📄 বিদআতের সংজ্ঞা ও পরিচয়
ইমাম আজম রহ. তথা তাবেয়িদের যুগে উম্মাহর মাঝে শিরকের মতো (আমলি) বিদআতের পরিমাণও ছিল অত্যন্ত কম। ফলে এ ব্যাপারে ইমাম আজম রহ.-এর লম্বা আলোচনা পাওয়া যায় না। বিদআত (البدعة) শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো নতুন আবিষ্কার, নব আবিষ্কৃত বস্তু। শরয়ি পরিভাষায় এর অর্থ নিয়ে সুদীর্ঘ আলোচনা, পর্যালোচনা, মতামত ও মতভেদ রয়েছে। আল্লামা শুরুম্বুলালি শুমুন্নির উদ্ধৃতিতে বিদআতের সংজ্ঞায় লিখেন, 'রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আনীত ইলম, আমল ও পদ্ধতির বিপরীতে নতুন কোনো ইলম, আমল বা পদ্ধতি উদ্ভাবন করা। সংশয়ের কারণে হোক কিংবা সৎ উদ্দেশ্যে হোক, যখন এমন কিছুকে দ্বীন ও সিরাতে মুস্তাকিম বানিয়ে ফেলা হবে, তখন সেটা বিদআত গণ্য হবে।'¹⁷⁰⁸ এটা বিদআতের স্পষ্ট সংজ্ঞা; কোনো অস্পষ্টতা নেই। ফলে ইলম, আমল, মানহাজ—সবকিছু বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে যদি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে প্রমাণিত নয় এমন কোনো বিষয়কে দ্বীনের অংশ বানানো হয়।
শাতেবি বিদআতের সুন্দর অর্থ লিখেছেন, যা বিদআতের সূক্ষ্ম, সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেশ করে। শাতেবি লিখেন, 'বিদআত হলো দ্বীনের মাঝে শরিয়ত-সদৃশ নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন, যার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন।' উক্ত সংজ্ঞার্থের মাধ্যমে কয়েকটি জিনিস স্পষ্ট হয় :
এক. বিদআত কেবল দ্বীনি বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবে। পৃথিবীর জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে নিত্যনতুন পদ্ধতি গ্রহণ করা বিদআত নয়। এ কারণে গাড়িতে চড়া বিদআত হবে না, ভাত-বিরিয়ানী খাওয়া বিদআত হবে না, মোবাইল বা মাইক চালানো বিদআত গণ্য হবে না। কারণ, এগুলো দ্বীনি বিষয় নয়।
দুই. শরিয়তের মাঝে সম্পূর্ণ নতুন উদ্ভাবিত হতে হবে। অর্থাৎ, শরিয়তের সঙ্গে এর কোনো পূর্বসম্পর্ক কিংবা ভিত্তি (الأصل) না থাকতে হবে। কিন্তু যদি শরিয়তের উসুলের আলোকে উদ্ভাবিত হয়, তবে সেটা বিদআত হবে না। এ কারণে নাহু, সরফ, আকিদা, উসুলুল ফিকহ ইত্যাদি শেখা ও চর্চা করা বিদআত হবে না। মাদরাসায় নির্দিষ্ট সিলেবাসে পড়া বিদআত হবে না। কারণ, এগুলোর মূল ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহতে বিদ্যমান।
তিন. শরিয়তসদৃশ হতে হবে। অর্থাৎ, শরিয়তে যেমন ইবাদতের নির্দিষ্ট সময় ও পদ্ধতি বলে দেওয়া হয়েছে, ইবাদতের জন্য এ ধরনের বিশেষ সময়, অবস্থা ও পদ্ধতি নির্ধারণ করা। যেমন—বিশেষ কোনো দিন বিশেষ বিশ্বাসের সঙ্গে নিয়ম করে রোযা রাখা অথচ শরিয়তে এ ধরনের রোযার কথা বলা হয়নি। বিশেষ কোনো পদ্ধতিকে ইবাদত মনে করে সর্বদা সে পদ্ধতিতে জিকির করা যে পদ্ধতি শরিয়তে বলা হয়নি। বিশেষ কোনো দিনে কোনো বিশেষ ধর্মীয় আচার নিয়মতান্ত্রিকভাবে পালন করা। কিন্তু এমন সাদৃশ্য ছাড়া এমনিতেই কোনো বিশেষ দিনে রোযা রাখলে কিংবা হঠাৎ এমনিতেই বিশেষ পদ্ধতিতে জিকির করলে সেটা বিদআত হবে না।
