📄 মক্কা ও মদীনা সফর এবং গ্রন্থ রচনা আরম্ভ
আঠারো বছর বয়সে ইমাম বুখারী রহ. মাতা এবং সহোদর আহমদ ইবনে ইসমাঈলের সাথে হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে পবিত্র হারামাইন উপস্থিত হন। হজ্ব পালন শেষে মাতা এবং ভাই মাতৃভূমিতে ফিরে এলেও ইমাম বুখারী রহ. ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে মদীনায় থেকে যান। আর সে সময়ে তিনি "قضايا الصحابة والتابعين" শিরোনামে একটি কিতাব রচনা করেন। অতঃপর তিনি চাঁদের আলোয় রওযায়ে আতহারের পাশে বসে প্রসিদ্ধ "التاريخ الكبير" গ্রন্থটি রচনা করেন। ইমাম বুখারী রহ. বলেন, আমি ‘তারিখে কবীর’ গ্রন্থে যতজন রাবীর নাম উল্লেখ করেছি প্রত্যেক জনের সমন্ধে কোন না কোন ঘটনা আমার জানা আছে। কিন্তু গ্রন্থটি সংক্ষিপ্ত করার উদ্দেশ্যে সে সমস্ত ঘটনাগুলি উল্লেখ করিনি।
'তারিখে কবীর' গ্রন্থটি রচনার পরেই তা নকলের ধারাবাহিকতা শুরু হয়। মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ ফিরয়াবী রহ. বর্ণনা করেন, আমি যখন 'তারিখে কবীর' গ্রন্থ নকল করি, তখন ইমাম বুখারী রহ. এর বয়স এমন ছিল যে, তাঁর দাঁড়ি পর্যন্ত বের হয়নি।
টিকাঃ
৪২. ইরশাদুস সারী (১/৩২)
📄 সহীহ বুখারীর রচনার হেতু
ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করেন, আমি স্বপ্নযোগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আগমন করতে দেখলাম। আর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে দাঁড়িয়ে গেলাম এবং হাতপাখা দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বাতাস করতে লাগলাম। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র চেহারা হতে মাছি দূর করতে থাকলাম। এ স্বপ্ন একজন স্বপ্নব্যাখ্যাকারীর নিকটে বললাম। তিনি তাঁর ব্যাখ্যায় আমাকে বললেন যে, তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অমীয়বানী (হাদীস) হতে মিথ্যা বানোয়াটকে দূরীভূত করবে। এ ঘটনা এবং স্বপ্ন সহীহ বুখারী রচনার অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
টিকাঃ
৪০. এ সম্পর্কে সামনে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। ইনশাল্লাহ (অনুবাদক)
📄 উৎকর্ষসমূহ
এ মহীয়ান, সম্মানিত, মর্যাদাবান ইমামের জীবন জন্মলগ্ন হতে মৃত্যু পর্যন্ত আশ্চর্য, অদ্ভুত, দুর্বোধ্য ঘটনাবলী দ্বারা পরিপূর্ণ। যেন এ মহান খেদমতের জন্যই তাঁকে নির্বাচিত করা হয়েছে। তাঁর এ চরম উৎকর্ষকে যদি কেরামত দ্বারা অভিব্যক্তি করা হয়, তাহলে যথার্থই বলা হবে। তাঁর উৎকর্ষগুলি নিম্নে বর্ণনা করা হল,
উৎকর্ষ এক. বাল্যকালে যে বয়সে বাচ্চারা খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সে সময় তিনি মাত্র এগার বছর বয়সে মুহাদ্দিসদের থেকে হাদীস শ্রবণ করেন।
উৎকর্ষ দুই. ইমাম বুখারী রহ. নিজে বর্ণনা করেন যে, তিনি এক হাজার মুহাদ্দিস থেকে হাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন।
