📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ঈসালে সওয়াবের পরিচয় এবং সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

📄 ঈসালে সওয়াবের পরিচয় এবং সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি


মৃত মুসলমানদের জন্য জীবিতদের পক্ষ থেকে দোয়া ও সদকাসহ বিভিন্নভাবে পুণ্য পাঠানো এবং সেগুলোর মাধ্যমে মৃতদের উপকৃত হওয়া ইসলামি শরিয়াহর প্রতিষ্ঠিত আকিদা। আহলে সুন্নাতের উলামায়ে কেরাম সকলে এ ব্যাপারে একমত। কারণ, কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমার মাধ্যমে বিষয়টি প্রমাণিত। কিন্তু দুই দল মানুষ এক্ষেত্রে দুই ধরনের প্রান্তিকতার শিকার হয়েছে। একদল ঈসালে সওয়াবের নামে মুসলিম সমাজে নানান বিদআতি রসম-রেওয়াজ চালু করেছে। বিভিন্ন পৌত্তলিক কুংস্কার ও রীতিনীতি মুসলমানদের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছে। মৃতকে ঘিরে একুশা, চল্লিশা, বিশাল ভোজসভা, টাকাপয়সার বিনিময়ে কুরআনখানি, কবরকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের প্রথা-পার্বণ ইত্যাদিকে সওয়াবের কাজ মনে করেছে। অথচ ইসলাম ও সুন্নাহসম্মত ঈসালে সওয়াবের সঙ্গে এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো মৃতদের জন্য অনুপকারী এবং জীবিতদের জন্য ক্ষতিকর। বিপরীতে আরেক দল লোক ঈসালে সওয়াবের নানান বৈধ পদ্ধতিকেও বিদআত গণ্য করেছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো—কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে ঈসালে সওয়াব করা।

ইমাম আজমের রহ.-এর মতে, জীবিতদের বিভিন্ন ইবাদতের মাধ্যমে মৃতদের উপকৃত হওয়া কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। পরবর্তীকালে সকল হানাফি আলেম ইমাম আজমের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। ইমাম তহাবি বলেন, 'জীবিতদের দোয়া ও সদকাতে মৃতদের জন্য উপকার রয়েছে।'¹⁶⁷৪ আবু হাফস বলেন, 'আহলে সুন্নাতের বৈশিষ্ট্য হলো, মৃতদের জন্য জীবিতদের দোয়া ও সদকাকে উপকারী মনে করা। মুতাযিলা ও বিদআতিরা এটা অস্বীকার করে।'¹⁶⁷৫

কুরআনে আল্লাহ তাআলা মাতা-পিতার জন্য দোয়া করতে শিখিয়েছেন, ۞ وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا ۞ অর্থ : মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত করো এবং বলো, 'হে আমার প্রতিপালক, তাদের দুজনের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।' [ইসরা : ২৪] কেবল মাতা-পিতা নয়, সকল মুমিনের জন্য দোয়ার কথা বলেছেন, ۞ رَّبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ ۞ অর্থ : 'হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করে, তাদের এবং সমস্ত মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারীদের ক্ষমা করুন।' [নুহ: ২৮] অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ۞ وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ۞ অর্থ : 'যারা তাদের পরে আগমন করেছে, তারা বলে : হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতৃগণকে ক্ষমা করুন এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়।' [হাশর : ৮-১০] যদি জীবিতদের দোয়া মৃতদের কোনো উপকারই না করত, তবে এভাবে দোয়া শিখিয়ে দেওয়া অর্থহীন কাজ গণ্য হতো। আল্লাহ তাআলা এমন কাজ থেকে পবিত্র।

