📄 নাম ও বংশ পরিচিতি
আমিরুল মু'মিনীন ফিল হাদীস অর্থাৎ হাদীস শাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ মহামানব ইমাম বুখারী রহ. এর সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন নাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম ইবনে মুগীরাহ ইবনে বারদিযবাহ ইবনে বাযযাবাহ আল জু'ফী আল বুখারী।
আল্লামা আহমদ ইবনে আলী ইবনে হাজার আসকালানী রহ. (মৃত্যুঃ ৮৫২ হিজরী) বর্ণনা করেন, 'বারদিযবাহ' শব্দটির (باء) বায়ে মুওয়াহহিদা যবরের সাথে (১) রায়ে মুহমালা (নুক্তা মুক্ত রা) সাকিনের সাথে। (دال) দালে মুহমালা (নুক্তা মুক্ত দাল) যেরের সাথে। (زاء) যায়ে মু'জামা (নুক্তা যুক্ত যা) সাকিনের সাথে। বায়ে মুওয়াহহিদা (এক নুক্তাওয়ালা বা) যবরের সাথে। অতঃপর সর্বশেষ 'হা' (ھ) ।
প্রসিদ্ধ ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে ইমাম বুখারী রহ. এর পূর্বপুরুষদের নাম বারদিযবাহ পর্যন্তই উল্লেখ রয়েছে। তবে আল্লামা তাজউদ্দীন সুবকী রহ. 'বাযযাবাহ' এর নামও উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ বারদিযবাহের পিতা 'বাযযাবাহ' বলে উল্লেখ করেন।১
বারদিযবাহ এবং তাঁর পিতা বাযযাবাহের ব্যাপারে ইতিহাসের গ্রন্থগুলিতে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, বারদিযবাহ শব্দটি ফারসী এবং বুখারী বাসীরা চাষা-ভূষাদের বারদিযবাহ বলে সম্বোধন করতেন। এ সূত্রে বারদিযবাহ একজন কৃষক ছিলেন। ধর্মের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন, অগ্নিপূজারী। তার গোত্রের লোকেরাও অগ্নিপূজারী ছিল এবং তারা অগ্নিপূজা করতেন।২
মুগীরাহ: ইমাম বুখারী রহ. এর সম্মানিত দাদা 'মুগীরাহ' ইসলাম গ্রহণের দ্বারা মর্যাদাবান হন। আল ইয়ামান ইবনে আখনাস জু'ফী আরাবী বংশধর ছিলেন এবং জু'ফী গোত্রের সাথে তার সম্পর্ক ছিল। আর জু'ফী ইবনে সাঈদ আল আশিরাহ 'মাযহায' গোত্রের শাখা ছিলো।৩
আর ইমাম বুখারী রহ.কে একারণেই জু'ফী বলা হয়। হাদীসে বর্ণিত আছে যে, عَنْ تَمِيمِ الدَّارِيِّ، أَنَّهُ قَالَ يَا رَسُولَ اللهِ وَقَالَ يَزِيدُ: إِنَّ تَمِيمًا، قَالَ يَا رَسُولَ اللهِ مَا السُّنَّةُ فِي الرَّجُلِ يُسْلِمُ عَلَى يَدَيِ الرَّجُلِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ، قَالَ هُوَ أَوْلَى النَّاسِ بِمَحْيَاهُ وَمَمَاتِهِ। তামীম আদদারী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের হাতে ইসলাম কবুল করেছে, তার ব্যাপারে কি বিধান? তিনি বললেন, ঐ মুসলিম ব্যক্তি তার জীবন ও মরণে ঘনিষ্ঠ বন্ধু।১০
ইবরাহীম : ইমাম বুখারী রহ. এর সম্মানিত দাদা 'ইবরাহীম' সম্পর্কেও ইতিহাসে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। যেমনটা ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, وَأَمَّا وَلَدُه إِبْرَاهِيمَ بْنُ الْمُغِيرَةِ فَلَمْ نَقِفْ عَلَى شَيْءٍ مِنْ أَخْبَارِهِ মুগীরার ছেলে ইবরাহীম সম্পর্কে আমরা কিছুই জানতে পারিনি।১১
ইসমাঈল : ইমাম বুখারী রহ. এর সম্মানিত পিতা আবুল হাসান ইসমাঈল ইবনে ইব্রাহীম সিকাহ (বিশ্বস্ত রাবী) মুহাদ্দিসদের স্তরে অন্তর্ভুক্ত। যেমনটি ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. তাঁর অমর গ্রন্থ 'আস সিকাত' এর মধ্যে তাঁর আলোচনা করেছেন।১২
ইমাম বুখারী রহ. এর সম্মানিত পিতা ইব্রাহীম হযরত হাম্মাদ ইবনে যায়েদ রহ. এবং হযরত ইমাম মালেক রহ. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। এ সূত্র ধরে তিনি এ দুই মনীষীর শিষ্য ছিলেন।১৩
