📄 তাত্ত্বিকতা ছেড়ে সুলুকের সন্ধান আবশ্যক
ইসলাম স্রেফ তাত্ত্বিকতা নয়; ইসলামি আকিদা স্রেফ কিছু তত্ত্ব ও তথ্য জানার নাম নয়; বরং এটা বিশ্বাস ও আমলের নাম, জীবনে বাস্তবায়িত করার নাম। এ জন্য কুরআন-সুন্নাহর সর্বত্র ঈমানের সঙ্গে আমলকে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ঈমান ও আমল দুটোর সমন্বয়কারীদের প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا ۞ অর্থ : 'যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তাদের মেহমানদারির জন্য আছে জান্নাতুল ফিরদাউস।' [কাহাফ : ১০৭] আল্লাহ আরও বলেন, ۞ وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُم بِالَّتِي تُقَرِّبُكُمْ عِندَنَا زُلْفَىٰ إِلَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ لَهُمْ جَزَاءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوا وَهُمْ فِي الْغُرُفَاتِ آمِنُونَ ۞ অর্থ : 'তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি তোমাদের আমার নিকটবর্তী করে না। তবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, তারা তাদের কর্মের বহুগুণ প্রতিদান পাবে এবং তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।' [সাবা : ৩৭]
আল্লাহ তাআলা মুমিনের জীবনে ঈমানের প্রভাব সম্পর্কে বলেন, ۞ يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَنفَالِ ۖ قُلِ الْأَنفালُ لِلَّهِ وَالرَّسُولِ ۖ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ ۖ وَأَطِیعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ * إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ * الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ * أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا ۚ لَّهُمْ دَرَجَاتٌ عِندَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ ۞ অর্থ : তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্বন্ধে প্রশ্ন করে। আপনি বলুন, 'যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ এবং রাসুলের। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করো। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো। (মুমিন তারা) যাদের হৃদয় কম্পিত হয় যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে আর তারা তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে। যারা নামায কায়েম করে এবং আমি যা দিয়েছি তা হতে ব্যয় করে, তারাই প্রকৃত মুমিন। তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদের জন্য রয়েছে মর্যাদা, ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।' [আনফাল : ১-৪]
বিভিন্ন হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মানুষকে ঈমানের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে আমল ও আখলাক শিক্ষা দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আবদুল কাইসের প্রতিনিধি দল ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের বললেন, 'তোমরা এক আল্লাহর উপর ঈমান আনবে। তোমরা কি জানো এক আল্লাহর উপর ঈমান কী?' তারা বলল, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বললেন, 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসুল—এ সাক্ষ্য দেওয়া, নামায আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের রোযা রাখা এবং গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ দান করা।'
