📄 পঞ্চম কারণ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন আমলকে অভ্যাস বা সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করা
-এই কারণ ও পূর্বোক্ত কারণের কাছাকাছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিভিন্ন কাজ কর্ম দেখে কিছু লোক ঐ কাজকে স্বভাব প্রসূত ও সাধারণ অভ্যাস মনে করেছেন। আবার কেউ এ কাজ কর্ম দেখে এটাকে ইচ্ছাকৃত ইবাদত মনে করেছেন। তাঁরা এটাকে সুন্নত ও মুস্ত াহাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর অনেক উদাহরণ হাদীসের কিতাবে রয়েছে। তবে নমুনা হিসেবে বিদায় হজ্জে 'আবতহ' নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবস্থান করাকে দেখা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ অবস্থানকে কেউ অস্বিকার করেনি। হযরত আবু হুরায়রা রা. ও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর মতে এটাও হজ্জের আমল সমূহের একটি আমল। তাই হাজীদের জন্য সেখানে অবস্থান করা সুন্নত।৩০ পক্ষান্তরে হযরত আয়েশা ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর মতে উক্ত যায়গায় অবস্থান ঘটনাক্রমে হয়েছিল (ইবাদত হিসেবে নয়) তাই এর সাথে হজ্জের মাসয়ালার কোন সম্পর্ক নেই। খাদেমরা সেখানে তাঁবু গেঁড়েছিল এ জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে অবস্থান করেছিলেন। তাছাড়া সেখান থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় যাওয়াও সহজ ছিল। কেননা কাফেলা এদিক থেকে সেদিক ছত্র ভঙ্গ হয়ে যাবে। ৩২
এক্ষেত্রে ফকীহ ও মুজতাহিদের প্রয়োজনীয়তাকে কেউ অস্বিকার করতে পারবে না। যার কাজ হবে উক্ত অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন সাহাবী রা. থেকে বিভিন্ন বর্ণনা ও মতামত গুলোকে একত্রিত করে সেগুলোর মধ্য থেকে কোন একটিকে প্রাধান্য দেওয়া। আর ইমামগণ এ কাজই করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিম্নোক্ত বাণী
منز لنا غدا انشاء الله بخيف بني كنانة حيث تقاسموا على الكفر
অর্থাৎ ইনশাআল্লাহ আমরা আগামীকাল খাইফে বনী কিনানাতে অবস্থান করবো। যেখানে নবুওয়াতের প্রথম দিকে মক্কার কাফেররা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে পরস্পর ওয়াদাবদ্ধ হয়েছিল। এ বাণী থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেখানে অবস্থান করা ঘটনাক্রমে হয়নি বরং কাফেরদের কুফরী নিদর্শন প্রকাশ করার স্থানে ইসলামের নিদর্শন প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে সেখানে অবস্থান করেছেন। এর সাথে যদি অন্যান্য আরো কোন উপকারিতা পাওয়া যায় যেমন, মদীনা মুনাওয়ারার রাস্তা যেহেতু সেদিকে। এজন্য ফিরে আসতে সহজ হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এ বিষয়গুলো এ কথা প্রমাণ করেনা যে, সেখানের অবস্থান ইচ্ছাকৃত ছিল না। (বরং প্রমাণ করে যে সেখানের অবস্থান ইচ্ছাকৃত ছিল।)
টিকাঃ
৩০. বুখারী, হাদীস নং ১৬৫৩, মুসলিম, হাদীস নং-৩১৬৬
৩১. বুখারী, হাদীস নং ১৭৬৮, মুসলিম, হাদীস নং-৩১৬৮
৩২. বুখারী, হাদীস নং-১৭৬৫,১৭৬৬, মুসলিম, হাদীস নং-৩১৬৯, ৩১৭২ আবু দাউদ, হাদীস নং-২০০৮,৯২২.
