📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 বুখারা শহরের ভৌগলিক বিবরণ

📄 বুখারা শহরের ভৌগলিক বিবরণ


বুখারা পশ্চিম উজবেকিস্থানের 'বোখারা' প্রদেশের রাজধানী শহর। এটি জেরফশন নদীর তীরে এক মরুদ্যানে, তুর্কমেনিস্থান সীমান্ত থেকে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। স্থানাঙ্কঃ ৩৯°৪৬′ উত্তর ৬৪°২৬′ পূর্ব। সময়ঃ জিএমটি+৫ঘন্টা।

ইয়াকুত হামুবী 'মু'জামুল বুলদান' গ্রন্থে লিখেন, বুখারা শব্দের উৎপত্তি ও শহরের নামকরণের বিষয়ে আমি অনেক গবেষণা করেছি, তবে আমি সে সম্পর্কে সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। তবে এ কথায় কোন সন্দেহ নেই যে, শহরটি অনেক পুরানো ও ঐতিহ্যবাহী। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামল, ফলের দীর্ঘ বাগান, সেই সাথে মিষ্টি ও উন্নতমানের ফল উৎপাদনের একটি শহর।

বুখারার উৎপাদিত ফল ফলাদি খাওয়ারিজমের বাজারে বিক্রি হত। বুখারা থেকে খাওয়ারিজম শহরের দুরত্ব ১২ মারহালা। যা অতিক্রম করতে পনের দিনের বেশি সময় লাগে। এই দুই শহরের মধ্যখানে সিগদ শহর অবস্থিত।

'কিতাবুস সুওয়ার' গ্রন্থকার বলেন যে, মা-ওরায়িন-নহর এলাকায় এরচেয়ে সবুজ শ্যামল মনোরম ও চমৎকার শহর আমি আর দেখিনি এবং এর চেয়ে সুন্দর শহরের ব্যাপারে কাউকে বলতেও শুনিনি। আপনারা যখন অতিউৎসাহে শহরের উপরের অংশে যাবেন, সেখানে সবুজ আর সবুজ দেখতে পাবেন।

মধ্য এশিয়ার যে কয়েকটি শহর ইতিহাসের টুকরো স্মৃতি লালন করে টিকে আছে, তার মধ্যে বুখারা অন্যতম। এ অঞ্চলের ইতিহাসের নানা পালাবদলের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুখারা শহরটি। প্রাচীন যুগ থেকেই নানা রাজবংশের শাসকদের পছন্দের জায়গা ছিল বুখারা। নানা সময় নানা শাসক তাই এর সৌন্দর্যবর্ধন ও সমবৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছেন। তবে বুখারা সবদিক থেকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে মুসলমানদের সময়। এই সময় স্থাপিত মোহনীয় অসংখ্য স্থাপনা এখনো বহাল তবিয়তে বিদ্যমান।

ঐতিহাসিক সিল্করোডের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হওয়ায় এটি ছিল, সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র। এছাড়া, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চায় এগিয়ে ছিল বুখারা। সভ্যতায় বুখারার দান নেহায়েত কম নয়। ইতিহাসে বুখারা মুসলমানদের পবিত্র শহর বলে খ্যাত।

বুখারা শহরটি ছোট-বড় মোট ১৪০ টি স্থাপত্য ধারণ করে আছে। ঐতিহ্যবাহী নানা মসজিদ-মাদরাসার অবস্থানের কারণে ইউনেস্কো বুখারাকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট (বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান) এর মর্যাদা দিয়েছে। এ পর্যায়ে কয়েকটি বিখ্যাত স্থাপনার সাথে পরিচয় হওয়া যাক।

