📘 ইমামগণের মতবিরোধ কি ও কেন 📄 তৃতীয় কারণ : কোন ব্যাপক হুকুমকে খাস হুকুম মনে করা

📄 তৃতীয় কারণ : কোন ব্যাপক হুকুমকে খাস হুকুম মনে করা


তৃতীয় কারণ হলো দ্বিতীয় কারণের বিপরীত অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন হুকুম ব্যাপক আকারে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু বর্ণনাকারী সেটাকে কোন বিশেষ ব্যক্তির সাথে অথবা কোন বিশেষ সময়ের সাথে খাস মনে করেছেন। এর উদাহরণ ও পূর্বোক্ত বর্ণনাসমূহ দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেছে। উদাহরণ স্বরুপ মৃতকে শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর বর্ণনা যা হযরত আয়েশা রা. এর মতে ইয়াহুদী মহিলার সাথে খাস ছিল। আর এ সকল স্থান যাচাই বাছাই করার জন্য মুজতাহিদ ইমামগণের প্রয়োজন। যাদের সামনে বিভিন্ন ধরণের বর্ণনা উপস্থিত রয়েছে। সাহাবাগণের বিভিন্ন বানী উপস্থিত থাকলে যেগুলোর মাঝে সমন্বয় থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, কোন হুকুমটি ব্যাপক আর কোনটি খাস এবং এর কারণ কি? তদ্রুপ এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে কেন কোন বিষয় কোন এক ব্যক্তির জন্য জায়েয সাব্যস্ত করা হয়েছে আবার ঐ বিষয়টি অন্য ব্যক্তির জন্য না-জায়েয সাব্যস্ত করা হয়েছে?

📘 ইমামগণের মতবিরোধ কি ও কেন 📄 চতুর্থ কারণ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি কাজ থেকে বিভিন্ন বিষয় ইসতিম্বাত (উদঘাটন) করা

📄 চতুর্থ কারণ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি কাজ থেকে বিভিন্ন বিষয় ইসতিম্বাত (উদঘাটন) করা


হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে মতানৈক্য অনেক সময় এ কারণে হয়ে থাকে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাধিক ব্যক্তিকে কোন একটি কাজ করতে দেখেছেন আর বিভিন্ন মানুষের বুঝ শক্তি বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে এটাতো স্পষ্ট। যেমন কেউ কেউ মুজতাহিদ ফকীহ ও বিজ্ঞ হয়ে থাকেন, তাই বিষয়টি তাঁর দৃষ্টি ভঙ্গিতে বুঝেছেন। তিনি ঘটনা যতার্থ বুঝেছেন। আবার কেউ প্রখর মেধার অধিকারী। তাই ঘটনা স্বরণ রাখার ক্ষেত্রে পূর্বোক্ত ব্যক্তি থেকেও অধিক যোগ্য। কিন্তু মাসয়ালা বুঝার দিক থেকে প্রথম ব্যক্তির চেয়ে নিম্ন স্থরের। এ ধরণের ব্যক্তিরা নিজ বুঝশক্তি অনুযায়ী ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এর উদাহরণ হজ্জের অধ্যায়ে অনেক রয়েছে।

উদাহরণঃ এক ব্যক্তি বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে لبيك بحجته বলতে শুনেছেন।২৯ এতে কোন সন্দেহ নেই যে এই বর্ণনা সহীহ। আর এতেও কোন সন্দেহ নেই যে, তিনি বর্ণনা করার ক্ষেত্রে কোন ত্রুটি করেন নি। কিন্তু অন্যান্য সাহাবাগণ বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিরান হজ্জের ইহরাম বেধে ছিলেন।২৮ এই বর্ণনা টি বাহ্যত প্রথমোক্ত বর্ণনার বিপরীত বুঝা যায়। কেননা কেরান হজ্জ হল এফরাদ হজ্জের বিপরীত। কিন্তু বাস্ত বতা হল, উভয় বর্ণনার মাঝে কোন বৈপরিত্য নেই। কেননা কেরানকারীর জন্য " لبيك بحجته" বলাও জায়েয আছে। এখন শুধু মুজতাহিদের কাজ উভয় ধরণের বর্ণনা সামনে রেখে তাতে সমন্বয় করা ও উভয়টির প্রয়োগ স্থল পৃথক সাব্যস্ত করা। যাতে বিভিন্ন বর্ণনার পার্থক্যের কারণে সংশয় সৃষ্টি না হয়। এ ধরণের আরেকটা বিষয় হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম বাঁধার আমল কোথা থেকে শুরু করেছেন। এ ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইহরামের কাজ শুরু করার বর্ণনার ভিন্নতার কারণেই ইমামগণের মাঝেও মতানৈক্য হয়ে গেছে যে, ইহরাম বাঁধা কখন উত্তম?

