📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কবরকেন্দ্রিক শিরক

📄 কবরকেন্দ্রিক শিরক


উম্মতে মুসলিমা কবরকেন্দ্রিক যতটা বিচ্যুতি ও বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে, অন্য ক্ষেত্রে খুব কমই হয়েছে। এটা সম্ভবত রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে আল্লাহ তাআলা তাঁর জীবদ্দশাতেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি বারবার কবর থেকে মানুষকে সতর্ক করেছেন। বরং ওফাতের কয়েক দিন আগেও তিনি এ ব্যাপারে উম্মাহকে সতর্ক করে গিয়েছেন। জুনদুব রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতের পাঁচ দিন আগে আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, 'সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগুলো তাদের নবি ও সালেহিনের কবরকে সিজদার জায়গা হিসেবে গ্রহণ করত। সাবধান! তোমরা কবরকে সিজদার জায়গায় পরিণত করো না। আমি তোমাদের নিষেধ করছি।'¹⁶⁴¹

সুতরাং কবরের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি প্রদর্শন করা, কবরের চারপাশে তাওয়াফ বা যিকির করা এবং কবরকে চুমু দেওয়া হারাম ও নিষিদ্ধ কাজ। জীবিত পীরের সামনে কিংবা মৃত পিরের মাজারকে সিজদা দেওয়া অত্যন্ত জঘন্য গুনাহ, পৌত্তলিকতার শামিল। কেউ যদি ইবাদত কিংবা ইবাদত-সদৃশ তাযিমপূর্বক এমন সিজদা করে, সে কাফের হয়ে যাবে। এটা আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। তবে কেউ যদি জাহেলি পারস্য রীতি অনুযায়ী অভিবাদনপূর্বক সিজদার মতো করে ভূমি চুম্বন করে (যমিন-বুস), তবে কাফের হবে না, কিন্তু শক্ত গুনাহগার হবে। বরং কাসানি, কুহুস্তানিসহ একদল হানাফি আলেম লিখেছেন, সম্মানের উদ্দেশ্যে হোক কিংবা অভিবাদনের উদ্দেশ্যে হোক, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামনে সিজদা করা কুফর।¹⁶⁴²

বর্তমান সময়ে বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে শেষোক্ত মতকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। অর্থাৎ, কেউ সিজদা দিয়ে ফেললে ব্যক্তিবিশেষকে কাফের বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হবে, কিন্তু বর্তমানে যেহেতু সিজদা দিয়ে অভিবাদন জানানোর প্রথা নেই, সুতরাং এটাকে ইবাদত এবং ইবাদত-সদৃশ ‘তাযিম’ ধরা হবে, আর সেক্ষেত্রে সবার সর্বসম্মতিক্রমে এটা কুফর ও শিরক বিবেচিত হবে।

টিকাঃ
১৬৪১. মুসলিম (কিতাবুল মাসাজিদ : ৫৩২)।
১৬৪২. রদ্দুল মুহতার (৬/৩৮৩)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 যাদু ও যাদুকরের বিধান

📄 যাদু ও যাদুকরের বিধান


পরিচয়: যাদুর সঙ্গে কুফর ও শিরকের ব্যাপক সংশ্লিষ্টতা আছে। যাদু কার্যকর করার জন্য অধিকাংশ যাদুকরই কুফর ও শিরকে লিপ্ত হয়। এ জন্য ইসলামে যাদু কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যাদুকরদের বিরুদ্ধে কুরআন ও সুন্নাহর বিধান অত্যন্ত কঠোর।

আহলে সুন্নাতের উলামায়ে কেরামের সকলের মতে, যাদুর অস্তিত্ব আছে। ক্রিয়া ও প্রভাব আছে। মুতাযিলা সেটা দেখতে না পেয়ে যাদু অস্বীকার করেছে। অথচ এটা জীবনের বাস্তবতা; অস্বীকারের সুযোগ নেই। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) জীবনের শেষ দিকে যাদুর মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অসুস্থ হয়েছেন। যাদু থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তাআলা সুরা ফালাক এবং সুরা নাস অবতীর্ণ করেছেন।¹⁶⁴³

