📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 স্মরণশক্তি

📄 স্মরণশক্তি


কারো স্মরণশক্তি দৃঢ় হওয়া আল্লাহর নিয়ামতসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি নেয়ামত। মুহাদ্দিসীনদেরকে ঐ নিয়ামত আল্লাহ তায়ালা সীমাহীনভাবে দান করেন। আর ইমাম বুখারী রহ. যেহেতু মুহাদ্দিসীনদের ইমাম ছিলেন, সেহেতু সে নিয়ামতের মূল অংশটি আল্লাহ তায়ালা তাঁকেই দান করেছিলেন। ইতিহাস ও জীবনী গ্রন্থগুলোর কয়েকটি কিতাবে ইমাম বুখারী রহ. সম্পর্কে এ ঘটনাটি উল্লেখ রয়েছে। যা থেকে ইমাম বুখারী রহ. এর স্মৃতিশক্তির প্রখরতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ইবনে আদী রহ. বর্ণনা করেন যে, একদা ইমাম বুখারী রহ. বাগদাদ সফরে গেলেন। বাগদাদের মুহাদ্দিসগণ ইমাম বুখারী রহ. এর স্মরণশক্তি পরিক্ষা কারার জন্য একটি মজলিস আহবান করলেন এবং দশজন মুহাদ্দিস একশটি হাদীসের মতন ও সনদকে উল্টোভাবে সাজিয়ে ইমাম বুখারী রহ. এর সামনে পাঠ করলেন। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. প্রত্যেকটি হাদীস পাঠের পর একই উত্তর দিতে লাগলেন যে, হাদীসটি এভাবে আমার কাছে পরিচিত নয়। অবশেষে যখন মুহাদ্দিসগণ বললেন, হাদীসগুলি কিভাবে আপনার কাছে পরিচিত? ইমাম বুখারী রহ. তখন প্রত্যেকটি হাদীসই তাদের মত উল্টো করে পাঠ করে তাদের ভুল জায়গাগুলি শুদ্ধ করে দিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করলেন। আর এ ঘটনায় সবাই কিংকর্তব্যবিমূর হয়ে ইমাম বুখারী রহ.এর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দানকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন।

আল্লামা হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বর্ণনা করেন যে, ইমাম বুখারী রহ. এর হাদীসের জবাব দেয়াটা আমাকে আশ্চর্য করেনি। কেননা তিনি হাদীসের হাফেয ছিলেন; বরং সে সব প্রশ্ন যা উল্টোভাবে তার কাছে পাঠ করা হয়েছিল, মাত্র একবার তিনি শ্রবণ করেই ধারাবাহিক ভাবে তা উল্লেখ করাটা আমাকে আশ্চর্য করেছে। কেননা প্রশ্নকারী তো মাত্র একবারই তা পাঠ করেছিলেন।

ইমাম আবু বকর আল কুলুযানী বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারী রহ. যে কিতাব একবার পড়তেন, সে কিতাবের সমস্ত হাদীস তার হিফয হয়ে যেত।

ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করেন যে, আমার সহীহ এক লক্ষ এবং গায়রে সহীহ দুই লক্ষ হাদীস হিফয আছে। অন্য একটি রেওয়ায়েতে আছে যে, ইমাম বুখারী রহ. একদা রাত্রে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলেন যে, তার কিতাবে কতগুলি হাদীস উল্লেখ আছে। অতঃপর তিনি গণনা করে বললেন, প্রায় দুই লক্ষ। ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করেন, আমি এক বৈঠকে শুধু নামাজের সম্বন্ধে দশ হাজার হাদীস বর্ণনা করতে পারব।

ইমাম বুখারী রহ. একদা বসরা সফরে গেলেন। অতঃপর যখন তিনি বসরা জামে মসজিদে নিজের নামাজ শেষ করলেন, তখন বসরাবাসী একটি হাদীসের মজলিস কায়েমের জন্য আবেদন জানালেন। ইমাম বুখারী রহ. বললেন, আমি তোমাদের ঐ হাদীসগুলি বর্ণনা করব যা তোমাদের সংরক্ষণে নেই। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. হাদীসের সনদসহ বর্ণনা শুরু করলেন এবং সনদ সম্পর্কে বলতে লাগলেন যে, তোমাদের নিকট এ হাদীসটি অমুক রাবী বর্ণনা করেন আর এ হাদীসটি আমি তোমাদের শহরের অমুক রাবীকে বর্ণনা করতে শুনেছি।

