📄 চতুর্থ কারণ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন ইরশাদকে তার বাহ্যিক অর্থে প্রয়োগ করা
সাহাবাগণ যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাকীকী আন্তরিক ও বাস্তবিক আশেক ছিলেন যাদের প্রত্যেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রত্যেকটি কাজের উপর পরিপূর্ণভাবে উৎসর্গ হতেন।
সাহাবাগণ সম্পর্কের উদাহরণ ও বর্ণনাতীত। তবে ছোট থেকে ছোট একটি উদাহরণ হলো হযরত আনাছ রা. বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন কোন এক সাহাবীর নির্মানাধীন বাড়ীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। (যে বাড়ির একটি কামড়াও তৈরী হয়ে গিয়েছিলো) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন যে, এটা কার ? মালিক সম্পর্কে জানার পর মুখে কিছু বললেন না। পরবর্তীতে যখন ঘরের মালিক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হলেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালামের উত্তর দিলেন না। তিন বার এরুপ করার পর তিনি লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন ও জানতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করেছিলেন এটা কার বাড়ী? এ কথা শুনে তিনি তৎক্ষনাত যেয়ে উক্ত কামরাসহ বাড়ীর সবকিছু ভেঙ্গে ফেললেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে যেয়ে বাড়ী ভেঙ্গে ফেলারও সংবাদ পর্যন্ত দিলেন না লজ্জা ও অপমানের কারণে। ঘটনাক্রমে দ্বিতীয় বার যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন বিষয়টি জানতে পারলেন। ৮২ মোটকথা তাঁরা কখনো কখনো মাহবুবের যবান থেকে নিসৃঃত শব্দের বাহ্যিক অনুযায়ী আমল করতেন। আর এটারও সম্ভাবনা আছে যে, কোন কোন সাহাবী উদ্দেশ্য ঐটাই বুঝতেন যার উপর তিনি আমল করতেন। কিন্তু এটাও অসম্ভব নয়, বরং কিছু কিছু শব্দ দ্বারা এ কথাও বুঝা যায় যে, স্বয়ং তাঁরা ও কখনো কখনো বুঝতে পারতেন যে, ইহা বাস্তব উদ্দেশ্য নয়। তারপর বাহ্যিক শব্দে যা আছে তার উপরই আমল করতেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববীর এক দরজার দিকে ইশারা করে বললেন যে, 'আমি এই দরজাকে মহিলাদের জন্য খাস করে দিলে ভালো হতো' এর পর থেকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. কখনো সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করেন নি।৮৩
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. এর ইন্তেকালের সময় তিনি নতুন কাপড় আনিয়ে পরিধান করলেন আর বললেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছি যে, মানুষ যে কাপড়ে মৃত্যু বরণ করবে তাকে সেই কাপড়েই হাশরের ময়দানে উঠানো হবে। ৮৪