এছাড়াও ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. ইমাম বুখারী রহ. এর সম্মানিত পিতা ইসমাঈল রহ. কে মুহাদ্দিসীনদের চতুর্থ স্তরে উল্লেখ করেছেন।১৪ ইমাম বুখারী রহ. উল্লেখযোগ্য "আত তারীখুল কাবির" গ্রন্থে স্বীয় পিতার সম্পর্কে উল্লেখ করেন যে, তিনি হযরত হাম্মাদ ইবনে যায়েদ এবং ইমাম মালেক রহ. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর তিনি (ইমাম বুখারী রহ. এর সম্মানিত পিতা) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ. এর সাথে সাক্ষাত ও মুসাহাফা অর্থাৎ করমর্দন করেছেন।১৫
ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় পিতার সম্পর্কে উল্লেখ করেন, رأى حماد بن زيد صافح ابن المبارك بكلتا يديه، وسَمِعَ مالكًا ইসমাঈল ইবনে ইব্রাহীম হাম্মাদ ইবনে যায়েদের রহ. এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। ইবনে মোবারক রহ. এর সাথে করমর্দন করেন এবং ইমাম মালেক রহ. থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। ১৬
আল্লামা শামসুদ্দীন আয যাহাবী রহ. বর্ণনা করেন, كان أبو البخاري من العلماء الورعين ইমাম বুখারী রহ. এর সম্মানিত পিতা ওলামায়ে মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ১৭
তার পরহেজগারী ও খোদাভীতির উপমা এমন ছিল যে, মৃত্যুর পরে তিনি অনেক সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন। আর সে সম্পদের ব্যাপারে তিনি বলতেন, এ সম্পদের মধ্যে এক তিল পরিমাণ হারামের লেশ নেই।১৮ অতঃপর এ হালাল সম্পদের দ্বারাই ইমাম বুখারী রহ. লালিত পালিত হন।
টিকাঃ
বারদিযবাহ শব্দের অর্থ কৃষক। তিনি ছিলেন, অগ্নি পূজারী। পারস্য বিজয়ের সময় মুসলমানদের হাতে তিনি বন্দী হন। তাঁর পুত্র মুগীরাহ বুখারার তৎকালীন গভর্ণর আল ইয়ামান ইবনে আখনাস জু'ফী এর হতে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ কারণে তাঁকে জু'ফী বলা হয়।
১ হাদইউস সারী (৬৬৯ পৃষ্ঠা)
২ তাবাকাতুশ শাফেয়ী (২/২)
৩ হাদইউস সারী (৬৬৯ পৃষ্ঠা)
৪ উমদাতুল কারী (১/১২৪)
১০ সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং (২৯১৮)
১১ ফতহুল বারী (১/৪৭৭)
১২ আস সিকাত লি ইবনে হিব্বান (৮/৯৮)
১৩ হাদইয়ুস সারী (৬৬৯ পৃষ্ঠা)
১৪ হাদইয়ুস সারী (৬৬৯ পৃষ্ঠা)
১৫ হাদইয়ুস সারী (৬৬৯ পৃষ্ঠা)
১৬ তারীখে কাবীর (১/৩৪২)
১৭ ইরশাদুস সারী (১/৩১)
১৮ হাদইয়ুস সারী (৬৬৯ পৃষ্ঠা)
📄 জন্মগ্রহণ
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, أبو عبد الله مُحَمَّد بن إِسْمَاعِيل بن إِبْرَاهِيم بن المغيرة بن بردزبه الجعفي ولد يَوْم الْجُمُعَة بعد الصَّلَاة لثلاث عشرة لَيْلَة خلت من شوال سنة أربع وَتِسْعِين وَمِائَة ببخارى। আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইব্রাহীম ইবনে মুগিরাহ ইবনে বারদিযবাহ আল-জু'ফী ১৯৪ হিজরীর ১৩ই শাওয়াল মোতাবেক পবিত্র জুমার দিনে জুমার নামাযের পর বুখারা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯
শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া মাদানী (মৃত্যুঃ ১৪০৬ হিজরী) রহ. বর্ণনা করেন, قال شيখ مشائخنا في مقدمة البخارى اتفقوا على انه ولد بعد صلاة الجمعة لثلاث عشرة خلت من شوال ١٩٤هـ। শায়খুল মাশায়েখ বুখারীর মুকাদ্দামার মধ্যে এ ব্যাপারে ঐক্যমত উল্লেখ করেন যে, ইমাম বুখারী রহ. ১৯৪ হিজরীর শাওয়াল মাস মোতাবেক জুমার দিনে জুমার নামাজের পর জন্মগ্রহণ করেন।২০
