📄 বুখারীতে ছুলাছিয়্যাত রেওয়ায়েত
ছুলাছিয়্যাত (شُبَّيَّات) দ্বারা উদ্দেশ্যে হল, ইমাম বুখারী রহ. এবং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে রাবীদের মাত্র তিনটি স্তর থাকে। প্রথম- তাবে তাবেয়ী, দ্বিতীয়- তাবেয়ী ও তৃতীয়- সাহাবীদের জামাআত। আর এ ধরনের হাদীস সর্বোচ্চ প্রকারের হাদীস বলে গণ্য করা হয়।
সহীহ বুখারীতে বাইশটি ছুলাছিয়্যাত রেওয়ায়েত রয়েছে। যার মধ্যে বিশটিই হানাফী শায়েখদের থেকে ইমাম বুখারী রহ. রেওয়ায়েত করেছেন। তন্মধ্যে ছয়টি আবু আসেম আন নাবীল জাহ্হাক হানাফী রহ. থেকে। আর তিনটি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ হানাফী রহ. থেকে এবং এগারোটি মক্কী ইবনে ইবরাহীম হানাফী রহ. থেকে। যাঁরা সকলেই ইমাম আবু হানিফা রহ. এর ছাত্র ছিলেন। বাকী দু'টি খালেদ ইবনে ইয়াহইয়া কূফী রহ. ও ইসাম ইবনে খালেদ হিমসী রহ. থেকে। যাঁরা হানাফী অনুসারী ছিলেন না।
📄 ইমাম বুখারী রহ. এর উদ্দেশ্য
ইমাম বুখারী রহ. এর সহীহ বুখারী প্রণয়নের কয়েকটি উদ্দেশ্য এখানে আলোচনা করা হল।
১. কেবল সহীহ হাদীস সংকলন করা।
২. প্রত্যেকটি সহীহ হাদীস থেকে শরীয়তের আহকাম উদ্ঘাটন করা।
৩. শরীয়তের আহকাম উদ্ঘাটন করার পদ্ধতি শিক্ষা দেয়া। যেমন, ইবারতুন নস (عبارة النص), দালালাতুন নস (دلالة النص), ইশারাতুন নস (إشارة النص), ইকতিযাউন নস (اقتضاء النص) ইত্যাদি দ্বারা কিভাবে মাসআলা উদ্ঘাটন হয়, তা শিক্ষা দেয়া।
৪. হাদীস ও ফিকহ্ দু'টিকে একত্র করা। যাতে করে সে সমস্ত লোক জবাব পেয়ে যায়, যারা হাদীস ও ফিকহকে আলাদা ও একটা অপরটার বিপরীদ হিসেবে দেখে।
📄 বুখারীর শর্তসমূহ
ইমামদের হাদীস বর্ণনার শর্তসমূহের উপড় স্বতন্ত্র গ্রন্থ রয়েছে। মুহাম্মদ ইবনে তাহের মাকদীসী বলেন, ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম রহ.সহ সিয়াহ সিত্তাহ এর ইমামগণের তাঁদের থেকে বর্ণনার কোন শর্ত উল্লেখ পাওয়া যায়নি; বরং তাদের গ্রন্থগুলো গবেষণা করে শর্তগুলো নির্বাচন করা হয়েছে।
ইমাম বুখারী রহ. ও ইমাম মুসলিমের শর্ত ছিল এই যে, তাঁরা এমন হাদীস সংকলন করেন, যা প্রসিদ্ধ সাহাবী হতে নির্ভরযোগ্য সনদসহ বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেক স্তরে রাবীদের বিশ্বস্ততা ও নির্ভযোগ্যতার ব্যাপারে কোন প্রকার মতানৈক্য নেই এবং সনদটিও অবিচ্ছিন্ন হয়। ২৪৫
যদি সাহাবীর নিকট হতে বর্ণনাকারী দুই বা ততোধিক হন, তবে তা খুবই উত্তম। আর যদি কোন স্তরে মাত্র একজন ব্যক্তি বর্ণনা করেন, তবে শেষ রাবী পর্যন্ত বিশুদ্ধ পরস্পরা পাওয়া গেলে ইমাম বুখারী ও মুসলিম তাঁরা উভয়েই সেই হাদীস সংকলন করেছেন। অবশ্য ইমাম মুসলিম এমন কতিপয় ব্যক্তির হাদীসও সংকলন করেছেন। যাঁদের প্রতি ইমাম বুখারী রহ. এর সন্দেহ হওয়াতে তিনি তাদের হাদীস সংকলন করেননি। কিন্তু ইমাম মুসলিম রহ. সেই সন্দেহ দূর করে তাঁদের হাদীস তাঁর সহীহ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। ২৪৬
টিকাঃ
২৪৫. শুরুতুল আইয়িম্মাহ (১ পৃষ্ঠা)
২৪৬. তাদরীবুর রাবী (৪১ পৃষ্ঠা)
📄 সহীহ বুখারীর ফযিলত