একাধিক হাদিস দ্বারাও বিষয়টি প্রমাণিত। যেমন—জানাযাবিষয়ক একাধিক হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, জানাযা মূলত মৃতের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার। এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়। আরেক হাদিসে সুষ্পষ্টভাবে এসেছে—মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়। কেবল তিনটি পুণ্যের পথ খোলা থাকে। এক. সদকা জারিয়া। দুই. তার রেখে যাওয়া মানুষের জন্য উপকারী ইলম। তিন. নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।¹⁶⁷৬ আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, আমার মা হঠাৎ মারা গিয়েছেন। তিনি কোনো ওসিয়ত করে যাননি। তবে আমার ধারণা, ওসিয়ত করে যেতে পারলে সদকার কথা বলতেন। আমি যদি তাঁর পক্ষ থেকে সদকা করি, তিনি কি উপকৃত হবেন? রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হ্যাঁ।¹⁶⁷৭ সাদ ইবনে উবাদা থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসুলকে বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার মা মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর জন্য কোন সদকা উত্তম হবে? রাসুল (ﷺ) বললেন, পানি। তখন সাদ তাঁর মায়ের পক্ষ থেকে একটি কূপ খনন করেন।¹⁶৭৮ জাবের ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে কুরবানির দিন ঈদগাহে উপস্থিত ছিলাম। খুতবার পরে তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করলেন। একটি ছাগল নিজ হাতে যবাই করলেন। বললেন, 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার! এটা আমার এবং আমার উম্মতের যারা কুরবানি করেনি সবার পক্ষ থেকে।'¹⁶⁷৯ এখানে জীবিত ও মৃতের মাঝে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।

টিকাঃ
১৬৭৪. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৮)।
১৬৭৫. আস-সাওয়াদুল আজম (৩, ১৯).
১৬৭৬. মুসলিম (কিতাবুল ওয়াসিয়্যাহ : ১৬৩১)। আবু দাউদ (কিতাবুল ওয়াসায়া : ২৮৮০)। তিরমিযি (আবওয়াবুল আহকাম : ১৩৭৬)।
১৬৭৭. বুখারি (কিতাবুল জানায়েয: ১৩৮৮)। মুসলিম (কিতাবুয যাকাত: ১০০৪)।
১৬৭৮. আবু দাউদ (কিতাবুয যাকাত: ১৬৮১)।
১৬৭৯. আবু দাউদ (কিতাবুয যাহায়া: ২৮১০)। তিরমিযি (আবওয়াবুল আযাহি: ১৫২১)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে ঈসালে সওয়াব বৈধ

📄 কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে ঈসালে সওয়াব বৈধ


মৌলিকভাবে জীবিতদের দোয়া ও সদকার মাধ্যমে মৃতদের উপকৃত হওয়া ইসলামের প্রতিষ্ঠিত এবং আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত আকিদা। তবে কোন কোন আমলের পুণ্য মৃতদের কাছে পৌঁছয় আর কোন আমল পৌঁছয় না, সেটা নিয়ে আলেমদের কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা এবং হানাফি মাযহাবের উলামায়ে কেরাম মনে করেন, সব ধরনের আমলের সওয়াব মৃতদের কাছে ঈসাল করা সম্ভব এবং তারা এর মাধ্যমে উপকৃত হয়। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহতে বিশেষ কোনো আমল ঈসালে সওয়াবের জন্য নির্ধারিত করে দেওয়া হয়নি। মালেক ও শাফেয়ি (বিশেষত পরবর্তী মালেকি ও শাফেয়িগণ) থেকেও একই মতামত পাওয়া যায়। বিপরীতে একদল আলেম মনে করেন, আর্থিক ইবাদত (সদকা, হজ) ঈসালে সওয়াব করা যায়; শারীরিক ইবাদত (নামায, রোযা, তেলাওয়াত) ঈসাল করা যায় না।¹⁶⁸⁰

