📄 গণক ও জ্যোতিষী
কিছু লোক মানুষের ভাগ্যের ক্ষেত্রে তারকা এবং গ্রহ-উপগ্রহের প্রভাবে বিশ্বাস করে। এ কারণে তাদের মতে, নক্ষত্রের পাঠ এবং তারকার গতিপথ দেখে মানুষের ভালোমন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যেতে পারে। কিন্তু এটা ভ্রান্ত আকিদা ও শিরক। মহাকাশের সকল তারকা-নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর আজ্ঞাবহ। ফলে মানুষের জীবন ও ভাগ্যে এগুলোর কোনো প্রভাব নেই। আল্লাহ তাআলা মানুষের ভাগ্যবিধাতা। একমাত্র আল্লাহ তাআলা মানুষের ভবিষ্যৎ জানেন। কোনো নক্ষত্র, চন্দ্র-সূর্য মানুষের ভবিষ্যৎ জানে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٍ بِأَمْرِهِ ۗ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ ۗ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ ۞ অর্থ : 'তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেন; এরপর তিনি আরশে ইস্তিওয়া করেন। তিনিই দিবসকে রাত্রি দিয়ে আচ্ছাদিত করেন যাতে এদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি তাঁরই আজ্ঞাধীন। এগুলো তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখো, সৃষ্টি ও আদেশ দুটোই তাঁর। মহিমাময় বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ।' [আরাফ : ৫৪] আল্লাহ আরও বলেন, ۞ إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَالْفُلْكِ الَّتِي تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِمَا يَنفَعُ النَّاسَ وَمَا أَنزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِن مَّاءٍ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَبَثَّ فিয়া مِن كُلِّ دَابَّةٍ وَتَصْرِيفِ الرِّيَاحِ وَالسَّحَابِ الْمُسَخَّرِ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ ۞ অর্থ : 'নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত্রি ও দিবসের পরিবর্তনে, যা মানুষের হিত সাধন করে তাসহ সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানসমূহে, আল্লাহ আকাশ থেকে যে বারিবর্ষণের মাধ্যমে ধরিত্রীকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন, তাতে আর তার মধ্যে যাবতীয় জীবজন্তুর বিস্তারণে, বায়ুর দিক পরিবর্তনে, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।' [বাকারা : ১৬৪] সুতরাং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ব্যাপারে এ ধরনের আকিদা রাখা শিরকে আকবর, যা একজন মুসলিমকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়।
ইমাম আজম রহ. বলেন, আল্লাহ তাআলা 'কিরামান কাতিবিনকেও বাহ্যিক বিষয়গুলো লিখে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদেরও অন্তরের খবর রাখার ক্ষমতা নেই। কারণ, অন্তরের খবর কেবল আল্লাহ তাআলা জানেন। আর জানেন ওহিপ্রাপ্ত রাসুল। সুতরাং যদি কেউ ওহি ছাড়া অন্তরের খবর জানার দাবি করে, সে যেন আল্লাহর ইলমে ভাগ বসাতে চাইল। এটা বিশাল অপরাধ। পরিণামে কুফর ও জাহান্নাম ছাড়া উপায় নেই।'¹⁶⁵⁰
সুতরাং কোনো গণক বা জ্যোতিষী অদৃশ্যের বিষয় জানে এমন বিশ্বাস করা বৈধ নয়। ইমাম তহাবি বলেন, 'আমরা কোনো গণক কিংবা জ্যোতিষীকে বিশ্বাস করি না। কুরআন, সুন্নাহ এবং উম্মাহর সর্বসম্মত মতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো দাবি-দাওয়া সত্য বলে স্বীকার করি না।'¹⁶⁵¹
কারণ, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গায়েব জানেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ ۞ অর্থ : 'আপনি বলুন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে, কেউ গায়েব জানে না। একমাত্র আল্লাহ তাআলা জানেন।' [নামল: ৬৫] অন্যত্র বলেন, ۞ وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ ۚ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ۚ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ ۞ : 'অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে। তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা জানে না। জলে ও স্থলে যা-কিছু আছে, তা তিনিই অবগত। তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও পড়ে না। মৃত্তিকার অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণা অঙ্কুরিত হয় না বা আর্দ্র কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।' [আনআম : ৫৯]