জটিলতা হলো, খোদ ইমাম আজম রহ. থেকেও মুতাযিলাদের বক্তব্যসদৃশ কথা বর্ণনা করা হয়। তিনি মনে করতেন, 'যাদু স্রেফ চোখের ধোঁকা। বাস্তবে এর কোনো প্রভাব নেই!'¹⁶⁴⁴ এখান থেকে কেউ মনে করেছে—ইমাম আজম যাদুর প্রভাব ও প্রকৃতি অস্বীকার করতেন। এমন ধারণা সঠিক নয়। কেউ কেউ ইমামের বক্তব্য আর মুতাযিলাদের বক্তব্য এক ও অভিন্ন মনে করেছে। বাস্তবতা এমন নয়। মুতাযিলারা যাদু বলতে কিছুর অস্তিত্বই স্বীকার করে না। বিপরীতে ইমাম আজম রহ. যাদুর প্রভাব স্বীকার করতেন। তিনি স্রেফ প্রভাবের একটা বিশেষ ধরনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এক্ষেত্রে তাঁর কথাই সঠিক। সেটা হলো—ইমাম আজমের মতে—যাদু কোনো বস্তুর মাহিয়্যাত (স্বরূপ)-কে বদলাতে পারে না। এক্ষেত্রে এটার কোনো প্রভাব নেই। ফলে যাদুর মাধ্যমে মানুষকে গাধায় কিংবা গাধাকে মানুষে পরিণত করা সম্ভব নয়। মাটিকে মিষ্টি কিংবা বালুকে চিনিতে পরিণত করা সম্ভব নয়। যেমন—ফেরাউনের যাদুকরদের যাদুর প্রভাবে মুসা আলাইহিস সালামের কাছে তাদের নিক্ষিপ্ত লাঠি ও রশিগুলো সাপ মনে হচ্ছিল। অথচ বাস্তবে সেগুলো সাপে পরিণত হয়নি; লাঠি ও রশিই ছিল। আল্লাহ তাআলা এ বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন: ۞ قَالَ بَلْ أَلْقُوا ۖ فَإِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِن سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَىٰ ۞ অর্থ: ‘মুসা বললেন: বরং তোমরাই নিক্ষেপ করো। তাদের যাদুর প্রভাবে হঠাৎ তাঁর মনে হলো, যেন তাদের রশি ও লাঠি ছোটাছুটি করছে।’ [তহা: ৬৬]

তবে বস্তুর গুণাগুণ পরিবর্তন করা সম্ভব। ফলে সুস্থকে অসুস্থ, সুখীকে দুঃখী, ঠান্ডাকে গরম, গরমকে ঠান্ডা—এভাবে ব্যক্তি বা বস্তুর গুণাগুণ পরিবর্তন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে যাদু ক্রিয়াশীল। ফলে ইমাম আজম রহ. যাদুকে স্রেফ দৃষ্টিবিভ্রম বলেছেন প্রথম অবস্থার প্রতি লক্ষ করে, বস্তুর 'মাহিয়‍্যাত' পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যাদুর অক্ষমতা তুলে ধরতে। বস্তুর গুণাগুণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যাদুকে তিনি প্রভাবহীন ও ক্রিয়াশূন্য বলেননি। সেটা বলা সম্ভবও নয়। কারণ, খোদ কুরআনে যাদুর এ ধরনের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বলা হয়েছে [বাকারা : ১০২]। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যাদুর প্রভাবে অসুস্থ হয়েছেন।

বিধান: আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে যাদু হারাম। কারণ, যাদুকর মূলত বিভিন্ন মিথ্যা, প্রতারণা, জিন ও শয়তানের সহায়তা এবং কুফর ও শিরকের আশ্রয় নিয়ে যাদু করে থাকে। ফলে কেউ এটাকে হালাল মনে করলে সে কাফের হয়ে যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হালাল মনে করা ছাড়া যাদু শেখা ও চর্চার বিধান কী? বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। একদল (হানাফি) আলেমের মতে, যাদু শেখা ও চর্চা করাই কুফর। হালাল মনে করা শর্ত নয়। ফলে যেকোনো অবস্থাতে যাদু শিখলে কিংবা চর্চা করলে তাকে হত্যা করা হবে।¹⁶⁴⁵