ইমাম বুখারী রহ. আরো বর্ণনা করেন, আমি একবার বলখ শহরে সফরে গেলাম। অতঃপর বলখ শহরের মুহাদ্দিসগণ আমার সনদের সাথে তাদের সনদ যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। অতঃপর আমি আমার এক হাজার উস্তাদ থেকে এক হাজার হাদীস বর্ণনা করলাম। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বর্ণনা করেন যে, এক রেওয়ায়েত দ্বারা ইমাম বুখারীর দুই কোটি হাদীস মুখস্থের প্রমাণ পাওয়া যায়।

হাশিদ ইবনে ইসমাঈল রহ. বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারী রহ. ইলম অর্জন সময়কালে মুহাদ্দিসদের দরসে বসে শুধু হাদীস শ্রবণ করতেন কিন্তু তা লিপিবদ্ধ করতেন না। এতে সাথীরা ইমাম বুখারী রহ. কে উপহাস করে বলতেন যে, তুমি শুধু সময় নষ্ট করছ। সাথীদের এ উপহাসে বিরক্ত হয়ে ইমাম বুখারী রহ. বললেন যে, তোমাদের নিকট কতগুলি হাদীস লিপিবদ্ধ আছে? সাথীরা তাদের লিপিবদ্ধ হাদীসের সংখ্যা জানালে ইমাম বুখারী রহ. তার চেয়ে অধিক সংখ্যক হাদীস মুখস্থ বর্ণনা করলেন। এ ঘটনার পর থেকে সাথীরা ইমাম বুখারী রহ. থেকে তাদের লিপিবদ্ধ হাদীসগুলি সংশোধন করে নিতেন।

ইনসাইক্লো পিডিয়া লিখকরাও ইমাম বুখারী রহ. এর প্রশংসায় বলেন, ইমাম বুখারী রহ. এর স্মরণশক্তি ও উপস্থিত জ্ঞান-প্রজ্ঞার পরিমাণ ও প্রখরতা এমন ছিল যে, সমকালীন মুহাদ্দিসদের কাছেও তা অলৌকিক বলে মনে হত।

সালিম ইবনে মুজাহিদ বর্ণনা করেন যে, ইমাম বুখারী রহ. আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, আমি যে সমস্ত সাহাবী ও তাবেয়ী হতে হাদীস বর্ণনা করেছি। তাদের প্রত্যেকেরই জীবন বৃত্তান্ত, জন্ম-মৃত্যু, আবাসভূমি, জন্মভূমি সম্পর্কে আমার জানা আছে। আর তিনি এও বর্ণনা করেন যে, আমি হাদীসের পরিশুদ্ধতা ও বিশুদ্ধতা সম্পর্কে যতক্ষণ না পূর্ণ আস্থা অর্জন করতাম, ততক্ষণ হাদীস গ্রহণের লক্ষ্যে বসে থাকতাম। অতঃপর বিষয়টি পরিষ্কার হলে তা গ্রহণ করতাম।

হাশিদ ইবনে ইসমাঈল বলেন, ইমাম বুখারী হাদীস শ্রবণের জন্য আমার পরিচিত মুহাদ্দিসদের নিকট যেতেন। কিন্তু তাঁর কাছে হাদীস লিখার জন্য দোয়াত-কলম থাকত না। আমি তাঁকে এ ব্যাপারে একবার জিজ্ঞাস করলে ষোল দিন পর তিনি এর জবাবে বললেন, আপনাদের এমন প্রশ্নে আমি বিরক্ত হয়ে গেছি। সুতরাং আপনাদের লিখিত হাদীসগুলি আমার সাথে মিলিয়ে নিন। অতঃপর তিনি সমস্ত হাদীস সনদসহ মুখস্থ বর্ণনা শুরু করলেন। আশ্চর্যের বিষয় হল, আমরা সে সময় পর্যন্ত পনের হাজার হাদীস লিপিবদ্ধ করেছিলাম। তিনি সবগুলিই মুখস্থ বর্ণনা করলেন।

একদা ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ রহ. জুমার নামাজের খুতবায় একটি হাদীসের সনদ ভুল পাঠ করলেন। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. তাঁকে সে সমন্ধে অবগত করলে তিনি তা গ্রহণ করে নিলেন।

