📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 চারিত্রিক মাধুর্য

📄 চারিত্রিক মাধুর্য


ইমাম বুখারী রহ. এর চরিত্র ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। তিনি সভ্য, ভদ্র, দয়ার্দ্র ও সহনশীল ছিলেন। তাকওয়া ও পরহেজগারীতে তার কোন উপমা ছিল না। হুসাইন ইবনে মুহাম্মদ রহ. বলেন, তিনি সল্পভাষী ছিলেন, অন্য লোকের নিকট যা আছে তার প্রতি ঈর্ষা ও লোভ করতেন না এবং অন্যদের কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করতেন না। তার পূর্ণ আত্মনিয়োগ ছিল জ্ঞানের প্রতি ও হাদীস গবেষণার প্রতি।

ইমাম বুখারী রহ. কখনো তার সাথে কৃত অপরাধের প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। ইমাম বুখারী রহ. নিশাপুরে অবস্থান কালে 'কুরআন মাখলুক নয়' না বলার কারনে ইমাম বুখারী রহ. এর শায়েখ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া যুহলী নিশাপুরকে তাঁর বিপক্ষে রণাঙ্গন তৈরি করলেন। সেই সাথে ইমাম বুখারী রহ. এর দরসের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। পরে নিশাপুরের প্রশাসক তাঁকে নিশাপুর ত্যাগে বাধ্য করলেন। এ ঘটনায় ইমাম মুসলিম রহ. এ পরিমাণ রাগান্বিত হলেন যে, মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া থেকে এমলাকৃত (শ্রুত লিপি) সমস্ত হাদীস একটি বাণ্ডিল বানিয়ে তার কাছে ফেরত পাঠালেন। কিন্তু ইমাম বুখারী রহ. নিজে মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া এর হাদীসকে পরিত্যাগ করেননি। এমনকি সহীহ বুখারীতেও তার রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন। তবে সেখানে তিনি তার পুরো নাম উল্লেখ করেননি; বরং তিনি তার দাদার নাম মুহাম্মদ ইবনে খালিদ এর দিকে লক্ষ্য করে মুহাম্মদ ইবনে খালিদ লিখেছেন অথবা কেবল "মুহাম্মদ" লিখেছেন। কেউ এ বিষয়ে ইমাম বুখারী রহ. কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, তিনি আমার উপর "যরাহ" করতেন। আর যদি আমি পরিষ্কারভাবে তার পুরো নাম উল্লেখ করতাম, তাহলে নির্দিষ্ট হয়ে যেতেন। আর মানুষেরা মনে করতেন, আমার 'যরাহ' কারীর আমি 'তা'দিল' করছি। আর এতে করে আমার 'সাদাকাত' ও 'আদালাত' প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেত। আর তার প্রভাব আমার রেওয়ায়ের উপর পড়ত।

টিকাঃ
১১৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪৪৮)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 জনপ্রিয়তা ও মুসলমানদের লিপ্সা

📄 জনপ্রিয়তা ও মুসলমানদের লিপ্সা


ইমাম বুখারী রহ. এর জ্ঞানের চরম উৎকর্ষতা, তাকওয়া ও পরহেজগারীর উদাহরণ জনমনে এমন ব্যাপকতা লাভ করে যে, তিনি যেখানে তাশরীফ নিতেন, হাজার হাজার লোকের সমাগম হতো। তিনি যখন ইলমে হাদীসে পরিপূর্ণতা লাভ করে জন্মভূমিতে ফিরে আসার ইচ্ছে পোষণ করলেন, তখন বুখারার আধিবাসীরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য শহরের বাহিরে প্রায় তিন মাইল পর্যন্ত মানুষ জমায়েত হয়েছিল। শহরে ও গ্রামের এমন কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না, যারা সে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. কে মাহাত্ম্যপূর্ণভাবে শহরে গ্রহণ করা হলো।

ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করেন, যখন তিনি নিশাপুর আগমন করলেন, তখন তার অধিবাসীরা শহর থেকে দুই-তিন মাইল সামনে গিয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন। ইমাম মুসলিম বলেন, এমন মাহাত্মপূর্ণভাবে আমি শহরবাসীদের কোন বাদশাহ বা সাহেবে ইলমকে অভ্যর্থনা জানাতে দেখিনি।

ইউসুফ ইবনে মুসা মারওয়াযী রহ. বর্ণনা করেন, একদা আমি বসরার জামে মসজিদে অবস্থান করছিলাম। এমতাবস্থায় একজন ঘোষক এ ঘোষণা করছিল যে, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী এখানে অবস্থান করছেন। অতঃপর আমি বের হয়ে সল্প বয়েসী এক তরুণকে নামায আদায় করতে দেখলাম। তার নামায শেষ হলে শতশত লোক তাকে অভ্যর্থনা জানাতে লাগলেন। কিছু সময় পর ঘোষক আবারো ঘোষণা করতে শুরু করল যে, শহরবাসীর অনুরোধে মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী আগামীকাল হাদীস বর্ণনা করবেন। অতঃপর সকাল থেকেই মুতাকাল্লিমীন, মুহাদ্দীসীন, হুফ্ফায ও আলিমদের জামাত সমবেত হতে লাগলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ সমবেত হল। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. মিব্বারে উপনীত হলেন এবং বললেন, আমি আপনাদের নিকট কেবল সে সমস্ত হাদীস বর্ণনা করবো, যে হাদীসগুলো বসরাবাসীদের কাছে নেই। অতঃপর তিনি শুরু করলেন,

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُثْمَانَ بْنِ جَبَلَةَ بْنِ أبي روাদ العتكي ببلدكم قَالَ حدثني أبي عَن شُعْبَة عَن مَنْصُورٍ وَغَيْره عَن سالم بن أبي الْجَعْدِ عَن أنس بن مالك أَنَّ أَعْرَابِيًّا جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ الرَّجُلُ يُحِبُّ الْقَوْمَ

হাদীসটি বর্ণনা করার পর তিনি বললেন, হে বসরাবাসী! এ হাদীসটি আপনাদের নিকট 'মুনসুর' মাধ্যমে পৌঁছায়নি; বরং অন্য সনদে পৌঁছেছে। আমি আপনাদের কাছে বিজয়ী হওয়ার জন্য এ হাদীসটি বর্ণনা করিনি; বরং ইলমে হাদীসের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করার জন্য। ইউসুফ ইবনে মুসা মারওয়াযী রহ. বলেন, এভাবে তিনি হাদীস বর্ণনা করছিলেন এবং বলছিলেন এই সনদে এই হাদীসটি আপনাদের কাছে পৌঁছেনি; বরং অন্য সনদে আপনাদের কাছে পৌঁছেছে।

টিকাঃ
১১৬. আল ফাওয়ায়েদুদ দারারী
১১৭. ফতহুল বারী (১/৪৮৭)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 শায়েখদের হাদীস সম্পাদনা

📄 শায়েখদের হাদীস সম্পাদনা


ইমাম বুখারী রহ. এর উস্তাদ মুহাম্মদ ইবনে সালাম আল-বাইকান্দী রহ. ইমাম বুখারী রহ. কে বললেন, أُنْظُرْ فِي كُتُبِي فَمَا وَجَدْتَ فِيهَا مِنْ خَطَأٍ فَاضْرِبْ عَلَيْهِ আপনি আমার কিতাবটি দেখুন। অতঃপর সেখানে কোন ভুল পেলে তা গোলাকার করে চিহ্নিত করুন। ইমাম বুখারী রহ. দেখলেন এবং যে হাদীসের ব্যাপারে ইমাম বুখারী রহ. মনোতুষ্টি করলেন, সেটি সম্পর্কে মুহাম্মদ ইবনে সালাম নিজে رضى الفتى 'পছন্দ করেছেন' লিখলেন আর যে হাদীসটি ইমাম বুখারী জঈফ বললেন, তাতে তিনি لم يرض الفتى 'অপছন্দ করেছেন' লিখলেন।

