📄 ইমাম বুখারী রহ.র অভ্যাস ও সহীহ বুখারীর কিছু বৈশিষ্ট্য
(১) হযরত গাঙ্গুহী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. তাঁর সহীহ হাদীস গ্রন্থের মধ্যে কোন কারণে রচনাকার্য স্থগিত করলে, তিনি পুনরায় শুরু করার সময় بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ দ্বারা লিখা শুরু করতেন। যার কারণে এ গ্রন্থের মাঝে মাঝে তাসমিয়ার উল্লেখ দেখা যায়।
(২) ইমাম বুখারী রহ. কখনো কখনো বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ না করে حُكِي রُوِيَ শব্দ ব্যবহার করেছেন। আল্লামা ইমাম নববী রহ. এ প্রসঙ্গে বলেন, ইমাম বুখারী রহ. এ ধরণের শব্দ দুর্বল তালিকাতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন।
(৩) ইমাম বুখারী রহ. তাঁর গ্রন্থে কিছু কিছু স্থানে قَالَ فَلَان বাক্যটি উল্লেখ করেছেন। হাদীস বিশারদগণের মতে, ইমাম বুখারী এ ধরনের শব্দ কেবল সে সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন, যেখানে হাদীস সংকলন ও বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁর মানহাজের শর্তানুযায়ী হাদীস বর্ণিত হয়নি।
(৪) ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ বুখারীতে অধ্যায় শেষ করার পূর্বে তার ইঙ্গিত দিতেন। অর্থাৎ তিনি কোন অধ্যায় শেষ করার পূর্বে এমন কোন শব্দ ব্যবহার করতেন, যাতে করে বুঝা যেত যে, তিনি এ অধ্যায় শেষ করছেন। যেমন, بَدْءُ الوَحْيِ অধ্যায়ের শেষে فَكَانَ ذَلِكَ آخِرَ شَأْنِ هِرَقْلَ শব্দটি।
(৫) ইমাম বুখারী রহ. কখনো কখনো হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল অথবা ঘটনাকে নিদিষ্ট করে অধ্যায় শিরোনাম করেছেন। যেমন, كَيْفَ كَانَ بَدْءُ الحَيْضِ, كَيْفَ فُرِضَتِ الصَّلَاةُ كَيْفَ كَانَ بَدْءُ الوَحْيِ
(৬) কখনো কখনো কোন এক রাবীর হাদীস নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত সহীহ ও গ্রহণযোগ্যতা থাকে। অতঃপর সে সময়ের পরে তার রেওয়াতেগুলো দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। যেমন মারওয়ান ইবনে হাকীমের ব্যাপারে প্রসিদ্ধ রয়েছে যে, তার হাকিম (বিচারক) হওয়ার পূর্বের রেওয়ায়েতগুলো গ্রহণযোগ্য।
(৭) সহীহ বুখারীর শুরুর হাদীসের সাথে সর্বশেষ হাদীসের সুপ্ত সম্পর্ক রয়েছে। ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীর শুরুতে إِنَّمَا الْأَعْمَالِ بِالنَّيَّاتِ হাদীসটি রেওয়ায়েত করেছেন। আর সর্বশেষ কিতাবুত তাওহীদের سُبْحَانَ الله وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللهُ الْعَظِيمِ হাদীসটি রেওয়ায়েত করেছেন। দুনো হাদীসের মাঝে গভীর সম্পর্ক হল, আমলের গ্রহণযোগ্যতা পরিছন্ন এবং একনিষ্ঠ নিয়তের মধ্যমেই হয়।
টিকাঃ
২২৪. তালিকাত হল, সনদের প্রথম দিকে রাবীর নাম বাদ পড়লে। অর্থাৎ সাহাবীর পর এক বা একাধিক রাবীর নাম বাদ গেলে তাকে মুয়াল্লাক বলে। আর এরূপ হওয়াকেই তালিকাত বলে।
📄 সহীহ বুখারী প্রণয়নের মহান উদ্দেশ্য
