📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ইউসুফ ইবনে খালেদ সামতির প্রতি ইমামের নসিহত

📄 ইউসুফ ইবনে খালেদ সামতির প্রতি ইমামের নসিহত


জ্ঞান অর্জন শেষ করে নিজ শহর বসরায় যাওয়ার জন্য ইমাম আজমের অনুমতি চাইলে তিনি ইউসুফ সামতিকে বলেন, 'তুমি যাওয়ার আগে আমি তোমাকে মানুষের সঙ্গে চলাফেরা ও আখলাক-আদব সম্পর্কে কিছু নসিহত করতে চাই, যা তোমার ইলমের সৌন্দর্য বাড়াবে। মনে রেখো, আচার-আচরণ আপনকে পর করে, পরকে আপন করে। অসাদাচরণ বাবা-মায়ের মতো আপনকেও পর করে দেয়। আর সদাচরণ পরকেও বাবা-মায়ের মতো আপন করে ফেলে।'

'বসরায় গিয়ে তোমার প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় মাঠে নেমে যেয়ো না। তাদের উপর নিজেকে এবং নিজের ইলম জাহির করো না। তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে ত্রুটি করো না। না হলে তারা তোমার বিরুদ্ধে লেগে যাবে। সুসম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে। হিংসা-বিদ্বেষ তৈরি হবে। তখন একে অন্যের বিপদে হাসবে। পরস্পরকে গোমরাহ, বিদআতি আখ্যা দেবে। হয়তো একসময় এটার জন্য শহরও ছাড়তে হতে পারে! অথচ এটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই যেখানে সৌজন্য দেখানোর প্রয়োজন, বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে চলার প্রয়োজন, সেখানে সেভাবে চলো।'

'বসরায় ফেরার পরে সেখানকার মানুষ তোমাকে দেখতে ছুটে আসবে। তাদের প্রত্যেককে উপযুক্ত সম্মান দিয়ো। বিশেষত গুণিজন, উলামায়ে কেরাম, মাশায়েখের প্রতি পরম ভক্তি-শ্রদ্ধা পেশ করো। তাদের সঙ্গে বিনম্রতা প্রদর্শন করো। সাধারণ মানুষদের সঙ্গে ভালো কথা বলো। বদলোকদের সঙ্গে কৌশলী হও। ভালো মানুষদের সঙ্গী ও সহচর হিসেবে গ্রহণ করো। শাসককে অবজ্ঞা করো না। কাউকে তুচ্ছ করো না। নিজের আত্মমর্যাদাবোধ নষ্ট করো না। নিজের গোপন কথা কাউকে বলো না। ভালো চিন-পরিচয় হওয়ার আগে কাউকে নিজের কাছে টেনো না। মন্দ ও ইতর লোককে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। প্রকাশ্যে এমন কিছু করো না যাতে মানুষ তোমার সমালোচনার সুযোগ পায়। বোকা লোকদের সঙ্গে বেশি মেশো না। অতি বোকা কিংবা ক্ষমতাশালী—এই দুই শ্রেণির লোকদের দাওয়াত গ্রহণ করো না। তাদের হাদিয়াও নিয়ো না।'

'সবসময় সৌজন্যবোধ, সবর, ধৈর্য, উত্তম চরিত্র, হৃদয়ের বিশালতা ইত্যাদি গুণের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা করো। বাহ্যিক বেশভূষা সাধ্যমতো সুন্দর রাখো। (সাধ্যমতো) নতুন কাপড় পরিধান করো। (সাধ্যমতো) ভালো বাহনে চড়ো। অধিক সুগন্ধি ব্যবহার করো। নিয়মমতো নিজেকে সময় দাও। সে সময় নিজের প্রয়োজনগুলো সারবে। নওকর-ভৃত্যদের প্রতি খেয়াল রাখবে। তারা ভুল করলে উত্তমভাবে এবং নম্রতার সঙ্গে সংশোধন করবে। বেশি নিন্দা-ভর্ৎসনা করবে না। কারণ, তাতে একসময় সেটা তাদের গায়ে লাগবে না। শাস্তি দেওয়ার হলে নিজে দেবে। তাতে তোমার অবস্থান দৃঢ় থাকবে।'