৩৩. মুসলিম, হাদীস নং-৩১৭৪
📄 ষষ্ঠ কারণ : হুকুমের ইল্লত (কারণ) এর ব্যাপারে মতানৈক্য
অনেক সময় হাদীসের বর্ণনার ভিন্নতা সৃষ্টির কারণ হয় হুকুমের ইল্লতের ভিন্নতা। উদাহরণ স্বরূপঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসা ছিলেন এমন অবস্থায় এক কাফেরের লাশ তাঁর কাছ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাড়িয়ে গেলেন। কোন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ সকল ফেরেশতাদের সম্মানে দাড়িয়েছিলেন যারা লাশের সাথে এসেছিলেন। সুতরাং যদি মু'মিনের লাশ নেওয়া হয় তাহলে তো দাড়ানো সাভাবিকভাবেই উত্তম হবে। তাই যাদের মতে দাড়ানোর মূল কারণ এটাই (অর্থাৎ লাশের সাথে ফেরেস্তাদের সম্মানে দাড়ানো উচিত) তাঁরা এ হাদীস বর্ণনার সময় কাফের শব্দ উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করেন না। কেননা তাঁদের মতে কাফের বা মুসলমান হওয়া কোন পার্থক্য নেই। (লাশ মাত্রই তার সাথে ফেরেস্তা থাকেন)
পক্ষান্তরে অন্যান্য বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ জন্য দাড়িয়েছিলেন যেন মুসলমানদের মাথার উপর দিয়ে কোন কাফেরের লাশ না যায়। কেননা এতে মুসলমানের অসম্মান হবে। এ অবস্থায় দাড়ানো শুধু কাফেরের লাশের সাথে খাস। তাই এ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে কাফের শব্দ অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।
এমনিভাবে হযরত রাফে ইবনে খাদীজ রা. বর্ণনা করেন বর্গা চাষের ভিত্তিতে জমি দেওয়া আমাদের জন্য লাভ ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটাকে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ ও রাসূলের অনুস্বরন সকল লাভের উর্ধ্বে।৩৬ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. বর্ণনা করেন আমরা বর্গা চাষের ভিত্তিতে জমির কারবার করতাম আর আমরা এটাকে কোন দোষ মতে করতাম না। কিন্তু যখন হযরত রাফে ইবনে খদীজ রা. বললেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা করতে নিষেধ করেছেন তখন আমরা তা বাদ দিলাম।৩৭
হযরত রাফে ইবনে খাদীজ রা. থেকেই অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন আমার চাচা সহ অন্যান্য ব্যক্তিরা এভাবে জমিবর্গা দিতেন যে, নালার পার্শ্ববর্তী জমির থেকে উৎপন্ন ফসল জমির মালিকের জন্য। আর অবশিষ্টাংশের জমির ফসল কৃষকের। অথবা জমির অন্য কোন বিশেষ অংশ নিদৃষ্ট করেনিতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা নিষেধ করেছেন। কেউ রাফে ইবনে খাদীজ রা. কে জিজ্ঞাসা করলেন যদি টাকার বিনিময়ে হয় তাহলে? তিনি উত্তরে বললেন টাকার বিনিময় হলে কোন ক্ষতি নেই। ৩৮
পক্ষান্তরে উপরোক্ত বর্ণনা সমুহের বিপরীতে হযরত আমর ইবনে দীনার রাহ. বলেন আমি হযরত ত্বউস রাহ. কে বললাম যে, আপনি বর্গা চাষের ভিত্তিতে জমি দেওয়া বর্জন করুন। কেননা সাহাবাগন এ লেনদেন করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বললেন সাহাবাদের মধ্যে অধিক জ্ঞানী সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্গা চাষ করতে নিষেধ করেন নি। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, জমি কোন মুসলিম ভাইকে কোন কিছুর বিনিময় ছাড়া চাষাবাদের জন্য দেওয়া ভাড়া দেওয়ার চেয়ে উত্তম। এ দ্বারা বুঝা গেল যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর মতানুযায়ী উক্ত নিষেধের কারণ ছিল একজন মুসলমানের সাথে উত্তম ব্যবহার করা। মাসয়ালার দিক থেকে না-জায়েয হওয়ার কারণে নয়। কিন্তু হযরত রাফে এর মতানুযায়ী নিষেধের কারণ ছিল না-জায়েয হওয়া। এ ধরণের উদাহরণ হাদীসের কিতাবে অনেক রয়েছে। ৩৯
মোটকথা হল, হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অনেক সময় কোন হুকুমকে বর্ণনাকারী কোন কারণের উপর প্রয়োগ করেছেন। অর্থাৎ হাদীসের বর্ণিত হুকুম কোন কারণে হয়েছে। আবার অন্য বর্ণনাকারী ঐ হুকুমকেই অন্য কারণের উপর প্রয়োগ করেছেন। তাঁরা নিজ নিজ বুঝ অনুযায়ী হুকুমের কারণ বর্ণনা করেছেন যেমন তারা বুঝেছেন। কিন্তু যে ব্যক্তির সামনে উভয় ধরনের বর্ণনা, মূলনীতি উপস্থিত সে অবশ্যই একটিকে প্রাধান্য দিবেন। কোন একটিকে মূল এবং অন্যটির ব্যাখ্যা ও গবেষণার যোগ্য সাব্যস্ত করবেন। তবে এ কাজ কে আন্ন্জাম দিবেন? এ ধরনের কাজ কেবল সে ব্যক্তিই করতে পারবেন যার সামনে সকল বিষয়ের অসংখ্য হাদীস, প্রত্যেক হাদীসের বিভিন্ন শব্দ উপস্থিত রয়েছে। সে ব্যক্তি নয় যার সামনে শুধু একটি মাত্র হাদীস রয়েছে। সে ব্যক্তির তো এ হাদীসটি অন্য হাদীসের সাথে বাহ্যিক বিরোধ হওয়ার কথা জানে না। একটি হাদীসকে আরেকটি হাদীসের উপর প্রধান্য দেওয়ার বিভিন্ন কারণও তার জানা নেই। সে ব্যক্তি কি করে কোন একটি কারণকে প্রাধান্য দিতে পারবে এবং কোন একটি হাদীসকে অন্য হাদীসের উপর প্রাধান্য দিতে পারবে?