কুরআন শরীফের এই আয়াত كَمَا بَدَانَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ এর তাফসীরে প্রসিদ্ধ বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, মানুষকে হাশরে বিবস্ত্র অবস্থায় উঠানো হবে।৮৫ বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা উক্ত বিষয় প্রমাণিত। আর এটা অসম্ভব যে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. উক্ত হাদীসের উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন নি। (অর্থাৎ এ হাদীসের বাস্তব উদ্দেশ্য তিনি অবশ্যই বুঝেছেন) কিন্তু এরপরও তিনি শুধু হাদীসের বাহ্যিক শব্দ অনুযায়ী আমল করার জন্য নুতন কাপড়ে এ কাজ করেছেন।
এ ধরণের উদাহরণ অনেক হাদীসে পাওয়া যায়, যদিও বাহ্যত এটা অসম্ভব মনে হয় কিন্তু যারা ভালোবাসার স্বাদ পেয়ে গেছে তারা বুঝতে পারবে যে, ভালোবাসার শব্দ সমূহ কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছাড়াই কি পরিমান সুস্বাদু! এ কারণেই সাহাবাগণ রহিত বর্ণনা সমূহ বর্ণনা করতেন অথচ কোন রহিত হুকুম বর্ণনা করার কোন প্রয়োজন থাকে না। এমনিভাবে এমন অনেক হাদীস বর্ণনা করা হয় যেগুলো স্পষ্টভাবেই রহিত।
টিকাঃ
৮২. আবু দাউদ, হাদীস নং ৫২৩৭।
৮৩. আবূ দাউদ, হাদীস নং ৪৬২।
৮৪. আবূ দাউদ কিতাবুল জানায়িয হাদীস নং ৩১১4।
📄 হাদীস অন্বেষণকারীদের জন্য কিছু আদব
ইলম হাদীস নিয়ে চিন্তা গবেষণা করা এবং সে বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করা, বর্ণনা বা লেখালেখি করার ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসীন এর চেয়েও বেশী শক্ত সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন। যদিও অনিচ্ছাকৃতভাবে বিষয়বস্তু দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। তবে যুগের দাবি পূরণ করতে গিয়ে হযরত ইমাম বুখারী (রহ.) এর একটা অতি আশ্চর্য ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। যা দ্বারা আন্দাজ করা যাবে যে, ইল্মে হাদীস হাসিল করার জন্য এবং তার তালেব হওয়ার জন্য পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ কি পরিমাণ কঠিন মেহনতের কথা বলেছেন। মুহাদ্দিস ও শায়খুল হাদীস হওয়া তো আরো অনেক পরের কথা।
হযরত মুহাম্মদ ইবনে আহমদ (রহ.) বলেন, হযরত ওলীদ ইবনে ইবরাহীম (রহ.) 'রিই'ই' নামক স্থান থেকে বিচারকের পদ থেকে বরখাস্ত হয়ে যখন বুখারায় আসলেন তখন আমার উস্তাদ হযরত আবু ইবরাহীম খাত্তালী আমাকে সহ তাঁর খেদমতে হাজির হলেন এবং তাঁর কাছে নিবেদন করলেন, যে সমস্ত হাদীস আপনি আমাদের মাশায়েখ ও উস্তাদগণ থেকে শুনেছেন তা বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, হাদীসের বর্ণনা তো আমি শুনি নি। আমার উস্তাদ খুব আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এতবড় ফক্বীহ ও অভিজ্ঞ আলেম হওয়ার পরও এমন কথা বললেন? উত্তরে তিনি তাঁর এক কাহিনী শুনালেন। তিনি বলেন, বালেগ হওয়ার পর হাদীস পড়ার আমার খুব আগ্রহ হল। তখন আমি হযরত ইমাম বোখারী রহ. এর খেদমতে হাজির হয়ে আমার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলাম। তখন তিনি আমাকে আদরের সাথে বললেন, বৎস! তুমি যখন কোন কাজ করার ইচ্ছা করবে তখন সর্বপ্রথম ঐ কাজের আনুষঙ্গিক বিষয়াদি ও অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে নিবে। এরপর তার সীমারেখা ও নিয়ম কানুন জানার পর ঐ কাজ শুরু করবে।