'নামাযের প্রতি যত্নবান থেকো। মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করো। কারণ, কৃপণ ব্যক্তি কখনো নেতৃত্ব দিতে পারে না। একদল মানুষকে নিজের সঙ্গী করো যারা তোমাকে মানুষের ভালোমন্দ জানাবে, মন্দ হলে সংশোধন করবে, ভালো হলে সহায়তা করবে।'

'কেউ তোমাকে দেখতে আসুক না আসুক, তুমি মানুষকে দেখতে যাবে। কেউ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করুক না করুক, তুমি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করবে, ক্ষমা করবে। কেউ কষ্ট দিলে তাকে ছেড়ে দেবে। কাছের কেউ অসুস্থ হলে নিজে তাকে দেখতে যাবে। লোক পাঠিয়ে খবর নেবে। কেউ অনুপস্থিত হলে তার ব্যাপারে খোঁজখবর নেবে। কেউ তোমার কাছে আসা ছেড়ে দিলে তুমি ছাড়বে না। যে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, তুমি তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়বে। কেউ অসাদাচরণ করলে ক্ষমা করবে। যে তোমার সমালোচনা করে তার প্রশংসা করবে। কারও সুখের মুহূর্তে তাকে শুভেচ্ছা জানাবে। দুঃখের মুহূর্তে সান্ত্বনা দেবে। মুসিবতে দেখলে নিজে ব্যথিত হবে। কেউ পাশে চাইলে তার পাশে দাঁড়াবে। সাহায্য চাইলে সাহায্য করবে। মানুষের প্রতি যথাসম্ভব বেশি বেশি ভালোবাসা প্রকাশ করবে। বাজে লোকদের মাঝেও সালামের প্রসার ঘটাবে। বিভিন্ন মজলিস, মসজিদ কিংবা অন্য কোথাও মানুষকে বিতর্ক করতে দেখলে চুপ থাকবে। নিজ থেকে বিতর্কে জড়াবে না। হুট করেই বিপরীতমুখী বক্তব্য দেবে না।'

'হ্যাঁ, যদি তোমাকে সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হয় আর তোমার জানা থাকে, তবে তুমি প্রথমে তাদের জানা কথা উল্লেখ করবে। অতঃপর বলবে, এ ব্যাপারে আরও একটা বক্তব্য আছে। তখন নিজের বক্তব্য দলিলসহ তুলে ধরবে। এতে মানুষ তোমার মর্যাদা ও মর্তবা বুঝতে পারবে। প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে তার অবস্থা অনুযায়ী কথা বলবে। স্পষ্ট বিষয়ে কথা বলবে। জ্ঞানের গভীর বিষয় সাধারণ মানুষের কাছে বলবে না। (ছাত্রদের সঙ্গে) মাঝে মাঝে মজা করবে। এটা তোমার প্রতি তাদের অনুরাগ ও আকর্ষণ সৃষ্টিতে সহায়তা করবে, ইলম অর্জনে আগ্রহ পাবে। মাঝে মাঝে তাদের খাওয়াবে। কেউ ভুল করলে এড়িয়ে যাবে। তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করবে। তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করবে। উদার হবে। কারও প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করবে না। সবার সঙ্গে সবার মতোই একজন হয়ে থাকবে। মানুষের সঙ্গে তেমন আচরণ করবে যেমনটা নিজের সঙ্গে করা পছন্দ করো। নিজের জন্য যা চাও তাদের জন্য তা চাইবে। নিজের নফসের প্রতি খেয়াল রাখবে। ভুল পথে চললে ঠিক করবে।'

'বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা ছড়াবে না। কেউ তোমার প্রতি বিরক্তি দেখালে তুমিও বিরক্তি দেখাবে না। মানুষের উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেবে না। সত্য পথে চলবে। অহংকার থেকে দূরে থাকবে। কেউ তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও তুমি করবে না। কেউ খেয়ানত করলেও আমানত রক্ষা করে চলবে। ওয়াফাদারি ও তাকওয়ার উপর থাকবে। প্রত্যেক ধর্মের মানুষের সঙ্গে যথোপযুক্ত আচরণ করবে।'

'এসব ওসিয়ত মেনে চললে, আশা করি, ভালো থাকবে। তুমি চলে যাচ্ছ, আমার খারাপ লাগছে (ছাত্রের প্রতি ওস্তাদের আখলাক দেখুন)! তবে তোমার সম্পর্কে জানতে পারলে আমার ভালো লাগবে। তাই আমার সঙ্গে পত্র মারফত যোগাযোগ রাখবে। নিজের প্রয়োজন জানাবে। আমার সঙ্গে পুত্রের মতো থাকবে। আমি তোমার পিতার মতো থাকব!'

