📄 নবী মুহাম্মদ সা. এর চুল মোবারকের বরকত
ইমাম বুখারী রহ. এর কাতেব বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারী রহ. এর নিকট নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কয়েকটি পবিত্র চুল ছিল। যা তিনি নিজ পরিধেয় সম্মানের সাথে রাখতেন।
📄 ইমাম বুখারী রহ. এর কবিতা
হাকেম রহ. স্বীয় ইতিহাস গ্রন্থে ইমাম বুখারী রহ. এর কবিতা উল্লেখ করেন,
اغتنم في الفراغ فضل ركوع * فعسى ان يكون موتك بغتة
كم صحيح رأيت من غير سقم * ذهبت نفسه الصحيحة فلتة
অবসর সময়ে রুকু এবং সিজদাহের ফজিলতকে মূল্যবান মনে কর। কেননা এও হতে পারে যে, আকস্মিক মৃত্যু এসে যেতে পারে। অনেক সুস্থ ও শক্তিবান ব্যক্তি যাদের কোন রোগ ব্যাধি নেই, তাদেরকেও মৃত্যু অস্বাদিত করেছে।
ইমাম বুখারী রহ. যখন হাফেয আবদুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান দারেমী রহ. এর মৃত্যু সংবাদ শুনলেন তখন তিনি এ কবিতা পাঠ করলেন,
ان عشت تفجع بالأحبه كلهم * وبقاء نفسك لا ابالك افجح
তুমি যদি জীবিত থাকতে, তাহলে সমস্ত প্রিয় ব্যক্তির মৃত্যু সংবাদ তোমার তিক্ত লাগে। আর তোমার অনুপস্থিতি তো সে তিক্ততা সবচেয়ে বেশি। এ কবিতাও ইমাম বুখারী পাঠ করেন,
مثل البهائم لاترى اجالها * حتى تساق الى المجاز تنحر
চতুষ্পদ জন্তুর মতো যার মৃত্যুর কোন খবর নেই। তারা এমন করছে যেন তাদেরকে জবেহ করার জন্য জবেহের স্থানে নেয়া হবে না।
خالق الناس بخلق واسع * لا تكن كلبا على الناس تهر
মানুষের সাথে প্রশস্ত মনে আচার ব্যবহার কর। যে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তার মতো হয়ো না। আল্লামা সুবকী রহ. এ কবিতাগুলি আত-তাবাকাতুশ শাফেয়ী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
টিকাঃ
৬১. হাদইয়ুস সারী (৪৮১ পৃষ্ঠা)
৬২. হাদইয়ুস সারী (৪৮১)
৬৩. বিস্তারিত সীরাতুল বুখারী (১০৩-১০৪ পৃষ্ঠা)
📄 একটি সন্দেহের নিরসন
উলামায়ে মুহাদ্দীসদের লক্ষ হাদিস মুখস্তের ও রেওয়ায়েতের বিষয়ে এ কথার সন্দেহ সৃষ্টি করে যে, হাদীসের বড় বড় কিতাব যেমন কানযুল উম্মাল, মুসনাদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, জামেউল উসূল, মাযমাউয যাওয়ায়েদ ইত্যাদি গ্রন্থের সমস্ত হাদীস গণনা করলে বিশ থেকে পঁচিশ হাজারের বেশি হাদীসের সংখ্যা হবে না। এমনকি মাওযু হাদীসগুলিকেও একত্র করলে অর্ধ লাখের বেশি হয় না। তাহলে একলক্ষ, দুইলক্ষ, ছয়লক্ষ হাদীস মুখস্ত ও রেওয়ায়েতের উদ্দেশ্য কি? আর সে হাদীসগুলি কোথায় লিপিবদ্ধ রয়েছে?
