📄 জন্মগ্রহণ
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, أبو عبد الله مُحَمَّد بن إِسْمَاعِيل بن إِبْرَاهِيم بن المغيرة بن بردزبه الجعفي ولد يَوْم الْجُمُعَة بعد الصَّلَاة لثلاث عشرة لَيْلَة خلت من شوال سنة أربع وَتِسْعِين وَمِائَة ببخارى। আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইব্রাহীম ইবনে মুগিরাহ ইবনে বারদিযবাহ আল-জু'ফী ১৯৪ হিজরীর ১৩ই শাওয়াল মোতাবেক পবিত্র জুমার দিনে জুমার নামাযের পর বুখারা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯
শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া মাদানী (মৃত্যুঃ ১৪০৬ হিজরী) রহ. বর্ণনা করেন, قال شيখ مشائخنا في مقدمة البخارى اتفقوا على انه ولد بعد صلاة الجمعة لثلاث عشرة خلت من شوال ١٩٤هـ। শায়খুল মাশায়েখ বুখারীর মুকাদ্দামার মধ্যে এ ব্যাপারে ঐক্যমত উল্লেখ করেন যে, ইমাম বুখারী রহ. ১৯৪ হিজরীর শাওয়াল মাস মোতাবেক জুমার দিনে জুমার নামাজের পর জন্মগ্রহণ করেন।২০
قال النووي: "اتفق العلماء على أنه ولد بعد صلاة الجمعة، لثلاث عشرة ليلة خلت من شوال، سنة أربع وتسعين ومائة। ইমাম নববী রহ. শরহে বুখারীর মধ্যে এ মতের উপর উলামাদের ঐক্যমত নকল করেন। ২১
আল্লামা কাস্তালানী রহ. আল্লামা ইবনে কাসীর নাইলুল আমানীর গ্রন্থকার সবাই একমত্য যে, ইমাম বুখারী রহ. ১৯৪ হিজরীর ১৩ ই শাওয়াল মোতাবেক শুক্রবার দিনে জুমার নামাজের পর জন্ম লাভ করেন।২২
এছাড়া আবু ইয়ালী আল খালীলী কিতাবুল ইরশাদের মধ্যে ১২ ই শাওয়াল ১৯৪ হিজরীর কথা উল্লেখ করেছেন। ২৩ শায়খ যাকারিয়া রহ. বিস্তারিত আলোচনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, فانهم اجمعوا على انه ولد بعد صلاة الجمعة لثلاث عشرة। অতঃপর জমহুর উলামা এ ব্যাপারে একমত যে, ইমাম বুখারী রহ. ১৩ তারিখ জুমার নামাযের পর জন্ম লাভ করেন। ২৪
টিকাঃ
১৯ হাদইয়ুস সারী (৬৬৯ পৃষ্ঠা)
২০ লামেউদ দারারী (২৭ পৃষ্ঠা)
২১ লামেউদ দারারী (২৭ পৃষ্ঠা)
২২ মুকাদ্দামা লামেউদ দারারী (২৮ পৃষ্ঠা)
২৩ মুকাদ্দামা লামেউদ দারারী (২৮ পৃষ্ঠা)
২৪ মুকাদ্দামা লামেউদ দারারী (২৮ পৃষ্ঠা)
📄 গঠন আকৃতি
ইমাম বুখারী রহ. ছিপছিপে, হালকা-পাতলা শরীরের অধিকারী ছিলেন। বেশি লম্বা এবং বেঁটে আকৃতির ছিলেন না। গায়ের রং বাদামী বর্ণের ছিল।
টিকাঃ
২৫ উর্দু এডিশন
২৬ তাযকিরাতুল হুফফায (১/৪০১)
📄 বাল্যকাল
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ইমাম বুখারী রহ. এর বাল্যকাল সম্পর্কে লিখেন, وَمَاتِ إِسْمَاعِيلَ وَمُحَمَّد صَغِيرٍ فَنَشَأَ فِي حجر أمه। ইমাম বুখারী রহ. যখন বাল্যকালে উপনীত হন, তখন তার পিতা ইসমাঈল রহ. ইন্তেকাল করেন। অতঃপর তিনি স্বীয় সম্মানিতা মাতার কোলেই লালিত-পালিত হন। ২৭
বাল্যকালেই ইমাম বুখারী রহ. দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। যার কারণে তাঁর সম্মানিতা মাতা মনোবেদনায় ভুগতে থাকেন এবং অনেক বিপত্তি তাঁকে সহ্য করতে হয়। তাঁর সম্মানিতা মাতা ইবাদাতকারীনী এবং খোদা প্রেমিক বান্দী ছিলেন। তিনি কাতরতা ও একনিষ্ঠতার সাথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন।
