📄 তৃতীয়বার দেশান্তর
ইমাম বুখারী রহ. যখন ২৫০ হিজরী সনে নিশাপুর আগমন করলেন, তখন ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আয যুহলী রহ. ঘোষণা করলেন যে, আগামীকাল মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আগমন করছেন, আমরা সকলে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাবো। ইমাম মুসলিম রহ. বলেন, সে সময় ইমাম বুখারী রহ.কে যে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে, তা কখনো কোন প্রশাসক, ওলী এবং আলিমকে জানানো হয়নি। সে সময় লোকেরা দুই-তিন মানযিল এগিয়ে গিয়ে ইমাম বুখারী রহ.কে অভ্যর্থনা জানান। অতঃপর তিনি নিশাপুরে বসবাস শুরু করলেন।
ইমাম আয যুহলী রহ. নিজের ছাত্র ও ভক্তদের ইমাম বুখারী রহ. এর নিকট গিয়ে হাদীস শোনার ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করলেন। তবে ইমাম বুখারী রহ.কে ইলমুল কালাম (ধর্মবিশ্বাসের বিষয়ে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা) শাস্ত্রের বিষয়ে প্রশ্ন করতে বারণ করে দিলেন। তবে কথায় আছে, মানুষকে যে কাজে বারণ করা হয়, তারা সে কাজের প্রতিই বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। অতঃপর একজন ব্যক্তি পূর্ণ মজলিসে ইমাম বুখারী রহ. এর নিকট কোরআনের শব্দের ব্যাপার তাঁর মতামত জানতে চাইলেন। ইমাম বুখারী রহ. তাঁর মতামত ব্যক্ত করতে না চাইলেও, প্রশ্নকারী বারবার অনুরোধ করায় উত্তরে তিনি বললেন,
الْقُرْآن كَلام الله غير مخلوق وأفعাল العباد مخلوقة والامتحان بدعة
কুরআন আল্লাহর কিতাব, সেটা মাখলুক নয় এবং বান্দার কাজ মাখলুক। আর কাউকে পরিক্ষায় ফেলে দেয়া বিদআত।
কিছু মানুষ একথা বলেছেন যে, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আয যুহলী রহ. প্রথমে ইমাম বুখারী রহ. থেকে হাদীস শ্রবণের ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছিলেন। কিন্ত যখন ইমাম বুখারী রহ. এর প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে লাগল, তখন তিনি তা অপছন্দ করলেন এবং ইমাম বুখারী রহ. থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। (হাদইউস সারী ৪৯০ পৃষ্ঠা)
ইমাম বুখারী রহ. এর এই বক্তব্য সাধারণের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করল। লোকেরা বলতে লাগল, ইমাম বুখারী বলেন, لفظى بالقرآن مخلوق এই বক্তব্য যখন ইমাম যুহলী রহ. এর কাছে পৌঁছালো তখন তিনি ঘোষণা করলেন,
