📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 ইমাম বুখারী রহ.এর রচনা ও সঙ্কলন

📄 ইমাম বুখারী রহ.এর রচনা ও সঙ্কলন


ইমাম বুখারী রহ. ইসলামী জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে অনেকগুলিই মহামূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার মধ্যে সর্বত্র অধিক সমাদৃত, খ্যাতি সম্পন্ন, মর্যাদাবান, সর্বশ্রেষ্ঠ ও অনবদ্য গ্রন্থ হচ্ছে, "আল জামেউস সহীহ আল বুখারী”। মহাগ্রন্থ আল কোরআনের পরেই সহীহ বুখারী অপেক্ষা অধিকতর বিশুদ্ধ গ্রন্থ দুনিয়াতে আর নেই। সব মিলে তিনি চব্বিশটি গ্রন্থ রচনা করেন।

(এক) قَضَايَا الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ (কাযায়া আস সাহাবাতি ওয়াত তাবেঈন) এটি ইমাম বুখারী রহ. এর সর্বপ্রথম রচিত গ্রন্থ। সেখানে সাহাবী রাযি. ও তাবেয়ীদের রহ. ফতোয়া ও ফায়সালা আলোচনা করা হয়েছে।

(দুই) التَّارِيْخُ الْكَبِيْر (আত তারীখুল কাবীর) এ দু'টি কিতাব তিনি মদিনাতুল মুনুওয়ারাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাওযাতুল আতহারের কাছে বসে চাঁদের আলোতে রচনা করেছেন। ইমাম বুখারী রহ. বলেন, এ গ্রন্থে যাঁদের নাম আলোচিত হয়েছে, প্রত্যেকের বিস্তারিত জীবনবৃত্তান্ত আমার জানা আছে। কিন্তু তিনি গ্রন্থাকৃতি লম্বা/বড় হবে জন্য তা আলোচনা থেকে বিরত থেকেছেন। ইমাম বুখারী রহ. এর উস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ রহ. যখন তিনি তারিখে কাবীর দেখেছেন, তখন তিনি আমীর আবদুল্লাহ ইবনে তাহির খোরাসানী এর কাছে তাশরীফ নিলেন এবং বললেন, আমি কি আপনাকে কিছু আশ্চর্য দেখাবো? অতঃপর তিনি তাকে তারীখে কারীর দেখালেন। আমীর আবদুল্লাহ ইবনে তাহির খোরাসানী তা দেখে খুবই আশ্চর্য হলেন। তিনি গ্রন্থটিতে সাহাবী, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈ ও মুহাদ্দীসদের জীবনীকে সুন্দরভাবে সন্নিবেশিত করেছেন।

(তিন) الْأَدَبِ الْمُفْرَد (আল আদাবুল মুফরাদ) এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চারিত্রিক গুণাবলির এক অনবদ্য সংকলন।

(চার) التَّفْسِير الْكَبِير (আত-তাফসীরুল কাবীর) ২০৪।

(পাঁচ) الجامع الْكَبِير (আল-জামেউল কাবীর)।

(ছয়) أسامي الصَّحَابَة (উসামাস সাহাবা)। এ বিষয়ে সর্বপ্রথম রচনাই ইমাম বুখারী রহ.এর।

(সাত) المبسوط (আল মাবসূত) ২০৫।

(আট) الجامع الصغير (আল জামেউস সাগীর)।

(নয়) بر الْوَالِدين (বিরুল ওয়ালিদাঈন)।

(দশ) کتاب الکنی (কিতাবুল কুনা) মুহাদ্দীসদেঃ উপনাম সম্পর্কে।

(এগারো) التاريخ الصغير (আত-তারিখুস সগীর)। এ গ্রন্থটি ইমাম বুখারী রহ. সন ভিত্তিক করে সাজিয়েছেন। যে বছর যে সব উলামায়ে কিরাম ইন্তিকাল করেছেন, তাদের জীবনী আগে আলোচনা করেছেন। তার পরের সনে যাঁরা ইন্তিকাল করেছেন তাঁদের জীবনবৃত্তান্ত আলোচনা করেছেন। এভাবে সন ভিত্তিক জীবনী আলোচনা করেছেন।

