📄 পঞ্চম কারণ : হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে মাধ্যম অনেক হওয়া
হাদীস সমূহ বর্ণনার ক্ষেত্রে যত বেশী মাধ্যম হবে পূর্ববর্তী সকল কারণের ভিত্তিতে ততবেশী ভিন্নতা তৈরী হবে। আর এমনটি হওয়া আবশ্যক। সকলের সামনেই আসে সকলেই বুঝে যে, কোন দূতের মাধ্যমে কোন একটি কথা বলে পাঠালে যদি তাতে কয়েক মাধ্যম এসে যায় তাহলে তাতে ভিন্নতা আসা আবশ্যক। এ জন্য হাদীসের ইমামগণ বর্ণনা সমূহ থেকে কোন একটিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ হিসেবে উঁচু সনদ অর্থাৎ মাধ্যম কম হওয়া কে একটি বড় কারণ সাব্যস্ত করেছেন। যদি আল্লাহ তা'আলা কখনো সুযোগ দেন তাহলে তা যথাস্থানে পরবর্তীতে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করবো। এখানে শুধু সংক্ষিপ্ত আকারে এতটুকু ইশারা করা জরুরী যে, যুক্তিগত, বর্ণনাগত, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষভাবে বুঝা যায় যে, মাধ্যম অধিক হওয়া ভিন্নতার অন্যতম একটি কারণ। আর এটাই বর্ণনার ভিন্নতার বড় একটা কারণ। হানাফীদের মতে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর ফেকাহকে অন্যান্য ইমামগনের (ফকীহ ও মুহাদ্দিস) বর্ণনার উপর প্রাধান্য দেওয়ার অন্যান্য অনেক কারণ থেকে এটাও একটি কারণ। কেননা ইমাম আবূ হানীফা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে মাধ্যম খুব কম। স্পষ্ট হওয়ার উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রসিদ্ধ ইমামগনের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ ছক আকারে দেওয়া হলো:
| নাম | জন্ম | ইন্তেকাল | মোট বয়স |
|---|---|---|---|
| ইমাম আবূ হানীফা রহ. | ৮০ হিঃ | ১৫০ হিঃ | ৭০ বছর |
| ইমাম মালেক রহ. | ৯৫ হিঃ | ১৭৯ হিঃ | ৮৪ বছর |
| ইমাম শাফেয়ী রহ. | ১৫০ হিঃ | ২০৪ হিঃ | ৫৪ বছর |
| ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. | ১৬৪ হিঃ | ২৪১ হিঃ | ৭৭ বছর |
| ইমাম বুখারী রহ. | ১৯৪ হিঃ | ২৫৬ হিঃ | ৬২ বছর |
| ইমাম মুসলিম রহ. | ২০৪ হিঃ | ২৬১ হিঃ | ৫৭ বছর |
| ইমাম আবূ দাউদ রহ. | ২০২ হিঃ | ২৭৬ হিঃ | ৭৪ বছর |
| ইমাম তিরমিযি রহ. | ২০৯ হিঃ | ২৭৯ হিঃ | ৭০ বছর |
| ইমাম নাসাঈ রহ. | ২১৪ হিঃ | ৩০৩ হিঃ | ৮৯ বছর |
| ইমাম ইবনে মাজাহ রহ. | ২০৯ হিঃ | ২৭৩ হিঃ | ৬৪ বছর |
উক্ত ছক দ্বারা একথা খুব স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম রহ. এর পর্যন্ত বর্ণনা আসতে যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ হতে প্রায় ২০০ (দুইশত) বছর আতিবাহিত হয়ে গেছে সেহেতু অনেক মাধ্যম এসেগেছে। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালেক রহঃ এর বিপরীত। কেননা এ ক্ষেত্রে ১০০ (একশত) বছরের ও ব্যবধান হয় নি। মোটকথা মাধ্যম অধিক হওয়া বর্ণনার ভিন্নতার কারণ হয়ে থাকে। আর হাদীসের কিতাব সংকলন যেহেতু ব্যপকভাবে দ্বিতীয় শতাব্দি থেকে শুরু হয়েছে সেহেতু সে সময় পর্যন্ত বর্ণনাকারীদের অধিক মাধ্যম হওয়ায় বর্ণনার শব্দে অনেক ভিন্নতা এসে গেছে।