القرآن كلام الله غير مخلوق من جميع جهاته، وحيث تصرف، فمن لزم هذا استغنى عن اللفظ وعما سواه من الكلام في القرآن، ومن زعم أن القرآن مخلوق فقد كفر، وخرج عن الإيمان، وبانت منه امرأته، يستتاب، فإن تاب، وإلا ضربت عنقه، وجعل ماله فيئاً بين المسلمين ولم يدفন في مقابرهم، ومن وقف، فقال: لا أقول مخلوق ولا غير مخلوق، فقد ضاهى الكفر، ومن زعم أن لفظي بالقرآن مخلوق، فهذا مبتدع، لا يجالس ولا يكلم ومن ذهব بعد هذا إلى محمد بن إسماعيل البخاري فاتهموه، فإنه لا يحضر مجلسه إلا من كان على مثل مذهبه ১৫৭
তিনি আরো বললেন, ألا من قال باللفظ فلا يحل له أن يحضر مجلسنا (যে ব্যক্তি কুরআন দ্বারা সৃষ্ট শব্দকে মাখলুক বলে, সে যেন আমার মজলিসে উপস্থিত না হয়)। ১৫৮
এই ঘোষণার পর ইমাম মুসলিম রহ. নিজের চাদর দ্বারা ভালকরে মাথা ঢেকে ফেললেন এবং ইমাম যুহলী রহ. এর দরবার থেকে বেরিয়ে গেলেন। তাঁর পিছনে পিছনে আহমদ ইবনে সালামা রহ.ও চলে গেলেন। ইমাম মুসলিম রহ. ইমাম যুহলী রহ. থেকে যা কিছু হাদীস লিখেছিলেন, তা তিনি ফেরত দিয়ে দিলেন। ১৫৯
হাকিম আরো বর্ণনা করেন, যখন ইমাম মুসলিম রহ. ও আহমদ ইবনে সালামা রহ. ইমাম যুহলী রহ এর মজলিস থেকে চলে আসেন, তখন যুহলী রহ. আরো বলেছেন, এ ব্যক্তি (ইমাম বুখারী) এ শহরে থাকতে পারে না। قَالَ الذُّهْلِيُّ لَا يُسَاكِنُنِي هَذَا الرَّجُلُ فِي الْبَلَدِ ১৬০
এরপর আহমদ ইবনে সালামা রহ. ইমাম বুখারী রহ. এর খেদমতে হাজির হয়ে বললেন, মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া যুহলী গোটা খোরাসানে বিশেষতঃ এই নিশাপুরে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। আমাদের কারো সাহস নেই, এ বিষয়ে যুহলীর সাথে কথা বলার। আপনি কি চিন্তা করেছেন? ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় দাড়ি মুষ্ঠিতে ধরে বললেন,
وَأُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى الله إِنَّ الله بَصِيرٌ بالعباد اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ অন্নী لَمْ أُرِدِ المقام بنيسابور أشرا ولا بطرا ولا طلبا للرياسة وَإِنَّمَا أَبَتْ عَلَيَّ نَفْسِي الرجوع إلى الوطن الغَلَبَة الْمُخالفين
আমি আমার সকল ব্যাপার আল্লাহর কাছে সমর্পন করছি। নিশ্চয় বান্দারা আল্লাহর দৃষ্টিতে রয়েছেন। হে আল্লাহ! তুমি তো জান, আমার ইচ্ছে এমন নয় যে, নিশাপুরে অবস্থানের মাধ্যমে নিজের বড়ত্ব ও বুযুর্গী প্রকাশ ও নেতৃত্ব অর্জন করার; বরং আমি নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে অস্বীকৃতী জানিয়ে ছিলাম, শত্রুপক্ষ শক্তিশালী হওয়ার কারণে। ১৬১
আহমদ ইবনে সালামাকে বলেন, আহমদ! আমি আগামীকাল সকালেই এখান থেকে চলে যাব। এরপর তিনি নিশাপুর থেকে বিদায় নেন। ১৬২
শায়খুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ সাহেব রহ. বলেন, এখানে দু'টি বিষয়ে তাহকীক প্রয়োজন। প্রথমতঃ ইমাম বুখারী রহ. কখনো لفظى بالقرآن مخلوق (কুরআন দ্বারা সৃষ্ট শব্দ মাখলুক) বলেছেন কি না?