ইমাম মাতুরিদি রহ. মনে করেন, একবাক্যে যাদুকে কুফর বলা এবং যাদুকরকে হত্যা করা যাবে না, বরং এর প্রকৃতি কী সেটা যাচাই করে নিতে হবে। যদি তাতে ঈমানের মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু থাকে, তবে কুফর হবে, নতুবা কুফর হবে না।¹⁶⁴⁶

ইমাম মাতুরিদির বক্তব্যের যৌক্তিকতা আছে। কারণ, যাদু কিছু কথা ও কর্মের সমন্বয়। ফলে উন্মুক্তভাবে কুফর নয়। যদি কুফরের উপাদান থাকে, তবে কুফর। যদি শিরকের উপাদান থাকে, তবে শিরক। নতুবা কবিরা গুনাহ। কামাল ইবনুল হুমাম ইমাম মাতুরিদির উদ্ধৃতিতে বলেন, 'যদি কোনো যাদুকর তার যাদুকে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা তৈরির কাজে ব্যবহার করে, তবে আকিদাগত কুফর না থাকলেও হত্যা করা হবে। কারণ, এক্ষেত্রে অপরাধ পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা। কিন্তু যদি বিশৃঙ্খলার কাজে ব্যবহার না করে বরং সাধারণ যাদু করে, তবে এককথায় কুফর বলা হবে না। আকিদাগত কুফর থাকলে কাফের। নতুবা কাফের নয়।'¹⁶⁴⁷

কিন্তু অন্য হানাফি ও সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের বক্তব্য আরও বস্তুনিষ্ঠ ও অধিকতর বাস্তবসম্মত। কারণ, কুফর ও শিরকের উপাদান না থাকলে সেটা মৌলিক ও কার্যকর যাদুর মাঝে পড়ে না; দৃষ্টিবিভ্রম, ভোজবাজি ও চোখের ছলনার নামান্তর হয়। বিপরীতে কার্যকর যাদুর জন্য জিন ও শয়তানের সহায়তা নিতে হয়। অথচ জিন ও শয়তান বিনিময় ছাড়া মানুষকে সহায়তা করে না। ফলে এক্ষেত্রে যাদুকরদের কুফর ও শিরকে লিপ্ত হতে হয়, কুফরি বাক্য উচ্চারণ করতে হয়। জিন-শয়তানদের পূজা দিতে হয়, সিজদা করতে হয়, তাদের নামে পশু বলি দিতে হয়। তাদের কাছে প্রার্থনা (ইস্তিগাসা) করতে হয়। তাদের নির্দেশে কুরআন কারিমকে অপদস্থ করা, পায়খানা ও ময়লার মাঝে ফেলে রাখা, কুরআনের উপর জুতো পায়ে দিয়ে হাঁটাসহ বিভিন্ন কুফর ও শিরকে লিপ্ত হতে হয়। তখনই শয়তান সন্তুষ্ট হয়ে যাদুকরদের সহায়তা করে। এটাই যাদুর প্রকৃত রূপ। এ কারণেই উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম যাদুকরদের একবাক্যে কাফের আখ্যা দিয়ে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন।

কুরআন-হাদিসেও যাদু এবং কুফর-শিরকের মাঝে এক গভীর সম্পর্ক চোখে পড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ وَمَا يُعَلِّمانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ ۞ অর্থ : ‘(হারুত ও মারুত ফেরেশতাদ্বয়) তারা উভয়ই এ কথা না বলে কাউকে (যাদু) শিক্ষা দিত না যে, আমরা পরীক্ষার জন্য (প্রেরিত হয়েছি); কাজেই তুমি (যাদুর মাধ্যমে) কাফের হয়ো না।' [বাকারা: ১০২] উক্ত আয়াতে যাদুকে প্রকারান্তরে 'কুফর' সাব্যস্ত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) হাদিসে বলেছেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। সেগুলো হলো, আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা, যুদ্ধের দিন পলায়ন করা এবং সচ্চরিত্র নিষ্কলঙ্ক মুমিন নারীকে অপবাদ দেওয়া।¹⁶⁴⁸ ফলে যাদুর সঙ্গে শিরকের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বরং কিছু হাদিসে যাদুকে সরাসরি শিরক বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'রুকা' (নিষিদ্ধ ঝাড়ফুঁক), 'তামায়িম' (ধাতুনির্মিত কবচ), 'তিওয়ালা' (স্বামী/স্ত্রী বশের যাদু) শিরক।¹⁶⁴⁹ উক্ত হাদিসে যাদুকে স্পষ্ট করেই শিরক বলা হয়েছে। সুতরাং যাদুর মাঝে কুফর ও শিরকের উপস্থিতি অনস্বীকার্য বিষয়।