উৎকর্ষ তিন. ১৮ বছর বয়সে সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ী রিদওয়ানুল্লাহি তায়ালা আজমাইনদের ফতোয়া এবং সামাধানগুলি একত্র করা শুরু করেন।
উৎকর্ষ চার. আর সে সময় তিনি প্রসিদ্ধ ইতিহাস গ্রন্থ “তারীখে কাবীর” (আট খণ্ডে রচিত) যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা মুবারকে চাঁদের আলোতে বসে রচনা করেন।
উৎকর্ষ পাঁচ. যিনি শুধু শ্রবণের মধ্যদিয়েই হাদীসকে হেফাজত করতেন। আমরা তো শ্রবণের পর লিপিবদ্ধ ব্যতিরেখে স্বরণ রাখতে পারি না। অথচ দশ বছরের বাচ্চার এ বিস্ময়কর স্বরণশক্তি সমকালীন মানুষদের জন্য আশ্চর্য্যের কারণ ছিল।
উৎকর্ষ ছয়. বাল্যকালের ঘটনা, একদা সালিম ইবনে মুজাহিদ আল্লামা বাইকান্দী রহ. এর দরবারে আসলেন, তখন তিনি তাঁকে বললেন, যদি কিছু সময় পূর্বে আগমন করতেন, তাহলে এমন বালকের সাথে সাক্ষাত হত, যিনি সত্তর হাজার হাদীস মুখস্থ করেছেন। আমি আশ্চর্য হয়ে তাঁর সন্ধানে বের হলাম এবং তাঁর সাক্ষাত পেলাম। অতঃপর আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি সত্তর হাজার হাদীস মুখস্থ করেছ? উত্তরে ইমাম বুখারী রহ. বললেন, সত্তর হাজার থেকেও বেশি হাদীস আমার হিফয আছে। এমনকি সেসব হাদীসের সাহাবী রাবী, তাবেয়ী রাবীদের জন্ম, মৃত্যু এবং তাদের আবাসস্থল সম্পর্কেও আমি বর্ণনা করতে পারব।
উৎকর্ষ সাত. কয়েকবার তাঁর বিস্ময়কর স্বরণশক্তির প্রকাশও হয়েছে। একদা তিনি বাগদাদে আগমন করলেন। বাগদাদের সমকালীন মুহাদ্দীসরা জানতে পারলেন, একজন ব্যক্তি লক্ষ হাদীসের হাফেয বলে দাবী করছেন। অতঃপর আলোচনার জন্য একটি বৈঠক প্রস্তুত করা হল। সে বৈঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হল যে, ইমাম বুখারী রহ. কে পরীক্ষা করা হবে। এছাড়াও দশজন মুহাদ্দিস হাদীসের সনদ এবং মতন উল্টা-পাল্টা করে ইমাম সাহেবের সামনে পেশ করবেন বলেও সিদ্ধান্ত গৃহীত হল। অতঃপর পরীক্ষা গ্রহণের মজলিস শুরু হল, এক মুহাদ্দীস ইমাম বুখারী রহ.এর সামনে একটি হাদীসের সনদ ও মতন উল্টো করে সাজিয়ে পাঠ করলেন।
অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. এ মতন সম্পর্কে বললে, لا اعرفه অর্থাৎ এ হাদীস এভাবে আমার কাছে পরিচিত নয়। এভাবে দশটি হাদীসকে পেশ করা হল এবং প্রত্যেক হাদীসের পর ইমাম বুখারী রহ. لا اعرفه অর্থাৎ এ হাদীসগুলো এ মতন ও সনদে আমার কাছে পরিচিত নয় বলেন। অতঃপর দ্বিতীয় ব্যক্তি দাঁড়িয়ে প্রথম ব্যক্তির মতোই দশটি হাদীসকে পরিবর্তন করে পাঠ করলেন। এভাবে দশজন একশতটি হাদীস পেশ করলেন এবং ইমাম বুখারী প্রত্যেকটি হাদীস শ্রবণ করে ঐ একই উত্তর দিতে লাগলেন।
অতঃপর ইমাম বুখারী রহ. প্রথম হাদীস ভুল বর্ণনাকারীর দিকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন, আপনি হাদীসটি এভাবে পাঠ করেছেন। অথচ হাদীসটির বর্ণনা এমন এবং হাদীসটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলেন। অতঃপর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় এরপর চতুর্থ এভাবে দশজন মুহাদ্দীসের একশত হাদীসের পর্যালোচনা করলেন। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ ও মুহাদ্দীসগণ তাঁর উপস্থিত স্বরণশক্তি এবং বিস্ময়কর মেধা দেখে তাঁর মেধার স্বীকৃতি প্রদানকারী ও সমর্থনকারী হয়ে গেলেন।