তেমনই ইমাম বুখারী রহ. এর শায়েখ আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ রহ. তানীসী বলেন, أُنْظُرْ فِي كُتُبِي وَأَخْبَرِنِي بِمَا فِيهَا مِنَ السَّقَطِ আপনি আমার কিতাবটি দেখুন এবং আমাকে বাদ পড়া বিষয় সম্পর্কে অবগত করুন।

এছাড়াও ইসমাঈল ইবনে আবী আওইয়াস রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. আমার কিতাবকে যে সুক্ষ্মভাবে সম্পাদনা করেছেন অন্য কেউ এভাবে করেনি। তিনি আরো বলেন, আমি ইমাম বুখারীকে বলেছি, আপনি আমার কিতাবটি যথাসম্ভব দেখুন। আমি আপনার প্রতি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। এছাড়াও তিনি তার হাদীসের মধ্যে যে হাদীসটি ইমাম বুখারী পছন্দ করতেন, তাতে তিনি লিখতেন,

هَذِهِ الْأَحَادِيث انتخبها مُحَمَّد بن إِسْمَاعِيل من حَدِيث إِسْمَاعِيل بن أبي أويس

ইসমাঈল ইবনে আবী আওয়াসের হাদীস থেকে মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল এই হাদীসটি নির্বাচিত করেছেন।

টিকাঃ
১১৮. ফতহুল বারী (১/৪৮৩)
১১৯. ফতহুল বারী (১/৪৮৩)
১২০. তারীখে বাগদাদ (২/২৪)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 সমসাময়িক মুহাদ্দিসদের স্বীকারোক্তি

📄 সমসাময়িক মুহাদ্দিসদের স্বীকারোক্তি


হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বর্ণনা করেন, যদি ইমাম বুখারী রহ. এর প্রশংসায় মুতাআখিরীনদের মতামত নকল করা হয়, তাহলে কাগজ ও কালী সম্ভবত শেষ হয়ে যাবে। সমকালীন সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, একদা উমর ইবনে যারারাহ রহ. ও মুহাম্মাদ ইবনে রা'ফে রহ. ইলালে হাদীস সম্পর্কে কিছু প্রশ্নের সমাধানের পর যখন মজলিস ত্যাগ করছিলেন, তখন তিনি উপস্থিত সমাবেশের দিকে মুখ ফিরে বললেন,

أبو عبد الله فَإِنَّهُ أفقه منا وأعلم وَأَبْصر

আবু আবদুল্লাহ আমাদের সকলের চেয়ে ফকীহ, জ্ঞানী ও গবেষক।

ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ রহ. বলেন, 'তিনি আমার থেকে উত্তম গবেষক'। অথচ সে সময় ইমাম বুখারী রহ. যুবক ছিলেন। ইমাম তিরমিযি রহ. বর্ণনা করেন, সনদ ও ইলালের মধ্যে ইমাম বুখারী রহ. চেয়ে উত্তম আমি কাউকে পাইনি। ইমাম মুসলিম রহ. ইমাম বুখারী রহ. এর দরবারে উপস্থিত হয়ে এ মর্মে সাক্ষ্য দেন যে,

أشهد أنه لَيْسَ فِي الدُّنْيَا مثلك

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনার মতো দ্বিতীয় আর কেউ নেই। ইবনে খুজাইমাহ রহ. বর্ণনা করেন, এ পৃথিবীতে আমি ইমাম বুখারী রহ. থেকে হাদীসের উত্তম আলিম দেখিনি।

টিকাঃ
১২১. আবু আবদুল্লাহ ইমাম বুখারী রহ এর কুনিয়াত ছিল
১২২. ফতহুল বারী (১/৪৮৪)
১২৩. ফতহুল বারী (১/৪৮৫)
১২৪. আত তাহযীব (১/৭০)

ফন্ট সাইজ
15px
17px