আহমদ ইবনে হামদুন বর্ণনা করেন, কোন এক জানাযায় আমি শরীক হয়ে ইমাম বুখারীকে দেখেছিলাম যে, মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া যুহালী তাকে আসমাউল রিজাল এবং ইল্লতে হাদীস সম্পর্কে প্রশ্ন করছিলেন। আর ইমাম বুখারী রহ. ধারাবাহিকভাবে তার উত্তর দিচ্ছিলেন।

মুহাম্মদ ইবনে আযহার সাযিস্তানী রহ. বর্ণনা করেন যে, আমি ইমাম বুখারী রহ. এর সাথে সুলাইমান ইবনে হরব রহ. এর খেদমতে হাদীস শ্রবণের জন্য উপস্থিত হলাম। অতঃপর একজন সাথী আরয করলেন যে, ইমাম বুখারী হাদীস লিপিবদ্ধ করেন না কেন? আমি তাকে বললাম, যদি তোমার কোন হাদীস বাদ থেকে থাকে তাহলে তা ইমাম বুখারীর নিকট থেকে লিপিবদ্ধ করে নাও।

মুহাম্মদ ইবনে হাতেম বর্ণনা করেন যে, একদা আমরা ফিরয়াবী রহ. দরবারে বসা ছিলাম। অতঃপর ফিরয়াবী একটি হাদীসের সনদ বর্ণনা করলেন, حَدَّثَنَا سُفْيَانِ عَن أَبي عُرْوَة عَن أبي الخطاب عن أَبي حَمْزَة আলোচ্য সনদে সুফিয়ান ছাড়া সমস্ত রাবীর কুনিয়াত অর্থাৎ উপনাম ব্যবহার করা হয়েছে। অতঃপর ফিরয়াবী রাবীদের আসল নাম জিজ্ঞাস করলে সমস্ত মজলিস স্তদ্ধ হয়ে যায়। অতঃপর সবাই ইমাম বুখারী রহ. এর দিকে তাকালেন এবং সাথে সাথে ইমাম বুখারী রহ. নাম বলতে শুরু করলেন, আবু উরওয়াহের আসল নাম মা'মার ইবনে রাশিদ, আবুল খাত্তাবের নাম কাতাদাহ ইবনে দুয়ামাহ এবং আবু হামজাহ এর প্রকৃত নাম আনাস ইবনে মালেক। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. এর এই পাণ্ডিত্য দেখে সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল।

ইমাম বুখারী রহ.এর বিচার, কল্পনাশক্তি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, বীরত্ব, বিখ্যাত হওয়ার বিষয়টি সমালোচকরাও স্বীকার করেছেন। ইমাম ইবনে সাঈদ বর্ণনা করেন, পৃথিবীতে ইমাম বুখারী রহ. এর মতো খোদাভীরু, বিচক্ষণ, জ্ঞান-প্রজ্ঞা সম্পূর্ণ ব্যক্তি আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। যেন তিনি সমকালীন উমরে ফারুক রাযি আল্লাহু তায়ালা আনহু।

আর এ কারণেই আমরা অবলোকন করেছি যে, ইমাম বুখারী রহ. 'কিতাবুল হিবাহ' শিরোনামে পাঁচশত হাদীস উল্লেখ করেছেন। আর যেখানে ইমাম ওকী ও আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ. এর গ্রন্থে এই বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে দুই, তিন, পাঁচ, ছয়টি হাদীসের বেশি উল্লেখ নেই। আর এ পরিমাণ স্মরণশক্তি দেখেই ইমাম আহমদ ইবনে হামদুন রহ. বলেন, কোন এক জানাযায় মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইমাম বুখারীকে আসমা ও ইলাল সম্পর্কে প্রশ্ন করছিলেন আর তিনি এভাবে জবাব দিচ্ছিলেন যে, يمر فيه مثل السهم كَأَنَّهُ يَقْرَأ قل هُوَ الله أحد এরূপ ধারাবাহিক ও আস্থার সাথে যেন তিনি قل هو الله অর্থাৎ সূরা এখলাছ পাঠ করছেন।

আর এ রকম অনেক ঘটনায় ইমাম বুখারী রহ. এর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, পাণ্ডিত্য ও বিচক্ষণতায় শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ ঘটেছে। যা সমকালীন সময়ে দৃষ্টান্তহীন ছিল। আর আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ করেন, ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ (এটা আল্লাহর কৃপা। যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন)।

