📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 দুনিয়া ত্যাগ ও খোদাভীরুতা

📄 দুনিয়া ত্যাগ ও খোদাভীরুতা


ইমাম বুখারী রহ. এর দুনিয়া ত্যাগ ও খোদাভীরুতা সম্পর্কে আলোচনা মুহাদ্দীসগণ ইতিহাসের ও হাদীসের ব্যাখ্যা গ্রন্থাবলীতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। চরম বাস্তবতা তো এই, যখন ইলম অর্জন কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয়, তখন তা দুনিয়া ত্যাগ ও খোদাভীরুতার কারণ হয়ে যায়।

ইমাম বুখারী রহ. এর পিতা সম্পর্কে এ কথা প্রচলন আছে যে, তাঁর মৃত্যুর সময় বলেছিলেন, আমার সম্পদে বিন্দু পরিমাণ হারামের স্পর্শ নেই। এ কথা প্রকাশমান যে, ইমাম বুখারী রহ. এর লালন-পালন হালাল এবং পবিত্র সম্পদ দ্বারা হয়েছিল। সুতরাং তার দুনিয়া ত্যাগ ও খোদাভীরুতার অবস্থান কোথায় হবে, তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়াও তার বাল্যকালে হাদীসের প্রতি অদম্য আগ্রহ যেন সোনায় সোহাগা হয়ে যায়। মাকসাম ইবনে সা'আদ রহ. বর্ণনা করেন, যখন রমজান মাস এসে যেত। তখন তার ছাত্র, সাথী ও বন্ধুরা সবাই এসে একত্রিত হত। অতঃপর তিনি তারাবীহের নামাজে এভাবে ইমামতী করতেন যে, প্রত্যেক রাকাতে বিশটি করে আয়াত তেলাওয়াত করতেন। আর এভাবে রমজানে একটি খতম পড়াতেন। আর তাহাজ্জুতের নামাজে অর্ধেক অথবা এক তৃতীয়াংশ কোরআন তেলাওয়াত করতেন। যা প্রত্যেক তিন দিনে একটি খতম হতো। তিনি বলতেন, প্রত্যেক খতমের পর দোয়া কবুল হয়। আরো বর্ণিত আছে, তিনি সহীহ বুখারীতে প্রত্যেকটি হাদীস বর্ণনা করার পূর্বে দু'রাকাত নফল নামাজ আদায় করতেন।

ইমাম বুখারী রহ. এর তীরান্দাজী শখ ছিল। একদা তিনি তীর নিক্ষেপ করছিলেন, হঠাৎ সেটি মালিকানাধীন একটি সাঁকোতে গিয়ে লাগল এবং সেটির সাধারণ একটু ক্ষতি হল। ইমাম বুখারী রহ. সাঁকোতে বিদ্ধ সে তীর নিজে উঠালেন এবং আবু জাফর নামে একজন সাথীকে সাঁকোর মালিকের কাছে পাঠালেন। অতঃপর সাঁকো মালিককে ঘটনাটি জানিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলে তিনি ইমাম বুখারী রহ. এর খোদাভীরুতা দেখে ক্ষমা করে দিলেন এবং বললেন, আমার সমস্ত সম্পদ তাঁর নামে উৎসর্গ করছি। অতঃপর যখন ইমাম বুখারী রহ. কে এই বিষয়টি জানানো হল, তখন তিনি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। সেই সাথে তিনি তিনশত দিরহাম সদকা করলেন।

একদা ইমাম বুখারী রহ. এর স্বীয় শিষ্য আবু মা'শার আয যারীর হতে তিনি ক্ষমা চাইলে আয যারীর বললেন, কি কারণে আপনি এমন করছেন? ইমাম বুখারী রহ. বললেন, একদা আমি হাদীস বর্ণনা করছিলাম। আর তুমি তা শ্রবণ করে আনন্দে নাচানাচী করছিলে। আর তখন তোমার মাথা ও হাত নড়ছিল। এ অবস্থা দেখে আমি তোমার উপর হেসেছিলাম। অতঃপর যারীর বললেন, আল্লাহর কসম! আপনার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক আমি পূর্বেই আপনাকে ক্ষমা করেছি।

