুরী বলেছেন ও "তাকলীদে গায়রে মুআয়্যিন" (নির্দিষ্ট না করে যার ইচ্ছা তার অনুসরণ করা) কে নিষেধ করেছেন।

সারকথাঃ উক্ত কারণগুলোর ভিত্তিতে উলামাগণের মাঝে সতন্ত্র দুইটি দল হয়ে গেছে। প্রথম নিন্দার কারণ সমূহ অর্থাৎ কি কারণে হাদীসের বর্ণনাকে দোষযুক্ত সাব্যস্ত করা যায়। মুহাদ্দিসগণ নিন্দার কারণ দশটি সাব্যস্ত করেছেন। যে গুলোর পাঁচটি বর্ণনাকারীর আদালত (ন্যায়পরায়নতা) সম্পর্কিত আর বাকী পাঁচটি তার মেধা শক্তি সম্পর্কিত। আদালত (ন্যায়পরায়নতা) সম্পর্কিত পাঁচটি নিম্নরুপঃ (১) বর্ণনাকারী মিথ্যাবাদী হওয়া, (২) মিথ্যাবাদীর অপবাদে অপবাদিত হওয়া, (৩) ফাছেক হওয়া, ব্যাপক চাই তা কার্যত হোক যেমন ব্যভিচার ইত্যাদি অথবা কথাগত যেমন গীবতকারী, (৪) বেদআতী হওয়া ও (৫) অবস্থা অজানা থাকা।

আর মেধাশক্তি সম্পর্কিত পাঁচটি নিম্নরুপঃ (১) অধিকাংশ ভুল বর্ণনা করা, (২) বর্ণনার ক্ষেত্রে গাফলতি করা, (৩) কোন সন্দেহ বা ওহাম সৃষ্টি করা, (৪) গ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারীদের বিপরিত বর্ণনা করা ও (৫) মেধাশক্তিতে কোন ত্রুটি হওয়া। উক্ত দশটি কারণ সম্পর্কে উলামাকেরামের মাঝে দুই দিক দিয়ে মতানৈক্য হয়ে গেছে। প্রথমতঃ উক্ত কারণ গুলো কোন সীমায় পৌঁছলে বর্ণনাকে যঈফ বা দুর্বল বলা হবে। যেমনঃ বেদআতী হওয়া এটা কি সাধারনভাবেই বর্ণনাটি দুর্বল বা যঈফ হওযার কারণ না-কি বেদআতের অনুকুলে বর্ণনা হলে যঈফ বা দুর্বল হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত: বর্ণনাকারীর ব্যাপারো উক্ত দশটি দোষের কোন একটি দোষ পাওয়ার যাওয়ার যে কথা বলা হল যে, হয় তার মাঝে কোন একটি দোষ আছে কি-না। যেমন: মিথ্যার অপবাদে অপবাদিত হওয়া। এক জনের কাছে সে মিথ্যার অপবাদে অপবাদিত। পক্ষান্তরে অন্য জনের কাছে বর্ণনাকারীদের ভুল, সে সত্যবাদী। এমনিভাবে অন্যান্য কারণগুলোতেও ফেকাহ ও হাদীসের ইমামগনের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। তাছাড়া উপরোক্ত দশটি কারণ ছাড়াও দূর্বলতার আরো কিছু কারণ নিয়ে উলামাকেরামের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। যেমনঃ সনদের মাঝ থেকে কোন বর্ণনাকারীকে বাদ দেওয়া। এক জামাতের মতে এটা নির্দিধায় দুর্বলতার কারণ এবং তার এই বর্ণনা দূর্বল যঈফ হিসেবে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে উলামাদের অন্য জামাতের মতে নিম্মোক্ত কারণ ব্যাপকভাবে নয় যে, যে কোন স্থান থেকেই বর্ণনাকারী বাদ পরবে তা যঈফ হয়ে যাবে (এমনটি নয়) বরং তাঁদের মতে এতে নিম্মোক্ত ব্যাখ্যা সাপেক্ষে তার ঐ বর্ণনাটা দুর্বল বা যঈফ হবে। ব্যাখ্যা হলো যে মাঝ থেকে যে বর্ণনাকারীকে বাদ দেওয়া হবে হয় তিনি সাহাবী হবেন বা তার নিম্মের কোন বর্ণনাকারী হবেন। এমনিভাবে বাদ দাতা নিজে নির্ভরযোগ্য কি-না? এ ধরনের অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোতে উলামা কেরামের মাঝে মতানৈক্য হয়েছে, যে এগুলোর কারণে বর্ণনায় দূর্বলতা আসে কি-না? এক দলের মতে সেগুলো দূর্বলতার কারণ। সুতরাং তাদের মতে যে বর্ণনায় উপরোক্ত কারণ সমূহ থেকে যে কোন একটি কারণ পাওয়া যাবে সে বর্ণনা দুর্বল যঈফ হয়ে যাবে। আর সেই (দুর্বল) হাদীস থেকে যে মাসআলা নির্গত হবে প্রমাণিত হবে না। পক্ষান্তরে যাদের মতে উপরোক্ত কারণগুলো দুর্বলতার কারণ নয় বা সেগুলো কিছু ব্যাখ্যা আছে তাদের মতে ওই সকল বর্ণনা যেগুলোতে উপরোক্ত কোন কারণ পাওয়া যায় সেগুলোতে তাদের কাছে দুর্বল হবে না। আর এ ধরণের হাদীস থেকে যে মাসয়ালা নির্গত হবে তা তাদের কাছে প্রমাণিত হবে এবং ঐ ধরণের হাদীস দলীল দেওয়ার উপযুক্ত। (অথচ এ ধরণের হাদীস প্রথমে উপরে আলোচিত লোকদের নিকট দলীলের উপযুক্ত নয়)

মন চায় এই বিষয়টি অনেক ব্যাখ্যা সহকারে লিখি। উপরোক্ত কারণগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে এটা স্পষ্ট করি যে কোন পর্যায়ে কি মতানৈক্য। কিন্তু তা ইলমী আলোচনা হওয়ায় সাধারণের বিরক্তির কারণ হবে। আলোচনা দীর্ঘায়িত হবে তাই সংক্ষিপ্ত করলাম। তবে প্রকৃত পক্ষে ইমামগণের নিকট এটা মতপার্থক্যের অনেক বড় একটা কারণ। কেননা কোন কোন ইমামের নিকট কিছু কারণ হাদীসের ক্ষেত্রে দুর্বলতা সৃষ্টি করে আবার অন্য ইমামগণের নিকট ঐ বিষয়টি হাদীসের ক্ষেত্রে দুর্বলতা সৃষ্টি করে না। এদিক লক্ষ্য করে উলামায়ে কেরام উসূলে হাদীসে তথা হাদীসের মূলনীতি বিষয়ক কিতাবগুলো হাদীস পড়ানোর পূর্বেই পড়া জরুরী মনে করতেন। যখন এ মূলনীতিগুলো জানা থাকবে তখন হাদীস পড়ার সময় এ সন্দেহ আসবে না যে ইমামগণ কেন এ হাদীসের বিরুদ্ধে মাসয়ালা বর্ণনা করেছেন। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে মন চাচ্ছিল যে, যারা হাদীসের তরজমা পড়েন, তাদেরকে তরজমা পড়ার আগে হাদীসের মূলনীতি সম্পর্কে মৌলিক কিছু ধারণা দিয়ে দেওয়া যাতে করে সাধারণ জনগণ হাদীসের তরজমা পড়ে গোমরাহ না হয় বা মাসলা মাসায়েলের ব্যাপারে অনিহা ও অনাগ্রহ সৃষ্টি না হয়। হাদীসের ব্যাপারে খারাপ ধারণা না আসে। (ইমামগণের ব্যাপারে খারাপ ধারণা বা খারাপ মন্তব্য না করে) আর এ সবগুলোই দ্বীনের ক্ষেত্রে বড় ক্ষতিকারক।

وَاللَّهُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ . অর্থৎ আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা তাকে সরল সঠিক পথ দেখান। (সূরা বাকারা, আয়াত-২১৩) এই কারণ ছাড়াও আরো অনেক কারণ রয়েছে যদ্বারা বর্ণনা ত্রুটিযুক্ত হয়ে যায়, তার উপর আমল করা যাবে না। আর এ সংক্রান্ত ইলম না থাকলেই এ হাদীসের উপর আমল করা জায়েয হবে না।

'তাযকিরা' নামক কিতাবের লেখক লিখেছেন যে, হাদীস সমূহের একটি খুব সুক্ষ ও নাজুক বিষয় হচ্ছে জালিয়াতকারী ও ওয়ায়েজদের পক্ষ থেকে অনেক জাল হাদীস বানিয়ে দেওয়া। এ ছাড়াও অনেক দ্বীনদার গ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারীদেরও হাদীসের অর্থ বুঝতে ভুল হয়ে যাওয়া। এজন্য মুজাতাহিদগণ হাদীস যাচাই করার জন্য একটি মাপকাঠি নির্ধারণ করার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। তারা যে উসূলও মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন সে উসূল ও মাপকাঠি সাধারণ মুহাদ্দিসগণ কর্তৃক হাদীস যাঁচাই করার জন্য নির্ধারিত উসূল ও মাপকাঠি থেকে ভিন্ন। এ কারনেই মুহাদ্দিসগণ ওই সাধারণ উসূল যা মুহাদ্দিসগণের কায়দা অনুযায়ী হাদীস সমূহ যাচাইয়ের জন্য নির্ধারিত। ফুকাহাগণ হাদীস যাচাই-বাছাই ও প্রাধান্য দেওয়ার জন্য উসূল বর্ণনা করেছেন যেগুলোকে উসূলে ফেকহে বাবুস সুন্নাহ বলে আখ্যায়িত করা হয়। উদাহরণ স্বরুপ আমরা সংক্ষেপে কিছু হানাফী উসূল বর্ণনা করছি, যদ্বারা বুঝা যাবে যে, হাদীস অনুযায়ী আমল করার জন্য কোন কোন বিষয় জানা থাকা জরুরী। আর হাদীস অনুযায়ী আমলের দাবীদাররা এ সম্পর্কে কি পরিমাণ বে-খবর।

উসূলবিদগণ বলেছেন, এ সকল বিষয় ছাড়াই কুরআনের ইলমের জন্য আরো অনেক বিষয় রয়েছে যা জানা থাকা জরুরী যে, এই হুকুমটি আম, না খাস। এই শব্দটি এক অর্থবোধক, না একাধিক অর্থবোধক। এই শব্দটি স্বীয় অর্থে স্পষ্ট, না অস্পষ্ট কোন অর্থ আছে। এই আদেশটি ওয়াজিবের জন্য, না মুস্তাহাবের জন্য, না ধমকীর জন্য, না অনুমতির জন্য, মোট কথা এ সকল নীতিমালা সম্পর্কে অবগত হওয়া তো একান্ত জরুরী। যেগুলো কুরআন শরীফ ও হাদীসের অর্থের সাথে সম্পর্ক রাখে। কিন্তু ওই সকল আহকাম জানাও জরুরী যেগুলোর সম্পর্ক শুধু হাদীস শরীফের সাথে সম্পর্ক রাখে। আর এই আহকাম চার প্রকারে বিভক্ত।

প্রথমতঃ আমাদের থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত পৌছার পদ্ধতি অবগত হওয়া জরুরী। কেননা, হাদীসসমূহে বিভিন্ন পন্থা রয়েছে। কিছু হাদীস মুতাওয়াতির। কিছু মাশহুর বা আহাদ হয়ে থাকে। যেগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা আমরা উপরে করেছি। মোটকথা, হানাফীদের উসূল অনুযায়ী হাদীসের সনদ বা সূত্রধারার পরস্পরের সম্পর্কের দিক লক্ষ্য করে হাদীস তিন প্রকার। ১. মুতাওয়াতির। ২. মাশহুর। ৩. খবরে ওয়াহেদ।

মুতাওয়াতিরের আলোচনা পূর্বে চলে গেছে।

মাশহুরঃ ঐ হাদীস যার প্রথমস্তর অর্থাৎ সাহাবীদের যামানায় এক দুইজন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তীতে নিম্নস্তরে এসে তার বর্ণনাকারী মুতাওয়াতিরের সীমায় পৌছে গেছে।

খবরে ওয়াহেদঃ যে হাদীসের সনদ শেষ পর্যন্ত মুতাওয়াতিরের সীমায় পৌছে না।

তৃতীয় এই প্রকারের হাদীস সম্পর্কে উলামাগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। এ হাদীস অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে আমল করা ওয়াজিব কি না। হানাফীদের মতে এতে ব্যাখ্যা রয়েছে। অর্থাৎ কখনো কখনো ওয়াজিব। কখনো ওয়াজিব না। মালেকীদের মতে যদি কিয়াসের বিপরিত হয় তাহলে তার উপর আমল করা ওয়াজিব না। পক্ষান্তরে হানাফীদের মতে যদি তার বর্ণনাকারী ফকীহ হয় কথার মূলে পৌছতে পারে যেমনঃ খোলাফায়ে রাশেদীন রা. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. আব্দুল্লাহ ইবনে ওমার রা. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. যায়েদ ইবনে সাবেত রা. মুয়ায ইবনে জাবাল রা. আয়েশা রা. ইত্যাদি ইত্যাদি, তাহলে এ হাদীসের উপর নির্দিধায় আমল করা ওয়াজিব। চাই তা কিয়াস অনুযায়ী হোক বা কিয়াসের বিপরিত হোক। আর যদি সে হাদীসের বর্ণনাকারী ফকীহ হিসেবে প্রসিদ্ধ না হয় তাহলে তার বর্ণনা দিরায়েতের (জ্ঞান, বুদ্ধি বা অভিজ্ঞতার) বিপরিত হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। এ কারণেই যখন হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করলেন যে, আগুনে পাকানো খাবার খেলে ওযু ভেঙ্গে যায়। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বললেন, আমরা গরম পানি দ্বারা ওযু করলেও কি পুনরায় ওযু করতে হবে?৯৪ সুতরাং এই হাদীস দলীলের উপযুক্ত না। আর যদি হাদীসের বর্ণনাকারী বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ না হয় আর তার থেকে বর্ণনাকারী গ্রহণযোগ্য হয় ও নির্দিধায় বর্ণনা করে দেয় তাহলে তাকেও (অর্থাৎ যার থেকে বর্ণনা করেছে তাকে) প্রসিদ্ধ মনে করা হবে। কিন্তু প্রত্যেক বর্ণনাকারীর জন্য চারটি শর্ত আবশ্যক। ১. মুসলমান হওয়া। ২. বিবেকবান হওয়া। ৩. সুস্ত মেধা সম্পন্ন হওয়া। ৪. ফাসেক না হওয়া।

উক্ত চারটি শর্তের জন্য আরো ব্যাখ্যা রয়েছে যা স্বস্থানে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ রয়েছে অর্থাৎ কি পরিমাণ মেধা ইত্যাদি প্রয়োজন। উদাহরণ স্বরুপ ফাসেক না হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কবীরা গুনাহে লিপ্ত না হওয়া ও ছগীরা গুনাহ বারবার না করা।

এমনিভাবে আয়ত্ব করার শক্তির ব্যাপারেও শর্ত রয়েছে অর্থাৎ হাদীসটি শোনার সময় যথাযথভাবে শুনেছে কি না, শোনার সময় তার অর্থ বুঝে শোনা এবং পরবর্তীতে অন্যের কাছে পৌছানো পর্যন্ত তা স্মরণ রাখা।

দ্বিতীয়তঃ হাদীসের সনদ ইত্তেসাল (যুক্ত) ও ইনকেতা (বিচ্ছিন) হওয়া হিসেবে আলোচনা। উসূলবিদগণ ইনকেতা (বিচ্ছিনতা) কে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। এক. বাহ্যিক ইনকেতা, অর্থাৎ সনদের মাঝে থেকে কোন মাধ্যম বাদ পড়া চাই তিনি সাহাবী হোন বা অন্য কেউ। ইমামগণের মাঝে এই মাসআলায়ও মতানৈক্য রয়েছে যে, কোন অবস্থায় উক্ত হাদীস দলীল দেওয়া যোগ্য আর কোন অবস্থায় যোগ্য নয়।

