📄 ইমাম দ্বারা কুতনী ও অন্যদের সন্দেহ
সহীহ বুখারীর যে রেওয়ায়েতগুলোর প্রতি ইমাম দারা কুতনী রাহ.সহ অন্যান্যরা যে আপত্তি তুলেছেন, তার সংখ্যা একশো দশটির মত। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ও আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী তাঁর বিস্তারিত জবাব দিয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. পরিপূর্ণভাবে জবাব দেয়ার পর বলেন, আল-হামদুলিল্লাহ! অধিকাংশ আপত্তির পরিপূর্ণ ও সঠিক জবাব দেয়া হয়েছে। আপত্তিকারীদের আপত্তির মানদন্ড ছিল খুবই সাধারণ এবং তা ছিল জমহুর উলামাদের মতের বিরোধী। সুতরাং তারতম্য সমন্বয় করার সময় সহীহাইনই প্রধান্য পেয়েছে। ২২৮
তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক সৃজনশীল অন্তরের মানুষের এ কথা বুঝা উচিত যে, ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় গ্রন্থে যে সমস্ত রাবী থেকে উদ্ধৃত করেছেন, তাঁর নিকটে সে সমস্ত রাবীর আদেল ও সহীহুল হিফয হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে। ২২৯ এ জন্য জমহুর উলামা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমকে সহীহাইন বলেছেন। তবে ইমাম বুখারী রহ. এর নিজের সমস্ত জ্ঞানগত ও শাস্ত্রগত পূর্ণাঙ্গতা সত্ত্বেও একজন মানুষ ছিলেন। এ জন্য সহীহ বুখারী সংকলনে তাঁর থেকে ভুল-বিস্মৃতি পদস্খলন ও ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটা অসম্ভব নয়। ২০০
টিকাঃ
২২৮. লামেউদ দারারী (৬ পৃষ্ঠা)
২২৯. ফতহুল বারী (১/৩৮৪)
২০০. ইমাম বুখারী রহ. এর উপর যেসব প্রশ্ন ও সমালোচনা হয়েছে, হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. হাদইয়ুস সারী মুকাদ্দামায়ে ফতহুল বারীতে তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। যেমন: (এক) বানি ইস্তিনজা বিল মা-ই এর অধীনে আতা ইবনে আবু মাইমূনা নামক বর্ণনাকারী সম্পর্কে ইমাম বুখারী নিজেই কিতাবুয যুয়াফাতে লিখেছেন যে তিনি কাদরিয়া আকিদায় বিশ্বাসী ছিলেন। (দুই) কিতাবুল মাগাযীতে আইয়ূব ইবনে আইয সম্পর্কে তিনি নিজেই মুরজিয়া আকিদাহ পোষণকারী বলেছেন। (তিন) ইসমাঈল ইবনে আবান আল ওয়াররাক সম্পর্কে তিনি মাতরুক বা পরিতাজ্য বলেছেন অথচ তার থেকে হাদীস নিয়েছেন। এছাড়াও সনদের বিবরণে কিছু ভুল হয়েছে, যেমন আতা খুরাসানীকে আতা ইবনে আবু রাবাহ মনে করা, মালিক ইবনে বুহাইনার ক্ষেত্রে বুহাইনাকে মা না বলে স্ত্রী বুঝানো ইত্যাদি। হাদীসের মূল পাঠেও কিছু ঐতিহাসিক ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়, যেমন সাওদা রা.-এর ওফাত আগে হওয়ার কথা বলা (যদিও যয়নব রা.-এর আগে হয়েছিল), খুবাইব রা. হারিসকে হত্যা করার কথা বদর যুদ্ধে বলা (যা অন্য খুবাইব করেছিলেন) ইত্যাদি।
📄 একটি ভুল বুঝাবুঝির সমাধান
সহীহাইনের প্রতি আরো একটি আপত্তি তোলা হয় যে, ইমাম আবু হানিফা রহ. ও অন্যান্য ইমাম রহ. গণ এমন অনেক রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণ উত্থাপন করেছেন। কিন্তু সেগুলো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত নেই। তাহলে তা সবচেয়ে সহীহ হওয়ার উদ্দেশ্যেই বা কী? মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আমীরুর হাজ্জ হাম্বলী রাহ. এই আপত্তির জবাবে বলেন, সহীহাইনের সহীহ হওয়া পরবর্তীদের দৃষ্টিকোণ থেকে। আর আইম্মায়ে মুজতাহিদীন ছিলেন, এর পূর্বের সময়কার। তাঁরা এ দলের অন্তর্ভুক্ত নয়। ২৩২
আল্লামা কাওছারী রহ. বলেন, শায়েখাইন ও আসহাবে সুনান ইত্যাদি ফিকহে ইসলামীর পরে সৃষ্টি হয়েছে এবং হাদীসের দিকে মনোযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্ত আইম্মায়ে মুজতাহিদীন যাঁরা অনেক পূর্বে অতিবাহিত হয়েছেন, তাঁদের নিকট মারফু ও মাওকুফ এবং সাহাবী ও তাবেয়ীদের ফতোয়ার ভাণ্ডার উপস্থিত ছিল। আর্থাৎ এমন রেওয়ায়েত সম্মলিত গ্রন্থ, যেখানে কেবল সহীহ হাদীসই বর্ণনা করা হয়েছে। ২৩৩
টিকাঃ
