📄 ইলম অর্জন
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. লিখেন, ইমাম বুখারী রহ. বলেন যে, বাল্যকালে মকতবে পড়াশুনার সময়ই আমার হাদীস মুখস্থ করার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তখন আমার বয়স মাত্র দশ বছর। মকতবের অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডি পেরিয়ে মুহাদ্দিস দাখেলী রহ. সহ অন্যান্য মুহাদ্দিসীনদের হাদীসের দরসে উপস্থিত হওয়া শুরু করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বাল্যকাল থেকেই ইমাম বুখারী রহ. এর সীমাহীন যোগ্যতা দান করে ছিলেন। ইলম অর্জনের শুরুতেই তাঁর সম্মানিতা মাতা ইমাম বুখারী রহ. কে কোরআন হিফযের উদ্দেশ্যে মকতবে প্রেরণ করেন।
ইমাম বুখারী বলেন, وَقَالَ الْفربري سَمِعت مُحَمَّد بن أبي حَاتِم وراق البُخَارِي يَقُول سَمِعت البُخَارِي يَقُول ألهمت حفظ الحديث وأنا في الكتاب। মহান আল্লাহ আমার অন্তরে হাদীস মুখস্থের আগ্রহ সৃষ্টি করে দিলেন, যখন আমি কেবল মকতবে পড়ছিলাম।
যেহেতু ইমাম বুখারী রহ. এর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস মোবারক মুখস্থ করার আগ্রহ ও উদ্দীপনা ছিল, সেহেতু তিনি বুখারার মুহাদ্দিসীনদের দরসে উপস্থিত হতে লাগলেন।
প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইমাম দাখেলী রহ. এর বরকতপূর্ণ দরসে সে সময়ের বড় বড় মুহাদ্দীসগণ শরিক হয়ে হাদীস শ্রবণ করতেন, ইমাম বুখারী রহ.ও বাল্য বয়সে সে দরসে ধারাবাহিক ভাবে শরীক হতে লাগলেন। আর সে সময় তাঁর বয়স কম হওয়ার কারণে দরসে জায়গা না পেয়ে তিনি দরসের কোনায় বসে বসে হাদীস শ্রবণ করতেন। অল্প অল্প করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাও ইমাম বুখারী রহ. কে হাদীসের সনদের গভীর জ্ঞান দান করতে থাকলেন।
ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করেন যে, একদিন আমার উস্তাদ ইমাম দাখেলী রহ. একটি হাদীসের সনদ বর্ণনা করছিলেন, ইমাম বুখারী রহ. দূরে বসে আরয করলেন, أبو الزبير لم يرو عن إِبْرَاهِيم। শায়েখ! আবু যুবাইর ইবরাহীম থেকে কোন রেওয়ায়েত করেননি। ইমাম দাখেলী রাহ. ইমাম বুখারী রহ.কে নতুন শিখছেন মনে করে ধমক দিলেন। ইমাম বুখারী রহ. আদব এবং গম্ভীর্যের সাথে আরয করলেন, ارجع إلى الأصل إن كان عندك। হযরত! যদি আপনার নিকট তার মূল পাণ্ডুলিপি থাকে, তাহলে সেখানে লক্ষ্য করুন। ইমাম দাখেলী রহ. ঘরে প্রবেশ করে মূল পাণ্ডুলিপি দেখলেন এবং ইমাম বুখারী রহ. এর কথাকেই সত্য বলে জানতে পারলেন। অতঃপর ফিরে এসে বললেন, হে স্নেহের তালিবে ইলম! এবার তুমি সঠিক সনদ বর্ণনা কর। ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করলেন, هو الزبير وهو بن عدي عن إبراهيم। মুহাদ্দিস দাখেলী রহ. কলম নিয়ে শুদ্ধ করতে করতে বললেন, (صدقت) তুমি সত্য বলেছ।
কোন এক ব্যক্তি ইমাম বুখারী রহ. কে জিজ্ঞাসা করলেন, উক্ত ঘটনার সময় আপনার বয়স কত ছিল? ইমাম বুখারী উত্তরে বললেন, এগার বছর। ৩২
এ বয়সেই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা ইমাম বুখারী রহ. কে হাদীস এবং তার সনদ সম্পর্কে এমন বিচক্ষণতা ও স্মৃতি শক্তির প্রখরতা দান করেছেন যে, স্বীয় উস্তাদের একটি ছোট ভুলের উপর তাঁকে তিনি সতর্ক করেছেন এবং সঠিকটি বর্ণনা করেছেন।