ইমাম বুখারী রহ. থেকে لفظى بالقرآن কথাটি কোথাও উল্লেখ নেই। তারীখে বাগদাদসহ আরো কিতাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ইমাম বুখারী রহ. এই বক্তব্যের সমন্ধ নিজের দিকে আরোপিত বলে উল্লেখ করেছেন। তা তিনি কখনোই বলেননি।
গুনজার তারিখে বুখারাতে নিজের সনদে আবু আমর আহমদ ইবনে নসর আন নিশাপুরী আল খাফাফ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, একদা আমরা ইসহাক ইবনে কুরাশী এর মজলিসে ছিলাম। আমাদের সাথে মুহাম্মদ ইবনে নসর আল মারওয়াযীও উপস্থিত ছিলেন। অতঃপর মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারীর আলোচনা চলতে লাগলো। মুহাম্মদ ইবনে নসর বললেন, আমি ইমাম বুখারীকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন, مَنْ زَعَمَ أَنِّي قُلْتُ: لَفْظِي بِالقُرْآنِ مَخْلُوْقُ فَهُوَ كَذَّابٌ، فَإِنِّي لَمْ أَقُلْهُ (যে ব্যক্তি বলে যে, নিশ্চয় আমি বলেছি, لَفْظِي بِالقُرْآن مَخْلُوقُ মিথ্যাবাদী। কখনোই আমি তা বলিনি)। খাফ্ফাফ বললেন, লোকদের মাঝে এ কথা তো ব্যাপক প্রসিদ্ধ। উত্তরে মুহাম্মদ ইবনে নসর বললেন, لَيْسَ إِلَّا مَا أَقُوْلُ সত্য সেটিই যা আমি বলেছি। ১৬৩
আবু আমর খাফাফ বলেন, আমি ইমাম বুখারীর খিদমতে হাজির হলাম। অতঃপর আমি হাদীস নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি হাস্যউজ্জল হলে, তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবু আবদুল্লাহ! এখানে কিছু লোক আপনার ব্যাপারে এমন এমন কথা বলে। জবাবে ইমাম বুখারী রহ বললেন,
يَا أَبَا عَمْرٍو ، احْفَظْ مَا أَقُولُ لَكَ : مَنْ زَعَمَ مِنْ أَهْلِ نَيْسَابُوْরَ وَقُوْمس وَالرَّيِّ وَهَمَذَانِ وَحلَوَانَ وَبَগْدَادَ وَالكُوْفَةِ وَالبَصْرَةِ وَمَكَّةَ وَالمَدِينَةِ أَنِّي قُلْتُ لَفْظِي بِالقُرْآنِ مَخْلُوْقُ فَهُوَ كَذَّابٌ، فَإِنِّي لَمْ أَقُلْهُ إِلا أَنِّي قُلْتُ أَفْعَالُ العِبَادِ مَخْلُوْقَةً
হে আবু আমর! তোমাকে বলছি, স্বরণ রাখ, নিশাপুর, কৌমিস, ১৬৪ আররায়, ১৬৫ হামাদান, ১৬৬ হালওয়ান, ১৬৭ বাগদাদ, কুফা, বসরা, মক্কা এবং মদীনার অধিবাসীদের যে ব্যক্তি আমার প্রতি এ অপবাদ আরোপ করে যে, আমি বলেছি, لفظى بالقرآن مخلوق (কুরআন দ্বারা সৃষ্ট শব্দ মাখলুক) সে মিথ্যাবাদী। নিশ্চয় আমি তা বলিনি; বরং আমি বান্দার কাজকে মাখলুক বলেছি। ১৬৮
দ্বিতীয়তঃ মাসআলা এবং তার তাহকীক। আহলে হকের সলফ এবং খলফ সকলেই একমত যে, কোরআন আল্লাহর কলাম, কদীম এবং গাইরে মাখলুক। মাসআলার তাহকীকের পূর্বে একটি বিষয় জানা দরকার যে, হুসাইন ইবনে আলী কারাবীসী, আবদুল্লাহ ইবনে কিলাব, আবু সাউর, দাউদ ইবনে আলী যাহীরী রহ. لفظى بالقرآن مخلوق বক্তব্যের প্রবক্তা। ১৬৯
হুসাইন ইবনে আলী কারাবীসী রহ. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর প্রিয় বন্ধুদের একজন ছিলেন। কিন্তু হুসাইন ইবনে কারাবীসী রহ. এর এমন বক্তব্য প্রচার হওয়ার পর ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর সাথে বৈরী সম্পর্ক হয়ে যায় এবং পরস্পর একে অন্যের বিপরীদ কাজ করতে লাগলেন। ১৭০