এখন শুন! কোন মানুষ ঐ পর্যন্ত কামেল মুহাদ্দেস হতে পারবে না যতক্ষণ না সে (১) চারটি জিনিসকে অন্য চারটি জিনিসের সাথে এমনভাবে লিখবে যেমন চারটি জিনিস অন্য চারটি জিনিসের সাথে (২) চারটি জিনিস চারটি জামানার মধ্যে (৩) চারটি অবস্থার সাথে চার স্থানে (৪) চারটি জিনিসের উপর চার প্রকার মানুষ থেকে।
আর তা চার উদ্দেশ্যের জন্য হবে। আর এই চার বিষয় ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণতা লাভ করবে না যতক্ষণ না এমন চারটি জিনিস হাসিল করা হবে যা অন্য চারটি জিনিসের সাথে হবে। এসব জিনিস যখন পরিপূর্ণ হয়ে যাবে তখন তার জন্য চারটি জিনিস সহজ হয়ে যাবে এবং চারটি বিপদে সে লিপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু এগুলোর উপর সবর করলে আল্লাহ পাক তাঁকে চারটি জিনিস দ্বারা দুনিয়াতে সম্মানিত করবেন এবং চারটি পুরস্কার পরকালে দান করবেন।
তখন আমি বললাম, হযরত! আল্লাহ পাক আপনার উপর রহম করুন। এবার এই চারটি বিষয়ের একটু ব্যাখ্যা করে বলুন। তিনি বললেন, শুন! ঐ চারটি জিনিস যা লেখার প্রয়োজন হয় তা হল,
(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বর্ণিত হাদীস ও তাঁর আদেশ নিষেধ লেখা।
(২) সাহাবাগণের বাণী ও তাঁদের ইলমী মর্যাদা অর্থাৎ কোন সাহাবী কোন্ স্তরের ছিলেন তা লেখা।
(৩) তাবেঈনগণের বাণী ও তাঁদের ব্যক্তিমর্যাদা অর্থাৎ কে নির্ভরযোগ্য আর কে নির্ভরযোগ্য নয় তা লেখা।
(৪) হাদীস বর্ণনাকারী সকলের জীবনী ও তাঁদের জন্ম তারিখ লেখা।
চারটি জিনিস লিখতে হয় চারটি জিনিসের সাথে তা হল (১) হাদীস বর্ণনাকারীর নাম (২) তাঁদের উপনাম (৩) তাঁদের বাসস্থান (৪) তাঁদের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ। যার দ্বারা এটা বুঝা যাবে যে, তাঁরা যাদের থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের সাথে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছে কি না। এগুলো এমন জরুরী বিষয় যেমন বক্তৃতার জন্য হামদ ও সানা হওয়া জরুরী এবং রাসূলগণের প্রতি দুরুদ শরীফ পড়া এবং সূরার সাথে বিসমিল্লাহ পড়া ও নামাযের শুরুতে তাকবীর বলা জরুরী।
আর চারটি জিনিস চার জামানায় লেখা দ্বারা উদ্দেশ্য হল (১) মুছনাদ (২) মুরছাল (৩) মাওকূফ (৪) মাকুতু। এসব ইল্মে হাদীসের চার প্রকারের নাম।
চার জামানার মধ্যে লেখা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, (১) বাল্যকালে (২) প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কাছাকাছি সময়ে (৩) প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে (৪) বার্ধক্যের পূর্ব পর্যন্ত।