এই বর্ণনার ভিন্নতার কারণেই প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রহ. হিবরুল উম্মাহ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর কাছে এই বর্ণনার ভিন্নতা উল্লেখ করে সমাধান জানতে চেয়েছেন। আবু দাউদ শরীফে এর বিস্তারিত বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। যার মোটামোটি অর্থ হল,

হযরত আবু সাঈদ ইবনে জুবাইর রা. বর্ণনা করেন, 'আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর কাছে জিজ্ঞাসা করলাম যে, সাহাবাদের এই মতানৈক্য আমার কাছে অবাক লাগে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইহরাম বাঁধার কাজ শুরু কখন হয়েছিল আমার বুঝে আসে না এতো মতানৈক্য কেন হল?' উত্তরে তিনি বললেন এর মূল বিষয় আমার ভালোভাবে জানা আছে, বাস্তবতা হল এই যে, হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু একবার হজ্জ করেছেন (তাও আবার জীবনের শেষ প্রান্তে। এজন্য অনেক লোকের সমাবেশ হয়েছিল, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে অবস্থায় যে কাজ করতে দেখেছেন সেটাকেই তিনি আসল মনে করেছেন) এ জন্য মতানৈক্য হয়ে গেছে। সে হজ্জের ঘটনা ছিল নিম্নরুপ,

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্জের সফরে যখন যুলহুলাইফা নামক স্থানে অবস্থান করেন সেখানকার মসজিদে ইহরাম বাঁধলেন তখনই ইহরাম বেঁধেছিলেন যে সময় যে পরিমাণে লোক উপস্থিত ছিল তাঁরা তা শুনলেন এবং পরবর্তীতে তারা এটাই বর্ণনা করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম শেষ করে উটে আরোহন করলেন। উট যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিয়ে দাঁড়াল তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার জোরে 'লাব্বাইক' বললেন। যারা আগেও উপস্থিত ছিলেন তারাতো বুঝলেন যে এ 'লাইব্বক' দ্বিতীয়বার। কিন্তু সে সময় যারা নিকটে ছিলেন এবং প্রথমে নিকটে ছিলেন না এবং প্রথম 'লাইব্বাক' শুনেন নাই তাঁরা এটা বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটে আরোহন করার পর ইহরাম বাঁধার কাজ শুরু করেছেন। উপস্থিত লোক সংখ্যা বেশী হওয়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আওয়াজ সকলের কাছে পৌঁছে নাই। আর প্রত্যেক সাহাবী অনেক বার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাত করতে পারেন নাই। বরং খন্ড খন্ড দলে বিভক্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হতেন এবং মাসআলা জিজ্ঞাসা করতেন। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উট সেখান থেকে বায়দার নামক স্থানের উঁচু জায়গায় আরোহন করলেন। আর (হাজীদের জন্য যেহেতু উঁচু স্থানে 'লাব্বাইক' বলা মুস্তাহাব তাই) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে উঁচু আওয়াজে 'লাব্বাইক' বলেছেন। আর সে সময় যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছিলেন তাঁরা এটা শুনলেন এবং এটাই বর্ণনা করলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়দার নামক স্থানে ইহরাম বেঁধেছেন অথচ আল্লাহর কছম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজের জায়গায় ইহরাম বেঁধেছিলেন আর অন্য সকল স্থানেই 'লাব্বাইক' বলেছেন। ২৯ আর যেহেতু হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রা. বিভিন্ন বর্ণনা শুনেছিলেন সেহেতু তাঁর তাহকীক করার প্রয়োজন হয়েছিল। আর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এ সব ঘটনা জানতেন এ জন্য অত্যন্ত আস্থার সাথে ইহরাম বাঁধার শুরু কোথায় হয়েছিল তা বলে দিয়েছেন এবং তিনি নিজে ফকীহ ও মুজতাহিদ ছিলেন তাই বর্ণনার ভিন্নতা হওয়ায় সেগুলোর মাঝে সমন্বয়ও করে দিয়েছেন। কিন্তু কোন সাধারন মানুষ এই ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনার শুধু শব্দের অনুবাদ জানলে সে বেচারা খুব পেরেশান হয়ে যাবে এবং ধারণাপ্রসূত বিভিন্ন প্রশ্ন ও অভিযোগ করে ফেলবে। এজন্যই 'গায়রে মুকাল্লেদরা'ও নিজেদের বাড়াবাড়ি ও গোড়ামি সত্ত্বেও 'তাকলীদ' (অনুস্বরন) থেকে মুক্ত নয়। হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ নিজ কিতাব 'ছাবীলুর রশাদ' নামক কিতাবে গায়রে মুকাল্লেদদের নেতা মৌলভি মুহাম্মাদ হুসাইন বাটলবী এর কথা 'ইশাআতুস সুন্নাহ' নামক কিতাব থেকে উল্লেখ করেছেন। প্রথমতঃ ১১ তম খন্ডের ২১১ পৃষ্টায় লেখেন 'গায়রে মুজাতাহিদ মুতলকের জন্য মুজতাহিদ থেকে পলায়ন করার কোন সুযোগ নেই' (যারা কোন মাযহাবের অনুসারী নয় তারা কোন কোন মাযহাব বা মতের অনুসরণ করা থেকে বাচতে পারবে না)। দ্বিতীয়ত ১১তম খন্ডের ৫৩ পৃষ্টার লেখেন ২৫ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি একথা বুঝতে পেরেছি যে, ইলমহীন লোকেরা মুজতাহিদে মুতলাক ও মুতলাক তাকলীদ বর্জনকারী হয়ে যায় (যে ইলমহীন লোকেরা কোনো মাযহাবের অনুসরণ না করে তারা শেষ পর্যায়ে) পরিশেষে ইসলামকে বিদায় জানায়। তাদের মধ্যে কিছু লোক হয় খ্রীষ্টান। আর কিছু হয় লা-মাযহাব যাদের দ্বীন ও মাযহাবের কোন পরওয়া থাকে না। আর এটাই হল, শরীয়তের বিধিবিধানের গণ্ডি থেকে বের হওয়া এবং বিধিবিধান অমান্য করার সামান্য কুফল।'