ফতহুল বারীসহ কয়েকটি কিতাবে এ ঘটনা উল্লেখ রয়েছে যে, একদা ইমাম বুখারী কিছু পূণ্য বিক্রয় করার মনস্থির করলেন। এক লোক পাঁচ হাজার মুনাফায় তা ক্রয়ের প্রস্তাব দিলেন। ইমাম বুখারী রহ. বললেন, আমি চিন্তা করে আগামীকাল আপনাকে জানাব। অতঃপর একদল লোক এসে উক্ত পূণ্য দশ হাজার মুনাফায় তা ক্রয়ের প্রস্তাব দিলেন। ইমাম বুখারী রহ. বললেন, আমি গত রাতে তা একদল লোককে দেয়ার ইচ্ছে করেছি। অতঃপর তিনি পাঁচ হাজার মুনাফায় তা দিয়ে দিলেন। আর বললেন, পাঁচ হাজার মুদ্রার জন্য আমি আমার নিয়ত পরিবর্তন করতে পারব না।

ইমাম কিরমানী রহ. বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারীকে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ায় অনেক সম্পদ দান করেছেন। তার পিতার উত্তরাধিকারী সূত্রেও অনেক সম্পদ পেয়েছিলেন। অতঃপর তিনি তা আল্লাহর রাস্তায় দান করতেন। কখনো তিনি দুইটি অথবা তিনটি বাদাম খেয়ে পুরো দিন অতিবাহিত করে দিতেন। শাহ্ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. সিয়ারু আলামীন নুবালার বরাতে বলেন, كان قليل الاكل جدا مفردا فى الجور وقال كان يقنع كل ليوم بلوزتين او ثلاث। ইমাম বুখারী রহ. কখনো কোন বাদশা হতে উপকৃত হবার চেষ্টা করেননি। যদিও তার সুযোগ তিনি বারবার পেয়েছিলেন। ইমাম বুখারী রহ. এর শাগীরদ ইমাম বুখারী সম্পর্কে বর্ণনা করেন, যখন তিনি আদম ইবনে আইয়াসের খেদমতে হাজির হলেন। তখন খরচের জন্য তাঁর কাছে কিছুই ছিল না। এমন কি তাঁকে দুই দিন শাক-সবজি খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। তৃতীয় দিন একজন অপরিচিত ব্যক্তি এসে ইমাম বুখারীকে দিনারের থলি দিলেন। ইমাম বুখারী বলেন, তাকে তিনি কোন দিনই দেখেননি।

ইমাম বুখারী রহ. এর শাগীরদ ইমাম সাহেব সম্পর্কে বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারী বলতেন, যেদিন থেকে গীবত হারাম হওয়ার ব্যাপারে আমি জানলাম, সে দিন হতে আমি কারো গীবত করিনি। আর আমার আল্লাহ হতে এ বিশ্বাস আছে যে, তিনি এ ব্যাপারে আমার হিসাব গ্রহণ করবেন না।

একদা ইমাম বুখারী রহ. অসুস্থ হলে পরিক্ষার জন্য তার প্রস্রাব ডাক্তারকে দেখানো হলো। ডাক্তার বললেন, তিনি তরকারী খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ.কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করে বলেন যে, আমি চল্লিশ বছর যাবত তরকারি গ্রহণ করি না। এরপর ডাক্তার হতে পথ্য জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এর ঔষধই হলো তরকারি খাওয়া। অতঃপর ইমাম সাহেবকে তা খাওয়ার জন্য বলা হলে তিনি তরকারি খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। অবশেষে আহলে ইলম এবং মুহাদ্দিসদের অনুরোধে তরকারি খেতে শুরু করলেন।

ইমাম বুখারী রহ. এর ইবাদতের একাগ্রতা সম্পর্কে এ ঘটনা কয়েকটি গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। একদা তিনি যোহরের নামাজ শেষে নফল নামাজে মশগুল হলেন। নফল নামাজ শেষে তিনি তার জামা উঠিয়ে সাথীদের বললেন, দেখ তো আমার জামার নিচে কিছু আছে কি না? সাথীরা তার জামা উচিয়ে নিতেই নিচ হতে একটি ভ্রমর বের হতে দেখলেন। যা তার শরীরের সত্তর জায়গায় দংশনের চিহ্ন এঁকেছে। এতে তার শরীর স্ফীত হয়েছে। সাথীরা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কেন নামাজকে ছেড়ে দিলেন না? ইমাম বুখারী রহ. উত্তরে বললেন, আমি যে সূরা তেলাওয়াত করছিলাম, তা শেষ করার ইচ্ছা হচ্ছিল না।