টিকাঃ
৩৪. নাসাঈ, হাদীস নং- ১৯৩১-
৩৫. নাসায়ী, হাদীস নং-১৯২৮.
৩৬. মুসলিম, হাদীস নং-৩৯৪৫, আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৩৯৫
৩৭. মুসলিম, হাদীস নং-৩৯৩৫.
৩৮. বুখারী, হাদীস নং-২৩৪৬.
৩৯. বুখারী, হাদীস নং-২৩৩০, মুসলিম, হাদীস নং-৩৯৫৭, আবু দাউদ, হাদীস নং- ৩৩৮৯, নাসায়ী, হাদীস নং-৩৯০৪.
📄 সপ্তম কারণ : হাদীসের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থের মাঝে মতানৈক্য হওয়া
হাদীসের বর্ণনার ভিন্নতার অন্যতম একটি বড় কারণ হল, অনেক শব্দ এমন রয়েছে যা আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থে সমানভাবে ব্যবহারিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক অর্থের দিকে লক্ষ্য করে কোন কথা বলেছেন কিন্তু কতক শ্রবনকারী এটাকে ভিন্ন অর্থ মনে করে ব্যবহার করেছেন। এর উদাহরণ দুই-একটি নয় বরং হাজার হাজার। উদাহরণ স্বরূপ 'ওযু' শব্দটি। পারিভাষিক অর্থে পরিচিত ওযুর অর্থে ব্যবহৃত হয়। শামায়েলে তিরমিযির এক বর্ণনায় এসেছে যে, হযরত সালমান ফারসী রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আরয করলেন যে, আমি তাওরাতে পড়েছি যে, খাওয়ার পরে ওযু করা খাবারে বরকত হওয়ার মাধ্যম। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন খাওয়ার আগে ও পরে ওযু করা খাবারে বরকত হওয়ার মাধ্যম।৪০ হযরত সালমান রা. এর উক্ত বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীতে যে ওযু শব্দটি ব্যবহারিত হয়েছে সবার কাছে স্পষ্ট যে এ ওযু দ্বারা উদ্দেশ্যে হাত ধৌত। (পারিভাষিক ওযু উদ্দেশ্য নয়)
এমনিভাবে তিরমিযি শরিফে ইকরাশ রা. থেকে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণিত হয়েছে যার শেষের দিকের অর্থ খানার শেষে পানি আনা হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা দ্বারা নিজ হাত মুবারক ধুলেন এবং মুখমন্ডল ও বাহুদ্বয়ের উপর মাছেহ করলেন আর বললেন, ইকরাশ আগুন দ্বারা পাকানো বস্তুর ব্যাপারে যে ওযু করার হুকম এসেছে তা হলো এই ওযু।৪১ বর্ণনাটি যদিও সমালোচিত কিন্তু এ বিষয় নিশ্চিত যে, উক্ত হাদীসে ওযু শব্দটি পারিভাষিক অর্থে ব্যবহৃত হয় নি।
এমনিভাবে 'জামউল ফাওয়ায়েদ' নামক কিতাবে হযরত বায্যার রহ. বর্ণনা করেন, হযরত মুয়ায রা. এর কাছে কেউ জিজ্ঞাসা করল আপনি আগুনে পাকানো খাবার খেয়ে কি ওযু করেন? তিনি বললেন হাত মুখমন্ডল ধোয়া এবং এটাকেই ওযু হিসেবে ব্যক্ত করা হয়। ৪২ এই বর্ণনার কারণে-ই চার ইমামের সর্ব সম্মতি সিদ্ধান্ত হলো, যে সকল হাদীসে আগুনে পাকানো খাবার খাওয়ার পর ওযুর কথা বলা হয়েছে সে সকল হাদীসে ওযু দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আভিধানিক অর্থ। অথবা (যদি পারিভাষিক ওযু উদ্দেশ্যে হয় তাহলে তা) হুকুম রহিত হয়ে গেছে।