টিকাঃ
২৯. নাসায়ী, হাদীস নং ৮৮৩০
২৮. বুখারী, হাদীস নং ১৫৬৩, মুসলিম, হাদীস নং ২৯৯৫
২৯. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৭৭০

📘 ইমামগণের মতবিরোধ কি ও কেন 📄 পঞ্চম কারণ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন আমলকে অভ্যাস বা সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করা

📄 পঞ্চম কারণ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন আমলকে অভ্যাস বা সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করা


-এই কারণ ও পূর্বোক্ত কারণের কাছাকাছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিভিন্ন কাজ কর্ম দেখে কিছু লোক ঐ কাজকে স্বভাব প্রসূত ও সাধারণ অভ্যাস মনে করেছেন। আবার কেউ এ কাজ কর্ম দেখে এটাকে ইচ্ছাকৃত ইবাদত মনে করেছেন। তাঁরা এটাকে সুন্নত ও মুস্ত াহাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর অনেক উদাহরণ হাদীসের কিতাবে রয়েছে। তবে নমুনা হিসেবে বিদায় হজ্জে 'আবতহ' নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবস্থান করাকে দেখা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ অবস্থানকে কেউ অস্বিকার করেনি। হযরত আবু হুরায়রা রা. ও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর মতে এটাও হজ্জের আমল সমূহের একটি আমল। তাই হাজীদের জন্য সেখানে অবস্থান করা সুন্নত।৩০ পক্ষান্তরে হযরত আয়েশা ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর মতে উক্ত যায়গায় অবস্থান ঘটনাক্রমে হয়েছিল (ইবাদত হিসেবে নয়) তাই এর সাথে হজ্জের মাসয়ালার কোন সম্পর্ক নেই। খাদেমরা সেখানে তাঁবু গেঁড়েছিল এ জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে অবস্থান করেছিলেন। তাছাড়া সেখান থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় যাওয়াও সহজ ছিল। কেননা কাফেলা এদিক থেকে সেদিক ছত্র ভঙ্গ হয়ে যাবে। ৩২

এক্ষেত্রে ফকীহ ও মুজতাহিদের প্রয়োজনীয়তাকে কেউ অস্বিকার করতে পারবে না। যার কাজ হবে উক্ত অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন সাহাবী রা. থেকে বিভিন্ন বর্ণনা ও মতামত গুলোকে একত্রিত করে সেগুলোর মধ্য থেকে কোন একটিকে প্রাধান্য দেওয়া। আর ইমামগণ এ কাজই করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিম্নোক্ত বাণী

