📄 ইমাম বুখারী রহ. এর ফিকহী সমলক
ইমাম বুখারী রহ. এর ফিকহী মসলকের ব্যাপারে উলামায়ে কেরামদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে এবং তাঁর ফিকহী মসলক সম্পর্কে পাঁচটি মত পাওয়া যায়।
প্রথম মতঃ মুজতাহিদে মুতলাক।
(এক) শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. মুজতাহীদে মুতলাক ২৭৭ ছিলেন। ২৭৮
(দুই) আল্লামা নাফীস উদ্দীন সুলাইমান ইবনে ইবরাহীম আলুবী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. মুজতাহিদে মুতলাক ছিলেন। কোন মাযহাবেরই অনুসারী ছিলেন না। ২৭৯
(তিন) ইমামুল আছার আল্লামা আনোয়ার শাহ্ কাশ্মীরী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. মুজতাহীদে মুতলাক ছিলেন। ফয়যুল বারীর মুকাদ্দামায় উল্লেখ আছে, ওয়ালাম আনাল বুখারী মুজতাহিদ লা রাইবা ফিহি... এ কথায় কোন সন্দেহ নেই যে, ইমাম বুখারী রহ. মুজতাহিদ ছিলেন। তবে তাঁর ব্যাপারে শাফেয়ী মাজহাবের অনুসারী হওয়ার যে বিষয়টি প্রচলিত আছে, তা এ জন্য যে, রফয়ে ইয়াদাঈন, উচ্চ আওয়াজে আমীন বলার মত প্রসিদ্ধ কিছু মাসআলায় তাঁর মত শাফেয়ী মাযহাবের মতের পক্ষে হয়। তাই অনেক শাফেয়ী তাঁকে শাফেয়ী বলেছেন। তবে শাফেয়ী হওয়ার ব্যাপারে এটুকু দলিল যথেষ্ট নয়। কারণ তিনি যতগুলি মাসআলাতে শাফেয়ীর সপক্ষে মত দিয়েছেন বা মতের অনুকূলে হয়েছে। তারচেয়ে অনেক বেশি বা দ্বিগুণ মাসআলাতে ইমাম বুখারী রহ. এর মত ইমাম আবু হানিফার রহ. এর মতের অনুকূলে হয়েছে। ২৮০
(চার) শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. মুজতাহিদে মুতলাক ছিলেন। ২৮১
(পাঁচ) আল্লামা ইউসুফ বানূরী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. মুজতাহিদে মুতলাক ছিলেন।
(ছয়) আল্লামা তাহের যাযাইরী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. মুজতাহিদে মুতলাক ছিলেন এবং বিশেষ কোন মাযহাবের অনুসারী ছিলেন না। ২৮২
(সাত) শায়খুল মাশায়েখ মাওলানা সালিমুল্লাহ খান সাহেব রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. এর ফিকহী মসলকের ব্যাপারে পাঁচটি বক্তব্য পাওয়া যায়। তবে প্রসিদ্ধ বক্তব্যটি হল, ইমাম বুখারী রহ. মুজতাহিদে মুতলাক ছিলেন।
দ্বিতীয় মতঃ মুকাল্লিদ।
ইমাম বুখারী রহ. শাফেয়ী মসলকের অনুসারী ছিলেন।
(এক) আল্লামা তাজুদ্দীন সুবকী রহ. বলেন, انه شافعي لانه تفقه بالحميدى والحميدي تفقه بالشافعي ইমাম বুখারী রহ. শাফেয়ী মসলকের অনুসারী ছিলেন। ২৮৩
(দুই) হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ইমাম বুখারী রহ. কে শাফেয়ীদের মধ্যে গণনা করেছেন। ২৮৪