কেবল মুখে নসিহত করেই ইমাম ক্ষান্ত থাকার মানুষ ছিলেন না। ফলে যেমনটা তাঁর ছাত্র ইউসুফ বর্ণনা করেন, 'অতঃপর তিনি আমাকে অনেকগুলো দিনার, পোশাক ও বাহন প্রদান করলেন। আমাকে বিদায় দিতে নিজে তাঁর সঙ্গী-সাথিসহ বের হলেন। ফোরাতের তীর পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিলেন! অতঃপর বিদায় নিলেন! তাঁর মতো অনুগ্রহ আমার জীবনে আর কারও নেই। তাঁর নসিহতের সুবাদে বসরাতে আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাই। সেখানকার আলেম-উলামা, তালেবুল ইলম এবং সাধারণ মানুষ—সবার প্রিয়পাত্রে পরিণত হই। কুফার মতো বসরাতেও হানাফি মাযহাব প্রতিষ্ঠিত হয়। মৃত্যু পর্যন্ত ইমামের চিঠি ও হাদিয়া আমার কাছে আসতে থাকে। কত মহান ও কল্যাণকর শিক্ষক ছিলেন তিনি। তাঁর মতো আর কে আছে?

টিকাঃ
১৭৬৪. মানাকিব, মক্কি (৩৬৫-৩৬৮)। মানাকিব, বাযযাযি (৩৬০-৩৬৩)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আবু ইউসুফের প্রতি ইমামের নসিহত

📄 আবু ইউসুফের প্রতি ইমামের নসিহত


আমরা আগেই বলেছি, ইমাম আজম রহ. বারবার শাসকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দায়িত্বের প্রস্তাব পেয়েও প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, তিনি তাদের কোনো কাজ করা পছন্দ করতেন না। তথাপি তিনি হয়তো ঈমানি ফারাসাতের মাধ্যমে তাঁর ছাত্রদের সরকারি দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি জীবদ্দশাতেই অনুভব করেছিলেন। এ জন্য তিনি তাদের এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দান করেন। ইমাম বলেন :

‘ইয়াকুব, শাসককে সম্মান করো। তার সামনে মিথ্যা বলো না। তার দরবারে বেশি যেয়ো না। প্রয়োজন ছাড়া তার কাছে হাজির হয়ো না। কারণ, যখন শাসকের কাছে বেশি যাবে, তার চোখ থেকে তোমার সম্মান পড়ে যাবে। মর্যাদা হ্রাস পাবে। ফলে শাসকের সঙ্গে আগুনের সম্পর্ক রাখবে—তার থেকে উপকৃত হবে, কিন্তু দূরে থাকবে। কাছে গেলে পুড়ে যাবে। শাসকের সামনে বেশি কথা বলবে না। কারণ, তাতে তিনি তোমার ভুল ধরবেন। তার লোকদের কাছে তুমি ছোট হবে। শাসকের কাছে গেলে নিজের, শাসকের এবং তাঁর কাছে উপস্থিত সবার মর্যাদার প্রতি লক্ষ রাখবে। তাঁর কাছে অন্য কোনো আলেম থাকলে সাবধানে কথা বলবে, যাতে ক্ষতিগ্রস্থ না হও এবং শাসকের চোখ থেকে পড়ে না যাও।’

‘সাধারণ মানুষের সামনে যে সম্পর্কে তোমাকে প্রশ্ন করা হবে এর বাইরে কিছু বলবে না। যা বলবে ইলমের উপর নির্ভর করে বলবে, যাতে তারা তোমার ব্যাপারে মন্দ ধারণা না করে। সাধারণ মানুষের সামনে হাসবে না। বেশি বাজারে যাবে না। ছোট শিশুদের সঙ্গে কথা বলতে পারো। তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারো। কিন্তু উঠতি বয়সের কিশোরদের সঙ্গে কথা বলবে না। কারণ, তারা ফেতনা। বয়োজ্যেষ্ঠ সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাস্তায় হাঁটবে না। কারণ, তাদের পিছনে হাঁটলে সেটা তোমার ইলমের জন্য শোভনীয় হবে না। আবার তাদের সামনে হাঁটলে সেটাও তোমার জন্য শোভনীয় নয়।'