২য় বাতেনী ইনকেতা, বাস্তবে এটা ইনকেতা হিসেবে ব্যক্ত করা সূক্ষ্ম দৃষ্টি ও নবীর হাদীসের প্রতি সীমাহীন সম্মানের কারণে। অন্যথায় এটা বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইনকেতা নয়। এ কারণে ফেকাহ ও উসূলের অন্যান্য ইমামগণ এটাকে ইনকেতা হিসাবে আখ্যায়িত করেন না। মোটকথা এটা বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। প্রথমতঃ আল্লাহর কিতাবের বিপরিত হওয়া উসূলবিদগণ এটার উদাহরণ পেশ করেন। لَا صَلوةَ إِلَّا بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ

অর্থাৎ সূরা ফাতেহা ছাড়া কোন নামায জায়েয নেই।৯৫ যেহেতু এই হাদীসটি কুরআনে কারীমের এ আয়াত فَأَقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْآن এর ব্যাপকতার বিপরিত। এজন্য উসূলবিদগণের নিকট এতে কোন বাতেনী ইনকেতা হয়েছে।

দ্বিতীয় কোন মাশহুর হাদীসের বিপরিত হওয়া, যেমন, الحديث القضاء بشاهد يمين অর্থাৎ সাক্ষী একজন থাকা অবস্থায় অপর সাক্ষীর পরিবর্তে শপথ নেওয়া হবে এবং এক সাক্ষী ও এক শপথ অনুযায়ী ফয়সালা করা হবে।৯৬

الْبَيِّنَهُ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِينُ عَلَى مَنْ أَنكَرَ على من انكر৯৭ এর বিপরিত হওয়ার কারণে উক্ত হাদীসটি দলীল হওয়ার উপুক্ত নয়।

এমনিভাবে প্রসিদ্ধ কোন ঘটনা যা সাধারণত ঘটে থাকে তাতে দুই একজন বর্ণনাকারী কর্তৃক এমন কোন বিষয়ের আলোচনা করা যে বিষয়ে অন্যান্য বর্ণনাকারীগণ কর্তৃক আলোচনা না করা এ বিষয়ের প্রমাণ যে, এ হাদীসে কোন গঢ় বঢ় হয়েছে। এমনিভাবে সাহাবীদের যুগে কোন মাসআলা সম্পর্কে সাহাবীগণ কর্তৃক তা প্রত্যাখান করার পর নিজ ইজতিহাদ অনুযায়ী কোন হুকুম দেওয়া সেই হাদীস দ্বারা দলীল না দেওয়াও দোষযুক্ত হওয়ার অন্তর্ভূক্ত।

এমনিভাবে কোন বর্ণনাকারী কর্তৃক নিজ বর্ণিত হাদীস অস্বীকার করা অথবা সেই হাদীসের বিপরিত আমল করা বা ফাতওয়া দেওয়াও বর্ণনাটি দোষযুক্ত হওয়ার অন্তর্ভূক্ত। এই আলোচনা দীর্ঘ করতে চাচ্ছি না। উসূলবিদগণ অনেক ব্যাখ্যা ও স্পষ্টভাবে এ সকল বিষয়কে দলীল ভিত্তিক আলোচনা করেছেন। যার মন চায় সে যেন লেখাগুলো দেখে নেয়।

আমার উদ্দেশ্য হল, সমস্ত ইমামগণের মতে চাই তারা ফকীহ হোন বা মুহাদ্দিস হোন তাদের কাছে হাদীসের জন্য এমন কিছু উসূল ও কায়দা রয়েছে, যেগুলো দ্বারা হাদীস পরিমাপ ও তার স্তর এবং সে অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব কি না তা জানা যায়। সে সকল কায়দার ভিন্নতার কারণেই ইমামগণের মাঝে অনেক বর্ণনার ব্যাপারে মতানৈক্য হয়েছে। কেননা, কতকের কাছে কোন একটি হাদীস অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব সাব্যস্ত হয়েছে এ জন্য যে, তাদের যাচাইয়ে সেই হাদীস মাপকাঠি অনুযায়ী হয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যদের কাছে তা আমল ওয়াজিব হওয়ার উপযুক্ত নয়। কেননা, তাদের যাচাইয়ে সেই হাদীস দলীল ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার স্ত রে কোন কারণে পৌছে নাই। উক্ত দুই মতামতের ব্যাপারে কেবল ওই ব্যক্তিই ফায়সালা করতে পারবে যে, উভয় দলের যাচাইয়ের উসূল সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত। পক্ষান্তরে যে এগুলো সম্পর্কে অবগত নয় সে নিজেই পথহারা সে কি করে অন্যকে পথ দেখাবে?

বাস্তবে এ সকল গায়রে মুকাল্লিদিনদের দেখে অবাক লাগে যারা জন সাধারণকে এই বলে ভ্রান্ত করে যে, যা মাযহাবের অনুসরণ করে তারা ইমামগণের অনুসরণ করতে যেয়ে হাদীসের কোন পরওয়া করে না। জন সাধারণ যারা কোন ইমামের অনুসরণ করে না তাদের সম্পর্কে কোন অভিযোগ নেই কেননা, তারা তো নিজেরাই অজ্ঞ। আলেমদের বিরুদ্ধে অভিযোগ। কেননা, তারা সকল বিষয়ে অবগত হয়েও গোপন করে ও বাস্ত ব বিষয়ে পর্দা টেনে দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয়। ইমামগণের শান অনেক উচু। এ বিষয়ে তো একজন সাধারণ মানুষ ও সহ্য করবে না যে, হাদীসের মোকাবেলায় ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইরশাদের মোকাবেলায় বড় থেকে বড় কোন ব্যক্তির কথা মেনে নিবে। কিন্তু নিশ্চিত বিষয় হল, হাদীস একত্রিত করা, সেগুলো প্রাধান্য দেওয়া সমন্বয় করা, এ সকল বিষয়ে সমকালিন উলামাগণের মোকাবেলায় ইমামগণের বাণী, তাদের প্রাধান্য দেওয়া অগ্রগণ্য ও আবশ্যকভাবে পালনীয়। যা অস্বীকার করা যুলুম ও বাড়াবাড়ির। মোটকথা ইমামগণের মাঝে মতানৈক্যের অন্যতম কারণ হল, বিভিন্ন বর্ণনার প্রাধান্য দেওয়া অর্থাৎ একাধিক বর্ণনার মাঝে কোন ইমামের কাছে কতক বর্ণনা প্রাধান্য পায় আবার অন্যদের কাছে অন্য বর্ণনা প্রাধান্য পায়। কোন এক দলের কাছে এক ধরনের বর্ণনা প্রাধান্য পায়, তাদের কাছে সে হুকুমটি বিপরিত বাকী সব বর্ণনা প্রাধান্য পায় না, বরং অন্য বর্ণনা যেগুলো তাদের কাছে প্রধান্য পায়নি সে বর্ণনা ব্যাখ্যার যোগ্য।

ইমামগণের মতানৈক্যের ব্যাপারে লিখিত কিতাব সমূহ, যেমন, শারানী রহ. কর্তৃক মীযান। কিতাবুল মুগনী, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, কাশফুল গুম্মাহ এ ধরণের কিতাবসমূহ যারা মুতালাআ করেছে তারা এ বিষয় সম্পর্কে অবগত যে, ইমামগণের সবকিছুর ভিত্তি নবুওয়াতের চেরাগ (অর্থাৎ হাদীস) থেকে গৃহীত। শুধু মাত্র ইল্লাত (কারণ) ও মাসায়েলের ইস্তিখরাজের (মাসয়ালা নির্গত করার নীতির) পার্থক্য হয়। উদাহরণ হিসাবে বিদায়াতুল মুজতাহিদ নামক কিতাবের একটি পরিচ্ছেদ, সার সংক্ষেপ উল্লেখ করছি। যদ্বারা এটা স্পষ্ট হবে যে, আয়াত ও হাদীসই হল, ইমামগণের বর্ণনার উৎস স্থল। তবে মাসয়ালা নির্গত করার নীতিমালার পদ্ধতি ভিন্ন।