(বার) التاريخ الأَوْسَط (আত তারিখুল আওসাত)।

(তের) كتاب الوحدান (কিতাবুল ওয়াহদান)। এ গ্রন্থে কেবল সে সমস্ত সাহাবা রযি.দের আলোচনা করা হয়েছে, যাঁদের থেকে কেবলমাত্র একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ২০৬

(চৌদ্দ) كِتَابُ الهِبَةِ (কিতাবুল হিবাহ) ২০৭। এ গ্রন্থে পাঁচশতটি হাদীস রয়েছে।

(পনের) كتاب الضعفاء الصغير (কিতাবুষ-যুয়াফা আস সাগীর)।

(ষোল) المسند الكبير (আল-মুসনাদুল কাবীর) ২০৮।

(সতের) كتاب الاشربة (কিতাবুল আশরিবাহ)।

(আঠার) كتاب الفوائد (কিতাবুল ফাওয়ায়েদ) ২০৯।

(উনিশ) كتاب الرقاق (কিতাবুর-রিকাক)।

(বিশ) الْقِرَاءَة خلف الإمام (আল-কিরাআতু খালফাল ইমাম)।

(একুশ) رفع الیدین (রফউল ইয়াদাইন)।

(বাইশ) خلق أَفعال العباد (খালকু আফ'আলিল ইবাদ)।

(তেইশ) كتاب العلل (কিতাবুল ইলাল) ২১০।

টিকাঃ
২০৪. কিতাবটি পাওয়া যায় না। ইমাম বুখারী রহ. এর ছাত্র ইমাম ফিরাবরী গ্রন্থটি রচনার কথা উল্লেখ করেন। এছাড়াও ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ও হাজী খলীফা গ্রন্থটির কথা উল্লেখ করেন। ফতহুল বারী (১/৪৯), কাশফুয যুনুন আন উসামীল কুতুব ওয়াল ফুনুন (২/৪৪৯)
২০৫. গ্রন্থটি পাওয়া যায় না। এটি ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারী রচনার পূর্বে এটি রচনা করেছিলেন। তিনি গ্রন্থটির শিরোনাম কায়েম করে সেগুলোর অধিনে হাদীসও জমা করেছিলেন। তবে তিনি কেবল সহীহ হাদীস জমা করার প্রতি অগ্রহী হোন এবং সহীহ বুখারীর কাজ শুরু করেন। আবুল ফযল মুহাম্মদ ইবনে তাহের আল মিকদিসী গ্রন্থটির কথা বলেন। তালিকুত তালীক আলা সহীহিল বুখারী (৫/৪২০)
২০৬. ফতহুল বারী (১/৪৯২)
২০৭. গ্রন্থটি পাওয়া যায় না। মুহাম্মদ ইবনে আবী হাতেম ওয়াররাক গ্রন্থটির কথা উল্লেখ করেছেন। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪১০)
২০৮. গ্রন্থটি পাওয়া যায় না। এটি সম্পর্কে ইমাম বুখারী রহ. এর ছাত্র মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ আল ফিরাবরী রহ. তথ্য দেন। কাশফুয যুনুন (২/৬৮৪)
২০৯. গ্রন্থটি পাওয়া যায় না। তবে এটি সম্পর্কে ইমাম তিরমিযি রহ. তাঁর সুনানে উল্লেখ করেছেন। (৬/৯৭)
২১০. গ্রন্থটি পাওয়া যায় না। আবুল কাসেম ইবনে মানদাহ রহ. এটির কথা উল্লেখ করেন। ফতহুল বারী (১/৪৯২)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 আল-জামেউস সহীহ