ইমাম বুখারী রহ. বলেন, আমি দু'বার আমার প্রভুর কাছে দোয়া করার সাথে সাথে তা কবুল হয়। যাতে আমার ধারণা হল যে, আমার আমলের প্রতিদান কি দুনিয়াতেই পেয়ে যাচ্ছি। অতঃপর আমি দুনিয়াবী জিনিস চাওয়া থেকে বিরত থাকলাম।

একদা ইমাম বুখারী রহ. ইলম অর্জনের সূত্রধরে সমুদ্র সফরে বের হলেন। সে সফরে ইমাম বুখারী রহ. এর কাছে এক হাজার আশরাফী ছিল। সফরকালে এক ব্যক্তি ইমাম বুখারীর সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ অমায়িক আচার ব্যবহার করলেন। অতঃপর কথায় কথায় ইমাম বুখারী রহ. তার আশরাফীর ব্যাপারে তাকে বললেন। অতঃপর একদিন সকালে লোকটি হা-হুলুস্তুল শুরু করল। লোকেরা আশ্চর্য হয়ে তার কারণ জিজ্ঞাস করলে সে বলল, আমার কাছে এক হাজার আশরাফীর একটি থলি ছিল। আজ তা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। অতঃপর থলেটি অনুসন্ধান করার জন্য প্রত্যেক আরোহীকে পৃথক করা হল। ইমাম বুখারী রহ. বিষয়টি পরিষ্কার বুঝে ফেললেন এবং নিজের উপার্জিত সেই এক হাজার আশরাফীর থলি সাগরে ফেলে দিলেন। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. এর কাছেও অনুসন্ধান হল। অবশেষে যখন কারো নিকট সে থলেটি পাওয়া গেল না, তখন জাহাজ আরোহীরা বিষয়টি নিয়ে উক্ত ব্যক্তিকে লজ্জা দিল। অতঃপর সফর শেষে যখন সে ব্যক্তি ইমাম বুখারী রহ. কে নির্জনে দেখতে পেলেন, তখন তিনি তাঁকে থলির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে ইমাম বুখারী রহ. বললেন, থলিটি আমি সাগরে ফেলে দিয়েছি। কেননা আমি আমার সমস্ত জীবন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচার প্রসারের কাজে ব্যয় করেছি। যদি আমার ধার্মিকতা, দ্বীনদারী ও নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তাহলে আমি এ চুরির অপবাদ থেকে কিভাবে মুক্তি পাব। ইমদাদুল বারী, ফজলুল বারী (মুকাদ্দামা)।

আল্লামা কিরমানী রহ. বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ তায়ালা ইমাম বুখারী রহ.কে বর্ণনাতীত ধন-সম্পদ দান করেছিলেন। তিনি পিতার উত্তরাধিকারী সূত্রে অনেক সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। তিনি তার সবটাই আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন।

টিকাঃ
৬৪. ফতহুল বারী মুকাদ্দামা (৪৭৯)
৬৫. হাদইয়ুস সারী (৪৮০ পৃষ্ঠা)
৬৬. ফতহল বারী (১/৪৮০)
৬৭. ফতহুল বারী মুকাদ্দামা (১/৪৮০)
৬৮. সিয়ারু আ'লামীন নুবালা (২/৪৩৯)
৬৯. ফতহুল বারী (১/৪৮১)
৭০. সিয়ারু আ'লামীন নুবালা (১৩/৪৩৯)
৭১. সিয়ারু আ'লামীন নুবালা (১৩/৪৩৯)
৭২. কাশফুল বারী মুকাদ্দামা (১৩২ পৃষ্ঠা)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 স্মরণশক্তি