ইবনে রুশদ রহ. বলেন, ওযু ভঙ্গের ব্যাপারে মূল হল আল্লাহ তাআলার বাণী (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَقْرَبُواْ الصَّلاَةَ وَأَنتُمْ سُكَارَى حَتَّى تَعْلَمُواْ مَا تَقُولُونَ وَلاَ جُنُبًا إِلاَّ عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّى تَغْتَسِلُواْ وَإِن كُنتُم مَّرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِّنَ الْغَابِطِ أَوْ لَمَسْتُمُ النِّسَاء ) (সূরা নিসা, আয়াত-৪৩)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, لا يقبل الله صَلَوةً مَّنْ أَحْدَثَ حَتَّى يَتَوَضَّأَ অর্থাৎ কেউ অপবিত্র হলে সে পবিত্র হওয়ার আগ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তার নামাজ কবুল করেন না।৯৮ এ হাদীস দ্বারা পেশাব পায়খানা, বায়ু, মযী ও ওদী দ্বারা ওযু ভেঙ্গে যাওয়ার ব্যাপারে সকল ইমাম একমত। এ সম্পর্কে আরো সাতটি মাসাআলা যা কায়দায়ে কুল্লির (মূলনীতি) পর্যায়ে রয়েছে সেগুলোতে মতানৈক্য রয়েছে।

প্রথমতঃ ওই সকল বস্তু যা পায়খানা-পেশাবের পথ ছাড়া অন্য কোন পথ দিয়ে বের হয়। এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম তিনটি মত রয়েছে। যারা উপরোক্ত আয়াতে নাপাক বের হওয়াকে ওযু ভঙ্গের কারণ সাব্যস্ত করেছেন। তাদের মতে শরীরের যে কোন স্থান থেকেই নাপাক বের হোক তা ওযু ভেঙ্গে দিবে। কারণ ওযু ভঙ্গের কারণ পাওয়া গেছে। এরা হলে ইমাম আবু হানীফা ও তার অনুসারীরা, ইমাম সাওরী, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.। এক দল সাহাবীও উক্ত মত পোষণ করেন। তাদের আছার এ মতের একটা দলীল। তাদের মতে যে কোন নাপাকী শরীরের যে কোন স্থান থেকে বের হোক না কেন তা ওযু ভেঙ্গে দিবে। যেমন, রক্ত, নাকসীর, (নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়া) বমী ইত্যাদি।

দ্বিতীয় মত হল, অন্যান্য ইমামগণের মত। তারা উল্লেখিত আয়াতে ওযু ভঙ্গের কারণ সাব্যস্ত করেছেন, সামনে ও পিছনের পথ দিয়ে কিছু বের হলে। তাদের মতে এ দুই পথ দিয়ে যা কিছু বের হোক না কেন, চাই রক্ত বা পাথর আর সুস্থ অবস্থায় বের হোক বা অসুস্থ অবস্থায় সব ওযু ভঙ্গের কারণ হবে। আর এ দুই পথ ভিন্ন অন্য কোথাও দিয়ে কোন কিছু বের হলে এদের মতে ওযু ভঙ্গের কারণ হবে না। এরা হলেন, ইমাম শাফেয়ী রহ. ও তাঁর অনুসারীগণ।

তৃতীয় দল হল, যারা বের হওয়া ও বের হওয়ার স্থান উভয়টির প্রতি লক্ষ্য রেখেছেন, তারা বলেন, এ দুই পথ দিয়ে যে স্বাভাবিক বস্তু বের হয় যেমন, পেশাব, মযী ইত্যাদি তা দ্বারা ওযু নষ্ট হয়ে যাবে। আর যে বস্তু স্বাভাবিক নয়, যেমন, পোকা, রক্ত ইত্যাদি তা দ্বারা ওযু নষ্ট হবে না। এ মত পোষণ করেন ইমাম মালেক ও তার অনুসারীগণ। এ আয়াত দ্বারাই চার ইমাম দলীল পেশ করেন ও মাসআলা বের করেন। কিন্তু ওযু ভঙ্গের কারণের ক্ষেত্রে যেহেতু ইমামগণের মতানৈক্য রয়েছে, সেহেতু হুকুমের ক্ষেত্রেও মতানৈক্য হয়েছে। আর এ ভিত্তিতেই বাণী ও বর্ণনার ক্ষেত্রে মতানৈক্য হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মতে আয়াতে যদিও দুই পথ থেকে যা বের হবে তা খাছ কিন্তু এটা একটি উদাহরণ আর তার হুকুম ব্যাপক। এই জন্য যে মহিলার ঋতু স্রাব ছাড়া রক্ত বের হচ্ছে এবং এ ধরণের ব্যক্তিদের জন্য সকল বর্ণনায় ওযুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো দ্বারা এই হযরতগণ সমর্থন গ্রহণ করেন। আর ইমাম মালেক রহ. এর মতে যেহেতু এ হুকুমটি খাছ ছিলো সেহেতু মুস্তাহাযা (হায়েয ছাড়াও যদি লজ্জা স্থান থেকে রক্ত বের হয় তার) জন্য সকল বর্ণনায় ওযুর হুকুম রয়েছে। তিনি সেগুলোর ব্যাপারে আলোচনা করেছেন ও অতিরিক্ত ওযুকে অপ্রমাণিত ও অগ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন।

এমনিভাবে দ্বিতীয় মাসয়ালা ঘুম। এ ব্যাপারেও উলামা কেরামের তিনটি মত রয়েছে। কতকে যে কোন ঘুমকে ওযু ভঙ্গের কারণ সাব্যস্ত করেছেন। কতকে যে কোন ঘুমকে ওযু ভঙ্গের কারণ নয় হিসাবে সাব্যস্ত করেছেন। আর তৃতীয় এক দল উলামা কেরام ব্যাখ্যা করেছেন যে কয়েক ধরণের ঘুম ওযু নষ্ট করে দেয়। আর কয়েক ধরণের ঘুম নষ্ট করে না। এ মতানৈক্য এ জন্য হয়েছে যে, ঘুমের ব্যাপারে দুই ধরণের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। কিছু বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, ঘুম ওযু নষ্ট করে না। ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মায়মুনা রা. এর ঘরে তাশরীফ নিয়ে গেলেন ও আরাম করলেন, এমনকি আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘুম অবস্থায় নাক ডাকার আওয়াজ শুনেছি। অতঃপর তিনি উঠে নামায আদায় করলেন কিন্তু ওযু করলেন না।৯৯

এমনিভাবে অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, কতক সাহাবা মসজিদে বসে নামাযের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় তন্দ্রা যাচ্ছিলেন অতঃপর তাঁরা নামায আদায় করলেন।১০০ পক্ষান্তরে অন্যান্য বর্ণনা এর বিপরিত যেমন হযরত সফওয়ান ইবনে আসসাল রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন যে, পেশাব পায়খানা অথবা ঘুমের কারণে মোজা খোলার প্রয়োজন নেই। মাসাহ যথেষ্ট। অবশ্য জানাবাত অবস্থায় মাসাহ যথেষ্ট হবে না।১০১

এমনিভাবে আবু হুরায়রা রা. এর বর্ণনার ওযু ওই ব্যক্তির উপর ওয়াজিব যে শুয়ে ঘুমাবে ইত্যাদি।১০২ উলামা কেরাম উক্ত দু ধরণের বর্ণনার কারণে দুই পন্থা অবলম্বন করেছেন। কেহ কেহ কোন একটা বর্ণনাকে প্রাধান্য দেওয়াকে গ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রেও দুই ভাগ হয়ে গেছে। অর্থাৎ এক ভাগ প্রথম প্রকারের বর্ণনাগুলোকে প্রধান্য দিয়েছেন। আর তাঁরা এ প্রাধান্য দেওয়ার অনেকগুলো কারণ উল্লেখ করেছেন। তাঁরা দ্বিতীয় প্রকারের বর্ণনাসমূহ অপ্রাধান্য বলে সাব্যস্ত করেছেন। পক্ষান্তরে অন্যান্যরা এর বিপরীত মনে করেন। আর তৃতীয় দল উভয় প্রকারের হাদীসকে প্রাধান্য মনে করেছেন। বিশেষ কোন এক বর্ণনা প্রাধান্য দেওয়ার কোন কারণ তারা পান নি। তারা উভয়টির মাঝে সমন্বয় সাধন করেছেন ও ঘুমকে কয়েক ভাবে বিভক্ত করেছেন। অর্থাৎ এক প্রকারের ওযু নষ্ট করে আর অন্য প্রকার ওযু নষ্ট করে না।