(তিন) আল্লামা নাওয়াব সিদ্দিক হাসান খান সাহেব রহ. আবযাদুল উলূমে উল্লেখ করেন যে, ইমাম বুখারী রহ. শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। ২৮৫
তৃতীয় মতঃ মুজতাহিদ ফিল মাযহাব। ২৮৬
ইমাম বুখারী রহ. মাযহাবের অধীনে মুজতাহিদ ছিলেন।
(এক) শাহ্ ওলী উল্লাহ মুহাদ্দীসে দেহলবী রহ. এর মতে ইমাম বুখারী রহ. শাফেয়ী মাযহাবের অধীনে মুজতাহিদ ছিলেন। ২৮৭
(দুই) আল্লামা ত্বাকী উদ্দীন আস সুবকী রহ. ইমাম বুখারী রহ. কে শাফেয়ী মসলকের মুজতাহিদ হিসেবে মত দিয়েছেন। ২৮৮
(তিন) আল্লামা আবদুর রশিদ নুমানী রহ. ইমাম বুখারী রহ.কে মাযহাবের অর্থাৎ শাফেয়ী মাযহাবের অধীনে মুজতাহিদ হিসেবে মত দিয়েছেন। ২৮৯
চতুর্থ মতঃ মুকাল্লিদ।
ইমাম বুখারী রহ. হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন।
(এক) আল্লামা ইবনে কাইয়্যুম আযযাওযী রহ. ইমাম বুখারী রহ.কে হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী হিসেবে মত দিয়েছেন। ২৯০
(দুই) আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে আবী ইয়ালা রহ. ইমাম বুখারী রহ.কে হাম্বলী সমলকের অনুসারী হিসেবে গণনা করেছেন। ২৯১
(তিন) আল্লামা আবুল হাসান ইরাকী রহ. ইমাম বুখারী রহ.কে হাম্বলী সমলকের অনুসারী হিসেবে গণনা করেছেন। ২৯২
পঞ্চম মতঃ মুজতাহিদও নয়, মুকাল্লিদও নয়।
আল্লামা মুবারকপুরী রহ. তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থের ১৭৫ পৃষ্ঠায় ইমাম বুখারী রহ.কে আহলে হাদীস বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। ২৯৩
টিকাঃ
২৭৭. মুজতাহিদে মুতলাক বলা হয়, যারা ইসলামী শরীয়তের উপর ব্যাপকভাবে একাধিক বিভিন্ন মাসআলার মধ্যে ইজতিহাদ করতে সক্ষম হন এবং তারা নিজেদের উসূলও নিজেরাই নিদিষ্ট করতে পারেন।
২৭৮. হাশিয়া লামেউদ দারারী (৬৯ পৃষ্ঠা)
২৭৯. মা তামাসা ইলাইহিল হাযাহ (২৬ পৃষ্ঠা)
২৮০. ফয়যুল বারী (১/৫৩)
২৮১. কাওয়াকিবুদ দারারী (১/১২) ও লামেউদ দারারী (১/১৫)
২৮২. তাওযীহুন নযরী ইলা উসূলীল আসরী (১৮৫ পৃষ্ঠা)
২৮৩. তাবাকাতুশ শাফেয়ী (২/৬-১০)
২৮৪. ফতহুল বারী (১/২৩)
২৮৫. আবযাদুল উলুম (৩/৮১০)
২৮৬. যারা ইজতিহাদের তরীকা বা উসূলের মধ্যে স্বীয় ইমামের অনুসরণ করেন। কিন্তু শাখাগত বিষয়ে সেই সকল উসূলের আলোকে নিজেও কোন হুকুম আহকাম ইস্তিম্বাত করেন।
২৮৭. আল ইনসাফ ফী আসহাবীল ইখতিলাফ (৭৫ পৃষ্ঠা)
২৮৮. আত তাবাকাত (২,৬)
২৮৯. মা তামাসু ইলাইহিল হাযাহ (২৫ পৃষ্ঠা)
২৯০. বিস্তারিত ই'লামুল মুওয়াককীয়ীন (১/২২৬)
২৯১. মা তামাসা ইলাইহিল হাযাহ (২৬ পৃষ্ঠা)
২৯২. ইযাহুল বুখারী (১/৪৭)
২৯৩. তায়েফায়ে মানসুরাহ (১১০ পৃষ্ঠা)
📄 প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত
ইমাম বুখারী রহ. শাফেয়ী মসলকের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আর এটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত। তবে তিনি আমাদের মত কেবল মুকাল্লিদই ছিলেন না; বরং তিনি শাফেয়ীদের মুজতাহিদও ছিলেন। অর্থাৎ মুজতাহিদ ফিল মাযহাব ছিলেন।
(এক) আল্লামা ইবনে হাজার আনকালানী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী হাদীসের মধ্যে বিরল শব্দের যে বিশ্লেষণ করতেন, তা তিনি বিশেষজ্ঞগণ থেকে গ্রহণ করতেন। আর তাঁর ফিকহী মতে ইমাম শাফেয়ী, আবী উবায়দাসহ প্রমুখের মতামত প্রধান্য পেয়েছে। ২৯৪
(দুই) যাঁরা মুজতাহিদে মুতলাক হন, তাঁদের ইজতিহাদের নিদিষ্ট উসূল থাকে। অথচ আমরা ইমাম বুখারী রহ. এর উসূলে ইজতিহাদ খুঁজে পাইনি।
(তিন) ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীতে কিছু জায়গাতে তরজমাতুল বাব উল্লেখ করেছেন কিন্তু হাদীস উল্লেখ করেননি। মুজতাহিদে মুতলাক না হওয়ার কারণেই এমনটি ঘটেছে।
(৪) ইমাম বুখারী রহ. যদি মুজতাহিদে মুতলাক হতেন, তবে তাঁর ছাত্র ইমাম তিরমিযি তাঁর ফিকহী মত নকল করতেন, যেমন তিনি অন্যান্য ইমামদেরটা করেছেন।
(৫) কিছু আলিম যেমন আল্লামা নববী বলেন, মুজতাহিদে মুতলাক আইম্মায়ে আরবাআ (চার ইমাম) এর মধ্যদিয়ে শেষ হয়েছে। ২৯৫
(৬) ইমাম বুখারী রহ. এর একটি ফতোয়া হলো, দু'টি শিশু একটি বকরী থেকে দুধ পান করলে হুরমতে রাযাআত প্রমাণিত হবে। এ ধরণের ফতোয়া মুজতাহিদদের মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ২৯৬
টিকাঃ
২৯৪. ফতহুল বারী (২/২৪৩)
২৯৫. রাওযাতুত ত্বোলিবীনের উদ্ধৃতি দিয়ে নুরুল হিদায়া (১০ পৃষ্ঠা)
২৯৬. ফতোয়ায়ে শামী (১/৭৭)
📄 আরো কিছু কথা
গাইরে মুকাল্লিদদের যামানার মুজাদ্দিদ ও মুজতাহিদ নাওয়াব সিদ্দীক হাসান খান সাহেব উল্লেখ করেন যে, ইমাম বুখারী রহ. শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। ২৯৭ নাওয়াব সাহেবের এ ইবারতের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তার নিকটে ইমাম বুখারী রহ. শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। ২৯৮
কাযী আবুল হুসাইন হাম্বলী রহ. এর মতে ইমাম বুখারী রহ. হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. উল্লেখ করেন যে, হাদীসের ইমামগণ যেমন, ইমাম বুখারী, মুসলিম প্রমুখ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল অনুসারী ছিলেন। ২৯৯ আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম রহ. বলেন, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম প্রমুখ ইমাম আহমদ রহ. এর অনুসারী ছিলেন। ৩০০
ইমাম বুখারী রহ. এর আলোচনা তাবাকাতে ফুকাহার মধ্যে উল্লেখ নেই, যা প্রমাণ করে তিনি মুজতাহিদে মুতলাক ছিলেন না।