টিকাঃ
১৬৪৩. দেখুন: আল-আকিদাহ আর-রুকনিয়্যাহ (৫৪)। আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (২৭৫-২৭৬)।
১৬৪৪. দেখুন: তাফসিরে ইবনে কাসির (১/২৫৫)।
১৬৪View. ফাতহুল কাদির (৬/৯৯)।
১৬৪৬. দেখুন : আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (২৭৬)। রদ্দুল মুহতার (৪/২৪১)।
১৬৪৭. ফাতহুল কাদির (৬/৯৯)।
১৬৪৮. বুখারি (কিতাবুল ওয়াসায়া: ২৭৬৬)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৮৯)।
১৬৪৯. আবু দাউদ (কিতাবুত তিব্ব: ৩৮৮৩)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুত তিব্ব: ৩৫৩০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 গণক ও জ্যোতিষী

📄 গণক ও জ্যোতিষী


কিছু লোক মানুষের ভাগ্যের ক্ষেত্রে তারকা এবং গ্রহ-উপগ্রহের প্রভাবে বিশ্বাস করে। এ কারণে তাদের মতে, নক্ষত্রের পাঠ এবং তারকার গতিপথ দেখে মানুষের ভালোমন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যেতে পারে। কিন্তু এটা ভ্রান্ত আকিদা ও শিরক। মহাকাশের সকল তারকা-নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর আজ্ঞাবহ। ফলে মানুষের জীবন ও ভাগ্যে এগুলোর কোনো প্রভাব নেই। আল্লাহ তাআলা মানুষের ভাগ্যবিধাতা। একমাত্র আল্লাহ তাআলা মানুষের ভবিষ্যৎ জানেন। কোনো নক্ষত্র, চন্দ্র-সূর্য মানুষের ভবিষ্যৎ জানে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٍ بِأَمْرِهِ ۗ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ ۗ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ ۞ অর্থ : 'তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেন; এরপর তিনি আরশে ইস্তিওয়া করেন। তিনিই দিবসকে রাত্রি দিয়ে আচ্ছাদিত করেন যাতে এদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি তাঁরই আজ্ঞাধীন। এগুলো তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখো, সৃষ্টি ও আদেশ দুটোই তাঁর। মহিমাময় বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ।' [আরাফ : ৫৪] আল্লাহ আরও বলেন, ۞ إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَالْفُلْكِ الَّتِي تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِمَا يَنفَعُ النَّاسَ وَمَا أَنزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِن مَّاءٍ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَبَثَّ فিয়া مِن كُلِّ دَابَّةٍ وَتَصْرِيفِ الرِّيَاحِ وَالسَّحَابِ الْمُسَخَّرِ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ ۞ অর্থ : 'নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত্রি ও দিবসের পরিবর্তনে, যা মানুষের হিত সাধন করে তাসহ সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানসমূহে, আল্লাহ আকাশ থেকে যে বারিবর্ষণের মাধ্যমে ধরিত্রীকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন, তাতে আর তার মধ্যে যাবতীয় জীবজন্তুর বিস্তারণে, বায়ুর দিক পরিবর্তনে, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।' [বাকারা : ১৬৪] সুতরাং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ব্যাপারে এ ধরনের আকিদা রাখা শিরকে আকবর, যা একজন মুসলিমকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়।