এমনিভাবে তৃতীয় মাসআলা হলো লজ্জাস্থান স্পর্শ করলে ওযু নষ্ট হয়ে যাওয়া। এক জামাত উলামা কেরামের মত হল, কোন অন্তরায় ছাড়া সরাসরি হাত দ্বারা লজ্জাস্থান স্পর্শ করলে ওযু নষ্ট হয়ে যায়। অন্য দলের বিশ্লেষণ উক্ত হুকুম শর্ত ছাড়া নয় বরং এর সাথে সাধ উপভোগের শর্ত রয়েছে। অর্থাৎ যদি কাম উদ্দিপনার সাথে স্পর্শ করে তাহলে ওযু নষ্ট হয়ে যায় অন্যথায় নয়। তৃতীয় দলের তাহকীক অনুযায়ী হাত দ্বারা স্পর্শ করার কারণে ওযু নষ্ট হয় না। সাহাবা কেরাম রা. এর মাঝেও এই বিষয় নিয়ে মতানৈক্য ছিল এ কারণে ই সাহাবা ও তাবেঈনদের মাঝে তিনটি মতানৈক্য হয়েছে।

ইমামগণের মধ্যে প্রথম মত ইমাম শাফেয়ী রহ. এর। দ্বিতীয় মত হযরত ইমাম মালেক রহ. এর। তৃতীয় মত হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. এর। আর ইমামগণের মতানৈক্যের মূল কারণ হল, لَمَسَ শব্দের মুশতারাক অর্থ (একাধিক অর্থ)। পবিত্র কুরআনে أَوْ لَا مَسْتُمُ النِّسَاءَ বর্ণিত হয়েছে। আরবী ভাষায় لَمَسَ শব্দটি দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়। সঙ্গম অর্থে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে হাত দ্বারা স্পর্শ করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। এ অর্থের ভিত্তিতেই ইমামগণের মাঝে মতানৈক্য হয়েছে। এক দলের মতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল সহবাস বা সঙ্গম। তাই তাদের মতে উক্ত আয়াত ওযু ভঙ্গকারী কারণ সমূহের অন্তর্ভূক্ত করবে না। আর এটাই হল ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মত। অন্যদের মতে এ আয়াতের উদ্দেশ্য হল স্পর্শ করা সুতরাং তাদের মতে এ আয়াত ওযু ভঙ্গকারী কারণসমূহের একটি। তবে এদের মতে এ হুকুমটি ব্যাপক নাকি শর্তযুক্ত। শাফেয়ীদের মতে ব্যাপক কোন শর্তযুক্ত নয়। এ জন্য তাদের মতে এটা দ্বারা অর্থাৎ স্পর্শ করার দ্বারা ওযু নষ্ট হয়ে যাবে। ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মতে এটা শর্তযুক্ত। আর সে শর্ত হল কামোদ্দিপনার সাথে স্পর্শ করা। তাদের মতে এ বিষয়ের প্রতি অনেক আছার (বাণী) ও আলামত রয়েছে। সে সকল আছার (বাণী) ও আলামতের ভিত্তিতেই তাঁরা উক্ত আয়াতের অর্থ নির্দিষ্ট করেন। উদাহরণ স্বরুপ ইমাম আবু হানীফা রহ. ও ইমাম মালেক রহ. এর মতে অন্যান্য অনেকগুলি আলামতের মধ্যে এটাও একটি আলামত যে হযরত আয়েশা রা. থেকে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেখানে বিভিন্ন পন্থায় এ বিষয় প্রমাণিত রয়েছে যে অনেক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত নামায অবস্থায় অথবা স্বাভাবিক অবস্থায় হযরত আয়েশা রা. এর গায়ে লেগে যেতো আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা থেকে নিষেধ করতেন না। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্ধকারে তাহাজ্জুদ নামায আদায় করছিলেন সে যুগে চেরাগ বাতীর নিয়ম ছিলো না হযরত আয়েশা রা. কাছে ঘুমিয়ে ছিলেন সেজদায় যাওয়ার সময় হযরত আয়েশা রা. এর পা সামনে ছিলো তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযরত অবস্থায় পা সরিয়ে দিলেন।১০৩

এর দ্বারা বুঝা গেল শুধু স্পর্শ করলে ওযু নষ্ট হয় না। আর হানাফী অনুসারীদের মতে হুকুমটা ব্যাপক কোনভাবেই স্পর্শ করলে ওযু নষ্ট হবে না। মালেকী অনুসারীদের মতে কামোদ্দিপনা ছাড়া স্পর্শ করলে ওযু নষ্ট হবে না।

অন্য হাদীসে হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কখনো কোন স্ত্রীকে আদর করতেন এরপর নতুন ওযু করা ছাড়াই নামায আদায় করতেন। ১০৪ এই স্পর্শ করা অবশ্যই কামোদ্দিপনাসহ হয়েছিলো। কেননা, স্ত্রীদেরকে আদর করা সাধারণতঃ কামোদ্দিপনা ছাড়া হয় না, ইত্যাদি ইত্যাদি। মোটকথা, ইমামগণের মাঝে যে মতানৈক্য তা মূলত হাদীসের ভিন্নতার উপর নির্ভরশীল। যে বিষয়ে আমি ইতিপূর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে এসেছি। এগুলো ছাড়া কোন বর্ণনাকে প্রধান্য দেওয়ার কারণসমূহ ভিন্ন হওয়া অতিরিক্ত বিষয়।

সারাংশঃ ইমামগণের মতানৈক্যের অন্যতম বড় কারণ হল হাদীসের বর্ণনা যাচাই বাছায়ের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ দুর্বলতার বিভিন্ন কারণের ভিত্তিতে একটি বর্ণনাকে এক ইমাম বিশ্লেষণে সত্য প্রমাণিত করেছেন। তার মতে সেই বর্ণনা অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব। আর তা থেকে যে হুকুম প্রমাণিত হবে তার উপর আমল করা ওয়াজিব।

আবার অন্য ইমামের নিকট সত্যতার মাপকাঠিতে সেই বর্ণনা পূর্ণতায় পৌছে নাই এ কারণে সেই ইমাম সাহেবের কাছে উক্ত বর্ণনার ভিত্তিতে ঐ বর্ণনা দ্বারা কোন মাসয়ালা প্রমাণিত করা সম্ভব নয়। বাস্তবে এই মতানৈক্য যথাস্থানে ঠিক রয়েছে। বাহ্যত বিবেক বুদ্ধি বা যুক্তিও এটাকে মেনে নেয়। কেননা, হাদীস শুদ্ধ অশুদ্ধ হওয়ার ভিত্তিই হল হাদীস বর্ণনাকারীর অবস্থা আর বর্ণনাফীদের অবস্থার ক্ষেত্রে যখন মতানৈক্য হয় তখন তাদের থেকে বর্ণিত হাদীসের উপর আমল করার ক্ষেত্রেও মতানৈক্য হওয়া নিশ্চিত। এর উদাহরণ ঐ অসুস্থ ব্যাক্তি। যে কয়েকজন ডাক্তারের চিকিৎসায় রয়েছে। তন্মেধ্যে এক চিকিৎসকের মতে তার অসুস্থতা খুবই মারাত্মক। দ্বিতীয় ডাক্তারের মতে স্বাভাবিক রোগ অর্থাৎ মারাত্মক কোন রোগ নয়। তৃতীয় এক ডাক্তারের মতে অসুস্থতার ধারণাই তার অসুস্থতার কারণ, অন্যথায় সে সুস্থ।