যখন কারাবীসী ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর আপত্তির কথা জানতে পারলেন, তখন তিনি বললেন, মা নদরই আইশ নামালু বিহাযাল ফাতা? ইন কুলনা মাখলুক কুলা বিদআহ ওয়া ইন কুলনা গায়র মাখলুক কুলা বিদআহ—আমরা জানি না এই ছেলেটির সাথে কি করা উচিৎ? আমরা যদি বলি কোরআন মাখলুক তাহলে তিনি বলেন, তা বিদআত। আর যদি বলি, মাখলুক নয় তাহলেও তিনি বলেন, তা বিদআদ। ১৭১
মাসআলার তাহকীকঃ এ ব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, কোরআন আল্লাহর কালাম, কদীম এবং গাইরে মাখলুক। তবে তেলাওয়াত কারীর শব্দ ও তেলাওয়াত নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। তেলাওয়াত (تلاوت) ও মাতলু (متلو) দুটি কি এক জিনিস নাকি আলাদা? কেউ কেউ দু'টি ভিন্ন বলে মত দিয়েছেন। তারা বলেন যে, তিলাওয়াত (تلاوت) হল, কারী (পাঠকের) ফেল (কাজ)। আর মাতলু (متلو) (পঠিত) হল, আল্লাহর কালাম। তবে কেউ কেউ এ বিষয়টিতে মতামত দেয়া থেকে বিরত থেকেছেন। আর ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. দু'টিকে এক বলেছেন। ১৭২ ইমাম বায়হাকী রহ. বলেন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. কেবল এ কারনে এটি বলতেন যে, যাতে করে কেউ এ বক্তব্য গ্রহণ না করে, তেলাওয়াত কারী (পাঠক) এর ফেল (কাজ) এবং মাতলু (পঠিত) আল্লাহর কালাম। যেহেতু মাতলু (পঠিত) এর অস্তিত্ব কারী (পাঠকের) তেলাওয়াতের উপর ভিত্তি করে হয়। এ জন্য কোরআন মাখলুক। নতুবা তিনি لفظى بالقرآن مخلوق এ বক্তব্যের উপর আপত্তি আনতেন না। তেমনিভাবে (لفظى بالقرآن غير مخلوق) এ বক্তব্যের উপর আপত্তি আনতেন না। ১৭৩
এখন ইমাম বুখারী রহ. ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মসলক এক হয়ে গেল। কেননা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর নিকট যদি লফয (শব্দ) ও মালফুয (উচ্চারিত) এবং তেলাওয়াত (পাঠ) ও মাতলু (পঠিত) এক না হত, তাহলে তিনি (لفظى بالقرآن غير مخلوق) বক্তব্য আপত্তি তুলতেন না। এখন প্রশ্ন হল, ইমাম বুখারী রহ. এই ইখতিলাফ কেন করলেন এবং তাঁর মতবিরোধ কেন এতো প্রসিদ্ধ হল? এই প্রশ্নের উত্তর হল, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. সে সময় কাদরিয়া, জাহমিয়া এবং মুতাযিলা ফিরকার মোকাবেলা করছিলেন। যারা কোরআনকে মাখলুক বলে অভিহিত করে এবং বিভিন্ন তা'বীর করে কোরআন মাখলুক হওয়ার পক্ষে দলিল পেশ করে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. مخلوق بالقرآن لفظى এ বক্তব্যে উপর এ কারণে আপত্তি তোলেন যে, জাহমিয়ারা مخلوق بالقرآن لفظى এ কথা দ্বারা নিজেদের মসলকের প্রচার করবেন। আর বলেন যে, مخلوق القرآن لفظى আর مخلوق একই কথা। প্রথম বাক্যে মধ্যে مخلوق এর হামল لفظی এর উপর। আর দ্বিতীয় বাক্যের মধ্যে مخلوق এর হামল القرآن এর উপর।
অন্যদিকে ইমাম বুখারী রহ. এর মোকাবেলা ইমাম আহমদ রহ. এর মসলক সম্পর্কে পরিপূর্ণ না জানা কিছু অনুসারীদের সাথে। যাদের ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মসলক সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান ছিল না এবং খলকে কোরআন মাসআলায় এ পরিমাণ বাড়াবাড়ি করতেন যে, যে কালি দ্বারা কোরআন লিখা হয়, যে কাগজে কোরআন ছাপা হয়, কোরআন লিখার পর এবং ছাপানোর পর সে কালি ও কাগজকেও তারা কদীম বলেন এবং সে আওয়াজ যা তেলাওয়াতকারীর গলা ও মুখ থেকে বের হয়, তাঁকেও কাদীম বলেন। অথচ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর ছাত্র, সাথী এবং উলামায়ে কেরাম কেউ এমন কথা বলেননি। এ কথা বাস্তব যে, লফয এবং আওয়াজ কিভাবে এক হতে পারে? লফয এক জিনিস আওয়াজ আলাদা জিনিস। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. থেকেও এমন বর্ণিত হয়েছে যে, তা কোরআন নয়। সেটি মানুষের ফেল (কাজ) এবং মাখলুক। হাদীসে বর্ণিত আছে, زَيِّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ তোমাদের সুন্দর আওয়ায দ্বারা কোরআনকে সুসজ্জিত কর। ১৭৪ এটি প্রকাশ্য যে, যদি কোন ব্যক্তি কারো থেকে কোন রেওয়ায়েত নকল করেন, তাহলে هذا لفظه অথবা هذا معناه কিন্তু صوته هذا কেউ বলে না। এখান থেকেও লফয (لفظ) এবং সওত (صوت) এর মাঝে পার্থক্যের বিষয়টি পরিষ্কার হয়। লফয (لفظ) দ্বারা প্রথম বক্তার দিকে সমন্ধ করা হয়, সওত (صوت) দ্বারা প্রথম বক্তার দিকে সমন্ধ করা হয় না। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. লফয (لفظ) সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করেছেন, তা তিনি সওত (صوت) এর ক্ষেত্রে করেননি। যাতে করে কেউ লফযি মাখলুক (لفظی مخلوق) বলে অথবা এমন কোন শব্দ বলে খলকে কোরআনের প্রচার না করতে পারে। ১৭৫
টিকাঃ
১৫৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪৫৫)
১৫৮. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪৬০)
১৫৯. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪৬০)
১৬০. হাদইউস সারী (৪৯১ পৃষ্ঠা)
১৬১. ফতহুল বারী (১/৪৯১)
১৬২. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪৫৯)
১৬৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা (১২/৪৫৭)
১৬৪. কৌমিস ইরানের একটি প্রাচীন রাজ্যের নাম। যেটি এখন সেমনান প্রদেশে অবস্থিত।
১৬৫. আররায় ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি উল্লেখ যোগ্য শহর।
১৬৬. হামাদান ইরানের ৩০টি প্রদেশের একটি। হামাদান এই প্রদেশের রাজধানী।
১৬৭. হলওয়ান এটিও ইরানের হরমুজগান প্রদেশের একটি গ্রাম।
১৬৮. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪৫৭) হাদইউস সারী (৪৯১ পৃষ্ঠা)
১৬৯. কাওয়ায়েদ ফী উলূমিল হাদীস (২২৬ পৃষ্ঠা)
১৭০. কাওয়ায়েদ ফী উলূমিল হাদীস (২২৬ পৃষ্ঠা)
১৭১. তাহযীবুত তাহযীব ২/৩৬১
১৭২. শরহু উসূলী ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতী ওয়াল জামাআতী (২/৩৫৫)
১৭৩. শরহু উসূলী ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতী ওয়াল জামাআতী (২/৩৫৫)
১৭৪. সুনানে নাসায়ী (১০১৬)
১৭৫. মুকাদ্দামা কাশফুল বারীর (১/১৪৯)
📄 নিজ ভূমিতে ঈমানী পরিক্ষা
ইমাম বুখারী রহ. যখন নিশাপুর ছেড়ে বুখারায় তাশরীফ নিলেন, তখন বুখারাবাসী ইমাম বুখারী রহ.কে আনন্দের সাথে অতি উৎসাহে সাদরে গ্রহণ করলেন এবং সম্মানজনক অভ্যর্থনা জানালেন। অতঃপর সেখানে ইমাম বুখারী রাহ. হাদীসের দরস শুরু করলেন। লোকেরা অতি উৎসাহে সে দরসে উপস্থিত হতে লাগলেন।