উৎকর্ষ আট. মুহাম্মদ ইবনে হামদাওয়াই বলেন, আমি ইমাম বুখারীকে বলতে শুনেছি যে, আমার এক লক্ষ হাদীসে সহীহ এবং দুই লক্ষ গায়রে সহীহ মুখস্থ আছে।
উৎকর্ষ নয়. মুহাম্মদ ইবনে হাতিম ও নজম ইবনে ফুযাইল স্বপ্নে দেখেন যে, জনাবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রওজা মোবারক হতে বের হয়ে চলতে লাগলেন এবং তারপরে ইমাম বুখারী রহ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদচিহ্নে পা রেখে রেখে হাটতে লাগলেন।
উৎকর্ষ দশ. সহীহ বুখারীর রচনা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসের মহত্ত্ব ও বুখারীর ফযিলত হল, ইমাম বুখারী রহ. ছয় লক্ষ সংরক্ষিত হাদীস ভান্ডার হতে সহীহ হাদীসের নির্বাচন এভাবে করেছেন যে, প্রত্যেকটি হাদীস নিজের মাপকাঠি দ্বারা পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর স্বীয় গ্রন্থে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর আদব ও মর্যাদার পরিচিতি পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করা। যার কল্পনা ইতিপূর্বে কারো ধারণায় আসা অসম্ভব ছিল।
ইমাম বুখারী নিজেই বর্ণনা করেন, مَا وَضعت في كتاب الصَّحِيح حَدِيثًا إِلا اغْتَسَلتُ قبل ذَلِكَ وَصليتُ رَكْعَتَيْنِ আমি স্বীয় সহীহ গ্রন্থে যখন কোন হাদীস লিপিবদ্ধ করতাম, তখন তার পূর্বে গোসল করতাম এবং দু'রাকাত নামাজ আদায় করতাম।
ইমাম বুখারী রহ. আরো বলেন, مَا أَدْخَلْت فِيهِ حَدِيثًا حَتَّى استَخَرْتُ الله تَعَالَى وَصَلَّيْتُ رَكْعَتَيْنِ وتيقنت صحته ইসতিখারার পর যখন হাদীসের শুদ্ধতার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন হয়, তখনই তা সহীহ বুখারীতে বর্ণনা করি। আর ইমাম বুখারী রহ. এ আমল ১৬ বছর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে করেন। কেননা তাঁর এ কিতাব রচনা করতে ১৬ বছর লাগে। কিতাব রচনার কাজ পরিসমাপ্তি হলে তা আলী ইবনুল মাদীনী, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন প্রমূখ (যাঁরা সমসাময়িক হাদীস বিশারদ এবং ইমাম ছিলেন) তাঁদের খেদমতে পেশ করলেন। তাঁরা সবাই তাঁর এ অভিনব রচনায় আনন্দ প্রকাশ করলেন। শুদ্ধতা এবং সনদের দিক থেকে গ্রন্থটি এ মর্যাদা অর্জন করল যে, أصح الكتب بعد كتاب الله الْعَزِيز (কুরআনের পর সবচেয়ে আস্থাভাজন গ্রন্থ) বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এ অভিব্যক্তির প্রতি উলামায়ে সলফ এবং খলফ ঐক্যমত ব্যক্ত করেন। আবু যায়িদ মারওয়াযী রহ.কে রুকন এবং মাকামে ইব্রাহীমের মধ্যে স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ করেন যে, আর কতদিন পর্যন্ত ইমাম শাফেয়ীর কিতাব দরস দিতে থাকবে? আমার কিতাব অধ্যয়ন কর এবং দরস দাও। তিনি আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার কিতাব কোনটি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার কিতাব جامع مُحَمَّد بن إِسْمَاعِيل (মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈলের জামে)।