চার অবস্থার অর্থ হল (১) কর্ম ব্যস্ততার সময় (২) কর্ম মুক্ততার সময় (৩) দরিদ্রতার সময় (৪) ধনাঢ্যের সময়। মোটকথা সবসময় এরই মধ্যে লেগে থাকবে।
চার জায়গার উদ্দেশ্য হল (১) পাহাড়ের উপর (২) নদীর মধ্যে (৩) শহরে (৪) জঙ্গলে। মোটকথা হাদীসের উস্তাদ যে স্থানেই পাওয়া যায় সেথায় হাদীস হাসিল করা।
চারটি জিনিসের উপরের অর্থ হল (১) পাথরের উপর (২) ঝিনুকের উপর (৩) চামড়ার উপর (৪) হাড়ের উপর। মোটকথা কাগজ বা এ জাতীয় লেখার উপযোগী কোন কিছু পাওয়ার আগ পর্যন্ত এসকল জিনিসের উপর লিখতে হবে। যাতে করে হাদীসসমূহ মেধা থেকে হারিয়ে যেতে না পারে।
চারজন থেকে হাসিল করবে তা হল, (১) নিজের চেয়ে বড় থেকে (২) নিজের চেয়ে ছোট থেকে (৩) নিজের সমসাময়িকদের থেকে (৪) আপন পিতার কিতাব থেকে যদি তাঁর লেখা বুঝা সম্ভব হয়। মোটকথা ইল্ম হাসিল করতে অলসতা করবে না। নিজের সমসাময়িক ও ছোটদের থেকেও ইলম হাসিল করতে লজ্জাবোধ করবে না।
চারটি উদ্দেশ্যের জন্য তা হল, (১) আল্লাহ পাককে রাজিখুশী করার জন্য। কারণ মনিবের সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখা গোলামের জন্য ফরজ (২) কোরআন পাকের অনূকুলে যত বিষয় আছে তার উপর আমল করার জন্য (৩) আগ্রহী তালেবদের কাছে পৌঁছানোর জন্য (৪) ইল্ম কিতাবাকারে লেখার জন্য যাতে করে পরবর্তী প্রজন্মদের জন্য তাতে হেদায়েতের ধারা চালু থাকে।
উল্লেখিত জিনিসগুলো হাসিল করতে হলে এর পূর্বে আরো চারটি জিনিস অবশ্যই হাসিল করতে হবে। আর এগুলো মানুষের আওতাধীন জিনিস। কষ্ট মেহনত করে যা অর্জন করতে হয়। (১) ইলমে কেতাবাত অর্থাৎ লেখার যোগ্যতা অর্জন করা (২) ইলমে লোগাত যার দ্বারা শব্দের আভিধানিক সঠিক অর্থ বুঝা যাবে। (৩) ইলমে সরফ বাক্যের গঠন প্রণালী বুঝা যায় (৪) ইলমে নাহু যেগুলো দ্বারা শব্দের শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা বুঝা যাবে।
এই বিদ্যাগুলো আবার এমন চারটি জিনিসের উপর নির্ভর করে যেগুলো পুরোপুরি ভাবে আল্লাহ পাকের দান। বান্দার চেষ্টা মেহনতের উপর তা নির্ভরশীল নয়। আর তা হল (১) সুস্থতা (২) শক্তি (৩) শিক্ষার প্রতি আগ্রহ (৪) স্মরণশক্তি।
এসব জিনিস যখন মানুষের হাসিল হয় তখন ইল্ম হাসিল করতে চারটি জিনিসের গুরুত্ব তার কাছে মূল্যহীন হয়ে যায়। অর্থাৎ (১) পরিবার (২) সন্তান (৩) অর্থ-সম্পদ (৪) ঘর-বাড়ী।
এরপর চারটি বিপদে সে লিপ্ত হয়ে যায় (১) বিপদের সময় দুশমনদের পক্ষ থেকে আনন্দের হাসা-হাসি (২) দোস্তদের পক্ষ থেকে তিরস্কার ও নিন্দাবাদ (৩) মূর্খ ও জাহেল লোকদের পক্ষ থেকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ (৪) ওলামাগণের পক্ষ থেকে হিংসা ও জ্বলন-পোড়ন এবং শত্রুতা ও অনিষ্ট কামনা।
পরে মানুষ যখন এগুলোর উপর সবর করে তখন আল্লাহ পাক তাঁকে চারটি জিনিস দুনিয়ায় দান করেন, আর চারটি জিনিস আখেরাতে দান করেন। দুনিয়ায় যে চারটি জিনিস দান করেন তা হল, (১) অল্পে তুষ্ট হওয়া এবং সম্মানিত হওয়া (২) পূর্ণ একীনের সাথে গাম্ভীর্যতা ও মাহাত্ম্য (৩) ইল্মের স্বাদ ও মজা (৪) দায়েমী যিন্দেগী।