📄 ষষ্ঠ কারণ : সনদে কোন এক বর্ণনাকারী দুর্বল হওয়া
মাধ্যম অধিক হওয়ার ক্ষেত্রে কোন দূর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারী এসে যায়। কোন দূর্বল মেধা সম্পন্ন ব্যক্তি অথবা অন্য কোন প্রাসঙ্গিক কারণে যে কোন কিছু বর্ণনা করে দেয়। তাদের মধ্যে কতক এমন বর্ণনাকারী ছিলেন যে, যারা নিজ মেধাশক্তি অথবা কিতাবের উপর আস্থা রাখতো কিন্তু তাদের মাঝে কোন দূর্ঘটনায় এমন কিছু ঘটেছে, যার কারণে তারা বর্ণনার ক্ষেত্রে গন্ডগোল করে ফেলেছে। ভুল বর্ণনা করছে। এ জন্য মুহাদ্দিসগণ হাদীস অনুযায়ী আমল করার জন্য প্রত্যেক বর্ণনাকারী সম্পর্কে অবগত হওয়াকে খুবই জরুরী মনে করেন। আর এ কারণেই মুহাদ্দিসগণ সাধারণ ব্যক্তির জন্য হাদীস শুনেই সে অনুযায়ী আমল করতে নিষেধ করেছেন। শরহে আরবাঈনে নববীয়্যাহ তে আছে
'অর্থাৎ যে ব্যক্তি সুনানের কিতাবে থাকা কোন হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করতে চায় যেমন, আবূ দাউদ, তিরমিযি, নাসাঈ ইত্যাদি বিশেষ করে ইবনে মাজাহ, মুসান্নেফ ইবনে আবী শায়বা, মুসান্নেফ আব্দুর রাজ্জাক ও এ ধরনের ওই সকল কিতাব যেগুলোতে দূর্বল বর্ণনা অধিক পরিমানে রয়েছে। সে যদি আহ্ল অর্থাৎ সহীহ হাদীসকে গায়রে সহীহ হাদীস থেকে পৃথক করতে পারে এরপরও তার জন্য ওই সময় পর্যন্ত কোন হাদীসকে দলীল বানিয়ে নেওয়া জায়েয হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে এর সনদের তাহকীক ও বর্ণনাকারীদের অবস্থা যাচাই না করবে। আর যদি সে এ তাহকীকের উপযুক্ত না হয় তাহলে কোন ইমামের অনুস্বরন করা জরুরী। অন্যথায় তার জন্য দলীল দেওয়া জায়েয হবে না। যাতে সে কোন বাতেল পথে না পড়ে যায়।'
এই বিষয়বস্তু আমরা যথাস্থানে বিস্তারিতভাবে দেখিয়ে দিবো যে, সংখ্যাগরিষ্ট ফকীহ ও মুহাদ্দিস এব্যাপারে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, যে ব্যক্তির বর্ণনার শুদ্ধতা ও দূর্বলতা জানার যোগ্যতা নেই, রহিত ও রহিত না এ পার্থক্য করতে পারেনা ব্যাপক হুকুমকে খাছ হুকুম থেকে পৃথক করতে পারে না। তার জন্য হাদীস অনুযায়ী আমল করা জায়েয নেই। বাস্তবে এই বিষয়টি কোন ব্যাখ্যার কোন মুখাপেক্ষী নয়। এটা এতো স্পষ্ট বিষয় যে, যে ব্যক্তি সহীহকে দূর্বল থেকে পৃথক করতে সক্ষম নয় সে কিভাবে সে অনুযায়ী আমল করবে।
📄 সপ্তম কারণ : মিথ্যার ব্যপকতা হওয়া
খায়রুল কুরুন অতিবাহিত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী অনুযায়ী মিথ্যার প্রকাশ হয়েছে।৮৭ লোকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলা শুরু করে দিয়েছে। এজন্য মুহাদ্দিস উলামাগণ মাওযু হাদীসের একাধিক কিতাব লিখেছেন। সেই মিথ্যাবাদীদের মধ্য থেকে এমন কিছু লোকও ছিলো যারা নিজেদের উদ্দেশ্য প্রমাণিত করার উদ্দেশ্যে মনগড়া হাদীস বানিয়ে দিয়েছে। এটা এমন একটি কারণ যদ্বারা যতই বর্ণনার ভিন্নতা হোক না কেন তা কম-ই মনে হবে।