চার. উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর বেশি ইবাদত। সুতরাং ইবাদতের নিয়তে নতুন বিষয় সংযোজন করলে বিদআত হবে, বাহ্যত সেটা দ্বীনি বিষয় না হলেও। যেমন—ইবাদতের নিয়তে বিশেষ কোনো পোশাক পরা কিংবা বিশেষ কোনো খাবার খাওয়া! বাহ্যত এগুলো দ্বীনি কাজ না হলেও বিদআত হওয়ার কারণ ইবাদতের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, ইবাদতের উদ্দেশ্যের বিদ্যমানতা নিছক দুনিয়াবি কাজটাকেও ‘দ্বীনি’ বিষয় এবং ‘শরিয়তসদৃশ’ করে দিচ্ছে, ফলে সেটা বিদআতে পরিণত হবে। কিন্তু ইবাদতের নিয়ত না থাকলে সেটা সাধারণ আচার-অভ্যাস কিংবা সাধারণ কর্ম হিসেবে গণ্য হবে।¹⁷⁰⁹
টিকাঃ
১৭০৮. গুনইয়াতু যাবিল আহকাম (১/৮৫) [দুরারুল হুক্কামের সঙ্গে সংযুক্ত হাশিয়া]।।
১৭০৯. দেখুন: আল-ইতিসাম, শাতেবি (১/৪৭-৫৫)।
📄 বিদআত থেকে রাসূলুল্লাহর (সা.) সতর্কবার্তা
উলামায়ে কেরামপ্রদত্ত বিদআতের বিভিন্ন সংজ্ঞার্থের মূল ভিত্তি হলো রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কিছু হাদিস। যেমন—আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মাঝে এমন কোনো নতুন বিষয় যোগ করল যা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, সেটা প্রত্যাখ্যাত হবে।'¹⁷¹⁰ এই নবসৃষ্ট প্রত্যাখ্যাত বিষয়টিই বিদআত।
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'মনে রেখো, সর্বোত্তম কথা হলো আল্লাহর কালাম (কুরআন)। আর সর্বোত্তম হেদায়াত হচ্ছে রাসুলুল্লাহর হেদায়াত (সুন্নাত)। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট হচ্ছে দ্বীনের মাঝে নবসৃষ্ট বিষয়গুলো। প্রত্যেক নবসৃষ্ট বিষয় বিদআত। প্রত্যেক বিদআত গোমরাহি। আর প্রত্যেক গোমরাহির পরিণতি হলো জাহান্নাম।'¹⁷¹¹
ইরবাজ ইবনে সারিয়াহ থেকে বর্ণিত, 'একদিন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নিয়ে নামায পড়লেন। নামাযশেষে আমাদের দিকে ফিরে গুরুগম্ভীর ওয়াজ করলেন। ... রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমি তোমাদের তাকওয়া ও আনুগত্যের ওসিয়ত করছি, একজন হাবশি দাসকেও (তোমাদের শাসক বানানো হলে তার আনুগত্য করবেন)। কেননা, আমার পরে তোমাদের যারা বেঁচে থাকবে, প্রচণ্ড মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত এবং খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরবে। সেগুলো তোমরা মজবুতভাবে ধরে রাখবে। দাঁত কামড়ে পড়ে থাকবে। সাবধান! (দ্বীনের মাঝে) নবসৃষ্ট বিষয়গুলো থেকে তোমরা বেঁচে থাকো। কারণ, (দ্বীনের ক্ষেত্রে) প্রত্যেক নবসৃষ্ট বিষয় বিদআত। আর প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা।'¹⁷¹²
আলি রাযি. রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন, 'যে ব্যক্তি দ্বীনের মাঝে নতুন কিছু সৃষ্টি করবে, অথবা নতুন কিছু সৃষ্টিকারীকে আশ্রয় দেবে (অর্থাৎ, বিদআত শুরু করবে কিংবা বিদআতিকে আশ্রয় দেবে), তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতা এবং সকল মানুষের অভিসম্পাত!'¹⁷¹³
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, 'সর্বোত্তম হেদায়াত হলো আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর হেদায়াত। সর্বোত্তম কথা হলো আল্লাহর কথা। অতি শীঘ্রই তোমরা দ্বীনে নতুন বিষয় সৃষ্টি করবে। তোমাদের জন্য নতুন বিষয় সৃষ্টি করা হবে। মনে রেখো, প্রত্যেক নতুন সৃষ্টি (বিদআত) গোমরাহি। আর প্রত্যেক গোমরাহির পরিণতি জাহান্নাম।'¹⁷¹⁴ অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'সুতরাং যখন তোমাদের মাঝে কোনো বিদআত সৃষ্টি করা হবে, তখন তোমরা সেটা বর্জন করে প্রথম যুগের হেদায়াত আঁকড়ে ধরবে। আহলে কিতাব (তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা) মূলত এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে। ... অবস্থা এমন হয়ে গিয়েছে যে, আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে আজ তারা কিছুই জানে না।'¹⁷¹৫