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কালিমার পাশাপাশি লজ্জাকে ঈমানের অঙ্গ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। রাস্তা থেকে ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে ফেলাকে ঈমানের শাখা সাব্যস্ত করেছেন। নিজের জন্য যা পছন্দ অন্যের জন্য সেটা পছন্দ করাকে ঈমান বলেছেন। এমন না করা পর্যন্ত কেউ মুমিন হতে পারবে না বলে সতর্ক করেছেন। আরেক হাদিসে বলেছেন, 'আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয় (তিনবার বললেন) যার প্রতিবেশীরা তার অনাচার থেকে মুক্ত না থাকে।'
ফলে ঈমানের সঙ্গে আমল, আদব ও আখলাকের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃত মুমিন কখনো আমলহীন ও আখলাকহীন হতে পারে না। আবার আখলাকহীন, বে-আমল ও প্রতারক কখনো প্রকৃত মুমিন হতে পারে না। নিজেকে সংশোধন, পরি শুদ্ধীকরণ, ভিতর ও বাহির সুনির্মল করার এই মিশন নিয়েই রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে আল্লাহ তাআলা প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولًا مِّنكُمْ يَتْلُو عَلَيْكُمْ آيَاتِنَا وَيُزَكِّيكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ ۞ অর্থ : 'যেমন আমি তোমাদের মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছি তোমাদেরই মধ্য হতে, যিনি তোমাদের নিকট আমার বাণীসমূহ পাঠ করবেন এবং তোমাদের বিশুদ্ধ (তাযকিয়া) করবেন। তোমাদের শিক্ষা দেবেন কিতাব ও তাঁর তত্ত্বজ্ঞান (হিকমত) এবং শিক্ষা দেবেন এমন বিষয় যা তোমরা জানতে না।' [বাকারা : ১৫১] অন্য আয়াতে বলেন, ۞ هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ ۞ অর্থ : 'তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদের বিশুদ্ধ (তাযকিয়া) করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতঃপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।' [জুমুআ : ২]
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন এই বিশুদ্ধতার মূর্ত প্রতীক। আল্লাহ তাআলা তাকে লক্ষ্য করে বলেন, ۞ وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ ۞ অর্থ : 'নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।' [কলম: ৪] রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর চরিত্র সম্পর্কে আম্মাজান আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন!' অর্থাৎ, কুরআনের সকল শিক্ষা ও দীক্ষা তাঁর মাঝে জীবন্ত ছিল।
সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-এর জীবনও ছিল কুরআন-সুন্নাহর এই আলোকিত রাজপথের উপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে তারা ঈমান ও আমল দুটো একসঙ্গে শিখতেন। কেবল বিশ্বাসের কিছু বিষয় অন্তরে সত্যায়ন করে সেগুলো মুখে আওড়ে ক্ষান্ত থাকতেন না, বরং হৃদয়ের গভীর থেকে সেগুলো অনুধাবন করতেন এবং কাজে বাস্তবায়িত করতেন। এ জন্য তারা ছিলেন নবিদের পরে সবচেয়ে নির্মল এবং সবচেয়ে বিশুদ্ধতম প্রজন্ম। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, 'আমাদের (তথা সাহাবাদের) কেউ কুরআনের দশটি আয়াত শেখার পরে সেগুলোর অর্থ জানা এবং সেগুলোর উপর আমল করার আগ পর্যন্ত আগে বাড়তেন না!' তাবেয়ি আবু আবদুর রহমান সুলামি বলেন, 'আমাদের যারা কুরআন শিখিয়েছেন (অর্থাৎ সাহাবারা) বলেছেন, তারা কুরআনের দশটি আয়াত শেখার পরে সেগুলোর উপর আমল করার আগে অন্য আয়াত শিখতেন না। এভাবে আমরা কুরআন ও আমল একসঙ্গে শিখি!'