ইবনে লাহাইয়া এক ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করেন যে, কোন এক সময় খারেজীদের শায়েখ ছিলো পরবর্তীতে তার তওবা করার সুযোগ হয়েছিলো তখন তিনি নিম্মোক্ত এই উপদেশ দিয়েছিলেন যে, হাদীস অর্জন করার সময় এর বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে যাচাই করুন। কেননা আমরা যখন কোন কথা প্রচারের ইচ্ছা করতাম তখন তাকে হাদীস বলে চালিয়ে দিতাম। হাম্মাদ বিন সালামাহ রহ. এক রাফেযীর কথা বর্ণনা করেন যে, আমরা আমাদের বিভিন্ন মজলিসে যখন কোন বিষয় নির্ধারন করতাম তখন সেটাকে আমরা হাদীস বানিয়ে নিতাম। মাসীহ ইবনে জাহাম এক বেদআতীর কথা বর্ণনা করেন যে, যখন সে তওবা করে তখন সে কসম খেয়ে বলে আমরা অনেক বাতেল বর্ণনা তোমাদের থেকে বর্ণনা করি আর তোমাদের গোমরাহ করাকে আমরা সওয়াবের কাজ মনে করি ইত্যাদি ইত্যাদি। হাদীসের হাফেযগন উক্ত বর্ণনাগুলোকে স্ব-স্ব স্থানে আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে হাফেয রহ. "লিছান" নামক কিতাবের শুরুতে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ৮৮
উক্ত আলোচনা দ্বারা আমার উদ্দেশ্য হলো এটা প্রমাণ করা। কেননা স্বয়ং নিজেরা স্বীকার করেছে যে, আমরা মনগড়া হাদীস বানিয়েছি। আর এই কারণটা অনেক কারণের সমষ্টি। কতক লোক তো নিজেদের ওই উদ্দেশ্যের জন্য বানাতো যেগুলোকে তারা দ্বীন মনে করতো। যেমন, রাফেযী, খারেজী ইত্যাদি ইত্যাদি। যাদের কথা পূর্বে বলা হল। এ জন্য মুহাদ্দিসগণ হাদীস অনুযায়ী আমল করার জন্য নির্ধারিত নীতিমালা ও অন্যান্য শর্ত নির্ধারণ করেছেন। যেমন যে ব্যক্তি সম্পর্কে রাফেযী থাকার কথা জানা যাবে সে ব্যক্তি বর্ণিত আহলে বাইতের ফাযায়েল সম্পর্কিত হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়।
হযরত হাম্মাদ বিন যায়েদ রহ. বলেন যিনদীকরা চৌদ্দ হাজার হাদীস বানিয়েছে। যাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তির নাম হলো আব্দুল কারীম ইবনে আবিল আওজা তাকে মাহদীর যুগে শুলীতে চড়ানো হয়েছিলো। যখন তাকে গুলিতে চড়ানো হচ্ছিলো তখন সে বললো "আমি হাজার হাজার মনগড়া হাদীস বানিয়েছি তম্মধ্যে হালাল বস্তুকে হারাম ও হারাম বস্তুকে হালাল বানিয়েছি"। আবার কতক ছিলো যারা কোন আমীর ও বাদশাহর মন খুশির জন্য মনগড়া হাদীস বানিয়ে দিতো। যাদের ঘটনা বিস্তারিতভাবে মাওযু'আতে উল্লেখ আছে। আর যে সম্পর্কে হাদীসের ইমামগণ বেশী আলোচনা করেছেন সে প্রকারের মধ্যে হলো সূফী ও ওয়ায়েজদের বর্ণনা সম্পর্কে। কেননা সূফীগণ মানুষের প্রতি ভালো ধারণার কারণে সকলের কথার উপর নির্ভর করেন ও তা সত্য মনে করে অন্যদের কাছে বর্ণনা করে দেন। আর অন্যরা সূফীদের উপর নির্ভর করে অন্যদের কাছে বর্ণনা করে দেয়। তাইতো ইমাম মুসলিম রহ. স্বীয় সহীহ এর শুরুতে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এমনিভাবে ওয়ায়েজদের বর্ণনা। কেননা তারা অধিকাংশ সময় মজলিস জমানোর উদ্দেশ্যে ভুল বর্ণনা করে। আবার কিছু লোক তো এমন আছে যে মানুষদের আখেরাতের বিষয়ে ভয় দেখানোর জন্য মনগড়া হাদীস বানানো জায়েয মনে করে।