এমন একটি বর্ণনা আছে যে, একবার হযরত আলী রা. ওযুর করেয়কটি অঙ্গ ধুয়ে বললেন مذا وضوء من لم يحدث 'ইহা ঐ ব্যক্তির ওযু যে পূর্ব থেকেই ওযু অবস্থায় আছে'। ৪৩ একথা তো নিশ্চিত যে কয়েকটি অঙ্গ ধোয়াকে শরয়ী ওযু বলে না। উক্ত উদাহরণগুলো হলো সে সকল স্থানের জন্য যেখানে নিশ্চিতভাবে শরয়ী ওযু উদ্দেশ্য নয়। এগুলো দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ওযু শব্দ ও অন্যান্য এমন শব্দ রয়েছে যেগুলো আভিধানিক, পারিভাষিক উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়।
সুতরাং এক্ষেত্রে মতানৈক্যের কারণ স্পষ্ট হল যে, অনেক সময় এমন অবস্থা হয় যে, কোন কোন বর্ননাকারী ওযু দ্বারা পারিভাষিক ওযু প্রয়োগ করেন তাই তিনি كوضوئه للصلوة শব্দ বৃদ্ধি করে দেন যাতে কোন সন্দেহ না থাকে ও শ্রবনকারীর কোন অস্পষ্টতা না থাকে। পক্ষান্তরে যে বর্ণনাকারীর তাহকীক অনুযায়ী ওযু দ্বারা এখানে পারিভাষিক ওযু নয় বরং আভিধানিক ওযুই উদ্দেশ্য, তিনি বর্ণনার ক্ষেত্রে হাত, মুখ ধোয়া শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করেন। যাতে শ্রবনকারীর কোন সন্দেহ না থাকে এবং সাথে সাথে হাদীসের অর্থও জানা হয়ে যায়। এভাবে এ ধরণের ক্ষেত্রে হাদীস বর্ণনার ভিন্নতা সৃষ্টি হয় যার ফলে সাহাবী, তাবেয়ী ও তাঁদের পরবর্তী মুজতাহিদ ইমামগনের মাঝেও মতানৈক্য হয়ে যায়। এ জন্যই প্রথম যুগে আগুনে পাকানো খাবার খাওয়ার পর ওযু ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে মতানৈক্য ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে ইমিগণের যুগে যেহেতু ওযু ভঙ্গের কারণ অধিক ছিল তাই ওয়াজিব না হৎ যাকে প্রাধন্য দেওয়া হয়েছে। চার ইমাম ওযু ভঙ্গ না হওয়ার উপর একমত হয়েছেন। তদুপরি এমন অসংখ্য মাসআলা রয়েছে যেগুলোতে উক্ত মতানৈক্য বাকী রয়েগেছে। উদাহরণ স্বরূপ পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করার কারণে ওযু করার হুকুম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন من مس ذكره فليتوضاً যে ব্যক্তি স্বীয় লজ্জস্থান স্পর্শ করবে সে যেন ওযু করে নেয়।৪৪ সাহাবা ও তাবেয়ীগনের মাঝে এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে যে, উক্ত ওযু দ্বারা কোন ওযু উদ্দেশ্য কারো কারো মতে পারিভাষিক ওযু উদ্দেশ্য আবার কারো কারো মতে অভিধানিক ওযু উদ্দেশ্যে। এক্ষেত্রে অন্য আরেকটি মতানৈক্য হলো কারো কারো মতে 'স্পর্শ করার' শব্দটি হাকীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং স্বাভাবিক হাত লাগানো উদ্দেশ্য। অন্য কারো কারো মতে এখানে 'স্পর্শ করা' শব্দটির অর্থ হলো পেশাব করা আর তা এজন্য যে, পেশাবের পর ইস্তেঞ্জা শিখানোর জন্য হাত দ্বারা স্পর্শ করা হয়। এমনিভাবে ওযুর হুকুমে ও মতানৈক্য ছিল আর তা হয়েছেও তাই কেউ কেউ এ ওযুকে ওয়াজিব মনে করে। পক্ষান্তরে কেউ কেউ এ ওযুকে উত্তম ও মুস্তাহাব