কালয়ান মিনারঃ বুখারার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা পোই কালয়ান মসজিদ কমপ্লেক্সের একটি মিনার হচ্ছে কালয়ান মিনার। এটি তৈরি করেন, কারাখানিদ শাসক মোহাম্মদ আরসালান খান। রোদে শুকনো ইট দিয়ে তৈরি গোলাকৃতির এই মিনারটি উপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে উঠে গেছে। এর উচ্চতা প্রায় সাড়ে পঁয়তাল্লিশ মিটার। মিনারের অভ্যন্তরে রয়েছে উপরে উঠার জন্য প্যাঁচানো সিঁড়ি। এই সিঁড়ি বেয়ে উঠে গোলাকার গম্বুজ আচ্ছাদিত ছাদে দাঁড়িয়ে আযান দিত মুয়াজ্জিন। যুদ্ধের সময় ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে ব্যবহার হতো এটি। বিশ শতকে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে মিনারের উপর থেকে ফেলে দেয়া হতো বলে মিনারটি মৃত্যু টাওয়ার রূপেও পরিচিত। এই মিনারটি ইতিহাসে সৌন্দর্য ও মৃত্যু অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে।

আর্ক দুর্গঃ বর্তমান বুখারার উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত এই দুর্গটি। মোটামুটি চতুর্ভুজ আকৃতির এই দুর্গ পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে বিস্তৃত। পঞ্চম শতকে এটি নির্মিত হয়। নির্মাণের পর থেকে ১৯২০ সালে রাশিয়ান আগ্রাসনের আগপর্যন্ত সুদীর্ঘকাল এটি টিকে ছিল। রেড আর্মি বোম মেরে দুর্গের একটা বড় অংশ উড়িয়ে দিলেও আর্কের জৌলুস খুব একটা কমেনি। এখনো আর্ক দেখতে কম আকর্ষণীয় নয়। মজবুত প্রাচীরের ভেতর অবস্থিত শক্তিশালী এই দুর্গকে বলা হয় 'শহরের ভেতরে শহর'। আর্ক মূলত বুখারার আমিরদের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সুদৃশ্য এই স্থাপত্যের প্রবেশ মুখেই রয়েছে একটি জামে মসজিদ। তারপর শুরু হয়েছে কোয়ার্টার।

চার মিনারঃ চার মিনার বুখারার একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। এটি নির্মাণ করেন খলিফা নিয়াজ কুল। তিনি ছিলেন জানিদ রাজবংশের শাসক। মসজিদের নামানুসারে এখানে যথারীতি চারটি মিনার আছে, তবে আযান দেয়ার জন্য মিনার হিসেবে ব্যবহৃত হয় না কোনোটাই। তবে নীল রঙের কাজ করা মিনারগুলো মসজিদের সৌন্দর্য যে বাড়িয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

কালান মসজিদঃ কালান মসজিদ বুখারার অন্যতম সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে জানা যায়, কারাখানিদ শাসনামলে এখানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। তবে তা মঙ্গোলদের আক্রমণে ধ্বংস হয়। পরে পঞ্চদশ শতকে এখানে ঐ মসজিদের ধ্বংসাবশেষের উপর আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এই মসজিদটি কালান মসজিদ নামে পরিচিত। কালান মসজিদের গঠন মধ্য এশিয়ার আর দশটা মসজিদের মতোই। মসজিদের সামনে রয়েছে চতুর্ভুজাকৃতির আঙিনা। রয়েছে পিলারনির্মিত গ্যালারি। মসজিদের উপরিভাগে রয়েছে কারুকাজ করা নীল মিনার।

মির-ই-আরব মাদরাসাঃ নান্দনিক এই ভবনটি নির্মিত হয়েছিল ষোল শতকে। শায়বানী শাসকদের ধর্মীয় গুরু শায়খ আবদুল্লাহ ইয়েমেনীর স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই মাদরাসার সাথে। মির-ই-আরব মাদরাসার চোখধাঁধানো নকশায় স্থান পেয়েছে মোজাইকের কাজ, জ্যামিতিক কারুকার্য এবং ক্যালিগ্রাফির পরিমিত ব্যবহার।

