📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 অধমের পর্যবেক্ষণ

📄 অধমের পর্যবেক্ষণ


এখানে ইমাম আজম রহ. সব ধরনের 'ওসিলা' গ্রহণকে নিষেধ করেননি, বরং নির্দিষ্ট কিছু শব্দের ব্যবহার ও বিশ্বাসকে নাকচ করেছেন। যেমন—প্রথম বাক্যে আল্লাহর উপর কারও অধিকার খাটিয়ে দোয়া করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন। মানুষের উপর তাঁর দেওয়া সবকিছু স্রেফই অনুগ্রহ ও করুণা। তাঁর উপর নবি-রাসুল কিংবা ফেরেশতা কারও কোনো অধিকার নেই। বরং সবাই তাঁর অনুগ্রহের ভিখারী। ফলে কোনো নবির প্রতি কিংবা কাবা ঘরের প্রতি অতিরঞ্জিত সম্মান প্রদর্শন করে আল্লাহর উপর সেগুলোর অধিকার সাব্যস্ত করাকে নাকচ করা হয়েছে। এটা স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। সুতরাং ইমাম আজম উক্ত বাক্যে ওসিলাগ্রহণকে নাকচ করেননি, অধিকার সাব্যস্ত করাকে নাকচ করেছেন। দুটোর মাঝে পার্থক্য সুস্পষ্ট। ওসিলার ক্ষেত্রে আল্লাহর উপর কারও অধিকার সাব্যস্ত করা হয় না, বরং আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তির মর্যাদা, আল্লাহর সঙ্গে তাঁর মহব্বতের সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ের সুবাদে দোয়া করা হয়। ফলে প্রথমটা নিষেধ, তাই দ্বিতীয়টাও নিষেধ হবে এটা অযৌক্তিক কথা। এ জন্য 'নবির হকের ওসিলায়' বলার দ্বারা যদি 'নবির সম্মানের ওসিলা' উদ্দেশ্য নেওয়া হয়, তবে সেটা মোটেই নিষিদ্ধ নয়।

একইভাবে দ্বিতীয় বাক্য নিষিদ্ধের কারণ হলো আরশের সম্মান প্রার্থনা করা কিংবা আরশের সম্মানে প্রার্থনা করা। সাধারণত ওসিলা সেসব বিষয়ের গ্রহণ করতে হয়, যেগুলোর সঙ্গে বান্দার সরাসরি সম্পর্ক থাকে। যেমন—আপনি আল্লাহর রাসুলের অনুসরণ করছেন, তখন রাসুলের ওসিলায় প্রার্থনা করবেন। আপনি কোনো বুযুর্গকে মহব্বত করেন এবং ভালোবাসেন, তাদের অনুসরণ করেন, তাদের ওসিলায় প্রার্থনা করবেন। কারণ, তাদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এমন বিষয় যার সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই, সেটার ওসিলায় প্রার্থনা করার যৌক্তিকতা কী? আল্লাহর আরশের ওসিলায় আপনি কেন প্রার্থনা করবেন? আরশের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী? তাহলে তো পৃথিবীর সবকিছুর ওসিলা দিয়ে দোয়া করা বৈধ হবে। বিপরীতে রাসুলুল্লাহর ওসিলায় যখন প্রার্থনা করবেন, তখন এর অর্থ অনেকটা এমন দাঁড়াবে—হে আল্লাহ, আমি আপনার রাসুলকে ভালোবাসি, তাঁর অনুসরণের চেষ্টা করি। আমি তাঁর একজন একনিষ্ঠ উম্মত। তিনি যেহেতু আপনার কাছে সম্মানিত ও মহব্বতের পাত্র, তাই তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসা ও অনুসরণের সুবাদে তাঁর মর্যাদার দিকে তাকিয়ে আপনি আমার দোয়া কবুল করুন! দুটোর মাঝে পার্থক্য সুস্পষ্ট।

বরং খোদ ইবনে তাইমিয়্যাহ, যার বক্তব্য প্রথম মতাদর্শের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়, তিনিও কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহিনের মাঝে এ প্রকারের তাওয়াসসুলের অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। তিনি লিখেন, আবু হানিফা এবং অন্যান্য আলেম থেকে 'নবি-রাসুলসহ অন্যান্য মাখলুকের মাধ্যমে দোয়া করার নিষেধাজ্ঞা'-সম্পর্কিত যেসব বক্তব্য এসেছে, সেগুলোতে দুটো বিষয় রয়েছে : এক. তাদের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার উপর কসম খাওয়া। এটা আলেমদের সর্বসম্মতিতে নিষিদ্ধ। দুই. তাদের মাধ্যমে দোয়া করা। এটাকে একদল লোক বৈধ বলেছেন। কতক সালাফ থেকে এ ব্যাপারে বর্ণনা রয়েছে। (فهذا يجوزه طائفة من الناس ونقل في ذلك آثار عن بعض السلف وهو موجود في دعاء كثير من الناس)¹⁶৯৭ তিনি অন্যত্র বলেন, 'ফলে এ ধরনের দোয়া সালাফ থেকে প্রমাণিত। আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত আছে, তিনি নবিজি (ﷺ)-এর ওসিলা দিয়ে দোয়া করেছেন। আরেক দল সেটা নিষেধ করেছে।' (فهذا الدعاء ونহوه قد روي أنه دعا به السلف ونقل عن أحمد بن حنبل في منسك المروذي التوسل بالنبي صلى الله عليه وسلم في الدعاء ونهى عنه آخرون)¹⁶৯৮

উপরের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, যদি তাওয়াসসুলের বিপক্ষের লোকদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য ধরা হয়, তবুও সেটা স্রেফ মতভেদপূর্ণ একটা বিষয়ে পরিণত হয়, যাকে সর্বোচ্চ মাকরুহ অভিহিত করা যায়। অথচ এমন একটা বিষয়কে বড় করে যুগের পর যুগ উম্মাহর দেহ ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। এটাকে শিরক এবং কাফেরদের মূর্তিপূজাসদৃশ আখ্যা দিয়ে মুসলমানদের উপর খড়গ চালানো হয়েছে, যা দ্বীনের নামে বাড়াবাড়ি এবং কোনোক্রমেই বৈধ নয়।

তা ছাড়া, বর্তমান আলোচনার শুরুতেই যেমন বলা হয়েছে, কোনো নবি বা ওলির ওসিলা দিয়ে দোয়া করলেই সেটা কবুল হয়ে যাবে কিংবা যার ওসিলা দেওয়া হচ্ছে তিনি দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখবেন—এ ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাস রাখা যাবে না। বরং দোয়া কবুলের একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। তিনি বলেন, ۞ وَإِذَا سأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ۖ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ ۞ অর্থ : 'আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্বন্ধে আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, (আপনি বলুন) আমি তো নিকটেই। যখন কেউ আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। সুতরাং তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় আর আমার প্রতি ঈমান আনে। তাহলে তারা সুপথপ্রাপ্ত হবে।' [বাকারা : ১৮৬] ফলে কেবল আল্লাহর কাছে, তাঁর প্রতি সুধারণা রেখে, তাঁর অনুগ্রহের আশা নিয়ে দোয়া করতে হবে। এটা আহলে সুন্নাতের নির্ভরযোগ্য সকল আলেমের সিদ্ধান্ত।

টিকাঃ
১৬৯৭. মাজমুউল ফাতাওয়া (১/২২২)।
১৬৯৮. প্রাগুক্ত (১/২৬৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00