২৩১. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।
২৩২. আত তাকরীর ওয়াত তাহবীর (৩/৩০)
২৩৩. লামেউদ দারারী (৮৪ পৃষ্ঠা)
📄 ইমাম আবু হানিফা থেকে রেওয়ায়াত না গ্রহণের কারণ
কথিত আছে, ইমাম বুখারী রহ. যেহেতু হানাফীদের প্রতি নাখোশ ছিলেন। তাই তিনি ইমাম আবু হানিফা রহ. থেকে রেওয়ায়েত করেননি। আল্লামা যায়লায়ী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. কঠিন পক্ষপাতিত্ব এবং ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মসলকের বিরুদ্ধে অনুপযোগী সমালোচনার কারণে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর কোন রেওয়ায়েত তাঁর কিতাবে বর্ণনা করেননি। ২৩৪
মাওলানা আবদুর রশিদ নূমানী লিখেন, ইমাম বুখারী রহ. ইমাম আবু হানিফা রহ. এর সাথে ঐ রীতিনীতিই অবলম্বন করেন, যা তিনি ইমাম জা'ফর সাদিক রহ. এর সাথে করেছেন। আল্লামা যাহাবী রহ. বলেন, ইমাম জা'ফর সাদিক রহ.কে ইমাম বুখারী রহ. দলিলের উপযুক্তই মনে করেন না। ২৩৫
আল্লামা কাওছারী এ ব্যাপারে সঠিক মতামত প্রকাশ করেন, তিনি লিখেন, ইমাম বুখারী রহ. ও ইমাম মুসলিম রহ. ইমাম আবু হানিফা রহ. থেকে কোন রেওয়ায়েত বর্ণনা করেননি ঠিকই। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা রহ. এর অল্প বয়েসী ছাত্রের সাথে সাক্ষাত ও তাঁর থেকে রেওয়ায়েত গ্রহণ দু'টিই প্রমাণিত। তেমনই ভাবে ইমাম বুখারী রহ. ইমাম শাফেয়ী রহ. এর কতক ছাত্রের সাথে সাক্ষাত করেন। মুহাদ্দিসীনে কেরামের এ রীতিনীতি থেকে প্রমাণিত হয় যে, যে সমস্ত মুহাদ্দীসগণের ছাত্রদের সংখ্যা এ পরিমাণ বেশি যে, তাঁরা স্বীয় শায়েখের হাদীসগুলি জমা ও সংরক্ষণ করতে সক্ষম। সে সমস্ত শায়েখদের প্রতি ইমাম বুখারী রহ. মনোযোগ কম দিয়েছেন। ২৩৬
📄 সহীহ বুখারীর পরিচ্ছেদ শিরোনাম
ইমাম বুখারী রহ. বিভিন্ন পদ্ধতিতে, ভিন্ন ভিন্ন নামে সহীহ বুখারীর পরিচ্ছেদ শিরোনাম দিয়েছেন।
এক, পরিচ্ছেদ শিরোনামে কোরআনের আয়াত। যেমন: (بَابُ قَوْلِ اللَّهِ تَعَالَى: {وَمَا أُوتِيتُمْ مِنَ العِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا})
দুই, সরাসরি কোরআনের আয়াত দিয়ে পরিচ্ছেদ শুরু। যেমন: বুনী (بَابُ: {فَإِنْ تَابُوا...})
তিন, ভাষাগত বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন। যেমন: (بَابُ مَا جَاءَ فِي قَوْلِ اللهِ تَعَالَى...)
চার, এক আয়াত দিয়ে একাধিক পরিচ্ছেদ শিরোনাম।
পাঁচ, সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসকে শিরোনাম করা। যেমন: (بَابُ قَوْلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ»)
ছয়, হাদীস হওয়ার প্রতি ইশারা না করে হাদীসকে শিরোনাম করা। যেমন: (بَابٌ: مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ)
সাত, হাদীসের শব্দের ব্যাখ্যা দিতে শিরোনাম পরিবর্তন। যেমন: 'সামাত' এর তাফসীর 'নাফর' দ্বারা করা।
আট, নিজস্ব শর্ত অনুযায়ী সহীহ নয় এমন হাদীসকে শিরোনাম করে অন্য রেওয়ায়েত দ্বারা সমর্থন করা।
নয়, সহীহ বুখারীতে বর্ণিত নেই এমন রেওয়ায়েতের সাহায্যে শিরোনাম প্রমাণ করা (যেমন সহীহ মুসলিমের শব্দ 'দালক' ব্যবহার)।
দশ, সংক্ষিপ্ত আকারে শিরোনাম প্রতিষ্ঠিত করা। যেমন হযরত উমর রা. এর গরম পানি ব্যবহারের ঘটনা। ২৩৭
এগারো, সাহাবী বা তাবেয়ীদের উদ্ধৃতি ব্যবহার।
বারো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সরাসরি আমল দ্বারা শিরোনাম।
তের, সরাসরি নিষেধাজ্ঞা সূচক বাণী দ্বারা শিরোনাম।
চৌদ্দ, সরাসরি নির্দেশ দ্বারা শিরোনাম।
পনেরো, নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী অনুমতি দ্বারা শিরোনাম।
ষোল, আমলের ফজিলত বর্ণনা করে শিরোনাম।
সতের, সরাসরি প্রশ্ন দ্বারা পরিচ্ছেদ শিরোনাম।
আঠারো, সাহাবায়ে কেরামের উদ্ধৃতি উল্লেখ।
উনিশ, তাবেয়ীদের উদ্ধৃতির সাহায্যে শরীয়তের আহকাম বর্ণনা।
বিশ, পরিচ্ছেদ শিরোনাম লিখে তাতে নিজের মন্তব্য পেশ করা।
টিকাঃ
২৩৭. ফতহুল বারী (১/২৯৯)