📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 শিরকের সংজ্ঞার্থ ও পরিচয়

📄 শিরকের সংজ্ঞার্থ ও পরিচয়


শিরক (الشرك) শব্দের শাব্দিক অর্থ: অংশীদার সাব্যস্ত করা। পরিভাষায় শিরক বলা হয়, 'আল্লাহ তাআলার সত্তা, তাঁর নাম, গুণ, কর্ম ও ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা।' যেমন—সন্তান দেওয়া, রিযিক দেওয়া, জীবন ও মৃত্যু দেওয়া আল্লাহর কর্ম। যদি কেউ মনে করে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জীবন ও মৃত্যু দিতে পারে কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ সন্তান দিতে পারে, রিযিক দিতে পারে, তবে এটা শিরক গণ্য হবে। গায়েব তথা অদৃশ্যের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার গুণ। যদি কেউ মনে করে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গায়েব জানে, তবে সেটা শিরক হবে। ইবাদত একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশ্যে পশু যবাই করলে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য রুকু-সিজদা কিংবা নামায-রোযা অথবা যেকোনো ইবাদত করলে সেটা শিরক হবে।

আরও সরলীকরণ করে বলা যায়—শিরক তাওহিদের বিপরীত বস্তু। যেসব বিষয় বাস্তবায়ন করাকে তাওহিদ বলা হয়, সেগুলোকে লঙ্ঘন করাই শিরক।

ইমাম আজম রহ. তাওহিদ সম্পর্কে বলেন, 'আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি। কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। তিনি তাঁর সৃষ্টির কোনো বস্তুর মতো নন। তাঁর সৃষ্টির কোনো বস্তুও তাঁর মতো নয়।'¹⁶³⁰

ইমাম তহাবি লিখেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা এক। তাঁর কোনো শরিক নেই। তাঁর মতো কিছুই নেই। কোনোকিছুই তাঁকে অক্ষম করতে পারে না। তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি সর্বদাই ছিলেন, তাঁর কোনো শুরু নেই। তিনি সর্বদাই থাকবেন, তাঁর কোনো শেষ নেই। তাঁর কোনো ক্ষয় নেই, লয় নেই। তাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না। কোনো কল্পনাশক্তি তাঁর কাছে পৌঁছতে পারে না। বোধবুদ্ধি তাঁকে পরিব্যাপ্ত করতে পারে না। সৃষ্টির কোনোকিছুই তাঁর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে না। তিনি সদা জীবিত, তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি সদা বিদ্যমান রক্ষাকর্তা, নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না। তিনি সৃষ্টিকর্তা, কিন্তু সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী। তিনি রিযিকদাতা, রিযিকদানে কোনো কষ্ট-ক্লান্তি নেই তাঁর। তিনি মৃত্যু দানকারী, নির্ভয়ে মৃত্যু দান করেন। তিনি পুনরুত্থানকারী, বিনাক্লেশে সৃষ্টিকে পুনরুত্থিত করেন।'¹⁶³¹

এসব আকিদার বিপরীত আকিদা ও আমলই শিরক। সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো সৃষ্টিকর্তা কিংবা পালনকর্তায় বিশ্বাস করা শিরক। দুই কিংবা ততোধিক খোদায় বিশ্বাস করা শিরক। আল্লাহকে সৃষ্টির মতো মনে করা কিংবা কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর মতো মনে করা শিরক। সুতরাং আল্লাহর জন্য পুত্র সাব্যস্ত করা—যেমনটা খ্রিষ্টানরা করে থাকে—শিরক। আল্লাহর উপর সৃষ্টির গুণ ও বৈশিষ্ট্য প্রয়োগ করা কিংবা আল্লাহর জন্য নির্ধারিত কোনো গুণ বা বৈশিষ্ট্য সৃষ্টির উপর প্রয়োগ করা শিরক। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে বিশ্বাস করা শিরক। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে রিযিকদাতা মনে করা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে স্বয়ংসম্পূর্ণ, পৃথিবীর পরিচালক, জীবন ও মৃত্যুর মালিক, স্বতন্ত্র প্রয়োজন পূর্ণকারী মনে করে তাদের কাছে প্রার্থনা করা শিরক। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে স্বয়ংসম্পূর্ণ সামগ্রিক আশ্রয়স্থল হিসেবে বিশ্বাস করে তার কাছে আশ্রয় চাওয়া শিরক। সুতরাং কোনো ওলি-আউলিয়া বা পিরকে গায়েবের ভান্ডার, আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত পৃথিবীর পরিচালক ও ত্রাতা মনে করা শিরক। ইমাম আজমকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর (পৃথিবী পরিচালনা এবং অন্য সকল) কাজের দায়িত্ব অন্য কারও হাতে সঁপে দেননি।'¹⁶³² সুতরাং পৃথিবী পরিচালনা কিংবা জগতের যেসব বিষয় একমাত্র আল্লাহর হাতে (তাসাররুপ), তাতে অন্য কাউকে অংশীদার কিংবা ক্ষমতাশালী মনে করা শিরক।

ইমাম আজম বলেন, 'মানুষের উপর আল্লাহর অধিকার হলো—সকল মানুষ কেবল তাঁর ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করবে না।'¹⁶³³ বোঝা গেল, যেগুলো একমাত্র আল্লাহর অধিকার, সেগুলো অন্য কাউকে দেওয়া শিরক। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও দাসত্ব করা—সেটা যে প্রকারেরই দাসত্ব হোক যথা: মূর্তিপূজা, পিরপূজা, কবরপূজা, ক্ষমতাপূজা, অর্থপূজা, প্রেমপূজা, প্রবৃত্তিপূজা—সবকিছু শিরক।