নবিদের আল্লাহ যতটুকু চান, জানিয়ে দেন। নবিরাও তাঁর জানানো ব্যতীত গায়েব জানেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন : ۞ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ عِندِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْবَ وَلَا أَقُولُ إِنِّي مَلَكٌ وَلَا أَقُولُ لِلَّذِينَ تَزْدَرِي أَعْيُنُكُمْ لَن يُؤْتِيَهُمُ اللَّهُ خَيْرًا ۖ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا فِي أَنفُسِهِمْ ۞ অর্থ : (আপনি বলুন) 'আর আমি তোমাদের বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ধনভান্ডার রয়েছে। এ কথাও বলি না যে, আমি গায়েব তথা অদৃশ্যের সংবাদ জানি। এ কথাও বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা। আর আমি এ কথা বলি না যে, তোমাদের দৃষ্টিতে যারা ক্ষুদ্র-নগণ্য, আল্লাহ তাদের কোনো কল্যাণ দান করবেন না। তাদের মনের কথা আল্লাহ ভালো করেই জানেন। সুতরাং এমন কথা বললে আমি অন্যায়কারী হব।' [হুদ : ৩১]
সুতরাং 'ইলমুল গায়েব'-এর একমাত্র অধিকারী আল্লাহ তাআলা। এটা তাঁর একক বিশেষত্ব। এতে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা শিরক। ফলে গণক-জ্যোতিষীকে কেউ 'অদৃশ্য সম্পর্কে অবহিত' মনে করলে শিরকের অপরাধে অভিযুক্ত হবে। বরং হানাফি মাযহাবের গ্রন্থগুলোতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, 'কেউ যদি এমন বিশ্বাস রাখে যে, নবিজি (ﷺ) গায়েব জানেন, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, এটা কুরআনের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। '¹⁶⁵²
এ কারণেই ইসলামে গণক ও জ্যোতিষীদের কাছে যেতে কঠোরভাবে বারণ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'যে ব্যক্তি গণকের কাছে গিয়ে তার কথা সত্যায়ন করবে, তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল করা হবে না।'¹⁶⁵³ অন্য হাদিসে এসেছে, 'যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে যাবে এবং তার কথা সত্যায়ন করবে, তবে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর অবতীর্ণ (দ্বীন) থেকে সে বেরিয়ে যাবে।'¹⁶⁵⁴
আরেক বর্ণনায় এসেছে, 'যে ব্যক্তি কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কাছে যাবে এবং তার কথা বিশ্বাস করবে, সে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর যা-কিছু অবতীর্ণ হয়েছে, সবকিছু অবিশ্বাস করল।'¹⁶⁵⁵
গণক ও জ্যোতিষী (কাহেন ও আররাফ)-এর বিধানও যাদুর বিধানের কাছাকাছি। খোদ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি জ্যোতিষশাস্ত্রের কিছু শিখল, সে যেন কিছু যাদু শিখল।'¹⁶⁵⁶ কারণ, তারা সাধারণত জিন-শয়তান ও তারকার মাধ্যমে তাদের কাজ করার দাবি করে। সুতরাং কেউ যদি এ ধরনের বিশ্বাস রাখে যে, আকাশের তারকা তার ভালোমন্দ করার ক্ষমতা রাখে কিংবা জিন ও শয়তানরা তার মনের আশা এবং সকল প্রয়োজন পূর্ণ করতে পারে, তবে সে মুশরিক হয়ে যাবে। তবে যদি এসব বিশ্বাস ছাড়া কেবল অনুমানভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণী করার দাবি করে, তবে সে মুশরিক হবে না; শক্ত গুনাহগার হবে। আর যদি যাদুর আশ্রয় নেয়, তবে তার বিধান যাদুকরের বিধানের মতো।¹⁶⁵⁷
গণক কিংবা জ্যোতিষীর কথা অনেক সময় সত্য হয়ে থাকে। এর মূল কারণও কুফর ও শিরক। অর্থাৎ, তারা কখনো কখনো যাদুকরদের মতো জিন ও শয়তানের আনুগত্য করে তাদের সাহায্য নেয়। তাদের পূজা দেয়। তাদের কাছে প্রার্থনা করে। ফলে তাদের কাছ থেকে কিছু কিছু বিষয় জেনে নেয়। কিছু কথা মিলে যায়। কিন্তু সেগুলো হাজারে দুই-চারটা সত্য হয়। বাকিগুলো মিথ্যা। জিন ও শয়তানরাই তাদের মিথ্যা বলে। ফলে তাদের বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই। উপরন্তু এভাবে জিন-শয়তানের ইবাদত ও সাহায্যগ্রহণ শিরক। আল্লাহ তাআলা এ কারণে কাফেরদের নিন্দা করে বলেছেন, ۞ وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا ۞ অর্থ : 'মানুষের মধ্যে কিছু লোক জিনদের কিছু লোকের আশ্রয় গ্রহণ করত। এভাবে তারা জিনদের আরও বেশি আত্মম্ভরী করে তুলেছিল।' [জিন : ৬] আবার কখনো কখনো এরা আদৌ কিছুই জানতে পারে না। আন্দাজে বলে এবং কাকতালীয়ভাবে কিছু কিছু মিলে যায়। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গায়েব জানে এমন বিশ্বাস শিরক। ফলে গণক, জ্যোতিষী, টিয়াপাখি, রাশিবিদ, তন্ত্রসাধক, পাথর-ব্যবসায়ী, ফকির-কবিরাজ—কারও কাছেই যাওয়া বৈধ নয়।
টিকাঃ
১৬৫০. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২২)।
১৬৫১. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (৩১)।
১৬৫২. আল-মুসায়ারাহ (১২৯-১৩০)। ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত ইলমকে 'গায়েব' জানা বলা হয় না। গায়েবের একমাত্র অধিকারী মহান আল্লাহ তাআলা।
১৬৫৩. মুসলিম (কিতাবুস সালাম: ২২৩০)। মুসনাদে আহমদ (আউয়ালু মুসনাদিল মাদানিয়িয়ন: ১৬৯০৬)।
১৬৫৪. আবু দাউদ (কিতাবুল কিহানাহ ওয়াত তাতাইউর: ৩৯০৪)।
১৬৫৫. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি হুরাইরা : ৯৬৬৭)। বাযযার (মুসনাদু আবদিল্লাহ ইবনে মাসউদ : ১৮৭৩)।
১৬৫৬. আবু দাউদ (কিতাবুল কিহানাহ: ৩৯০৫)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল আদাব : ৩৭২৬)।
১৬৫৭. দেখুন: ফাতহুল কাদির (৬/৯৯)।