📄 কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ এবং কবরে বাতি প্রজ্জ্বলন
পরবর্তী যুগের একদল আলেম এক্ষেত্রে শৈথিল্যের শিকার হয়েছেন। তাদের মতে, কোনো উজর ছাড়া কবরের উপর কিংবা কবরস্থানের ভিতরে মসজিদ নির্মাণ কিংবা মসজিদের ভিতরে কাউকে দাফন, ওলির কবরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক সেখানে বাতি প্রজ্বলন, চাদর চড়ানো, ফুল প্রদান, কবরকেন্দ্রিক উরস-অনুষ্ঠান ইত্যাদি বৈধ। অথচ মুহাক্কিক আলেমদের মতে এগুলো বৈধ হওয়ার কোনো যুক্তি বা সুযোগ নেই!
হযরত গঙ্গুহি রহ.-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর রওযার উপরেও তো অবকাঠামো রয়েছে, চতুর্দিকে বাতি লাগানো হয়েছে। তাহলে এটা নিষিদ্ধ হয় কী করে? বড় বড় সাহাবার কবরও এমন বিশাল স্থাপত্যের মাঝে বিদ্যমান। এগুলোর বিধান কী? তিনি বললেন, 'এ সবকিছু অবৈধ। কোনো মুহাক্কিক ও মাকবুল আলেম এগুলো করেননি। বরং এগুলো রাজা-বাদশাহদের কাজ। তা ছাড়া, কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত সকল কথা ও কাজ পরিত্যাজ্য। কে বলল কিংবা কে করল সেটা দেখার বিষয় নয়।'
টিকাঃ
১৭২২. ফাতাওয়া রশিদিয়া (১৫২)।
📄 কবরস্থানে কুরআন তেলাওয়াতের বিধান
ইমাম আজম রহ.-এর মতে, কবরের কাছে কুরআন তেলাওয়াত মাকরুহ। ইমাম আবু ইউসুফও এটাকে মাকরুহ বলেছেন। তবে ইমাম মুহাম্মাদ রহ. বৈধ বলেছেন। এ কারণে পরবর্তী হানাফি উলামায়ে কেরাম ইমাম মুহাম্মাদের অনুসরণে এটাকে বৈধ বলেছেন।
ইবনুল হুমাম লিখেন, 'কবরের পাশে কুরআন তেলাওয়াতের বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। তবে গ্রহণযোগ্য কথা হলো—এটা মাকরুহ নয়।' আল্লামা উশি লিখেন, 'কবরের কাছে কুরআন পড়া আবু হানিফার মতে মাকরুহ, মুহাম্মাদ রহ.- এর মতে মাকরুহ নয়। এটার উপরই (মাযহাবের) ফাতাওয়া। কাসানি লিখেন, 'কবর যিয়ারত এবং সেখানে কুরআন পড়া রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগ থেকে আজকের দিন পর্যন্ত মুসলমানদের সর্বসিদ্ধ আমল।'
পরবর্তীকালে সময় যত গড়িয়েছে, বৈধতা থেকে বিষয়টি মুস্তাহাবের দিকে গিয়েছে। পরবর্তী আলেমগণ এটাকে মুস্তাহাব ও ফযিলতের কাজ আখ্যা দিয়েছেন, যদিও প্রথম যুগের আলেমগণ এমন বলেননি। তারা কবরস্থানে নির্দিষ্ট সুরা ও আয়াত তথা ইয়াসিন, মুলক, বাকারার প্রথম ও শেষ আয়াতগুলো এবং সুরা ইখলাস পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ইবনে নুজাইম লিখেন, 'কবরের পাশে কুরআন তিলাওয়াতে কোনো সমস্যা নেই। বরং অন্য দোয়ার চেয়ে উত্তম। যিয়ারতকারীর দোয়া ও তেলাওয়াতের ওসিলায় আল্লাহ কবরের আযাব হালকা করে দেবেন কিংবা একেবারে বন্ধ করে দেবেন এটাও সম্ভব।' শুরুম্বুলালি বলেন, 'কবরের পাশে ইয়াসিন পড়া মুস্তাহাব...। বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী কবরের পাশে কুরআন তেলাওয়াতের জন্য বসা মাকরুহ নয়।'
টিকাঃ
১৭২৩. ফাতহুল কাদির (২/১৪২)।