উৎকর্ষ এগার, আল্লামা সুবকী আশ-শাফেয়ী বর্ণনা করেন, وأما الجامع الصَّحِيحِ وَكَونه ملجأ للمعضلات ومجربا لقضاء الْحَوَائِجِ فَأَمر مَشْهُور বুখারী শরীফ মুশকিল সমাধানে এবং প্রয়োজন পূরুণার্থে উপকারী উপকরণ। অতঃপর সেটি প্রসিদ্ধ।
উৎকর্ষ বার. ইমাম বুখারী রহ. এর হাদীস প্রেম ছাড়াও কোরআনের প্রতি আসক্তি ও আগ্রহ ছিল। রমযান শরীফে তাঁর সাথী এবং ছাত্ররা একত্রিত হত। অতঃপর তিনি তারাবীহের নামাযে প্রত্যেক রাকাতে বিশ বিশটি করে আয়াত তেলাওয়াত করতেন। আর সাহরীতে কোরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করতেন এবং প্রত্যেক তিন দিন পর পর একটি খতম শেষ করতেন। আর সেই সাথে প্রতিদিন সকাল হতে ইফতার পর্যন্ত এক খতম পূর্ণ করতেন।
উৎকর্ষ তের. একবার ইমাম মুসলিম রহ. ইমাম বুখারী রহ. এর নিকটে আগমন করলেন। অতঃপর তিনি ইমাম বুখারী রহ.এর পবিত্র পেশানীতে চুম্বন করলেন এবং এ শব্দাবলী দ্বারা তাঁর মর্যাদা ও মহত্বের অনুমোদন করলেন, سَمِعت أَبَا حَامِد أَحمد بن حمدون يَقُول سَمِعت مسلم بن الحجاج وَجَاء إِلَى مُحَمَّد بن إِسْمَاعِيل البখارى فقبل مَا بَين عَيْنَيْهِ وَقَالَ دعنى حَتَّى أقبل رجليك يا أستاذ الأستاذين ومسند المحدثিন وَيَا طبيب الحديث في علله পেশানীতে চুম্বন করার পর বলতে লাগলেন, আমাকে আপনার পবিত্র পা দু'টি চুম্বনের সুযোগ দান করুন, হে শিক্ষককূল শিরমণি! মুহাদ্দীসগণের সম্রাট এবং হাদীসের ব্যাধির অভিজ্ঞ চিকিৎসক।
উৎকর্ষ চৌদ্দ. ইমাম বুখারী রহ. এর মৃত্যুর ঘটনাটিও অনেক মাহাত্ম্য ও অলৌকিকপূর্ণ ছিল। ইমাম বুখারী রহ. এর যখন বুখারার প্রশাসকের সাথে মতবিরোধ হল। তখন তিনি সমরকান্দে তাশরীফ নিলেন এবং খরতঙ্গ নামক গ্রামে নিকটাত্মীয়দের কাছে অবস্থান করলেন। আব্দুল কুদ্দুস সমরকান্দী বর্ণনা করেন যে, এক রাতে তাহাজ্জুতের নামাজ আদায়ের পর বিনয় ও কাতরতার সাথে আল্লাহ নিকট প্রার্থনা করেন যে, হে প্রভু তোমার প্রসস্ত জমিন সংকীর্ণ হয়ে গেছে। অতঃপর তুমি আমাকে তোমার সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ দাও। অতঃপর এ দোয়ার এক মাস পরে ইমাম বুখারী রহ. ইহলোক ত্যাগ করেন। অতঃপর তাঁকে খরতঙ্গেই সমাধিস্থ করা হয়।
আবদুল ওয়াহিদ ইবনে আদম আত তাওয়াবিসী রহ. বর্ণনা করেন যে, আমি এক রাতে স্বপ্নে জনাব সায়্যেদুল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এমন অবস্থায় সাক্ষাত লাভ করলাম যে, তিনি সাহাবী রাযিআল্লাহু আনহুমদের নিয়ে অপেক্ষা করছেন। অতঃপর আমি সালাম করলাম তিনি জবাব দিলেন। এরপর জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! কার জন্য অপেক্ষা করছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল এর জন্য অপেক্ষা করছি। এ ঘটনার কিছুদিন পর এ মর্মে সংবাদ আসল যে, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী কিছুদিন পূর্বে ইন্তিকাল করেছেন। অতঃপর আমি হিসেব করে দেখলাম যে, সেই স্বপ্নের রাতেই তিনি ইন্তিকাল করেছেন।