ইমাম আজম রহ. বলেন, আল্লাহ তাআলা 'কিরামান কাতিবিনকেও বাহ্যিক বিষয়গুলো লিখে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদেরও অন্তরের খবর রাখার ক্ষমতা নেই। কারণ, অন্তরের খবর কেবল আল্লাহ তাআলা জানেন। আর জানেন ওহিপ্রাপ্ত রাসুল। সুতরাং যদি কেউ ওহি ছাড়া অন্তরের খবর জানার দাবি করে, সে যেন আল্লাহর ইলমে ভাগ বসাতে চাইল। এটা বিশাল অপরাধ। পরিণামে কুফর ও জাহান্নাম ছাড়া উপায় নেই।'¹⁶⁵⁰

সুতরাং কোনো গণক বা জ্যোতিষী অদৃশ্যের বিষয় জানে এমন বিশ্বাস করা বৈধ নয়। ইমাম তহাবি বলেন, 'আমরা কোনো গণক কিংবা জ্যোতিষীকে বিশ্বাস করি না। কুরআন, সুন্নাহ এবং উম্মাহর সর্বসম্মত মতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো দাবি-দাওয়া সত্য বলে স্বীকার করি না।'¹⁶⁵¹

কারণ, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গায়েব জানেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ ۞ অর্থ : 'আপনি বলুন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে, কেউ গায়েব জানে না। একমাত্র আল্লাহ তাআলা জানেন।' [নামল: ৬৫] অন্যত্র বলেন, ۞ وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ ۚ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ۚ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ ۞ : 'অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে। তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা জানে না। জলে ও স্থলে যা-কিছু আছে, তা তিনিই অবগত। তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও পড়ে না। মৃত্তিকার অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণা অঙ্কুরিত হয় না বা আর্দ্র কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।' [আনআম : ৫৯]

নবিদের আল্লাহ যতটুকু চান, জানিয়ে দেন। নবিরাও তাঁর জানানো ব্যতীত গায়েব জানেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন : ۞ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ عِندِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْবَ وَلَا أَقُولُ إِنِّي مَلَكٌ وَلَا أَقُولُ لِلَّذِينَ تَزْدَرِي أَعْيُنُكُمْ لَن يُؤْتِيَهُمُ اللَّهُ خَيْرًا ۖ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا فِي أَنفُسِهِمْ ۞ অর্থ : (আপনি বলুন) 'আর আমি তোমাদের বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ধনভান্ডার রয়েছে। এ কথাও বলি না যে, আমি গায়েব তথা অদৃশ্যের সংবাদ জানি। এ কথাও বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা। আর আমি এ কথা বলি না যে, তোমাদের দৃষ্টিতে যারা ক্ষুদ্র-নগণ্য, আল্লাহ তাদের কোনো কল্যাণ দান করবেন না। তাদের মনের কথা আল্লাহ ভালো করেই জানেন। সুতরাং এমন কথা বললে আমি অন্যায়কারী হব।' [হুদ : ৩১]

সুতরাং 'ইলমুল গায়েব'-এর একমাত্র অধিকারী আল্লাহ তাআলা। এটা তাঁর একক বিশেষত্ব। এতে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা শিরক। ফলে গণক-জ্যোতিষীকে কেউ 'অদৃশ্য সম্পর্কে অবহিত' মনে করলে শিরকের অপরাধে অভিযুক্ত হবে। বরং হানাফি মাযহাবের গ্রন্থগুলোতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, 'কেউ যদি এমন বিশ্বাস রাখে যে, নবিজি (ﷺ) গায়েব জানেন, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, এটা কুরআনের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। '¹⁶⁵²

এ কারণেই ইসলামে গণক ও জ্যোতিষীদের কাছে যেতে কঠোরভাবে বারণ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'যে ব্যক্তি গণকের কাছে গিয়ে তার কথা সত্যায়ন করবে, তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল করা হবে না।'¹⁶⁵³ অন্য হাদিসে এসেছে, 'যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে যাবে এবং তার কথা সত্যায়ন করবে, তবে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর অবতীর্ণ (দ্বীন) থেকে সে বেরিয়ে যাবে।'¹⁶⁵⁴

আরেক বর্ণনায় এসেছে, 'যে ব্যক্তি কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কাছে যাবে এবং তার কথা বিশ্বাস করবে, সে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর যা-কিছু অবতীর্ণ হয়েছে, সবকিছু অবিশ্বাস করল।'¹⁶⁵⁵