এমনিভাবে একজন বর্ণনাকারী গবেষকের কাছে অগ্রহণযোগ্য ও নিন্দিত। পক্ষান্তরে অন্যজনের কাছে দ্বীনদার ও সত্যবাদী। এমতাবস্থায় যেমনিভাবে চিকিৎসকদের উপর আক্রমণ করা যাবে না তেমনিভাবে ইমামগণ কাউকে দোষারুপ বা কাউকে সত্যাবাদী আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রেও তাদের উপর কোন আপত্তি করা যাবে না। বরং চিকিৎসকদের মতো বলা হবে হাদীস ও শরীয়তের অনুসারীদেরকে বলা হবে যে, তোমার দৃষ্টিতে যার বিশ্লেষণ ও তাহকীক ভালো লাগে এবং যার উপর তোমার আস্থা বেশী হয় তুমি তারই অনুসরণ কর তাহলে আল্লাহ তাআলা সাহায্য করবেন। সকল পথ্য একত্রিত করে মাজন হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।

হাদীসের ইমামগণ স্পষ্টভাষায় বলেছেন যে, হাদীস যাচাইকারীদের উদাহরণ হল, স্বর্ণ রুপা পরীক্ষকদের ন্যয়। স্বর্ণ রুপা দেখেই বুঝা যায় যে, এটা খাটি নাকি ভেজাল।

হাফেজ ইবনে হাজর রহ. শরহে নুখবাতুল ফিকার নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, উলূমে হাদীসের মধ্যে সবচেয়ে জটিল বিষয় হল, মুআল্লাল (হাদীসের দোষত্রুটি) এর আলোচনা। এতে দক্ষ ঐ ব্যক্তিই হতে পারে যাকে আল্লাহ তাআলা দোষ বুঝার শক্তি ও ভাল মুখস্ত শক্তি দান করেছেন এবং বর্ণনাকারীদের স্তর ও মর্যাদার পরিচয় এবং সনদ ও মতনের ব্যাপারে দৃঢ় যোগ্যতা রয়েছে। এ কারণে হাদীসের ইমামগণের মধ্যে থেকে খুবই কম সংখ্যক লোক এ ব্যাপারে কথা বলেছেন। যেমন আলী ইবনুল মাদানী রহ., ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ., ইমাম বুখারী রহ., ইমাম দারাকুতনী রহ., প্রমূখ ইমামগণ। এরপর তিনি বলেছেন যে, হাদীসের দোষ বর্ণণাকারীগণ অনেক সময় দাবীর স্বপক্ষে দলীল প্রমাণ পেশ করতে অক্ষম হয়। যেমন স্বর্ণ-রুপা পরীক্ষকগণ স্বর্ণ-রুপা যাচাই করতে যেয়ে ভেজালের দলীল পেশ করতে অক্ষম হয়।

এমনিভাবে আল্লামা সুয়ূতী রহ. 'তাদরীবুর রাবী' নামক কিতাবে লেখেন, হাদীসের প্রকার থেকে আঠার প্রকার মুআল্লাল (দোষযুক্ত)। আর এই প্রকারটি সমস্ত প্রকারের মধ্যে খুব সুক্ষ্ম ও তীক্ষ্ম এবং বিশেষ প্রকারের ভুল মনে করা হয়। এ বিষয়ে কেবল ঐ সব ব্যক্তিগণই ধরতে পারেন যাদের রয়েছে মুখস্ত শক্তি ও পূর্ণ যাচাই করার যোগ্যতা। হাকেম রহ. বলেন, অনেক সময় হাদীস মুআল্লাল (দোষযুক্ত) হয়ে যায় বাহ্যত তাতে কোন দোষ বুঝা যায় না। তালীলের (দোষ নির্ণয় করার) দলীলের ক্ষেত্রে আমাদের কাছে মুখস্ত শক্তি ও বুঝ শক্তি এবং হাদীস সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ছাড়া আর কিছু নেই। ইবনে মাহদী রহ. বলেন নতুন দশটি হাদীস অর্জন করার চেয়ে একটি হাদীসের দোষ জানা উত্তম।১০৫ (তবে এটা সাধারণ মানুষের জন্য নয়)

আল্লামা নববী রহ. বলেন যে, হাদীসের ইল্লত (দোষ) ঐ সুক্ষ্ম ত্রুটিকে বলে যা অস্পষ্ট, বাহ্যিক হাদীসে কোন ত্রুটি থাকে না। কিন্তু বাস্তবে তাতে গোপনীয়ভাবে ত্রুটি রয়েছে। কখনো বর্ণনাকারী একক হয়ে যাওয়া আবার কখনো অন্যান্য বর্ণনাকারীদের বিরোধিতা করার কারণে জানা যায়। আবার কখনো অন্যান্য কারণও এর সাথে মিলে যায়। যেগুলো বিষেশজ্ঞগণ জানতে পারেন। ইবনে মাহদী রহ. এর কাছে কেহ জিজ্ঞাসা করল আপনি কোনো হাদীসকে মুআল্লাল (দোষযুক্ত) আবার কোনো হাদীসকে সহীহ বলেছেন। এটা আপনি কিভাবে জানেন? উত্তরে তিনি বললেন, যদি তুমি মুদ্রা যাচাইকারীর কাছে কিছু দিরহাম নিয়ে যাও আর সে কিছু দিরহামকে খাদযুক্ত আর কিছু দিরহামকে উন্নত ও ভাল বলে তাহলে কি তুমি তার কাছে জিজ্ঞাসা করো যে, কোন দলীলের ভিত্তিতে আপনি এটা জানতে পারলেন? বাস্তবে হল হাদীসের সাথে অধিক সম্পর্ক এবং সর্বাবস্থায় যাচাই বাছাই করার দ্বারা এই যোগ্যতা সৃষ্টি হয়।

আবু যারআ রহ. এর কাছে কেউ জিজ্ঞসা করল যে, আপনি কোনো কোনো হাদীসকে ত্রুটিযুক্ত বলে দেন এর দলীল কি? উত্তরে তিনি বললেন, আমার কাছে কোন হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো যদি আমি সেটাকে ক্রুটিযুক্ত বলেদেই। তাহলে তুমি ইবনে দারাহ এর কাছে এরপর আবু হাতিমের কাছে জিজ্ঞাসা কর যদি তারা সকলে একই উত্তর দেয় তাহলে বুঝে নিও। লোকে এটা যাচাই করলো ঠিক সেরুপই পেল।

এ ধরণের বিভিন্ন কথা একত্রিত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। ইলমে হাদীসের সাথে যারা সম্পর্ক রাখে তারা সবাই এটা ভালো করে জানেন। আমার উদ্দেশ্য ছিলো এ বিষয়টি স্পষ্ট করা যে, ইমামগণের মতানৈক্য হাদীস ও আছার (সাহাবাদের বাণী) বর্ণনার ভিন্নতার কারণে হতো। যা পূর্বের একাধিক আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে। এর সাথে সাথে হাদীস ও আছারের শুদ্ধতা ও দুর্বলতার দিক থেকে বিভিন্ন পার্থক্য হয়। সাধারণ মানুষতো দূরের কথা, অনেক নামধারী জ্ঞানীরাও এ ব্যাপারে ধোঁকায় পড়ে রয়েছেন যে, ইমামগণের মতানৈক্য মনে হয় তাদের পরস্পরের বিরোধীতার কারণে হয়েছে। আসল বিষয়টি এমন নয় যে, ইমামগণ দলীল প্রমাণ ছাড়া নিজেদের মনগড়া ইজতিহাদ থেকে কিছু বলে দিয়েছেন। বরং উদ্দেশ্য হল, ইমামগণের সকল বিষয় হাদীসে নববী থেকে সংগৃহিত। তবে সংগ্রহ ও ইস্তিম্বাতের (মাসয়ালার নির্গত করার) পদ্ধতি ভিন্ন ছিলো।