উৎকর্ষ পনের. আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বর্ণনা করেন, মৃত্যুর পূর্বে ইমাম বুখারী রহ. দীর্ঘ সময় ধরে দোয়ায় রত ছিলেন। অতঃপর তিনি শয়ন করলে তার পবিত্র আত্মা বিদায় নেন। মৃত্যুর পর তাঁর শরীর হতে অনেক ঘাম বের হয়েছিল। তিনি অসীয়ত করেছিলেন যে, যেন তিন কাপড় দ্বারা তাঁকে কাফন দেয়া হয়। অতঃপর যখন তাঁকে কাফন দেয়ার পর জানাজা নামাজ শেষে কবরে রাখা হল, তখন তাঁর কবর থেকে মেশকের চেয়ে উত্তম সুঘ্রাণ বের হতে থাকল। আর তা দীর্ঘ সময় স্থায়ী হল। লোকেরা তাঁর কবর হতে মাটি সংগ্রহ করে, তা হতে তাবাররুক হাসিল করতে লাগল। এমনকি মানুষের উদ্দীপনা দেখে জাল/নেট দ্বারা কবরকে সংরক্ষণ করা হল। ইবনে হাজার আসকালনী রহ. ভাষায়, فلما ادرحناه فى اكفانه وصلينا عليه وضعناه فى حضرقه فاح من تراب قبره رائحة طيبة لالمسك ও دامت اياما وجعل الناس يختلفون الى القبر اياما ياخذون من ترابه الى ان جعلنا عليه خشبا مشبكا মহান আল্লাহ তায়ালা এ সম্মানিত মহান বুযুর্গের খেদমত অর্থাৎ হাদীস সংরক্ষণ এবং নাম কিয়ামত পর্যন্ত আলোকিত রাখবেন।
টিকাঃ
৪৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফায (২/৫৫৫)
৪৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফায (২/৫৫৫)
৪৬. তাবাকাতুশ শাফেয়ী (২/৫)
৪৭. ফতহুল বারী মুকাদ্দামা (১/৪৮৬)
৪৮. ফতহুল বারী মুকাদ্দামা (১/৪৮৭)
৪৯. ফতহুল বারী মুকাদ্দাম (১/৪৮৯)
৫০. ফতহুল বারী (১/৪৮৯)
৫১. ফতহুল বারী (১/৪৮৯)
৫২. ফতহুল বারী (১/৪৮৯)
৫৩. তাবাকাতুশ শাফেয়ী (২/২৩৪)
৫৪. তাবাকাত (২/৯)
৫৫. তাবাকাতুশ শাফেয়ী (২/২২৪)
৫৬. ঘটনাটি ইবনে আসাকির তারীখে দামেশক ৫২/৬৮, খতিবে বাগদাদী তারিখে বাগদাদ ১৩/১০৩, ইমাম নববী তাহযিবুল আসমা ওয়াল লোগাত ১/৭০, ইবনে কাসীর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৪/৫৩১ গ্রন্থে উল্লেখ করেন। তবে ইমাম বুখারী রহ. পদচুম্বনের অনুমতি দিয়েছিলেন কি না সে বিষয়ে কোন মতামত পাওয়া যায় না। এছাড়াও দেখা-সাক্ষাত এবং বড়দের সম্মান করার সুন্নতি পদ্ধতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত। কদমবুচি করার দ্বারা শরয়ী দৃষ্টিকোন থেকে দু'টি খারাবী লাজেম আসে। ১. গাইরুল্লাহের সামনে মাথাকে অবনত করা হয়। যা হারাম। ২. বিধর্মী রুসম পালন করা হয়। বিধর্মীদের আদর্শ অনুসরণ করাও হারাম। হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের লক্ষ্য করে বললেন, হে বৎস! তুমি গৃহে পরিবার পরিজনের কক্ষে প্রবেশকালে সালাম করবে। এতে তোমার এবং তোমার গৃহের সকলের জন্য কল্যাণ হবে। -সুনানে তিরমিযি (৩৮৭২)। হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত যায়েদ বিন হারেসা রা. মদীনায় আসলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ঘরে ছিলেন। হযরত যায়েদ রা. এসে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরজায় করা নাড়ালেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেরিয়ে