বুখারার প্রশাসক খালিক ইবনে আহমদ আয যুহলী হাদীস ও ইতিহাস জানার মানসে ইমাম বুখারী রহ.কে রাজপ্রাসাদে এসে তাকে হাদীস ও ইতিহাস পাঠদানের জন্য অনুরোধ জানালেন। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. বললেন, আমি ইলমকে মানুষের দরজায় গিয়ে বিতরণ করে তার অসম্মান করতে পারবো না। আপনি যদি একান্তই ইলম অর্জন করতে চান, তাহলে আমার মসজিদে এসে তা অর্জন করুন। আর যদি এটি আপনার ভালো না লাগে, তাহলে আপনার ক্ষমতাবলে আমাকে হাদীসের পাঠদানে বাধা দিন। যাতে আমি কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তায়ালার সামনে নিজের অপারগতা পেশ করতে পারি। কেননা আমি ইলমকে গোপন করতে পারবো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ أَلْجَمَهُ اللَّهُ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
যে ব্যক্তি জানা ইলম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে তা গোপন করল, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাকে আগুনের লাগাম পরিয়ে দিবেন। ১৭৬
অন্য একটি রেওয়ায়েতে উল্লেখ আছে বুখারার প্রশাসক ইমাম বুখারী রাহ.কে রাজপ্রসাদে এসে তার সন্তানদেরকে হাদীস ও ইতিহাসের পাঠদানের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। আর ইমাম বুখারী রাহ. তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ছিলেন। অতঃপর বুখারার প্রশাসক কিছু অসৎ ব্যক্তির সহযোগিতায় ইমাম বুখারী রহ. এর মতামতের সমালোচনা করতে লাগলো যার ফলে লোকদের মাঝে মতবিরোধ ও অসন্তোষ দেখা দিল। যার ফলশ্রুতিতে বুখারার প্রশাসক ইমাম বুখারী রহ.কে শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলো। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. বুখারা ত্যাগ করার সময় বদদোয়া করলেন। এক মাসেরও কম সময়ে খলীফাতুল মুসলিমীন সেই প্রশাসকের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করলেন এবং তাকে প্রত্যাহার করলেন। আর সেই সাথে শাস্তি হিসেবে গাধার পিঠে বসিয়ে শহরে ঘোরানোর নির্দেশ দিলেন এবং তাকে বন্দি করলেন। ১৭৭
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِنَّ اللَّهَ قَالَ: مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীর সাথে দুশমনি করবে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। ১৭৮
এরপর সমরকান্দবাসী ইমাম বুখারী রহ.কে তাদের নিকট আসার জন্য অনুরোধ জানালেন। কিন্তু সেখানের লোকেরাও মতভেদের শিকার হল। অতঃপর তিনি বাধ্য হয়ে মামারবাড়ি খরতঙ্গে অবস্থান নিলেন। যা বুখারা থেকে অল্প দূরেই অবস্থিত। অতঃপর রমযানুল মোবারক সেখানেই কাটালেন। রমযানের শেষের দিকে সমরকান্দবাসী মতবিরোধ ভুলে একমত হয়ে ইমাম বুখারী রহ.কে সমরকান্দে আহ্বান জানালেন এবং তিনি তা গ্রহণও করলেন।
গালিব ইবনে যিবরীল আস সমরকান্দী, যিনি ইমাম বুখারী রহ.কে সমরকান্দে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন, তিনি বলেন, আমি ইমাম বুখারীকে সমরকান্দ সফরের পূর্বে প্রত্যেক রাতের তাহাজ্জুতে এই দোয়া করতে শুনেছি।
اللَّهُمَّ إِنَّهُ قَدْ ضَاقَتْ عَلَيَّ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ، فَاقْبِضْنِي إِلَيْكَ
হে আমার প্রতিপালক, আপনার এই পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্তেও আমার জন্য তা সঙ্কোচিত হয়ে গেছে। অতএব আমাকে আপনার কাছে উঠিয়ে নিন ১৭৯ ১৮০
টিকাঃ
১৭৬. সুনানে আবু দাউদ (৩৬৫৮)
১৭৭. হাদইউস সারী (৪৯৩ পৃষ্ঠা)
১৭৮. সহীহ বুখারী (৬৫০২)