📄 স্মরণশক্তি


কারো স্মরণশক্তি দৃঢ় হওয়া আল্লাহর নিয়ামতসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি নেয়ামত। মুহাদ্দিসীনদেরকে ঐ নিয়ামত আল্লাহ তায়ালা সীমাহীনভাবে দান করেন। আর ইমাম বুখারী রহ. যেহেতু মুহাদ্দিসীনদের ইমাম ছিলেন, সেহেতু সে নিয়ামতের মূল অংশটি আল্লাহ তায়ালা তাঁকেই দান করেছিলেন। ইতিহাস ও জীবনী গ্রন্থগুলোর কয়েকটি কিতাবে ইমাম বুখারী রহ. সম্পর্কে এ ঘটনাটি উল্লেখ রয়েছে। যা থেকে ইমাম বুখারী রহ. এর স্মৃতিশক্তির প্রখরতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ইবনে আদী রহ. বর্ণনা করেন যে, একদা ইমাম বুখারী রহ. বাগদাদ সফরে গেলেন। বাগদাদের মুহাদ্দিসগণ ইমাম বুখারী রহ. এর স্মরণশক্তি পরিক্ষা কারার জন্য একটি মজলিস আহবান করলেন এবং দশজন মুহাদ্দিস একশটি হাদীসের মতন ও সনদকে উল্টোভাবে সাজিয়ে ইমাম বুখারী রহ. এর সামনে পাঠ করলেন। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. প্রত্যেকটি হাদীস পাঠের পর একই উত্তর দিতে লাগলেন যে, হাদীসটি এভাবে আমার কাছে পরিচিত নয়। অবশেষে যখন মুহাদ্দিসগণ বললেন, হাদীসগুলি কিভাবে আপনার কাছে পরিচিত? ইমাম বুখারী রহ. তখন প্রত্যেকটি হাদীসই তাদের মত উল্টো করে পাঠ করে তাদের ভুল জায়গাগুলি শুদ্ধ করে দিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করলেন। আর এ ঘটনায় সবাই কিংকর্তব্যবিমূর হয়ে ইমাম বুখারী রহ.এর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দানকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন।

আল্লামা হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বর্ণনা করেন যে, ইমাম বুখারী রহ. এর হাদীসের জবাব দেয়াটা আমাকে আশ্চর্য করেনি। কেননা তিনি হাদীসের হাফেয ছিলেন; বরং সে সব প্রশ্ন যা উল্টোভাবে তার কাছে পাঠ করা হয়েছিল, মাত্র একবার তিনি শ্রবণ করেই ধারাবাহিক ভাবে তা উল্লেখ করাটা আমাকে আশ্চর্য করেছে। কেননা প্রশ্নকারী তো মাত্র একবারই তা পাঠ করেছিলেন।

ইমাম আবু বকর আল কুলুযানী বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারী রহ. যে কিতাব একবার পড়তেন, সে কিতাবের সমস্ত হাদীস তার হিফয হয়ে যেত।

ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করেন যে, আমার সহীহ এক লক্ষ এবং গায়রে সহীহ দুই লক্ষ হাদীস হিফয আছে। অন্য একটি রেওয়ায়েতে আছে যে, ইমাম বুখারী রহ. একদা রাত্রে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলেন যে, তার কিতাবে কতগুলি হাদীস উল্লেখ আছে। অতঃপর তিনি গণনা করে বললেন, প্রায় দুই লক্ষ। ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করেন, আমি এক বৈঠকে শুধু নামাজের সম্বন্ধে দশ হাজার হাদীস বর্ণনা করতে পারব।

ইমাম বুখারী রহ. একদা বসরা সফরে গেলেন। অতঃপর যখন তিনি বসরা জামে মসজিদে নিজের নামাজ শেষ করলেন, তখন বসরাবাসী একটি হাদীসের মজলিস কায়েমের জন্য আবেদন জানালেন। ইমাম বুখারী রহ. বললেন, আমি তোমাদের ঐ হাদীসগুলি বর্ণনা করব যা তোমাদের সংরক্ষণে নেই। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. হাদীসের সনদসহ বর্ণনা শুরু করলেন এবং সনদ সম্পর্কে বলতে লাগলেন যে, তোমাদের নিকট এ হাদীসটি অমুক রাবী বর্ণনা করেন আর এ হাদীসটি আমি তোমাদের শহরের অমুক রাবীকে বর্ণনা করতে শুনেছি।

ইমাম বুখারী রহ. আরো বর্ণনা করেন, আমি একবার বলখ শহরে সফরে গেলাম। অতঃপর বলখ শহরের মুহাদ্দিসগণ আমার সনদের সাথে তাদের সনদ যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। অতঃপর আমি আমার এক হাজার উস্তাদ থেকে এক হাজার হাদীস বর্ণনা করলাম। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বর্ণনা করেন যে, এক রেওয়ায়েত দ্বারা ইমাম বুখারীর দুই কোটি হাদীস মুখস্থের প্রমাণ পাওয়া যায়।