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, সহীহ বুখারী পুরোটাই যেন বিশুদ্ধতাকে আবশ্যক করে রেখেছে। সেখানে কেবল সহীহ হাদীস নিয়ে আসা হয়েছে। যেমনটি তার নাম থেকেই বুঝা যায়। ইমাম বুখারী রহ. বিশুদ্ধ হাদীস সন্নিবেশ করার পাশাপাশি আরো এমন কিছু জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমাহার ঘটিয়েছেন, যা এ গ্রন্থের মর্যাদাকে আরো অধিক উন্নত করেছে। তিনি তাঁর সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা ও গভীর জ্ঞানের মাধ্যমে হাদীসের মতন থেকে বহু জ্ঞান ও ফিকহী বিষয়াবলী আহরণ করে বিভিন্ন বাবের শুরুতে সেগুলি সংযোজন করেছেন।
তেমনিভাবে তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াতের হুকুমের প্রতি পরিপূর্ণ মনোনিবেশ করেছেন এবং সেখান থেকে তিনি নান্দনিক ও বিরল অর্থের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। শাহ্ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দীসে দেহলবী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. এর আসল উদ্দেশ্যে ছিল, হাদীসের সমুদ্র থেকে সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদীসকে নির্ণয় করা এবং সেখান থেকে ফিকহ, সীরাত ও তাফসীর উদ্ঘাটন করা। তিনি হাদীস গ্রহণের যে শর্তারোপ করেছেন, তা তিনি যথাযথভাবে পালন করেছেন। ২২৫
এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইমাম বুখারী রহ. এর সহীহ বুখারীতে উদ্দেশ্যে ছিল, ইস্তিমবাত বা শরীয়তের হুকুম আহকাম উদ্ঘাটনের পদ্ধতি নির্ণয় করা। যার কারণে এ কথা বলা হয় যে, فِقْهُ الْبُخَارِيُّ فِي تَرَاجِمِهِ ইমাম বুখারী রহ.এর জ্ঞান-গরিমা ও বুদ্ধি-চাতুর্য তাঁর গ্রন্থের পরিচ্ছেদ শিরোনামে লুকিয়ে রয়েছে। ২২৬
টিকাঃ
২২৫. হুজ্জাতুল্লাহিল বালীগা (১/১৫)
২২৬. লামে' (২৪ পৃষ্ঠা)
📄 সহীহ বুখারীর পরিচ্ছেদ শিরোনামের উপর স্বতন্ত্র কিতাব রচনা
সহীহ বুখারীর অধ্যায়ের শিরোনামই সহীহ বুখারীর একটি স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য। যা দুর্বোধ্য ও সূক্ষ্ম মাসায়েলের উপর হওয়ার কারণে অন্যান্য হাদীসের কিতাবগুলো থেকে আলাদা। আল্লামা শাহ আনোয়ার কাশ্মীরী রহ. বলেন, সবচেয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিচ্ছেদ শিরোনাম সহীহ বুখারীর। ইমাম বুখারী রহ. কখনো কখনো ইশারা ও ইঙ্গিতের আশ্রয় গ্রহণ করে পরিচ্ছেদ শিরোনাম প্রদান করেছেন। এই বিষয়ের উপর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল:
(এক) المتوارى على تراجم ابواب البخاري : আল্লামা নাসির উদ্দীন আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল ইসকেন্দারী রহ. এটি রচনা করেন।
(দুই) ترجمان التراجم : আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে উমর আল ফিহরী আস সীবতী রহ. (ইবনে রুশদ) এটি রচনা করেন।
(তিন) فلك الاعراض المبهمة في الجمع بين الحديث والترجمة : আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুনসুর আল মাগরুবী রহ. এটি রচনা করেন।
(চার) تعليق المصابيح على ابوب الجامع الصحيح : বদরুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আবী বকর ইবনে উমর রহ. এটি রচনা করেন।
(পাঁচ) شرح تراجم ابواب البخاري : শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দীসে দেহলবী রহ. এটি রচনা করেন।