১৭৯. হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে মৃত্যু কামনা করা নিষেধ করা হয়েছে। তারপরেও ইমাম বুখারী রহ. فاقبضنِي إِلَيْكَ বলে কেন মৃত্যু কামনা করলেন? উত্তরে বলা যায় যে, প্রথমতঃ পার্থিব বিপদাপদের কারণে মৃত্যু কামনা করা নিষেধ ও না জায়েজ। যা হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বারা প্রমাণিত। তবে অপারগ হলে কিভাবে আল্লাহ তায়ালার কাছে সাহায্য চাইতে হবে তাও হাদিসে বর্ণিত রয়েছে। عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ: لَا يَتَمَنَّيَنَّ أَحَدُكُمُ الْمَوْتَ مِنْ ضُرَّ أَصَابَهُ... (সহিহ বুখারী ৫৬৭১)। দ্বিতীয়তঃ কিছু কারণে মৃত্যু কামনা করা জায়েজ আছে। তার মধ্যে প্রথম কারণ হল, পরকালীন মুসিবতের কারণে অথবা দ্বীনি ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য মৃত্যু কামনা করা। (সুনানে তিরমিযি ৩২৩৩; মুসনাদে আহমদ ২৩৬২৫)। ইবনে রজব রহ. বলেন, এ ধরণের মৃত্যু কামনাকে অধিকাংশ আলিম জায়েজ বলেন। (মুয়াত্তা মালিক ৬৩১/৩০৪৪)। তৃতীয়তঃ দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর রাস্তায় শহীদী মৃত্যু কামনা। আর শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করা শুধু বৈধ নয়; বরং উত্তম। (সহীহ মুসলিম ১৯০৯; সহীহ বুখারী ২৯৭৫)।
১৮০. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪৬৬)
📄 মৃত্যু
বর্ণিত আছে, সমরকান্দবাসী ইমাম বুখারীকে নেয়ার জন্য বাহন পাঠিয়েছিলেন এবং ইমাম বুখারী রহ.ও যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় যাত্রা শুরু করতে পারেননি। এমতাবস্থায় তার শরীর মোবারক থেকে অস্বাভাবিক ঘাম ঝরছিলো। যার কারণে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন। অতঃপর ২৫৬ হিজরী সন ১ম শাওয়াল মোতাবেক ১৩ আগষ্ট ৮৭০ ইংরেজী, পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন, তের দিন কম ৬৬ বছর বয়সে এই মহান মনীষী নশ্বর জগত ছেড়ে অবিনশ্বর জগত পানে চলে গেলেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ১৮১
ইমাম বুখারী রহ. এর কথামতোই তাঁকে জামা ও পাগড়ী ছাড়াই কাফন দেয়া হয়। তবে দাফনের জায়গা নিয়ে মতবিরোধ দেখা গেল। কেউ কেউ সমরকান্দে নিয়ে গিয়ে সেখানে দাফন করতে চাইলেন। কেউ আবার সেখানেই দাফন করতে চাইলেন। অবশেষে ঈদুল ফিতিরের দিন যোহরের নামাজের পর খরতঙ্গেই দাফন করা হল। এভাবেই এই পৃথিবীর উজ্জল নক্ষত্র, হাদীসে নববী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাদেম, পৃথিবীর ইলমের পৃষ্টপোষক মাটির নিচে গোপন হয়ে গেলেন।
টিকাঃ
১৮১. তাবাকাতে হানাবিলা (১/২৭৮)
📄 উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সুসংবাদ
আবদুল ওয়াহিদ ইবনে আদম আত তাওয়াবিসী রহ. বর্ণনা করেন, তিনি বলেন যে, আমি স্বপ্নে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের একটি জামাআত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তিনি তার উত্তর দিলেন। অতঃপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে জানালেন, আমরা মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারীর জন্য অপেক্ষা করছি। কিছুদিন পর যখন ইমাম বুখারী রহ. এর মৃত্যু সংবাদ আমার কাছে পৌঁছালো, তখন জানতে পারলাম যে, তাঁর মৃত্যুটি ঠিক সেই সময় হয়েছে, যখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। ১৮২
টিকাঃ
১৮2. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪৬৪)