'রাস্তায় বসবে না। একান্ত বসতে হলে মসজিদে বসবে, দোকানে বসবে না। বাজারে বা মসজিদে খাবে না। খোলা জায়গায় পান করবে না। রেশম, অলংকার ইত্যাদি পরবে না। কারণ, এগুলো অহংকারের দিকে ঠেলে দেয়। প্রয়োজন ছাড়া বিছানায় (শুয়ে) স্ত্রীর সঙ্গে বেশি কথা বলবে না। তার সঙ্গে অতিরিক্ত মাখামাখি করবে না। আল্লাহর যিকির ছাড়া তার কাছে যাবে না। তার সামনে অন্য ব্যক্তির স্ত্রী কিংবা যেকোনো নারী-পরিচারিকার আলোচনা করবে না। এতে তার ভালো লাগবে না। হতে পারে তুমি অন্য নারীর আলোচনা করলে সেও অন্য পুরুষের আলোচনা করবে।'

'যাবতীয় সক্ষমতা অর্জন ব্যতীত বিয়ে করবে না। প্রথমে ইলম অর্জন করো। এরপর হালাল উপার্জন করো। শেষে বিবাহ করো। কারণ, ইলম অর্জনের সময় সম্পদের পিছনে মনোযোগ দিলে ইলম থেকে বঞ্চিত হবে। সম্পদ তোমাকে গোলাম-দাসী এবং দুনিয়ার আসবাবপত্রের প্রেমে ডুবিয়ে দেবে। একইভাবে ইলম অর্জন শেষ করার আগে বিবাহ করলে তোমার সময় বরবাদ হবে। সন্তান, সম্পদ ইত্যাদি ইলম থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। তাই যৌবনের শুরুতে ইলম অর্জন করবে, যখন হৃদয় ও মন শূন্য থাকে, স্থির থাকে। অতঃপর সম্পদ অর্জন করবে। সম্পদ অর্জিত হয়ে গেলে বিবাহ করবে। যথাসাধ্য স্ত্রীর বাড়িতে কম যাবে। তার বাপের বাড়িতে সংসার পাতবে না। (একাধিক স্ত্রী থাকলে) এক ঘরে দুই স্ত্রী রাখবে না। স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণ করবে।'

'আল্লাহকে ভয় করে চলবে। আমানত রক্ষা করবে। সবার জন্য কল্যাণ কামনা করবে। কাউকে তুচ্ছ করবে না। আমজনতার মাঝে দ্বীনের সূক্ষ্ম বিষয়ে কথা বলবে না। কারণ, তোমার অনুসরণে তারাও তখন সেসব বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। কেউ তোমাকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করলে যতটুকু প্রশ্ন করা হবে ততটুকু উত্তর দেবে। নিজের পক্ষ থেকে অন্য কিছু যোগ করবে না। কারণ, তাতে সে জবাব বুঝতে পারবে না। ...সাধারণ মানুষ এবং বাজারি লোকদের সঙ্গে ইলমি বিতর্ক করবে না। তাতে নিজের সম্মানহানি হবে। সত্য প্রকাশে কাউকে ভয় করবে না, হোক সে রাজা-বাদশাহ। অন্যদের চেয়ে কম ইবাদতে সন্তুষ্ট থাকবে না। কারণ, সাধারণ মানুষ যখন তাদের চেয়ে তোমাকে বেশি ইবাদত করতে না দেখবে, তোমার ব্যাপারে বিভিন্ন মন্দ ধারণা করবে। আমলের প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যাবে। ইলম এবং আহলে ইলমকে তারা মূল্যহীন মনে করবে।'

'কখনো ইলম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না। যদি দশ বছরও কামাই-রোজগার ছাড়া থাকতে হয়, খাবার ছাড়া থাকতে হয়, তবুও ইলম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না। কেননা, ইলম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সংকীর্ণ জীবন ডেকে আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ ۞ অর্থ : 'যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকুচিত হয়ে পড়বে আর আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।' [তহা : ১২৪]