উত্তর : উসূলে হাদীস শাস্ত্রে এ কথা সর্বজন স্বীকৃতিপ্রাপ্ত যে, হাদীসের তুরক ও রেওয়ায়েত পরিবর্তন হওয়ার কারণে হাদীসের গণনা বৃদ্ধি পায়। যদিও হাদীসের শব্দাবলী একই রকম হয়। একই হাদীস হাজার জন উস্তাদের কাছ কাছ থেকে শ্রবণ করার দ্বারা তা হাজার হাদীস বলে পরিগণিত হয়। সে ভাবে রেওয়ায়েতকারী সাহাবীর সংখ্যা পরিবর্তন হওয়ায় হাদীসের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। আর এদিকে লক্ষ্য রেখেই মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় লক্ষ হাদীস বলা প্রচলিত হয়। আর প্রসিদ্ধ অভিমত হল, ولا مشاحة في الاصطلاح অর্থাৎ পরিভাষায় দ্বিমত করার কোন সুযোগ নেই।
📄 দুনিয়া ত্যাগ ও খোদাভীরুতা
ইমাম বুখারী রহ. এর দুনিয়া ত্যাগ ও খোদাভীরুতা সম্পর্কে আলোচনা মুহাদ্দীসগণ ইতিহাসের ও হাদীসের ব্যাখ্যা গ্রন্থাবলীতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। চরম বাস্তবতা তো এই, যখন ইলম অর্জন কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয়, তখন তা দুনিয়া ত্যাগ ও খোদাভীরুতার কারণ হয়ে যায়।
ইমাম বুখারী রহ. এর পিতা সম্পর্কে এ কথা প্রচলন আছে যে, তাঁর মৃত্যুর সময় বলেছিলেন, আমার সম্পদে বিন্দু পরিমাণ হারামের স্পর্শ নেই। এ কথা প্রকাশমান যে, ইমাম বুখারী রহ. এর লালন-পালন হালাল এবং পবিত্র সম্পদ দ্বারা হয়েছিল। সুতরাং তার দুনিয়া ত্যাগ ও খোদাভীরুতার অবস্থান কোথায় হবে, তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়াও তার বাল্যকালে হাদীসের প্রতি অদম্য আগ্রহ যেন সোনায় সোহাগা হয়ে যায়। মাকসাম ইবনে সা'আদ রহ. বর্ণনা করেন, যখন রমজান মাস এসে যেত। তখন তার ছাত্র, সাথী ও বন্ধুরা সবাই এসে একত্রিত হত। অতঃপর তিনি তারাবীহের নামাজে এভাবে ইমামতী করতেন যে, প্রত্যেক রাকাতে বিশটি করে আয়াত তেলাওয়াত করতেন। আর এভাবে রমজানে একটি খতম পড়াতেন। আর তাহাজ্জুতের নামাজে অর্ধেক অথবা এক তৃতীয়াংশ কোরআন তেলাওয়াত করতেন। যা প্রত্যেক তিন দিনে একটি খতম হতো। তিনি বলতেন, প্রত্যেক খতমের পর দোয়া কবুল হয়। আরো বর্ণিত আছে, তিনি সহীহ বুখারীতে প্রত্যেকটি হাদীস বর্ণনা করার পূর্বে দু'রাকাত নফল নামাজ আদায় করতেন।
ইমাম বুখারী রহ. এর তীরান্দাজী শখ ছিল। একদা তিনি তীর নিক্ষেপ করছিলেন, হঠাৎ সেটি মালিকানাধীন একটি সাঁকোতে গিয়ে লাগল এবং সেটির সাধারণ একটু ক্ষতি হল। ইমাম বুখারী রহ. সাঁকোতে বিদ্ধ সে তীর নিজে উঠালেন এবং আবু জাফর নামে একজন সাথীকে সাঁকোর মালিকের কাছে পাঠালেন। অতঃপর সাঁকো মালিককে ঘটনাটি জানিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলে তিনি ইমাম বুখারী রহ. এর খোদাভীরুতা দেখে ক্ষমা করে দিলেন এবং বললেন, আমার সমস্ত সম্পদ তাঁর নামে উৎসর্গ করছি। অতঃপর যখন ইমাম বুখারী রহ. কে এই বিষয়টি জানানো হল, তখন তিনি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। সেই সাথে তিনি তিনশত দিরহাম সদকা করলেন।