হাসকাফি (১০৮৮ হি.) মৃতের যিয়ারত প্রসঙ্গে লিখেন, কবরের কাছে গিয়ে বলবে, 'আসসালামু আলাইকুম মুমিন সম্প্রদায়, আমরা শীঘ্রই আপনাদের সঙ্গে এসে মিলিত হচ্ছি' (السَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ)। অতঃপর সুরা ইয়াসিন পাঠ করবে। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি এগারোবার সুরা ইখলাস পাঠ করবে, অতঃপর এর সওয়াব মৃতদের জন্য বখশে দেবে, তাকে মৃতদের সংখ্যাসমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে (অর্থাৎ, প্রত্যেকের পক্ষ থেকে পড়া হবে)। 'শরহুল লুবাব' গ্রন্থে এসেছে, (যিয়ারতের সময়) যতটুকু সম্ভব কুরআন পাঠ করবে। যেমন—সুরা ফাতিহা, সুরা বাকারার শুরু থেকে 'আল-মুফলিহুন' পর্যন্ত, আয়াতুল কুরসি, (বাকারার শেষে) 'আমানার রাসুল' থেকে শেষ পর্যন্ত, সুরা ইয়াসিন, সুরা মুলক, সুরা তাকাসুর এবং এগারো/বারো/তেরো বা সতেরোবার সুরা ইখলাস পড়বে। শেষে দোয়া করবে, 'হে আল্লাহ, আমরা যা পাঠ করলাম এর সওয়াব আপনি অমুক অমুক ব্যক্তির রুহে পৌঁছিয়ে দিন।' ইবনে আবিদিন লিখেন, আমাদের উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—নামায, রোযা, সদকা ইত্যাদিসহ যেকোনো আমল মৃতের জন্য ঈসালে সওয়াব করা যেতে পারে। হ্যাঁ, মালেক ও শাফেয়ি শারীরিক ইবাদত—যেমন : নামায, তেলাওয়াত এগুলোকে—আলাদা রাখেন। তাদের মতে, এগুলোর সওয়াব মৃতের রুহে পৌঁছয় না। বিপরীতে হজ, সদকা এগুলোর পুণ্য পৌঁছয়। তবে মুতাআখখিরিন তথা পরবর্তী সময়ের শাফেয়ি উলামায়ে কেরামও তাদের মত পরিবর্তন করেন এবং তেলাওয়াতের সওয়াব মৃতের রুহে পৌঁছয় বলে মত প্রকাশ করেন।¹⁶⁸¹

বিভিন্ন বর্ণনায় বোঝা যায়, খোদ ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদও তেলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির রুহে পৌঁছয় মনে করতেন। কারণ, সাহাবা ও তাবেয়িন থেকে কুরআন তেলাওয়াতের ওসিয়ত পাওয়া যায়। যেমন—ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করে যান যেন তাঁর কবরের কাছে সুরা বাকারা পাঠ করা হয়। ইমাম আহমদ প্রথমে এটা নিষেধ করতেন। এ জন্য এক অন্ধ ব্যক্তিকে তিনি কবরের কাছে কুরআন পাঠ করতে দেখে বলেন, এটা বিদআত! পরে মুহাম্মাদ ইবনে কুদামা তাকে বলেন, আবদুর রহমান ইবনুল আলা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করে যান যেন দাফনের সময় তাঁর মাথার কাছে সুরা বাকারার প্রথম ও শেষ অংশ তেলাওয়াত করা হয়। তিনি বলেন, আমি ইবনে উমরকে এমন ওসিয়ত করতে শুনেছি! এটা শুনে ইমাম আহমদ বলেন, যাও! লোকটিকে গিয়ে বলো সে যেন কুরআন তেলাওয়াত করে! সুন্নাহর প্রতি আহমদ ইবনে হাম্বলের আত্মসমর্পণ দেখুন! তা ছাড়া, তাঁর থেকে বর্ণিত আছে, আয়াতুল কুরসি তিনবার এবং সুরা ইখলাস একবার পড়ে সেটার সওয়াব মৃতদের প্রতি ঈসাল করা। ইমাম শাফেয়ি রহ.-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কবরের কাছে কুরআন তেলাওয়াত করা যাবে কি না? তিনি বললেন, 'কোনো সমস্যা নেই।'¹⁶⁸২

এসব বর্ণনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়ে যায় যে, কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব চার মাযহাবের ঐকমত্যে মৃত ব্যক্তির রুহে বখশ করা যায়। তবে মতভেদ থেকে বেঁচে থাকতে যদি দোয়া ও সদকার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা হয়, সেটা নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম।