টিকাঃ
১৬৩০. আল-ফিকহুল আকবার (১)।
১৬৩১. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (৭-৯)।
১৬৩২. আল-ফিকহুল আবসাত (৪২)।
১৬৩৩. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৭)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 শিরকের বিরুদ্ধে ইমাম আজম

📄 শিরকের বিরুদ্ধে ইমাম আজম


শিরকের ব্যাপারে ইমাম আজম রহ. থেকে খুব বেশি আলোচনা পাওয়া যায় না। কারণ, তিনি ছিলেন তাবেয়ি-যুগের মানুষ। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে গড়া আলোকিত প্রজন্ম সাহাবায়ে কেরাম রাযি. তখনও পৃথিবীতে তাওহিদের দীপ জ্বেলে প্রোজ্জ্বল করে রেখেছিলেন। মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা এবং ঈমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কাজ প্রকাশ পাচ্ছিল, আকিদাগত নানারকম বিচ্যুতি শুরু হচ্ছিল। কিন্তু সরাসরি শিরক সংঘটনের পরিমাণ ছিল নিতান্তই সীমিত। উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাওহিদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। শিরকের অস্তিত্ব ছিল একেবারেই বিরল।

যেহেতু আমাদের সালাফে সালেহিনের নীতি ছিল প্রচলিত বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে কথা বলা, বিদ্যমান ফেতনার মোকাবিলা করা, এ জন্য খারেজি, জাহমিয়্যাহ, মুরজিয়া, কাদারিয়্যাহ, মুতাযিলা, শিয়াসহ বিভিন্ন ফিরকার বিরুদ্ধে আমরা ইমামের সংগ্রাম দেখতে পেলেও শিরকের বিরুদ্ধে তাঁর বিশেষ কোনো আলোচনা বা সংগ্রাম দেখতে পাই না। কারণ, মুসলিম উম্মাহ তখন আল্লাহর অনুগ্রহে সেসব শিরক থেকে মুক্ত ছিল, যেগুলো পরবর্তীকালে উম্মাহকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে।

যেহেতু বর্তমান গ্রন্থটি ইমাম আজম রহ.-এর আকিদার ব্যাপারে, এ জন্য আমরা এখানে ইমাম আজমের বক্তব্য এবং সরাসরি সংশ্লিষ্টতার বাইরে লম্বা কোনো আলোচনার সুযোগ দেখি না। তবে উম্মাহর মাঝে যেহেতু শিরকের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে, এ জন্য আল্লাহ তৌফিক দিলে উম্মাহকে সতর্ক করার জন্য আমরা তাওহিদ ও শিরকের উপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রণয়নের ইচ্ছা রাখি। এখানে কেবল ইমাম আজম এবং হানাফি আলেমদের বক্তব্যের আলোকে সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বিষয় তুলে ধরব, ইনশাআল্লাহ।

শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে ইমাম বলেন, “শিরক নেক আমল নষ্ট করে দেয়। আল্লাহ বলেন, ۞ مَن يَكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ ۞ অর্থ: 'যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কুফর করবে, তার আমল নষ্ট হয়ে যাবে। পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।' [মায়িদা : ৫]¹⁶³⁴

ইমাম আরও বলেন: 'যেভাবে শাহাদাতের মর্যাদা (সকল ইবাদতের মাঝে) সবচেয়ে বেশি, তেমনইভাবে শিরকের গুনাহ সকল গুনাহের চেয়ে মারাত্মক। শিরক সবচেয়ে জঘন্য গুনাহ। কুরআনে এটাকে সবচেয়ে বড় জুলুম বলা হয়েছে: (ইন্নাশ শিরকা লা জুলমুন আজিম) [লুকমান: ১৩]। অন্য কোনো গুনাহকে আল্লাহ 'বড় জুলুম' হিসেবে আখ্যা দেননি। শিরকের ভয়াবহতা বোঝাতে আল্লাহ বলেন, ۞ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ ۞ অর্থ : 'যে-কেউ আল্লাহর সাথে শরিক করল, সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল, অতঃপর মৃতভোজী পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোনো দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল।' [হজ: ৩১] অন্যত্র বলেন, ۞ تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا * أَن دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا ۞ অর্থ ‘নভোমণ্ডল ফেটে পড়া, ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ হওয়া আর পর্বতমালা চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ কারণে যে, তারা দয়াময় আল্লাহর জন্য সন্তান দাবি করেছে।' [মারইয়াম : ৯০-৯১] হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ কিংবা অন্য কোনো পাপের ক্ষেত্রেও আল্লাহ এমন রোমহর্ষক উদাহরণ দেননি।”¹⁶³⁵

ইমাম নিজস্ব সূত্রে আবু যর রাযি. থেকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিস বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।'¹⁶³⁶ বোঝা গেল, কেউ আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে তাওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ তাঁকে কখনোই ক্ষমা করবেন না। সে মুশরিক হিসেবে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে।

টিকাঃ
১৬৩৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৬)।
১৬৩৫. প্রাগুক্ত (১৮)।
১৬৩৬. কাশফুল আসার, হারেসি (১/১৫১-১৫২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00