একরাতে তিনি সায়্যেদিনা হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের সাক্ষাত লাভ করেন। আর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তাঁকে এ সুসংবাদ প্রদান করেন যে, তোমার দোয়ার বরকতে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় মেহেরবানীতে তোমার প্রিয় পুত্র সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিবেন। অতঃপর সকালে তিনি যখন সন্তানকে ডাকলেন, তখন তিনি ইমাম বুখারী রহ.কে দৃষ্টি শক্তি সম্পূর্ণ দেখতে পেলেন। ২৮
আল্লামা তাজউদ্দীন সুবকী রহ. (মৃত্যুঃ ৭৭ হিজরী) বলেন, সূর্যের তাপ ও গরমের তীব্রতার কারণে ইমাম বুখারী রহ. এর ইলম অর্জনের জন্য সফরকালীন দ্বিতীয়বার দৃষ্টি চলে যাওয়ার উপক্রম হয়। অতঃপর যখন তিনি খোরাসান গেলেন কেউ একজন তাঁর চুল কেটে তদস্থলে খেতমীর (নীল রং বিশেষ এক প্রকার চুল যা ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়) প্রলেপ লাগানোর পরামর্শ দিলেন। এতে তাঁর দৃষ্টি দ্বিতীয় বার ফিরে পেলেন। ২৯
টিকাঃ
২৭ ফতহুল বারী (১/৪৭৭)
২৮ হাদইয়ুস সারী (৬৬৯ পৃষ্ঠা)
২৯ তাবাকাতুশ শাফেয়ী (২/৪)
📄 ইলম অর্জন
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. লিখেন, ইমাম বুখারী রহ. বলেন যে, বাল্যকালে মকতবে পড়াশুনার সময়ই আমার হাদীস মুখস্থ করার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তখন আমার বয়স মাত্র দশ বছর। মকতবের অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডি পেরিয়ে মুহাদ্দিস দাখেলী রহ. সহ অন্যান্য মুহাদ্দিসীনদের হাদীসের দরসে উপস্থিত হওয়া শুরু করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বাল্যকাল থেকেই ইমাম বুখারী রহ. এর সীমাহীন যোগ্যতা দান করে ছিলেন। ইলম অর্জনের শুরুতেই তাঁর সম্মানিতা মাতা ইমাম বুখারী রহ. কে কোরআন হিফযের উদ্দেশ্যে মকতবে প্রেরণ করেন।
ইমাম বুখারী বলেন, وَقَالَ الْفربري سَمِعت مُحَمَّد بن أبي حَاتِم وراق البُخَارِي يَقُول سَمِعت البُخَارِي يَقُول ألهمت حفظ الحديث وأنا في الكتاب। মহান আল্লাহ আমার অন্তরে হাদীস মুখস্থের আগ্রহ সৃষ্টি করে দিলেন, যখন আমি কেবল মকতবে পড়ছিলাম।
যেহেতু ইমাম বুখারী রহ. এর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস মোবারক মুখস্থ করার আগ্রহ ও উদ্দীপনা ছিল, সেহেতু তিনি বুখারার মুহাদ্দিসীনদের দরসে উপস্থিত হতে লাগলেন।
প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইমাম দাখেলী রহ. এর বরকতপূর্ণ দরসে সে সময়ের বড় বড় মুহাদ্দীসগণ শরিক হয়ে হাদীস শ্রবণ করতেন, ইমাম বুখারী রহ.ও বাল্য বয়সে সে দরসে ধারাবাহিক ভাবে শরীক হতে লাগলেন। আর সে সময় তাঁর বয়স কম হওয়ার কারণে দরসে জায়গা না পেয়ে তিনি দরসের কোনায় বসে বসে হাদীস শ্রবণ করতেন। অল্প অল্প করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাও ইমাম বুখারী রহ. কে হাদীসের সনদের গভীর জ্ঞান দান করতে থাকলেন।
ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করেন যে, একদিন আমার উস্তাদ ইমাম দাখেলী রহ. একটি হাদীসের সনদ বর্ণনা করছিলেন, ইমাম বুখারী রহ. দূরে বসে আরয করলেন, أبو الزبير لم يرو عن إِبْرَاهِيم। শায়েখ! আবু যুবাইর ইবরাহীম থেকে কোন রেওয়ায়েত করেননি। ইমাম দাখেলী রাহ. ইমাম বুখারী রহ.কে নতুন শিখছেন মনে করে ধমক দিলেন। ইমাম বুখারী রহ. আদব এবং গম্ভীর্যের সাথে আরয করলেন, ارجع إلى الأصل إن كان عندك। হযরত! যদি আপনার নিকট তার মূল পাণ্ডুলিপি থাকে, তাহলে সেখানে লক্ষ্য করুন। ইমাম দাখেলী রহ. ঘরে প্রবেশ করে মূল পাণ্ডুলিপি দেখলেন এবং ইমাম বুখারী রহ. এর কথাকেই সত্য বলে জানতে পারলেন। অতঃপর ফিরে এসে বললেন, হে স্নেহের তালিবে ইলম! এবার তুমি সঠিক সনদ বর্ণনা কর। ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করলেন, هو الزبير وهو بن عدي عن إبراهيم। মুহাদ্দিস দাখেলী রহ. কলম নিয়ে শুদ্ধ করতে করতে বললেন, (صدقت) তুমি সত্য বলেছ।
কোন এক ব্যক্তি ইমাম বুখারী রহ. কে জিজ্ঞাসা করলেন, উক্ত ঘটনার সময় আপনার বয়স কত ছিল? ইমাম বুখারী উত্তরে বললেন, এগার বছর। ৩২
এ বয়সেই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা ইমাম বুখারী রহ. কে হাদীস এবং তার সনদ সম্পর্কে এমন বিচক্ষণতা ও স্মৃতি শক্তির প্রখরতা দান করেছেন যে, স্বীয় উস্তাদের একটি ছোট ভুলের উপর তাঁকে তিনি সতর্ক করেছেন এবং সঠিকটি বর্ণনা করেছেন।
আল্লামা বাইকান্দী রহ. যিনি ইমাম বুখারী রহ. এর সমকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস এবং যামানার ইমাম ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন, যখন মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আমার দরসে আসত। তখন আমি দিশেহারা হয়ে হাদীস বর্ণনা করতে ভয় পেতাম যে, আমার কোথাও কোন ভুল হয় কি না। ৩৩
একদা আল্লামা বাইকান্দী রহ. ইমাম বুখারী রহ. কে বললেন, তুমি আমার গ্রন্থাবলী সম্পাদনা কর এবং যে স্থানে ভুল পাও তা সংশোধন কর। তখন কোন এক ব্যক্তি আশ্চর্য হয়ে বললেন, কে এ ছেলে? অর্থাৎ তার প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল, আল্লামা বাইকান্দী রহ. এর মত ব্যক্তির গ্রন্থ সংশোধন করতে পারেন এমন ব্যক্তি কে? আল্লামা বাইকান্দী রহ. বললেন, فَقَالَ هَذَا الَّذِي لَيْسَ مثله। এ ছেলে এমন, যার কোন দৃষ্টান্ত নেই। ৩৪
একদা সালিম ইবনে মুজাহিদ আল্লামা বাইকান্দী রহ. এর দরবারে আসলেন, তখন তিনি তাঁকে বললেন, যদি কিছু সময় পূর্বে আগমন করতেন, তাহলে এমন এক বালকের সাথে সাক্ষাত হত, যিনি সত্তর হাজার হাদীস মুখস্থ করেছেন। ৩৫
আল্লামা কাস্তালানী রহ. বলেন, ইমাম বুখারী রহ. এর বাল্যকালেই সত্তর হাজার হাদীস মুখস্থ ছিল। ৩৬
টিকাঃ
৩২ হাদইয়ুস সারী (২২৯ পৃষ্ঠা)
৩৩ হাদইয়ুস সারী (৬৭৫ পৃষ্ঠা)
৩৪ ফতহুল বারী (১/৪৮৩)
৩৫ হাদইয়ুস সারী (১৭৫ পৃষ্ঠা)
৩৬ মুকাদ্দামা শরহে কাস্তালানী (৩৩ পৃষ্ঠা)