লাব-ই-হাউজঃ প্রাচীন বুখারার পানির উৎস ছিল কিছু উন্মুক্ত পুকুর। পানি সহজলভ্য হলেও রোগজীবাণু ছড়ানোর জন্য পুকুরগুলোর কুখ্যাতি ছিল। এজন্য ১৯২০ এর দশকে প্রায় সবগুলো পুকুর ভরাট করে ফেলা হয়। ল্যাব-ই-হাউজ বেঁচে যায় এর তিনপাশে তিনটি মনোহর স্থাপত্য থাকার কল্যাণে। পুকুরটির একপাশে আছে কুকেলদাশ মাদরাসা, নাদির দিওয়ান-বেঘী মাদরাসা ও নাদির দিওয়ান-বেঘী খানকা।

ইসমাঈল সামানি কবরঃ ইসমাঈল সামানি মাজার বুখারার অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা। ইসমাঈল সামানি ছিলেন সামানিদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা।

টিকাঃ
১. বুখারা নগর উজবেকিস্তান প্রজাতন্ত্রে অবস্থিত। বর্তমানে এই নগরটি মধ্য এশিয়ার রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। মা-ওরাউন-নহর এলাকায় একটি প্রধান নগর হিসেবে গণ্য জীহুন নদীর তীরে। ইরানের সমরকান্দ হতে ৩০০ কিলোমিটার দূরে।

📘 ইমাম বুখারী রহ এর ঈমানদীপ্ত জীবন 📄 বুখারা ও সমরকান্দের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

📄 বুখারা ও সমরকান্দের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস


বুখারায় ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ইমাম বুখারী রহ. এর সময় পর্যন্ত বুখারার ইতিহাস।

(১) যিয়াদ ইবনে আবি সুফিয়ান ৪৬ হিজরী মোতাবেক ৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে রাবী' ইবনে হারেসকে তিনি ইরাক থেকে খুরাসানের দিকে পাঠান। তখন বলখ শহরে ইসলামী পতাকা উড্ডয়ন হয়েছিল। শহরটি মা-ওরায়িন-নহর দক্ষিণ এলাকার জন্য প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা হত। তার সেনাবাহিনী সিগদ শহর থেকে জীহুন সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।

(২) এরপর হযরত মুয়াবিয়া রা. ৫০ হিজরী মোতাবেক ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে যিয়াদের ইন্তিকালের পর উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে বুখারা অভিযানে পাঠান। উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক প্রদেশ বায়কান্দ আক্রমণ করেন এবং বিজয় লাভ করেন। এরপর তিনি বুখারা অভিমুখে রওনা করেন। যাতে করে যুদ্ধ ছাড়াই বিজয় করা সম্ভব হয়। আর সেই কাফেলায় চার হাজারের মত বন্দিও ছিল। ঘটনাটি ৫৩ হিজরী মোতাবেক ৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে ঘটে। বুখারার খাতুন মালেকা এই অভিযান প্রতিরোধের জন্য পার্শ্ববর্তী তুর্কিদের থেকে সাহায্য চান। অতঃপর তারা আরবীদের সাথে যুদ্ধ করে এবং সর্বশেষ উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে বুখারা বিজয় করা ব্যতিতই মার্ভে ফিরে আসতে হয়। অতঃপর খাতুনে মালেকা প্রত্যেক বছর এক লক্ষ দিরহাম জিজিয়া কর প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ হন।