এ কথা স্পষ্ট যে, উম্মতে মুহাম্মাদি বিদআত আঁকড়ে ধরলেও অভিন্ন পরিণতি তৈরি হবে। উম্মত সুন্নাত বাদ দিয়ে বিদআতের মাঝে ডুবে যাবে। দুঃখজনকভাবে উম্মতের বিভিন্ন অংশে এমন হৃদয়বিদারক বাস্তবতা তৈরি হয়েছেও।
টিকাঃ
১৭১০. বুখারি (কিতাবুস সুলহ: ২৬৯৭)। মুসলিম (কিতাবুল আকযিয়াহ: ১৭১৮)।
১৭১১. মুসলিম (কিতাবুল জুমুআহ : ৮৬৭)।
১৭১২. আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৬০৭)। দারেমি (মুকাদ্দিমা: ৯৬)। ইবনে হিব্বান (মুকাদ্দিমা : ৫)।
১৭১৩. বুখারি (ফাযায়িলুল মদিনা: ১৮৭০)। মুসলিম (কিতাবুল হজ: ১৩৭১)।
১৭১৪. শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (১/৮৬)।
১৭১৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৮৬)।
📄 বিদআতের বিরুদ্ধে ইমাম
ইমাম আজম রহ. বিদআত থেকে শক্তভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি নিজস্ব সূত্রে এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর একাধিক হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি (হাম্মাদ → ইবরাহিম → আলকামা → ইবনে মাসউদ সূত্রে) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি ইসলামে নতুন কিছুর উদ্ভাবন করবে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যে কোনো বিদআতের সূচনা করবে, সে গোমরাহ হয়ে যাবে। আর গোমরাহের পরিণতি হলো জাহান্নাম।'¹⁷¹⁶
ইমাম আজম হাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেন, ইবনে মাসউদ রাযি. বলতেন, 'সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হচ্ছে (দ্বীনের মাঝে) নব আবিষ্কৃত বিষয়। প্রত্যেক নব আবিষ্কৃত বিষয় বিদআত। প্রত্যেক বিদআত গোমরাহি। প্রত্যেক গোমরাহির পরিণতি হচ্ছে জাহান্নাম।'¹⁷¹⁷
ইমাম আরও বলেন, 'তোমরা যেসব বস্তু শিখছ এবং মানুষকে শেখাচ্ছ, তন্মধ্যে সবচেয়ে উত্তম (ইলম) হলো সুন্নাহ। মানুষের আবিষ্কৃত বিদআতের মাঝে হেদায়াত নেই। হেদায়াত তো কেবল কুরআন, রাসুলুল্লাহর সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের পথে। এ ছাড়া সবই দ্বীনের ক্ষেত্রে সংযোজন। বিদআত।¹⁷¹⁸ ইমাম আরও বলেন, 'সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরো। সালাফের অনুসরণ করো। প্রত্যেক নবসৃষ্ট বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, সেগুলো বিদআত।'¹⁷¹৯
ইমাম আজম মাইমুন ইবনে মিহরান থেকে ইবনে আব্বাস সূত্রে বর্ণনা করেন, একব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে আপনি শিক্ষা দিন। তিনি বললেন, 'যাও, কুরআন শেখো।' তাঁকে তিনি তিনবার এ কথা বললেন। অতঃপর চতুর্থবার বললেন, 'বন্ধু হোক কিংবা শত্রু হোক, সত্য যার কাছেই পাও, গ্রহণ করে নাও। কুরআন শেখো। কুরআনের পথে চলো।'¹⁷²⁰
টিকাঃ
১৭১৬. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৯)।
১৭১৭. আল-ফিকহুল আবসাত (৫২-৫৩)।
১৭১৮. আর-রিসালাহ (৩৫)।
১৭১৯. যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহি (৫/২০৭)।
১৭২০. আল-ফিকহুল আবসাত (৫২-৫৩)।