মুতাযিলারা একবাক্যে সব ধরনের ঈসালে সওয়াব অস্বীকার করে। তাদের দাবি, মানুষের তাকদিরের পরিবর্তন নেই। তা ছাড়া, মানুষ নিজে যা করে তার মাধ্যমে উপকৃত হবে। মৃত্যুর পরে অন্যের আমলে তার কোনো লাভ নেই। মুতাযিলাদের খণ্ডনে আহলে সুন্নাত বলেন, দোয়া ও সদকার মাধ্যমে মৃতের উপকৃত হওয়ার সঙ্গে তাকদিরের কোনো সংঘাত নেই। কারণ, তাকদিরে এভাবে লেখা আছে যে, মৃত্যুর পরেও সে দোয়া পাবে এবং এর মাধ্যমে উপকৃত হবে। আর অন্যের আমলের মাধ্যমে উপকৃত হওয়াও মূলত নিজের আমলই। অর্থাৎ, মৃত ব্যক্তি দুনিয়াতে হয়তো এমন কোনো পুণ্য বা ভালো কাজ করে গিয়েছে যার কারণে জীবিতরা তার জন্য দোয়া করছে। ফলে প্রকারান্তরে জীবিতদের দোয়া ও সদকা তার নিজের কর্মেরই ফসল! তা ছাড়া, এটা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারাই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং যুক্তি দেখিয়ে কুরআন ও সুন্নাহ ছেড়ে দেওয়া বৈধ হবে না।

টিকাঃ
১৬৮০. দেখুন: হিদায়াহ (১/১৭৮)।
১৬৮১. রদ্দুল মুহতার (২/২৪২-২৪৩)।
১৬৮২. দেখুন: আর-রুহ, ইবনুল কাইয়িম (২১-২২, ১৭৪)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 বিদআতের সংজ্ঞা ও পরিচয়

📄 বিদআতের সংজ্ঞা ও পরিচয়


ইমাম আজম রহ. তথা তাবেয়িদের যুগে উম্মাহর মাঝে শিরকের মতো (আমলি) বিদআতের পরিমাণও ছিল অত্যন্ত কম। ফলে এ ব্যাপারে ইমাম আজম রহ.-এর লম্বা আলোচনা পাওয়া যায় না। বিদআত (البدعة) শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো নতুন আবিষ্কার, নব আবিষ্কৃত বস্তু। শরয়ি পরিভাষায় এর অর্থ নিয়ে সুদীর্ঘ আলোচনা, পর্যালোচনা, মতামত ও মতভেদ রয়েছে। আল্লামা শুরুম্বুলালি শুমুন্নির উদ্ধৃতিতে বিদআতের সংজ্ঞায় লিখেন, 'রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আনীত ইলম, আমল ও পদ্ধতির বিপরীতে নতুন কোনো ইলম, আমল বা পদ্ধতি উদ্ভাবন করা। সংশয়ের কারণে হোক কিংবা সৎ উদ্দেশ্যে হোক, যখন এমন কিছুকে দ্বীন ও সিরাতে মুস্তাকিম বানিয়ে ফেলা হবে, তখন সেটা বিদআত গণ্য হবে।'¹⁷⁰⁸ এটা বিদআতের স্পষ্ট সংজ্ঞা; কোনো অস্পষ্টতা নেই। ফলে ইলম, আমল, মানহাজ—সবকিছু বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে যদি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে প্রমাণিত নয় এমন কোনো বিষয়কে দ্বীনের অংশ বানানো হয়।

শাতেবি বিদআতের সুন্দর অর্থ লিখেছেন, যা বিদআতের সূক্ষ্ম, সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেশ করে। শাতেবি লিখেন, 'বিদআত হলো দ্বীনের মাঝে শরিয়ত-সদৃশ নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন, যার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন।' উক্ত সংজ্ঞার্থের মাধ্যমে কয়েকটি জিনিস স্পষ্ট হয় :

এক. বিদআত কেবল দ্বীনি বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবে। পৃথিবীর জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে নিত্যনতুন পদ্ধতি গ্রহণ করা বিদআত নয়। এ কারণে গাড়িতে চড়া বিদআত হবে না, ভাত-বিরিয়ানী খাওয়া বিদআত হবে না, মোবাইল বা মাইক চালানো বিদআত গণ্য হবে না। কারণ, এগুলো দ্বীনি বিষয় নয়।

