📄 হাদীসের কিতাবসমূহের মাঝে সহীহ বুখারীর অবস্থান
সহীহ বুখারীর ব্যাপারে মোটামুটি সবাই একমত যে, অন্যান্য সিহাহ অর্থাৎ সহীহ মুসলিম, তিরমিযি, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ এবং সমস্ত হাদীসের কিতাবের উপর প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব ২৫০ রয়েছে। আল্লামা নববী রহ. বলেন, উলামায়ে ইসলাম এ বিষয়ে ঐক্যমত যে, সহীহ বুখারীর বিশুদ্ধতা ও অন্যান্য ইলমী ফায়দার দিক থেকে সহীহ মুসলিমের উপরও প্রাধান্য পাবে। ২৫১
হাফিয ইবনে কাসীর রহ. বলেন, لَا يُوَازِيهِ فِيهِ غَيْرُهُ، لَا " صَحِيحُ مُسْلِمٍ " وَلَا غَيْرُهُ সহীহ মুসলিমসহ অন্যান্য সকল কিতাবের কোনটিই সহীহ বুখারীর বিশুদ্ধতার মোকাবেলা করতে পারবে না। ২৫২ ইমাম শাফেয়ী রহ থেকে এ রেওয়ায়েতটি বর্ণনা করা হয়েছে যে, পৃথিবীর বুকে মুয়াত্তা মালেকের মতো সহীহ কিতাব আমার নযরে নেই। অন্য রেওয়ায়েতে আছে, কিতাবুল্লাহর পরে মুয়াত্তা মালেকের চেয়ে অধিক বিশুদ্ধ কিতাব আর নেই। ২৫৩ আল্লামা নববী রহ. বলেন, ইমাম শাফেয়ী রহ. এর এ বক্তব্যটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম রচনা হওয়ার পূর্বে ছিল।
শাহ্ আবদুল আজিজ রহ. বলেন, বুখারী, মুসলিম ও মুয়াত্তা মালেকের রেওয়ায়েত বিশুদ্ধ এবং মুয়াত্তা মালেকের অধিকাংশ মারফু রেওয়ায়েতই সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে। ২৫৪
হাকেমের উস্তাদ শায়েখ আবু আলী নিশাপুরী রহ. এবং কিছু পশ্চিমা (মরক্কো, আন্দালুসী) উলামায়ে কেরাম সহীহ মুসলিমকে আল্লাহর কিতাব কোরআনের পর সবচেয়ে বিশুদ্ধ কিতাব বলে মনে করেন। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, হয়তো বা সে সমস্ত উলামায়ে কেরামের নিকট সহীহ মুসলিমে হাদীসের সুশ্রী বিন্যাসের দৃষ্টিকোণ থেকে সহীহ বুখারীর উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। ২৫৫
সহীহ বুখারীকে সহীহ মুসলিমের উপর প্রাধান্যের আরো একটি গ্রহণযোগ্য দলিল হলো, সহীহ বুখারী থেকে সহীহ মুসলিমের রেওয়ায়েতের উপর বেশি কালাম (হাদীস শাস্ত্রের সমালোচনা) করা হয়েছে। ইমাম দারা কুতনী রহ. বলেন, قَالَ أَبُو الحسن الدَّارَقُطْنِي الْحَافِظُ لَوْلَا البُخَارِيِّ لما رَاحٍ مُسلم وَلَا جَاءَ যদি সহীহ বুখারী না থাকতো, তাহলে মুসলিমেরও অস্তিত্ব থাকতো না। ২৫৬
টিকাঃ
২৫০. আল্লাহর কিতাবের পর বিশুদ্ধতম গ্রন্থ হল, সহীহ বুখারী। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বুখারী শরীফের একেকটি শব্দ কোরআনের মত সহীহ ও এবং সঠিক। তার খুঁত বের করা এবং দুর্বল বলা জায়েয নেই। বিশুদ্ধতম গ্রন্থ হওয়ার অর্থ শুধু এটাই যে, আজ পর্যন্ত হাদীসের যত গ্রন্থ লিপিবদ্ধ হয়েছে, তন্মধ্যে সর্বাধিক সহীহ হাদীস সহীহ বুখারীতেই আছে।
২৫১. মুকাদ্দামা শরহে মুসলিম (১১ পৃষ্ঠা)
২৫২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১১/২৭)
২৫৩. ফতহুল বারী (১/১০)
২৫৪. ইযালায়ে নাফে'য়া (৬ পৃষ্ঠা)
২৫৫. ইফাদাত
২৫৬. ফতহুল বারী (১/৪৯০)
