📄 ভূমিকা
نَحْمَدُهُ وَنُصَلِّي عَلَي رَسُوْلِهِ الْكَرِيمِ وَأَلِهِ وَ أَصْحَابِهِ وَ أَتْبَاعِهِ وَحَمَلَةِ لِلدِّيْنِ الْقَوِيمِ
মাযাহিরে উলুম মাদরাসার পক্ষ থেকে ১৩৪৬ হিঃ রমযান মাস হতে উক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক ও জামেয়া আশরাফিয়া লাহোর এর মুফতী মাওলানা জামিল আহমাদ সাহেব দাঃ বাঃ এর তত্ত্বাবধানে মাসিক 'আল মুযাহের' নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ হতে থাকে। তাঁর অনেক পিড়াপিড়ির পর আমি নিজে অযোগ্য ও অক্ষম হওয়া স্বত্বেও ইমামগণের মতানৈক্যের বিষয়ে সে পত্রিকায় একটা লেখা দিতে থাকি, যতদিন পর্যন্ত তা প্রকাশ হয়েছিল ততদিন পর্যন্ত নিজের অনেক ব্যস্ত তা থাকা স্বত্বেও প্রত্যেক মাসে তাতে দুই-চার পৃষ্টা করে লিখতে ছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন বাধা-বিপণ্ডির কারণে প্রায় ১৩/১৪ মাস পর উক্ত পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায় ফলে আমার উক্ত বিষয়ও প্রকাশ করা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর যদিও অনেক বন্ধুবান্ধব ও বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক মন্ডলি উক্ত বিষয়টি পরিপূর্ণ করার প্রতি পিড়াপিড়ি করতে থাকেন, আর মাওলানা জামিল আহমাদ সাহেব যেহেতু একই মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন এবং সর্বদা কাছেই থাকতেন সেহেতু বারংবার তাগাদা করে কিছু লিখিয়ে নিতেন, কিন্তু পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমার আগ্রহ ও বন্ধুবান্ধবের পিড়াপিড়ি সত্ত্বেও তা পূর্ণ করার সুযোগ হয় নি। ইচ্ছা ছিল তাতে অনেক বিস্তারিত ও অন্যান্য বিষয় বস্তু জমা করার। কিন্তু ইলমী ব্যস্ততা ও লেখা- লেখি বাড়তেই থাকে, এ জন্য তা পূর্ণ করা সম্ভব হয় নি। কোন কোন বন্ধু এ ব্যাপারে পিড়াপিড়ি করল যে, যতটুকু প্রকাশিত হয়েছে ততটুকুই প্রথম খন্ড হিসেবে ছাপানো হোক। উক্ত বিষয়ের বিষয়বস্তু একেবারেই সংক্ষেপ ও অপূর্ণাঙ্গ ছিল তাই আমার খেয়াল হলো যে, আরো কিছু অংশ হলে ছাপানো হবে, কিন্তু বর্তমানে তো সে ইচ্ছাও নেই। কেননা বিভিন্ন অসুস্থতা আমাকে একেবারেই মাযূর ও বেকার বানিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় স্নেহের মাওলানা শাহেদ ও আমার অন্যান্য ঘনিষ্ট বন্ধুবর্গ পিড়াপিড়ি করলেন যে, যতটুকু লেখা হয়েছে ততটুকুও ফায়দা থেকে খালি নয়, তাই স্নেহের মাওলানা শাহেদ তা ছাপানোর ইচ্ছা করেলেন, আল্লাহ তা'য়ালা বরকত দান করুন, উম্মতকে উপকৃত করুন এবং স্নেহের শাহেদকে উভয় জাহানে উন্নতি দান করুন, আমীন।
وما توفيقى الا بالله عليه توكلت واليه انيب
(হযরত মাওলানা) মুহাম্মাদ যাকারিয়া রহ. ১৫ জুমাদুল উলা ১৩৯১ হিঃ
📄 কিতাবটি সংকলনের কারণ
আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দুরুদ ও সালাম। অনেক দিন যাবৎ এই প্রশ্ন মন থেকে মুখে এসে যেত যে, মুজতাহিদ ইমামগণ যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা ও কাজ দ্বারা দলিল পেশ করেছেন তখন তাঁরা পরস্পরে কেন মতানৈক্য করেছেন? বিশেষ করে তর্কযুদ্ধে এবং মতানৈক্য পূর্ণ মাসআলাগুলোর ব্যাপারে অনেক কিতাব প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়ায় উক্ত প্রশ্ন আরো শক্ত রুপ ধারণ করেছে। এমন কি প্রশ্নকারীরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। তাদের এক দল মুজতাহিদ ইমামগণের ব্যাপারে খারাপ ধারণায় এমন ভাবে লিপ্ত রয়েছে যে, নিজেদের সুধারণার ফলে যদিও সে খারাপ ধারণা থেকে মুক্ত হতে চায় কিন্তু তাদের সামনেই মুজতাহিদগণের কথার স্পষ্ট বর্ণনার বিপরীত মনে হওয়ায় তা থেকে মুক্ত হতে পারে না। অন্য দল এর চেয়ে ও একধাপ এগিয়ে তারা মুজতাহিদ ইমামগণকে বাদ দিয়ে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারেও এই ধারণা পোষণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো এরকম আবার কখনো অন্য রকম কথা বলেছেন।
অথচ বাস্তবতা হলো এই ভ্রান্তি উর্দু ভাষায় অনুবাদকারীদের। কেননা কথা বুঝার জন্য তাদের যোগ্যতা ও ভুমিকা জানা, মনোযোগী হওয়া, মেধাবী হওয়া আবশ্যক, অথচ এগুলো তাদের নেই। শুধু মাত্র শব্দের অর্থ সামনে আসার কারণেই এ সকল প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। এই মতানৈক্যের কারণে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পরস্পরের মাঝে দল ভারি করার উদ্দেশ্যে তর্কে লেগে থাকে। এক দল উযু করলে অন্য দলের কাছে তা বাতিল। এক দল নামায আদায় করলে অন্য দলের নিকটতা ফাসেদ বলে গন্য হতে লাগল। হজ্জ, যাকাত, সওমসহ সকল ক্ষেত্রেই মতানৈক্য বৃদ্ধি পেতে লাগল ও এক পর্যায়ে এ মতানৈক্য ঝগড়া-বিবাদ পর্যন্ত পৌঁছে দিল।
এ জন্য, মতানৈক্যের মূল ভিত্তি প্রকাশ করার একান্ত প্রয়োজন দেখা দিল, আর ইসলামের প্রথম যুগ হতেই মতানৈক্যের বিভিন্ন কারণ বর্ণনা করে এ বিষয়ে সর্তক করার প্রয়োজন হলো যে, মূলত বর্ণনার ভিন্নতা নয় যার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুউঁচু মর্যদার ব্যাপারে কোন সন্দেহ সৃষ্টি হতে এবং তাঁর পরবর্তী সাহাবা তাবেয়ী ও মুজতাহিদ ইমামগনের ব্যাপারে বেয়াদবী করার সুযোগ হবে, বরং সমস্ত মুজতাহিদই সিরাতে 'মুসতাকিমের' পথ প্রদর্শক ও আহবানকারী ছিলেন। আর তাদের ব্যাপারে বেয়াদবি করা মাহরুম ও বঞ্চিত হওয়ার আলামত, এগুলো থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রায় চাই
এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী। কিন্তু হায় যদি এর জন্য কোন যোগ্য ব্যক্তি কলম ধরতেন তাহলে ভাল হত অন্যথায় আমার অসম্পূর্ণ লেখা উক্ত বিষয় বস্তু সমাধান করার পরিবর্তে -আল্লাহ না করুন- আরো ঘোলাটে না হয়ে যায়।