قال النووي: "اتفق العلماء على أنه ولد بعد صلاة الجمعة، لثلاث عشرة ليلة خلت من شوال، سنة أربع وتسعين ومائة। ইমাম নববী রহ. শরহে বুখারীর মধ্যে এ মতের উপর উলামাদের ঐক্যমত নকল করেন। ২১
আল্লামা কাস্তালানী রহ. আল্লামা ইবনে কাসীর নাইলুল আমানীর গ্রন্থকার সবাই একমত্য যে, ইমাম বুখারী রহ. ১৯৪ হিজরীর ১৩ ই শাওয়াল মোতাবেক শুক্রবার দিনে জুমার নামাজের পর জন্ম লাভ করেন।২২
এছাড়া আবু ইয়ালী আল খালীলী কিতাবুল ইরশাদের মধ্যে ১২ ই শাওয়াল ১৯৪ হিজরীর কথা উল্লেখ করেছেন। ২৩ শায়খ যাকারিয়া রহ. বিস্তারিত আলোচনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, فانهم اجمعوا على انه ولد بعد صلاة الجمعة لثلاث عشرة। অতঃপর জমহুর উলামা এ ব্যাপারে একমত যে, ইমাম বুখারী রহ. ১৩ তারিখ জুমার নামাযের পর জন্ম লাভ করেন। ২৪
টিকাঃ
১৯ হাদইয়ুস সারী (৬৬৯ পৃষ্ঠা)
২০ লামেউদ দারারী (২৭ পৃষ্ঠা)
২১ লামেউদ দারারী (২৭ পৃষ্ঠা)
২২ মুকাদ্দামা লামেউদ দারারী (২৮ পৃষ্ঠা)
২৩ মুকাদ্দামা লামেউদ দারারী (২৮ পৃষ্ঠা)
২৪ মুকাদ্দামা লামেউদ দারারী (২৮ পৃষ্ঠা)
📄 গঠন আকৃতি
ইমাম বুখারী রহ. ছিপছিপে, হালকা-পাতলা শরীরের অধিকারী ছিলেন। বেশি লম্বা এবং বেঁটে আকৃতির ছিলেন না। গায়ের রং বাদামী বর্ণের ছিল।
টিকাঃ
২৫ উর্দু এডিশন
২৬ তাযকিরাতুল হুফফায (১/৪০১)
📄 বাল্যকাল
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ইমাম বুখারী রহ. এর বাল্যকাল সম্পর্কে লিখেন, وَمَاتِ إِسْمَاعِيلَ وَمُحَمَّد صَغِيرٍ فَنَشَأَ فِي حجر أمه। ইমাম বুখারী রহ. যখন বাল্যকালে উপনীত হন, তখন তার পিতা ইসমাঈল রহ. ইন্তেকাল করেন। অতঃপর তিনি স্বীয় সম্মানিতা মাতার কোলেই লালিত-পালিত হন। ২৭
বাল্যকালেই ইমাম বুখারী রহ. দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। যার কারণে তাঁর সম্মানিতা মাতা মনোবেদনায় ভুগতে থাকেন এবং অনেক বিপত্তি তাঁকে সহ্য করতে হয়। তাঁর সম্মানিতা মাতা ইবাদাতকারীনী এবং খোদা প্রেমিক বান্দী ছিলেন। তিনি কাতরতা ও একনিষ্ঠতার সাথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন।
একরাতে তিনি সায়্যেদিনা হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের সাক্ষাত লাভ করেন। আর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তাঁকে এ সুসংবাদ প্রদান করেন যে, তোমার দোয়ার বরকতে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় মেহেরবানীতে তোমার প্রিয় পুত্র সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিবেন। অতঃপর সকালে তিনি যখন সন্তানকে ডাকলেন, তখন তিনি ইমাম বুখারী রহ.কে দৃষ্টি শক্তি সম্পূর্ণ দেখতে পেলেন। ২৮
আল্লামা তাজউদ্দীন সুবকী রহ. (মৃত্যুঃ ৭৭ হিজরী) বলেন, সূর্যের তাপ ও গরমের তীব্রতার কারণে ইমাম বুখারী রহ. এর ইলম অর্জনের জন্য সফরকালীন দ্বিতীয়বার দৃষ্টি চলে যাওয়ার উপক্রম হয়। অতঃপর যখন তিনি খোরাসান গেলেন কেউ একজন তাঁর চুল কেটে তদস্থলে খেতমীর (নীল রং বিশেষ এক প্রকার চুল যা ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়) প্রলেপ লাগানোর পরামর্শ দিলেন। এতে তাঁর দৃষ্টি দ্বিতীয় বার ফিরে পেলেন। ২৯
টিকাঃ
২৭ ফতহুল বারী (১/৪৭৭)
২৮ হাদইয়ুস সারী (৬৬৯ পৃষ্ঠা)
২৯ তাবাকাতুশ শাফেয়ী (২/৪)