(ছয়) الابواب والتরাজম : মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্দলবী রহ. এটি রচনা করেন।
টিকাঃ
২২৭. (৫) شرح مناسبات تراجم البخاري (২) مناسبات على تراجم البخاري (৩) تراجم البخارى الموسوم مناسبات ابواب صحيح البخاري لبعضها بعضا (৪) اراز المعانى الغামضه في تتابع البخاري بالمعارضة (৫) الدراري في ترتيب ابواب البخاري (৬) شرح تراجم البخاري।
📄 ইমাম দ্বারা কুতনী ও অন্যদের সন্দেহ
সহীহ বুখারীর যে রেওয়ায়েতগুলোর প্রতি ইমাম দারা কুতনী রাহ.সহ অন্যান্যরা যে আপত্তি তুলেছেন, তার সংখ্যা একশো দশটির মত। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ও আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী তাঁর বিস্তারিত জবাব দিয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. পরিপূর্ণভাবে জবাব দেয়ার পর বলেন, আল-হামদুলিল্লাহ! অধিকাংশ আপত্তির পরিপূর্ণ ও সঠিক জবাব দেয়া হয়েছে। আপত্তিকারীদের আপত্তির মানদন্ড ছিল খুবই সাধারণ এবং তা ছিল জমহুর উলামাদের মতের বিরোধী। সুতরাং তারতম্য সমন্বয় করার সময় সহীহাইনই প্রধান্য পেয়েছে। ২২৮
তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক সৃজনশীল অন্তরের মানুষের এ কথা বুঝা উচিত যে, ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় গ্রন্থে যে সমস্ত রাবী থেকে উদ্ধৃত করেছেন, তাঁর নিকটে সে সমস্ত রাবীর আদেল ও সহীহুল হিফয হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে। ২২৯ এ জন্য জমহুর উলামা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমকে সহীহাইন বলেছেন। তবে ইমাম বুখারী রহ. এর নিজের সমস্ত জ্ঞানগত ও শাস্ত্রগত পূর্ণাঙ্গতা সত্ত্বেও একজন মানুষ ছিলেন। এ জন্য সহীহ বুখারী সংকলনে তাঁর থেকে ভুল-বিস্মৃতি পদস্খলন ও ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটা অসম্ভব নয়। ২০০
টিকাঃ
২২৮. লামেউদ দারারী (৬ পৃষ্ঠা)
২২৯. ফতহুল বারী (১/৩৮৪)
২০০. ইমাম বুখারী রহ. এর উপর যেসব প্রশ্ন ও সমালোচনা হয়েছে, হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. হাদইয়ুস সারী মুকাদ্দামায়ে ফতহুল বারীতে তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। যেমন: (এক) বানি ইস্তিনজা বিল মা-ই এর অধীনে আতা ইবনে আবু মাইমূনা নামক বর্ণনাকারী সম্পর্কে ইমাম বুখারী নিজেই কিতাবুয যুয়াফাতে লিখেছেন যে তিনি কাদরিয়া আকিদায় বিশ্বাসী ছিলেন। (দুই) কিতাবুল মাগাযীতে আইয়ূব ইবনে আইয সম্পর্কে তিনি নিজেই মুরজিয়া আকিদাহ পোষণকারী বলেছেন। (তিন) ইসমাঈল ইবনে আবান আল ওয়াররাক সম্পর্কে তিনি মাতরুক বা পরিতাজ্য বলেছেন অথচ তার থেকে হাদীস নিয়েছেন। এছাড়াও সনদের বিবরণে কিছু ভুল হয়েছে, যেমন আতা খুরাসানীকে আতা ইবনে আবু রাবাহ মনে করা, মালিক ইবনে বুহাইনার ক্ষেত্রে বুহাইনাকে মা না বলে স্ত্রী বুঝানো ইত্যাদি। হাদীসের মূল পাঠেও কিছু ঐতিহাসিক ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়, যেমন সাওদা রা.-এর ওফাত আগে হওয়ার কথা বলা (যদিও যয়নব রা.-এর আগে হয়েছিল), খুবাইব রা. হারিসকে হত্যা করার কথা বদর যুদ্ধে বলা (যা অন্য খুবাইব করেছিলেন) ইত্যাদি।