টিকাঃ
১৭৪৪. বুখারি (কিতাবুল ঈমান: ৫৩)। সহিহ ইবনে হিব্বান (কিতাবুল ঈমান: ১৭২)।
১৭৪৫. বুখারি (কিতাবুল ঈমান : ৯)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৩৫)।
১৭৪৬. বুখারি (কিতাবুল ঈমান: ১৩)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৪৫)।
১৭৪৭. বুখারি (কিতাবুল আদাব: ৬০১৬)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৪৬)।
১৭৪৮. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আয়েশা : ২৫২৪০)। ইবনে আবি শাইবা (কিতাবুন নিকাহ : ১৭৫০৬)।
১৭৪৯. তাফসিরে তাবারি (১/৮০)।
📄 আকিদার মূল উদ্দেশ্য আমল
ফলে ঈমান ও আকিদা বলতে সাহাবায়ে কেরাম কেবল তাত্ত্বিকতা বুঝতেন না, বিতর্ক বুঝতেন না; বরং আমল ও কাজে বাস্তবায়ন বুঝতেন। এ জন্য আমরা সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-কে দেখব, তারা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে আমলহীন তাত্ত্বিক বিষয়ের পরিবর্তে আমলের বিষয়ে প্রশ্ন করতেন। বরং রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছ থেকে বিস্ময়কর কিছু শোনার পরও সে সম্পর্কে অর্থহীন কৌতূহলী প্রশ্ন না করে তাতে আমলের এবং নিজেদের করণীয় কী আছে সেটা খুঁজতেন! যেমন দাজ্জালবিষয়ক হাদিস এর সুস্পষ্ট সাক্ষী। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন সাহাবাদের বললেন, 'দাজ্জাল চল্লিশ দিন পর্যন্ত পৃথিবীতে অবস্থান করবে। এর একটি দিন এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান এবং তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান হবে। অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের দিনসমূহের মতো হবে।' সাহাবায়ে কেরাম এটা কীভাবে ঘটবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করার পরিবর্তে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, যেদিন এক বছরের সমান হবে, সেদিন আমরা নামায পড়ব কীভাবে!? আমাদের জন্য কি একদিনের নামাযই যথেষ্ট হবে? জবাবে তিনি বললেন, 'না, বরং তোমরা বর্তমান দিনের হিসাবে ওই দিনের পরিমাণ নির্ধারণ করে নামায পড়বে।' ফলে সাহাবাদের জীবনের সকল ইলম ও আকিদার মূল উদ্দেশ্য ছিল জীবনে বাস্তবায়িত করা, ঈমানের আলোয় আলোকিত হওয়া।
সাহাবাদের এই আলোকিত পথেই ছিলেন তাদের ছাত্র তথা তাবেয়িগণ। ইমাম আজম রহ. ছিলেন তাদের একজন। এ জন্য তিনিও আত্মশুদ্ধি, ইখলাস, তাকওয়া, আখলাক ও খোদাভীতির সেই সানুদেশে ছিলেন, যা বর্তমানে ইলম ও আকিদার শুষ্ক ও নিরস চর্চার যুগে কল্পনাও করা যায় না। তিনি ইলম চর্চা করেছেন, আকিদা নিয়ে কথা বলেছেন, কিন্তু বাড়াবাড়ি করেননি। আত্মশুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে তাত্ত্বিকতা ঝাড়ায় মত্ত থাকেননি। আকিদা নিয়ে তর্কের জেরে হৃদয়ের কথা ভোলেননি। ফলে তিনি আকিদা ও ফিকহের ক্ষেত্রে যেমন নিজ যুগের ইমাম ছিলেন, তেমনই আল্লাহভীতি, নিষ্ঠা, বিনয়, দুনিয়া-বিমুখতা, চরিত্র-মাধুরী, তাযকিয়া ও ইহসানের ময়দানেও ছিলেন শিখরদেশে। তাঁর যুহদ, আধ্যাত্মিকতা, নফসের নিয়ন্ত্রণ, অন্তরের পরিচ্ছন্নতা, চারিত্রিক নির্মলতা ও আত্মশুদ্ধির চমৎকার সব দৃষ্টান্তে ইতিহাসের গ্রন্থগুলো ভরপুর।
