📄 যাযরাতুল হাফেয
সালেহ ইবনে যাযারাহ ২০৫ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অনেক মেধাবী ও তীক্ষ্ণ স্মরণশক্তির অধিকারী ছিলেন। তিনি দরসের সময় কোন কিতাব সামনে রাখতেন না। তারপরও একটি শব্দ ভুল হতো না। তিনি ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন রহ., ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ., সাঈদ ইবনে সুলায়মান রহ. ও আবু নাসর তাম্মার রহ. এর মতো যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দীসদের সহচার্যে হাদীস শ্রবণ করেন। তিনি ২৬৬ হিজরী সনে বুখারায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তৎকালীন বুখারার আমীর পাণ্ডিত্যের কারণে তাঁকে অনেক সম্মান করতেন ও ভালবাসতেন। ইমাম দারা কুতনী রহ. বলেন, তিনি সিকাহ রাবী ছিলেন।
তিনি খোশমেজাজী ছিলেন। ইমাম আয যুহলী তাঁর মুসতাকিল আলোচনা লিখেছেন। তিনি ইমাম বুখারী রহ.এর সমকালীন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দীস হওয়া সত্ত্বেও ইমাম বুখারী রহ. এর দরসে উপস্থিত হয়ে হাদীস শ্রবণ করেছেন। তিনি ২৯৩ হিজরী সনে পরলৌকিক জগতে সফর করেন।
📄 ফকীহ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে নসর মারওয়াযী
তিনি ২০২ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ করেন। ইমামুল মুহাদ্দিসীন বুখারী রহ. ছাড়াও তিনি ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ রহ., ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া রহ., ইয়াযিদ ইবনে সালেহ রহ., হিশাম ইবনে আম্মার রহ., সাদাকাহ ইবনে আল ফযল রহ. থেকে ইলমী ফায়দা অর্জন করেন।
ফিকহী ইলমের সাথে সাথে সাহাবীদের বক্তব্য ও মাযহাব এবং তাবেয়ীদের সমন্বয়কারী ছিলেন। যখন কোন মজলিসে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া রহ.কে কোন মাসআলা জিজ্ঞেস করা হতো আর যদি সেখানে মুহাম্মদ ইবনে নসর উপস্থিত থাকতেন, তাহলে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আয যুহলী তাঁর ফিকহী পাণ্ডিত্যের ও সাহাবীদের বক্তব্যের সমন্বয়কারী হওয়ার কারণে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে নসর মারওয়াযী রহ. দিকে প্রশ্নকারীকে ইশারা করতেন।
হাফিয আয যাহাবী রহ. মুহাম্মদ ইবনে নসর ও ইবনে খুযাইমা রহ.এর তালিবে ইলমের সময়কালের একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত তাবারী, মুহাম্মদ ইবনে নসর, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক খুযাইমা, মুহাম্মদ ইবনে হারুন আর রুমানী ইলম অর্জনের লক্ষ্যে মিসরের একটি স্থানে একত্র হয়েছিলেন। সকলের খরচের টাকা শেষ হয়ে গিয়েছিল যার ফলে সকলে ক্ষুধার্ত থাকতে লাগলেন। যখন ক্ষুধার জ্বালা অসহনীয় হয়ে গেল এবং অন্যের সহযোগিতা বা দান গ্রহণ প্রয়োজন হলো, তখন সকলে পরামর্শে বসলেন। যেহেতু হাদীসে সুওয়াল (ভিক্ষা বা অন্যের কাছে দান চাওয়া) করার ব্যাপারে নিষেধ আছে। তাই সকলেই একে অন্যকে সুওয়াল করার জন্য অনুরোধ করতে লাগলেন। অতঃপর বিষয়টি লটারীর দিকে গড়ালো এবং লটারীতে মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযাইমা রহ. এর নাম আসলো। তিনি অপারগ হয়ে বললেন, আমাকে অযু করে দুই রাকাআত নামাযের সুযোগ দিতে হবে। অতঃপর তিনি নামায পড়তে লাগলেন। এমতাবস্থায় একজন লোক এসে দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকতে লাগলেন। সকলে উপস্থিত হলে জানতে পারলেন তিনি শহরের প্রসাশকের বিশেষ লোক। তার উপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, মুহাম্মদ ইবনে নসর মারওয়াযী কে? লোকেরা যখন মুহাম্মদ ইবনে নসরকে দেখিয়ে দিলেন, তখন তিনি তাঁকে পঞ্চাশটি আশরাফির একটি থলি বের করে দিলেন। অতঃপর এভাবে সকলের নাম নিলেন এবং সবাইকে খরচের জন্য একটি করে থলি দিলেন। তারপর বললেন, আমাদের আমীর ঘুমিয়ে ছিলেন। অতঃপর ঘুম থেকে উঠে আমাকে বললেন, আমি এখনি স্বপ্নে দেখলাম যে, মুহাম্মদরা অসহনীয় ক্ষুধার্ত অবস্থায় ইলম অর্জন করছেন। অতঃপর তিনি এই হাদিয়া আপনাদের জন্য পাঠিয়েছেন এবং কসম দিয়েছেন এটি শেষ হলে যেন আপনারা কাউকে পাঠিয়ে দেন।
২৯৪ হিজরী সনে সমরকান্দে মুহাম্মদ ইবনে নসর রহ. মৃত্যুবরণ করেন। (তাযকিরাতুল হুফফায)
📄 ইমাম আবু হাতেম রাযী
ইমাম রাযী রহ.কে জরাহ ওয়াত তা'দিলের গ্রহণযোগ্য বড় ইমাম হিসেবে গণনা করা হয়। তিনি ১৯০ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস গ্রহণের জন্য সর্বদায় পায়ে হেঁটে সফর করতেন। তিনি নিজে বর্ণনা করেন যে, আমি এক সফরে এক হাজার ফরসখ ১৯৫ পর্যন্ত পায়ে হেঁটে চলার গণনা করেছি। তারপর গণনা ছেড়ে দেই। তিনি বাহরাইন থেকে মিসর, মিসর থেকে রামেলা, রামেলা থেকে তুরতুস এসব জায়গায় পায়ে হেঁটে সফর করেছেন।
বসরায় গিয়ে একবার খরচের টাকা শেষ হয়ে গেলে তিনি তাঁর কাপড় বিক্রি করে দিলেন। এ টাকাও শেষ হয়ে গেলে তিনি কয়েক দিন অভুক্ত থাকলেন। তিনি ইমাম বুখারী রহ. এর সময়কালে বড় মুহাদ্দীস হওয়া সত্ত্বেও ইমাম বুখারী রহ.এর তাহকীক ও গবেষণা দেখে নিজেই এসে ইমাম বুখারী রহ. থেকে ইলমী ফায়দা অর্জন করেন। তিনি ২৭৭ হিজরী সনে ইন্তিকাল করেন।
টিকাঃ
১৯৫. এক ফরসখ সমান তিন মাইল। আর এক হাজার ফরসখ সমান তিন হাজার মাইল। অতঃপর এক কিলোমিটার সমান ০.৬২১২৭১ মাইল। সুতরাং তিন হাজার মাইল সমান ৪৮২৮.০৩১ কিলোমিটার।
📄 ইবরাহীম আল হারবী
ইবরাহীম আল হরবী রহ.কে ইলমে লোগাত, আদব, নাহু ও ফিকহের ইমাম বলা হয়। খতীবে বাগদাদ বর্ণনা করেন, তাঁকে লোগাত ও নাহুর ইমাম মানা হয়। আমি পঞ্চাশ বছর ধরে কখনো তাঁর দরসগাহকে শূণ্য দেখিনি। তিনি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন। তিনি কখনো বাদশা বা সুলতানের হাদীয়া-তোহফার প্রতি সামান্যতম আগ্রহ দেখাননি। তাঁর স্বাধীনচেতা মানসিকতাও তাঁকে ইলমী তাহকীক ও গবেষণা থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
সমকালীন মুসলিম খলিফা তাঁকে এক হাজার দিরহাম হাদিয়া পাঠালে তিনি তা ফেরত দিলেন। অতঃপর খলিফা অনুরোধের সাথে দ্বিতীবার পাঠালেন, এবারো তিনি তা গ্রহণ করলেন না। ২৮৫ হিজরী সনের জিলহজ্ব মাসে তিনি ইন্তিকাল করেন। তিনি ইমাম বুখারী রহ.এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ইলমী ফায়দা হাসিল করেন।