(৩) কয়েক বছর অতিক্রম হওয়ার পর মুসলিম বাহিনী সাঈদ ইবনে উসমানের নেতৃত্বে আবার বুখারা অভিমুখে অভিযানে বের হলে বুখারার মালেকা খাতুন আবারো শান্তিচুক্তির প্রস্তাব করেন এবং সাঈদ ইবনে উসমান জামানত হিসেবে কিছু চাইলে মালেকা খাতুন বুখারায় তার শত্রুদের আশিজন পাঠালেন। এভাবে তিনি শত্রুদের অনিষ্ট থেকেও নিরাপত্তা লাভ করলেন সেইসাথে শান্তিচুক্তিও প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন। এটি তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছিল। এর কিছু দিন পর সাঈদ ইবনে উসমান মালেকা খাতুনকে বিবাহ করলেন। তাদের পারস্পারিক ভালবাসা এতোটাই গভীর ছিল যে, লোকেরা তাদেরকে উদাহরণ পেশ করতেন এবং কবিতা রচনা করতেন। এরপর তিনি সিগদ ও সমরকান্দ বিজয়ের ইচ্ছা করলেন এবং সিগদ অভিমুখে অভিযান করলেন। তিনি যখন বুখারায় ফিরে আসলেন, সেখানকার অধিবাসীরা মালেকা খাতুনের জামানত হিসেবে রাখা নেতাদের ফেরত চাইলে তিনি অস্বীকার করলেন এবং তাদেরকে মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন। জনগণ হতাশ হয়ে ইয়াযিদ ইবনে মারওয়ানের শাসনামলে তার ঘরে ঢুকে অতর্কিত হামলা করে তাকে হত্যা করল।

(৪) তারপর মুসলিম ইবনে যিয়াদ দ্বিতীয়বার বুখারা সমরকান্দ অভিযানে বের হন। এবার মালেকা খাতুন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন এবং প্রতিবেশীদের থেকে সাহায্য-সহযোগীতা চাইলেন। অতঃপর মুসলিম ইবনে যিয়াদের সাথে তার বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হল। মুসলিম বাহিনী প্রথমে পিছু হটলেও শেষে তারা বিজয় লাভ করে। মালেকা খাতুন এবারো শান্তিচুক্তি করতে চাইলে মুসলিম ইবনে যিয়াদ তাতে রাজি হয়ে সমস্ত সৈন্য নিয়ে মার্ভে ফেরত আসলেন।

(৫) ৭৬ হিজরীতে কুতায়বা ইবনে মুসলিম হাজ্জাজের হুকুমে অভিযানে বের হন। তিনি মার্ভে সৈন্য জমা করতে থাকেন। অতঃপর তিনি ৭৭ হিজরী মোতাবেক ৭১৫ খ্রিস্টাব্দে মা-ওরায়িন-নহর দক্ষিণ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। যা মুসলমানদের জন্য অনেক লাভজনক প্রমাণিত হয়। সেখান থেকে অনেক গণিমত অর্জন হল। কুতায়বা সেগুলোকে কয়েকটি ছোট ছোট রাজত্বে ভাগ করলেন। যেমন-ওয়ারদান, রামতান, সিগদ, কিশ, নাখশাব, সমরকান্দ। অতঃপর কুতায়বা সৈন্যবাহিনী নিয়ে মার্ভে ফিরে আসলেন। এরপর তিনি সৈন্যবাহিনী নিয়ে বুখারা অভিযানে বের হলেন। মুসলমানরা এর পূর্বে তিনবার বুখারা অভিযান করেছিল এবং সেখানে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিল। কিন্তু মুসলিম বাহিনী সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর তারা আবার নিজেদের পুরানো ধর্মে ফিরে যেত। চতুর্থবারের মতো মুসলমান বাহিনী বুখারা বিজয় করল।

(৬) মুসলিম বাহিনী বুখারার প্রশাসক হিসেবে খাদ্দাতকে নিযুক্ত করলেন। যিনি পূর্ব থেকেই সেখানকার প্রশাসক ছিলেন। তবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুলতানের পক্ষ থেকে একজন ব্যক্তিকে নিয়োজিত করা হল, যিনি প্রশাসনের কাজে সহযোগিতা করবেন এবং খাদ্দাতের পরে তিনিই প্রশাসক হবেন। তবে কিছু দিনের মধ্যেই সুলতান কর্তৃক নিয়োগকৃত ব্যক্তি তার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতায় প্রধান প্রশাসক হিসেবে জায়গা দখল করে নিলেন। এতে খাদ্দাত দুর্বল হয়ে পড়েন। এছাড়াও তাকে জিজিয়া হিসেবে প্রত্যেক বছর এক লক্ষ দিরহাম সুলতানকে পরিশোধ করতে হত।