منز لنا غدا انشاء الله بخيف بني كنانة حيث تقاسموا على الكفر

অর্থাৎ ইনশাআল্লাহ আমরা আগামীকাল খাইফে বনী কিনানাতে অবস্থান করবো। যেখানে নবুওয়াতের প্রথম দিকে মক্কার কাফেররা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে পরস্পর ওয়াদাবদ্ধ হয়েছিল। এ বাণী থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেখানে অবস্থান করা ঘটনাক্রমে হয়নি বরং কাফেরদের কুফরী নিদর্শন প্রকাশ করার স্থানে ইসলামের নিদর্শন প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে সেখানে অবস্থান করেছেন। এর সাথে যদি অন্যান্য আরো কোন উপকারিতা পাওয়া যায় যেমন, মদীনা মুনাওয়ারার রাস্তা যেহেতু সেদিকে। এজন্য ফিরে আসতে সহজ হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এ বিষয়গুলো এ কথা প্রমাণ করেনা যে, সেখানের অবস্থান ইচ্ছাকৃত ছিল না। (বরং প্রমাণ করে যে সেখানের অবস্থান ইচ্ছাকৃত ছিল।)

টিকাঃ
৩০. বুখারী, হাদীস নং ১৬৫৩, মুসলিম, হাদীস নং-৩১৬৬
৩১. বুখারী, হাদীস নং ১৭৬৮, মুসলিম, হাদীস নং-৩১৬৮
৩২. বুখারী, হাদীস নং-১৭৬৫,১৭৬৬, মুসলিম, হাদীস নং-৩১৬৯, ৩১৭২ আবু দাউদ, হাদীস নং-২০০৮,৯২২.
৩৩. মুসলিম, হাদীস নং-৩১৭৪

📘 ইমামগণের মতবিরোধ কি ও কেন 📄 ষষ্ঠ কারণ : হুকুমের ইল্লত (কারণ) এর ব্যাপারে মতানৈক্য

📄 ষষ্ঠ কারণ : হুকুমের ইল্লত (কারণ) এর ব্যাপারে মতানৈক্য


অনেক সময় হাদীসের বর্ণনার ভিন্নতা সৃষ্টির কারণ হয় হুকুমের ইল্লতের ভিন্নতা। উদাহরণ স্বরূপঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসা ছিলেন এমন অবস্থায় এক কাফেরের লাশ তাঁর কাছ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাড়িয়ে গেলেন। কোন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ সকল ফেরেশতাদের সম্মানে দাড়িয়েছিলেন যারা লাশের সাথে এসেছিলেন। সুতরাং যদি মু'মিনের লাশ নেওয়া হয় তাহলে তো দাড়ানো সাভাবিকভাবেই উত্তম হবে। তাই যাদের মতে দাড়ানোর মূল কারণ এটাই (অর্থাৎ লাশের সাথে ফেরেস্তাদের সম্মানে দাড়ানো উচিত) তাঁরা এ হাদীস বর্ণনার সময় কাফের শব্দ উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করেন না। কেননা তাঁদের মতে কাফের বা মুসলমান হওয়া কোন পার্থক্য নেই। (লাশ মাত্রই তার সাথে ফেরেস্তা থাকেন)

পক্ষান্তরে অন্যান্য বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ জন্য দাড়িয়েছিলেন যেন মুসলমানদের মাথার উপর দিয়ে কোন কাফেরের লাশ না যায়। কেননা এতে মুসলমানের অসম্মান হবে। এ অবস্থায় দাড়ানো শুধু কাফেরের লাশের সাথে খাস। তাই এ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে কাফের শব্দ অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।

এমনিভাবে হযরত রাফে ইবনে খাদীজ রা. বর্ণনা করেন বর্গা চাষের ভিত্তিতে জমি দেওয়া আমাদের জন্য লাভ ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটাকে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ ও রাসূলের অনুস্বরন সকল লাভের উর্ধ্বে।৩৬ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. বর্ণনা করেন আমরা বর্গা চাষের ভিত্তিতে জমির কারবার করতাম আর আমরা এটাকে কোন দোষ মতে করতাম না। কিন্তু যখন হযরত রাফে ইবনে খদীজ রা. বললেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা করতে নিষেধ করেছেন তখন আমরা তা বাদ দিলাম।৩৭