টিকাঃ
৭৩. ফতহুল বারী মুকাদ্দামা (১/৪৮৬)
৭৪. তারীখে বাগদাদ (২/২০) তাহযীবুল কামাল (১৬৮) তাবাকাতুশ শাফীয়াতুল কুবরা (২/২১৮) সিয়ারু আ'লামীন নুবালা (১২/৪০৪)
৭৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৩/৪১৬)
৭৬. তাবাকাতুল হানাবিলা (১/২৭৫) তারীখে বাগদাদ (২/২৫) তাবাকাতুশ শাফেয়ী (২/২১৮)
৭৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৩/৪১৬)
৭৮. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৩/৪১৬)
৭৯. তারীখে বাগদাদ (২/১৬) সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪০৯)
৮০. মুকাদ্দামা ফতহুল বারী (৪৮৭ পৃষ্ঠা)
৮১. হাদউয়ুস সারী (৪৮৬ পৃষ্ঠা)
৮২. ইনসাইক্লো পিডিয়া অফ ইসলাম (৪/৭৭৫)
৮৩. ফতহুল বারী (১/৪৭৮)
৮৪. হাদইয়ুস সারী (৪৮২ পৃষ্ঠা)
৮৫. ফতহুল বারী (১/৪৮৮)
৮৬. সূরা জুমুআ (৪)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 কোরআনের জ্ঞানে ইমাম বুখারীর মর্যাদা

📄 কোরআনের জ্ঞানে ইমাম বুখারীর মর্যাদা


ইমাম দারেমী রহ. থেকে একটি রেওয়ায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল এবং বলা হল, ইমাম বুখারী এটিকে সহীহ বলেছেন। ইমাম দরেমী রহ. উত্তরে বললেন, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আমাদের থেকে অধিকতর বিচক্ষণ এবং উত্তম ব্যক্তি। আর মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জবান দ্বারা যেই বিধি-নিষেধ বর্ণনা করেছেন, তা তিনি যথাযথভাবে বুঝেছেন এবং দিল-মন, কান ও মস্তিষ্ককে একত্র করে কোরআন তেলোওয়াত করেছেন। আর তার দৃষ্টান্তের উপর গবেষণা করেছেন এবং হালাল-হারামের ইলম অর্জন করেছেন।

ইমাম বুখারী রহ. এর কাতেব মুহাম্মদ ইবনে আবু হাতিম বর্ণনা করেন, আমি ইমাম বুখারীকে বলতে শুনেছি যে, আমার এরূপ বিষয়ে জ্ঞান নেই, যা প্রয়োজনীয় এবং কোরআন ও হাদীসে উল্লেখ নেই। আমি বললাম তা কি সম্ভব? ইমাম বুখারী উত্তরে বললেন, হ্যাঁ।

বর্ণনাকারী বলেন, কোরআনের সম্পর্কে গভীর চিন্তা ও গবেষণা করা। তার আয়াত সমূহকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা এবং তার গভীরতায় পৌঁছা। ইমাম বুখারী রহ. এর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল।

টিকাঃ
৮৭. ফতহুল বারী মুকাদ্দামা (৪৮৫ পৃষ্ঠা)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 দুনিয়া ত্যাগী

📄 দুনিয়া ত্যাগী


ইমাম বুখারী রহ. এর সম্মানিত পিতা বুযুর্গ, খোদাভীরু ও আল্লাহর আশেক বান্দা ছিলেন। সুতরাং এরূপ পিতার সন্তান কেমন ঈমানদার ও খোদাভীরু হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

ইমাম বুখারী রহ. কোন সাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না; বরং তিনি উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। যেমনটি আবু সাঈদ বকর ইবনে মুনির বর্ণনা করেন, একদা ইমাম বুখারী কিছু মাল বিক্রয়ের ইচ্ছা করলেন। অতঃপর এক ব্যবসায়ী দল সে সম্পদের মূল্য পাঁচ হাজার দিরহাম নির্ধারণ করতে চাইলেন। ইমাম বুখারী তাদের কাছে বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত দিলেন না। অথচ তা তাদের নিকটেই বিক্রয়ের জন্য টান অনুভব করলেন। আর এ কারণেই যখন অন্য এক ব্যবসায়ী দল তা দশ হাজার মূল্যে তা ক্রয়ের কথা জানালেন, তখন ইমাম বুখারী তাতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, لَا أُحِبُّ أَنْ أَنْقُضَ نِيَّتِي আমি আমার নিয়্যাত পরিবর্তন পছন্দ করছি না।

তার এমন খোদাভীরুতা, দ্বীনদারী পরহেজগারী ও ব্যক্তিত্ববোধের কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একনিষ্ঠ ও প্রকৃত উত্তরসূরীতে পরিণত হয়েছেন।