আল্লামা বাইকান্দী রহ. যিনি ইমাম বুখারী রহ. এর সমকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস এবং যামানার ইমাম ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন, যখন মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আমার দরসে আসত। তখন আমি দিশেহারা হয়ে হাদীস বর্ণনা করতে ভয় পেতাম যে, আমার কোথাও কোন ভুল হয় কি না। ৩৩
একদা আল্লামা বাইকান্দী রহ. ইমাম বুখারী রহ. কে বললেন, তুমি আমার গ্রন্থাবলী সম্পাদনা কর এবং যে স্থানে ভুল পাও তা সংশোধন কর। তখন কোন এক ব্যক্তি আশ্চর্য হয়ে বললেন, কে এ ছেলে? অর্থাৎ তার প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল, আল্লামা বাইকান্দী রহ. এর মত ব্যক্তির গ্রন্থ সংশোধন করতে পারেন এমন ব্যক্তি কে? আল্লামা বাইকান্দী রহ. বললেন, فَقَالَ هَذَا الَّذِي لَيْسَ مثله। এ ছেলে এমন, যার কোন দৃষ্টান্ত নেই। ৩৪
একদা সালিম ইবনে মুজাহিদ আল্লামা বাইকান্দী রহ. এর দরবারে আসলেন, তখন তিনি তাঁকে বললেন, যদি কিছু সময় পূর্বে আগমন করতেন, তাহলে এমন এক বালকের সাথে সাক্ষাত হত, যিনি সত্তর হাজার হাদীস মুখস্থ করেছেন। ৩৫
আল্লামা কাস্তালানী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. এর বাল্যকালেই সত্তর হাজার হাদীস মুখস্থ ছিল। ৩৬
টিকাঃ
৩২ হাদইয়ুস সারী (২২৯ পৃষ্ঠা)
৩৩ হাদইয়ুস সারী (৬৭৫ পৃষ্ঠা)
৩৪ ফতহুল বারী (১/৪৮৩)
৩৫ হাদইয়ুস সারী (১৭৫ পৃষ্ঠা)
৩৬ মুকাদ্দামা শরহে কাস্তালানী (৩৩ পৃষ্ঠা)
📄 সফরসমূহ
ইমাম বুখারী রহ. ইলম অর্জনের লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে সফর করেছেন। যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা এখানে তুলে ধরছি।
আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আবী হাতেম ওয়াররাকের বর্ণনা মতে ইমাম বুখারী রহ. প্রথম সফর করেন ২১০ হিজরীতে। আর হাদীস শ্রবণ শুরু করেন, ২০৪ অথবা ২০৫ হিজরী থেকে। অল্প বয়সে ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় মাতৃভূমিতে যে কৃতিত্ব ও অনুকম্পা অর্জন করেছেন, তা বিস্ময়ের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
২১০ হিজরীতে ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় মাতা এবং ভ্রাতার সাথে মক্কা মুয়াজ্জমায় সফর করেন। সে সফরে বড় সহোদর আহমদ ইবনে ইসমাঈলও সাথে ছিলেন। স্বীয় মাতা এবং সহোদর হজ্ব পালন শেষে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন এবং ইমাম বুখারী রহ. মক্কা মুকারমায় থেকে যান। হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালবাসা ও অন্যান্য দ্বীনি ইলম অর্জনের আকাঙ্খা মাতা ও সহোদরের বিচ্ছেদ তাঁকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করেনি। অতঃপর তিনি ইলম অর্জনের লক্ষ্যে মক্কা মুকারমার শায়েখদের দরসে হাজির হওয়া আরম্ভ করলেন।৩৭
সে সময়ে মক্কা মুকাররমায় যেসব শায়খদের শিক্ষাকেন্দ্র স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও মানব সৃষ্টির কেন্দ্রস্থল ছিল এবং যাঁদেরকে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান করা হত, তাঁর মধ্যে (১) ইমাম আবুল ওয়ালিদ আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আযরাকী (মৃত্যুঃ ২২৩ হিজরী)। (২) আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে আবদির রহমান (মৃত্যুঃ ২১৩ হিজরী)। (৩) আবু বকর আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর আল হুমায়দী (মৃত্যুঃ ২১৯ হিজরী) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন। ইমাম বুখারী রহ. মক্কা মুকারমার পর ২১২ হিজরী সনে মদীনা মুনাওয়ারাহ সফর করেন। সে সময় মদীনা মুনাওয়ারাহ ইলমে নববীর প্রাণকেন্দ্র ছিল। আর এ কারণেই মদীনায় বহু লোকের আনাগোনা হত।