ওয়ায়েজদের বর্ণনা বিশেষ করে মাওযু কিতাবে পাওয়া যায়। হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন রহ. এক মসজিদে নামায আদায় করছিলেন। নামাযের পর এক ওয়ায়েজ ওয়াজ শুরু করল এবং ওয়াজ করতে যেয়ে ঐ ওয়ায়েজ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন এর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করল। ওয়াজ শেষ করলে ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন হাতের ইশারায় তাকে ডাকলেন। সে মনে করলো যে, তিনি তাকে কিছু দেওয়ার জন্য ইশারা করছেন। বিধায় সে কাছে এলো তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, এই হাদীস কে বর্ণনা করেছে? সে পুনরায় উক্ত দুই ব্যক্তির নামই বললো। সেই নির্বোধ তাঁদেরকে চিনতো না। কিন্তু হাদীসের জগতে যেহেতু তাঁদের দুইজনের নাম প্রসিদ্ধ ছিল তাই সে তাঁদের উভয়ের নাম বলে দিল। তিনি বললেন আমি হলাম ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন আর ইনি হলেন আহমাদ ইবনে হাম্বল। আমরা তো এই হাদীস তোমাকে শুনাই নি ও আমরা নিজেরা ও ইহা শুনি নি। সে বললো তুমি ই ইবনে মুঈন? তিনি বললেন হ্যা, সে বলতে লাগলো আমি সব সময় শুনে আসতেছিলাম যে, ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন নির্বোধ। আজ বাস্তবে দেখলাম। তিনি বললেন সেটা কিভাবে? সে বলতে লাগলো যে, তুমি কি করে মনে করলে যে, ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন ও আহমাদ ইবনে হাম্বল তোমরা ই দুই জন? আমি তো ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন ও আহমাদ ইবনে হাম্বল থেকে ১৭ (সতের) খানা হাদসি শুনেছি।৮৯ আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. কষ্টে ও ক্ষোভে নিজ চেহারার উপর কাপড় টেনে দিলেন। অন্যদিকে সে মযাক করতে করতে চলে গেল।
এ কারণেই হযরত উমর রা. এর যুগে ওয়াজ করার ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করেছিলেন। আবু নাঈম 'কিতাবুল হুলয়াহ' নামক কিতাবে যুহরী রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এক, দুই, তিন, চার ব্যক্তি হলে হাদীস বর্ণনা করাতে কোন অসুবিধা নেই তবে যদি মজলিস বড় হয় তখন হাদীস বলা থেকে চুপ থাকো।
হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, বনী ইসরাইল এর যখন ধ্বংস শুরু হলো তখন তারা ওয়াজ শুরু করে দিয়েছিলো।৯০ যায়েন ইরাকী রহ. বর্ণনা করেন যে, ওয়ায়েজদের বিপদের মধ্যে থেকে একটি হলো তারা সকল ধরনের কথা জন সাধারণের সামনে বর্ণনা করে দেয় অথচ তারা এগুলো সব বুঝতে পারে না। এ দ্বারা তাদের ইতেকাদ নষ্ট হয়ে যায়। যখন এটা সত্য ও সহীহ বিষয়ের ক্ষেত্রে হয় তখন ভুল ও মনগড়া বিষয়ের কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। (যে সাধারণ মানুষের সামনে ভুল ও মনগড়া কথা বললে আরো বেশী ক্ষতি হয়)
এ কারণেই উলামা কেরামের মাওযূ' বর্ণনা সম্পর্কেও কিতাব লিখতে হয়েছে। তাঁরা মাওযূ' বর্ণনার মাঝে যাচাই বাছাই করেছেন যেমন করেছেন সহীহ বর্ণনার ক্ষেত্রে। যাতে করে পরবর্তী লোকদের সংশয় ও সন্দেহ না থাকে।
টিকাঃ
৮৭. তিরমিযি, হাদীস নং-২১৬৫, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ২৩৬৩
৮৮. লিসানুল মীযান ১/১১।
৮৯. ইবনুল জাওয়ী রহ. কর্তৃক রচিত কিতাবুল মাওযূআত এর ভূমিকা, পৃষ্টা-২২।
৯০. মাজমাউয যাওয়ায়েদ, কিতাবুল ইলম ১/১৮৯
📄 অষ্টম কারণ : হাদীসের কিতাবে মুআনিদ (ইসলামের শত্রু) দের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ
বর্ণনাকারী নিজে গ্রহণযোগ্য, সত্যবাদী কিন্তু তার কিতাবে কোন মুআনিদ ও ভ্রান্ত মতবাদের অধিকারীর পক্ষ থেকে এমন কোন হস্তক্ষেপ হয়েছে যদ্বারা বর্ণনার মাঝে ভিন্নতা তৈরী হয়। বর্ণনাকারী যেহেতু গ্রহণযোগ্য সেহেতু তার বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করা যায় না অন্যদিকে হস্ত ক্ষেপ কারীর কথা চিন্তা করলে মূল বর্ণনার গঢ়-বঢ় হয়ে গেছে। অতএব উসূলবিদগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, হাম্মাদ বিন সালামাহ রহ. এর কিতাবে তাঁর এক ভাতিজা যে রাফেযী হয়ে গিয়েছিলো এক হাদীস অন্ত র্ভূক্ত করে দিয়েছিলো। এই কারণ ও অন্যান্য আরো এমন কিছু কারণ আছে যেগুলো জন সাধারণের সামনে ব্যাখ্যা করার যোগ্য নয়। কেননা এসব বিষয় বুঝতে তাদের বুঝ শক্তি অক্ষম। তারা এ সব ঘটনা দ্বারা এবং নিজেদের কম বুঝ ও ত্রুটিপূর্ণ ইলমের কারণে হাদীসের সকল কিতাব ও বর্ণনা সম্পর্কে মন্দ-ধারণা করবে। এজন্য আমি এ বিষয়টি সংক্ষেপ করেছি। বাস্তবে এই বিষয়গুলো এমন সাধারণ নয় যে, সকলের সামনে এটা প্রকাশ করা যাবে। আর না প্রত্যেক শ্রেণীর মানুষ তা বুঝতে পারবে। এ কারণেই মাশায়েখগন জন সাধারনের সামনে বিশেষ বিশেষ মাসয়ালা আলোচনা করাকে নিষেধ করেছেন। আর এ সকল কারণেই ইল্ম শিক্ষা করাকে জরুরী সাব্যস্ত করেছিলেন। যদ্বারা তার যোগ্যতা অর্জন হয়ে যায়। বিশেষ করে উসূলে ফেকাহ ও উসূলে হাদীসের ইলম যাতে করে কথা বুঝা ও যাচাই করার যোগ্যতা হয়ে যায়। যায়েন ইরাকী রহ. এর কথা একটু আগেই উল্লেখ করেছি যে, ওয়ায়েজদের বিপদ-আপদ থেকে অন্যতম হলো জন সাধারণের সামনে এমন সব বিষয় বর্ণনা করা যা তারা বুঝতে পারে না। যদ্বারা তাদের আকীদা বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বর্ণনা করেন যখন তুমি কোন সম্প্রদায়ের কাছে এমন হাদীস বর্ণনা করো যেখানে তাদের আকল পৌঁছে না তখন তা তাদের জন্য ফেৎনার কারণ হবে। হযরত ইমাম মুসলিম রহ.ও স্বীয় কিতাবের মুকাদ্দামায় উক্ত হাদীস উল্লেখ করেছেন।৯১” বুখারী শরীফে ইমাম বুখারী রহ. হযরত আলী রা. থেকেও এ ধরনের বাণী বর্ণনা করেছেন।
