📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ইমাম আজমের আধ্যাত্মিক জীবন

📄 ইমাম আজমের আধ্যাত্মিক জীবন


খলিফা হারুনুর রশিদ ইমাম আজম সম্পর্কে জানতে চাইলে আবু ইউসুফ রহ. বলেন, 'আমিরুল মুমিনিন, তিনি হারাম থেকে অনেক দূরে থাকতেন। দুনিয়াদারদের দুনিয়া এড়িয়ে চলতেন। অধিক সময় নীরব থাকতেন। সর্বক্ষণ চিন্তার মাঝে ডুবে রইতেন। বেশি কথা বলতেন না। বেশি কথা পছন্দ করতেন না। যদি তাঁকে কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করা হতো, সেটুকু জবাব দিয়ে ক্ষান্ত থাকতেন। তিনি নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। দ্বীনকে সুরক্ষিত রাখতেন। মানুষের পিছনে লাগার পরিবর্তে নিজেকে নিয়ে থাকতেন। সবার প্রশংসা করতেন। কারও ব্যাপারে কটু কথা বলতেন না।' সবকিছু শুনে হারুনুর রশিদ বললেন, 'এটাই সালেহিনদের চরিত্র।'

হ্যাঁ, এটাই আল্লাহর ওলিদের জীবন। সুন্নাহর আলোতে উদ্ভাসিত জীবন। এটাই বিশুদ্ধ ও প্রকৃত ঈমানের সুফল। মানুষের সঙ্গে কম মেশা, কম কথা বলা এবং কম হাসা ইমাম আজম রহ.-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, যে ব্যাপারে সবাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই যে, ইমাম আজম তাঁর নফস ও মুখের নিয়ন্ত্রক ছিলেন। প্রয়োজনের বাইরে কথা বলতেন না। কারও নামে মন্দ বলতেন না। কারণ, নিজের আত্মার শুদ্ধিতে এবং নিজের নফস নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকলে, বিশুদ্ধ ইলম ও আখেরাতের চিন্তায় নিমগ্ন থাকলে, অন্য মানুষ নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময় থাকে না। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. বলেন, 'তিনি কুফার সবচেয়ে বড় মুত্তাকি মানুষ ছিলেন। আমানত রক্ষায় তিনি ছিলেন সকলের শীর্ষে।'

তিনি অর্থহীন হাসি-মশকরা করতেন না। উচ্চৈঃস্বরে হাসতেন না। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর অনুসরণে তিনি সর্বদা মুচকি হাসতেন। তাঁর সামনে কেউ কারও মন্দ বললে তিনি থামিয়ে দিয়ে বলতেন, 'বাদ দাও। মানুষের নামে মন্দ বলা থেকে বিরত থাকো। আমাদের নামে যারা মন্দ বলে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিন। যারা আমাদের ভালো বলে, আল্লাহ তাদের রহম করুন।'

আত্মশুদ্ধির আরেক ভিত্তি হলো নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করা, বিনয়ী হওয়া এবং মানুষকে সম্মান করা। ইমাম আজমের মাঝে এটাও পুরো মাত্রায় বিদ্যমান ছিল। তিনি কাউকে ছোট করতেন না। তাঁর ছাত্রদের তিনি অত্যন্ত মহব্বত করতেন, যথযোগ্য মর্যাদা দিতেন। আবদুল জাব্বার হাযরমি বলেন, 'আমি তাঁর চেয়ে আর কাউকে নিজের শাগরেদদের এতটা সম্মান দিতে দেখিনি।' তাঁর ছাত্রদের মাঝে অনেকে অন্যান্য আলেমের কাছে গমন করত, যাদের সঙ্গে তাঁর নানাবিধ দূরত্ব ছিল, যাদের কেউ কেউ হিংসাবশত তাঁর সমালোচনাও করত। কিন্তু তিনি কখনো নিজের ছাত্রদের তাদের কাছে যেতে বারণ করতেন না। তাঁর ঈমান, আমল, আখলাক ও তাযকিয়ার সিলসিলা ছাত্রদের মাঝেও বিস্তৃত হয়। তাঁর ছাত্ররা একেকজন হেদায়াতের দিশারী হয়ে ওঠেন। দাউদ আত-তায়ি এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ফলে তাযকিয়া ও তাসাওউফের বরকতময় ধারার ইমাম তিনি।

আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মশুদ্ধির এই দৃশ্য তাঁর জীবনের সর্বত্র বিদ্যমান। তাঁকে কেউ কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, 'রাব্বি সাল্লিম! রাব্বি সাল্লিম! (আল্লাহ রক্ষা করুন। আল্লাহ রক্ষা করুন)। অনেক সময় কেউ তাঁকে অবমূল্যায়ন করলেও নিজেকে তিনি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতেন। প্রসিদ্ধি এবং দুনিয়ার মর্যাদাকে নিজের নফসের তুষ্টির কাজে লাগাতেন না, প্রতিশোধ নিতেন না। একবার একব্যক্তি ইমাম আজমকে একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দিতে গিয়ে বলেন, 'এক্ষেত্রে হাসান (বসরি) ভুল করেছেন।' তখন এক লোক ইমামের মাকে তুলে গালি দিয়ে বলল, হে... পুত্র! 'হাসান ভুল করেছেন' এমন কথা বলার সাহস হলো কী করে? তাঁর নাম অস্পষ্ট রেখে কুনিয়ত দিয়ে বোঝাতে পারলে না? এটা ছিল বড় মাত্রার বেয়াদবি ও ধৃষ্টতা। হাসান বসরি ভুল করেছেন বলা কোনো গলত কথা ছিল না। লোকজন তাকে পাকড়াও করার জন্য ছুটে গেল। ইমাম আজম কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থাকলেন। এরপর মাথা উঠিয়ে বললেন, 'হাসান ভুল করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ঠিক করেছেন।' লোকটিকে কিছুই বললেন না। আরেক দিন আরেক ব্যক্তি ইমাম আজম রহ.-কে 'কাফের', 'যিন্দিক' বলে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগল। ইমাম আজম জবাবে বললেন, 'আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। তিনি জানেন তুমি যা বলছ আমার মাঝে সেগুলো নেই। তাঁকে চেনার পর থেকে কখনো অন্য কাউকে তাঁর সঙ্গে শরিক করিনি। তিনি ছাড়া অন্য কারও কাছে কিছুর প্রত্যাশা করিনি। অন্য কারও শাস্তির ভয় করিনি।' অতঃপর তিনি কাঁদতে লাগলেন। তাঁর শরীর কেঁপে উঠল! লোকটি ভুল বুঝতে পেরে বলল, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তিনি বললেন, 'তুমি মুক্ত। এমন কথা আমার ব্যাপারে যে-ই বলেছে, সবাই মুক্ত। ভাই! প্রসিদ্ধি অনেক মন্দ ব্যাপার। প্রসিদ্ধি অনেক ক্ষতিকর।'

একব্যক্তি তাঁকে বলল, আল্লাহকে ভয় করুন! তিনি কেঁপে উঠলেন। তাঁর রং বিবর্ণ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে বললেন, 'হ্যাঁ, ভাই। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দিন। এমন আরও বলবেন। আমরা সবসময় এ ধরনের উপদেশের প্রতি মুখাপেক্ষী।'

মোটকথা, বিশুদ্ধ আকিদার পাশাপাশি হৃদয়কে বিশুদ্ধ করা, নিজের আত্মাকে সুস্থ রাখা, প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রত্যেক মুমিনের উপর ফরয। ইমাম আজমের জীবনীগুলোতে দেখা যায়, তিনি মাসের পর মাস রাতে ঘুমাতেন না। ইশার ওজু দ্বারা ফজরের নামায পড়তেন। রাতে তাঁর জায়নামাযে কান্নার আওয়াজে প্রতিবেশীরা সজাগ হয়ে যেত। এটা তাঁর জীবনীগ্রন্থগুলোর সর্বসম্মত সাক্ষ্য। এ ছাড়া তাঁর অত্যধিক আমলের ব্যাপারে শত শত বর্ণনা বিদ্যমান। তথাপি আমরা এখানে সেগুলো উল্লেখ করিনি। কারণ, নামায-রোযা এবং বাহ্যিক ইবাদত, আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমরা যেটুকু অগ্রসর, আত্মশুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ততটাই অনগ্রসর ও অমনোযোগী। ফলে এ দিকটাতে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলতেন, 'যদি মানুষের সমস্যার চিন্তা না থাকত, তবে আমি ফাতাওয়া দেওয়া বন্ধ করে দিতাম।'