📄 আল-জামেউস সহীহ


নিদিষ্টভাবে একথা জানা নেই যে, ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারী রচনার কাজ কখন শুরু করেছিলেন এবং তা শেষ করেছিলেন। তবে এ কথার প্রমাণ আছে যে, যখন ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীর রচনা কাজ শেষ করেন, তখন তিনি তাঁর শায়েখদের মধ্যে হতে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. (মৃত্যু: ২৪১ হিজরী), আলী ইবনুল মাদীনী (মৃত্যু: ২৩৪ হিজরী), ইবনে মুঈন (মৃত্যু: ২৩৩ হিজরী) এর নিকট অভিমত জানতে তা পেশ করেছিলেন।

সর্বপ্রথম ইবনে মুঈন রহ. ইন্তিকাল করেন ২৩৩ হিজরী সনে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারী রচনার কাজ ২৩৩ হিজরী সনে শেষ করেছিলেন। যদিও তারপরে কিছু কিছু সংযোজন ও বিয়োজনের কাজ করেছেন। ২১২

সহীহ বুখারীর রচনার কাজ তিনি দীর্ঘ ষোল বছরে শেষ করেন। ইমাম বুখারী রহ. নিজে বর্ণনা করেন, صنفت كتابي الصحيح لست عشرة سنة আমার সহীহ বুখারী রচনা করতে ষোল বছর সময় লেগেছে। ২১০ সুতরাং এ হিসাব মতে সহীহ বুখারীর রচনা শুরুর সন ২১৭ হিজরী ধরা হবে। যখন ইমাম বুখারী রহ. এর বয়স মাত্র তেইশ বছর ছিল। ২১৪

টিকাঃ
২১২. জামে বলা হল, এমন হাদীসের গ্রন্থকে, যে গ্রন্থে আট ধরনের শিরোনামে হাদীসসমূহ বিন্যস্ত হয়। (১) আকাইদ (বিশ্বাস) (২) আহকাম (শরীয়তের আদেশ-নিষেধ) (৩) রিকাক (দয়া-সহানুভূতি/আত্মশুদ্ধি) (৪) আদব (শিষ্টাচার ও নিয়ম পদ্ধতি) (৫) তাফসীর (কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ) (৬) সিয়ার ও তারীখ (রাসূলুল্লাহ সাঃ এর জীবন চরিত) (৭) ফিতান ও আশরাত (বিশৃঙ্খলা ও কিয়ামতের আলামত) (৮) মানাকিব (সাহাবায়ে কেরামের মান-মর্যাদা)।
২১০. ওফাইয়াতুল আ'ইয়ান (২/৩৩৫)
২১৪. লামে' (পৃষ্ঠা ৬২)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 সহীহ বুখারীর নামকরণ

📄 সহীহ বুখারীর নামকরণ


হাদীস বিশারদগণের নিকট সংক্ষিপ্তভাবে কিতাবটি সহীহুল বুখারী বা 'আল জামী' নামে পরিচিত হলেও ইমাম বুখারী স্বয়ং নিজে গ্রন্থটির পূর্ণ নামকরণ করেছেন এভাবে: الجامع الصَّحِيح المسند من حَدِيث رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وسنته وأيامه

আল-জামী: এমন সংকলন যার মধ্যে হাদীস শাস্ত্রের আটটি অধ্যায় থাকবে এবং সহীহ বুখারীতে এই আটটি অধ্যায় রয়েছে। আর এ কারণে এটিকে জামী বলা হয়।

আস-সহীহ: ২১৫ এ কিতাবের সমস্ত হাদীস সহীহ। ইমাম বুখারী রহ. এতে বিশুদ্ধতাকে বাধ্যতামূলক করে নিয়েছেন। তাঁর তথ্যানুসন্ধান অনুযায়ী এতে কোন রেওয়ায়েত দুর্বল নেই।

আল-মুসনাদ ২১৬: মুসনাদ বলার কারণ হল, এর হাদীসগুলো মুত্তাসিল সনদে মারফু' আকারে বর্ণিত। যে সব আছার ইত্যাদি বর্ণিত আছে, সেগুলো অধিনস্থ এবং শিরোনামে আছে। শব্দটি গুরুত্বের জন্য এসেছে।

সুন্নাতীহী: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কাজ ও অবস্থাকে বুঝানো হয়েছে।