একদা ইমাম বুখারী রহ. এর স্বীয় শিষ্য আবু মা'শার আয যারীর হতে তিনি ক্ষমা চাইলে আয যারীর বললেন, কি কারণে আপনি এমন করছেন? ইমাম বুখারী রহ. বললেন, একদা আমি হাদীস বর্ণনা করছিলাম। আর তুমি তা শ্রবণ করে আনন্দে নাচানাচী করছিলে। আর তখন তোমার মাথা ও হাত নড়ছিল। এ অবস্থা দেখে আমি তোমার উপর হেসেছিলাম। অতঃপর যারীর বললেন, আল্লাহর কসম! আপনার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক আমি পূর্বেই আপনাকে ক্ষমা করেছি।
ফতহুল বারীসহ কয়েকটি কিতাবে এ ঘটনা উল্লেখ রয়েছে যে, একদা ইমাম বুখারী কিছু পূণ্য বিক্রয় করার মনস্থির করলেন। এক লোক পাঁচ হাজার মুনাফায় তা ক্রয়ের প্রস্তাব দিলেন। ইমাম বুখারী রহ. বললেন, আমি চিন্তা করে আগামীকাল আপনাকে জানাব। অতঃপর একদল লোক এসে উক্ত পূণ্য দশ হাজার মুনাফায় তা ক্রয়ের প্রস্তাব দিলেন। ইমাম বুখারী রহ. বললেন, আমি গত রাতে তা একদল লোককে দেয়ার ইচ্ছে করেছি। অতঃপর তিনি পাঁচ হাজার মুনাফায় তা দিয়ে দিলেন। আর বললেন, পাঁচ হাজার মুদ্রার জন্য আমি আমার নিয়ত পরিবর্তন করতে পারব না।
ইমাম কিরমানী রহ. বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারীকে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ায় অনেক সম্পদ দান করেছেন। তার পিতার উত্তরাধিকারী সূত্রেও অনেক সম্পদ পেয়েছিলেন। অতঃপর তিনি তা আল্লাহর রাস্তায় দান করতেন। কখনো তিনি দুইটি অথবা তিনটি বাদাম খেয়ে পুরো দিন অতিবাহিত করে দিতেন। শাহ্ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. সিয়ারু আলামীন নুবালার বরাতে বলেন, كان قليل الاكل جدا مفردا فى الجور وقال كان يقنع كل ليوم بلوزتين او ثلاث। ইমাম বুখারী রহ. কখনো কোন বাদশা হতে উপকৃত হবার চেষ্টা করেননি। যদিও তার সুযোগ তিনি বারবার পেয়েছিলেন। ইমাম বুখারী রহ. এর শাগীরদ ইমাম বুখারী সম্পর্কে বর্ণনা করেন, যখন তিনি আদম ইবনে আইয়াসের খেদমতে হাজির হলেন। তখন খরচের জন্য তাঁর কাছে কিছুই ছিল না। এমন কি তাঁকে দুই দিন শাক-সবজি খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। তৃতীয় দিন একজন অপরিচিত ব্যক্তি এসে ইমাম বুখারীকে দিনারের থলি দিলেন। ইমাম বুখারী বলেন, তাকে তিনি কোন দিনই দেখেননি।
ইমাম বুখারী রহ. এর শাগীরদ ইমাম সাহেব সম্পর্কে বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারী বলতেন, যেদিন থেকে গীবত হারাম হওয়ার ব্যাপারে আমি জানলাম, সে দিন হতে আমি কারো গীবত করিনি। আর আমার আল্লাহ হতে এ বিশ্বাস আছে যে, তিনি এ ব্যাপারে আমার হিসাব গ্রহণ করবেন না।
একদা ইমাম বুখারী রহ. অসুস্থ হলে পরিক্ষার জন্য তার প্রস্রাব ডাক্তারকে দেখানো হলো। ডাক্তার বললেন, তিনি তরকারী খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ.কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করে বলেন যে, আমি চল্লিশ বছর যাবত তরকারি গ্রহণ করি না। এরপর ডাক্তার হতে পথ্য জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এর ঔষধই হলো তরকারি খাওয়া। অতঃপর ইমাম সাহেবকে তা খাওয়ার জন্য বলা হলে তিনি তরকারি খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। অবশেষে আহলে ইলম এবং মুহাদ্দিসদের অনুরোধে তরকারি খেতে শুরু করলেন।