যদিও বর্তমানে এই বিষয়টি ভয়ঙ্কর নেই যেহেতু হাদীসের ইমামগণ সহীহ, ভুল, বর্ণনা সমূহ যাচাই করে দিয়েছেন। অগ্রহণযোগ্য থেকে গ্রহণযোগ্যকে পৃথক করে দিয়েছেন। একারণে ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় "বুখারী শরীফে" ৬ লক্ষ হাদীস থেকে, ইমাম মুসলিম রহ. তিন লক্ষ হাদীস থেকে এবং ইমাম আবু দাউদ রহ. ৫ পাঁচ লক্ষ হাদীস থেকে নির্বাচন করেছেন।
যাহোক আমরা এখানে দ্বিতীয় যুগের আলোচনা শেষ করছি এই জন্য যে, আলোচনার শুরু থেকে এই পর্যন্ত যা বর্ণনা করা হলো তা দ্বারা বুঝানো উদ্দেশ্য এই ছিলো যে, হাদীসের বর্ণনার ক্ষেত্রে ভিন্নতার একাধিক কারণ তৈরী হয়েছিল। আর এগুলো ছাড়াও এটা স্পষ্ট হওয়া যুক্তি যুক্তও ছিলো।
সেই অনেক কারণ থেকে ১৮ (আঠার) কারণ প্রথম যুগে ও ৮ (আট) কারণ এই দ্বীতিয় যুগে আলোচনা করেছি। এগুলো ছাড়াও যতো বেশী মাধ্যম বৃদ্ধি পেয়েছে ততো বেশী ভিন্নতা ও দুর্বলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণেই ইমাম বুখারী রহ. এর কিতাবে যঈফ (দুর্বল) বর্ণনা খুবই কম। এমনকি একেবারেই নেই। এ জন্য যে, তাঁর যুগ ছিলো দ্বিতীয় শতাব্দির শেষ দিকে। দারাকুতনী কিতাবে অনেক বেশী যঈফ (দুর্বল) বর্ণনা এসে গেছে এ জন্য যে, তাঁর যুগ বুখারী থেকে অনেক পরে। আর এ কারণে আইম্মায়ে মুজতাহিদদের যুগ ইমাম বুখারী রহ. থেকেও আগে ছিলো। তাই আইম্মায়ে আরবাআর বর্ণনায় দুর্বলতা খুব কম এসেছে। সর্বশেষ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর যুগ। আর তিনিও ইমাম বুখারী রহ. এর আগের। এ চার ইমামের যুগ পর্যন্ত বর্ণনায় যতটা দুর্বলতা আসে নাই তার চেয়ে বেশী দূর্বলতা এসেছে তাঁদের পরবর্তী যুগে।
সারকথা হলো উপরোক্ত ভিন্নতার কারণ ও বর্ণনার দূর্বলতার কারণে আইম্মায়ে ফেকাহ ও হাদীসের জন্য সেগুলোর যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, গ্রহনযোগ্য বর্ণনাকে আগ রেখেছেন, অগ্রহনযোগ্য ও মিথ্যা বর্ণনাকে বাদ দিয়েছেন। অতপর গ্রহনযোগ্য বর্ণনা থেকে প্রাধান্য ও অপ্রাধান্য, রহিত ও রহিত নয় এমন হাদীসগুলোকে পৃথক করেছেন।
কিন্তু এরপরও এ সকল বিষয় এমন ছিলো যে, এদের মাঝে ভিন্নতা হয়েছিলো। কারণ এটা জরুরী নয় যে, আমার নিকট যে ব্যক্তি গ্রহণযোগ্য সে সকলের কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে অথবা আমার নিকট যে দ্বীনদার হবে সে অন্য সকলের কাছে এমনই হবে। এ ভিত্তিতেই ইমামগনের মাঝে মতানৈক্য হয়েছে। আর হওয়া উচিত ছিলো। কেননা এটা সৃষ্টিগত বিষয়। এজন্য আমরা এখন সংক্ষিপ্ত আকারে সেগুলোর আলোচনা করছি।
টিকাঃ
৯۱. মুকাদ্দামায়ে সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪,