📘 ইমামগণের মতবিরোধ কি ও কেন > 📄 প্রথম কারণ : সাহাবা কেরাম রা. এর কারণ না জানা

📄 প্রথম কারণ : সাহাবা কেরাম রা. এর কারণ না জানা


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মাসআলা শিক্ষা করা, শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি বর্তমান যুগের মতো এমন ছিল না। বর্তমানে যেমন, ফেকাহের নামে সতন্ত্র কিতাব ও প্রবন্ধ, ছোট বড় লেখা, প্রত্যেকটি মাসআলা পৃথক পৃথক করে লেখা, প্রত্যেকটি মাসআলা ও আহকামের রুকন ও শর্ত, আদব ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহে পৃথক পৃথক করে লেখা হয়েছে। কিন্তু পূর্ব যুগে অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মাসাইল শিখা ও শিখানোর পদ্ধতি ছিল এই যে, কোন হুকুম নাযিল হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা বাণী ও কর্মের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে দেখাতেন। যেমন ওযুর বিধান নাযিল হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওযু করে দেখিয়ে দিয়েছেন। নামাজের বিধান নাযিল জিবরাইল আ. নিজে পড়িয়ে দেখিয়েছেন আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাগণকে শিখিয়েছেন। তখন এ সমস্ত ইবাদত ও বিধানের বিশ্লেষণ করা হত না যে এটা ফরয, এটা ওয়াজিব ও এটা সুন্নাত। সাহাবাগণ রা. বিভিন্ন সম্ভাবনা ও যুক্তি সম্পর্কে প্রশ্নই করতেন না। যদি কেউ কোন বিষয়ে প্রশ্ন বা অভিযোগ করতো সেটা সবাই বিয়াদবী মনে করতো এবং তাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হতো।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবেন ওমর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, কোন ব্যক্তির স্ত্রী যদি সমজিদে নামায আদায় করতে চায় তাহলে সে যেন বাঁধা না দেয়, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর এক পুত্র তাঁর যুগের (খারাপ) অবস্থা দেখে বলল আমি (বর্তমান যুগে) মসজিদে যেতে দিব না।' হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসের বিপরীতে পুত্রের উক্ত উক্তি শুনে শুধু ধমকিই দিলেন না বরং মুসনাদে আহমাদের বর্ণনা অনুযায়ী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পুত্রের সাথে কথাও বলেন নি।২ আর পুত্রকে লক্ষ্য করে বললেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী বর্ণনা করলাম আর তুমি তার উত্তরে কথা বললে।১

এমনিভাবে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. এর কাছে কোন এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন যে, বেত্র নামায ওয়াজিব না সুন্নাত? উত্তরে তিনি বললেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা আদায় করতেন, সাহাবাগন সর্বদা আদায় করতেন, এরপরও সে তিনবার জিজ্ঞাসা করল বেত্র নামায ওয়াজিব না সুন্নাত? হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. একই উত্তর দিতে লাগলেন।৩ এর উদ্দেশ্য ছিল যে, আমল কারীর জন্য বিশ্লেষণ করার কোন প্রয়োজন নেই। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাগনের আমল এই ছিল তখন এটা আমাল করা ওয়াজিব বুঝা যায়, মোটকথা মাসআলা শিক্ষা করা ও দেওয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমলের মাধ্যমেই হত। সে সময় 'উযুতে অমুক কাজ ছুটে গেলে কি হুকুম? আর এমনটি করলে কি হুকুম?' এ ধরণের প্রশ্ন করাকে সবাই অপছন্দ করতেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, হযরত ওমর রা. এমন ব্যক্তির ব্যাপারে লানত করেছেন যে ব্যক্তি এমন সকল বিষয়ে প্রশ্ন করে যা এখনো উপস্থিত হয় নি, তখন কোন সমস্যা বা মাসআলা সংঘঠিত হলে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে জিজ্ঞাসা করা হত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে মাসায়ালার মুনাসেব ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হুকুম বর্ণনা করে দিতেন এসকল ক্ষেত্রে মতানৈক্য হওয়া আবশ্যিক ও স্পষ্ট।

নিন্মের উদাহরণ স্বরুপ কয়েকটি ঘটনা দ্বারা এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে যাবে। ইমাম মুসলিম রহঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, এক অন্ধ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আরয করল যে, মসজিদে পৌঁছে দেওয়ার মত আমার কোন লোক নেই তাই আমার জন্য এই অনুমতি আছে কি যে, আমি মসজিদে না যেয়ে ঘরে নামায আদায় করব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দিলেন, এরপর এ কথা জানতে পেরে যে, তার ঘর মসজিদের এত নিকটে যে, আযান তার ঘরে পৌঁছে তখন তাকে অনুমতি দিলেন না এবং মসজিদে এসে নামাযে শরীক হতে বললেন।৪ কিন্তু ইতবান ইবনে মালেক রা. এর ঘটনায় জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর অন্ধত্বের ওযর কবুল করে তাকে মসজিদে না আসার অনুমতি দিয়েছেন।৫

এমনিভাবে আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ রা. আযানের শব্দগুলো স্বপ্নে দেখেছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে এই অনুমতি দিয়েছিলেন যে, বেলাল রা. আযান দিবেন আর তিনি তাকবীর বলবেন।৬ কিন্তু এক সফরের ঘটনায় বনিত আছে যে, যিয়াদ ইবনে হারেস সাদায়ী রা. আযান দিলেন এর পর বেলাল রা. তাকবীর বলার ইচ্ছা করলেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে, যে ব্যক্তি আযান দিবে তাকবীর বলা তারই অধিকার এবং বেলাল রা. কে তাকবীর বলা থেকে বাঁধা দিলেন।'৭

হযরত আবু বকর রা. একবার নিজের সমস্ত সম্পদ সদকা করলেন আর তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা গ্রহণও করলেন।"৮ কিন্তু অন্যান্য অনেক সাহাবী এমন ছিলেন যারা নিজের সমস্ত সম্পদ সদকা করেছেন অথবা সদকা করার ইচ্ছ করেছেন কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের কে বাধা দিয়েছেন বা নিষেধ করেছেন।"৯

মোটকথা এ ধরনের ঘটনা দু-একটি নয় বরং শত-সহস্র পর্যন্ত পৌছবে যেগুলো দ্বারা এ বিষয় স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন কোন সাহাবীকে এমন কোন হুকুম ও নির্দেশ দিয়েছেন যা অন্যান্য সাহাবীদের দেননি। হযরত আবূ হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে রোজা অবস্থায় তার স্ত্রীকে চুমু দেওয়ার অনুমতি দিলেন। কিন্তু অন্য এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলে তাঁকে নিষেধ করলেন। অনুমতি দিলেন না।১০ একথা শুনলে হঠাৎ বুঝে আসল যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকে অনুমতি দিয়েছেন সে বৃদ্ধ আর যাকে অনুমিত দেন নি বা বারন করলেন সে যুবক ছিল।

সুতরাং উপরোক্ত ঘটনাগুলোতে প্রত্যেক সাহাবী এ বিষয়ই বর্ণনা করলেন যা তাঁর সামনে ঘটেছে ও যা তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে জেনে নিয়েছেন। যাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা অবস্থায় স্ত্রীর সহিত আলিঙ্গন করা ও চুমু দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন সে অবশ্যই সকলের কাছে এ কথাই পৌঁছানোর চেষ্টা করবে যে, রোজা অবস্থায় চুমু দেওয়া ও আলিঙ্গন করা জায়েয ও রোজা ভঙ্গকারী নয়, পক্ষান্তরে অন্য ব্যক্তি বেশ শক্ত ভাবেই তার বিপরীত বর্ণনা করবে এবং রোজা অবস্থায় এটাকে না-জায়েয বর্ণনা করবে, আর এটাই শেষ নয় যে, এই দুই ব্যক্তির ভিন্ন দু'টি বর্ণনা হয়ে গেছে বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে সব সময় ইলম অন্বেষনকারী ও আশেকীনদের জামাত, মাসআলা জিজ্ঞাসাকারী, যিয়ারতকারী, দূত ও আমীরদের আনাগোনা হতে থাকতো।

এ কারণে উক্ত ভিন্ন দুটি হুকুম ভিন্ন ভিন্ন সময়ে শ্রবনকারীরা যেখানে যাবেন তাঁরা সেখানে তিনি যা শুনেছেন তিনি সেটাই বর্ণনা করবেন যা তাঁরা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে নিজ কানে শুনেছেন। বাস্তবে এটা এমন একটি ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার অধিনে যে পরিমানই বর্ণনার ভিন্নতা হোক তা অনেক কমই হয়েছে। কেননা মজলিসে মা'যুর গায়রে-মা'যুর, সুস্থ অসুস্থ, শক্তিশালী, দূর্বল সব ধরনের লোক আসতো আর প্রত্যেক ব্যক্তির শক্তি ও দূর্বলতার দিকে লক্ষ্য করে তার জন্য হুকুম পরিবর্তন হয়ে যেত। কোন কোন ব্যক্তির অন্তর এত শক্ত ছিল যে, যদি নিজের সমস্ত সম্পদ সদকা করে দেয় তাহলে তার যবানে অভিযোগ অথবা প্রশ্ন তো দূরে কথা বরং তার অন্তরে এই প্রশান্তি লাভ হতো যে, তার যতই কষ্ট হবে ততই আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টি লাভ হবে ও আল্লাহর দিকে ধাবিত তত বেশী হতে থাকবে। এধরণের ব্যক্তির জন্য খুবই সমুচিত যে সে তার সমস্ত সম্পদ সদকা করে দিবে। অন্য আরেক ব্যক্তি যার অন্তরে উক্ত প্রশান্তি নেই বরং সে সন্দেহের মাঝে ডুবে আছে। তার জন্য সমস্ত সম্পদ সদকা করা জায়েয নেই।

এমনিভাবে যে ব্যক্তি খুব শক্তিশালী তার জন্য উচিত যে, সে সফর অবস্থায় রমযানের রোজা কাজা করবে না। যাতে করে রমযানের বিশাল ফযীলত থেকে বঞ্চিত হতে না হয়। পক্ষান্তরে অন্য ব্যক্তি খুব দুর্বল সে যদি সফর অবস্থায় রোজা রাখে তাহলে তার ক্ষতির সম্ভাবনা প্রবল। তার জন্য এ অবস্থায় রমযানের রোজা না রাখা জায়েয। উপরে উল্লেখিত এ সব পার্থক্যের কারণেই হাদীসের বর্ণনার ক্ষেত্রে ভিন্নতা ও পার্থক্য এসেছে।

হযরত আবু সাইদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন রমযানের ১৬ তারিখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অশ্বারোহি বাহিনী নিয়ে এক যুদ্ধে রওয়ানা হলেন, পথিমধ্যে আমাদের কিছু লোক রোজা রাখল আর অন্য দল ইফতার করল। এক্ষেত্রে পরস্পর কোন দলই অন্য দলকে তিরস্কার করলো না। না রোজাদারগন ইফতারকারীদেরকে তিরস্কার করল। না ইফতারকারীরা রোজাদারদের বিরোধিতা করল।১১

হযরত হামযা ইবনে আমর আমলামী রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে জিজ্ঞাসা করলেন আমার অভ্যাস হলো বেশি বেশি রোজা রাখা। আমি কি সফর অবস্থায় ও রোজা রাখব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন তোমার ইচ্ছা, মন চাইলে রাখতে পারো অথবা মন না চাইলে রেখো না।১২ পক্ষান্তরে হযরত জাবের রা. বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সফর অবস্থায় রোজা রাখা কোন কল্যাণকর বিষয় নয়। ১৩ বরং অন্য হাদীসে আছে যে, যারা সফর অবস্থায় রোজা রেখে ছিলো তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোনাহগার বলে ছিলেন। ১৪ এর থেকে আরো শক্ত কথা বলেছেন, যে সফর অবস্থায় রোজা রাখা বাড়ীতে থাকা অবস্থায় রোজা ভেঙ্গে দেয়ার মতো। ১৫ (বাড়ীতে থাকা অবস্থায় যেমন রোজা না রাখা ঠিক নয় বরং গোনাহ তেমন সফরে থাকা অবস্থায় রোজা রাখা।)

মোটকথা বর্ণনার ভিন্নতার উল্লেখযোগ্য একটি কারণ হলো অবস্থার ভিন্নতা অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন অবস্থা ও সময়ের প্রতি লক্ষ্য করে দুই ব্যক্তিকে দুই সময়ে পৃথক পৃথক নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং এক মজলিসে যে হুকুম দিয়েছেন অন্য মজলিসে সে হুকুমের ভিন্ন হুকুম দিয়েছেন। এটা তো স্পষ্ট বিষয়। এ জন্য এ দুইটি ভিন্ন হুকুম বর্ণনা করার ক্ষেত্রে দুইটি বড় বড় দলে বিভক্ত হয়েছেন।

কোন কোন সাহাবী এরকম ছিলেন যে, তারা উভয় হুকুম শুনেছেন, তারা এ একই বিষয়ে দুইটি হুকুম শুনার পর তাঁদের এ বিষয়ে অবশ্যই চিন্তা ফিকির এসেছে যে, উক্ত একই বিষয়ে দুইটি হুকুম দেয়ার কারণ কি? অতপর তাঁরা নিজ খেয়াল অনুযায়ী সেগুলোর মাঝে সমন্বয় করেছেন। যেমন হযরত আবূ হুরায়রা রা. কর্তৃক রোযা অবস্থায় স্ত্রীকে চুমু দেওয়া ও আলিঙ্গন করা প্রসঙ্গে দুইটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ১৬ এ দুইটি হুকুমের মাঝে পার্থক্যের কারণ বর্ণনা করে দিয়েছেন। এধরনের হাজারো ঘটনা রয়েছে এখানে সেগুলোর সংকুলান হবে না আর তা উদ্দেশ্য ও না।

উপরোক্ত কয়েকটি ঘটনা উদাহরণ স্বরুপ উল্লেখ করা হয়েছে এ কথা বোঝানোর জন্য যে, এ বিষয়টি অস্পষ্ট কোন বিষয় নয়। তারপরও ঘটনাগুলো দ্বারা সহজে বুঝা যায় এবং বেশি মজবুত হয়। হাদীস বর্ণনার এ ভিন্নতা হওয়ায় সাহাবা, তাবেয়ী ও মুজতাহিদ ইমামগণের জন্য আবশ্যক হল, উভয় ধরনের বর্ণনার উৎস, অবস্থা ও ইত্যাদি বিষয় অনুসন্ধান করে প্রত্যেক বর্ণনাকে তার যথা স্থানে প্রয়োগ করা।

টিকাঃ
১. বুখারী, হাদীস নং-৮৬৫, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৬
২. মুসনাদে আহমাদ-২/৩৬
৩. মুসনাদে আহমাদ-২/২৯
৪. মুসলিম, হাদীস নং-১৪৮৬
৫. মুসলিম, হাদীস নং-১৪৯৬
৬. আবু দাউদ, হাদীস নং ৫১২,
৭. আবু দাউদ, হাদীস নং-৫১৪
৮. আবু দাউদ, হাদীস নং-১৬৭৮, তিরমিযী, হাদীস নং-৩৬৭৫, দারেমী হাদীস নং- ১৬৬০
৯. আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৩১৯
১০. আবু দাউদ, হাদীস নং ২৩৮৭
১১. মুসলিম, হাদীস নং-২৬১৮,
১২. বুখারী, হাদীস নং-১৯৪৩, আবু দাউদ, হাদীস নং-২৪০২, তিরমিযি, হাদীস নং- ৭১১।
১৩. মুসলিম, হাদীস নং ২৬১২. আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৪০৭. নাসাঈ, হাদীস নং ২২৫৯।
১৪. মুসলিম, হাদীস নং ২৬১০. তিরমিযী, হাদীস নং ৭১০. নাসাঈ, হাদীস নং ২২৬৫. ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৬৬৬।
১৫. নাসায়ী, হাদীস নং-২২৮৬. ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৬৬৬.
১৬. আবূ দাউদ, হাদীস নং ২৩৮৭

📘 ইমামগণের মতবিরোধ কি ও কেন > 📄 দ্বিতীয় কারণ : খাস হুকুমকে ব্যাপক মনে করা

📄 দ্বিতীয় কারণ : খাস হুকুমকে ব্যাপক মনে করা


দ্বিতীয় কারণ হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষ কোন ব্যক্তির জন্য কোন হুকুমকে খাসভাবে দিয়েছেন। কোন কারণে কোন ব্যক্তিকে বিশেষ কোন নির্দেশ দিয়েছেন, মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ সে নির্দেশকে ব্যাপক নির্দেশ মনে করে ব্যাপকভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর বর্ণনা হযরত আয়েশা রা. এর মতে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মৃত ব্যক্তিকে তার পরিবারবর্গের কান্নার কারণে শাস্তি দেওয়া হয়।১৭ হযরত আয়েশা রা. এটা অস্বিকার করেন। কেননা, তাঁর ধারণা হলো বিশেষ এক মহিলার ব্যাপারে এ হুকুম দেয়া হয়েছিল। সে ইয়াহুদী মহিলা মৃত্যু বরণ করার পর তার পরিবারের লোক কান্না কাটি করতেছিল ও তাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছি।১৮

এখানে আমাদের এধরণের অনেক বর্ণনা উল্লেখ করা উদ্দেশ্য নয় এবং এব্যাপারে আলোচনা করাও উদ্দেশ্য নয় যে, জমহুরের মতে হযরত আয়েশা রা. এর মত গ্রহণযোগ্য নাকি হযরত ইবনে ওমর রা. এর মত গ্রহণযোগ্য? বরং আমাদের উদ্দেশ্য হলো এ কথা বুঝানো যে, এধরণের মতানৈক্য হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অনেক রয়েছে।

এধরণের একটা বিষয় হল, হানাফীদের তাহকীক অনুযায়ী খুৎবার সময় তাহিয়‍্যাতুল মসজিদের হাদীস। তা হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালীক গাতফানী রা. নামের এক সাহাবী যিনি অত্যান্ত গরীব ও অসহায় ছিলেন তাঁকে তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায পড়ার অনুমিত দিয়েছিলেন, যেন উপস্থিত লোকেরা তাঁর দারিদ্রতা দেখতে পায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন বিশেষ অবস্থা দেখে তাঁকে খুৎবার মাঝেই তাহিয়্যাতুল মসজিদ অর্থাৎ নফল নামাজ পড়ার অনুমতি দিয়েছেন। কোন কোন বর্ণনা অনুযায়ী স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুৎবা বন্ধ করে দাড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু মজলিসে উপস্থিত অনেক সাহাবী যারা উক্ত হুকুমকে (অর্থাৎ খুৎবার সময় তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়াকে) সকলের জন্য জায়েয মনে করে সাধারণ ভাবে বলতেন, যে কেউ খুৎবার সময় মসজিদে উপস্থিত হবে তার জন্য তাহিয়্যাতুল মসজিদ দুই রাকাআত নামায পড়া উচিত। ২০

এ ধরণের আরো একটি হল, হযরত হুযাইফা রা. এর গোলাম সালেম রা. এর দুধ পানের ঘটনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একমাত্র তাঁকেই সেই হুকুম দিয়েছিলেন। ২১ কিন্তু হযরত আয়েশা রা. উক্ত হুকুমকে ব্যাপক মনে করে ব্যাপক আকারে হুকুম লাগিয়েছেন। ২২ আর অন্য উম্মাহাতুল মুমিন রা. সর্বাস্থায় এটাকে অস্বিকার করেছেন। হযরত উম্মে সালমা রা. বর্ণনা করেন এর কারণ আমার জানা নেই। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, এ হুকুম শুধু সালেম (রা) এর সাথেই খাস ছিল। (অন্যদের জন্য নয়) ২৩ হযরত ইমরান ইবনে হসাইন রা. এর কথার কারণ এটাই যা ইবনে কুতাইবা রহ. "তাওবীলে মুখতালাফিল হাদীস" নামক কিতাবে বর্ণনা করেছেন। তা এই যে,

أن عمران بن حصین رضی الله عنه قال : والله إن كنت لأرى أني لوشئت لحدثت عن رسول الله صلى الله عليه وسلم يومين متتابعين، ولكن بطاني عن ذلك أن رجالا من أصحاب رسول الله صلى الله عليه و سلم سمعوا كما سمعت وشهدوا كما شهدت ويحدثون احاديث ماهي كما يقولون، وأخاف ان يشبه لى كما شبه بهم فاعلمك انهم كانوا يغلطون لا أنهم كانوا يتعمدون.

সাহাবী হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা. বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর কসম আমার এ পরিমাণ হাদীস মুখস্ত আছে যে যদি আমি চাই তাহলে ধারাবাহিক দুই দিন পর্যন্ত হাদীস বর্ণনা করতে পারি। কিন্তু বাধা হল, আমার ন্যায় অন্যান্য সাহাবীও হাদীস শুনেছেন ও আমার ন্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে তারাও উপস্থিত ছিলেন। তারপরও হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে ভুল হয়েছে। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে আমার ভয় হয় যে, হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে আমার সংশয় হয়ে যাবে যেমন সংশয় তাদের হয়েছে। তবে আমি এ ব্যাপারে সর্তক করছি যে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁদের যা কিছু হয়েছে তা ধারণা প্রসুত হয়েছে তাঁরা বুঝেশুনে ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুল বর্ণনা করেন নি।

এজন্যই হযরত ওমর রা. তাঁর খেলাফত কালে অধিক পরিমাণে হাদীস বর্ণনা করতে নিষেধ করেছিলেন।২৫ এমনকি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে এই আধিক্যতার কারণে তিনি কোন কোন সম্মানিত সাহাবীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন।

হযরত আবু সালমা রা. হযরত আবূ হুরায়রা রা.কে জিজ্ঞাসা করলেন আপনি কি হযরত ওমর রা. এর যুগেও এতো বেশী হাদীস বর্ণনা করতেন? তিনি উত্তরে বললেন, তখন এতো বেশী হাদীস বর্ণনা করলে হযরত ওমর রা. দোররা মেরে খবর করে দিতেন। ২৬

মোটকথা বর্ণনার ভিন্নতার দ্বিতীয় কারণ এটাও ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন বিশেষ ব্যক্তিকে কোন বিশেষ হুকুম দিয়েছে, আর সে হুকুমকে বর্ণনাকারী ব্যাপক মনে করে ব্যাপক আকারে বর্ণনা করে দিয়েছেন। যার কিছু উদাহরণ পূর্বে উল্লেখ করা হল।

টিকাঃ
১৭. বুখারী, হাদীস-১২৮৭, মুসলিম, হাদীস-২১৪৩, তিরমিযী, হাদীস-১০০২, নাসয়ী, হাদীস-১৮৩৯, ইবনে মাজাহ, হাদীস-১৫৯৩।
১৮. বুখারী, হাদীস নং-১২৮৯, মুসলিম, হাদীস নং ২১৫৬, তিরমিযী, হাদীস নং ১০০৬, নাসায়ী, হাদীস নং-১৮৫৭, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৫৯৫।
১৯. মুসলিম, হাদীস নং-২০২৩, আবু দাউদ, হাদীস নং-১১১৬. ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১১১২.
২০. তিরমিযি, হাদীস নং ৫১১,
২১. মুসলিম, হাদীস নং ৩৬০০, আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৬১, নাসাঈ, হাদীস নং ৩৩২২,
২২. বুখারী, হাদীস নং ৫১০২, মুসলিম, হাদীস নং ৩৬০৬,
২৩. মুসলিম কিতাবুর রযা হাদীস নং ৩৬০৫,
২৪. তাওবীলু মুখতালাফিল হাদীস (ইবনে কুতাইব্য) পৃষ্টা নং ৩০।
২৫. তাযকিরাতুল হুফফায (আল্লামা যাহাবী রহ) - ১/৭
২৬. তাযকিরাতুল হুফফায-১/৭

📘 ইমামগণের মতবিরোধ কি ও কেন > 📄 তৃতীয় কারণ : কোন ব্যাপক হুকুমকে খাস হুকুম মনে করা

📄 তৃতীয় কারণ : কোন ব্যাপক হুকুমকে খাস হুকুম মনে করা


তৃতীয় কারণ হলো দ্বিতীয় কারণের বিপরীত অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন হুকুম ব্যাপক আকারে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু বর্ণনাকারী সেটাকে কোন বিশেষ ব্যক্তির সাথে অথবা কোন বিশেষ সময়ের সাথে খাস মনে করেছেন। এর উদাহরণ ও পূর্বোক্ত বর্ণনাসমূহ দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেছে। উদাহরণ স্বরুপ মৃতকে শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর বর্ণনা যা হযরত আয়েশা রা. এর মতে ইয়াহুদী মহিলার সাথে খাস ছিল। আর এ সকল স্থান যাচাই বাছাই করার জন্য মুজতাহিদ ইমামগণের প্রয়োজন। যাদের সামনে বিভিন্ন ধরণের বর্ণনা উপস্থিত রয়েছে। সাহাবাগণের বিভিন্ন বানী উপস্থিত থাকলে যেগুলোর মাঝে সমন্বয় থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, কোন হুকুমটি ব্যাপক আর কোনটি খাস এবং এর কারণ কি? তদ্রুপ এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে কেন কোন বিষয় কোন এক ব্যক্তির জন্য জায়েয সাব্যস্ত করা হয়েছে আবার ঐ বিষয়টি অন্য ব্যক্তির জন্য না-জায়েয সাব্যস্ত করা হয়েছে?

📘 ইমামগণের মতবিরোধ কি ও কেন > 📄 চতুর্থ কারণ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি কাজ থেকে বিভিন্ন বিষয় ইসতিম্বাত (উদঘাটন) করা

📄 চতুর্থ কারণ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি কাজ থেকে বিভিন্ন বিষয় ইসতিম্বাত (উদঘাটন) করা


হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে মতানৈক্য অনেক সময় এ কারণে হয়ে থাকে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাধিক ব্যক্তিকে কোন একটি কাজ করতে দেখেছেন আর বিভিন্ন মানুষের বুঝ শক্তি বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে এটাতো স্পষ্ট। যেমন কেউ কেউ মুজতাহিদ ফকীহ ও বিজ্ঞ হয়ে থাকেন, তাই বিষয়টি তাঁর দৃষ্টি ভঙ্গিতে বুঝেছেন। তিনি ঘটনা যতার্থ বুঝেছেন। আবার কেউ প্রখর মেধার অধিকারী। তাই ঘটনা স্বরণ রাখার ক্ষেত্রে পূর্বোক্ত ব্যক্তি থেকেও অধিক যোগ্য। কিন্তু মাসয়ালা বুঝার দিক থেকে প্রথম ব্যক্তির চেয়ে নিম্ন স্থরের। এ ধরণের ব্যক্তিরা নিজ বুঝশক্তি অনুযায়ী ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এর উদাহরণ হজ্জের অধ্যায়ে অনেক রয়েছে।

উদাহরণঃ এক ব্যক্তি বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে لبيك بحجته বলতে শুনেছেন।২৯ এতে কোন সন্দেহ নেই যে এই বর্ণনা সহীহ। আর এতেও কোন সন্দেহ নেই যে, তিনি বর্ণনা করার ক্ষেত্রে কোন ত্রুটি করেন নি। কিন্তু অন্যান্য সাহাবাগণ বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিরান হজ্জের ইহরাম বেধে ছিলেন।২৮ এই বর্ণনা টি বাহ্যত প্রথমোক্ত বর্ণনার বিপরীত বুঝা যায়। কেননা কেরান হজ্জ হল এফরাদ হজ্জের বিপরীত। কিন্তু বাস্ত বতা হল, উভয় বর্ণনার মাঝে কোন বৈপরিত্য নেই। কেননা কেরানকারীর জন্য " لبيك بحجته" বলাও জায়েয আছে। এখন শুধু মুজতাহিদের কাজ উভয় ধরণের বর্ণনা সামনে রেখে তাতে সমন্বয় করা ও উভয়টির প্রয়োগ স্থল পৃথক সাব্যস্ত করা। যাতে বিভিন্ন বর্ণনার পার্থক্যের কারণে সংশয় সৃষ্টি না হয়। এ ধরণের আরেকটা বিষয় হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম বাঁধার আমল কোথা থেকে শুরু করেছেন। এ ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইহরামের কাজ শুরু করার বর্ণনার ভিন্নতার কারণেই ইমামগণের মাঝেও মতানৈক্য হয়ে গেছে যে, ইহরাম বাঁধা কখন উত্তম?

এই বর্ণনার ভিন্নতার কারণেই প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রহ. হিবরুল উম্মাহ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর কাছে এই বর্ণনার ভিন্নতা উল্লেখ করে সমাধান জানতে চেয়েছেন। আবু দাউদ শরীফে এর বিস্তারিত বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। যার মোটামোটি অর্থ হল,

হযরত আবু সাঈদ ইবনে জুবাইর রা. বর্ণনা করেন, 'আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর কাছে জিজ্ঞাসা করলাম যে, সাহাবাদের এই মতানৈক্য আমার কাছে অবাক লাগে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইহরাম বাঁধার কাজ শুরু কখন হয়েছিল আমার বুঝে আসে না এতো মতানৈক্য কেন হল?' উত্তরে তিনি বললেন এর মূল বিষয় আমার ভালোভাবে জানা আছে, বাস্তবতা হল এই যে, হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু একবার হজ্জ করেছেন (তাও আবার জীবনের শেষ প্রান্তে। এজন্য অনেক লোকের সমাবেশ হয়েছিল, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে অবস্থায় যে কাজ করতে দেখেছেন সেটাকেই তিনি আসল মনে করেছেন) এ জন্য মতানৈক্য হয়ে গেছে। সে হজ্জের ঘটনা ছিল নিম্নরুপ,

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্জের সফরে যখন যুলহুলাইফা নামক স্থানে অবস্থান করেন সেখানকার মসজিদে ইহরাম বাঁধলেন তখনই ইহরাম বেঁধেছিলেন যে সময় যে পরিমাণে লোক উপস্থিত ছিল তাঁরা তা শুনলেন এবং পরবর্তীতে তারা এটাই বর্ণনা করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম শেষ করে উটে আরোহন করলেন। উট যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিয়ে দাঁড়াল তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার জোরে 'লাব্বাইক' বললেন। যারা আগেও উপস্থিত ছিলেন তারাতো বুঝলেন যে এ 'লাইব্বক' দ্বিতীয়বার। কিন্তু সে সময় যারা নিকটে ছিলেন এবং প্রথমে নিকটে ছিলেন না এবং প্রথম 'লাইব্বাক' শুনেন নাই তাঁরা এটা বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটে আরোহন করার পর ইহরাম বাঁধার কাজ শুরু করেছেন। উপস্থিত লোক সংখ্যা বেশী হওয়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আওয়াজ সকলের কাছে পৌঁছে নাই। আর প্রত্যেক সাহাবী অনেক বার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাত করতে পারেন নাই। বরং খন্ড খন্ড দলে বিভক্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হতেন এবং মাসআলা জিজ্ঞাসা করতেন। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উট সেখান থেকে বায়দার নামক স্থানের উঁচু জায়গায় আরোহন করলেন। আর (হাজীদের জন্য যেহেতু উঁচু স্থানে 'লাব্বাইক' বলা মুস্তাহাব তাই) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে উঁচু আওয়াজে 'লাব্বাইক' বলেছেন। আর সে সময় যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছিলেন তাঁরা এটা শুনলেন এবং এটাই বর্ণনা করলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়দার নামক স্থানে ইহরাম বেঁধেছেন অথচ আল্লাহর কছম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজের জায়গায় ইহরাম বেঁধেছিলেন আর অন্য সকল স্থানেই 'লাব্বাইক' বলেছেন। ২৯ আর যেহেতু হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রা. বিভিন্ন বর্ণনা শুনেছিলেন সেহেতু তাঁর তাহকীক করার প্রয়োজন হয়েছিল। আর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এ সব ঘটনা জানতেন এ জন্য অত্যন্ত আস্থার সাথে ইহরাম বাঁধার শুরু কোথায় হয়েছিল তা বলে দিয়েছেন এবং তিনি নিজে ফকীহ ও মুজতাহিদ ছিলেন তাই বর্ণনার ভিন্নতা হওয়ায় সেগুলোর মাঝে সমন্বয়ও করে দিয়েছেন। কিন্তু কোন সাধারন মানুষ এই ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনার শুধু শব্দের অনুবাদ জানলে সে বেচারা খুব পেরেশান হয়ে যাবে এবং ধারণাপ্রসূত বিভিন্ন প্রশ্ন ও অভিযোগ করে ফেলবে। এজন্যই 'গায়রে মুকাল্লেদরা'ও নিজেদের বাড়াবাড়ি ও গোড়ামি সত্ত্বেও 'তাকলীদ' (অনুস্বরন) থেকে মুক্ত নয়। হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ নিজ কিতাব 'ছাবীলুর রশাদ' নামক কিতাবে গায়রে মুকাল্লেদদের নেতা মৌলভি মুহাম্মাদ হুসাইন বাটলবী এর কথা 'ইশাআতুস সুন্নাহ' নামক কিতাব থেকে উল্লেখ করেছেন। প্রথমতঃ ১১ তম খন্ডের ২১১ পৃষ্টায় লেখেন 'গায়রে মুজাতাহিদ মুতলকের জন্য মুজতাহিদ থেকে পলায়ন করার কোন সুযোগ নেই' (যারা কোন মাযহাবের অনুসারী নয় তারা কোন কোন মাযহাব বা মতের অনুসরণ করা থেকে বাচতে পারবে না)। দ্বিতীয়ত ১১তম খন্ডের ৫৩ পৃষ্টার লেখেন ২৫ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি একথা বুঝতে পেরেছি যে, ইলমহীন লোকেরা মুজতাহিদে মুতলাক ও মুতলাক তাকলীদ বর্জনকারী হয়ে যায় (যে ইলমহীন লোকেরা কোনো মাযহাবের অনুসরণ না করে তারা শেষ পর্যায়ে) পরিশেষে ইসলামকে বিদায় জানায়। তাদের মধ্যে কিছু লোক হয় খ্রীষ্টান। আর কিছু হয় লা-মাযহাব যাদের দ্বীন ও মাযহাবের কোন পরওয়া থাকে না। আর এটাই হল, শরীয়তের বিধিবিধানের গণ্ডি থেকে বের হওয়া এবং বিধিবিধান অমান্য করার সামান্য কুফল।'

টিকাঃ
২৯. নাসায়ী, হাদীস নং ৮৮৩০
২৮. বুখারী, হাদীস নং ১৫৬৩, মুসলিম, হাদীস নং ২৯৯৫
২৯. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৭৭০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00