মোটকথা ইমামগণের মতানৈক্যের অন্যতম কারণ হল, ওই সব হাদীস যেগুলোতে মাসয়ালা বর্ণনা করা হয়েছে। কোন ইমামের কাছে কোন একটি হাদীসের মাসয়ালা গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে আর অন্য ইমামের নিকট উক্ত হাদীসের বিপরিত কোন হাদীসের বর্ণনাকে সহীহ ও অধিক গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। আর যখন ইমামগণ হাদীসে বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা নির্ণয় করার ক্ষেত্রে ডাক্তার ও মুদ্রা যাচাইকারীদের মতো। আর ইমামগণের কাজই হল, বর্ণনাসমূহের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা নির্ণয় করা। সুতরাং ইমামগণের কাছে এ কথা জিজ্ঞাসা করা যে, ওমুক বর্ণনা গ্রহণযোগ্য আর ওমুক বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য কেন? এটা বড় আহমকি ও নির্বুদ্ধিতার আলামত। এজন্য তেরশ বছর পর একথা নিশ্চিত নয় যে, ইমামগণের নিকট বর্ণনা সমূহ ওই সনদে পৌছেছে যা আমাদের সামনে রয়েছে। আর এটাও নিশ্চিত নয় যে, আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনার ত্রুটিসমূহ তাদের কাছেও ছিল অথবা ইমাম বুখারী ও মুসলিম উল্লেখ করে দিয়েছেন। বিশেষ করে চার ইমামের স্তর, মর্যাদা ও যমানা সবকিছু ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহ) এর থেকে অগ্রগামী। আর তারা যখন অগ্রগামী তখন তাদের পরবর্তী ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিযী, ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ) দের সম্পর্কে কি বলার আছে। এরপর তাদের ও পরবর্তী ইমাম দারাকুতনী, ইমাম বায়হাকী (রহ) সহ অন্যান্যদের অবস্থা ইমামগণের সামনে আলোচনা করা কতটুকু যোগ্য? এ কারণেই উপরোক্ত সকল ব্যক্তিবর্গ নিজেদেরে উচু মর্যদা থাকা ও হাদীসের ক্ষেত্রে বিশেষ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও কোন ইমামের অনুসরণ করা ছাড়া কোন উপায় ছিলো না। আর থাকার কথাও ছিলো না। কেননা, হাদীসের শব্দ মুখস্ত করা ও হাদীসের সনদ মুখস্ত করা এক বিষয় আর হাদীস থেকে মাসয়ালা বের করা ও ফিকহী দৃষ্টিতে সে অনুযায়ী আমল করা ভিন্ন বিষয়।

টিকাঃ
৯۲. বুখারী, হাদীস নং- ৫৭৫৭, মুসলিম, হাদীস নং- ৫৭৮৯, আবূ দাউদ, হাদীস নং- ৩৫৩৭, ৩৫৩৯।
৯৩. বুখারী, হাদীস নং- ৫৭০৭.
৯৪. তিরমিযী, হাদীস নং ৮৯, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৪৮৫.
৯৫. তিরমিযী, হাদীস নং- ২৪৭.
৯৬. আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৬১০, তিরমিযী, হাদীস নং ১৩৪২, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২৩৬৮.
۹۷. বুখারী, হাদীস নং ২৫১৪, মুসলিম, হাদীস নং ৩৬১৯, তিরমিযী, হাদীস নং ১৩৪১, নাসায়ী, হাদীস নং ৫৪২৭, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২৩২১.
৯৮. বুখারী, হাদীস নং ১৩৫, মুসলিম, হাদীস নং ৫০৭.
৯৯. বুখারী, হাদীস নং ১১৭, আবু দাউদ, হাদীস নং-১৩৫৭.
১০০. আবু দাউদ, হাদীস নং ২০০.
১০۱. তিরমিযী, হাদীস নং ৯৬, নাসায়ী, হাদীস নং ১৫৯, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪৭৮.
۱۰۲. আবু দাউদ, হাদীস নং ২০২,
১০৩. বুখারী, হাদীস নং ৩৮২, মুসলিম, হাদীস নং ১১৪৫, আবু দাউদ, হাদীস নং ৭১৩, নাসায়ী, হাদীস নং ১৬৮.
১০৪. নাসায়ী, হাদীস নং ১৭০.
১০৫. তাদরীবুর রাবী-১/১৩৫

📘 ইমামগণের মতবিরোধ কি ও কেন > 📄 দ্বিতীয় কারণ : বিপরিতমুখী বর্ণনার মাঝে প্রাধান্য দেওয়ার মূলনীতিসমূহে মতানৈক্য

📄 দ্বিতীয় কারণ : বিপরিতমুখী বর্ণনার মাঝে প্রাধান্য দেওয়ার মূলনীতিসমূহে মতানৈক্য


ইমামগণের মাঝে দ্বিতীয় মতানৈক্য হয়েছে বিপরীতমুখী বর্ণনার মাঝে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ সমূহে। যদিও এর আলোচনা সংক্ষিপ্ত আকারে পূর্বে চলে এসেছে। তারপরও বাস্তবে যেহেতু এটাই ইমামগণের মাঝে মতানৈক্যের অন্যতম বড় একটি কারণ সেহেতু এ বিষয়ে পৃথকভাবে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করাও প্রয়োজন মনে করছি। ইমামগণের মাঝে একাধিক বর্ণনাকে সহীহ মেনে নিয়ে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ সমূহের মাঝে ও মতানৈক্য হয়েছে অর্থাৎ ভিন্ন দুই বিষয়ের মাঝে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ কি হতে পারে। এর বর্ণনাও অনেক দীর্ঘ। আর চার ইমামের কিতাব অধ্যয়ন করার দ্বারা এর বিস্তারিত হাকীকত স্পষ্ট হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি,

সুফিয়ান ইবনে উয়ায়নাহ রহ. বলেন, এক বার এক বাজারে আবু হানীফা ও আওযায়ী রহ. এর কথা হল, ইমাম আওযায়ী রহ. ইমাম আবু হানীফা এর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা রুকুতে যাওয়া ও রুকু থেকে উঠার সময় কেন হাত উঠান না? ইমাম আবু হানীফা রহ. উত্তরে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত এর প্রমাণ সহীহভাবে প্রমাণিত না। আওযায়ী রহ, তিনি যুহরী, তিনি সালেম থেকে, তিনি ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায শুরু করার সময়, রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে উঠার সময় হাত উঠাতেন। ইমাম আওযায়ী রহ. এর উত্তরে ইমাম আবু হানীফা রহ. একটি হাদীস শুনিয়ে দিলেন যে, হাম্মাদ তিনি, ইবরাহীম থেকে, তিনি আলকুমা ও আসওয়াদ থেকে তাঁরা উভয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নামায আদায় করতেন তখন শুধু তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত উঠাতেন।' এর উত্তরে আওযায়ী রহ. বললেন, আমি যে সনদে হাদীসটি বর্ণনা করলাম অর্থাৎ যুহরী, তিনি সালেম থেকে তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে এ সনদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত তিনটি মাধ্যম মাত্র। আর আপনি সনদ বর্ণনা করলেন, অর্থাৎ হাম্মাদ থেকে, তিনি ইবরাহীম থেকে, তিনি আলকুমা ও আসওয়াদ থেকে, তাঁরা দুইজন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে, এ সনদে মাধ্যম চার জন। তখন ইমাম আবু হানীফা রহ. বললেন, হাম্মাদ মুহরী থেকে বেশী ফকীহ ছিলেন। আর ইবরাহীম সালেম থেকে বেশী ফকীহ ছিলেন। আলকুমাহও ইবনে উমর রা. থেকে নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে কম গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। তবে ইবনে উমার রা. সাহাবী হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন আলকুমারও অন্যান্য অনেক ফযীলত রয়েছে। আর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের রা. কথা তো বাদই দিলাম। এরপর আওযায়ী রহ. চুপ হয়ে গেলেন। ১০৬

ইবনে আরাবী রহ. তিরমিযীর শরাহে লেখেন, যদি কখনো ইবনে উমার ও ইবনে মাসউদ (রা.) এর মাঝে কোন বিষয়ে দ্বন্দ হয় তাহলে ইবনে মাসউদ রা. কে প্রাধান্য দিতে হবে।