টিকাঃ
৮৮. তারিখে বাগদাদ (২/৩২২)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 ব্যক্তিত্ববোধ

📄 ব্যক্তিত্ববোধ


ইমাম বুখারী রহ. এর জীবনে এমন কতক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে, যা অনেক বড় বড় মহামানবদের জীবনীও এসব বৈশিষ্ট্য থেকে ফাঁকা ছিল। তার চারিত্রিক গুণাবলী মধ্যে অতি লজ্জাশীলতা, ধৈর্য্যশীলতা, আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন, স্বল্পে তুষ্ট, প্রফুল্লতা, আময়িকতা, জাগ্রত, সচেতনাতা ছিল অন্যতম। আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে মাথা নত করাকে তিনি কল্পনাও করতেন না। আর এ মহৎগুণের কারণেই তাঁকে দেশান্তর হতে হয়েছে।

আর যখন ইমাম বুখারী রহ. এর জ্ঞানের ঐশ্বর্য ও প্রতিপত্তির সংবাদ আশপাশ ছড়িয়ে গেল। তখন বুখারার আমীর উমারাগণ তাদের বাচ্চাদের বিশেষভাবে শিক্ষাদানে জন্য ইমাম বুখারীকে এ মর্মে আবেদন জানায় যে, তিনি যেন রাজপ্রাসাদে এসে তাদের বাচ্চাদের বিশেষ তালিম দান করেন। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. তাদের প্রতিউত্তরে বললেন, أَنَا لَا أُذِلُّ الْعِلْمَ وَلَا أَحْمِلُهُ إِلَى أَبْوَابِ النَّاسِ فَإِنْ كَانَتْ لَكَ إِلَى شَيْءٍ مِنْهُ حَاجَةً فَاحْضُرْ فِي مَسْجِدِي أَوْ فِي دَارِي (আমি দরজায় দরজায় গিয়ে ইলমের অবমূল্যায়ন করতে পারব না। যদি কারো ইলমের পিপাসা থাকে তাহলে সে আমার মসজিদে অর্থাৎ দরসে অথবা আমার ঘরে হাজির হবে)।

বুখারার আমীরগণ তাঁর এই আপসহীন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে শহর ত্যাগের নির্দেশ দেয়। অবশেষে ইমাম বুখারী রহ. ইলমের অমর্যাদা থেকে নিজেকে দেশান্তর করাকে বেশি পছন্দ করলেন। এ সম্বন্ধে তিনি বলেন, مَا اسْتَصْغَرْتُ نَفْسِي عِنْدَ أَحَدِ إِلَّا عِنْدَ عَلِيِّ بْنِ الْمَدِينِي (আলী ইবনে মাদীনী ছাড়া আমি কারো নিকট নিজেকে ছোট অনুভব করিনি)।

ইমাম বুখারী রহ. ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এরূপ কোন কাজকে সমর্থন করতেন না। আর এ কারণেই তার দরবারে আমীর ও প্রশাসকরা আনাগোনা থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন। আর তিনি বাদশাহদের তাঁর কাছে আনাগোনাকে এ পরিমাণ ঘৃণা করতেন যে, সেটি যেন তার চারিত্রিক গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল। আর তিনি কখনোই আমীর বা বাদশাহদের কাছে নমনীয় ভূমিকায় উপস্থিত হওয়াকে পছন্দ করতেন না। এ সূত্র ধরেই একদা তিনি কাউকে মুদারাবা ভিত্তিক (শ্রম ও মালের অংশীদার ভিত্তিক ব্যবসা) কিছু সম্পদ দিয়েছিল। অতঃপর সে ব্যক্তি পঁচিশ হাজার দিরহাম খিয়ানত করে মূলধনকে ফেরত দিল। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. কে বাদশাহর দরবারে নালিশের মধ্য দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বলা হলে তিনি বললেন, وَلَن أَبِيعُ دِينِي بِدُنْيَايَ (আমি আমার দ্বীনকে দুনিয়ার বিপরীতে নষ্ট করব না)। অবশেষে তিনি দশ দিরহাম মাসিক উসূলের ভিত্তিতে বিষয়টি নিষ্পত্তি করলেন।

টিকাঃ
৮৯. তারিখে বাগদাদ (২/৩৩)
৯০. তারিখে বাগদাদ (২/১৭)
৯১. ফতহুল বারী (১/৪৭৯)

ফন্ট সাইজ
15px
17px