গেলেন খালি গায়েই। আল্লাহর কসম আমি এর আগে কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খালি গায়ে দেখিনি। তারপর তার সাথে মুআনাকা করলেন এবং চুমু খেলেন। -সুনানে তিরমিযি (২৭৩২)। হযরত বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন দু'জন মুসলিমের মাঝে পরস্পর সাক্ষাৎ হয়, তারপর তারা পরস্পর মুসাফাহা করে, তাহলে তারা পরস্পর হতে পৃথক হওয়ার আগেই তাদের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। সুনানে তিরমিযি (২৭২৭)। হযরত ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। -সুনানে আবু দাউদ (৪০৩১)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের ছাড়া অন্য কোন সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য রেখে চলবে, সে আমাদের দলে নয়। তোমরা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সাথে সাদৃশ্য স্থাপন করো না। ইয়াহুদীরা সালাম করে আঙ্গুলের ইশারা দ্বারা আর খৃস্টানরা সালাম করে হাতের তালুর ইশারা দ্বারা। সুনানে তিরমিযি (২৬৯৫)। হযরত আনাস বিন মালিক রা. বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কারো যদি তার ভাই বা তার বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ হয়, তবে সে কি তার অভিবাদন এর জন্য মাথা ঝুকাবে? তিনি বললেন, না। লোকটি বলল, তাহলে তাকে লেপ্টে ধরবে এবং চুমু খাবে? তিনি বললেন, না। তাহলে কি তার হাত ধরবে এবং মুসাফাহা করবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সুনানে তিরমিযি (২৭২৮)। একদল আলিম বলেছেন, সম্মানার্থে পদচুম্বন ও কদমবুচি জায়েয আছে। কিন্তু তারা সাথে সাথে শর্তারোপ করে দিয়েছেন যে, যেন চুমু খেতে গিয়ে রুকুর সুরত বা সিজদার সুরত না হয়ে যায়। যদি রুকু বা সেজদার সুরত হয়ে যায়, তাহলে তা জায়েয হবে না। -আল মুজতাবা (৪/২০৫০), আল মুহীতুল বুরহানী (৮/১১৮), ফাতাওয়া আলমগীরী (৫/৩৬৯)। ফকিহ্ ও মুহাক্কিকীনদের মতে, তা জায়েয হবে না। কারণ বর্তমান প্রচলিত কদমবুচিতে রুকু বা সিজদার সুরত হওয়া স্পষ্ট। এছাড়াও এটি বিধর্মীদের প্রতীক। সুতরাং আমরা দ্বিতীয় মতকে প্রাধান্য দিয়ে নাজায়েয বলি।
৫৭. তাবাকাতুশ শাফেয়ী (২/২৩২)
📄 ইমাম বুখারী রহ. এর কেরামত
ইমাম বুখারী রহ. এর কাতেব আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আবী হাতেম রহ. বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারী রহ. মেহমানদের জন্য একটি গাভী যবেহ করলেন। অতঃপর যখন রান্নার কাজ শেষ হল এবং মেহমানদের খানার জন্য ডাকা হল, তখন দেখা গেল হিসেবের চেয়ে অতিরিক্ত মেহমান উপস্থিত হয়েছে, যা ধারণা ছিল না। আমি মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ আল ফিরাবরী হতে তিন দিরহাম দিয়ে রুটি নিয়ে এসেছিলাম। আর সে সময় এক দিরহাম দিয়ে পাঁচ মন রুটি পাওয়া যেত। অতঃপর এ রুটিগুলি মেহমানদের সামনে বিছিয়ে দিলাম এবং সবাই তৃপ্তি সহকারে খানা খেলেন। অবশেষে দেখা গেল অনেক রুটি অবশিষ্ট আছে।