এক, মুহাম্মদ ইবনে আহমদ মারওয়াযী রহ. বলেন, كنت نائما بين الرُّكْن وَالْمُقَامِ فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَنَامِ فَقَالَ لِي يَا أَبا زيد إِلَى مَتى تدرس كتاب الشَّافِعِي وَلَا تدرس كتابي فقلت يَا رَسُول الله وَمَا كتابك قَالَ جَامع مُحَمَّد بن إِسْمَاعِيل। আমি একদা পবিত্র কা'বা ঘরে হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীমের মাঝে শায়িত ছিলাম, তখন স্বপ্নে দেখতে পেলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ব-শরীরে আমার সামনে উপস্থিত। তিনি আমাকে সম্বোধন করে বললেন, হে আবু যায়েদ! তুমি আর কতকাল ধরে ইমাম শাফেয়ী (মৃত্যুঃ ২০৪ হিজরী) এর কিতাব পড়তে থাকবে? ওসব ছেড়ে দিয়ে এখন আমার কিতাব শিক্ষা শুরু করো। আমি সবিনয়ে আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনার কিতাব কোনটি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বললেন, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী যে হাদীস গ্রন্থখানা সংকলন করেছেন, সেটিই আমার কিতাব। ২৪৭
দুই, আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. এর বক্তব্যে, তিনি বলেন, বুখারী শরীফ পাঠ করে বৃষ্টি বর্ষণের দোয়া করা হয়।
তিন, যে ঘরে বুখারী শরীফ পাঠ করা হয়, সে ঘরে প্লেগ হয় না।
চার, ইমাম বুখারী রহ. এর জীবদ্দশায় নব্বই হাজার ছাত্র তা পড়েছেন।
পাঁচ, আল্লামা নববী রহ. বলেন, সহীহ হাদীস সম্বলিত নিখুঁত ও একনিষ্টভাবে প্রথম জামী' গ্রন্থ রচনা করেন, ইমাম বুখারী রহ.।
ছয়, বিশিষ্ট মুহাদ্দীস নজম ইবনে ফুযাইল রহ. বর্ণনা করেন, رأيت مُحَمَّদ بن إِسْمَاعِيل البُخَارِيّ فِي الْمَنَام يمشي خلف النَّبي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وَالنَّبِيِّ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يمشي فكلما رفع النبي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم قدمه وضع البُخَارِيّ قدمه في ذلك الموضع। একদা আমি স্বপ্ন দেখলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় রওযা মুবারক থেকে বের হয়ে আসছেন এবং ইমাম বুখারী রহ. তাঁর পিছনে পিছনে হাঁটছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে স্থানে পা রেখে হাঁটছেন। তিনিও তাঁর পিছনে ঠিক সেই স্থানে পা রেখে হাঁটছেন। ২৪৮
সাত, মাওলানা আবদুল হাই রহ. লিখেন, মাওলানা আবদুল মালেক আব্বাসী রহ. এর কোরআন ও সহীহ বুখারী মুখস্থ ছিল।
আট, আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ. এবং হাফেয ইবনে হাজার রহ. লিখেন, বিপদ-আপদ, বালা-মসিবত থেকে পরিত্রাণের জন্য সহীহ বুখারী পাঠ এবং দোয়া খুবই পরীক্ষিত আমল।
নয়, শায়েখ আবদুল হক মুহাদ্দীসে দেহলবী রহ. লিখেন, বুখারী শরীফ খতম প্রত্যেক বালা-মসীবতের প্রতিরোধক।
দশ, আল্লামা জামালুদ্দীন রহ. স্বীয় উস্তাদ সৈয়দ আসীল উদ্দীন রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি সহীহ বুখারী মোটামুটি একশ বিশ বারের মত খতম করেছি এবং প্রত্যেকবার যে উদ্দেশ্যে খতম করেছি, তা পূরণ হয়েছে। ২৪৯
টিকাঃ
২৪৭. হাদইয়ুস সারী (৬৭৬ পৃষ্ঠা)
২৪৮. তারীখে বাগদাদ (২/১০)
২৪৯. আশআতুল লুমআত (১/১১)