আর পরকালে যে চারটি জিনিস দান করেন তা হল, (১) শাফায়াতের অধিকার, যার জন্যই তিনি চাইবেন তার জন্য শাফায়াত করতে পারবেন (২) আরশের নীচে ছায়া, যেদিন আরশের ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না (৩) হাউজে কাওসারের অধিকার, অর্থাৎ যার জন্য তিনি চাইবেন তাকে হাউজে কাওসার থেকে পান করাতে পারবেন (৪) আম্বিয়াগণের সাথে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান পাওয়া।
সুতরাং হে বৎস! আমি আমার উস্তাদ ও পীর মাশায়েখগণের থেকে বিক্ষিপ্তভাবে যা কিছু শুনেছিলাম তার সবই সংক্ষিপ্তভাবে তোমাকে বলে দিলাম। এবার তোমার জন্য স্বাধীনতা রয়েছে যে, ইচ্ছা হলে তুমি হাদীসশাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করতে পারো আর না চাইলে না করতে পারো। ৮৬
উপরোক্ত এই উসূল ও মূলনীতিগুলো ইমাম বুখারী রহ. ওই সমস্ত ব্যক্তির জন্য একত্রিত করেছেন যে মুহাদ্দিস বা হাদীসের আলেম হওয়ার ইচ্ছা পোষন করে। আমাদের জন্য বাস্তবিক অর্থে-ই ইমাম বুখারী রহ. এর উক্ত নসীহত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত ও মজবুত ভাবে তা আকড়ে ধরা উচিত। বাস্তবে তো ইলমে হাদীস এর চেয়েও বেশী কঠিন। আর বর্তমান অলসতার যুগে যেখানে মানুষের ইলম অর্জনের শেষ সীমা মনে করা হয় সিহাহ সিত্তার কয়েকটি কিতাব যেগুলো পড়ে নিজেকে মুহাদ্দিস বা ইলমে হাদীসের ফাযেল মনে করতে থাকে। বাস্তবে মুর্খতার এই যুগে আমাদের মতো অর্ধ মৌলভীদের দ্বারা ইলমে দ্বীনের যে, পরিমান ক্ষতি হচ্ছে এর উদাহরণ সম্ভবত তালাশ করলে পূর্বের কোন যুগে তা পাওয়া যাবে না। যার অনেক কারণ হতে একটি কারণ হলো নিজ ফযীলতের উপর আস্থা, নিজ অসম্পূর্ণ জ্ঞানের প্রতি ভরসা অথচ মৃতাআখখিরীন ফকীহগণ নিজ রায় অনুযায়ী ফাতওয়া দেওয়াকেও এই যুগে অনুমতি দেন নি বরং উহার সাদৃশ্য পূর্বের কোন ফাতওয়া থেকে বর্ণনা করার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে মাসআলা মাসায়েল তো অনেক দূরের বিষয় বড় বড় ইলমি তাহকীক নিজ যোগ্যতা, নিজ বুঝ অনুযায়ী হয়ে থাকে
মোটকথা এই আলোচ্য বিষয় নিজ প্রয়োজন থাকা স্বত্তেও মূল আলোচ্য বিষয় থেকে বহির্ভূত রেখে আমি পূর্বের আলোচ্য বিষয়ের দিকে ফিরে আসছি। অর্থাৎ দ্বিতীয় শতাব্দিতে বর্ণনার ভিন্নতার অনেক কারণ থেকে উদাহরণ হিসেবে উপরোক্ত চারটি কারণের উপর ক্ষান্ত করছি। সামনে এগুলো অর্থাৎ এর পর সাহাবী, তাবে তাবেয়ী, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন, আইম্মায়ে মুহাদ্দিসীন। মোট কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকে যতই দূর হয়েছে ততই বর্ণনার ভিন্নতার কারণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর বৃদ্ধি আবশ্যক ও ছিল। কেননা যত মুখ তত কথা। উক্ত কারণ বাস্তবে অনেক কারণের সমষ্টি সংক্ষিপ্ততার উদ্দেশ্যে সবগুলোকে একটির মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করে বর্তমানের পঞ্চম কারণ সাব্যস্ত করেছি যাতে আলোচ্য বিষয় দীর্ঘায়িত না হয়।