মনে করে ওযু করাকে মুস্তাহাব বলেছেন। যা আমরা অষ্টম কারণে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো। এ প্রকার হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐ বাণী যে নামাযীর সামনে দিয়ে মহিলা, কুকুর ও গাধা যাওয়ার কারণে নামায ভঙ্গ হয়ে যায়। ৪৫ কতক শ্রবনকারী এটাকে বাহ্যিক অর্থে প্রয়োগ করে নামায ভঙ্গ হওয়া দ্বারা বাস্তবেই নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে বলেছেন। পক্ষান্তরে কোন কোন সাহাবী ও ফকীহদের মতে নামায ফাসেদ হওয়ার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। তবে তাঁদের নিকট এর হাকীকী অর্থ উদ্দেশ্য নয় বরং তাঁদের মতে 'নামায ফাসেদ/ভঙ্গ' হয়ে যাওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নামাযের একগ্রতা ও খুশু নষ্ট হয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য আর এর পক্ষে দুই একটি নয় বরং অসংখ্য আলামত বিদ্যমান রয়েছে। যা নিজ নিজ স্থানে বর্ণিত হয়েছে। আর এখানে সংক্ষিপ্ততার উদ্দেশ্য আমরা তা বর্জন করলাম।
টিকাঃ
৪০. শামায়েলে তিরমিযী, হাদীস নং-১৮৬
৪১. তিরমিযী, হাদীস নং-১৮৩৪
৪২. জামউল ফাওয়ায়েদ, হাদীস নং-২৭৭
৪৩. নাসাঈ, হাদীস নং ১৩০
৪৪. আবূ দাউদ, ১৮১, তিরমিযি, হাদীস নং ৮২, নাসাঈ, হাদীস নং ১৬৩, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪৯
৪৫. মুসলিম, হাদীস নং- ১১৩৯, আবূ দাউদ, হাদীস নং ৭০২, তিরমিযি, হাদীস নং ৩৩৮..
📄 অষ্টম কারণ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন কাজকে সাহাবাগণ সুন্নাত বা ওয়াজিব মনে করার ব্যাপারে মতানৈক্য
এ অষ্টম কারণ সপ্তম কারণের অনেকটা কাছাকছি। যার ফলে এ দিকে সংক্ষিপ্ত আকারে ইশারা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কোন কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন অথবা কোন কাজ করতে নিষেধ করেছেন। আর নির্দেশটি বিভিন্ন ভঙ্গিতে হতো। কতক শ্রবনকারী এ নির্দেশকে আবশ্যক ও পালন করা জরুরী মনে করেছেন। যার ফলে তাঁদের নিকট সে কাজ করা ওয়াজিব ও আবশ্যক ছিল। অন্য কতক শ্রবনকারী সে নির্দেশ মুতাবেক কাজ করাকে উত্তম মনে করেছেন। আবার আরেক দল এটাকে শুধু অনুমতি মনে করেছেন। অর্থাৎ ওয়াজিব বা উত্তম না বরং করলে করা যাবে এমনটি মনে করেছেন। এ প্রকার ভূক্ত হলো ওযুতে নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ। এ ক্ষেত্রে এক দল নির্দেশের বাহ্যিক দিক লক্ষ্য করে ওয়াজিব বলেছেন। অন্য এক দল লোক এটাকে মুস্তাহাব ও উত্তমের পর্যায়ে রেখেছেন। এমনিভাবে ঘুম থেকে উঠার পর ওযু করার পূর্বে হাত ধোয়ার নির্দেশকে এক দল লোক এটাকে বাহ্যিক অর্থে প্রয়োগ করে সে অবস্থায় হাত ধোয়া ওয়াজিব বলেছেন। পক্ষান্তরে অন্যদের মতে তা মুস্তাহাব ও সুন্নাত পর্যায়ে ছিল। বাস্তবে এ মতানৈকটা দীর্ঘ আলোচনার বিষয়।