হাশিদ ইবনে ইসমাঈল রহ. বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারী রহ. ইলম অর্জন সময়কালে মুহাদ্দিসদের দরসে বসে শুধু হাদীস শ্রবণ করতেন কিন্তু তা লিপিবদ্ধ করতেন না। এতে সাথীরা ইমাম বুখারী রহ. কে উপহাস করে বলতেন যে, তুমি শুধু সময় নষ্ট করছ। সাথীদের এ উপহাসে বিরক্ত হয়ে ইমাম বুখারী রহ. বললেন যে, তোমাদের নিকট কতগুলি হাদীস লিপিবদ্ধ আছে? সাথীরা তাদের লিপিবদ্ধ হাদীসের সংখ্যা জানালে ইমাম বুখারী রহ. তার চেয়ে অধিক সংখ্যক হাদীস মুখস্থ বর্ণনা করলেন। এ ঘটনার পর থেকে সাথীরা ইমাম বুখারী রহ. থেকে তাদের লিপিবদ্ধ হাদীসগুলি সংশোধন করে নিতেন।

ইনসাইক্লো পিডিয়া লিখকরাও ইমাম বুখারী রহ. এর প্রশংসায় বলেন, ইমাম বুখারী রহ. এর স্মরণশক্তি ও উপস্থিত জ্ঞান-প্রজ্ঞার পরিমাণ ও প্রখরতা এমন ছিল যে, সমকালীন মুহাদ্দিসদের কাছেও তা অলৌকিক বলে মনে হত।

সালিম ইবনে মুজাহিদ বর্ণনা করেন যে, ইমাম বুখারী রহ. আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, আমি যে সমস্ত সাহাবী ও তাবেয়ী হতে হাদীস বর্ণনা করেছি। তাদের প্রত্যেকেরই জীবন বৃত্তান্ত, জন্ম-মৃত্যু, আবাসভূমি, জন্মভূমি সম্পর্কে আমার জানা আছে। আর তিনি এও বর্ণনা করেন যে, আমি হাদীসের পরিশুদ্ধতা ও বিশুদ্ধতা সম্পর্কে যতক্ষণ না পূর্ণ আস্থা অর্জন করতাম, ততক্ষণ হাদীস গ্রহণের লক্ষ্যে বসে থাকতাম। অতঃপর বিষয়টি পরিষ্কার হলে তা গ্রহণ করতাম।

হাশিদ ইবনে ইসমাঈল বলেন, ইমাম বুখারী হাদীস শ্রবণের জন্য আমার পরিচিত মুহাদ্দিসদের নিকট যেতেন। কিন্তু তাঁর কাছে হাদীস লিখার জন্য দোয়াত-কলম থাকত না। আমি তাঁকে এ ব্যাপারে একবার জিজ্ঞাস করলে ষোল দিন পর তিনি এর জবাবে বললেন, আপনাদের এমন প্রশ্নে আমি বিরক্ত হয়ে গেছি। সুতরাং আপনাদের লিখিত হাদীসগুলি আমার সাথে মিলিয়ে নিন। অতঃপর তিনি সমস্ত হাদীস সনদসহ মুখস্থ বর্ণনা শুরু করলেন। আশ্চর্যের বিষয় হল, আমরা সে সময় পর্যন্ত পনের হাজার হাদীস লিপিবদ্ধ করেছিলাম। তিনি সবগুলিই মুখস্থ বর্ণনা করলেন।

একদা ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ রহ. জুমার নামাজের খুতবায় একটি হাদীসের সনদ ভুল পাঠ করলেন। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. তাঁকে সে সমন্ধে অবগত করলে তিনি তা গ্রহণ করে নিলেন।

আহমদ ইবনে হামদুন বর্ণনা করেন, কোন এক জানাযায় আমি শরীক হয়ে ইমাম বুখারীকে দেখেছিলাম যে, মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া যুহালী তাকে আসমাউল রিজাল এবং ইল্লতে হাদীস সম্পর্কে প্রশ্ন করছিলেন। আর ইমাম বুখারী রহ. ধারাবাহিকভাবে তার উত্তর দিচ্ছিলেন।