টিকাঃ
১৭৫০. মুসলিম (কিতাবুল ফিতান : ২৯৩৭)। আবু দাউদ (কিতাবুল মালাহিম : ৪৩২১)। তিরমিযি (আবওয়াবুল ফিতান: ২২৪০)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল ফিতান: ৪০৭৫)।
📄 ইমাম আজমের আধ্যাত্মিক জীবন
খলিফা হারুনুর রশিদ ইমাম আজম সম্পর্কে জানতে চাইলে আবু ইউসুফ রহ. বলেন, 'আমিরুল মুমিনিন, তিনি হারাম থেকে অনেক দূরে থাকতেন। দুনিয়াদারদের দুনিয়া এড়িয়ে চলতেন। অধিক সময় নীরব থাকতেন। সর্বক্ষণ চিন্তার মাঝে ডুবে রইতেন। বেশি কথা বলতেন না। বেশি কথা পছন্দ করতেন না। যদি তাঁকে কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করা হতো, সেটুকু জবাব দিয়ে ক্ষান্ত থাকতেন। তিনি নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। দ্বীনকে সুরক্ষিত রাখতেন। মানুষের পিছনে লাগার পরিবর্তে নিজেকে নিয়ে থাকতেন। সবার প্রশংসা করতেন। কারও ব্যাপারে কটু কথা বলতেন না।' সবকিছু শুনে হারুনুর রশিদ বললেন, 'এটাই সালেহিনদের চরিত্র।'
হ্যাঁ, এটাই আল্লাহর ওলিদের জীবন। সুন্নাহর আলোতে উদ্ভাসিত জীবন। এটাই বিশুদ্ধ ও প্রকৃত ঈমানের সুফল। মানুষের সঙ্গে কম মেশা, কম কথা বলা এবং কম হাসা ইমাম আজম রহ.-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, যে ব্যাপারে সবাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই যে, ইমাম আজম তাঁর নফস ও মুখের নিয়ন্ত্রক ছিলেন। প্রয়োজনের বাইরে কথা বলতেন না। কারও নামে মন্দ বলতেন না। কারণ, নিজের আত্মার শুদ্ধিতে এবং নিজের নফস নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকলে, বিশুদ্ধ ইলম ও আখেরাতের চিন্তায় নিমগ্ন থাকলে, অন্য মানুষ নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময় থাকে না। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. বলেন, 'তিনি কুফার সবচেয়ে বড় মুত্তাকি মানুষ ছিলেন। আমানত রক্ষায় তিনি ছিলেন সকলের শীর্ষে।'
তিনি অর্থহীন হাসি-মশকরা করতেন না। উচ্চৈঃস্বরে হাসতেন না। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর অনুসরণে তিনি সর্বদা মুচকি হাসতেন। তাঁর সামনে কেউ কারও মন্দ বললে তিনি থামিয়ে দিয়ে বলতেন, 'বাদ দাও। মানুষের নামে মন্দ বলা থেকে বিরত থাকো। আমাদের নামে যারা মন্দ বলে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিন। যারা আমাদের ভালো বলে, আল্লাহ তাদের রহম করুন।'
আত্মশুদ্ধির আরেক ভিত্তি হলো নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করা, বিনয়ী হওয়া এবং মানুষকে সম্মান করা। ইমাম আজমের মাঝে এটাও পুরো মাত্রায় বিদ্যমান ছিল। তিনি কাউকে ছোট করতেন না। তাঁর ছাত্রদের তিনি অত্যন্ত মহব্বত করতেন, যথযোগ্য মর্যাদা দিতেন। আবদুল জাব্বার হাযরমি বলেন, 'আমি তাঁর চেয়ে আর কাউকে নিজের শাগরেদদের এতটা সম্মান দিতে দেখিনি।' তাঁর ছাত্রদের মাঝে অনেকে অন্যান্য আলেমের কাছে গমন করত, যাদের সঙ্গে তাঁর নানাবিধ দূরত্ব ছিল, যাদের কেউ কেউ হিংসাবশত তাঁর সমালোচনাও করত। কিন্তু তিনি কখনো নিজের ছাত্রদের তাদের কাছে যেতে বারণ করতেন না। তাঁর ঈমান, আমল, আখলাক ও তাযকিয়ার সিলসিলা ছাত্রদের মাঝেও বিস্তৃত হয়। তাঁর ছাত্ররা একেকজন হেদায়াতের দিশারী হয়ে ওঠেন। দাউদ আত-তায়ি এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ফলে তাযকিয়া ও তাসাওউফের বরকতময় ধারার ইমাম তিনি।
আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মশুদ্ধির এই দৃশ্য তাঁর জীবনের সর্বত্র বিদ্যমান। তাঁকে কেউ কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, 'রাব্বি সাল্লিম! রাব্বি সাল্লিম! (আল্লাহ রক্ষা করুন। আল্লাহ রক্ষা করুন)। অনেক সময় কেউ তাঁকে অবমূল্যায়ন করলেও নিজেকে তিনি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতেন। প্রসিদ্ধি এবং দুনিয়ার মর্যাদাকে নিজের নফসের তুষ্টির কাজে লাগাতেন না, প্রতিশোধ নিতেন না। একবার একব্যক্তি ইমাম আজমকে একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দিতে গিয়ে বলেন, 'এক্ষেত্রে হাসান (বসরি) ভুল করেছেন।' তখন এক লোক ইমামের মাকে তুলে গালি দিয়ে বলল, হে... পুত্র! 'হাসান ভুল করেছেন' এমন কথা বলার সাহস হলো কী করে? তাঁর নাম অস্পষ্ট রেখে কুনিয়ত দিয়ে বোঝাতে পারলে না? এটা ছিল বড় মাত্রার বেয়াদবি ও ধৃষ্টতা। হাসান বসরি ভুল করেছেন বলা কোনো গলত কথা ছিল না। লোকজন তাকে পাকড়াও করার জন্য ছুটে গেল। ইমাম আজম কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থাকলেন। এরপর মাথা উঠিয়ে বললেন, 'হাসান ভুল করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ঠিক করেছেন।' লোকটিকে কিছুই বললেন না। আরেক দিন আরেক ব্যক্তি ইমাম আজম রহ.-কে 'কাফের', 'যিন্দিক' বলে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগল। ইমাম আজম জবাবে বললেন, 'আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। তিনি জানেন তুমি যা বলছ আমার মাঝে সেগুলো নেই। তাঁকে চেনার পর থেকে কখনো অন্য কাউকে তাঁর সঙ্গে শরিক করিনি। তিনি ছাড়া অন্য কারও কাছে কিছুর প্রত্যাশা করিনি। অন্য কারও শাস্তির ভয় করিনি।' অতঃপর তিনি কাঁদতে লাগলেন। তাঁর শরীর কেঁপে উঠল! লোকটি ভুল বুঝতে পেরে বলল, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তিনি বললেন, 'তুমি মুক্ত। এমন কথা আমার ব্যাপারে যে-ই বলেছে, সবাই মুক্ত। ভাই! প্রসিদ্ধি অনেক মন্দ ব্যাপার। প্রসিদ্ধি অনেক ক্ষতিকর।'
একব্যক্তি তাঁকে বলল, আল্লাহকে ভয় করুন! তিনি কেঁপে উঠলেন। তাঁর রং বিবর্ণ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে বললেন, 'হ্যাঁ, ভাই। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দিন। এমন আরও বলবেন। আমরা সবসময় এ ধরনের উপদেশের প্রতি মুখাপেক্ষী।'
মোটকথা, বিশুদ্ধ আকিদার পাশাপাশি হৃদয়কে বিশুদ্ধ করা, নিজের আত্মাকে সুস্থ রাখা, প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রত্যেক মুমিনের উপর ফরয। ইমাম আজমের জীবনীগুলোতে দেখা যায়, তিনি মাসের পর মাস রাতে ঘুমাতেন না। ইশার ওজু দ্বারা ফজরের নামায পড়তেন। রাতে তাঁর জায়নামাযে কান্নার আওয়াজে প্রতিবেশীরা সজাগ হয়ে যেত। এটা তাঁর জীবনীগ্রন্থগুলোর সর্বসম্মত সাক্ষ্য। এ ছাড়া তাঁর অত্যধিক আমলের ব্যাপারে শত শত বর্ণনা বিদ্যমান। তথাপি আমরা এখানে সেগুলো উল্লেখ করিনি। কারণ, নামায-রোযা এবং বাহ্যিক ইবাদত, আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমরা যেটুকু অগ্রসর, আত্মশুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ততটাই অনগ্রসর ও অমনোযোগী। ফলে এ দিকটাতে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলতেন, 'যদি মানুষের সমস্যার চিন্তা না থাকত, তবে আমি ফাতাওয়া দেওয়া বন্ধ করে দিতাম।'