টিকাঃ
৮৫. বুখারী, হাদীস নং ৪৭৪০, মুসলিম, হাদীস. নং ৭২০১, তিরমিযি, হাদীস নং ২৪২৩ নাসাঈ, হাদীস নং ২০৮৪।
৮৬. তাদরীবুর রাবী, তাহযীবুল কামাল, খণ্ড-৬/২৩৬
📄 পঞ্চম কারণ : হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে মাধ্যম অনেক হওয়া
হাদীস সমূহ বর্ণনার ক্ষেত্রে যত বেশী মাধ্যম হবে পূর্ববর্তী সকল কারণের ভিত্তিতে ততবেশী ভিন্নতা তৈরী হবে। আর এমনটি হওয়া আবশ্যক। সকলের সামনেই আসে সকলেই বুঝে যে, কোন দূতের মাধ্যমে কোন একটি কথা বলে পাঠালে যদি তাতে কয়েক মাধ্যম এসে যায় তাহলে তাতে ভিন্নতা আসা আবশ্যক। এ জন্য হাদীসের ইমামগণ বর্ণনা সমূহ থেকে কোন একটিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ হিসেবে উঁচু সনদ অর্থাৎ মাধ্যম কম হওয়া কে একটি বড় কারণ সাব্যস্ত করেছেন। যদি আল্লাহ তা'আলা কখনো সুযোগ দেন তাহলে তা যথাস্থানে পরবর্তীতে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করবো। এখানে শুধু সংক্ষিপ্ত আকারে এতটুকু ইশারা করা জরুরী যে, যুক্তিগত, বর্ণনাগত, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষভাবে বুঝা যায় যে, মাধ্যম অধিক হওয়া ভিন্নতার অন্যতম একটি কারণ। আর এটাই বর্ণনার ভিন্নতার বড় একটা কারণ। হানাফীদের মতে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর ফেকাহকে অন্যান্য ইমামগনের (ফকীহ ও মুহাদ্দিস) বর্ণনার উপর প্রাধান্য দেওয়ার অন্যান্য অনেক কারণ থেকে এটাও একটি কারণ। কেননা ইমাম আবূ হানীফা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে মাধ্যম খুব কম। স্পষ্ট হওয়ার উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রসিদ্ধ ইমামগনের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ ছক আকারে দেওয়া হলো:
| নাম | জন্ম | ইন্তেকাল | মোট বয়স |
|---|---|---|---|
| ইমাম আবূ হানীফা রহ. | ৮০ হিঃ | ১৫০ হিঃ | ৭০ বছর |
| ইমাম মালেক রহ. | ৯৫ হিঃ | ১৭৯ হিঃ | ৮৪ বছর |
| ইমাম শাফেয়ী রহ. | ১৫০ হিঃ | ২০৪ হিঃ | ৫৪ বছর |
| ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. | ১৬৪ হিঃ | ২৪১ হিঃ | ৭৭ বছর |
| ইমাম বুখারী রহ. | ১৯৪ হিঃ | ২৫৬ হিঃ | ৬২ বছর |
| ইমাম মুসলিম রহ. | ২০৪ হিঃ | ২৬১ হিঃ | ৫৭ বছর |
| ইমাম আবূ দাউদ রহ. | ২০২ হিঃ | ২৭৬ হিঃ | ৭৪ বছর |
| ইমাম তিরমিযি রহ. | ২০৯ হিঃ | ২৭৯ হিঃ | ৭০ বছর |
| ইমাম নাসাঈ রহ. | ২১৪ হিঃ | ৩০৩ হিঃ | ৮৯ বছর |
| ইমাম ইবনে মাজাহ রহ. | ২০৯ হিঃ | ২৭৩ হিঃ | ৬৪ বছর |