মুহাম্মদ ইবনে আযহার সাযিস্তানী রহ. বর্ণনা করেন যে, আমি ইমাম বুখারী রহ. এর সাথে সুলাইমান ইবনে হরব রহ. এর খেদমতে হাদীস শ্রবণের জন্য উপস্থিত হলাম। অতঃপর একজন সাথী আরয করলেন যে, ইমাম বুখারী হাদীস লিপিবদ্ধ করেন না কেন? আমি তাকে বললাম, যদি তোমার কোন হাদীস বাদ থেকে থাকে তাহলে তা ইমাম বুখারীর নিকট থেকে লিপিবদ্ধ করে নাও।

মুহাম্মদ ইবনে হাতেম বর্ণনা করেন যে, একদা আমরা ফিরয়াবী রহ. দরবারে বসা ছিলাম। অতঃপর ফিরয়াবী একটি হাদীসের সনদ বর্ণনা করলেন, حَدَّثَنَا سُفْيَانِ عَن أَبي عُرْوَة عَن أبي الخطاب عن أَبي حَمْزَة আলোচ্য সনদে সুফিয়ান ছাড়া সমস্ত রাবীর কুনিয়াত অর্থাৎ উপনাম ব্যবহার করা হয়েছে। অতঃপর ফিরয়াবী রাবীদের আসল নাম জিজ্ঞাস করলে সমস্ত মজলিস স্তদ্ধ হয়ে যায়। অতঃপর সবাই ইমাম বুখারী রহ. এর দিকে তাকালেন এবং সাথে সাথে ইমাম বুখারী রহ. নাম বলতে শুরু করলেন, আবু উরওয়াহের আসল নাম মা'মার ইবনে রাশিদ, আবুল খাত্তাবের নাম কাতাদাহ ইবনে দুয়ামাহ এবং আবু হামজাহ এর প্রকৃত নাম আনাস ইবনে মালেক। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. এর এই পাণ্ডিত্য দেখে সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল।

ইমাম বুখারী রহ.এর বিচার, কল্পনাশক্তি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, বীরত্ব, বিখ্যাত হওয়ার বিষয়টি সমালোচকরাও স্বীকার করেছেন। ইমাম ইবনে সাঈদ বর্ণনা করেন, পৃথিবীতে ইমাম বুখারী রহ. এর মতো খোদাভীরু, বিচক্ষণ, জ্ঞান-প্রজ্ঞা সম্পূর্ণ ব্যক্তি আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। যেন তিনি সমকালীন উমরে ফারুক রাযি আল্লাহু তায়ালা আনহু।

আর এ কারণেই আমরা অবলোকন করেছি যে, ইমাম বুখারী রহ. 'কিতাবুল হিবাহ' শিরোনামে পাঁচশত হাদীস উল্লেখ করেছেন। আর যেখানে ইমাম ওকী ও আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ. এর গ্রন্থে এই বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে দুই, তিন, পাঁচ, ছয়টি হাদীসের বেশি উল্লেখ নেই। আর এ পরিমাণ স্মরণশক্তি দেখেই ইমাম আহমদ ইবনে হামদুন রহ. বলেন, কোন এক জানাযায় মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইমাম বুখারীকে আসমা ও ইলাল সম্পর্কে প্রশ্ন করছিলেন আর তিনি এভাবে জবাব দিচ্ছিলেন যে, يمر فيه مثل السهم كَأَنَّهُ يَقْرَأ قل هُوَ الله أحد এরূপ ধারাবাহিক ও আস্থার সাথে যেন তিনি قل هو الله অর্থাৎ সূরা এখলাছ পাঠ করছেন।

আর এ রকম অনেক ঘটনায় ইমাম বুখারী রহ. এর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, পাণ্ডিত্য ও বিচক্ষণতায় শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ ঘটেছে। যা সমকালীন সময়ে দৃষ্টান্তহীন ছিল। আর আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ করেন, ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ (এটা আল্লাহর কৃপা। যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন)।