এভাবে ঈমান, আকিদা, ইলম ও আমলের মতো আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি ইমাম ছিলেন। বকর ইবনে মারুফ বলেন, 'আমি উম্মতে মুহাম্মাদির মাঝে আবু হানিফার চেয়ে উত্তম জীবনের অধিকারী আর কাউকে দেখিনি।' এটাই আত্মশুদ্ধির মূল কথা। এ কারণে যারা আত্মশুদ্ধিকে অবজ্ঞা করে, তাত্ত্বিকতার পিছনে থাকে, ইমাম আজম রহ. তাদের শক্ত সমালোচনা করেছেন। ইমাম মনে করতেন, যারা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের পথ ছেড়ে অর্থহীন তাত্ত্বিকতার পিছনে পড়ে, তাদের চেহারায় নুর থাকে না। তাদের হৃদয় নরম থাকে না, বরং পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। সেখানে তাকওয়া ও খোদাভীতি থাকে না। থাকে অন্যকে ছোট করার এবং প্রতিপক্ষকে গোমরাহ সাব্যস্ত করার জিঘাংসা। এ কারণে তিনি তাঁর ছেলেকে এসব অর্থহীন বিতর্কে জড়াতে নিষেধ করে দেন।
টিকাঃ
১৭৫১. দেখুন : ফাযায়িলু আবি হানিফা, ইবনে আবিল আওয়াম (৪৭)। আখবারু আবি হানিফা, সাইমারি (৪৩)।
১৭৫২. দেখুন: উকুদুল জুমান (২৩০)। আল খাইরাতুল হিসান (৯৯)।
১৭৫৩. দেখুন : ফাযায়িলু আবি হানিফা (৫৫-৫৬)।
১৭৫৪. দেখুন: আখবারু আবি হানিফা (৪৪)।
১৭৫৫. দেখুন: আল-খাইরাতুল হিসান (৯৯)।
১৭৫৬. ফাযায়িলু আবি হানিফা (৪৮)।
১৭৫৭. দেখুন: উকুদুল জুমান (২৭২)।
১৭৫৮. উকুদুল জুমান (২৭০)।
১৭৫৯. আখবারু আবি হানিফা (৪৮)। ফাযায়িলু আবি হানিফা (৬২)।
১৭৬০. দেখুন: আল-খাইরাতুল হিসান (৯৬)।
১৭৬১. ফাযায়িলু আবি হানিফা (৬৩)।
১৭৬২. আল খাইরাতুল হিসান (১০০)।
১৭৬৩. দেখুন: মানাকিব, মক্কি (৫৪-৫৫, ১৮৩-১৮৪)।
📄 শেষকথা
সবশেষে ইমামের একটি বক্তব্যের মাধ্যমে গ্রন্থ শেষ করতে চাইছি। ইমাম রহ. বলেন, ‘অনুগ্রহ করে খোঁটা দেওয়া আমলকে নষ্ট করে দেয়। রিয়া তথা লৌকিকতাও আমলকে নষ্ট করে দেয়।’ অথচ এই দুটো গুনাহ মহামারীর মতো আমাদের মাঝে বিদ্যমান। বিশেষত এগুলো ধার্মিক ও আল্লাহভীরু মানুষের মাঝে বেশি বিদ্যমান। আল্লাহর প্রতি ভয় এবং জান্নাত কামনা থেকেই মানুষ একে অন্যের প্রতি ইহসান করে। পরে শয়তানের প্রবঞ্চনায় খোঁটা দিয়ে ফেলে। একইভাবে রিয়া ভালো কাজ ও ইবাদতের মাঝেই বেশি আসে। গুনাহের মাঝে রিয়া নেই। ফলে এই দুটো অপরাধে গুনাহগার ও পাপীদের চেয়ে ধার্মিক লোকেরাই বেশি জড়ায়। অনেক সময় অনেকে অনুভবও করে না কিংবা গুনাহই মনে করে না। এটা আরও ভয়ংকর ব্যাপার। আল্লাহ তাআলার কাছে আমরা এ ধরনের পাপ থেকে ক্ষমা ও আশ্রয় প্রার্থনা করছি। ইখলাস চাইছি। তিনি হেদায়াতের মালিক এবং তৌফিকদাতা।
আল্লাহ তাআলার কাছে আমরা দোয়া করছি, তিনি ইমাম আজম আবু হানিফা রহ. এবং সালাফের সকল ইমামকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে তাদের উত্তম বিনিময় দিন। তাদের পথে আমাদের থাকার তৌফিক দিন। আমৃত্যু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশুদ্ধ আকিদার উপর দৃঢ়পদ রাখুন। আমিন।
টিকাঃ
১৭৬৬. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৬)।