আমি 'আল-মুযাহের' এর উপদেষ্টাগণের কাছে ওযর পেশ করেছি। কিন্তু এরপর ও সীমাতিরিক্ত পিড়াপিড়ির কারণে নিজ অযোগ্যতা স্বীকার করা সত্ত্বেও নিজে এ সামান্য কিছু লিখেছি।
উক্ত মতানৈক্য তিনটি যুগে হয়েছে,
প্রথমঃ হাদীসের মতানৈক্য। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী ও কর্মে বাহ্যত যে মতানৈক্য বুঝা যায়।
দ্বিতীয়ঃ সাহাবাগনের আছারের মতানৈক্য। অর্থাৎ সাহাবা রা. ও তাবেয়ী রহঃ গনের বাণী ও কর্মে যে মতানৈক্য বুঝা যায়।
তৃতীয়ঃ মাযহাবের মতানৈক্যঃ যা মুজতাহিদ ইমামগনের যুগে কোন মুজতাহিদের পছন্দনীয় মতামত তাঁর অনুসারীদের কাছে সর্বদার জন্য আমল যোগ্য হিসেবে নির্ধারিত হয়ে যায়।
এ জন্য উক্ত তিনটির প্রত্যেকটির ব্যাপারে পৃথক ভাবে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করছি। আর মূলতঃ দ্বিতীয় ও তৃতীয় মতানৈক্য যেহেতু প্রথম প্রকার মতানৈক্যের শাখা বা প্রথম প্রকার মতানৈক্যের ফল সেহেতু বর্ণনার ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে লেখা পেশ করছি। আল্লাহ তা'য়ালার কাছেই তাওফিক কামনা করছি।
📄 পরিশিষ্ট
এ বিষয়ে আরো বেশী লেখা হয়েছিল কিন্তু বর্তমানে পান্ডলিপি এ টুকুই পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত লিখার পর উপায় উপকরণের অভাবে 'আল- মুযাহের' পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। তারপর বন্ধুবান্ধবদের অনেক পিড়াপিড়ির ফলে এ বিষয়টি পূর্ণতা দান করা সম্ভব হয়। আমারও আগ্রহ ছিলো এজন্য বিষয়বস্তু যতটা আমার স্মরণে ছিলো তা অনেক দীর্ঘ ও বিস্তৃত এবং চার থেকে পাঁচ শত পৃষ্ঠা লেখার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যস্ততায় এটা পূর্ণ করার সুযোগ হয় নি। আর এটা অপূর্ণ হওয়ায় কখনো ছাপানোর ইচ্ছা ছিলো না। যদিও অনেক বন্ধুবান্ধব পীড়াপিড়ি করেছিলো আর আমি বার বার বলেছিলাম যে, এটা তো প্রাথমিক ও অসম্পূর্ণ বিষয়। কিন্তু ১৩৯০ হিজরীতে আমার হেজাজ সফরে শাহেদ সেই পৃষ্ঠাগুলো না জানি কোথা থেকে সে তালাশ করে নিলো তখনও ২/১টি লিখিত অংশ পাওয়া যাচ্ছিলো না। এগুলো তালাশ করে এনে ছাঁপানোর জন্য পিড়াপিড়ি করলো ও বললো এটুকুই অনেক জরুরী ও অনেক উপকারী হবে। অন্যদিকে আমার মুখলেছ বন্ধুরা মুফতী মাহমুদ, মাওলানা ইউনুস, মাওলানা আক্কেল, মাওলানা সালমান সাহেব সহ অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ সকলেই এটা ছাঁপানোর জন্য জোড় অনুরোধ করলেন। এজন্য আমি প্রিয় শাহেদকে অনুমতি দিলাম। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে ও পাঠকদেরকে উপকৃত করুন।
(শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা) মুহাম্মদ যাকারিয়া (মুহাজিরে মাদানী রহ.)