দুই. শরিয়তের মাঝে সম্পূর্ণ নতুন উদ্ভাবিত হতে হবে। অর্থাৎ, শরিয়তের সঙ্গে এর কোনো পূর্বসম্পর্ক কিংবা ভিত্তি (الأصل) না থাকতে হবে। কিন্তু যদি শরিয়তের উসুলের আলোকে উদ্ভাবিত হয়, তবে সেটা বিদআত হবে না। এ কারণে নাহু, সরফ, আকিদা, উসুলুল ফিকহ ইত্যাদি শেখা ও চর্চা করা বিদআত হবে না। মাদরাসায় নির্দিষ্ট সিলেবাসে পড়া বিদআত হবে না। কারণ, এগুলোর মূল ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহতে বিদ্যমান।

তিন. শরিয়তসদৃশ হতে হবে। অর্থাৎ, শরিয়তে যেমন ইবাদতের নির্দিষ্ট সময় ও পদ্ধতি বলে দেওয়া হয়েছে, ইবাদতের জন্য এ ধরনের বিশেষ সময়, অবস্থা ও পদ্ধতি নির্ধারণ করা। যেমন—বিশেষ কোনো দিন বিশেষ বিশ্বাসের সঙ্গে নিয়ম করে রোযা রাখা অথচ শরিয়তে এ ধরনের রোযার কথা বলা হয়নি। বিশেষ কোনো পদ্ধতিকে ইবাদত মনে করে সর্বদা সে পদ্ধতিতে জিকির করা যে পদ্ধতি শরিয়তে বলা হয়নি। বিশেষ কোনো দিনে কোনো বিশেষ ধর্মীয় আচার নিয়মতান্ত্রিকভাবে পালন করা। কিন্তু এমন সাদৃশ্য ছাড়া এমনিতেই কোনো বিশেষ দিনে রোযা রাখলে কিংবা হঠাৎ এমনিতেই বিশেষ পদ্ধতিতে জিকির করলে সেটা বিদআত হবে না।

চার. উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর বেশি ইবাদত। সুতরাং ইবাদতের নিয়তে নতুন বিষয় সংযোজন করলে বিদআত হবে, বাহ্যত সেটা দ্বীনি বিষয় না হলেও। যেমন—ইবাদতের নিয়তে বিশেষ কোনো পোশাক পরা কিংবা বিশেষ কোনো খাবার খাওয়া! বাহ্যত এগুলো দ্বীনি কাজ না হলেও বিদআত হওয়ার কারণ ইবাদতের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, ইবাদতের উদ্দেশ্যের বিদ্যমানতা নিছক দুনিয়াবি কাজটাকেও ‘দ্বীনি’ বিষয় এবং ‘শরিয়তসদৃশ’ করে দিচ্ছে, ফলে সেটা বিদআতে পরিণত হবে। কিন্তু ইবাদতের নিয়ত না থাকলে সেটা সাধারণ আচার-অভ্যাস কিংবা সাধারণ কর্ম হিসেবে গণ্য হবে।¹⁷⁰⁹

টিকাঃ
১৭০৮. গুনইয়াতু যাবিল আহকাম (১/৮৫) [দুরারুল হুক্কামের সঙ্গে সংযুক্ত হাশিয়া]।।
১৭০৯. দেখুন: আল-ইতিসাম, শাতেবি (১/৪৭-৫৫)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 বিদআত থেকে রাসূলুল্লাহর (সা.) সতর্কবার্তা

📄 বিদআত থেকে রাসূলুল্লাহর (সা.) সতর্কবার্তা


উলামায়ে কেরামপ্রদত্ত বিদআতের বিভিন্ন সংজ্ঞার্থের মূল ভিত্তি হলো রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কিছু হাদিস। যেমন—আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মাঝে এমন কোনো নতুন বিষয় যোগ করল যা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, সেটা প্রত্যাখ্যাত হবে।'¹⁷¹⁰ এই নবসৃষ্ট প্রত্যাখ্যাত বিষয়টিই বিদআত।