টিকাঃ
৭৩. ফতহুল বারী মুকাদ্দামা (১/৪৮৬)
৭৪. তারীখে বাগদাদ (২/২০) তাহযীবুল কামাল (১৬৮) তাবাকাতুশ শাফীয়াতুল কুবরা (২/২১৮) সিয়ারু আ'লামীন নুবালা (১২/৪০৪)
৭৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৩/৪১৬)
৭৬. তাবাকাতুল হানাবিলা (১/২৭৫) তারীখে বাগদাদ (২/২৫) তাবাকাতুশ শাফেয়ী (২/২১৮)
৭৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৩/৪১৬)
৭৮. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৩/৪১৬)
৭৯. তারীখে বাগদাদ (২/১৬) সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৪০৯)
৮০. মুকাদ্দামা ফতহুল বারী (৪৮৭ পৃষ্ঠা)
৮১. হাদউয়ুস সারী (৪৮৬ পৃষ্ঠা)
৮২. ইনসাইক্লো পিডিয়া অফ ইসলাম (৪/৭৭৫)
৮৩. ফতহুল বারী (১/৪৭৮)
৮৪. হাদইয়ুস সারী (৪৮২ পৃষ্ঠা)
৮৫. ফতহুল বারী (১/৪৮৮)
৮৬. সূরা জুমুআ (৪)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 কোরআনের জ্ঞানে ইমাম বুখারীর মর্যাদা

📄 কোরআনের জ্ঞানে ইমাম বুখারীর মর্যাদা


ইমাম দারেমী রহ. থেকে একটি রেওয়ায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল এবং বলা হল, ইমাম বুখারী এটিকে সহীহ বলেছেন। ইমাম দরেমী রহ. উত্তরে বললেন, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আমাদের থেকে অধিকতর বিচক্ষণ এবং উত্তম ব্যক্তি। আর মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জবান দ্বারা যেই বিধি-নিষেধ বর্ণনা করেছেন, তা তিনি যথাযথভাবে বুঝেছেন এবং দিল-মন, কান ও মস্তিষ্ককে একত্র করে কোরআন তেলোওয়াত করেছেন। আর তার দৃষ্টান্তের উপর গবেষণা করেছেন এবং হালাল-হারামের ইলম অর্জন করেছেন।

ইমাম বুখারী রহ. এর কাতেব মুহাম্মদ ইবনে আবু হাতিম বর্ণনা করেন, আমি ইমাম বুখারীকে বলতে শুনেছি যে, আমার এরূপ বিষয়ে জ্ঞান নেই, যা প্রয়োজনীয় এবং কোরআন ও হাদীসে উল্লেখ নেই। আমি বললাম তা কি সম্ভব? ইমাম বুখারী উত্তরে বললেন, হ্যাঁ।

বর্ণনাকারী বলেন, কোরআনের সম্পর্কে গভীর চিন্তা ও গবেষণা করা। তার আয়াত সমূহকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা এবং তার গভীরতায় পৌঁছা। ইমাম বুখারী রহ. এর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল।

টিকাঃ
৮৭. ফতহুল বারী মুকাদ্দামা (৪৮৫ পৃষ্ঠা)

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 দুনিয়া ত্যাগী

📄 দুনিয়া ত্যাগী


ইমাম বুখারী রহ. এর সম্মানিত পিতা বুযুর্গ, খোদাভীরু ও আল্লাহর আশেক বান্দা ছিলেন। সুতরাং এরূপ পিতার সন্তান কেমন ঈমানদার ও খোদাভীরু হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

ইমাম বুখারী রহ. কোন সাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না; বরং তিনি উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। যেমনটি আবু সাঈদ বকর ইবনে মুনির বর্ণনা করেন, একদা ইমাম বুখারী কিছু মাল বিক্রয়ের ইচ্ছা করলেন। অতঃপর এক ব্যবসায়ী দল সে সম্পদের মূল্য পাঁচ হাজার দিরহাম নির্ধারণ করতে চাইলেন। ইমাম বুখারী তাদের কাছে বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত দিলেন না। অথচ তা তাদের নিকটেই বিক্রয়ের জন্য টান অনুভব করলেন। আর এ কারণেই যখন অন্য এক ব্যবসায়ী দল তা দশ হাজার মূল্যে তা ক্রয়ের কথা জানালেন, তখন ইমাম বুখারী তাতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, لَا أُحِبُّ أَنْ أَنْقُضَ نِيَّتِي আমি আমার নিয়্যাত পরিবর্তন পছন্দ করছি না।

তার এমন খোদাভীরুতা, দ্বীনদারী পরহেজগারী ও ব্যক্তিত্ববোধের কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একনিষ্ঠ ও প্রকৃত উত্তরসূরীতে পরিণত হয়েছেন।

টিকাঃ
৮৮. তারিখে বাগদাদ (২/৩২২)

ফন্ট সাইজ
15px
17px