১৭২৪. ফাতাওয়া সিরাজিয়্যাহ (৩১৩)।
১৭২৫. বাদায়েউস সানায়ে (২/২১২)।
১৭২৬. আল-মুহিতুল বুরহানি (৫/৩১১)। হাশিয়াতুত তাহতাভি (৬২১)।
১৭২৭. আল-বাহরুর রায়েক (২/৩৪৩)।
১৭২৮. নুরুল ইযাহ (৯৮)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
তবে এ ব্যাপারে তাহকিকি কথা হলো, বিষয়টি উন্মুক্ত না করে আমাদের আসলাফ তথা ইমাম আজমের বক্তব্যের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করা উচিত। অর্থাৎ, (এক.) হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, মৃত ব্যক্তি জীবিত ব্যক্তির সালাম শুনতে পায় এবং উত্তর দেয়। ইমাম আজম রহ.-এর মতে, কবরে মৃত ব্যক্তির রুহ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। (দুই.) স্থানগত দিক থেকে শরিয়তে কবরস্থানে কুরআন তেলাওয়াত নিষেধাজ্ঞার মতো কোনো উপাদান নেই। কারণ, জায়গাটা নোংরা কিংবা কুরআনের শানের জন্য অনুপযুক্ত নয়। (তিন.) কুরআন তেলাওয়াত এক ধরনের দোয়া, বরং সর্বোত্তম দোয়া। আর কবরস্থানে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া পড়া বৈধ। ফলে কবরের পাশে কুরআন তেলাওয়াত বৈধ হওয়া যৌক্তিক।
তবে যেহেতু হুবহু এই পদ্ধতিটা (তথা সরাসরি কুরআন তেলাওয়াত) রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবা থেকে প্রমাণিত নয়, ফলে এটাকে সুন্নাত ও ইবাদত মনে করে নিয়মিত আমলের অংশ বানানো উচিত হবে না। মুহাক্কিক হানাফি আলেমদের বক্তব্যের সারমর্মও এটা। মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি বলেন, ‘কবরস্থানে নিম্নস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করলে মাকরুহ হবে না। কিন্তু উচ্চৈঃস্বরে তেলাওয়াত করলে মাকরুহ হবে। হ্যাঁ, যদি কবরবাসীকে তেলাওয়াত শুনিয়ে তৃপ্ত করার উদ্দেশ্যে উচ্চৈঃস্বরে পড়ে, তবে বৈধ।’
এ বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তেলাওয়াতের পদ্ধতিটাকে ইবাদত বা সুন্নাত মনে করা হচ্ছে না, বরং মূল উদ্দেশ্য ঈসালে সওয়াব। এ কারণেই নিম্নস্বরে তেলাওয়াতের কথা বলা হয়েছে। আর ইমাম আজম এবং হানাফি মাযহাবমতে ঈসালে সওয়াবের জন্য কুরআন তেলাওয়াত মসজিদ, ঘর কিংবা দোকান—সর্বত্র করা যায়। সুতরাং কবরস্থানেও করা যাবে। হ্যাঁ, যেহেতু মৃত ব্যক্তি জীবিতদের আওয়াজ শুনতে পায়, তাই তাকে শোনানোর উদ্দেশ্যে যদি উচ্চৈঃস্বরে পড়ে, তবে তাতে অসুবিধা নেই। কাযিখান একই কথা স্পষ্ট করে লিখেন, ‘যদি কবরবাসীকে তেলাওয়াত শুনিয়ে তৃপ্ত করার উদ্দেশ্যে কবরের পাশে কুরআন তেলাওয়াত করা হয়, তবে করা যেতে পারে। যদি ঈসালে সওয়াব উদ্দেশ্য হয়, তবে আল্লাহ তাআলা সকল জায়গার তেলাওয়াত শুনতে পান (কবরের পাশে তেলাওয়াত নিষ্প্রয়োজন)।’ তবে যদি পদ্ধতিটাকেই সুন্নাত মনে করা হয়, তবে সেটা বিদআত হবে।