ইমাম বুখারী রহ. কখনো তাকলীদের বিপরীতে একটি হরফও উল্লেখ করেননি। কিন্তু গাইরে মুকাল্লিদ হযরত যারা ইমাম বুখারী রহ.কে মান্য করার দাবীদার, তারা তাকলীদের বিরোধিতা করেন। মাওলানা আবদুল আজিজ মুলতানী লিখেন, তাকলীদ উম্মাতের পুরানো রোগ। ৩০১ ৩০২ মাওলানা সালাহ উদ্দীন ইউসুফ সাহেব লিখেন, তাকলীদ কতক সময়ে তা শিরকে পরিণত হয়ে যায়। ৩০৩ বাশীরুর রহমান সাহেব বলেন, তাকলীদ দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য বদবখতি। ৩০৪ মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া গুন্দলবী সাহেব লিখেন, ইসলামের সবচেয়ে বড় ফিতনা হল তাকলীদ। ৩০৫ ৩০৬ মাওলানা আবদুশ শাকুর হিসারোবী লিখেন, মুকাল্লিদদের সাথে বিবাহ-শাদী বৈধ নয়। ৩০৭ মাওলানা মুহাম্মদ জুনাগড়ী লিখেন, ওহীয়ে এলাহীকে সবচেয়ে বেশি প্রতারিত করেছে তাকলীদ। ৩০৮ ৩০৯ নাওয়াব নূরুল হোসেন খান সাহেব লিখেন, তাকলীদকে মেনে নেয়ার অর্থ বিদআতকে মেনে নেয়া। ৩১০ নাওয়াব ওহীদুজ্জামান সাহেব লিখেন, হানাফী ও শাফেয়ী বিদআতী ফিরকার অন্তর্ভুক্ত। ৩১১
টিকাঃ
২৯৭. আবযাদুল উলূম (১/৪৬০ ও ৬৪০)
২৯৮. আল হিত্তাহ ফী যিকরীস সিহাহীস সিত্তাহ (১/২৪২)
২৯৯. ফতোয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া (২৫/২৩২)
৩০০. ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন (২/১৭১)
৩০১. ইসতীসালুত তাকলীদ (২ পৃষ্ঠা)
৩০২. ইসতীসালুত তাকলীদ (৫ পৃষ্ঠা)
৩০৩. আহলে হাদীস ও আহলে তাকলীদ (১৬ পৃষ্ঠা)
৩০৪. যরবুশ শাদীদ আলা আহলিত তাকলীদ (৬ পৃষ্ঠা)
৩০৫. যরবুশ শাদীদ (১৬ পৃষ্ঠা)
৩০৬. যরবুশ শাদীদ (৫৯ পৃষ্ঠা)
৩০৭. সিয়াহাতুল যিনান (৫ পৃষ্ঠা)
৩০৮. ত্বরীকে মুহাম্মাদী (২৫ পৃষ্ঠা)
৩০৯. ত্বরীকে মুহাম্মাদী (২৫ পৃষ্ঠা)
৩১০. আন নাহজুল মাকবুল (১৬ পৃষ্ঠা)
৩১১. হিদায়াতুল মাহদী (১/১২১)
📄 সহীহ বুখারীর ভিত্তিও তাকলীদের উপর
যদি ইনসাফের দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, ইমাম বুখারী রহ. এর সহীহ বুখারী গ্রন্থনা তাকলীদের উপর ভিত্তি করেই। এ জন্য যে, ইমাম বুখারী রহ. হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজ শায়েখের উপর আস্থা ও ভরসা রেখেছেন। ইমাম বুখারী রহ. নিজের শায়েখ থেকে হাদীস শ্রবণ করেছেন এবং তার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে নিজ শায়েখের কাছ থেকে কোন দলিল বা প্রমাণ চাননি। কোন প্রমাণ ছাড়াই তিনি নিজ শায়েখের হাদীস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বলে মেনে নিয়েছেন। এটিকে তাকলীদ না বলে অন্য কি বলবেন? এ থেকে পরিষ্কার বুঝে আসে যে, সহীহ বুখারী এর সমস্ত রেওয়ায়েতের ভিত্তি তাকলীদের উপর।