গণক ও জ্যোতিষী (কাহেন ও আররাফ)-এর বিধানও যাদুর বিধানের কাছাকাছি। খোদ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি জ্যোতিষশাস্ত্রের কিছু শিখল, সে যেন কিছু যাদু শিখল।'¹⁶⁵⁶ কারণ, তারা সাধারণত জিন-শয়তান ও তারকার মাধ্যমে তাদের কাজ করার দাবি করে। সুতরাং কেউ যদি এ ধরনের বিশ্বাস রাখে যে, আকাশের তারকা তার ভালোমন্দ করার ক্ষমতা রাখে কিংবা জিন ও শয়তানরা তার মনের আশা এবং সকল প্রয়োজন পূর্ণ করতে পারে, তবে সে মুশরিক হয়ে যাবে। তবে যদি এসব বিশ্বাস ছাড়া কেবল অনুমানভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণী করার দাবি করে, তবে সে মুশরিক হবে না; শক্ত গুনাহগার হবে। আর যদি যাদুর আশ্রয় নেয়, তবে তার বিধান যাদুকরের বিধানের মতো।¹⁶⁵⁷

গণক কিংবা জ্যোতিষীর কথা অনেক সময় সত্য হয়ে থাকে। এর মূল কারণও কুফর ও শিরক। অর্থাৎ, তারা কখনো কখনো যাদুকরদের মতো জিন ও শয়তানের আনুগত্য করে তাদের সাহায্য নেয়। তাদের পূজা দেয়। তাদের কাছে প্রার্থনা করে। ফলে তাদের কাছ থেকে কিছু কিছু বিষয় জেনে নেয়। কিছু কথা মিলে যায়। কিন্তু সেগুলো হাজারে দুই-চারটা সত্য হয়। বাকিগুলো মিথ্যা। জিন ও শয়তানরাই তাদের মিথ্যা বলে। ফলে তাদের বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই। উপরন্তু এভাবে জিন-শয়তানের ইবাদত ও সাহায্যগ্রহণ শিরক। আল্লাহ তাআলা এ কারণে কাফেরদের নিন্দা করে বলেছেন, ۞ وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا ۞ অর্থ : 'মানুষের মধ্যে কিছু লোক জিনদের কিছু লোকের আশ্রয় গ্রহণ করত। এভাবে তারা জিনদের আরও বেশি আত্মম্ভরী করে তুলেছিল।' [জিন : ৬] আবার কখনো কখনো এরা আদৌ কিছুই জানতে পারে না। আন্দাজে বলে এবং কাকতালীয়ভাবে কিছু কিছু মিলে যায়। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গায়েব জানে এমন বিশ্বাস শিরক। ফলে গণক, জ্যোতিষী, টিয়াপাখি, রাশিবিদ, তন্ত্রসাধক, পাথর-ব্যবসায়ী, ফকির-কবিরাজ—কারও কাছেই যাওয়া বৈধ নয়।

টিকাঃ
১৬৫০. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২২)।
১৬৫১. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (৩১)।
১৬৫২. আল-মুসায়ারাহ (১২৯-১৩০)। ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত ইলমকে 'গায়েব' জানা বলা হয় না। গায়েবের একমাত্র অধিকারী মহান আল্লাহ তাআলা।
১৬৫৩. মুসলিম (কিতাবুস সালাম: ২২৩০)। মুসনাদে আহমদ (আউয়ালু মুসনাদিল মাদানিয়িয়ন: ১৬৯০৬)।
১৬৫৪. আবু দাউদ (কিতাবুল কিহানাহ ওয়াত তাতাইউর: ৩৯০৪)।
১৬৫৫. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি হুরাইরা : ৯৬৬৭)। বাযযার (মুসনাদু আবদিল্লাহ ইবনে মাসউদ : ১৮৭৩)।
১৬৫৬. আবু দাউদ (কিতাবুল কিহানাহ: ৩৯০৫)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল আদাব : ৩৭২৬)।
১৬৫৭. দেখুন: ফাতহুল কাদির (৬/৯৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00