এই মতানৈক্য দূর করা মুজতাহিদ ও ফকীহ ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। এজন্য শুধু হুকুম সামনে আসলে প্রত্যেক ব্যক্তি বাধ্য যে, অন্যান্য নির্দেশ ও হুকুম আহকাম দেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যে, এই নির্দেশ বা হুকুম কোন পর্যায়ের। এক হাদীসে শেষ বৈঠকে বসে তাশাহুদ পড়ার নির্দেশ এসেছে।৪৬ অন্য হাদীসে اقتلوا الاسودين في الصلاة الحية والعقرب অর্থ, নামাযে দুই প্রানী সাঁপ ও বিচ্ছু হত্যা করো। নামাযে সাপ ও বিচ্ছু মারার নির্দেশ এসেছে। ৪৭ আর একথা স্পষ্ট যে, উভয় হুকুম এক পর্যায়ের নয়, এ কারনেই স্বয়ং ইমামদের মাঝেও মতানৈক্য হয়েছে যে, উক্ত সমস্ত হুকুম ওয়াজিব নাকি মুস্তাহাব বা উত্তমের পর্যায়ের? এসব কারণে ইমামগণের নিকট মতানৈক্য আছে যে, নামাজে এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় যাওয়ার সময় তাকবীর বলা, রুকু সিজদায় স্থীর থাকার হুকুম, রুকু সিজদার তাসবীহ পাঠ করা, আত্তাহিয়্যাতু পড়া এসব হুকুম বা নির্দেশ ওয়াজিব নাকি সুন্নাত বা মুস্তাহব নাকি উত্তম পর্যায়ের। প্রত্যেক মুজতাহিদ অত্যন্ত মেহনত ও গভীর দৃষ্টি দিয়ে অন্যান্য বর্ণনা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মপন্থা, সাহাবাগনের কর্মপন্থা ও প্রাধান্য দেওয়ার নীতিমালাগুলো সামনে রেখে উক্ত বর্ণনাগুলোর মাঝে পার্থক্য বর্ণনা করেছেন। তাহকীকের পর প্রত্যেকটি হুকুমকে তার যথাস্থানে রেখেছেন। এসব আলোচনার দ্বারা মুজতাহিদের প্রয়োজনিয়তা অনুভব করা যায়। আর এটাও বুঝা যায় যে তাকলীদ বা অনুসরণ ছাড়া উপায় নেই। বুখারী শরীফের তরজমায় শুধু কোন কাজ করা বা না করার নির্দেশ দেখে এ কথা জানা যে এটা ওয়াজিব অথবা মুস্তাহাব এটা কখনো সম্ভব না।
এ কারণেই উলামায়ে কেরাম হাদীস পড়ানোর জন্য প্রথমে উসূলে ফেকাহ ও উসূলে হাদীস পড়া জরুরী মনে করেন। এ জন্যই উলামায়ে কেরাম আবশ্যক করেছেন যে, মুজতাহিদের জন্য কমপক্ষে কুরআনের ইলম অর্থাৎ তাঁর আহকামঃ খাস, আম, মুজমাল, মুহকাম, মুফাসসার, মুআওয়াল, নাসেখ, মানসুখ ইত্যাদি ইত্যাদি জানা আবশ্যক। আর ইলমে হাদীসের সম্পর্কে যথাযথভাবে অবগত হওয়া অর্থাৎ বর্ণনার স্তরঃ মুতাওয়াতির, গায়রে মুতাওয়াতির, মুরসাল, মুত্তাসিল, সহীহ, মুআল্লাল, যয়ীফ, কওয়ী ও রেওযায়েতের স্তর জানা এগুলোর সাথে সাথে আভিধানিক দক্ষতা, নাহবী নিয়ম কানুন সম্পর্কে অবগত, সাহাবা ও তাবেয়ীদের কোন বিষয়ে একমত আর কোন বিষয়ে মতানৈক্য তা জানা জরুরী। উপরোক্ত সবগুলোর সাথে সাথে কিয়াসের বিভিন্ন ধরন ও প্রকার সম্পর্কে জানা থাকতে হবে।
টিকাঃ
৪৬. বুখারী, হাদীস নং ৮৩১, মুসলিম, হাদীস নং ৭৮৯৮, আবূ দাউদ, হাদীস নং ৯৬৮, নাসাঈ, হাদীস নং ১১৬৭, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৮৯৯.
৪৭. আবূ দাউদ, হাদীস নং ৯২১, তিরমিযি, হাদীস নং ৩৯০.