(৭) বুখারায় ইসলাম কবুলকারীদের সাথে মুসলিম বাহিনী খুব সুন্দর আচরণ করেন। সেই সাথে কাফেরদের মন পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করতে থাকেন এবং যারা ইসলামকে গভীরভাবে মেনে চলতে চান, তাদের আর্থিক সহযোগিতাও করলেন। ৯৪ হিজরীতে মসজিদে কুতায়বা নির্মাণ করা হয়। বুখারার প্রশাসনের ব্যক্তিবর্গ নতুন ধর্মবিশ্বাস সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যাপারে প্রসিদ্ধতা লাভ করেন। কিছু লোক মসজিদ এবং ইসলামের সাথে অন্যায় আচরণ করলে মুসলমানরা তাদের কঠিন শাস্তি দেন। এতে করে বুখারার পরিবেশ শান্ত হয়ে যায়।

(৮) বুখারা বিজয়ের পর কুতায়বা ফারগানা এর দিকে অভিযান পরিচালনা করলেন। পূর্ব তুর্কিস্তানের এলাকা মা'মর তায়তুরুক থেকে কানসূ পর্যন্ত মুসলিম বাহিনী পৌঁছে গেল। কিন্তু মুসলমানদের কাশগর, খাতান এবং তাফানে থিতু হতে অনেক সময় লাগে। এরপর খলিফা ওলীদের ইন্তিকালের পর কুতায়বা মার্ভে ফিরে আসেন এবং নবনির্বাচিত খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা করলেন।

(৯) অতঃপর সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিকের সময় ইয়াযিদ ইবনে মুহাল্লিব গভর্ণর নির্বাচিত হলেন এবং কুতায়বার বিরুদ্ধে তার বাহিনীতেই বিদ্রোহ শুরু হল। যার নেতৃত্বে ছিল, ওকী ইবনে আসওয়াদ, হাসান ইবনে আইয়াস। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর তারা তাঁকে হত্যা করল। এভাবেই একজন ইসলামী মহান নায়কের জীবনের অবসান ঘটল। যিনি মধ্য এশিয়ায় একটি মহান ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বস্তুপুজার পরিবর্তে ইসলামের সৌন্দর্য সবদিকে ছড়িয়ে দিয়ে ছিলেন।

(১০) পিতার পর যখন হযরত উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. খলিফা নির্বাচিত হলেন, তখন ইয়াযিদ ইবনে মুহাল্লিবকে তার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে জন্য দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিলেন এবং তার স্থলে মাসলামা ইবনে আবদুল মালিককে নিয়োগ দিলেন। উমর ইবনে আবদুল আযিযের মৃত্যুর পর ইয়াজিদ ইবনে মুহাল্লাব বন্দীদশা থেকে পালিয়ে ইরাকের দিকে চলে যান এবং সেখানে সমর্থন লাভে সক্ষম হন। তিনি দ্বিতীয় ইয়াযিদকে খলিফা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং পাল্টা শক্তির উত্থান ঘটান। প্রাথমিকভাবে সফল হলেও পরে তিনি মাসলামা ইবনে আবদুল মালিকের সেনাদের কাছে পরাজিত এবং নিহত হন।