📄 সহীহ বুখারীর মকবুলিয়্যাত
হাফেয ইবনুস সালাহ রহ. বুখারী ও মুসলিমের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বলেন, وَكِتَابَاهُمَا أَصَحُ الْكُتُبِ بَعْدَ كِتَابِ اللهِ الْعَزِيزِ ثُمَّ إِنَّ كِতَابَ الْبُخَارِيِّ أَصَحٌ الْكِتَابَيْنِ صَحِيحًا، وَأَكْثَرُهُمَا فَوَائِدَ আল্লাহর কিতাবের পর এই দুই কিতাবের অবস্থান। অতঃপর সহীহ বুখারীর সম্মান ও মর্যাদা বিশুদ্ধতার দিক থেকে অন্যের উপর স্বতন্ত্র ও শ্রেষ্ঠ। আর দু'টির মধ্যেই অনেক উপকার রয়েছে। ২৫৭
মুহাম্মদ ইবনে আহমদ মারওয়াযী রহ. বলেন, স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী যে হাদীস গ্রন্থখানা সংকলন করেছেন, সেটিই আমার কিতাব। ২৫৮ ২৫৯
শাহ্ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দীসে দেহলবী রহ. বলেন, যে ব্যক্তি এ কিতাবকে মর্যাদা ও সম্মানের উপযুক্ত মনে করবে না, সে ব্যক্তি অবশ্যই বিদআতী এবং মুসলমানদের সঠিক রাস্তার বিরোধী। ২৬০ অন্যত্রে তিনি কসম খেয়ে বলেন, সহীহ বুখারীর যে প্রসিদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে, এর চেয়ে বেশি আমরা চিন্তাও করতে পারি না। ২৬১
টিকাঃ
২৫৭. মুকাদ্দামা ইবনুস সালাহ (১/৮৫)
২৫৮. হাদইয়ুস সারী (৬৭৬পৃষ্ঠা)
২৫৯. ঘটনাটি আলাদা শিরোনামে পূর্বেও উল্লেখ হয়েছে। (অনুবাদক)
২৬০. হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা (১/২৯৭)
২৬১. হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা (১/৩৫০)
📄 হাদীস গ্রহণে ইমাম বুখারী রহ. এর শর্ত
ইমাম বুখারী রহ. হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে বাল্যকাল থেকেই নিজস্ব মানহাজ অনুযায়ী হাদীস গ্রহণ করেছেন। তিনি হাদীস বর্ণনাকারীগণের পুঙ্খানুপুঙ্খ অবস্থা, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, তাকওয়া, পরহেযগারী, স্মৃতিশক্তি, বর্ণনা ক্ষমতা, চারিত্রিক মাধুর্য, ব্যবহারিক জীবন, শিক্ষা ও বসস্থান সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল ছিলেন। রাবীদের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ সম্পর্কে পূর্ণ অবগত না হয়ে হাদীস রেওয়ায়েত করেননি।
প্রখ্যাত মুহাদ্দীসগণ অনেক গবেষণা চালিয়ে হাদীস বর্ণনাকারীদের গুণগত দিক থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাচাই-বাছাই এবং যথার্থ বিশ্লেষণ পূর্বক কঠোর নীতি অবলম্বন করে তাঁদের পাঁচ শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন।
প্রথম স্তরঃ যাঁদের হাদীস সংরক্ষণের ক্ষমতা অত্যাধিক এবং আপন শায়েখের ২৬২ সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর ছিল। যেমন, মালেক ইবনে আনাস রহ., উকাইল ইবনে খালিদ রহ. প্রমূখ।
দ্বিতীয় স্তরঃ যাঁদের হাদীস সংরক্ষণের ক্ষমতা অত্যাধিক বটে, কিন্তু শায়েখের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর নয়। যেমন, লাইস ইবনে সা'য়াদ রা. প্রমূখ।