মোটকথা, কবরস্থানে কুরআন পড়াকে একবাক্যে বিদআত বলে দেওয়া সঠিক নয়, যেমনটা একদল আলেম নির্বিচারে সবগুলোকে বিদআত গণ্য করে থাকেন। খোদ সাহাবা ও তাবেয়িন থেকে কবরের কাছে কুরআন তেলাওয়াতের ওসিয়ত পাওয়া যায়। তাহলে এটাকে একবাক্যে বিদআত বলা যায় কীভাবে? যেমন—ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করে যান যেন তাঁর কবরের কাছে সুরা বাকারা পাঠ করা হয়। ইমাম আহমদ প্রথমে এটা নিষেধ করতেন। এ জন্য এক অন্ধ ব্যক্তিকে তিনি কবরের কাছে কুরআন পাঠ করতে দেখে বলেন, এটা বিদআত! পরে মুহাম্মাদ ইবনে কুদামা তাকে বলেন, আবদুর রহমান ইবনুল আলা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করে যান যেন দাফনের সময় তাঁর মাথার কাছে সুরা বাকারার প্রথম ও শেষ অংশ তেলাওয়াত করা হয়। তিনি বলেন, আমি ইবনে উমরকে এমন ওসিয়ত করতে শুনেছি! এটা শুনে ইমাম আহমদ বলেন, যাও! লোকটিকে গিয়ে বলো সে যেন কুরআন তেলাওয়াত করে! ইমাম শাফেয়ি রহ.-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কবরের কাছে কুরআন তেলাওয়াত করা যাবে কি না? তিনি বললেন, 'কোনো সমস্যা নেই।'
সুতরাং কবরের কাছে কুরআন তেলাওয়াত ইমাম মুহাম্মাদ, শাফেয়ি ও আহমদের মতে বৈধ। পরবর্তী ইমামদের মাঝে কাযি ইয়ায ও কারাফিও এটাকে বৈধ লিখেছেন। হানাফি উলামায়ে কেরামের সকলে বৈধ এবং কেউ কেউ মুস্তাহাব পর্যন্ত লিখেছেন। তারা সাহাবির আমল ও ইস্তিহসানের ভিত্তিতে এটা বলেছেন। ফলে এটাকে একবাক্যে বিদআত বলে দেওয়ার সুযোগ নেই। বিপরীতে ইমাম আজম ও আবু ইউসুফ রহ. এটাকে মাকরুহ (তাহরিমি) বলতেন। ইমাম মালেকও মাকরুহ বলতেন। তারা মনে করতেন এটা রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এবং সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত নয়। অসম্ভব নয় যে, ইবনে উমরের বক্তব্য তাদের কাছে পৌঁছয়নি কিংবা পৌঁছলেও সেটাকে বিশুদ্ধ গণ্য করেননি। খোদ ইমাম আহমদ থেকেও কবরের কাছে তিলাওয়াত সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞার বর্ণনা রয়েছে।
তাই যদি ঈসালে সওয়াব উদ্দেশ্য হয়, তবে কবরস্থানে কুরআন পড়া নিষ্প্রয়োজন। পড়লেও নিম্নস্বরে পড়া উচিত। যদি মৃতদের শুনিয়ে তাদের প্রফুল্ল এবং তাদের চিত্ত প্রশান্ত করা উদ্দেশ্য হয়, তবে সেটা করা মুবাহ (বৈধ) হবে। আর যদি কবরের পাশে উচ্চৈঃস্বরে কুরআন পড়াটাই কবর যিয়ারতের সুন্নাতের অংশ কিংবা অতিরিক্ত পুণ্যের মাধ্যম মনে করা হয়, তবে সেটা মাকরুহ তাহরিমি বা নিষিদ্ধ হবে, যেমনটা ইমাম আজম ও আবু ইউসুফের মত। কারণ, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এবং সাহাবায়ে কেরাম সচরাচর এমন করতেন না। এটা সালাফে সালেহিনের আমলও নয়। আর ইবাদতের ক্ষেত্রে সুন্নাত ও সালাফের যত কাছাকাছি থাকা যায়, তত উত্তম।
টিকাঃ
১৭২৯. আল-মুহিতুল বুরহানি (৫/৩১১)।
১৭৩০. ফাতাওয়া কাযিখান (৩/৩২৬)।
১৭৩১. দেখুন: আর-রুহ, ইবনুল কাইয়িম (২১-২২, ১৭৪)।
১৭৩২. দেখুন: আবু দাউদের বর্ণনায় 'মাসায়েলুল ইমাম আহমদ' (১৫৮)।