(১১) সমরকান্দে তুর্কি শাসন বিস্তার লাভ করে। খালিফা হিশাম একটি বড় সৈন্য বাহিনী প্রস্তুত করে সমরকান্দ অভিযানে প্রেরণ করলেন। খুরাসানের গভর্ণর খালিদ ইবনে আবদুল্লাহ তার ভাই আসাদকে সে বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে পাঠান। কিন্তু তিনি পরাজিত হন। এরপর খলিফা হিশাম আসরসকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। কিন্তু তিনিও পরাজিত হন। বাধ্য হয়ে খুরাসানের নতুন গভর্ণর জুনদুব নিজেই সেনাপতির দায়িত্ব নিয়ে আক্রমণ করেন। প্রথমে তিনি পরাজিত হলেও শেষে তিনি বিজয় লাভ করেন এবং নাসর ইবনে সাইয়্যারকে সমরকান্দের আমির নিযুক্ত করে মার্ভে ফিরে আসেন এবং তিনি সেখানেই মৃত্যু বরণ করেন। অতঃপর তার ভাইকে খুরাসানের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং অল্প কিছু দিন পরে তিনিও মৃত্যুবরণ করলে নাসর ইবনে সাইয়্যারকে খুরাসানের গভর্ণর নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি খুব প্রসিদ্ধ বীর ও দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় সমরকান্দ শাসন করেন। বনু উমায়্যার সর্বশেষ খলিফা মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদের শাসনামলে তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে আবু মুসলিমকে শাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

(১২) খলিফা হারুনুর রশিদ এর শাসনামলের শেষদিকে নসর ইবনে সাইয়্যার এর পৌত্র রাফে ইবনে লাইস খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। খলিফা খুরাসানের আমিরকে নির্দেশ দেন যে, রাফে ইবনে লাইসকে যেন গাধার পিঠে করে শহর ঘোরানো হয় এবং বন্দি করা হয়। কিন্তু সে পালিয়ে যেতে সামর্থ হয়। সমরকান্দবাসীও তাকে বিদ্রোহে সমর্থন দেন। এতে খলিফা হারুনুর রশিদ সমস্যায় পড়ে যান। এ বিশৃঙ্খলা দমনের জন্য তিনি আফ্রিকার কমান্ডার হারসামা ইবনে আ'য়ানকে পাঠান। তবে তিনি ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। এরপর তিনি খোযাইমা ইবনে হাযেমকে পাঠান তিনিও এ বিশৃঙ্খলা থামাতে ব্যর্থ হন। যার কারণে খলিফা হারুনুর রশিদ সমালোচনার মুখে পড়েন।

(১৩) এদিকে বলখী একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি 'সামান' ব্যক্তিগত কিছু দুশমনের মোকাবেলার জন্য খুরাসানের আমির আসাদ ইবনে আবদুল্লাহ এর সাহায্য চান। খুরাসানের আমির তাকে সাহায্য করলে তিনি অভিভূত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি নূহ, আহমদ, ইয়াইয়া এবং ইলিয়াস নামে চার সন্তানের জনক ছিলেন। খলিফা মামুন খুরাসানের আমিরকে ওসিয়ত করেন যে, তারা অত্যাধিক ভাল মানুষ এবং ওয়াদা পূরণে সচেতন। খলিফা তাদের থেকে রাফের বিদ্রোহের সহযোগীতা নেন এবং সমরকান্দ নূহকে, ফারগান আহমদকে, তাশকান্দ ইয়াহইয়াকে এবং হিরাত ইলিয়াসকে শাসক নিযুক্ত করেন।
নূহ এর মৃত্যুর পর আহমদ সমরকান্দের শাসক হন। তারপর নসর ইবনে আহমদ। অতঃপর ইয়াকুব ইবনে লাইস বিদ্রোহ করলে নরস ইবনে আহমদ সহদোর ভাই ইসমাঈল ইবনে আহমদের সাহায্য নেন এবং বিদ্রোহ দমন করেন। সে সময় লোকদের মুখে মুখে নসর ইবনে আহমদের নাম ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর দুই ভায়ের মধ্যে মনমালিন্য শুরু হলে ইসমাঈল ইবনে আহমদ ভাইকে বন্দি করেন। চার বছর এভাবে অতিবাহিত হলে ২৭৯ হিজরী সনে তিনি ইন্তিকাল করেন।