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'মনে রেখো, সর্বোত্তম কথা হলো আল্লাহর কালাম (কুরআন)। আর সর্বোত্তম হেদায়াত হচ্ছে রাসুলুল্লাহর হেদায়াত (সুন্নাত)। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট হচ্ছে দ্বীনের মাঝে নবসৃষ্ট বিষয়গুলো। প্রত্যেক নবসৃষ্ট বিষয় বিদআত। প্রত্যেক বিদআত গোমরাহি। আর প্রত্যেক গোমরাহির পরিণতি হলো জাহান্নাম।'¹⁷¹¹

ইরবাজ ইবনে সারিয়াহ থেকে বর্ণিত, 'একদিন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নিয়ে নামায পড়লেন। নামাযশেষে আমাদের দিকে ফিরে গুরুগম্ভীর ওয়াজ করলেন। ... রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমি তোমাদের তাকওয়া ও আনুগত্যের ওসিয়ত করছি, একজন হাবশি দাসকেও (তোমাদের শাসক বানানো হলে তার আনুগত্য করবেন)। কেননা, আমার পরে তোমাদের যারা বেঁচে থাকবে, প্রচণ্ড মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত এবং খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরবে। সেগুলো তোমরা মজবুতভাবে ধরে রাখবে। দাঁত কামড়ে পড়ে থাকবে। সাবধান! (দ্বীনের মাঝে) নবসৃষ্ট বিষয়গুলো থেকে তোমরা বেঁচে থাকো। কারণ, (দ্বীনের ক্ষেত্রে) প্রত্যেক নবসৃষ্ট বিষয় বিদআত। আর প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা।'¹⁷¹²

আলি রাযি. রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন, 'যে ব্যক্তি দ্বীনের মাঝে নতুন কিছু সৃষ্টি করবে, অথবা নতুন কিছু সৃষ্টিকারীকে আশ্রয় দেবে (অর্থাৎ, বিদআত শুরু করবে কিংবা বিদআতিকে আশ্রয় দেবে), তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতা এবং সকল মানুষের অভিসম্পাত!'¹⁷¹³

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, 'সর্বোত্তম হেদায়াত হলো আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর হেদায়াত। সর্বোত্তম কথা হলো আল্লাহর কথা। অতি শীঘ্রই তোমরা দ্বীনে নতুন বিষয় সৃষ্টি করবে। তোমাদের জন্য নতুন বিষয় সৃষ্টি করা হবে। মনে রেখো, প্রত্যেক নতুন সৃষ্টি (বিদআত) গোমরাহি। আর প্রত্যেক গোমরাহির পরিণতি জাহান্নাম।'¹⁷¹⁴ অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'সুতরাং যখন তোমাদের মাঝে কোনো বিদআত সৃষ্টি করা হবে, তখন তোমরা সেটা বর্জন করে প্রথম যুগের হেদায়াত আঁকড়ে ধরবে। আহলে কিতাব (তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা) মূলত এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে। ... অবস্থা এমন হয়ে গিয়েছে যে, আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে আজ তারা কিছুই জানে না।'¹⁷¹৫

এ কথা স্পষ্ট যে, উম্মতে মুহাম্মাদি বিদআত আঁকড়ে ধরলেও অভিন্ন পরিণতি তৈরি হবে। উম্মত সুন্নাত বাদ দিয়ে বিদআতের মাঝে ডুবে যাবে। দুঃখজনকভাবে উম্মতের বিভিন্ন অংশে এমন হৃদয়বিদারক বাস্তবতা তৈরি হয়েছেও।

টিকাঃ
১৭১০. বুখারি (কিতাবুস সুলহ: ২৬৯৭)। মুসলিম (কিতাবুল আকযিয়াহ: ১৭১৮)।
১৭১১. মুসলিম (কিতাবুল জুমুআহ : ৮৬৭)।
১৭১২. আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৬০৭)। দারেমি (মুকাদ্দিমা: ৯৬)। ইবনে হিব্বান (মুকাদ্দিমা : ৫)।
১৭১৩. বুখারি (ফাযায়িলুল মদিনা: ১৮৭০)। মুসলিম (কিতাবুল হজ: ১৩৭১)।
১৭১৪. শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (১/৮৬)।
১৭১৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৮৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00