সে সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শহর মদীনায় যাঁরা ইলমে নববীর আলো ছড়াচ্ছিল তাঁদের মধ্যে (১) ইব্রাহীম ইবনে মানযার ইবনে মুগীরাহ (মৃত্যুঃ ২৩৬হিজরী) (২) ইব্রাহীম ইবনে হামজা (৩) আবদুল আযিয ইবনে আবদুল্লাহ ছিলেন উল্লেখযোগ্য।
হেজাজে অবস্থানকালে তিনি মক্কা ও মদীনা ছাড়াও আরো অন্যান্য শহরে গিয়ে শায়েখদের কাছ থেকে ইলমে হাদীসের জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেন।
টিকাঃ
৩৭ তারিখে বাগদাদ (২/৭)
📄 বসরা শহরের ঘটনা
হেজাজ শহরে ছয় বছর অতিক্রম করার পর তিনি বসরায় সফর করার ইচ্ছা করলেন। সে সময় বসরা ইলম, আদব এবং হাদীস প্রচারের অন্যতম শহর ছিল। ইমাম বুখারী রহ. কুফা শহরে পৌঁছে ইমাম আবু আসেম আন নবীল, সাফওয়ান ইবনে ঈসা, মুহাম্মদ ইবনে আরআর। আবুল ওয়ালিদ তিয়াসী, মুহাম্মদ ইবনে সিনান এবং তাঁদের সমকালীন উলামা থেকে উপকার হাসিল করেন।
যেহেতু ইমাম বুখারী রহ. কয়েকবার বসরায় সফর করেছেন। সুতরাং এ ঘটনাটি কোন সফরকালে ঘটেছে, তা উল্লেখ করা সম্ভব নয়। ইমাম বুখারী রহ. এর সাথী হাশেদ ইবনে ইসমাঈল (মৃতঃ ২৬১ হিজরী) বর্ণনা করেন, ইলম অর্জনের সময়কালীন একদা ইমাম বুখারী রহ. বসরার মাশায়েখদের নিকট আগমন করলেন। ধারাবাহিকভাবে ষোল দিন তিনি হাদীস শ্রবণ করলেন। অথচ কোন বিষয়ই তিনি লিপিবদ্ধ করে রাখলেন না। ইমাম সাহেবের সাথীরা বিষয়টি প্রশ্নের উপযোগী মনে করে ইমাম বুখারীকে উক্ত বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে ইমাম সাহেব চুপ করে থাকলেন।
অতঃপর সাথীরা যখন জোর তাগিদ দিতে লাগলেন, তখন তিনি বললেন, আপনাদের লিখিত হাদীসগুলো নিয়ে আসুন। সাথীরা যখন তাদের সংরক্ষিত হাদীসগুলো নিয়ে আসলেন। তখন ইমাম বুখারী রহ. তাঁর হাদীস ভাণ্ডার (হিফয) হতে পনের হাজার (১৫০০০) হাদীস মুখস্থ বর্ণনা করে শুনালেন। উপস্থিত মজলিস ইমাম সাহেবের স্মৃতিশক্তি ও উপস্থাপনা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন।
হাশিদ ইবনে ইসমাঈল রহ. আরো বর্ণনা করেন যে, এ ঘটনার পর ইমাম সাহেবের সহপাঠিদের অবস্থা এরূপ ছিল যে, جعلنا نحكم كتبنا من حفظه। আমরা নিজেদের লিখাগুলি ইমাম বুখারীর স্মৃতি (হিফয) থেকে শুদ্ধ করে নিতাম। ৩৮
এ ঘটনা থেকে ইমাম বুখারী রহ. এর স্মরণশক্তির প্রখরতা অনুমান করা যায়। ইলমে হাদীসের এ মহান খিদমত তাঁর স্মরণশক্তির খায়ের ও বরকত থেকেই। এছাড়াও কখনো তিনি বসরার হাদীসগুলি কুফা, শাম, মিশর ও অন্যান্য সফর থেকে ফিরে এসে লিপিবদ্ধ করতেন।
টিকাঃ
৩৮ ফতহুল বারী (১/৪৭৮)
📄 কুফা সফর
পরবর্তীতে তিনি কুফায় কয়েকবার সফর করেন। সেখানে তিনি যাঁদের রেওয়ায়েত অনুসন্ধানের পর নির্ভরযোগ্যতা পেয়েছেন, তাঁদের রেওয়ায়েতই কেবল গ্রহণ করেছেন। ইমাম নববীর বর্ণনা মতে তাঁদের নাম হল, (১) আবদুল্লাহ্ ইবনে মূসা (২) আবু নাঈম (৩) আহমদ ইবনে ইয়াকুব (৪) ইসমাঈল ইবনে আবান (৫) আল হাসান ইবনে রা'বী (৬) খালিদ ইবনে মাখলাদ (৭) সাঈদ ইবনে হাফস (৮) ত্বালাক ইবনে গান্নাম (৯) ওমর ইবনে হাফস (১০) উরওয়াহ (১১) কুবিসাহ ইবনে উকবা (১২) আবু গাসসান। কুফায় এ সমস্ত মাশায়েখ থেকে তিনি ইস্তেফাদা লাভ করেন।