অগ্নিপুজকদের শাসনামল থেকেই বুখারা সমস্ত ইলমের প্রসিদ্ধ কেন্দ্র ছিল। সবাই শ্রদ্ধার সাথে তা স্বরণ করে। ইসলামী শাসনামলে তা আরো সমৃদ্ধ, সৌন্দর্যমণ্ডিত ও পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। যরফসা সমুদ্রের কিনারে ঘেঁষা এই শহরে জগতবিখ্যাত আলিম উলামা পীর মাশায়েখদের উপস্থিতিতে হয়ে উঠে ইলম ও তাসাউফের নূরানী প্রাণকেন্দ্রে। আজও তাঁদের মাকবারা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসাবে মুসলমানদের অন্তরে জায়গা করে নিয়ে আছে।

সেখানে বিখ্যাত আবু হাফস বুখারী (১৫০ হিজরী থেকে ২২৭ হিজরী) যিনি ইমাম আবু হানিফা রহ. এর ছাত্র ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান শায়বানী রহ.এর প্রিয় ছাত্র ছিলেন। ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী (১৯৪ হিজরী থেকে ২৫৬ হিজরী), আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক আবু আলী ইবনে সিনা (৩৭০ হিজরী থেকে ৪২৮ হিজরী), বিখ্যাত সুফি সৈয়দ বাহাউদ্দীন নকশবন্দী (৭১৮ হিজরী থেকে ৭৯১ হিজরী) জন্মগ্রহণ করেন।

বুখারার গভর্ণর ইসমাঈল ইবনে আহমদ দ্বীনদার, পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন। তার শাসনামলে বুখারায় যে পরিমাণ মাদরাসা ও মসজিদ নির্মাণ হয়েছে ইতিহাসে মধ্য এশিয়ার কোন শহরেই তা ছিল না। তিনি বুখারাকে ইলমের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে ছিলেন। তিনি ২৯০ হিজরী সনে ইন্তিকাল করেন।

বুখারা সমরকান্দ ইসলামী হুকুমতের শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তৈমুর লং সমরকান্দ শাসন করেন এবং সেখানেই তাঁর সমাধী রয়েছে। তিনি ছাড়াও হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা. এর ছেলে হযরত কুসাম ইবনে আব্বাস রা. যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আপন চাচাতো ভাই ছিলেন। তিনিও সেখানে আরাম করছেন। হযরত কুসাম ইবনে আব্বাস রা. জিহাদের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছিলেন এবং পরবর্তীতে দ্বীন প্রচারের জন্য তিনি সেখানে থেকে যান। শাহ-ই- জিন্দা তাঁর সমাধি বলে বিশ্বাস করা হয়।

টিকাঃ
২. খ্রিস্টীয় ১ম শতকে বুখারা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৮ম শতকে আরবরা জয় করার আগেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। পরবর্তীতে কারাখানীয় ও তাতারেরা শহরটি দখল করে। ১২১৯ সালে চেঙ্গিস খান এসে শহরটি ধুলায় মিশিয়ে দেয়। ১৫৫৫ সালে এটি একটি উজবেক আমীরের রাজধানীতে পরিণত হয়। এরপরই এই আমিরাতটি বিভিন্ন সময় মঙ্গোল, তুর্কি, ও উজবেকরা শাসন করে। পরে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের অংশ করে নেয়। ১৯৯১ সালে এটি স্বাধীন উজবেকিস্তানের অংশে পরিণত হয়। যা আজ পর্যন্ত অপরিবর্তিত রয়েছে। (উইকিপিডিয়া)
৩. মার্ভ মধ্য এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মরুদ্যান শহর ছিল। এর অবস্থান ছিল, বর্তমান তুর্কমেনিস্তানের মেরির কাছে ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের পাশে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px