উক্ত বিতর্ক উল্লেখ করার দ্বারা আমার উদ্দেশ্য হলো উক্ত ইমাম দ্বয়ের প্রাধান্য দেওয়ার কারণ সমূহ বর্ণনা করা। কেননা আওযায়ী রহ. ও অন্যান্য শাফেয়ীদের মতে কম মাধ্যম বিশিষ্ট সনদ প্রাধান্য পাওয়ার ও যোগ্য অগ্রগণ্য। আর ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মতে বর্ণনাকারী ফকীহ হওয়ার দ্বারা প্রাধান্য পায়। আর হানাফীদের মতে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ সমূহ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটাও যে, যখন একাধিক বর্ণনার মাঝে দ্বন্দ হয় তখন ফকীহ বর্ণনাকারীর বর্ণনাকে তাঁরা প্রাধান্য দেয়। বিষয়টি যুক্তিযুক্তও। কেননা মানুষ যত বুঝমান হবে কথা তত পরিপূর্ণ ভাবে বর্ণনা করতে পারবে। এমনিভাবে ইমাম মালেক রহ. এর মতে মদিনাবাসীরা যদি কোন বর্ণনা অনুযায়ী আমল করে তাহলে তা প্রাধান্য পাওয়ার কারণ হবে। অর্থাৎ যদি কখনো দুই বর্ণনার মাঝে দ্বন্দ হয় তাহলে যেই বর্ণনা অনুযায়ী মদীনাবাসীরা আমল করে আসছে সেই বর্ণনাকে তাঁরা প্রাধান্য দেয়। 'মুওয়াত্তা ইমাম মালেক' যা দেখলে স্পষ্ট হয়ে যায়। ইবনে আরাবী মালেকী রহ. তিরমিযীর ব্যাখ্যা গ্রন্থে লেখেন যে, ইমাম মালেক রহ. এর নীতি হলো যখন কোন হাদীস মদীনাবাসীদের মাঝে প্রসিদ্ধ হয়ে যায় তখন তা যাচাই এর উর্ধ্বে উঠে যায়।

যে সকল কারণে একাধিক হাদীসের মাঝে কোন একটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, সেগুলো অনেক বেশী। হাযেমী রহ. 'কিতাবুল নাসেখ ওয়াল মানসুখ' এ এমন ৫০টি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলো দ্বারা দ্বন্দপূর্ণ দুই হাদীসের মাঝে কোন একটিকে অন্যটির উপর প্রাধান্য দেওয়া যায়।

আর ইরাকী রহ. 'কিতাবুন নুকাত' এ ১০০ টির চেয়েও বেশী কারণ উল্লেখ করেছেন। এগুলো সবগুলোর ব্যাপারে ঐক্যমত নেই। হাদীস অনুযায়ী আমল কারীদের জন্য এটা আবশ্যক যে, সে সবগুলোর তাহকীক করার পর এটা দেখা যে, কোন হাদীসে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ বেশী পাওয়া যায়। যাতে করে সে অন্যান্য দ্বন্দপূর্ণ হাদীসের উপর এটাকে প্রাধান্য দিতে পারে। এ জন্য হানাফীগণ ঐ সকল হাদীসকেও প্রাধান্য দেন যেগুলোর সনদ শক্তিশালী বা উঁচু স্তরের। আর এগুলোর কারণে প্রাধান্য পাবে না কেন? কেননা এর চেয়েও প্রাধান্য দেওয়ার শক্তিশালী কারণ পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ হানাফীদের মতে প্রাধান্য দেওয়ার শক্তিশালী অন্যতম কারণ হলো কোন হাদীসের বিষয়বস্তু কুরআনের শব্দের অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া। আর এটা খুবই স্পষ্ট বিষয়। কেননা হাদীসের শব্দ সমূহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শব্দ হওয়া নিশ্চিত নয়।

রাবীদের কর্তৃক অর্থ ঠিক রেখে ভিন্ন শব্দে বর্ণনা করার আলোচনা পূর্বে চলে গেছে। পক্ষান্তরে কুরআনের শব্দ সমূহ হুবহু বর্ণিত হওয়া নিশ্চিত। এজন্য বিভিন্ন হাদীসের বিষয় বস্তুর মাঝে যে বিষয় বস্তু কুরআনের শব্দের বেশী নিকটবর্তী বুঝা যাবে উহা প্রাধান্যশীল হওয়া নিশ্চিত ও স্পষ্ট কথা। এ কারণে হানাফীগণ রাফে'ইয়াদাইন (নামাজে হাত উঠানো) সম্পর্কে বর্ণনাসমূহের মাঝে ঐ সকল বর্ণনাকে প্রাধান্য দেন যেগুলো রাফে'ইয়াদাইন (নামাজে হাত উঠানো) বুঝায় না। কেননা কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, وَقُوْمُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ

এই আয়াতের শব্দের অর্থ হলো চুপ স্থীর হয়ে নামাজ পড়া। এই ভিত্তিতে এমন যত বর্ণনা রয়েছে যেগুলোর কোন একটিতে স্থীরতার কাছাকাছি পাওয়া যাবে সেই বর্ণনাটি হানাফীদের মতে প্রাধান্য পাবে। বিভিন্ন ঘটনা দ্বারাও এটার সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন প্রথম দিকে নামাজে অনেক আমল যেমন কথা বলা, আলাপ করা, ইত্যাদি সর্বসম্মতিক্রমে জায়েয ছিল।

পরবর্তীতে ধীরে ধীরে স্থীরতার দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। এজন্য যে কোন দ্বন্দপূর্ণ দুই বর্ণনা থেকে যে বর্ণনাটি স্থীরতার কাছাকাছি হবে সেই বর্ণনাটিই হানাফীদের মতে প্রাধান্য পাবে। আর এজন্যই হানাফীদের মতে ইমামের পিছনে ক্বেরাত পড়া সম্পর্কে দ্বন্দপূর্ণ বর্ণনার ঐ সকল বর্ণনাকে প্রাধান্যযোগ্য যেগুলো ক্বেরাত পাঠ না করা সম্পর্কে বুঝায়। কেননা وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا

অর্থাৎ আর যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তাতে কান লাগিয়ে রাখ এবং নিশ্চুপ থাক।১০৭ এই আয়াতের অধিক নিকটতম। এজন্য হানাফীদের মতে ফজর ও আছরের নামাজ বিলম্ব করে আদায় করা উত্তম। PM কেননা قَبْلَ طُلُوعِ الْشَمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا অর্থাৎ সূর্য উদয়ের পূর্বে ও সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে। এই আয়াতের অধিক নিকটতম। এজন্য যে, সূর্য উদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে কেবল ঐ সময়কেই বলা হবে যখন তা নিকটবর্তী হবে। কেননা সূর্যাস্তের তিন-চার ঘন্টা পূর্বে পৌছার ক্ষেত্রে কেউই বলে না যে, আমি সূর্য উদয়ের পূর্বে পৌছে যাব। এজন্যই হানাফীদের মতে বেতর নামাজে দো'আয়ে কুনূতে اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ দু'আকে প্রাধান্য দেয়। কেননা কুরআন শরীফে দুই সূরা পাঠ করার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের হাজারো উদাহরণ আছে দীর্ঘ হওয়ার আশংকায় সেগুলো উল্লেখ করছি না। কিন্তু হাদীস অনুযায়ী আমল করার জন্য বর্ণনার দুর্বলতার কারণ সমূহ এবং প্রাধান্য দেওয়ার কারণ সমূহ জানা একান্তই জরুরী। এটা ছাড়া বর্ণনা অনুযায়ী আমল সম্ভব নয়। আমি আমার ছাত্র জীবনে ইমামগণের উসূল জমা করা এবং প্রাধান্য দেওয়ার একাধিক কারণ একত্রিত করা শুরু করেছিলাম। কিন্তু সময়ের অভাবে পরিপূর্ণ করতে পারি নাই। والله الموفق

টিকাঃ
১০৬. ই'লাউস সুনান, কিতাবুল সালাত ৩/৭৫ (পাকিস্তান হতে প্রকাশীত)।
১০৭. সূরা আরাফ আয়াত নং-২০৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00