এভাবে ঈমান, আকিদা, ইলম ও আমলের মতো আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি ইমাম ছিলেন। বকর ইবনে মারুফ বলেন, 'আমি উম্মতে মুহাম্মাদির মাঝে আবু হানিফার চেয়ে উত্তম জীবনের অধিকারী আর কাউকে দেখিনি।' এটাই আত্মশুদ্ধির মূল কথা। এ কারণে যারা আত্মশুদ্ধিকে অবজ্ঞা করে, তাত্ত্বিকতার পিছনে থাকে, ইমাম আজম রহ. তাদের শক্ত সমালোচনা করেছেন। ইমাম মনে করতেন, যারা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের পথ ছেড়ে অর্থহীন তাত্ত্বিকতার পিছনে পড়ে, তাদের চেহারায় নুর থাকে না। তাদের হৃদয় নরম থাকে না, বরং পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। সেখানে তাকওয়া ও খোদাভীতি থাকে না। থাকে অন্যকে ছোট করার এবং প্রতিপক্ষকে গোমরাহ সাব্যস্ত করার জিঘাংসা। এ কারণে তিনি তাঁর ছেলেকে এসব অর্থহীন বিতর্কে জড়াতে নিষেধ করে দেন।

টিকাঃ
১৭৫১. দেখুন : ফাযায়িলু আবি হানিফা, ইবনে আবিল আওয়াম (৪৭)। আখবারু আবি হানিফা, সাইমারি (৪৩)।
১৭৫২. দেখুন: উকুদুল জুমান (২৩০)। আল খাইরাতুল হিসান (৯৯)।
১৭৫৩. দেখুন : ফাযায়িলু আবি হানিফা (৫৫-৫৬)।
১৭৫৪. দেখুন: আখবারু আবি হানিফা (৪৪)।
১৭৫৫. দেখুন: আল-খাইরাতুল হিসান (৯৯)।
১৭৫৬. ফাযায়িলু আবি হানিফা (৪৮)।
১৭৫৭. দেখুন: উকুদুল জুমান (২৭২)।
১৭৫৮. উকুদুল জুমান (২৭০)।
১৭৫৯. আখবারু আবি হানিফা (৪৮)। ফাযায়িলু আবি হানিফা (৬২)।
১৭৬০. দেখুন: আল-খাইরাতুল হিসান (৯৬)।
১৭৬১. ফাযায়িলু আবি হানিফা (৬৩)।
১৭৬২. আল খাইরাতুল হিসান (১০০)।
১৭৬৩. দেখুন: মানাকিব, মক্কি (৫৪-৫৫, ১৮৩-১৮৪)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 শেষকথা

📄 শেষকথা


সবশেষে ইমামের একটি বক্তব্যের মাধ্যমে গ্রন্থ শেষ করতে চাইছি। ইমাম রহ. বলেন, ‘অনুগ্রহ করে খোঁটা দেওয়া আমলকে নষ্ট করে দেয়। রিয়া তথা লৌকিকতাও আমলকে নষ্ট করে দেয়।’ অথচ এই দুটো গুনাহ মহামারীর মতো আমাদের মাঝে বিদ্যমান। বিশেষত এগুলো ধার্মিক ও আল্লাহভীরু মানুষের মাঝে বেশি বিদ্যমান। আল্লাহর প্রতি ভয় এবং জান্নাত কামনা থেকেই মানুষ একে অন্যের প্রতি ইহসান করে। পরে শয়তানের প্রবঞ্চনায় খোঁটা দিয়ে ফেলে। একইভাবে রিয়া ভালো কাজ ও ইবাদতের মাঝেই বেশি আসে। গুনাহের মাঝে রিয়া নেই। ফলে এই দুটো অপরাধে গুনাহগার ও পাপীদের চেয়ে ধার্মিক লোকেরাই বেশি জড়ায়। অনেক সময় অনেকে অনুভবও করে না কিংবা গুনাহই মনে করে না। এটা আরও ভয়ংকর ব্যাপার। আল্লাহ তাআলার কাছে আমরা এ ধরনের পাপ থেকে ক্ষমা ও আশ্রয় প্রার্থনা করছি। ইখলাস চাইছি। তিনি হেদায়াতের মালিক এবং তৌফিকদাতা।

আল্লাহ তাআলার কাছে আমরা দোয়া করছি, তিনি ইমাম আজম আবু হানিফা রহ. এবং সালাফের সকল ইমামকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে তাদের উত্তম বিনিময় দিন। তাদের পথে আমাদের থাকার তৌফিক দিন। আমৃত্যু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশুদ্ধ আকিদার উপর দৃঢ়পদ রাখুন। আমিন।

টিকাঃ
১৭৬৬. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00