উক্ত ছক দ্বারা একথা খুব স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম রহ. এর পর্যন্ত বর্ণনা আসতে যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ হতে প্রায় ২০০ (দুইশত) বছর আতিবাহিত হয়ে গেছে সেহেতু অনেক মাধ্যম এসেগেছে। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালেক রহঃ এর বিপরীত। কেননা এ ক্ষেত্রে ১০০ (একশত) বছরের ও ব্যবধান হয় নি। মোটকথা মাধ্যম অধিক হওয়া বর্ণনার ভিন্নতার কারণ হয়ে থাকে। আর হাদীসের কিতাব সংকলন যেহেতু ব্যপকভাবে দ্বিতীয় শতাব্দি থেকে শুরু হয়েছে সেহেতু সে সময় পর্যন্ত বর্ণনাকারীদের অধিক মাধ্যম হওয়ায় বর্ণনার শব্দে অনেক ভিন্নতা এসে গেছে।
📄 ষষ্ঠ কারণ : সনদে কোন এক বর্ণনাকারী দুর্বল হওয়া
মাধ্যম অধিক হওয়ার ক্ষেত্রে কোন দূর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারী এসে যায়। কোন দূর্বল মেধা সম্পন্ন ব্যক্তি অথবা অন্য কোন প্রাসঙ্গিক কারণে যে কোন কিছু বর্ণনা করে দেয়। তাদের মধ্যে কতক এমন বর্ণনাকারী ছিলেন যে, যারা নিজ মেধাশক্তি অথবা কিতাবের উপর আস্থা রাখতো কিন্তু তাদের মাঝে কোন দূর্ঘটনায় এমন কিছু ঘটেছে, যার কারণে তারা বর্ণনার ক্ষেত্রে গন্ডগোল করে ফেলেছে। ভুল বর্ণনা করছে। এ জন্য মুহাদ্দিসগণ হাদীস অনুযায়ী আমল করার জন্য প্রত্যেক বর্ণনাকারী সম্পর্কে অবগত হওয়াকে খুবই জরুরী মনে করেন। আর এ কারণেই মুহাদ্দিসগণ সাধারণ ব্যক্তির জন্য হাদীস শুনেই সে অনুযায়ী আমল করতে নিষেধ করেছেন। শরহে আরবাঈনে নববীয়্যাহ তে আছে
'অর্থাৎ যে ব্যক্তি সুনানের কিতাবে থাকা কোন হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করতে চায় যেমন, আবূ দাউদ, তিরমিযি, নাসাঈ ইত্যাদি বিশেষ করে ইবনে মাজাহ, মুসান্নেফ ইবনে আবী শায়বা, মুসান্নেফ আব্দুর রাজ্জাক ও এ ধরনের ওই সকল কিতাব যেগুলোতে দূর্বল বর্ণনা অধিক পরিমানে রয়েছে। সে যদি আহ্ল অর্থাৎ সহীহ হাদীসকে গায়রে সহীহ হাদীস থেকে পৃথক করতে পারে এরপরও তার জন্য ওই সময় পর্যন্ত কোন হাদীসকে দলীল বানিয়ে নেওয়া জায়েয হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে এর সনদের তাহকীক ও বর্ণনাকারীদের অবস্থা যাচাই না করবে। আর যদি সে এ তাহকীকের উপযুক্ত না হয় তাহলে কোন ইমামের অনুস্বরন করা জরুরী। অন্যথায় তার জন্য দলীল দেওয়া জায়েয হবে না। যাতে সে কোন বাতেল পথে না পড়ে যায়।'
এই বিষয়বস্তু আমরা যথাস্থানে বিস্তারিতভাবে দেখিয়ে দিবো যে, সংখ্যাগরিষ্ট ফকীহ ও মুহাদ্দিস এব্যাপারে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, যে ব্যক্তির বর্ণনার শুদ্ধতা ও দূর্বলতা জানার যোগ্যতা নেই, রহিত ও রহিত না এ পার্থক্য করতে পারেনা ব্যাপক হুকুমকে খাছ হুকুম থেকে পৃথক করতে পারে না। তার জন্য হাদীস অনুযায়ী আমল করা জায়েয নেই। বাস্তবে এই বিষয়টি কোন ব্যাখ্যার কোন মুখাপেক্ষী নয়। এটা এতো স্পষ্ট বিষয় যে, যে ব্যক্তি সহীহকে দূর্বল থেকে পৃথক করতে সক্ষম নয় সে কিভাবে সে অনুযায়ী আমল করবে।