হযরত রাফে ইবনে খাদীজ রা. থেকেই অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন আমার চাচা সহ অন্যান্য ব্যক্তিরা এভাবে জমিবর্গা দিতেন যে, নালার পার্শ্ববর্তী জমির থেকে উৎপন্ন ফসল জমির মালিকের জন্য। আর অবশিষ্টাংশের জমির ফসল কৃষকের। অথবা জমির অন্য কোন বিশেষ অংশ নিদৃষ্ট করেনিতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা নিষেধ করেছেন। কেউ রাফে ইবনে খাদীজ রা. কে জিজ্ঞাসা করলেন যদি টাকার বিনিময়ে হয় তাহলে? তিনি উত্তরে বললেন টাকার বিনিময় হলে কোন ক্ষতি নেই। ৩৮

পক্ষান্তরে উপরোক্ত বর্ণনা সমুহের বিপরীতে হযরত আমর ইবনে দীনার রাহ. বলেন আমি হযরত ত্বউস রাহ. কে বললাম যে, আপনি বর্গা চাষের ভিত্তিতে জমি দেওয়া বর্জন করুন। কেননা সাহাবাগন এ লেনদেন করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বললেন সাহাবাদের মধ্যে অধিক জ্ঞানী সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্গা চাষ করতে নিষেধ করেন নি। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, জমি কোন মুসলিম ভাইকে কোন কিছুর বিনিময় ছাড়া চাষাবাদের জন্য দেওয়া ভাড়া দেওয়ার চেয়ে উত্তম। এ দ্বারা বুঝা গেল যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর মতানুযায়ী উক্ত নিষেধের কারণ ছিল একজন মুসলমানের সাথে উত্তম ব্যবহার করা। মাসয়ালার দিক থেকে না-জায়েয হওয়ার কারণে নয়। কিন্তু হযরত রাফে এর মতানুযায়ী নিষেধের কারণ ছিল না-জায়েয হওয়া। এ ধরণের উদাহরণ হাদীসের কিতাবে অনেক রয়েছে। ৩৯

মোটকথা হল, হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অনেক সময় কোন হুকুমকে বর্ণনাকারী কোন কারণের উপর প্রয়োগ করেছেন। অর্থাৎ হাদীসের বর্ণিত হুকুম কোন কারণে হয়েছে। আবার অন্য বর্ণনাকারী ঐ হুকুমকেই অন্য কারণের উপর প্রয়োগ করেছেন। তাঁরা নিজ নিজ বুঝ অনুযায়ী হুকুমের কারণ বর্ণনা করেছেন যেমন তারা বুঝেছেন। কিন্তু যে ব্যক্তির সামনে উভয় ধরনের বর্ণনা, মূলনীতি উপস্থিত সে অবশ্যই একটিকে প্রাধান্য দিবেন। কোন একটিকে মূল এবং অন্যটির ব্যাখ্যা ও গবেষণার যোগ্য সাব্যস্ত করবেন। তবে এ কাজ কে আন্‌ন্জাম দিবেন? এ ধরনের কাজ কেবল সে ব্যক্তিই করতে পারবেন যার সামনে সকল বিষয়ের অসংখ্য হাদীস, প্রত্যেক হাদীসের বিভিন্ন শব্দ উপস্থিত রয়েছে। সে ব্যক্তি নয় যার সামনে শুধু একটি মাত্র হাদীস রয়েছে। সে ব্যক্তির তো এ হাদীসটি অন্য হাদীসের সাথে বাহ্যিক বিরোধ হওয়ার কথা জানে না। একটি হাদীসকে আরেকটি হাদীসের উপর প্রধান্য দেওয়ার বিভিন্ন কারণও তার জানা নেই। সে ব্যক্তি কি করে কোন একটি কারণকে প্রাধান্য দিতে পারবে এবং কোন একটি হাদীসকে অন্য হাদীসের উপর প্রাধান্য দিতে পারবে?

টিকাঃ
৩৪. নাসাঈ, হাদীস নং- ১৯৩১-
৩৫. নাসায়ী, হাদীস নং-১৯২৮.
৩৬. মুসলিম, হাদীস নং-৩৯৪৫, আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৩৯৫
৩৭. মুসলিম, হাদীস নং-৩৯৩৫.
৩৮. বুখারী, হাদীস নং-২৩৪৬.
৩৯. বুখারী, হাদীস নং-২৩৩০, মুসলিম, হাদীস নং-৩৯৫৭, আবু দাউদ, হাদীস নং- ৩৩৮৯, নাসায়ী, হাদীস নং-৩৯০৪.

ফন্ট সাইজ
15px
17px