আইয়্যামিহী: শব্দটি দ্বারা বুঝানো হয়েছে, ইমাম বুখারী রহ. যুদ্ধসমূহের ও জাহেলিয়্যাত যুগের এমন কিছু ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতময় জীবনের সাথে সম্পর্ক রয়েছে।

টিকাঃ
২১৫. সহীহ শব্দটি একবচন, বহুবচন হল, সিহাহ। এর আভিধানিক অর্থ হল, বিশুদ্ধ, ত্রুটিমুক্ত, নির্ভুল, যথার্থ, সত্য, সঠিক, সুস্থ। যে হাদীস নির্ভরযোগ্য সনদ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত এবং দোষ-ত্রুটি ও রোগ থেকে মুক্ত তাই সহীহ।
২১৬. মুসনাদ কর্মবাচক বিশেষ্য। অর্থ: সম্পৃক্ত বা মিলিত বস্তু। মুসনাদ বলা হয়, যার সনদ রাবী থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত মিলিত এবং কোথাও কোন বিচ্ছেদ ঘটেনি।

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 সহীহ বুখারী রচনার কারণ

📄 সহীহ বুখারী রচনার কারণ


সহীহ বুখারী রচনার কারণ কী ছিল, তা নিয়ে কয়েকটি মতামত পাওয়া যায়। এক, ইমাম বুখারী রহ. এর জীবনী থেকে জানা যায় যে, শুধু দশ বছর বয়স থেকে তাঁর হাদীসে নববী মুখস্থ করার অসীম আগ্রহ সৃষ্টি হয়। আর এ জন্য তিনি বিভিন্ন দেশের সহস্রাধিক মাশায়েখ ও বড় বড় ইমাম থেকে হাদীস গ্রহণ করেন। ২৩ বছর বয়সে ইমাম বুখারী রহ. এর নিকটে ছয় লক্ষ হাদীসের বিশাল ভান্ডার জমা হয়ে যায়। ৩ লাখ মুখস্থ আর তিন লাখ পাণ্ডুলিপিতে। অতঃপর তাঁর মনে বারবার আসতে লাগল যে, সহীহ হাদীসগুলিকে একত্র করে প্রত্যেক বিষয়ে তা সন্নিবেশিত করতে পারলে উম্মাতের অনেক ফায়দা হবে। আর এর ভিত্তিতেই তিনি সহীহ বুখারীর সংকলনের কাজ শুরু করেন।

দুই, ইমাম বুখারী রহ. এর তৎকালীন শায়েখ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ একদা ছাত্রদের মজলিসে এ আকাঙ্খা প্রকাশ করলেন যে, لَوْ جَمَعْتُمْ كِتَابًا مُخْتَصَرًا لِصَحِيحِ سُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ যদি তোমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুনান দিয়ে একটি সহীহ বিশুদ্ধ গ্রন্থ সন্নিবেশিত করতে! ঘটনাক্রমে ইমাম বুখারী রহ. সে মজলিসে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর মনে বিষয়টি গেঁথে গেল এবং সহীহ হাদীস জমা করার কাজ শুরু করে দিলেন। ২১৭

তিন, ইমাম বুখারী রহ. একদা স্বপ্নে দেখলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে দাঁড়িয়ে পাখা দ্বারা বাতাস করছিলেন আর পবিত্র দেহ থেকে মাছি উড়ে উড়ে যাচ্ছিল। স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারী বিশেষজ্ঞরা এ স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বললেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে মিথ্যা ও অভিযোগগুলো দূর করবেন। অর্থাৎ হাদীসের ভান্ডার থেকে জাল ও দূর্বল হাদীসগুলো ছেঁটে বের করে দিবেন। অতঃপর তিনি এ ব্যাখ্যা পাওয়ার পর সহীহ বুখারী রচনার কাজ শুরু করলেন।

