📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 নিজ ভূমিতে ঈমানী পরিক্ষা

📄 নিজ ভূমিতে ঈমানী পরিক্ষা


ইমাম বুখারী রহ. যখন নিশাপুর ছেড়ে বুখারায় তাশরীফ নিলেন, তখন বুখারাবাসী ইমাম বুখারী রহ.কে আনন্দের সাথে অতি উৎসাহে সাদরে গ্রহণ করলেন এবং সম্মানজনক অভ্যর্থনা জানালেন। অতঃপর সেখানে ইমাম বুখারী রাহ. হাদীসের দরস শুরু করলেন। লোকেরা অতি উৎসাহে সে দরসে উপস্থিত হতে লাগলেন।

বুখারার প্রশাসক খালিক ইবনে আহমদ আয যুহলী হাদীস ও ইতিহাস জানার মানসে ইমাম বুখারী রহ.কে রাজপ্রাসাদে এসে তাকে হাদীস ও ইতিহাস পাঠদানের জন্য অনুরোধ জানালেন। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. বললেন, আমি ইলমকে মানুষের দরজায় গিয়ে বিতরণ করে তার অসম্মান করতে পারবো না। আপনি যদি একান্তই ইলম অর্জন করতে চান, তাহলে আমার মসজিদে এসে তা অর্জন করুন। আর যদি এটি আপনার ভালো না লাগে, তাহলে আপনার ক্ষমতাবলে আমাকে হাদীসের পাঠদানে বাধা দিন। যাতে আমি কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তায়ালার সামনে নিজের অপারগতা পেশ করতে পারি। কেননা আমি ইলমকে গোপন করতে পারবো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ أَلْجَمَهُ اللَّهُ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»

যে ব্যক্তি জানা ইলম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে তা গোপন করল, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাকে আগুনের লাগাম পরিয়ে দিবেন। ১৭৬

অন্য একটি রেওয়ায়েতে উল্লেখ আছে বুখারার প্রশাসক ইমাম বুখারী রাহ.কে রাজপ্রসাদে এসে তার সন্তানদেরকে হাদীস ও ইতিহাসের পাঠদানের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। আর ইমাম বুখারী রাহ. তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ছিলেন। অতঃপর বুখারার প্রশাসক কিছু অসৎ ব্যক্তির সহযোগিতায় ইমাম বুখারী রহ. এর মতামতের সমালোচনা করতে লাগলো যার ফলে লোকদের মাঝে মতবিরোধ ও অসন্তোষ দেখা দিল। যার ফলশ্রুতিতে বুখারার প্রশাসক ইমাম বুখারী রহ.কে শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলো। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. বুখারা ত্যাগ করার সময় বদদোয়া করলেন। এক মাসেরও কম সময়ে খলীফাতুল মুসলিমীন সেই প্রশাসকের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করলেন এবং তাকে প্রত্যাহার করলেন। আর সেই সাথে শাস্তি হিসেবে গাধার পিঠে বসিয়ে শহরে ঘোরানোর নির্দেশ দিলেন এবং তাকে বন্দি করলেন। ১৭৭

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِنَّ اللَّهَ قَالَ: مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীর সাথে দুশমনি করবে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। ১৭৮

এরপর সমরকান্দবাসী ইমাম বুখারী রহ.কে তাদের নিকট আসার জন্য অনুরোধ জানালেন। কিন্তু সেখানের লোকেরাও মতভেদের শিকার হল। অতঃপর তিনি বাধ্য হয়ে মামারবাড়ি খরতঙ্গে অবস্থান নিলেন। যা বুখারা থেকে অল্প দূরেই অবস্থিত। অতঃপর রমযানুল মোবারক সেখানেই কাটালেন। রমযানের শেষের দিকে সমরকান্দবাসী মতবিরোধ ভুলে একমত হয়ে ইমাম বুখারী রহ.কে সমরকান্দে আহ্বান জানালেন এবং তিনি তা গ্রহণও করলেন।

গালিব ইবনে যিবরীল আস সমরকান্দী, যিনি ইমাম বুখারী রহ.কে সমরকান্দে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন, তিনি বলেন, আমি ইমাম বুখারীকে সমরকান্দ সফরের পূর্বে প্রত্যেক রাতের তাহাজ্জুতে এই দোয়া করতে শুনেছি।

اللَّهُمَّ إِنَّهُ قَدْ ضَاقَتْ عَلَيَّ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ، فَاقْبِضْنِي إِلَيْكَ

হে আমার প্রতিপালক, আপনার এই পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্তেও আমার জন্য তা সঙ্কোচিত হয়ে গেছে। অতএব আমাকে আপনার কাছে উঠিয়ে নিন ১৭৯ ১৮০