ইমাম বুখারী রহ. এর ইবাদতের একাগ্রতা সম্পর্কে এ ঘটনা কয়েকটি গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। একদা তিনি যোহরের নামাজ শেষে নফল নামাজে মশগুল হলেন। নফল নামাজ শেষে তিনি তার জামা উঠিয়ে সাথীদের বললেন, দেখ তো আমার জামার নিচে কিছু আছে কি না? সাথীরা তার জামা উচিয়ে নিতেই নিচ হতে একটি ভ্রমর বের হতে দেখলেন। যা তার শরীরের সত্তর জায়গায় দংশনের চিহ্ন এঁকেছে। এতে তার শরীর স্ফীত হয়েছে। সাথীরা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কেন নামাজকে ছেড়ে দিলেন না? ইমাম বুখারী রহ. উত্তরে বললেন, আমি যে সূরা তেলাওয়াত করছিলাম, তা শেষ করার ইচ্ছা হচ্ছিল না।
ইমাম বুখারী রহ. বলেন, আমি দু'বার আমার প্রভুর কাছে দোয়া করার সাথে সাথে তা কবুল হয়। যাতে আমার ধারণা হল যে, আমার আমলের প্রতিদান কি দুনিয়াতেই পেয়ে যাচ্ছি। অতঃপর আমি দুনিয়াবী জিনিস চাওয়া থেকে বিরত থাকলাম।
একদা ইমাম বুখারী রহ. ইলম অর্জনের সূত্রধরে সমুদ্র সফরে বের হলেন। সে সফরে ইমাম বুখারী রহ. এর কাছে এক হাজার আশরাফী ছিল। সফরকালে এক ব্যক্তি ইমাম বুখারীর সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ অমায়িক আচার ব্যবহার করলেন। অতঃপর কথায় কথায় ইমাম বুখারী রহ. তার আশরাফীর ব্যাপারে তাকে বললেন। অতঃপর একদিন সকালে লোকটি হা-হুলুস্তুল শুরু করল। লোকেরা আশ্চর্য হয়ে তার কারণ জিজ্ঞাস করলে সে বলল, আমার কাছে এক হাজার আশরাফীর একটি থলি ছিল। আজ তা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। অতঃপর থলেটি অনুসন্ধান করার জন্য প্রত্যেক আরোহীকে পৃথক করা হল। ইমাম বুখারী রহ. বিষয়টি পরিষ্কার বুঝে ফেললেন এবং নিজের উপার্জিত সেই এক হাজার আশরাফীর থলি সাগরে ফেলে দিলেন। অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. এর কাছেও অনুসন্ধান হল। অবশেষে যখন কারো নিকট সে থলেটি পাওয়া গেল না, তখন জাহাজ আরোহীরা বিষয়টি নিয়ে উক্ত ব্যক্তিকে লজ্জা দিল। অতঃপর সফর শেষে যখন সে ব্যক্তি ইমাম বুখারী রহ. কে নির্জনে দেখতে পেলেন, তখন তিনি তাঁকে থলির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে ইমাম বুখারী রহ. বললেন, থলিটি আমি সাগরে ফেলে দিয়েছি। কেননা আমি আমার সমস্ত জীবন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচার প্রসারের কাজে ব্যয় করেছি। যদি আমার ধার্মিকতা, দ্বীনদারী ও নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তাহলে আমি এ চুরির অপবাদ থেকে কিভাবে মুক্তি পাব। ইমদাদুল বারী, ফজলুল বারী (মুকাদ্দামা)।
আল্লামা কিরমানী রহ. বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ তায়ালা ইমাম বুখারী রহ.কে বর্ণনাতীত ধন-সম্পদ দান করেছিলেন। তিনি পিতার উত্তরাধিকারী সূত্রে অনেক সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। তিনি তার সবটাই আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন।
টিকাঃ
৬৪. ফতহুল বারী মুকাদ্দামা (৪৭৯)
৬৫. হাদইয়ুস সারী (৪৮০ পৃষ্ঠা)
৬৬. ফতহল বারী (১/৪৮০)
৬৭. ফতহুল বারী মুকাদ্দামা (১/৪৮০)
৬৮. সিয়ারু আ'লামীন নুবালা (২/৪৩৯)
৬৯. ফতহুল বারী (১/৪৮১)
৭০. সিয়ারু আ'লামীন নুবালা (১৩/৪৩৯)
৭১. সিয়ারু আ'লামীন নুবালা (১৩/৪৩৯)
৭২. কাশফুল বারী মুকাদ্দামা (১৩২ পৃষ্ঠা)