'নতুন কোনো শহরে গেলে নিজেকে সেখানকার আলেমদের একজন মনে করো। পুরোটা নিজের করার চেষ্টা করো না, যাতে তারা বুঝতে পারে যে, তুমি তাদের সম্মান-মর্যাদার ভাগ নিতে আসোনি। কারণ, এমন হলে তারা সবাই মিলে তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে, তোমার মতাদর্শের উপর আঘাত হানবে, সাধারণ মানুষ তোমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। কারণ, সাধারণ মানুষের নিজস্ব চোখ নেই। তারা তোমার প্রতিপক্ষ আলেমদের চোখ দিয়েই তোমার দিকে তাকাবে। ফলে শুধু শুধু অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তাই তাদের সামনে ফাতাওয়া দেবে না। তাদের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ ও মুনাযারা করবে না। দলিল ছাড়া তাদের সঙ্গে কথা বলবে না। তাদের ওস্তাদ-মাশায়েখের সমালোচনা করবে না। সমালোচনা করলে তারাও তোমার সমালোচনায় লিপ্ত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ ۞ অর্থ : আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তারা ডাকে তাদের তোমরা গালি দিয়ো না। কেননা, তাহলে তারাও সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে।' [আনআম : ১০৮]

'মানুষের ব্যাপারে সদাসর্বদা সতর্ক থাকবে। নিজের গোপন ও প্রকাশ্য উভয় অবস্থা আল্লাহর কাছে সমান রাখবে। কারণ, এটাই ইলমের কাফফারা যে, তোমার যাহের ও বাতেন আল্লাহর কাছে সমান থাকবে। ... বেশি হাসাহাসি করবে না। কারণ, এটা অন্তর মেরে ফেলে। নারীদের সঙ্গে বেশি কথা বলবে না বা ওঠবস করবে না। কারণ, এটাও অন্তরকে হত্যা করে ফেলে। ধীরস্থিরতার সঙ্গে চলাফেরা করবে। কোনো কাজে তাড়াুড়া করবে না। পিছন থেকে কেউ ডাক দিলে সাড়া দেবে না। যখন কথা বলবে, অতি উচ্চৈঃস্বরে বলবে না। আওয়াজ উঁচু করবে না। স্থির থাকবে। কম নড়াচড়ার অভ্যাস করবে। মানুষের সামনেও বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করবে, যাতে তারা সেটা দেখে শিখতে পারে। প্রত্যেক নামাযের পরে কুরআনের কিছু অংশ তেলাওয়াত করবে। আল্লাহর যিকির করবে। তাঁর নেয়ামত ও (মুসিবতের) সবরের উপর শুকরিয়া আদায় করবে। প্রতি মাসে কয়েকটা দিন রোযা রাখবে। তাতে সাধারণ মানুষও রোযার প্রতি উৎসাহিত হবে। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যতটুকু ইবাদত প্রত্যাশা করো, নিজের কাছ থেকে ততটুকুতে সন্তুষ্ট থেকো না। নিজের নফসকে দেখে রেখো। তাকে সুরক্ষিত রাখতে চেষ্টা করো।'

'নিজে নিজে কেনাবেচা করবে না (বরং ইলমের পিছনে সময় দেবে)। একজনকে সহায়ক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তার কাছে দায়দায়িত্ব সঁপে দেবে। দুনিয়ার মাঝে নিশ্চিন্ত হয়ে বসবাস করো না। কারণ, আল্লাহ তোমাকে এগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। কিশোরদের কাছে যেয়ো না। শাসকদের কাছে যেয়ো না। ... মানুষের দোষ খুঁজো না, বরং ভালো দিকগুলো খুঁজো। যদি কারও মাঝে খারাপ কিছু দেখো, তবে সেটা প্রচার করো না, বরং তাকে ভালোটা করতে বলো। ভালোভাবে স্মরণ করো। হ্যাঁ, যদি কারও দ্বীনের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি-বিচ্যুতি থাকে, তবে সেটা মানুষের সামনে তুলে ধরো যাতে মানুষ সতর্ক থাকে, তার কাছ থেকে দূরে থাকে। দ্বীনের ব্যাপারে হক কথা বলতে গিয়ে কাউকে ভয় পেয়ো না। কারণ, আল্লাহ তোমার সাহায্যকারী। একবার এটা করতে পারলে মানুষ তোমাকে ভয় পেতে শুরু করবে। তখন তোমার সামনে, তোমার শহরে আর কেউ বিদআত করার সাহস পাবে না। কেউ করলেও সাধারণ মানুষই তোমার পক্ষ থেকে সেটার প্রতিবাদের জন্য যথেষ্ট হবে।'