টিকাঃ
১৭৬. সুনানে আবু দাউদ (৩৬৫৮)
১৭৭. হাদইউস সারী (৪৯৩ পৃষ্ঠা)
১৭৮. সহীহ বুখারী (৬৫০২)
১৭৯. হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে মৃত্যু কামনা করা নিষেধ করা হয়েছে। তারপরেও ইমাম বুখারী রহ. فاقبضنِي إِلَيْكَ বলে কেন মৃত্যু কামনা করলেন? উত্তরে বলা যায় যে, প্রথমতঃ পার্থিব বিপদাপদের কারণে মৃত্যু কামনা করা নিষেধ ও না জায়েজ। যা হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বারা প্রমাণিত। তবে অপারগ হলে কিভাবে আল্লাহ তায়ালার কাছে সাহায্য চাইতে হবে তাও হাদিসে বর্ণিত রয়েছে। عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ: لَا يَتَمَنَّيَنَّ أَحَدُكُمُ الْمَوْتَ مِنْ ضُرَّ أَصَابَهُ... (সহিহ বুখারী ৫৬৭১)। দ্বিতীয়তঃ কিছু কারণে মৃত্যু কামনা করা জায়েজ আছে। তার মধ্যে প্রথম কারণ হল, পরকালীন মুসিবতের কারণে অথবা দ্বীনি ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য মৃত্যু কামনা করা। (সুনানে তিরমিযি ৩২৩৩; মুসনাদে আহমদ ২৩৬২৫)। ইবনে রজব রহ. বলেন, এ ধরণের মৃত্যু কামনাকে অধিকাংশ আলিম জায়েজ বলেন। (মুয়াত্তা মালিক ৬৩১/৩০৪৪)। তৃতীয়তঃ দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর রাস্তায় শহীদী মৃত্যু কামনা। আর শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করা শুধু বৈধ নয়; বরং উত্তম। (সহীহ মুসলিম ১৯০৯; সহীহ বুখারী ২৯৭৫)।
১৮০. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪৬৬)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 মৃত্যু

📄 মৃত্যু


বর্ণিত আছে, সমরকান্দবাসী ইমাম বুখারীকে নেয়ার জন্য বাহন পাঠিয়েছিলেন এবং ইমাম বুখারী রহ.ও যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় যাত্রা শুরু করতে পারেননি। এমতাবস্থায় তার শরীর মোবারক থেকে অস্বাভাবিক ঘাম ঝরছিলো। যার কারণে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন। অতঃপর ২৫৬ হিজরী সন ১ম শাওয়াল মোতাবেক ১৩ আগষ্ট ৮৭০ ইংরেজী, পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন, তের দিন কম ৬৬ বছর বয়সে এই মহান মনীষী নশ্বর জগত ছেড়ে অবিনশ্বর জগত পানে চলে গেলেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ১৮১

ইমাম বুখারী রহ. এর কথামতোই তাঁকে জামা ও পাগড়ী ছাড়াই কাফন দেয়া হয়। তবে দাফনের জায়গা নিয়ে মতবিরোধ দেখা গেল। কেউ কেউ সমরকান্দে নিয়ে গিয়ে সেখানে দাফন করতে চাইলেন। কেউ আবার সেখানেই দাফন করতে চাইলেন। অবশেষে ঈদুল ফিতিরের দিন যোহরের নামাজের পর খরতঙ্গেই দাফন করা হল। এভাবেই এই পৃথিবীর উজ্জল নক্ষত্র, হাদীসে নববী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাদেম, পৃথিবীর ইলমের পৃষ্টপোষক মাটির নিচে গোপন হয়ে গেলেন।

টিকাঃ
১৮১. তাবাকাতে হানাবিলা (১/২৭৮)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সুসংবাদ

📄 উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সুসংবাদ


আবদুল ওয়াহিদ ইবনে আদম আত তাওয়াবিসী রহ. বর্ণনা করেন, তিনি বলেন যে, আমি স্বপ্নে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের একটি জামাআত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তিনি তার উত্তর দিলেন। অতঃপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে জানালেন, আমরা মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারীর জন্য অপেক্ষা করছি। কিছুদিন পর যখন ইমাম বুখারী রহ. এর মৃত্যু সংবাদ আমার কাছে পৌঁছালো, তখন জানতে পারলাম যে, তাঁর মৃত্যুটি ঠিক সেই সময় হয়েছে, যখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। ১৮২

টিকাঃ
১৮2. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪৬৪)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 কারামত

📄 কারামত


ইমাম বুখারী রহ.কে কবরে দাফনের পর, কবর থেকে মিশক আম্বরের সুঘ্রাণ আসতে থাকে। আশ্চর্যভাবে লোকেরা তাঁর কবরের মাটি সংগ্রহ করতে লাগলো। কবরে মানুষের মাত্রাতিক্ত সমাগমের কারণে রক্ষী নিয়োগ করা হলো। এর পরেও যখন লোক সমাগম নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছিল না, তখন কবরকে হিফাযতের জন্য বাঁশের খাঁচি বানিয়ে কবরকে হিফাযত করা হল। ইমাম বুখারী রহ.এর মৃত্যুর পর এমন কারামত প্রকাশের কারণে তাঁর বিরুদ্ধীবাদীরা ইমাম বুখারী রহ. প্রতি বিদ্বেষ পোষণের কারণে অনুশোচনা করতে লাগলো। ১৮৩

টিকাঃ
১৮৩. হাদইউস সারী (৪৯৩ পৃষ্ঠা) সিয়ারু আ'লামীন নুবালা (১২/৪৬৭)

ফন্ট সাইজ
15px
17px