তৃতীয় স্তরঃ যাঁদের হাদীস সংরক্ষণের ক্ষমতা অত্যাধিক নয়। কিন্তু শায়েখের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর। যেমন, মুয়াবিয়া ইবনে ইয়াহইয়া রহ. প্রমূখ।
চতুর্থ স্তরঃ যাঁদের হাদীস সংরক্ষণের ক্ষমতাও অত্যাধিক নয় এবং শায়েখের সাথে সম্পর্কও ঘনিষ্ঠতর নয়। যেমন, যামআহ ইবনে সালেহ রহ.।
পঞ্চম স্তরঃ যাঁদের মধ্যে এই উভয় প্রকার গুণেরই স্বল্পতা রয়েছে, অধিকন্তু অন্যান্য ত্রুটিও বিদ্যমান। যেমন, যাহার ইবনে কাসীর রহ.।
ইমাম বুখারী রহ. ২৬৪ উপরোক্ত পাঁচ শ্রেণীর রাবীদের মধ্যে থেকে প্রথম শ্রেণীর রাবীগণের রিওয়ায়েত অনুযায়ী হাদীস গ্রহণ করেছেন। ইমাম বুখারী রহ. দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে অনেক যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর অল্প কয়েকজন নির্বাচিত রাবী থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। আর ইমাম বুখারী রহ. তৃতীয় শ্রেণী থেকে হাদীস গ্রহণ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করেছেন।
নীচে থেকে উপর সাহাবী পর্যন্ত ঐ রাবী থেকে রেওয়ায়েত গ্রহণ করেছেন, যাঁদের আদালত ও যবতের ব্যাপারে তাঁদের সমকালীন সময়ের সমস্ত মাশায়েখ ও উস্তাদের একমত পেয়েছেন। ২৬৫
টিকাঃ
২৬২. শায়খ (شيخ) এর বহুবচন শুয়ুখ। পরিভাষায় প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ও ইলমে হাদীস শিক্ষাদাতা রাবীকে শায়খ বলা হয়।
২৬৪. হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. তাঁর শায়েখদের পাঁচটি স্তরে বিভক্ত করেছেন। প্রথম স্তর: যে সকল শায়খ নির্ভরযোগ্য তাবেয়ীদের নিকট হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় স্তর: তাবে তাবেয়ী। তৃতীয় স্তর: যাঁরা তাবেয়ীদের সাথে সাক্ষাত লাভ করেননি তবে প্রবীণ তাবে তাবেয়ী থেকে সরাসরি হাদীস গ্রহণ করেছেন। চতুর্থ স্তর: সমসাময়িক বন্ধু বান্ধব। পঞ্চম স্তর: তাঁর ছাত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এমন ব্যক্তিগণ।
২৬৫. ফতহুল মুলহিম (১৫৪-১৬৩)
📄 বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে তুলনা
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে কোনটির মর্যাদা বেশি তা নিয়ে উলামাদের তিনটি মত পাওয়া যায়।
(এক) কিছু মুতাআখিরীনের মতে সহীহ এর দৃষ্টিকোন থেকে দু'টিই সমান।
(দুই) আন্দালুসী ও মাগরিবী কিছু আলিম যেমন, ইবনে রুশদ, ইবনে হাযেম রহ. এর মতে সহীহ মুসলিম সহীহ বুখারী থেকে বিশুদ্ধতর ও শ্রেষ্ঠ।
(তিন) সমস্ত মুহাদ্দীসদের নিকটে সহীহ সনদ, আদালতে রিজালের দৃষ্টিকোন থেকে সহীহ বুখারীই মুসলিমের উপর শ্রেষ্ঠ।
সহীহ মুসলিমের ব্যাপারে মাগরিবীদের দলিল হল, হাফিয আবু আলী নিশাপুরী রহ. এর مَا تَحْتَ أَدِيمِ السَّمَاءِ كِتَابُ أَصَحَّ مِنْ كِتَابٍ مُسْلِمُ بْنُ الْحَجَّاجِ। এর কয়েকটি জবাব রয়েছে, প্রথমত এই বক্তব্যে থেকে বেশি থেকে বেশি এটুকু প্রমাণিত হয় যে, মুসলিমও সহীহ একটি গ্রন্থ। কারণ শ্রেষ্ঠত্ব সনদের দিক থেকে নয়; বরং সুন্দর বিন্যাসের দিক থেকে। ২৬৬
টিকাঃ
২৬৬. মুকাদ্দামা ফতহুল মুলহিম (২৭০ পৃষ্ঠা)