'মৃত্যুকে স্মরণ করবে। উস্তাদ-মাশায়েখসহ যাদের কাছ থেকে ইলম শিখেছ তাদের জন্য ইস্তিগফার করবে। সবসময় কুরআন তেলাওয়াত করবে। বেশি বেশি কবর যিয়ারত করবে। মাশায়েখের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। পবিত্র স্থানগুলো দর্শন করবে। দাওয়াতের উদ্দেশ্য ছাড়া শুধু শুধু বিদআতপন্থিদের সঙ্গে মিশবে না, তাদের সঙ্গে বসবে না। গালিগালাজ করবে না। অভিশাপ দেবে না। আজান দিলেই মসজিদে চলে যাবে, যাতে সাধারণ মানুষ তোমার সামনের কাতারে না থাকে! শাসকের প্রাসাদের আশেপাশে বসবাস করবে না।'

‘প্রতিবেশীর গোপনীয়তা রক্ষা করবে। কেননা, সেটা আমানত। মানুষের গোপনীয় কথা প্রকাশ করবে না। কেউ কোনো বিষয়ে পরামর্শ চাইলে ইবাদত মনে করে যথাসাধ্য সুপরামর্শ দেবে। কৃপণতা করবে না। লোভ করবে না। মিথ্যা বলবে না। গোঁজামিল দেবে না। বরং স্পষ্টভাষী এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলবে। সাদা কাপড় পরবে। মনের দিক থেকে ধনী হবে। দুনিয়ার প্রতি কম আগ্রহ দেখাবে। দরিদ্র হলেও দারিদ্র্য প্রকাশ করবে না। সাহসী ও হিম্মতওয়ালা হও। কারণ, যার হিম্মত যত কম, তার মর্তবাও তত কম।’

‘রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটবে। ডানে-বামে তাকাবে না। দোকানে গেলে বেশি দরাদরি করবে না। বরং (সম্ভব হলে) সবাই যা দেয় তারচেয়ে বেশি দেবে। এতে সাধারণের মাঝে তোমার ব্যক্তিত্ব তৈরি হবে, সবাই সম্মান করবে। বিভিন্ন কাজের জন্য লোক রাখবে। তাতে ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে সময় দিতে সুবিধা হবে। পাগল ও খ্যাতির পূজারী লোকদের সঙ্গে মুনাযারা-বিতর্ক করবে না। কারণ, তারা সুযোগ খুঁজবে। হক খুঁজবে না।’

‘বড় আলেমদের সামনে নিজেকে যাহির করতে যাহবে না। এতে করে একসময় তারাই তোমাকে ওঠাবেন। নিজেকে যাহির করতে গেলে উলটো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইভাবে কোনো এলাকায় বা লোকদের মাঝে গেলে তারা তোমাকে নামাযের সময় সামনে ঠেলে না দিলে নিজে নিজে সামনে যাবে না। ... ইলমের মজলিসে রাগ করবে না। সাধারণ মানুষের সামনে কেচ্ছা-কাহিনি বলবে না। কারণ, কেচ্ছা-কাহিনি বলতে হলে মিথ্যা বলা অপরিহার্য। তোমার নামে যেসব যিকির কিংবা ওয়াজের মজলিস চলে, সেখানে নিজে যেয়ো না। বরং নিজের শাগরেদ কিংবা পরিচিত কাউকে পাঠাও। একইভাবে বিয়ে পড়ানো, জানাযা এবং ঈদের নামায পড়ানোর দায়িত্বও তোমার এলাকার ইমামের উপর ছেড়ে দেবে (অর্থাৎ, নিজে এরচেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করবে)। আমাকে তোমার দোয়ায় স্মরণ রেখো।’

টিকাঃ
১৭৬৫. দেখুন: মানাকিব, মক্কি (৩৭০-৩৭৭)। মানাকিব, বাযযাযি (৩৬৫-৩৭০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00