চার, হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, অধিকাংশ হাদীস বিশারদ যখন সনদ আকারে হাদীস সংকলন করতেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা অধ্যায় ও সনদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে হাদীস লিপিবদ্ধ করতেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, আবু বকর ইবনে আবী শায়বা রহ.। ইমাম বুখারী রহ. এ সকল সংকলন, বর্ণনাধারা, লিখন ও বিন্যাস পদ্ধতি অবলোকন করেন। তখন তিনি দেখতে পান, ঐ সমস্ত কিতাবে সহীহ ও হাসান হাদীস একই স্তরে বিন্যাস্ত এবং পাশাপাশি অনেক যঈফ হাদীসও বিদ্যমান। তখন ইমাম বুখারী রহ. এর মনে দৃঢ়তার সাথে সাড়া দিল যে, এমন হাদীসের গ্রন্থকে মহামূল্যবান বলা যায় না। ফলে তিনি সহীহ হাদীস সংকলন কাজে আত্মনিয়োগ ও সুদৃঢ় পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। ২১৮

ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারী কোথায় বসে রচনা করেছেন তা নিয়ে দুই ধরণের বক্তব্য পাওয়া যায়। প্রথমতঃ রওযায়ে আতহার অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাওযা মোবারকের পাশে বসে সংকলন করেছেন। আর দ্বিতীয়টি হল, হাতিমে বসে তা সংকলন করেছেন। এখন একটি প্রশ্ন আসে যে, মক্কা-মদীনায় তিনি তো ষোল বছর অবস্থান করেননি; বরং সর্বোচ্চ চার বছর অবস্থান করেছেন। তাহলে তা কিভাবে সম্ভব হয়? তার জবাব এই যে, তিনি রওযায়ে আতহারে বসেই সমস্ত অধ্যায়কে সন্নিবেশিত করেছেন। এরপর যখন যে হাদীস পেয়েছেন, তাকে সে অধ্যায়ে জমা করেছেন।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. মক্কা, মদীনা, বসরা এবং বুখারা নগরীতে গ্রন্থটির সংকলনের কাজ সম্পন্ন করেছেন। কেননা তিনি দীর্ঘ ষোল বছর এ মহান কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। অতঃপর আল্লামা আইনী রহ. মুহাম্মদ ইবনে আলী রহ. এর বর্ণনা উল্লেখ করেন, তিনি বলেন, আমি ইমাম বুখারীকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন, আমি আমার জামী গ্রন্থটি নিয়ে বসরায় পাঁচ বছর থেকেছি এবং গ্রন্থ সংকলনের কাজ করেছি। ২১৯

এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. প্রথমে মসজিদুল হারামে বসে তাঁর সহীহ গ্রন্থ সংকলনের সূচনা, বিন্যাস এবং অধ্যায়সমূহ সাজিয়েছেন। অতঃপর স্বদেশ বুখারা ও অন্যান্য স্থানে সফর করে হাদীস সংকলন করেছেন। ২২০

ইমাম ফিরাবরী রহ. বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারী রহ. আমাকে বলেছেন যে, আমি সহীহ বুখারীর প্রত্যেকটি হাদীস লিখার পূর্বে গোসল করতাম, দুই রাকাআত নামায আদায় করতাম। এরপর এস্তিখারা করে মনোতুষ্টির পর তা আমার কিতাবে লিপিবদ্ধ করতাম। আর আমি ছয় লক্ষ হাদীস থেকে যাচাই-বাছাই করে সহীহ বুখারী সংকলন করেছি। হযরত শায়খুল হিন্দ বর্ণনা করেন, সহীহ বুখারীর সংকলনের সময়কাল ষোল বছরই তিনি রোযা রাখেন। আর এই রোয়ার বিষয়টি তিনি কাউকে জানতে দিতেন না। ২২১

টিকাঃ
২১৭. সিয়ারু আ'লামীন নুবালা (১২/৪০১)
২১৮. হাদইউস সারী (৭ পৃষ্ঠা)
২১৯. ওমদাতুল কারী (১/০৫)
২২০. ফতহুল বারী (১/৪৮৯)
২২১. ফযলুল বারী (১/৬১)

ফন্ট সাইজ
15px
17px